শহরে হঠাৎ

Now Reading
শহরে হঠাৎ

প্রাঞ্জলের বাবা খুব খুশি। হবেই না কেন? তার ছেলে আজকে হলে উঠবে। প্রাঞ্জল এইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, বিষয় বাংলা। ছেলের এই সাফল্য বাবার চোখে মুখে প্রকাশ পেয়েছে। গর্বে তার বুকটা ফুলে গেছে। একেবারে গ্রামের স্কুল, মফস্বলের একটা কলেজ, এরপর আশেপাশের একটা কোচিং সেন্টারে অনেকটা ডিসকাউন্টে ভর্তি হয়েছিল। সবাই যখন এডমিশন মৌসুমে ঢাকায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, সে তখন পড়ার টেবিলে। প্রাঞ্জল তার বাবার অবস্থার কথা ভেবে কখনও বলেনি ঢাকায় পাঠাতে। তবে সে কখনও ভাবেনি ঢাকায় কোচিং না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যাবে। তার বাবাও ভাবেনি। কারণ তাদের গ্রাম থেকে গত ৭ বছরে কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেনি। সে পেরেছে, তার এলাকায় সে এখন সবার আইকন। নলডাঙা গ্রামের বাচ্চাদের এখন পড়তে বসানো হয় প্রাঞ্জলের উদাহরণ দিয়ে। ‘প্রাঞ্জলের মত হতে হবে, ওর মত ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে।’

-বাবা, সোহেল ভাই অনেক ভাল। তার জন্য আজকে সিট পেয়ে গেলাম।

-হুম, চল খেয়ে আসি। কখন থেকে না খেয়ে আছিস।

-হ্যা, চল।

রুমে সব জিনিসপত্র রেখে তারা ক্যান্টিনে খেতে গেল।

সোহেল তার কলেজের বড় ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তাকে মোটামুটি চিনে। রাজনীতিতে সক্রিয়। তার জন্যেই এত তাড়াতাড়ি হলের সিট পেয়ে গেল। শুরুতেই সিট পাওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল প্রাঞ্জলের জন্য।

প্রাঞ্জলের মন খুব খারাপ। বাবা চলে গেছে বাড়িতে। এই প্রথম পরিবার ছেড়ে বাইরে আছে। সবকিছুর সাথে মানায় নেওয়া খুব কঠিন হবে। বিশেষ করে সামনের দিনগুলো কি হবে ভেবেই কুল পায় না। পরশু থেকে ক্লাশ শুরু। যারা চান্স পেয়েছে সবাই কত ভাল স্টুডেন্ট। তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় ভাল করতে পারবে তো? তাকে ভাল করতেই হবে, এলাকার সবাই তার কত সুনাম করে। কোনমতেই সেটাকে ভুলে গেলে চলবে না।

তার রুমমেট গাইবান্ধার এক বড় ভাই। বেশ হাসি-খুশি থাকেন সবসময়। রতন – ডাকনাম। মনে হচ্ছে অনেক ভাল রুমমেটই হবে। তার বাবা যাওয়ার সময় রতন ভাই উনাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি দেখে রাখবেন। এই কারণে প্রাঞ্জলের বাবা বেশ নিশ্চিন্ত মনেই বাড়ি যেতে পেরেছেন।

রতন ভাই গিটার বাজাতে ভালবাসে। কি সুন্দর করে গিটার বাজায়।

-শোন তোমার কিন্তু একটূ সমস্যা হবে। মাঝে মাঝে গিটার প্র্যাক্টিস করি।

-না ভাই, আমি গান শুনতে ভালবাসি। মিউজিকের প্রতি আগ্রহ আছে। তাছাড়া আপনি তো বেশ গিটার বাজান। শুনতে ভালই লাগছে।

শুনে হেসে দিল।

-আজকে টিএসসিতে কনসার্ট আছে। তুমি যাবে?
-আপনার পার্ফরম্যান্স আছে নাকি?
-আরে নাহ, জেমস আসতেছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। যাবা নাকি মিয়া বল।

কখনও এত বড় কনসার্টে যায়নি। মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে গেল।

-আচ্ছা ভাই, আপনি নিয়ে গেলে যেতে পারি।

সোহেল ভাই ফোন করেছিল। কনসার্টে থাকার কারণে ফোন ধরতে পারেনি। ফোনে হঠাৎ দেখল ২ টা মিসকল।

