হঠাৎ কেন খেয় হারিয়ে ফেলল বাংলাদেশ?

Now Reading
হঠাৎ কেন খেয় হারিয়ে ফেলল বাংলাদেশ?

চলতি সাউথ আফ্রিকা সিরিজটা মোটেও ভালো যাচ্ছে না টাইগারদের। টেস্ট সিরিজে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের পর ওডিআই সিরিজেও হোয়াইটওয়াশ হয়ে হতাশার ঘন কালো মেঘ ছেয়ে আছে টাইগার শিবির জুড়ে। সেই ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা এখন বাংলাদেশের আকাশেও। সেই সুদূর সাউথ আফ্রিকা থেকে যেন শুধুই একবুক দীর্ঘশ্বাস ছুটে আসছে বাংলাদেশী সমর্থকদের দিকে। অন্তত একটা ম্যাচ জয়ের আশায় সমর্থকরা যখন বুক বেঁধে ছিলেন, তখনও টাইগাররা তাদের আফসোস ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেন নি। ওডিআই সিরিজগুলোতে বাঘের মত লড়াই করা সেই বাংলাদেশ হঠাৎ কিভাবে খেয় হারিয়ে ফেলল এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনজুড়েই। এদিকে অনেক উড়ো খবর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরকে উসকে দিচ্ছে যেন। টেস্ট সিরিজে মুশফিকের ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে জটিলতা কিংবা কোচের সঙ্গে তামিমের মনোমালিন্য কোনকিছুই বাদ যাচ্ছে না সমর্থকদের মন থেকে।

বিগত দুই তিনবছর ধরে ঘরের মাটিতে টাইগারদের একের পর এক সাফল্য প্রতিবেশী ক্রিকেট খেলা দেশগুলোকে ঈর্ষান্বিত করেছে। ঘরের মাটিতে ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড এমনকি সাউথ আফ্রিকাকেও হারিয়ে দেওয়া সেই বাংলাদেশ আজ কেমন যেন নিষ্প্রভ। তবে কি শুধু হোম গ্রাউন্ডের সুবিধা নিয়েই এতটা পথ হেঁটেছে টাইগাররা? এ কথা মানতে নারাজ বাংলাদেশী ক্রিকেটবোদ্ধারা। “নড়াইল এক্সপ্রেস” খ্যাত মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে ওডিআই সিরিজগুলোতে যেভাবে দাপট দেখিয়েছে টাইগাররা তাতে কে বলবে শুধু হোম গ্রাউন্ডের সুবিধাই তাদের সাফল্য এনে দিয়েছে? তবে হ্যাঁ, চেনা মাঠের সাথে পরিচিত আবহাওয়ার তো একটা ভালো সুযোগ সুবিধা আছে, তা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।

গত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেলা বাংলাদেশের যোগ্যতা নিয়ে আর কথা বলার হয়তো দরকার নেই। তবে হঠাৎ সেই জেগে ওঠা দলটির এমন ভরাডুবির পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে অনেক গুঞ্জন চলছে। ২২ গজের পিচে বারবার হতাশ করা সৌম্য সরকার, ইমরুল কায়েস কিংবা হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান সাব্বির রহমানের বদলি কেউ কি পারতেন বাংলাদেশকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচাতে? ভক্তদের আন্দোলনের ফসল হিসেবে দলে আসা নাসির হোসাইন কি খুব একটা সুবিচার করতে পেরেছেন নিজের নামের প্রতি? তাসকিন আহমেদের বোলিং এ রানের বন্যায় কি আল-আমিন হোসাইন পারতেন উইকেট শিকারী হতে? সব প্রশ্নের সাথেই একটা “হয়তো” থেকেই যাচ্ছে। যেখানে ঘরোয়া লিগে তিন সিজনে প্রায় তিন হাজার রান করা শাহরিয়ার নাফিস নিজে আফসোস করে টিম ম্যানেজমেন্টের দরজায় কড়া নাড়েন, সেখানে রান খড়ায় থাকা সৌম্য-ইমরুলকে বারবার সুযোগ দেওয়াটা কি কোন পক্ষপাতিত্য ইঙ্গিত করে? ভক্তদের মনে এখন সেই শাহরিয়ার নাফিস বা আনামুল হক বিজয়রাই সৌম্য-ইমরুলের বদলি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু প্রধান কোচ হাতুরুসিঙ্গহের কষা ছকে কি আছে কে জানে!

