লাস্ট বয় থেকে সেরা বিজ্ঞানী

Now Reading
লাস্ট বয় থেকে সেরা বিজ্ঞানী

আইজাক নিউটন

গ্রামের বাইরে শীতের বিকেলে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার নামে। সেই অন্ধকারে একটি ছেলে চেষ্টা করছে ঘুড়ি ওড়াতে। কাঠি আর কাপড়ের তৈরি ঘুড়ি- ছেঁড়া কাপড় জোড়া দিয়ে দিয়ে তার আবার বিড়াট লম্বা লেজ। শুধু তাই না, সেই লেজের আগায় ঝোলানো ছোট্ট একটি আলো।

ছেলেটি ভাবছে, যদি ঘুড়ি আকাশে ওড়ে, তখন আালো দেখে সবাই ভাববে,বুঝি এটি একটি নতুন তারাই উঠল আকাশে। কেউ হয়তো ভাববে এটি রোজকেয়ামতের পূর্বলক্ষণ। ছেলেটি ভাবে আর তার ঠোটের কোনায় দুষ্ট হাসি খেলে যায়।
কিন্তু সে ঘুড়ি কি আকাশে ওড়ে ? আলোর ভারে লেজ তার পড়ছে ঝুলে। যতবারই সুতা ধরে টানে, ততবারই ঘুড়িটা গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তাকে হাল ছেড়ে দিতে হয়।
কথাটা কেমন করে গ্রামের আরো দুচারজন লোকের কানে গিয়ে ওঠে। যারা শোনে তারা বলাবলি করে : যেমন ব্যাটা আহাম্মক আমাদের বোকা বানাতে গিয়েছিল, তেমনি তার উচিত ফল হয়েছে। মূখটা এসব পাগলামি রেখে মাস্টারের কথমতো স্কুলের পড়া পড়লেই তো হতো।

এসব কথা ছেলেটি বড় হয়ে নিজেই তার আত্মজীবনীতে লিখে গেছে। বিলেতের স্কিলিংটনক বলে একটি জায়গায় গ্রামের স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে সে ছিল লাস্ট বয়। মাস্টাররা দিয়েছিল এর মাথায় গোবর ছাড়া কিছু নাই। সহপাঠিরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করত।

কিন্ত বড় হয়ে সেই ছেলেটিই এমন সব আবিষ্কার করে বসর- যা দেখে দুনিয়ার সব বড় বড় বিজ্ঞানীরা থ’ খেয়ে গেলেন। তাকে গুরু মানলেন। তাকে করা হল বিলেতের পার্লামেন্টর সদস্য, সম্রাট তাকে ভূষিত করলেন ‘নাইট’ বা ‘স্যার’ উপাধি দিয়ে। পন্ডিতদের সেরা পতিষ্ঠান রয়্যাল সোসাইটি তাকে সভাপতি newton110.jpg

নির্বাচিত করলেন। সেই ছেলেটির নাম ছিল আইজাক নিউটন

নিউটনের জন্ম হয়েছিল ১৬৪২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। বাপ ছিলেন কৃষক, নিউটন জন্মাবার আগেই তিনি মারা যান। গাঁয়ের স্কুলেই ছোটবেলায় পড়াশোনা,কিন্তু পড়ার চেয়ে সূর্যঘড়ি, জলঘড়ি, এমনিতরো কলকব্জা নিয়ে নাড়াচাড়ার ঝোকেই তার বেশি দেখা যেত।

যথন তার বয়স ১৬, তখন একদিন বিলেতে ভীষন ঝড় হয়। সে কি প্রচন্ড হাওয়ার দাপট। বিলেতের ইতিহাসে এমন ঝড় খুব কমই হয়েছে। নিউটনের তখন একটি শখ হলো হাওয়ার বেগ মাপার। হাওয়ার দাপটা যখন বেশি তখন সে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এবার যেদিকে হাওয়ার প্রবাহ সেদিকে দিলেন এক লাফ এবং যেখানে পড়লো সেখানে একটি দাগ দিলেন, তারপর ঠিক উল্টো দিকে দিলেন আরেকটা লাফ আর মাটিতে দিলেন আরএকটা দাগ। পাড়া-প্রতিবেশিরা জানালার ফাঁকা দিয়ে দেখলো এই পাগলের অবাক কান্ড।

আত্মীয়-¯^জন ভাবলো কৃষকের ছেলে কৃষকই হবে। কিন্ত ছেলের ঝোঁক বিজ্ঞানের বই যোগাড় আর অদ্ভুত অদ্ভুত পরীক্ষা করা। একদিন নিউটনকে পাঠানো হলো বাজারে কিছু ডিম, কয়কটা ভেড়া, আরো অন্যান কিছু জিনিস বিক্রি করার জন্য
কিন্তু তিনি না গিয়ে আরেকজনকে পাাঠালেন, আর সে না গিয়ে ঝপের ভিতরে চুপ করে বসে অংক কষতে লাগলো। এই নিয়ে গ্রামের সবাই তাকে বেশি বেশি বলতে লাগলো তখন তার চাচা তাকে বাচালো, তাকে কলেজে পড়ানোর কথা বলল এবং কলেজ পড়ানোর জন্য তাকে কেমব্রিজ পাঠানো হলো। সত্য সত্য কলেজে গিয়ে খুব ভাল অংক কষতে লাগলো । প্রথম বছরেই তিনি গনিতের এক নতুন দিক ক্যালকুলাস আবিষ্কার করে ফেললেন। লিখে রাখলেন সে সব। কিন্তু কাউকে বললেন না কিছুই।

অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

Now Reading
অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

সাত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠিয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হওয়া খুবই কষ্টকর মনে হয় সুভংকর এর। তার উপর মা কল্পনা দেবীর তাড়াহুড়ো তো আরো বেদনাদায়ক!
– “আমার বাবুসোনা টা লক্ষী না? দেখবে আজকেও ঠিক সবার আগে বাস ধরতে পৌছে গেছি আমরা। একদম সামনের সিটটায় বসবো। কত্ত মজা হবে দেখো।”
-উফ মা! কতবার বলেছি আমাকে বাবুসোনা বলোনা কারো সামনে। ওরা রোজ হাসে যে দেখতে পাওনা!
– আচ্ছা বাবা বলবোনা। এখন ভালো বাবুটার মতো নাস্তাটা খেয়ে নাওতো।
-আবারো!
-ঠিক আছে, আর বলবোনা!
অপর পাশে চেয়ারে বসে চোখ কুঁচকে একবার মা ছেলের ন্যাকামো দেখে শুভদ্বীপ। দিনদিন এসব দেখতে দেখতে ত্যাক্ত হয়ে যাচ্ছে মনটা!
চেয়ার ঠেলে ওঠে পড়লো শুভদ্বীপ। আজ একটু জলদি যেতে হবে অফিসে,বিকেলে আবার লায়ন্স ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। লায়ন্স ক্লাবের কথা ভাবতেই সুদিপ্তার কথা মনে পড়ে গেলো। কি একটা জরুরি খবর আছে ওকে দেয়ার মতো। তবে এমনি এমনি দেবেনা বিনিময়ে একবেলা খেতে হবে ওর সাথে! রহস্যময়ী মেয়ে একটা! ও কি ভেবেছে শুভদ্বীপ কিছুই বুঝেনা!
  ভাবতে ভাবতে এক চিলতে হাসি ফুটলো শুভদ্বীপের মুখে। তখনই কল্পনার কথা শুনে মেজাজটা খিঁচিয়ে ওঠলো,
-তুমি একবার সুভংকরকে ড্রপ করে দেবে? একই দিকে যাচ্ছো যখন…..
-আমার অত সময় নেই। একই দিকে গেলেই হলো?
এই না বলছিলে স্কুলবাস ধরতে হবে? কি করে পারো এসব ন্যাকামো করতে….!
-“শুভ!” কল্পনা গলা নামিয়ে ধমকে ওঠলো।
  “ছেলেটা রোজ বসে থাকে বাবা এসে নিয়ে যাবে স্কুল থেকে, তখন না পারো, সকালে তো দিয়ে আসতে পারো একবার! নিজের কারনেই কিন্তু ছেলের সাথে দূরত্ব বাড়াচ্ছো তুমি।”
– হয়েছে, আবার শুরু করে দাও এখন। এসব ন্যাকামো করে করে তুমিই বরং ছেলেটার মাথা খাচ্ছো…
হঠাৎ ফোনের রিংটা বেজে ওঠতে,কথা শেষ না করেই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো শুভদ্বীপ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল্পনাও সুভংকরের স্কুল ব্যাগটা গোছাতে লাগলো।
এসব খটমট ওদের নিত্যদিনের অভ্যেস। সুভংকরও বুঝে বাবা ওকে স্কুলে দিয়ে আসতে বা নিয়ে আসতে চায়না। কিন্তু কেনো জানেনা! জানেনা বলেই কেবলি মনে হয় বাবা ওকে একটুও ভালোবাসেনা। আর এই ভাবনা থেকেই মনটা ছোট হয়ে থাকে সবসময়। বাবার সামনে তাই নিজেকে গুঁটিয়ে রাখে একদম বোবার মতো!
স্কুল বাসে ওঠতেই কল্পনা দেবী আজ একটু অবাক হলো। বাচ্চাগুলো সব সীটে বসে বসে ছবি আঁকছে!
-কি ব্যাপার বাবু, এত কিসের ছবি আঁকা হচ্ছে সবার!
-আন্টি জানেননা, কাল আমাদের স্কুলের আর্ট প্রতিযোগীতা হবে! যা ফার্স্ট হবে তাকে অননেক বড় পুরষ্কার দেয়া হবে!!
ছোট একটা ছেলে জবাব দিলো। কল্পনা অবাক, কই সুভংকর তো ওকে কিছুই বলেনি! তাকিয়ে দেখে ছেলেটা মাথা নিচু করে আছে। চোখে পানি!
-কি হলো বাবাই? আমাকে বলিসনি কেনো?
-বাবা যে এসব পছন্দ করেনা! আবার বকবে তোমাকে!    টলোমলো চোখে জবাব দিলো সুভংকর।
স্তম্ভিত কল্পনা কি বলবে বুঝতে পারছেনা। আস্তে করে বললো,
-বাবা কিন্তু অনেক ভালোবাসে তোমায়। এমনি রাগ দেখায় বলে বুঝোনা!
তুমি ছবি আঁকবে, দেখো বাবা জানতে পারলে খুব খুশি হবে!
