3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (শেষ পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (শেষ পর্ব)

চেরনোবিল, নামের সাথে জড়িয়ে আছে যেন দুর্ভোগ আর মৃত মানুষের আর্তনাদ। বিপর্যয়ের সময়কার কাহিনী সেই সাথে সোভিয়েত বাহিনীর ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবেলার কাহিনী ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে। দুর্ঘটনার ৩১ বছর পর চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র আর প্রিপিয়াট শহরের বর্তমান অবস্থা সিরিজের এই শেষ পর্বে আলোচনা করা হবে।chernobyl2.jpg.size.custom.crop.1086x724.jpg

প্রিপিয়াট, এক সময়ের আধুনিক আর কোলাহলে পরিপূর্ণ শহরে এখন প্রবেশ করলে মনে হতে পারে, হলিউডের কোন ভৌতিক ছবির জন্যে বানানো কোন সেটে প্রবেশ করছেন। প্রতি বছর প্রকৃতি আপন খেয়ালে একটু একটু করে প্রিপিয়াট শহরকে গ্রাস করে নিচ্ছে। একসময়ের রৌদ্র উজ্জ্বল আকাশচুম্বী স্থাপনাগুলোর গায়ে গজিয়েছে লতানো গাছ, ফাটল ধরা ছাদ জায়গা করে দিয়েছে গাছদের বেড়ে উঠার জন্যে। সময়ের ছাপ পড়ছে ক্ষতবিক্ষত দেয়াল আর মার্বেল পাথরের মেঝেগুলোতেও। তুষারপাত, বৃষ্টি আর তাপমাত্রার পরিবর্তনের সাথে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে একসময় হাজারো মানুষের পদচারণে মুখর ব্যস্ত রাস্তাগুলো। আগাছা আর ঝরা পাতার নিচে এখনো খুঁজে পাওয়া যায় তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া শহরবাসীর প্রিয় কোন বস্তু অথবা সৈনিকদের ব্যবহার করা তেজস্ক্রিয়তা বিরোধী মাস্ক।

ইউক্রেনের বিশেষ কিছু পর্যটন কোম্পানি চেরনোবিলের নির্দিষ্ট অংশে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দেয়। তারপরও বিশেষ অনুমতি এবং সাথে অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক নিয়ে প্রবেশ করা যায় চেরনোবিলে। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের আশেপাশে যে সব স্থানে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সহনশীলতার মাঝে এসেছে কেবল সেই অংশে যাবার অনুমতি দেয়া হয় দর্শনার্থীদের। পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের ১৯ মাইল জায়গা জুড়ে রয়েছে বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল। সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে পুরোপুরি নিষেধ। তেজস্ক্রিয়তার কোন প্রভাব যাতে না পরে সে জন্যে বিশেষ নির্দেশ থাকলেও নিয়মের তোয়াক্কা না করে বেশিরভাগ দর্শনার্থী শহরের ঘরবাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। কয়েক ঘণ্টার জন্যে সেখানে অবস্থান করতে দেয়া হলেও দুর্ঘটনা-ক্ষেত্রের ৩০ কিলোমিটারের ভেতরে স্থায়ী ভাবে কাউকে বসবাসের অনুমতি দেয়া হয় না।1.jpg

ভৌতিক নগরের বিশেষ দর্শনীয় বস্তুগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বিশাল এক নাগরদোলা যা বছরের পর বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রঙিন শরীরে বয়সের ছোপ পরতে শুরু করেছে। বাম্পারকারের বিশাল শতচ্ছিন্ন ছাউনি আর উজ্জ্বল রঙের গাড়িগুলোর মরচে পরা শরীর মনে করিয়ে দেয় ভয়াবহ সেই দুর্যোগের ভয়াবহতা। বাস স্টেশন, দমকল অফিস, বাচ্চাদের স্কুল কিংবা স্থানীয় হাসপাতাল সবখানেই ছড়িয়ে আছে হুট করে চলে যাওয়া প্রিপিয়াটবাসীর জীবনের ছাপ। রাস্তায় মরচে পরা গাড়ির সাথে মে ডে উদযাপনের জন্যে প্রস্তুত করা ব্যানারগুলোও অপেক্ষায় আছে কখনো না হওয়া কুচকাওয়াজের শব্দের। বিশাল সাইনবোর্ড বছরের পর বছর ধরে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে চলছে সবাইকে মৃত এই শহরে।2.jpg

প্রিপিয়াট শহর ১৯৮৬ সালের পর থেকে জনশূন্য হলেও চেরনোবিল শক্তিকেন্দ্র কিন্তু বন্ধ হয়ে যায় নি। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত মোট চারটি পারমানবিক চুল্লি বসানোর কাজ সম্পন্ন করে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ। সেই সাথে কাজ চলতে থাকে আরও দুইটি চুল্লীর। ৮৬ সালে চার নম্বর চুল্লীর বিস্ফোরণের ফলে সেই দুইটি চুল্লীর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট তিনটি পারমাণবিক চুল্লী আরও কয়েক বছর কার্যকর ছিল, কারণ ইউক্রেনের বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটানোর জন্যে অন্য কোন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক ভাবে নেয়া সম্ভব ছিল না। ২ নম্বর পারমাণবিক চুল্লী ১৯৯১ সালে, ১ নম্বর চুল্লীটি ১৯৯৬ সালে এবং সর্বশেষ ২০০০ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় চেরনোবিলের তিন নম্বর এবং সর্বশেষ পারমাণবিক চুল্লী। Chernobyl-520066.jpg

বিস্ময়কর হলেও সত্যি চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে এখনো প্রায় ৪০০০ মানুষ কাজ করে। এই কর্মচারীদের মধ্যে প্রকৌশলী, বিশেষজ্ঞ আর শ্রমিক রয়েছে। তাদের মূল কাজ ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর রক্ষণাবেক্ষণ করা। পার্শ্ববর্তী অপর চুল্লীগুলো নিস্ক্রিয় করা এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ অপসারণের সময় যাতে কোন রকম দুর্ঘটনা না ঘটে সে জন্যে এই কর্মীদের নিয়োগ করা হয়েছে। তেজস্ক্রিয় এই অঞ্চলে কর্মীরা কিভাবে কাজ করে তা নিয়ে যে কারও কৌতূহল জাগতে পারে। পূর্ণ বিবরণী জানা না গেলেও এটুকু জানা যায়, তেজস্ক্রিয়তা রোধী বিশেষ পোশাক ছাড়াও বিশেষ তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কাজ করা লাগে সেখানে। প্রত্যেক কর্মচারীকে মাসে দুই সপ্তাহ চেরনোবিলে কাজ করবার পরবর্তী দুই সপ্তাহ তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকার মাঝে রয়েছে বিশাল এক বন। প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই বনের নাম ‘রেড ফরেস্ট’। যে অঞ্চলের কোন কিছুই সাধারণ নয় সেখানকার বনও তাই অসাধারণ। চেরনোবিল বিস্ফোরণের ফলে এই অঞ্চলের পাইন গাছের পাতা মরে লালচে হয়ে গিয়েছিল। অশুভ সেই মৃত বনের নাম তাই রাখা হয় রেড ফরেস্ট। দুর্ঘটনা পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সময় বিষাক্ত এই বন কেটে ফেলা হয় এবং অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থের সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়।। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বন্য অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত এলাকাগুলোর একটি বলা হয়ে থাকে। অনেকের মতে এই জঙ্গলে আশ্রয় নেয়া বন্য পশু-পাখি যারা তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয়েছিল, পরবর্তীতে তাদের মৃতদেহ সেখানকার মাটিতে মিশে জায়গাটি আরও বিষাক্ত করে তোলে। যার ফলে পরবর্তী সময় সেখানে জন্মানো গাছ এবং প্রাণীদের মধ্যে অদ্ভুত আকৃতি এবং গঠন দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে রেড ফরেস্টে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে যার ফলে আশঙ্কা দেখা দেয় তেজস্ক্রিয় বাষ্প ছড়িয়ে পরার।18pa142mfvc1fjpg.jpg