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের “ডন ব্র্যাডম্যান” হিসেবে মুমিনুল হককেই মানেন ভক্তরা। নিজের ডেব্যু টেস্ট থেকেই স্বমহিমায় জ্বলছিলেন তিনি। তার রানের গড়ও ছিল আশির উপরে। অথচ সেই রান মেশিনও ছিলেন টেস্ট সিরিজে ঘুমন্ত। বড় ইনিংস খুব একটা আসে নি তার ব্যাট থেকে। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপ শক্ত করতে তার যে ভূমিকা ছিল তাতে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন। যদিও তার ব্যাটের দিকে তাকিয়ে ছিল অনেক টেস্টপ্রেমী ভক্ত।

দেশের মাটিতে জ্বলে ওঠা তরুণ অফ স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজও টেস্ট সিরিজে ছিলেন আলোচনার বাইরে। মিরপুরের মাটিতে তার যে টার্ন প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের উইকেটে থিতু হওয়ার সুযোগ দিত না, সেই টার্ন সাউথ আফ্রিকার এই পিচে কেমন যেন আড়ালে রয়ে গেল। নামের প্রতি সুবিচার করতে পারলেন না মিরাজ। মোস্তাফিজও পারেন নি প্রত্যাশা ভালোভাবে পূরণ করতে, সাথে আরো হতাশায় ডুবিয়েছেন ইনজুরিতে পড়ে। এখন ফিরে আসাটাই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের মত সিনিয়র খেলোয়াড়রাও দলকে পর্যাপ্ত সাপোর্ট দিতে পারেন নি প্রয়োজনে।

লিটন দাস বহুদিন রান খরায় থাকার পর এই ট্যুরে রানে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এটা অবশ্যই ভালো খবর বাংলাদেশের জন্য। টিম ম্যানেজেন্টের জন্য হয়তো আরো ভালো খবর নিয়ে আসছেন লিটন। উইকেটের পেছনে তার বেশ কিছু ভালো ক্যাচ বাংলাদেশ দলে একজন ভালো উইকেটরক্ষকেরই যে আভাস দিচ্ছে। বিশেষ করে টেস্ট সিরিজে সাউথ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান বাভুমা’র যে ক্যাচটি তিনি নিয়েছেন তাতেই তিনি উইকেটের পেছনে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছেন। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এই লিটনই হবেন উইকেটের পেছনে বাংলাদেশের একজন যোগ্য কান্ডারি।

পুরো টেস্ট সিরিজে যে মানুষটাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট আর ক্রিকেটপ্রেমীরা মিস করেছে, তিনি সাকিব আল হাসান। ব্যাটে-বলে বারবার মুখ থুবড়ে পড়া বাংলাদেশ যেন তখন সাকিবকেই ডেকেছে বারবার। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের দল সুদূর সাউথ আফ্রিকার মাটিতে নাকানিচুবানি খাচ্ছে, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তার হঠাৎ বিশ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্তে যে সমালোচনা শুরু হয়েছিল তাতেই যেন আগুন উস্কে দিয়েছিল এই ব্যাটিং-বোলিং ব্যর্থতা। তবে তিনি কেন “নাম্বার ওয়ান” তার প্রমাণ ওডিআই সিরিজে ভালোভাবেই দিয়েছেন সাকিব। এতে সেই সমালোচনায় অবশ্য ভাটা পড়েছে কিছুটা। এখন টি-টুয়েন্টিতে তার অলরাউন্ড দক্ষতা দেখতে সবাই অধির আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।