রাতে বাড়ি ফিরলোনা শুভদ্বীপ। কল্পনার ফোনটাও রিসিভ করলোনা। সারা রাত জেগে বসে থাকলো কল্পনা, সাথে সুভংকরও ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছে। সকাল দশটায় বাসায় ফিরলো ও। এসেই সোজা চলে গেলো গোসলে, কল্পনা বা সুভর দিকে ফিরেও তাকালো না!
নাস্তা করছে ওরা। শুভদ্বীপ পত্রিকা পড়ছে আর চা খাচ্ছে। বাসায় আসা অবধি একটা কথাও বলেনি ও!
   চা শেষ করে ওঠে দাড়াতেই কল্পনা কথা বলে ওঠলো,
 – আজ বিকেলে ফ্রী আছো তুমি?
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ,
-কেনো!
– লায়ন্স ক্লাবে আমাদের নিয়ে যেয়ো। সুভংকরের আর্ট প্রতিযোগীতা আছে একটা…
-উফ কল্পনা! তোমার ওই পিকাসো কে নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে যেয়োনা ওখানে। বাহির থেকে ফরেনাররা আসবে ওই প্রতিযোগীতায়, ওটা তোমার এই পিকাসোর জন্য নয়!
– তুমিও থাকছো ওখানে?
কল্পনা একটু অবাক হলো, তোমার পত্রিকা নিউজেও দেখলাম আজ। বেশ বড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে তাহলে!
– তবে আর বলছি কি! আমার মুখ হাসিওনা ওখানে গিয়ে আর, প্লিজ!
কথা ক’টি বলেই বেরিয়ে গেলো শুভদ্বীপ।
অনেক দিন পর আজ লায়ন্স ক্লাবে এলো কল্পনা। সেই যে বিয়ের পর পর শুভদ্বীপের সঙ্গে আসতে মাঝে মাঝে। তারপর তো সুভংকরের জন্ম হলো,সেই ই শেষবার।  কল্পনাকে দেখে সুভংকরের আর্ট টিচাট এগিয়ে এলো,
  – দিদি আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে খুব। দেখবেন পুরষ্কারটা আমাদের সুভই জিতবে,ওর মাঝে পিকাসোর ছায়া দেখেছি আমি!
ওইযে দূরে শুভদ্বীপকে দেখা যাচ্ছে। ঘাড় ফিরাতেই হাত নাড়লো কল্পনা, শুভদ্বীপ এক নজর তাকিয়ে নজর ফিরিয়ে নিলো! কি আশ্চর্য!
কল্পনা অবাক হয়ে ভাবলো, একই জায়গা,
একই মানুষ,
তবু সময়ের ব্যাবধানে মানুষ কতটা বদলে যায়!!
চারদিকে দেশী আর ফরেনারে গিজগিজ করছে। নাচ, গানে একটা আস্ত উৎসব যেনো!
তারই এক ফাঁকে চিত্রাংকন চলছে। এক মনে ছবি আঁকছে সুভংকর। কল্পনা শুধু দূরে দাড়িয়ে ছেলের মুখটা দেখেই যাচ্ছে। কি এক অদৃশ্য সংকল্প ওই ছোট্ট মুখে!
প্রতিযোগীতা শেষ। মার্কিং চলছে, কিছুক্ষন বাদেই প্রতিযোগীর নাম ঘোষনা করা হবে। শুভদ্বীপ দূরে দাড়ানো কল্পনাকে একবার দেখলো। পাশে সুভংকর দাড়িয়ে আছে। মুখ ফিরিয়ে নিলো ও।
“অযথাই লোক হাসাতে এসেছে দুজন। ভাগ্যিস কারো সাথে পরিচর করিয়ে দেইনি! কেমন লজ্জাটা পেতাম!”
একে একে মাইকে এনাউন্স হচ্ছে বিজয়ীদের নাম। তৃতীয় বিজয়ী, দ্বিতীয় বিজয়ী পুরষ্কার নিয়ে এলো।
সবশেষে প্রথম বিজয়ীর নাম ঘোষিত হলো, সুভংকর ব্যানার্জি…….!
প্রচন্ড করতালিতে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ। আনন্দের আতিশয্যে হাসি থামছেইনা শুভদ্বীপের। “আমার ছেলে! আমার ছেলেটা প্রথম হয়েছে!”
“কালই আমার পত্রিকার প্রথম পাতায় খবরটা ছাপাবো আমি!”
  একেকজন কে পাশ কাটিয়ে এগুচ্ছে আর মনে মনে আকর্ষনীয় ক্যাপশন বাছাই করছে শুভদ্বীপ। সম্পাদকের নিজের ছেলে বলে কথা!
পুরষ্কার হাতে  নিয়ে এদিকেই আসছে সুভংকর। কল্পনাকে এসে জড়িয়ে ধরলো। ওদের ঘিরে ধরলো করতালিরত জনগন। ভীর ঠেলে এগুতে পারছেনা আর শুভদ্বীপ। গলা ছেড়ে ডাকলো ছেলেকে…
-সুভংকর!!
মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে একবার তাকালো সুভংকর। চোখে অশ্রুধারা টলমল করছে ওর, এক পলক তাকিয়েই মায়ের কোলে মুখ গুজলো আবার!
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ।
এই ভীর ঠেলে এগিয়ে কি লাভ হবে আর?
অনেক আগেই তো ছেলের সাথে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে ফেলেছে শুভদ্বীপ নিজেই!!