দুর্ঘটনার ৩১ বছর পর কি বলা চলে ইউক্রেন, রাশিয়া বা ইউরোপ চেরনোবিলের বিষাক্ত ছোবল থেকে পুরোপুরি নিরাপদ? না, সে কথা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ‘সার্কোফেগাস’ নামের বিশাল এক কাঠামোর মাধ্যমে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লীকে ঢেকে দেয়া হয়েছিল সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে গত পর্বে। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত বৈজ্ঞানিকরা ঘোষণা করেন সার্কোফেগাস ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তা ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। সেই সময়ই ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্কের সহায়তায় একটি বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়, যাতে সার্কোফেগাসের রক্ষণাবেক্ষণে অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি না হয়। কিন্তু বিগত ৩১ বছরে নানান ভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হয় সার্কোফেগাস। বৃষ্টিপাত এবং তুষার গলা পানির কারণে সার্কোফেগাসের ধাতব শরীরে মরচে পরতে শুরু করে। সেই সাথে ভেতরের পারমাণবিক বর্জ্য পর্যবেক্ষণের জন্যে রাখা বিশাল ছিদ্রগুলো দিয়েও ভেতরে পানি প্রবেশ করে। মরচের প্রভাব ছাড়াও সার্কোফেগাস ক্ষয় হবার পেছনে তেজস্ক্রিয়তা দায়ী। সেই সাথে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করায় কিছু ত্রুটি প্রাথমিক ভাবেই রয়ে গিয়েছিল এই কাঠামোতে।new-safe-confinement-chernobyl-NPP-ukraine-2.jpg

১৯৯৬ সালে ঘোষণা করা হয় সার্কোফেগাসের ভেতরে ঢুকে মেরামত করা সম্ভব নয় সেখানের তেজস্ক্রিয় পরিবেশের কারণে। কিন্তু সময়ের সাথে ক্ষয়ে যাওয়া এই স্থাপনার উপর আর বেশিদিন ভরসা করাও সম্ভব নয়। তখনই নতুন আরও নির্ভরযোগ্য নতুন একটি কাঠামোর কথা পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন বন্দীশালা বা নতুন আশ্রয় New Safe Confinement (NSC or New Shelter)  এর কাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালের মাঝে শেষ করবার লক্ষ্যে কাজ শুরু হলেও নানান জটিলতায় শেষ পর্যন্ত বলা হয় ২০১৫ সালে সম্পন্ন হবে নতুন এই কাঠামোর কাজ। অর্থনৈতিক জটিলতায় আবারো কাজ পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ীয় ২০১৭ সালের শেষ দিকে নতুন এই স্থাপনার কাজ সম্পন্ন হবে। এতে মোট খরচ হচ্ছে ২.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এনএসসি নামের এই স্থাপনা মূলত তৈরি করা হচ্ছে কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় বাষ্প বা অন্য কোন পদার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লী থেকে বের না হতে পারে। সার্কোফেগাসের উপরে একে বসিয়ে দেয়া হবে যাতে পুরো চুল্লীটি সুরক্ষিত থাকে। এর ফলে কমপক্ষে ১০০ বছর নিশ্চিত থাকা যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস।

অনেক বিশেষজ্ঞ অনেক রকম মতামত প্রকাশ করলেও সবচেয়ে কম করে হলেও ১৮০ থেকে ৩২০ বছর লাগবে চেরনোবিল এলাকা মানুষের বসবাসের উপযোগী হতে। মাটির নিচের দূষণ অথবা পানি নিশ্চিত রূপে নিরাপদ হতে আরও বেশি সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লী থেকে পারমাণবিক বর্জ্য কবে নাগাদ সরানো হবে এই বিষয়ে সঠিক কিছু জানা যায় নি। যেমন জানা যায়নি অগণিত মৃত মানুষগুলো সম্পর্কে। রহস্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যের সামান্য অংশই হয়তো আলোচনা করতে পেরেছি।  চেরনোবিলের কাহিনী এই পর্যন্তই থাকলো। আগামীতে দেখা হবে নতুন কোন কাহিনী নিয়ে। ধৈর্য ধরে পুরো সিরিজটি পড়ার জন্যে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (পঞ্চম পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (পঞ্চম পর্ব)

চতুর্থ পর্বের পর থেকে,

পারমাণবিক যে লাভা ধীরে ধীরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছিল পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অংশকে গ্রাস করতে, বিশেষজ্ঞরা এর নামকরণ করেন ‘এলিফেন্ট ফুট’। আকৃতিতে কিছুটা মিল থাকায় হাতির পায়ের সাথে মিলিয়ে এই নাম রাখা হয়। এর আকার প্রায় দুই মিটার আর সব মিলিয়ে ওজন হবে ২০০ টন। উত্তপ্ত লাভার মত এই পদার্থকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক পদার্থগুলোর একটি বলে গণ্য করা হয়। ‘এলিফেন্ট ফুট’ এর তেজস্ক্রিয়তা এতোটাই বেশি যে, বিশেষ পোশাক ছাড়া এর কাছাকাছি গেলে ৪ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু ঘটতে পারে একজন মানুষের। এই গলিত মৃত্যুর ধারা জলাশয়ের পানির সংস্পর্শে এলে যে বিস্ফোরণ ঘটবে সেটি হবে হিরোশিমার আণবিক বিস্ফোরণের কমপক্ষে দশগুণ বড়!

পারমাণবিক এই টাইমবম্বকে পানির সাথে মিশতে না দেবার একটাই উপায় তখন সামনে খোলা ছিল। চুল্লীর নিচের জলাশয় থেকে সব পানি অপসারণ করে ফেলতে হবে। এরপর এই জলাশয়কে এমন ভাবে আটকে দিতে হবে যাতে করে উত্তপ্ত লাভা আর এগুতে না পারে। পরিকল্পনার চূড়ান্ত হবার পরই এর ত্রুটিও সবার চোখে ধরা পরে। বিস্ফোরণের ফলে, জলাশয়ে থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্যে যে এক জোড়া গেট ভালভ ব্যবহার হতো সেগুলো অকেজো হয়ে পরে। জলাশয়ের ভেতরে প্রবেশ না করে সেই ভালভ খোলার আর কোন উপায় নেই। এদিকে ধীর পায়ে হলেও ‘এলিফেন্ট ফুট’ নামের মৃত্যু নেমে আসছে ফাটলের গা বেয়ে। সোভিয়েত কর্তারা সিদ্ধান্ত নেয়, বাইরে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সরাসরি জলাশয়ে পৌঁছাতে হবে। ৪০০ খনি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর নিচের সেই জলাশয়ে যাবার পথ হিসেবে ১৬৮ মিটার (৫৫১ ফিট) সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করে। এমন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার আতংক আর মৃত্যু ভয় ছাড়াও, বৈরি আবহাওয়াও তাদের কাজ আরও কঠিন করে তোলে। অবশেষে শেষ হয় সুরঙ্গ তৈরির কাজ। যে খনি শ্রমিকরা এ কাজে অংশ নিয়েছিল তাদের এক-চতুর্থাংশ বয়স ৪০ পেরুনোর আগেই মারা যায় তেজস্ক্রিয়তার কারণে।