এই ব্যর্থতার জন্য হয়তো টিম ম্যানেজমেন্টের ভুল সিদ্ধান্তই বেশি দায়ী। খেলোয়াড়দের সাথে অনেকে কোচ-কর্মকর্তাদের সম্পর্ক যে ভালো যাচ্ছে না তা টেস্ট সিরিজ চলাকালীন মুশফিকুর রহিমের প্রেস কনফারেন্স থেকেই বোঝা গেছে। একজন অধিনায়ক যখন মাঠে থেকে দলের কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, সেক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্ট অবশ্যই এই ব্যর্থতার দায়ভার নিতে বাধ্য। ধোনীর অধিনায়কত্বে ভারত যে কয়টা ম্যাচ জিতেছে তার প্রায় অধিকাংশতেই দর্শকরা মাঠে ধোনীর বুদ্ধিমত্বার পরিচয় পেয়েছেন। শুধু নামে অধিনায়ক হয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের হাতের পুতুল হওয়া একটা মানুষের নেতৃত্বে একটা দল কতটুকুই আগাতে পারবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দীহান।

এছাড়াও অভিজ্ঞ ওপেনার তামিম ইকবালের সাথে কোচের দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে চলে এসেছে এবার। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে উড়ো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে যে দলের অনুশীলনেও নাকি কোচ-তামিম দ্বন্দ্ব দেখা গেছে। এটাকেও একটা কারণ মনে করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। নইলে ইনজুরি থেকে ফিরে ওডিআই খেলতে মুখিয়ে থাকা দেশের অন্যতম সেরা এই রান মেশিনকে কেনই বা প্রথম ওডিআই ম্যাচে বসে থাকতে হল শুধুই দর্শক হয়ে? সাউথ আফ্রিকার রানের বন্যার বিপরীতে রান তুলতে খুঁড়িয়ে চলতে থাকা বাংলাদেশ দল হয়তো বেশি মিস করেছে এই ওপেনারের ব্যাটটাকে। হয়তো তামিমও আফসোস করেছেন বসে বসে।

মাঠ এবং পিচের কন্ডিশন নিয়েও হয়েছে অনেক কথা। যেখানে ট্যুর শুরুর আগে সবাই কেপটাউন কিংবা  জোহানেসবার্গে জমজমাট একটা ক্রিকেট ম্যাচের কথা চিন্তা করছিলেন, হঠাৎ তারা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বাফেলো পার্কের নাম শুনে হয়তো অনেকেই চিন্তা করছিলেন আদৌ এই নামে কোন ক্রিকেট স্টেডিয়াম আছে কি না! যেসব স্টেডিয়াম বছরের বেশিরভাগ সময় থাকে তালাবন্ধ, সে স্টেডিয়ামগুলোতেই আপ্যায়ন করা হল টাইগারদের। না ছিল আউটফিল্ড ভালো, না ছিল গ্যালারীর অবস্থা ভালো। এটাকে ঠিক অপমান বা হেয় করা বললে ঠিক হবে কি না জানা নেই, তবে এর জবাব মাঠে দিতে ব্যর্থ ছিল টাইগাররা। যদিও সে সুযোগ তৈরিও করতে পারে নি তারা।dwaine-pretorius-returned-figu.jpg

টেস্ট-ওডিআই এর এমন ভরাডুবির পর টি-টুয়েন্টিই শেষ ভরসা। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের আশা টেস্ট-ওডিআই এর সকল হতাশা মুছে অন্তত এই টি-টুয়েন্টি সিরিজে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। কোচ-টিম ম্যানেজমেন্টেরও পালন করতে হবে গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব। দেখা যাক এই আশার কতটুকু মূল্যায়ন করতে পারে মাশরাফি-সাকিব-মুশফিকরা।