আমি আর বাবা

Now Reading
আমি আর বাবা

এই গল্পটা একান্তভাবেই আমার নিজের। কারো বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই করার নেই। গল্পের পুরোটাই আমার বাবাকে ঘিরে।
আমার বাবা জমাদার খায়রুল হক মুন্সী।
 সেই ৪৭’এর ভাঙনের সময় তার বাবা আহসান হক মুন্সীর হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রায় মাস তিনেক এ জেলা ও জেলা ঘুরাঘুরি করে শেষে পুরান ঢাকার লক্ষীবাজারের এই জায়গাটায় এসে তারা স্থির হোন। ভারতে তাদের বিশাল জমিজমা বিক্রি করে অর্থকরি এনে বসত ভিটে গড়ে তুলেন এই এখানেই।
বাবা বড় হলেন, বিয়ে থা করলেন। আমার জন্মের ঠিক তিন মাস আগে দাদা পরলোক গমন করেন।
এদেশে এসেও দাদা বিরাট কারবার পেতে বসেছিলেন। হুট করে সব পড়লো বাবার ঘাড়ে! বাবাও বেশ পাক্কা ব্যাবসায়ীর মতো দাদার কাজ বুঝে নিলেন অল্প দিনেই।
সারাদিন বাবার দেখা পেতামনা। খুব মন খারাপ লাগতো। মেয়েরা এমনিতেও বেশ বাবা ভক্ত হয়। আমিও তেমন। কেও কেও আবার রসিকতা করতো, বলতো,
 “বাব্বাহ!
এমন দহরম মহরম আর দেখিনি! বাবা ভক্ত মেয়ে নাকি মেয়ে ভক্ত বাবা!!”
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটি। বাবা মেয়ের মধুর সম্পর্ক ঠিক ছোট্ট বেলার মতোই আছে আমাদের।
ভার্সিটির তৃতীয় বছরে নতুন একজন কে জীবনে স্থান দিলাম। ছেলেটির নাম শিহাব! এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে আর এত কেয়ারিং ঠিক যেনো বাবার মতোই!
কথায় বলেনা? মেয়েরা ছেলে পছন্দ পছন্দ করে বাবার সাথে মিল দেখে। আমিও তাই করেছিলাম।
একদিন বাবার সাথে ওকে কথা বলিয়ে দিলাম, মূহুর্ত বাদেই দুজনের বেশ জমে গেলো!
পরের বছরই বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। শিহাবের সাথে। নতুন সংসার, নতুন বাড়ি। তারপরও বাবার সাথে আমার দূরত্ব এতটুকুন কমলো না। পাশাপাশি মহল্লায় থাকি, বাবা রোজ সকাল-বিকাল দুবেলা করে আমার শ্বশুর বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যায়। কখনো ভেতরে আসে কখনো বা হাটতে হাটতে ফোনে কল দেয়!
বছর ঘুরতেই আমাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে এলো। বাবা দেখতে এলো ওকে, গুলুমুলো বাবুটার নাম রাখলো বাবা নাফিসা। ডাকনাম দিলাম আমরা সুমো।
দিন যাচ্ছে আমাদের। এক রাতে ঘুম আসছেনা, শুয়ে এপাশ ওপাশ ছটফট করছি কেবল।
হটাৎ মনে হলো বাবা যেনো রাস্তা থেকে ডাক দিলো! রাত তখন দুটো বেজে দশ।
এত রাতে কেও নেই রাস্তায়।
-ঘুম আসছেনা তো, অস্থির মনে এসব হ্যালুসিনেশন হয় ই। ঘুমিয়ে পড়ো।”
     শিহাবের কথা ই মেনে নিলাম। অনেক চেষ্টার পর ঘুমালাম।
সাত সকালে মা’র ফোন এলো। বাবা হার্ট এ্যাটাক করেছেন। পাগলের মতো ছুটে গেলাম হসপিটালে। ততক্ষনে ময়নাতদন্ত শেষ, মেজর হার্ট এ্যাটাক।
মৃত্যুর সময় রাত দুটা থেকে আড়াইটার ভেতর!
বাবার হঠাৎ এমন চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই।
রাতে ঘুম আসেনা সহজে, খাওয়ায় রূচি নেই, এমনকি সুমোর যত্নও করছিলামনা ঠিকভাবে। এর মাঝেই একদিন ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। বিকেলে সিড়ির পাশের ছাদে সুমোকে  মাদুর বিছিয়ে বসে আছি, হঠাৎ দেখি ছাদের কার্নিসটার দিকে তাকিয়ে সুমো খিলখিল করে হাসছো!
অবাক হয়ে গেলাম। ওদিকটাতে কিচ্ছু নেই সুমো তবে হাসছে কেনো!
প্রায়দিনই সুমো এমন করছে। কখনো শুয়ে থেকে জানলার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে আবার কখনোবা হামাগুড়ি দিয়ে অদৃশ্য কিসের পেছনে যেনো ছুটে বেড়ায় আর হাসে!
আমি কাওকেই দেখতে পাইনা, কিন্তু অনুভব করতে পারি বাবা আমাদের দেখছে! খুব কাছেই যেনো আছে, কানের পাশে গরম নিঃশ্বাস পাই যেনো আমি কখনো কখনো!
শিহাবকে বলবো বলবো ভেবেও বলিনা কিছু। এসব বিশ্বাস করানো কঠিন।
বাবা মারা যাওয়ার পর আস্তে আস্তে আবার সবাই যার যার কাজে মন দিয়েছি। সুমোও বড় হচ্ছে। প্রায় তিন মাসের মাথায় একদিন বাবাকে স্বপ্ন দেখলাম। হাত ইশারা করে দূরে কাকে যেনো দেখাচ্ছে! অস্পষ্ট চেহারা কাছে যেতে স্পষ্ট হলো, শিহাব! হঠাৎ দুম করে ও যেনো পড়ে গেলো নিচে! আমি চিৎকার করে জেগে ওঠলাম।