মাটির নিচের পথ ধরে জলাশয়ে প্রবেশ করেন পানি নিষ্কাশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মীরা। সেখানেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। গেট ভালভগুলো পানির নিচে ডুবে রয়েছে। চুল্লীর সরাসরি নিচে থাকা এই পানি কতটা বিষাক্ত হতে পারে সেটা পরিমাপ না করলেও ভালভাবেই কল্পনা করা যায়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশের স্বার্থে আর ইউরোপবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন অকুতোভয় তরুণ ভ্যালেরি বেজপালভ, অ্যালেক্সি আনানেকো এবং বরিস বারানভ তেজস্ক্রিয় পানিতে নেমে ভালভ খুলে জলাশয়ের পানি বের হওয়া নিশ্চিত করেন। এ ঘটনার ২০ দিনের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার সাথে লড়াই করে তিনজনই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তাদের মৃত্যুর সময় নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। দ্বিতীয় এই বিস্ফোরণ আটকানো সম্ভব হলেও হাঁফ ছাড়বার উপায় নেই সোভিয়েত কর্তাদের। মধ্যরাতের চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর বিস্ফোরণে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য চুল্লীর ছাদে আর আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল সেখান থেকেও ছড়াচ্ছে বিষাক্তটা। অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় এই বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না করা গেলে পার্শ্ববর্তী চুল্লীর কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাথে মানুষের শারীরিক ঝুঁকি তো রয়েছেই।

নতুন এই সমস্যা নিয়ে আবার ভাবতে বসে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞরা। ততদিনে তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা সবাই জেনে গেছে। এর অসীম শক্তি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে অবলীলায়। সিদ্ধান্ত আসে পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণে দূর নিয়ন্ত্রিত রোবট ব্যবহার করা হবে। মহাশূন্য অভিযানে পাঠানোর জন্যে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার এ ধরনের রোবট নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। রোবটের সাহায্যে শক্তিকেন্দ্রের ছাদের উপরের পারমাণবিক বর্জ্য (যার বেশির ভাগ ইউরেনিয়ামের টুকরো)নিচে ফেলা হবে। নিচে বিশালাকার ক্রেনের সাহায্যে এই দূষিত পদার্থগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হবে যাতে দূষণ ছড়াতে না পারে।

তেজস্ক্রিয়তা কেবল জীবিত প্রাণীদের উপরই নয় সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির উপরও প্রভাব ফেলে। সরাসরি সংস্পর্শে এলে পুরোপুরি বিকল করে দিতে পারে যে কোন যন্ত্রকে। দুইদিন কাজ করার পর তাই একে একে বিকল হতে থাকে সোভিয়েত রোবট। ঘনিয়ে আসা এই বিপদের সমাধানে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেয়া অভিযান পরিচালকরা। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এ কাজে মানুষ ব্যবহার করার। তেজস্ক্রিয়তা-রোধী বিশেষ পোশাক আর টুপি পরে ছোট ছোট দলে ভাগ মানুষ প্রবেশ করবে ইউরেনিয়ামের টুকরো ভরা ছাদে। মাত্র একবার ছাদ থেকে দূষিত ইউরেনিয়ামের টুকরো বাইরে ফেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে যাবে তারা। কারণ ৪৫ সেকেন্ড সময়ের বেশি পারমাণবিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা একশ ভাগ। পালা করে নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা এই অসম্ভব কাজ করতে থাকে। একই সাথে চলতে থাকে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা। যার নাম ‘প্রোজেক্ট সার্কোফেগাস’। স্টিল আর কনক্রিটের বিশাল এক কাঠামো এই সার্কোফেগাস। ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে এই কাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০০ টন তেজস্ক্রিয় কোরিয়াম, ৩০ টন বিষাক্ত ধুলো আর ১৬ টন ইউরেনিয়াম আর পটাশিয়াম সার্কোফেগাস এর ভেতর ঢাকা পরে। দুর্ঘটনার ২৪ দিনের মাথায় এর কাজ শুরু হয় এবং ২০৬ দিনের মাঝে এই বিশাল কাঠামো কাজ শেষ করা হয়। বেশ কয়েকটি ধাপে সার্কোফেগাস এর কাজ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলাদা আলাদা অংশ তৈরি করে এনে একসাথে জোড়া দিয়ে কাঠামোটি দাড় করানো হয়। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে পুরোপুরি ভাবে ঢেকে দেয়া হয় অভিশপ্ত এই পারমানবিক চুল্লীকে।

অদ্ভুত হলেও সত্যি এতো বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান ছিল অনেক বেশি। কাগজে কলমে চেরনোবিলের এই বিপর্যয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ধরা হয় মাত্র ৩১ জন। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের কর্মরত ব্যক্তিদের বাইরে সেই তালিকায় আছে প্রাথমিক ভাবে আগুন নেভাতে যাওয়া দমকল কর্মী এবং পানির ভালভ খুলতে যেয়ে মারা যাওয়া সেই তিন বীরের নাম। বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায় লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বিপদকালিন কাজে অংশ গ্রহণ করেছিল। এদের মাঝে অনেকেই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয় এবং স্বাভাবিক সময়ের আগে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু সেসব নিবেদিতপ্রাণ মানুষের কোন তালিকা বা পরিচয়য়ের নথি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। চেরনোবিলের মৃত্যু কূপের সাথে তাদের নাম পরিচয়ও ঢাকা পরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল ক্ষমতার আড়ালে।

এভাবেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মানব ইতিহাসের ভয়ানক এই বিপর্যয় সামাল দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পতন হয়, সেই কবর খোঁড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয়েছিল এই চেরনোবিল দুর্ঘটনার মাধ্যমে। অদৃশ্য এই মৃত্যু-দূতকে সার্কোফেগাস কি সত্যি ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে সঠিক ভাবে? একত্রিশ বছর পরে আজও কতটা বিপজ্জনক চেরনোবিল এলাকা? সেসব থাকবে ধারাবাহিক এই সিরিজের শেষ পর্বে।

 

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর ( চতুর্থ পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর ( চতুর্থ পর্ব)

চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রর দুর্ঘটনা এবং প্রিপিয়াট শহর নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই সিরিজের বিগত পর্বগুলোতে। এই পর্ব এবং আগামী পর্বে থাকবে বিস্ফোরণ ঘটার পরে ইউক্রেন অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন কিভাবে সেই দুর্যোগ মোকাবেলা করেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

গভীর রাতে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার প্রাথমিক ধাক্কা সকাল হতেই সামলে নেয় স্থানীয় দমকল বাহিনীর কর্মীরা। শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রনকক্ষ আর কর্মচারীদের যাতায়াতের অংশের আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু চুল্লীর মূল অংশ যেখানে পারমাণবিক জ্বালানী রয়েছে সেখানের আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। বিষাক্ত এই জ্বালানী নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে যায়। প্রচণ্ড উত্তাপ ছাড়াও এর থেকে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় বাষ্প বাতাসে মিশে ক্রমাগত দমবন্ধকারী ধোঁয়া সৃষ্টি করতে থাকে। বর্ণ গন্ধহীন এই বিষ এতোটাই ক্ষতিকর আর ভয়াবহ ছিল যে, সেই বাতাসে কয়েক মিনিট নিঃশ্বাস নিলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়া নিশ্চিত। সেই সাথে মৃত্যুর সম্ভাবনাও বেড়ে চলে প্রতি মুহূর্তে। পারমাণবিক চুল্লীর আশেপাশের এলাকায় সেই বাতাস দ্রুত ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। মেঘের সাথে তেজস্ক্রিয় কণা মিশে সৃষ্টি হয় ভয়ানক তেজস্ক্রিয় মেঘের। হাওয়ায় ভেসে সেই মৃত্যু দূত এগুতে থাকে দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর দিকে।