-সোহেল ভাই, সরি – আমি কনসার্ট দেখতে গেছিলাম। বুঝতে পারিনি।

-তাই নাকি? বাহ, তুমি তো পুরাই স্মার্ট হয়ে গেছো। যাই হোক, আমার রুমে এসে দেখা কর।

-অবশ্যই ভাই। কখন আসব বলেন?
পরেরদিন ক্লাশ করে বিকালে সোহেল ভাইয়ের রুমে দেখা করতে গেল।

-আসছ? গুড। বসো এইখানে।

চুপ করে বসল। সোহেল বেশ গম্ভীর মেজাজের ছেলে। সবসময় একটা চড়া গলায় কথা বলে। তবে হলে ওঠার ব্যবস্থা করে দিয়ে যে উপকার করেছেন সেটা তার কাছে অনেক বড় কিছু। তার বাবার সামর্থ্য ছিল না হলের বাইরে কোথাও রাখার। ঢাকায় বাসা ভাড়া, খাওয়া বাবদ যে খরচ সেটা প্রাঞ্জলের বাবার পক্ষে সম্ভব নয়।

-শোন, হলে থাকলেও কিন্তু হাতখরচ লাগবে প্রতি মাসে। কিছু ভেবেছ?

-টিউশনি খুজতেছি। রুমমেট বড় ভাইকে বলেছি। উনি কয়েকটা টিউশনি করান। আমাকে বলেছেন, পেয়ে গেলে জানাবে।

-আচ্ছা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি উঠে দাড়ালেন। বললেন, চল চা খেয়ে আসি।

রুমে ফিরেছে প্রাঞ্জল। তার মধ্যে একটা চিন্তার রেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

-কি রে!! কিছু হয়েছে?
-ভাই, যদি পড়াশোনার বাইরে কিছু করি, আপনার মত মিউজিক করতে চায়। পলিটিক্স না।

-পলিটিক্সের কথা আসছে কেন? মিউজিক করবি তো ভাল কথা।

-সোহেল ভাই, বলল মাঝে মাঝে তার সাথে থাকতে। কোন মিটিং মিছিলে গেলে যেতে। আরো বললেন যে টিউশনি করা লাগবেনা। মাসে মাসে বেশ টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে দিবেন উনি।

-বলিস কি? এত তাড়াতাড়ি পলিটিক্সে যাস না। একটু সময় নেওয়া ভাল।

-না গিয়েও তো উপায় নেই। উনি আমার হলে সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

-হুম, উনি বেশ নামি-দামি, ক্ষমতাশালী লোকের সাথে উঠ-বস করেন। তুই এক কাজ করতে পারিস। উনাকে একবার অনুরোধ করে দেখ। বল যে, পলিটিক্সের প্রতি তোর আগ্রহ নেই। সবেমাত্র ক্লাশ শুরু হয়েছে। কিছুদিন ভালভাবে পড়াশোনা করতে চাস। এরপর পলিটিক্স করবি। তাহলে কিছুটা সময় পাবি সবকিছু বুঝে ওঠার। ততদিনে হয়ত ভুলেও যাবেন উনি।

প্রাঞ্জলের মুখ দিয়ে কথা বের হল না। শুধু মাথা নাড়ল।

তাকে সোহেল ভাইকে কিছুই বলতে হয়নি। তার রুমমেটই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রতন ভাইয়ের এক বন্ধুও পলিটিক্স করেন। তাকে দিয়েই সোহেলকে বলা হয়েছে প্রাঞ্জলের বিষয়ে।

সোহেল ফোন দিয়েছিল প্রাঞ্জলকে। বলেছে, আপাতত থাক।

রতন ভাই টিউশনি করিয়ে মাত্র রুমে আসল। এসেই গিটার নিয়ে বসে গেল। সাউন্ডবক্সে বেজে চলেছে,

“শহরে হঠাৎ আলো চলাচল, জোনাকি নাকি স্মৃতি দাগে;

কাঁপছিল মন, নিরালা রকম, ডাকনাম নামলো পরাগে !”

-ভাই, আমাকে গিটার শেখাবেন?
-শিখবি?

প্রাঞ্জল হাসল, এই প্রথম তাকে প্রাণখুলে হাসতে দেখল রতন।