সে রাতে আর ঘুমোতে পারিনি। সারা রাত শিহাবকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম আমি। কেনো যেনো ওকে নিয়ে ভয় ভয় লাগছিলো!
পরদিন ওঠে নাস্তা রেডী করছি। শিহাব গোসল করে কাপড় নেড়ে দিচ্ছে বারান্দায়।  আমার শ্বশুর বাড়িটা একটু পুরনো ধাঁচের। লম্বা বারান্দা দুপাশে, মাঝখানে থাকার ঘরগুলো সারি করে দেয়া।
আমি যে ঘরে নাস্তা দিচ্ছি তারই ঝুল বারান্দায় কাপড় দিচ্ছে শিহাব। হঠাৎ ওকে টলে ওঠতে দেখে কেমন করে ওঠলো আমার ভেতরটা! পুরনো ঝুল বারান্দার রেলিং শিহাবের ভর রাখতে পারছেনা, ভেঙে পড়ে যাচ্ছে ওটা!
চিৎকার করে দৌড়ে গেলাম আমি, শিহাবও কোনোমতে সামলে নিয়ে পিলার ধরে ওঠে এলো ভেতরে। জড়িয়ে ধরলাম ওকে। স্বপ্নটার কথা তখনি মনে পড়ে গেলো,
    “বাবা কি সাবধান করে দিতে এসেছিলো আমাকে? জানে তো শিহাব,সুমো দুজনের একজনকে ছাড়াও আমি থাকতে পারবোনা!”
রাতে শিহাবকে বলেছিলাম স্বপ্নের কথাটা। বিশ্বাস করেনি, অবশ্য মুখের উপর হাসেওনি, ভদ্র ছেলে তো। আমাকে ইনসাল্ট করতে চায়নি। আমিও আর জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইলামনা।
দু মাস ভালোয় ভালোয় গেলো। এক বিকেলে হালকা চোখটা লেগে এসেছে, বাবাকে আবার দেখলাম!
ভয়ানক স্বপ্ন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে তার মাঝখানে আমাদের ছোট্ট সুমো চিৎকার করছে দু হাত বাড়িয়ে! বাবা দূরে দাড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন নিরবে।
ঝট করে ঘুম ভেঙে সটান ওঠে বসলাম। চটপট একটা ব্যাগে আমার আর সুমোর কাপড় গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। সিএনজি নিয়ে রওনা দেয়ার আগে ভাবলাম দোতলায় আমার শ্বাশুরিকে একবার বলে আসি,তারপর ভাবলাম না থাক। এভাবে হুট করে বেরুতে দেবেনা কেও, কিন্তি আমার তো আর এক মিনিটও এবাড়িতে থাকা চলবেনা। আমার মেয়ের যে বড্ড বিপদ! বললেও কেও বিশ্বাস করবেনা আমায়।
সিএনজি নিয়ে মা’র ওখানে যাচ্ছি। পথে শিহাবকে কল দিয়ে বললাম,
“মাকে দেখতে যাচ্ছি। তুমিও অফিস থেকে চলে এসো কিন্তু।”
ও অবাক হলো একটু, কিছু বললো না।
হঠাৎ এমন করে আসতে দেখে মাও অবাক। খুশিও হলো। খুশির চোটে তক্ষুনি বাজারে ছুটলো, নাতনী কে আজ চিংড়ি খাওয়াবে মা!
বাড়িতে আমি আর সুমো। দুতলায় বাবার ঘরটায় এলাম। কিছুই সরানো হয়নি, বাবা থাকতে যেমন ছিলো তেমনি সব সাজানো! মাও কি আমার মতো বাবাকে অনুভব করে?
সুমো বিছানায় বসে খেলছে। নিচের ঘরে এলাম ওর গোছলের জামা আনার জন্য,এমন সময়ই বাড়ি কাঁপিয়ে বিষ্ফোরনের শব্দ হলো! মা বার বার করে বলে গিয়েছিলো “চুলায় দুধ বসিয়ে যাচ্ছি দেখিস।”
 সিলিন্ডারটার জয়েন্টে একটু লিক হয়ে ছিলো দুধের বলক এসে পড়ে গিয়েছে।
ওখান থেকেই গরম বাড়তে বাড়তে বিষ্ফোরন।
সুমো!
আমার ছোট্ট মেয়েটা  দুই তলায় বসে আছে। আগুন কাঠের দরজা পুড়িয়ে সিড়ির দিকে ছুটছে দ্রুত! হাঁচড়ে পাঁচড়ে সিড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, অর্ধেক ওঠতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম।
মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটায় চোখ খুলে দেখি সামনে অনেক মানুষ!
মা, আমার শ্বাশুরী,শিহাব আর ওর কোলে আমার সুমো!
জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম এখনো হালকা ধোঁয়া ওঠছে। সব পুড়ে ছাঁই।
মা বললেন, কিছুই আর থাকলোনা রে। তোর বাবার ঘরটায় ঢুকেছিলাম একটা কিচ্ছু বাকি নেই সব পুড়া কাঠের গুলো হয়ে গেছে।”
কেনো জানিনা হাউমাউ করে কান্না বেরিয়ে এলো আমার। বাবা মারা যেতেও বোধহয় এত কান্না আসেনি যতটা না বাবার ঘরটা পুড়ে গেছে শুনে কাঁদলাম!
বাবা মারা যাওয়ার আগে ইনসিওরেন্স করিয়ে রেখেছিলেন। বাড়িটার সব ক্ষয়ক্ষতি ওরাই সারিয়ে দেবে।
আমি শ্বশুর বাড়িতে ফিরে এলাম। অদৃশ্য কারো অস্তিত্ব আর অনুভব করছিনা। সেদিনের আগুনে সব কিছুর সাথে বাবার প্রেতাত্মাটাও কি পুড়ে গিয়েছিলো??
জানিনা! শুধু জানি বাবা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো, আর আমিও!