আন্তর্জাতিক ভাবে পারমাণবিক বিপর্যয় নিয়ে যতই লুকোচুরি করুক সোভিয়েত ইউনিয়ন, দুর্ঘটনার মোকাবেলা তাদের মুখ ফিরিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর মত, দেবতাদের সাথে মানুষের অসম লড়াইয়ের এক কাহিনী যেন শুরু হয় চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লী আর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের মাঝে। প্রাথমিক ভাবে প্রিপিয়াট শহর আর এর আশেপাশের মানুষজন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় তাদের মূল যুদ্ধ। সামরিক প্রহরার মাধ্যমে প্রথমেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ চেরনোবিলের সাথে সমগ্র ইউক্রেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই সাথে দুর্ঘটনা এলাকার ত্রিশ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে কেউ বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেয়। এই প্রস্তুতির অনেকটুকুই অফল হয় কারণ, পারমাণবিক বিষাক্তটা আর এর ভয়াবহতা তখনও সবার কাছে নিতান্তই তাত্ত্বিক বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে চেরনোবিল অঞ্চলে অবস্থানরত সৈন্য এবং বিশেষজ্ঞ কর্মীদের বায়ু বিশুদ্ধিকরণ মুখোশ এবং বিশেষ পোশাক পরার নির্দেশ দেয়া হলেও অনেকেই সেই বিষয়ে অনীহা দেখায়। ফলাফল স্বরূপ সমস্যা সমাধানকারী দলের সদস্যরাও আক্রান্ত হতে থাকে পারমাণবিক বিষাক্ততায়।

প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব এবং সেই সাথে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে সম্পূর্ণ ধারনা না থাকায় বিশেষজ্ঞ দল নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে। প্রাথমিক ভাবে তারা সিদ্ধান্ত নেয় বাতাসে বিষাক্ত পারমাণবিক পদার্থগুলো মেশা বন্ধ করতে হবে। সে জন্যে চুল্লীর ভেতর জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানীর উপর বিশেষ আস্তরণ তৈরির কথা তারা চিন্তা করেন। চুল্লীর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বালু আর বরিক এসিডের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চুল্লীর মুখের ভেতরে বালু আর বরিক এসিড নিক্ষেপের জন্যে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামরিক হেলিকপ্টার আনানো হয়। ৬০০ জন অভিজ্ঞ পাইলট এই অভিযানে অংশ নেন। পালাক্রমে সারা দিন-রাতে তারা শতশত বার চুল্লীর উপর দিয়ে যাওয়া আসা করেন বস্তা ফেলার জন্যে। সে সময় বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ এতোটাই বেশি ছিল যে হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিও এবং স্থির ছবিগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে দুইপাশে অনেকখানি ঝলসে যেতে দেখা যায়। আস্তরণ তৈরির কাজে নিয়োজিত একটি হেলিকপ্টার পার্শ্ববর্তী ক্রেনে ধাক্কা লেগে ভূপাতিত হয়। ঘটনাস্থলে মারা যায় ভেতরে আটকা পরা সকলেই। আস্তরণ তৈরির এই পরিকল্পনা প্রাথমিক ভাবে সফল হয়। কুন্ডুলী পাকিয়ে উঠতে থাকা মৃত্যুর ধোঁয়ার বেগ কমে আসতে শুরু করে। কিন্তু বিস্ফোরণে পারমাণবিক চুল্লী এতোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, রাসায়নিক এই আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা তারপরও সম্ভব হচ্ছিলো না। বালু আর বরিক এসিডের পর সীসার আরও একটি আস্তরণ দেয়া হয় একই উপায়ে। তেজস্ক্রিয়তা বাইরে বের হওয়া বন্ধের জন্যে সীসা ব্যবহার করা হয়েছিল।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিক ভাবে জানার জন্য সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে গোপনে তদন্তে পাঠানো হয় কেজিবিকে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভিডিও ধারণ করে কেজিবি। কিন্তু সেই ভিডিও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাইরে প্রচার করেনি। সোভিয়েতদের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের বিপরীত শক্তি আমেরিকার গোয়েন্দা বিমান চেরনোবিল থেকে গোপন ভিডিও চিত্র পাঠানোর পর আমেরিকা সহ বিশ্বের অন্য সব দেশ জানতে পারে আসল ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বীকার করতে বাধ্য হয় ইউক্রেনের পারমাণবিক চুল্লী বিস্ফোরণের কথা। মৃত্যুর বালি ঘড়ি উল্টে যাবার পর স্বীকার অস্বীকারে যদিও খুব বেশি পার্থক্যের সৃষ্টি করে না। ইউক্রেন, রাশিয়া আর বেলারুশের গণ্ডি পেরিয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পরতে শুরু করে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে সহ অন্যান্য দেশে। স্বাভাবিকের তুলনায় চার-পাঁচগুণ তেজস্ক্রিয়তা ধরা পরে এই সব অঞ্চলে। ফ্রান্স আর যুক্তরাজ্যের নানান অংশেও বিষাক্ত মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত অদৃশ্য কোন ভিনগ্রহবাসীর আক্রমণে যেন আক্রান্ত হতে থাকে গোটা ইউরোপ। খবর আসতে থাকে তেজস্ক্রিয় বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে ফসল নষ্ট হবার। সেইসব এলাকার মানুষ এমনকি গবাদি পশু আর বন্যপ্রাণী সবই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় ।

বাইরের দেশগুলো যখন নিজেদের দেশের বায়ু নিরাপদ রাখতে লড়ছে তখন ইউক্রেন তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের সামনে নতুন আরও একটি বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয়। প্রাথমিক তদন্তের শেষে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভেতরে ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীতে তখনও পারমাণবিক বিক্রিয়া চলছে। এই ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীর ঠিক নিচেই রয়েছে ৫ মিলিয়ন গ্যালন ধারণ ক্ষমতার জলাধার। এই জলাধারের পানিই ব্যবহৃত হত চুল্লীর শীতলীকরণে কাজে। ক্রমাগত জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানির উপর যে আস্তরণ দেয়া হয়, সেই সীসা, বালি আর বরিক এসিড পারমাণবিক জ্বালানীর সাথে মিশে উত্তপ্ত লাভার মত এক পদার্থের সৃষ্টি করে। ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লীর একেবারে তলানিতে জমে থাকা এই জ্বলন্ত লাভা আর জলাধারের মাঝে ছিল কেবল একটি কনক্রিট স্ল্যাব। বিস্ফোরণের ফলে সেই স্ল্যাবে ফাটলের সৃষ্টি হয়। কেবল বিস্ফোরণ নয় সেই সাথে পারমানবিক কেন্দ্রের ত্রুটিপূর্ণ গঠন এর জন্যে দায়ী। উত্তপ্ত রাসায়নিক লাভা ধীরে ধীরে স্ল্যাবের ফাটল দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।  পারমাণবিক এই লাভা পানির সংস্পর্শে আসলে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধ্বংস হবে পুরো পারমাণবিক চুল্লী, সেই সাথে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটবে পার্শ্ববর্তী অন্য তিনটি চুল্লীতেও। যার ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ইউরোপের অর্ধেকের বেশি দেশ আর সেই সব এলাকার অনেক অংশ অন্তত পাঁচ লক্ষ বছরের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ অন্যদিকে শতাব্দীর ভয়াবহতম বিস্ফোরণের সম্ভাবনা, কিভাবে এই সব কিছুর সমাধান করে ক্ষমতাশীল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কোন উপায়ে তারা আটকে দেয় অদৃশ্য এই মৃত্যু দানবকে, সেই প্রশ্নের জবাব থাকবে আগামী পর্বে।

 

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (তৃতীয় পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (তৃতীয় পর্ব)

গত পর্বের পর থেকে ……

বাইরে রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে নিয়ন্ত্রন কক্ষের উত্তেজনা বাড়তে থাকে। নিজের কাজে অভিজ্ঞ আকিমভ এবং টপ্টোনভ শুরুতেই কাজের খুঁত দেখতে পান। বিশেষজ্ঞদের যে নির্দেশনামা তাদের দিয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট বলা ছিল চুল্লীর শক্তি কোন অবস্থায় রেখে পরীক্ষা চালাতে হবে। পরীক্ষা প্রধান তথা সে সময় চার নম্বর পারমানবিক চুল্লীর নিয়ন্ত্রনকক্ষের প্রধান ডিয়াটলভ সেই নির্দেশনা মানতে নারাজ। সে নির্দেশ দেয় টপ্টোনভকে নিজের হিসাব অনুযায়ী পরীক্ষা শুরু করতে। টপ্টোনভ এবং আকিমভ কাজ শুরুর আগে ডিয়াটলভকে আবারো এই বিষয়ে ভেবে দেখতে বলে। ডিয়াটলভ মনে করিয়ে দেয় কে এই পরীক্ষার নেতা। সোভিয়েত নিয়মে যদিও প্রকৌশলীদের বেশ ভালো পারিশ্রমিক এবং সুযোগ সুবিধা দেয়া হত, কিন্তু নেতার কথা না শুনলে শাস্তির পরিমাণও কম ছিল না। তাই মনে খুঁতখুঁত করলেও পরীক্ষা শুরু হয় তাদেরই হাত ধরে।