জীবন্ত স্মৃতির পাতা….

Now Reading
জীবন্ত স্মৃতির পাতা….

সেই ভয়াবহ রাতের কথা এখনো আমার মনে হলে ভয়ে কুঁকড়ে উঠি।এখনো বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগলে আমি বিদ্যুতের মতোই চমকে উঠি!

আমার জীবনে এমন রাত হয়তো আর কখনোই আসবেনা কিন্তু আমার জীবনের গতিপথ পাল্টিয়ে দিয়েছিলো সেই নিষ্ঠুর রাত।
আমার এখনো মনে পড়ে বাবা যখন মাকে চুলের মুঠি ধরে হেচঁকা টানতে টানতে বাড়ির বাহিরে নিয়ে চললো!
“এই খানকি মাগি চল,আজ তোর শেষ দিন,তোকে আজ জীবন্তই পুঁতে ফেলবো”।
এই কথা বলতে বলতে টেনে মাকে নিয়ে গেলো বাবা।আমি শুধু চেয়ে চেয়েই দেখেছি কিছুই করতে পারিনি তখন,আর পাঁচ বছরের একটা বাচ্চার পক্ষে ওই নিশিকালো বৃষ্টির রাতে কি-ই বা করার ছিলো।আর তাছাড়া আমি বাবাকে ওই বয়সেই প্রচন্ড ভয় পেতাম।আমি কখনো এক মুহূর্তের জন্যেও দেখিনি বাবা আমাকে আদর করতে,নাতো মায়ের সঙ্গে একটু হেসে কথা বলতে।আমি কখনোই আমার বাবার আদর পাইনি তার মৃত্যু অবধি।
কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম না তখনো,মায়ের অপরাধটা কি ছিলো অথবা আমার মতো নেহাতই একটা ছোট্ট শিশুর অন্যায় টা বা কি ছিলো।
সেই রাতের পর থেকে আমি আর কখনোই মাকে দেখতে পাইনি।বাবা সত্যিই সত্যিই নাকি মাকে মেরে ফেলেছিলো।
এরপর থেকে আমি ভাবতাম এখন থেকে হয়তো বাবা আমাকে আদর করবেন!কিন্তু না,মায়ের মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই বাবা আমাকে বাড়ির কাজের লোকের মাধ্যমে দূরের একটা হোস্টেলে রেখে আসেন।আমাকে যখন ওই বুড়োমত লোকটি নিয়ে যাচ্ছিলো,তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে স্পষ্টতই বাবাকে বলতে শুনলাম;”যা তাড়াতাড়ি নিয়ে যা এই জাউরাটাকে,আমি আর সহ্য করতে পারছিনা এই জারজকে”!
স্বয়ং বাবার মুখ থেকে সেদিন আমি এই কথাটা শুনেছিলাম,কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি কেনো বাবা আমার সম্পর্কে এমন কঠিন কথা বলেছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পরে যখন আমি আবার বাড়িতে ফিরে আসলাম,তখন সব কিছু যেনো কেমন অদ্ভুত ঠেকলো আমার কাছে।
যেই লোকটি জীবনে কখনোই আমার মাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি,তাকে নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করেছিলেন এবং কি একমাত্র সন্তান হিসেবে আমাকে একমুহূর্তের জন্যেও একটু আদর করেনি!
সেই লোকটি কি করে এতো বিশাল সম্পদ আমার জন্যে রেখে গিয়েছে!
আমি প্রায় সময় ভেবে কুল পেতাম না।কিন্ত একটা বিষয় আমার কাছে আরো বেশি অদ্ভুত লেগেছে,তা হলো বাবা নাকি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন আমি যেনো উনার মৃত্যুর সময় উপস্থিত না থাকি এবং কি কখনো যেনো উনার কবরের পাশে পর্যন্ত না যাই!!
আমি বুঝতে পারতাম না কেনো বাবা আমার উপরে এতোটাই রুষ্ট ছিলেন!
কিন্তু আমি তো কখনো বাবা থাকা অবস্থায়ও বাবার সঙ্গে একটু কথা পর্যন্ত বলতে পারিনি।তাহলে কেনো বাবা আমার উপরে এমন কঠিন ভাবে রাগান্তিত ছিলেন।
আমার খুবই মন চাইতো বাবার কবরের পাশে গিয়ে একটু জিগ্যেস করি আমার অপরাধ কি?
কেনো আমাকে পিতৃস্নেহ থেকে চিরদিনের জন্য বন্ঞ্চিত করেছেন?
কিন্তু আমার কান্নাগুলো হাওয়াতেই মিলিয়ে যেতো নিষ্ঠুরভাবে।আমি নিদারুণ কষ্টে দিনগুলো কাটাতাম।

বাবার রেখে যাওয়া বিশাল অর্থ সম্পদ দেখাশোনা করেই আমার দিনগুলো কেটে যেতে থাকলো।আমি প্রায় সময়েই এখন আমার হতভাগ্য মায়ের ঘরে যাই।মায়ের জন্য আমার বুকের ভিতর দুমড়েমুচড়ে উঠে।
জানিনা আমার মাকে বাবা কোথায় মেরে পুঁতে রেখেছিলো,আদো কি আমার মায়ের কবর আছে!নাকি সত্যিই অজানা কোন জায়গা তে মাকে পুঁতে রেখে এসেছিলেন বাবা।
আমি এখনো আমার মায়ের নরম শীতল কোমল বুকের উষ্ণতা অনুভব করি।
মা যেনো প্রায় রাতেই আমার কাছে এসে বলে,”আমার সোনা ধন,আমার মানিক,আমার খোকা,আয় বাবা, আমার কাছে আয়;আহারে আমার সোনা মানিকটা কেমন শুকিয়ে গেছে”।
এরপর যখনই আমি ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম কান্নায় আমার বুক ভিজে যেতো মায়ের জন্য।
আমি প্রায়ই রাতেই নির্ঘুম চোখে কাটাতাম যদি একবার হলেও মাকে একটু দেখতে পাই।
আমার আশায় নিতান্তই হতাশায় পরিনত হতো।
কিন্তু আমি এখনো জানতে পারিনি বাবা কেন আমাকে আর মাকে এতোটাই ঘৃণা করতো!!

একদিন যখন মায়ের ঘরে পুরোনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে যাই,তখনই একটা ডায়েরি আমার চোখে পড়ে ।
ডায়েরিতে অস্পষ্ট আর ঝাপসা হাতের লেখায় একটা নাম চোখে পড়লো,নামটা দেখে আমি একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম;”আঞ্জুমান” এই নামটা তো আমার মায়েরাই!
হ্যাঁ আমার মায়ের নামই আঞ্জুমান।
আমি আস্তে আস্তে একটা একটা করে পুরোনো সেই ডায়েরির পাতা উল্টানো শুরু করলাম ।
আমার দুচোখ যেনো জলে টলমল করে উঠলো।আমার মায়ের ভুলবাল বানানে আঁকাবাঁকা ভাঙ্গা ভাঙ্গা লেখা।মনে হয়না আমার মা খুব বেশি লেখাপড়া করেছিলেন।হাতের লেখা দেখে মনে হলো বড়জোর সিক্স সেভেন পর্যন্ত পড়েছিলেন।আমি খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি পাতা পড়তে লাগলাম।আমার কাছে এক একটা লাইন, শব্দ, যেনো মহামূল্যবান মনে হতে লাগলো।আচমকাই যেনো আকাশে বিদ্যুৎ খেলে গেলো,মনে হয় যেনো এখনই বৃষ্টি নামবে অঝোর ধারায়।
আমি যেনো নেহাতই এক অবুঝ শিশু হয়ে গেছি।সেই রাতে মুহুর্তের জন্যেও আমি দুচোখের পাতা এক করিনি।একটার পর একটা পাতা শুধু পড়ছি আর পড়ছি।

আমার দাদা ছিলেন অনেক বড় লোক আর দানশীল ব্যক্তি।আমার মায়ের দুকুলে কেউ ছিলোনা।দাদা গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে এসে শহরে তার কাছে রাখেন ।মাকে দাদা খুবই আদর করতেন।আর বাবা ছিলেন দাদার একমাত্র সন্তান ।একদিন সুযোগ পেয়ে বাবা মাকে ধর্ষণ করেছিলেন আর ভয় দেখিয়েছেন যদি কখনো কারো কাছে এসব কথা বলে তাহলে জানে মেরে ফেলবে।
এরপর থেকে প্রতিরাতেই বাবা মাকে এই নারকীয় লালসার শিকার করতেন।আমার কিশোরী মা ভয়ে কাউকে বলতে পারতেন না।কিন্তু একসময় মা গর্ভবতী হয়ে পড়ে আর তখনই ব্যাপারটা পুরোপুরি জানাজানি হয়ে যায় ।
এই বিষয়টি নিয়ে দাদা খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন।কিন্তু বাবা একেবারেই অস্বীকার করেছিলেন বিষয়টি।
শেষপর্যন্ত কোন উপায় না দেখে দাদা বাবাকে বললেন ”তুই যদি ওর পেটের সন্তান আর ওকে স্বীকার না করিস,তাহলে তোকে আমি ত্যাজপুত্র ঘোষনা করতে বাধ্য হবো।”এই কথা শুনার পরে বাবা মাকে মেনে নিতে সম্মত হন।
কিন্তু দাদা বুঝতে পেরেছিলেন যে বাবা একসময় আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দিবেন।তাই আমার জন্মের পরপরই দাদা সমস্ত সম্পত্তি টাকাপয়সা একমাত্র আমার নামেই উইল করে দেন।
দাদার মৃত্যুর পরেই মায়ের উপর বাবার নির্যাতনের মাত্রা আরো বেশি বেড়ে যায় ।প্রতিদিনই বাবা নতুন নতুন মেয়ে নিয়ে আসতেন আর মাকে প্রচন্ড মারধর করতেন।
আর বলতেন ”হারামজাদি তোকে আমি একদিন মেরেই ফেলবো,তোর কারণেই আমি সমস্ত সম্পত্তি থেকে বন্ঞ্চিত হয়েছি”!
প্রায় সময়ই বাবা মাকে মারতেন আর এমন কথা বলতেন।

সেইদিন ছিলো এক বৃষ্টির রাত বাবা মাতাল হয়ে বাড়ি তে এসে মাকে চুলের মুঠি ধরে মারধর করতে লাগলো আর মাকে টেনে হিছড়ে নিয়ে গেলো ।
এরপর থেকে আর কখনোই আমি মায়ের সেই নিষ্পাপ মুখটি দেখতে পাইনি।জানিনা সেইরাতে আমার হতভাগ্য দুখিনি মায়ের কি নিষ্ঠুর পরিণতি হয়েছিলো।জানিনা কি কষ্টটাই না পেয়েছিলো আমার মা টা।
আমার দুচোখ বেড়ে অশ্রু ঝরছে মায়ের জন্য।
এখনো বৃষ্টি হলেই আমি ভয়ে শিউরে উঠি,হৃদয় আমার দুমড়েমুছড়ে উঠে অজানা ভয়ে।
আমার নিষ্ঠুর বাবার জন্যে একরাশ ঘৃণা উতলে উঠে মনে।
মনে যেনো হয় যেনো বাবার পাপীষ্ঠ শরীরটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলি।
আমার জনমদুখী মা টা কোথায় আছে,কেমন আছে এখনো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।

ভালোবাসি মা! অনেক বেশি।

বৃদ্ধাশ্রম কি শুধুই একটি আশ্রয়স্থল!

Now Reading
বৃদ্ধাশ্রম কি শুধুই একটি আশ্রয়স্থল!