৭০০ মেগাওয়াট শক্তিতে পরীক্ষা করবার নির্দেশ থাকলেও ডিয়াটলভ এই শক্তি ২০০ মেগাওয়াটে নামিয়ে আনতে নির্দেশ দেয়। সাড়ে বারোটা নাগাদ পারমাণবিক চুল্লীর শক্তি কমিয়ে আনা হয়। ক্ষমতা কমাতে যেয়ে বিপত্তি ঘটায় কর্কশ কণ্ঠে অ্যালার্ম বেজে ওঠে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় টপ্টোনভ পুরো পারমাণবিক চুল্লী বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ডিয়াটলভ অন্য ধাতের গড়া মূর্তি। উপরওয়ালাদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়াতে তার আর ধৈর্য ছিল না। আকিমভ এবং তার সহকারী টপ্টোনভ যতবার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে তার হিসেবে পরীক্ষা চালাতে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে, ডিয়াটলভ তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। বন্ধ করে দেয়া পারমাণবিক চুল্লী আবারো চালু করতে বাধ্য করা হয়। ঘড়িতে সময় তখন ১২:৪০ থেকে কিছু বেশি।

সাবস্ক্রাইব করে রাখুব বাংলাদেশীজম প্রজেক্টের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করে নতুন সব আপডেটের জন্য! 

চুল্লী নতুনকরে চালু করার সময় দ্রুত শক্তি বাড়াতে নিয়ন্ত্রণকারী বোরোন দণ্ড গুলো তুলে নেয়ার নির্দেশ দেন ডিয়াটলভ। নিজের স্বৈরাচারী একক নির্দেশে চেরনোবিল চার নম্বর চুল্লীর এগুতে থাকে তার নিয়তির দিকে। এ যেন মহাশক্তিধর কোন ক্ষমতার বিপরীতে একরোখা কোন যোদ্ধার লড়াই। অতীত দিনের পরাজয় আসলে এই একনায়ক কে আরও আগ্রাসী করে তুলেছিল। চেরনোবিলের পারমাণবিক কেন্দ্রে আসার আগে আনাতোলি ডিয়াটলভ সোভিয়েতের একটি পারমাণবিক ডুবোজাহাজ তৈরি কেন্দ্রে কাজ করত। সেখানে এক দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয় সে, এর ফলে তার ছেলে লিউকমিয়ায় (তেজস্ক্রিয়তার কারনে ছড়ানো রোগ বিশেষ) আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়। সেই থেকে পারমাণবিক শক্তির সাথে অদৃশ্য এক স্নায়বিক যুদ্ধ চলে তার। কিন্তু এই আক্রোশ হাজারগুনে প্রতিফলিত হয়ে শুধু তাকে নয় অগণিত মানুষকে সেই সাথে পুরো দেশকে নিশ্চিত এক ধংসের মুখে ঠেলে দেয়।

পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ যখন শুরু হয় তখন মধ্যরাতের পর আরও এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। চুল্লীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্যে যে পানির লাইন সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়। অত্যধিক উত্তপ্ত ইউরনিয়াম দণ্ড ঠাণ্ডা হতে না পেরে আরও উত্তপ্ত হতে থাকে। শক্তির ভারসাম্যহীনতায় আগে থেকেই বিপর্যয়ের বালি ঘড়ি উল্টো দিকে যাত্রা করেছিল। তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রনের পানি বন্ধ করায় চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লী ধীরেধীরে পরিণত শুরু করে অদৃশ্য এক টাইমবোমে!

পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে জেনারেটর চালু হয়ে পানির প্রবাহ পুনরায় শুরু করে তাপমাত্রা কমানোর কথা থাকলেও, সেগুলো চালু হতে দেরী হতে থাকে। পরীক্ষকদের হিসেবে টারবাইনের মাধ্যমে পানির যে প্রবাহ চলার কথা ছিল সেটাও কাজে আসে না। এর ফলে চুল্লীর ভেতর বাস্পের চাপ বাড়তে থাকে, ইউরেনিয়াম দণ্ড সহ পুরো চুল্লী এবং স্থাপনা এর ফলে কাঁপতে শুরু করে। ঘটনায় বিপদের আঁচ পান আকিমভ এবং টপ্টোনভ। দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সেই জন্যে এবার দলপতির নির্দেশের তোয়াক্কা না করে জরুরী প্রয়োজনে ব্যাবহারের জন্যে যে সুইচ তা চেপে দেন টপ্টোনভ।

চুল্লীর ক্ষমতা আর তাপমাত্রা স্বয়ংক্রিয় ভাবে কমিয়ে আনার জন্যে বোরোন দণ্ডগুলো দ্রুত চুল্লীতে নেমে আসতে শুরু করে। শুরু হয় ধ্বংসের প্রথম পর্যায়। প্রতিটি বোরোন দণ্ডের মাথায় গ্রাফাইট আবরণ জড়ানো ছিল। এই গ্রাফাইট অতিমাত্রায় উত্তপ্ত চুল্লীকে নিস্ক্রিয় করার যায়গায় বরং সৃষ্টি করে বিশাল এক তরঙ্গ ঢেউ (সারজ)। অনেকটা জ্বলন্ত আগুনের মাঝে তেল ঢেলে দেবার মতন। এর ফলে চুল্লীর ক্ষমতা এক ধাক্কায় বেড়ে যায় একশো গুন বা তারও বেশি। ৫০টির মত বোরোন দণ্ড ভেঙ্গে যায় এবং বাষ্পের চাপে চুল্লীর আবরণ ভাঙ্গতে শুরু করে। ১:২৩ মিনিটে ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। বিস্ফোরনোর সাথে সাথে নিয়ন্ত্রন কক্ষ সহ পুরো শক্তিকেন্দ্রের বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রন কক্ষের সবার ধারনা হয় চুল্লী বন্ধ করা গেছে, হয়তো উত্তাপের ফলে পানির কোন লাইনে বিস্ফোরণ হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই ঘটে দ্বিতীয় দফায় বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণ পুরো কেন্দ্রকে নাড়িয়ে দেয়। চার নম্বর চুল্লীর ছাদ ভেঙ্গে উড়ে যায়। চুল্লীর ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস, ইউরনিয়ামের টুকরো সহ পারমাণবিক বর্জ্য বেরিয়ে আসে। খুব গরম কেটলি থেকে হঠাৎ ছিটকে আসা পানির মত প্রায় ৫০ টন পারমাণবিক জ্বালানি ছড়িয়ে পরে বাতাসে। যা হিরোশিমার ১০ গুন। ৭০০ টন তেজস্ক্রিয় গ্রাফাইট খন্ড বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পরে আশেপাশে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা অনুযায়ী চুল্লীতে যে আগুন তারা জ্বলতে দেখেছিলেন তার রঙ কমলা ছিল না সে আগুনের রঙ ছিল নীল। ধূলা, ধোঁয়া আর অজানা এক মৃত্যুর স্বাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে প্রথমে তা গ্রাস করে চুল্লীর কাছে কর্মরত কর্মীদের। ধীর পায়ে মৃত্যু প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রন কক্ষে, যেখান থেকে তাকে ডেকে আনা হয়েছে। শহরের খুব বেশি মানুষ টের পায় না এই ভয়াবহতার, তারা তখন গভীর ঘুমে অচেতন। ঘুমের মাঝেই অলিখিত মৃত্যু পরোয়ানা লেখা হয়ে যায় তাদের নামে।

১:২৬ মিনিতে অগ্নিসংকেত বেজে ওঠে। কয়েক মিনিটেই দমকল বাহিনী চলে আসে পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রে। ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন এই সাহসী দমকল কর্মীরা সাহায্যের হাত বাড়ায় দুর্ঘটনা কবলিত লোকদের দিকে। পরিস্থিতি তারা নিয়ন্ত্রনেও নিয়ে আসে সকাল সাড়ে ছয়টার মধ্যে। কিন্তু এ শুধু বাইরের আগুন নেভানো। আকাশে বাতাসে ততক্ষণে ছড়িয়ে পরতে শুরু করছে অদৃশ্য মৃত্যুর মেঘ।

মধ্যরাতের এই মর্মান্তিক নাটকের প্রধান আনাতোলি ডিয়াটলভ, যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তায় সে আক্রান্ত হয় ,তাতে ৫০-৭০ ভাগ মানুষ এক মাসের মাঝে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু ডিয়াটলভ অলৌকিক ভাবে বেঁচে যায়। ১৯৮৭ সালে তাকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়, যার পাঁচ বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দেয়া হয়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ১৯৯৫ সালে মৃত্যুর আগে চেরনোবিল বিষয়ে একটি বই লিখে গেছে সে। মৃত্যুর আগে তার ভাষ্য ছিল, পারমাণবিক চুল্লী আর তার মাঝে যে কোন একটিকে দায়ী করা যায়। এবং এই দুর্ঘটনার জন্য পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের তৈরির কৌশল দায়ী।

আলেকজেন্ডার আকিমভ, চুল্লীতে পানির পুনঃপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করানোর সময় তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হন। দুর্ঘটনার পনেরো দিন পর মারা যান তেজস্ক্রিয় বিষাক্তটার কারনে। মৃত্যুর আগে তার শেষ কথা ছিল, আমি যতটুকু পেরেছিলাম চেষ্টা করেছি। কিন্তু এর পরও কিভাবে এটা ঘটল আমি জানি না।

আকিমভের তিন দিন পর তার সহকারী টপ্টোনভ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন। তার মৃত্যুর আগের আকুতিও ছিল সে সবই করেছে যা তার করা সম্ভব ছিল।

এভাবেই শুরু হয় দুর্যোগের প্রথম অধ্যায়। মৃত্যুর এই ফাঁদ কেবল প্রিপিয়াট আর ইউক্রেনকেই নয়, গ্রাস করতে এগুতে থাকে পুরো ইউরোপকে। সঠিক সময় আগুন নেভাতে না পারলে আবারো ঘটবে বিস্ফোরণ। সে বিস্ফোরণের পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে ইউরোপের অর্ধেকের বেশি অংশ! অসীমের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে কি উপায়ে কাজ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন? কত জীবনের বিনিময়ে থামানো হয় পরের বিস্ফোরণকে? এসবই থাকবে আগামী পর্বে।

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (দ্বিতীয় পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (দ্বিতীয় পর্ব)

২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ মধ্যরাত। চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের চার নম্বর চুল্লীর নিয়ন্ত্রন কক্ষ। ঘটনা-দুর্ঘটনা এর শ্বাসরুদ্ধকর নাটকের শুরু এখানেই। বিপর্যয়ের পরের হাহাকার আর বেদনার বিষয় নানান ছবি আর লেখায় উঠে আসলেও, কিভাবে কি কারনে পারমাণবিক এই বিপর্যয়ের শুরু, তার বিবরণ অস্পষ্ট অনেক জায়গাতেই। এবারের পর্বে এবং পরবর্তী পর্বে থাকবে এই বিষাদের রঙ্গমঞ্চে ঠিক কি ঘটেছিল সে বিষয় কিছু কথা।

শহরের বাতিগুলো আস্তে আস্তে নিভে আসছিল। সারা দিনের খাটুনির পর ব্যাস্ত নগরী প্রিপিয়াট তখন ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাতি জ্বলছে কেবল ক্লান্তিহীন পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের ভেতরে। অন্য সব সাধারণ রাতের মতই যার যার শিফট শেষ করে একদল কর্মী বিদায় নিয়েছে, নতুন শিফটের কর্মীদের কাজ চলছে ঢিমেতালে স্বাভাবিক ভাবেই। ১৬০ জন কর্মী সে রাতে কাজ করছিল চার নম্বর পারমানবিক শক্তি কেন্দ্রে। ব্যস্তটা কেবল চার নম্বর শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রন কক্ষে। আজ রাতে তারা একটি বিশেষ পরীক্ষা চালাবে। নিরাপত্তামুলক এই পরীক্ষা চালানোর জন্যে আজকের দিনটি ধার্য করবার কারন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্যে মূল বিদ্যুৎ গ্রিড থেকে সাময়িক ভাবে এই পারমানবিক চুল্লীটিকে বিচ্ছিন্ন করা হবে। চেরনোবিলের চার নম্বর এই  চুল্লীর সাময়িক ছুটির আগে তাই বিশেষ এই পরীক্ষার আয়োজন। কেউ তখনও জানতো না, চুল্লীর সাময়িক ছুটি কেবল এরই আজীবনের ছুটিতে পরিণত হবে না সেই সাথে অসীম ছুটির দেশে নিয়ে যাবে অসংখ্য মানুষ আর শহরকেও।

নিরাপত্তা মূলক এই পরীক্ষাটি চেরনোবিলে অন্য শক্তিকেন্দ্রে গুলোতে আগেও করা হয়েছিল। ১৯৮২,৮৪ এবং ৮৫ সালে। কিন্তু প্রতিবার কোন না কোন ত্রুটির কারনে পরীক্ষাটি সফল হয় নি। তাই আবারো ১৯৮৬ সালে পরীক্ষাটি করবার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তিপক্ষ। বিগত বারের ভুল গুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সুবিশাল নির্দেশনাও পাঠানো হয় পরীক্ষাকারী দলের কাছে। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই বেশ কিছু ত্রুটি রয়ে যায় এই প্রক্রিয়ায়।

প্রথমত, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বচ্চ গুপ্ত সংস্থা ‘কেজিবি’ পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের পরিচালকদের বার-বার সতর্ক করে দেয় যে, চেরনোবিলের এই শক্তিকেন্দ্রগুলোর গঠনে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। যে কোন সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা আর শক্তির মোহে অন্ধ কর্তিপক্ষ তখন ছিল অন্ধ, তারা নিজেদের অন্যতম সংস্থা কেজিবির কথাও শুনতে আগ্রহী হয়নি।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন, পারমাণবিক দুর্ঘটনা সম্পর্কে সবার বাস্তব ধারনার অভাব। যেহেতু এর আগে কোন পারমাণবিক শক্তি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি তাই এই মহাশক্তিকে তারা আর দশটা সাধারণ শক্তিকেন্দ্রের মতই ভাবতে শুরু করেছিল। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের রাজনীতির রাঘববোয়ালরা দেশকে বিশ্ব বাজারে শ্রেষ্ঠ প্রমান করতে সব কাজে চমক আনার চেষ্টা করতেন। চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লি যখন নির্মাণ করা হয়, তারা ঘোষণা করেছিল নির্মাণ কাজ সময়ের আগে শেষ করতে পারলে বিশেষ পুরস্কারের ব্যাবস্থা থাকবে। নিয়ম অনুযায়ীয় চুল্লীর উপরের যে ছাদ বা চিমনী অংশ সেটি বানানোর কথা ছিল আগুন অপরিবাহী হিসেবে। কিন্তু দুর্ঘটনার পরে কেঁচো খুড়তে সাপ বের হয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায় সেই ছাদ বানানো হয়েছিল নিয়ম না মেনে অর্থাৎ দাহ্য পদার্থ ব্যাবহার করে।

ফিরে আসি চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর নিয়ন্ত্রন কক্ষে। ২৫ তারিখের শেষে ২৬ তারিখের ঠিক শুরুতে নিরাপত্তা পরীক্ষার কাজ শুরু করা হয়। বৈজ্ঞানিক চুলচেরা ব্যাখায় না যেয়ে সহজ ভাষায় বললে, নিরাপত্তা পরীক্ষাটি ছিল এমন, ‘যদি কোন কারনে এই বিশাল পারমাণবিক চুল্লীকে ঠাণ্ডা করতে যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয় (২৮ হাজার লিটার প্রতি ঘণ্টায়), সেটি যদি কোন যান্ত্রিক গোলযোগে বন্ধ হয়ে যায় তখন কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হবে।’ পারমাণবিক চুল্লীর কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে করার সামান্য একটু ব্যাখ্যা করলে ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হবে।

তাপের সাহায্যে পানিকে বাস্প বানায় মূল চুল্লী। এই বাষ্প বানানোর জন্যে চুল্লীতে ব্যাবহার করা হয় ইউরনিয়াম দণ্ড। দণ্ড গুলো প্রচণ্ড গরম হয়ে এর সংস্পর্শে আসা পানিকে বাস্প করে, এই বাস্প বিশাল এক টারবাইনকে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। চেরনোবিলের চার নম্বর চুল্লীতে ১৬৬১ টি ইউরেনিয়াম দণ্ড এই কাজে ব্যাবহার হত। দণ্ড গুলো উত্তপ্ত হয়ে যাতে কোন ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে যে জন্যে তাপমাতার গতি নিয়ন্ত্রনের জন্যে বোরোন দণ্ড ব্যাবহার করা হত। ২১১টি বোরোন দণ্ড সেই চুল্লী নিয়ন্ত্রনের জন্যে বসানো ছিল। ব্যাপারটা অনেকটা গাড়ির গতি কমাতে ব্রেক যে কাজ করে সেই রকম। বোরোন দণ্ড গুলো চুল্লীতে উঠিয়ে নামিয়ে এই নিয়ন্ত্রনের কাজ করা যেত।

উত্তপ্ত পারমাণবিক চুল্লীকে ঠাণ্ডা করতে এর চারপাশে পানি প্রবাহের ব্যাবস্থা ছিল। পানি চুল্লীর চারপাশে প্রবাহিত করা হলে ইউরনিয়াম দণ্ড গুলো আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হয়ে যেত। ভেজা রুমাল পেচিয়ে গরমের দিনে মাথা ঠাণ্ডা রাখার মত ব্যাপার। নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্যে পানির এই প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। কাগজ কলমের হিসাব অনুযায়ী জরুরী প্রয়োজনে রাখা তিনটি জেনারেটর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে নিজেরা স্বয়ংক্রিয় ভাবে চালু হয়ে যাবে। এবং তারা পুনরায় পানির প্রবাহ নিশ্চিত করে চুল্লীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখবে। বিশেষজ্ঞদের ধারনা অনুযায়ী জেনারেটর চালু হতে সময় আরো বেশি লাগতে পারে। জেনারেটর চালুর আগের এই সময়টাতে পারমাণবিক চুল্লীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যাবস্থার কথা তারা চিন্তা করেন। এই নির্দিষ্ট সময়টায় টারবাইনের গতির কারনে সৃষ্ট বিদ্যুৎ থেকে চুল্লী ঠাণ্ডা করার পানি সরবরাহ করা যায় কিনা সেটি জানার জন্যেই এই পরীক্ষা করা হবে।

যদিও শক্তিকেন্দ্রে কর্মরত প্রত্যেক কর্মী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই ভয়ানক ইতিহাসে মিশে আছে তারপরও তিনটি চরিত্র এর মাঝে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রথম হলেন আনাতোলি ডিয়াটলভ (Anatoly Dyatlov) সহকারী প্রধান প্রকৌশলী। যার নির্দেশে এই পরীক্ষা চালানো হয়। প্রধান প্রকৌশলী নিকোলাই মাক্সিমোভিচ(Nikolai Maksimovich)এর এই পরীক্ষা নিজে থেকে পরিচালনা করার কথা থাকলেও, তিনি নিজে পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রন কক্ষে ছিলেন না। সহকারী প্রধান প্রকৌশলীকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত মনে প্রিপিয়াটের নিজের বাসস্থানে ঘুমিয়ে ছিলেন। দ্বিতীয়জন হলেন আলেকজেন্ডার আকিমভ (Aleksandr  Akimov) যিনি পরীক্ষা চলাকালীন সময় নিয়ন্ত্রন কক্ষের শিফট প্রধান ছিলেন। কাজ সম্পর্কে সাবধানী লোক তিনি এবং শেষ জন লিওনিড টপ্টোনভ (Leonid Toptunov) চুল্লীর যান্ত্রিক কার্যক্রমের পরিচালক, তিনি চুল্লীর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কাজে নিয়জিত ছিলেন, আকিমভের সহকারী অভিজ্ঞ এই প্রকৌশলী সে।

বিস্ফোরণের জন্যে এদের মাঝেই হয়তো কেউ দায়ী। সুনিশ্চিত ভাবে কিছু বলা না গেলেও বেঁচে ফেরা সহকর্মী আর তাদের অতীত ইথিহাস থেকে এর ধারনা করা যায়। কি ঘটেছিল ১টা বেজে ২৩ মিনিটে চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে?  তা থাকছে আগামী পর্বে।

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (প্রথম পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (প্রথম পর্ব)

চেরনোবিল, ইউক্রেন। মনের ভেতর নাড়া দিতে এই নামটাই যতেষ্ট, অনেকের কাছেই এই নাম আর নামের পেছনের স্মৃতি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর সব ভূতুড়ে ছবি। বিগত শতাব্দীর ভয়াবহতম পারমানবিক দুর্ঘটনার কারনে চেরনোবিল আজ ভূতুড়ে নগরী। কোন মানুষ বাস করেনা সেখানে। বিশাল সব স্থাপনাগুলো কালের সাক্ষী হয়ে ধ্বংসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ধারাবাহিক এই লেখার প্রথম পর্বে চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের আগের এবং দুর্ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।

সোভিয়েত ইউনিয়ন অধ্যুষিত ইউক্রেনের একেবারে উত্তর সীমান্তে বিশাল এক পারমানবিক শক্তিকেন্দ্রের নাম ‘চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র’ (Chernobyl Nuclear Power Plant)। দুর্ঘটনার ঘটবার আগে ইউক্রেনের প্রায় ১০ ভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করত এই কেন্দ্র। চারটি পারমাণবিক চুল্লি (Nuclear Reactor)মিলিয়ে এই চেরনোবিল প্ল্যান্ট। প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই কেন্দ্র বানানোর কথা ছিল ইউক্রেনের রাজধানীর কাছে। পরবর্তীতে শুধুমাত্র যারা এখানে কাজ করে তাদের থাকার সুবিধার জন্যে আলাদা শহর নির্মাণ করা হয়। শহরের নাম রাখা হয় ‘প্রিপিয়াট’ (Pripyat)। এই শহরকে অন্য সব শহর থেকে একটু আলাদা ধাঁচে তৈরি করা হয়। প্রিপিয়াট শহরকে গড়ে তোলা হয়েছিল আদর্শ নগর হিসেবে। ১৯৭৯ সালে শহর হিসেবে ঘোষণা দেয়া হলেও, এর নয় বছর আগে থেকে কাজ শুরু হয় প্রিপিয়াটকে গড়ে তোলার। সময়ের তুলনায় এখানে আধুনিকায়নের চেষ্টা হয়েছে অনেকভাবেই। মসৃণ সুবিশাল রাস্তা, দেয়ালে আঁকা বিশাল সব রঙিন ছবি আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আজও দেখা যায় এই মৃত্যুর শহরে। তখনকার সময়ে বাচ্চাদের জন্যে উন্নত স্কুল ,বিশাল শপিং মল, চোখ ধাঁধানো সব ঘরবাড়ি সবই তৈরি করা হয়েছিল সেখানে। মোট কথা আধুনিক আর আরামদায়ক জীবনযাপনের কোন সুবিধা বাকি রাখা হয়নি শহরটিতে। সেখানে যারা বাস করত তাদেরকে খুঁজে আনা হয়েছিল পুরো ইউক্রেন আর সোভিয়েত ইউনিয়নের নানা প্রান্ত থেকে। সবচেয়ে মেধাবি, কর্মঠ আর যোগ্য লোকদের নিয়ে শহর সাজানো হয়েছিল, পারমাণবিক শক্তিতে চলা এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে সঠিক ভাবে চালানোর জন্যে। কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মাঝের দূরত্ব তাই আজ সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুঃসহ ইতিহাস হয়ে।

চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের দুর্ঘটনা এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, সেখানকার সাধারণ মানুষের বাঁচার যুদ্ধ বিষয়ে কোন সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। চেরনোবিলের নিচে প্রিপিয়াটের নাম ঢাকা পরে গেলেও ভয়াবহ মৃত্যুর খেলা সবার আগে এ শহরবাসীই দেখা শুরু করে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের শহর হঠাৎ পরিণত হয় ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক উদ্বাস্তুতে।। ‘চেরনোবিল’ নামের অপর একটি শহরও এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রিপিয়াট এর চেয়ে অনেক কম লোকজন বাস করত সেই শহরে। মূল শক্তিকেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে সেই শহরের অবস্থান। পরোক্ষ ভাবে ছোঁয়াচে রোগের মত ছড়িয়ে পরা তেজস্ক্রিয়তায় বিপর্যয়ের শিকার হয় ইউক্রেনের রাজধানী ‘কিয়েভ’ও।

সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলছিল। ১৯৮৩ সালের পর থেকে চারটি চুল্লি পুরদমে কাজ শুরু করার পর থেকে কোন বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। সাধারণ মানুষের তেমন ধারনাও ছিলনা কি এই পারমাণবিক শক্তি অথবা তেজক্সিয়তার ক্ষমতাই বা কতটুকু। ১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিলের এক দুর্ঘটনা কেবল প্রিপিয়াটবাসী নয় পুরো পৃথিবীকে জানতে বাধ্য করে স্বাদ,গন্ধ আর আকৃতিহীন অদৃশ্য এই শত্রুর বিষয়ে। ২৫ এপ্রিল মধ্যরাতের পর অর্থাৎ ২৬ তারিখের শুরুটাই ছিল সেই অভিশাপের শুরু। বিস্ফরনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় শহরের অনেকের। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দের পর তারা দেখতে পান চার নাম্বার চুল্লি থেকে ঘন ধোয়া আর আগুন বের হতে। তাদের মতে সেই আগুনের রঙ ছিল নীল। ঘটনার দিন এমনকি পরের দিন প্রায় দুপুর পর্যন্ত সেখানের মানুষ জানতোও না অদৃশ্য এই মৃত্যু কিভাবে তাদেরকে গ্রাস করতে শুরু করেছে। দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন মানুষ কেবল এটুকু জানত, গত রাতে চার নাম্বার পারমানবিক চুল্লিতে আগুন লাগার কারনে সামান্য ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। শহরের মানুষদের সেখান থেকে যখন সরিয়ে নেয়া হয়, প্রিপিয়াটের বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ তখন হয়ে দাঁড়ায় সাধারণ মানুষের সহ্য সীমার পঞ্চাশ গুনেরও বেশি। ২৭ তারিখ দুপুরের দিকে হাজারো সরকার নিয়ন্ত্রিত বাস আর গাড়ি প্রিপিয়াটে এসে পৌছায়। সাথে আসে সৈন্যের দল। মাইকে করে চারিদিকে ঘোষণা জারি করা হয়, সাময়িক ভাবে কিছু সময়ের জন্যে শহরবাসীকে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া লাগবে। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে বিস্ফোরণের ফলে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে জাওয়ায় তাদের এই নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। নিজেদের ব্যবহার্য সামান্য কিছু জিনিষ, হালকা খাবার আর জরুরী কাগজপতের বাইরে কোন সামগ্রই সাথে না নেবার জন্যে বলা হয় সবাইকে। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ সেইদিন ছোট্ট এই ঘোষণায় বাড়ি ছাড়ে, এই আশায় আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। মাত্র কয়েকটাই তো দিনের ব্যাপার। প্রিপিয়াট ও চেরনোবিল শহর এবং আসে পাশের কিছু ক্ষুদ্র গ্রাম থেকে সব মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানী কিয়েভে। তাদের নিজ ঘরে ফেরার সময় দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছরে পরিণত হয়। কিন্তু কোনদিন আর তাদের ফেরা হয়না তাদের প্রিয় শহরে। বিজ্ঞানীদের ধারনা অনুযায়ী আগামী বিশ হাজার বছরের মধ্যে প্রিপিয়াট শহর বা এর কাছাকাছি মানুষের বসবাস করা উচিৎ হবে না। চেরনোবিল শহরের ভাগ্য প্রিপিয়াট থেকে কিছুটা ভাল। দুর্ঘটনার ত্রিশ বছর পর অনেকটা ভূতুড়ে হলেও কিছু পরিবার এখন বাস করে সেই শহরে।

অদৃশ্য অজানা এই তেজস্ক্রিয় মৃত্যুর মিছিলের শুরু তখন থেকেই। চেরনোবিলের অনেক রহস্যময় বিষয়ের মাঝে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, বিস্ফোরণের প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টা পর যে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, তাদের উপর তেজস্ক্রিয়তার ছোবল কতটা ভয়াবহ ভাবে পড়েছিল? কতজন আক্রান্ত হয় পারমাণবিক চুল্লি থেকে বের হওয়া বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তায়? সময়ের আগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে কত মানুষ? এর কোন সঠিক দলিল আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। চিকিৎসার কথা, মৃত্যুর কথা আর সেই ভয়াবহতার কথা যেন সময়ের সাথে মিশে গেছে চেরনোবিলের তেজস্ক্রিয়তার বিষাক্তটায়।

দেখতে দেখতে ছয় দিন পার হয়ে যায়। সমগ্র দেশ আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ধাঁধায় ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনও নিশ্চুপ বিস্ফোরণ আর দুর্ঘটনার বিষয়ে। নিজেদের দুর্বলতা বাইরের বিশ্বে প্রকাশ করতে নারাজ তারা। নিজেদের শক্ত হাতেই সব সামলে ফেলার অতি আত্মবিশ্বাসে তারা কাজ করে যাচ্ছিল কাউকে না জানিয়েই। ১লা মে, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিক দিবসের উৎসব হতো জমকালো আয়জনে। বিশেষকরে সকল জনসাধারনের জন্যে ছুটির দিনে সামরিক প্যারাড ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভেও আয়োজন করা হয় সেই অনুষ্ঠানের। চেরনোবিলের দুর্ঘটনা কবলিত শক্তিকেন্দ্র থেকে দূরে হলেও, ততদিনে বাতাসে তেজস্কিয়তা পরিমাণ যা ছিল তা সাধারন মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে অথবা ভয়াবহ রোগাক্রান্ত করার জন্যে যতেষ্ট ছিল। ইউক্রেনের মানুষ সে বছরের সেই প্যারেড কে ‘Parade of Death’ নামেই জানে। রহস্যময় ভাবে ১৯৮৬ সালে কিয়েভে যে উৎসবে হয়, এর কোন ছবি অথবা নথিপত্র কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু ছবি বা কাগজ হারিয়ে যেতে পারে তাই বলে কোন প্রমান না থাকা সত্যি রহস্যময়।

কিভাবে এই ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবেলা করে সোভিয়েত সরকার? ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রে? ভূতুড়ে শহর প্রিপিয়াটের এখনকার অবস্থা কেমন? এর সবই থাকবে আগামী পর্বগুলোতে।