সামাজিক গল্প:

ভুল

নিচু হয়ে ব্যাগ গুলো রাখতে গিয়ে সামনের রগ ওঠা শীর্ণ পা’দুটো চোখে পড়লো। ব্যাগের হাতলটায় নিজের হাত দিটোর দিকে একবার তাকালেন, “হাত বাড়িয়ে পা’দুটো একবার ছুঁয়ে নেবো?” ভাবনাটা আসলো বটে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই চিন্তাটা কে মন থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিলেন রাহাত সাহেব। “এসব ন্যাকামো ভালো দেখায়না,আশালতা কি ভাববে? ছিহ!”
ব্যাগ দুটো রেখে আস্তে করে পিছু ফিরে সোজা হয়ে দাড়ালেন,এক কদম, দু কদম করে গাড়ির দিকে এগুচ্ছেন, “একবার পিছু ফিরে তাকাবো কি? নাহ থাক্, গাড়িতে আশালতা কি ভাববে…!!”

দরজার হাতলটা আঙ্গুলে পিছলে গেলো,কাঁপা কাঁপা হাতে আবারো ধরলেন,তারপর সিটে বসেই গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দিলেন। হুশ করে বৃদ্ধাশ্রমের সাইনবোর্ডটা পেরিয়ে এসে বড় রাস্তায় ওঠলো গাড়ি।
স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে স্পিড-ব্রেকারে পায়ের চাপ একটু কমালেন। সচরাচর ত্রিশের ভেতরেই গাড়ি চালান,অথচ আজ এই এতটুকু আসতেই পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে রাহাত সাহেবের গাড়ি!

পাশ থেকে একটা হাত জড়িয়ে ধরলো রাহাত সাহেবকে, “আশা,এইবার তুমি খুশিতো?”

“হুম,থ্যাংকু রাহাত!”
“একদম মনের মতো হবে সব এখন থেকে,দেখো! ঠিক যেমনটা আমি স্বপ্ন দেখে এসেছিলাম।”

স্ত্রী’কে এতদিন পর মন খুলে হাসতে দেখছেন রাহাত সাহেব,”সবাইকে তো আমি একা একজনই সন্তুষ্ট করতে পারবোনা।যেকোনো একজনকে নাহয় একটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হলো।” মনে মনে ভাবলেন,
“ওখানে তুমি ভালো থাকো,এখানে আশাও সুখী হোক।”
ভাবতে ভাবতে গাড়ি চালানোয় মন দিলেন।

__________

__________

গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই নড়ে ওঠলেন মানুষটি। শীর্ণ হাত দুটো দিয়ে ভারী ব্যাগ দুটো তুলে নিলেন,একটা ছেলে এগিয়ে আসছিলো,সাহায্য করার জন্যই বোধহয়,মাথা নেড়ে নিষেধ করে দিলেন।
চাবি আর রুম নম্বর গাড়িতেই দিয়েছিলো রাহাত,ভারী ব্যাগ দুটো নিয়ে ওদিকেই চললেন তিনি। দরজা খুলে ব্যাগ দুটো ভেতরে রাখলেন,পিছু পিছু আসা ছেলেটা এখনো দাড়িয়ে আছে। মিষ্টি হেসে ওর দিকে হাতের ইশারায় ডাকলেন মানুষটি।
ছেলেটা দৌড়ে ছুটে এলো,ভেতরে গিয়ে পার্স হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন খুজে এনে ওর হাতে দিলেন,তারপর ইশারায় ফিরে যেতে বলেই দরজাটা লাগিয়ে দিলেন।

ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকারে,শীর্ণ মানুষটার চোখ দুটো থেকে দুফোঁটা লোনা পানি ঝরে পড়লো এতক্ষনে!!

___________

____________

শহরের নামিদামী একটি রেষ্টুরেন্ট। ভেতরে মানুষ গঁজগিজ করছে।বেশিরভাগই মধ্যবয়স্ক আর বয়োবৃদ্ধ।

আজ:★parent’s Day★
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথী:
“বিশিষ্ট শিল্পপতি রাহাত হোসাইন।”

বক্তৃতা,গান,নাচ সব কিছুর পর লাঞ্চ-ব্রেক। প্রধান অতিথি নিজের হাতে কয়েকজনকে খাবার পরিবেশন করবেন।
একে একে কয়েকজনকে দেয়ার পর শেষজনের কাছে এসে দাড়ালেন রাহাত সাহেব। চামচে একটুকরো মাংস তুলে দিলেন সামনে বাড়ানো প্লেটে। সাথে সাথেই মানুষটি বুভুক্ষের মতো খাওয়া শুরু করলো!

রাহাত সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।

দাঁতবিহিন মাঁড়িতে চোয়ালের নড়াচড়া,
ভাজ পড়া চামড়া,
চোখে ভারী পাওয়ারের চশমা!
সবই একে একে দেখছেন তিনি, অতি পরিচিত কার মুখ যেনো বার বার এসেও আসছেনা!!

নিজের আসনে বসেও স্বস্থি পাচ্ছেননা রাহাত সাহেব। বার বার কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছেন! শেষে আর থাকতে না পেরে সাময়িক অসুবিধার কথা বলে বিদায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন।

গাড়ি চলছে।
সামনে সবই কেমন ঝাপসা ঝাপসা দেখছেন রাহাত সাহেব। তবুও দু’মাস আগের ওই সাইনবোর্ডটা চিনতে ভুল হলোনা একটুও!

গাড়ি থামিয়ে,এসে দাড়ালেন দরজার সামনে।
ঠক্! ঠক্! ঠক্!
কাঁপা কাঁপা হাতে নক করলেন দরজায়।
“কে?” দরজা খুলতে খুলতে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন কেউ একজন।

“আমি”
“তোমার খোকা..!!”

ঝট করে মাঝপথেই দরজার শব্দ বন্ধ হয়ে গেলো। আবছা অন্ধকারে,শীর্ণ হাত দুটো থমকে গেছে!!

দরজাটা কি খুলবে??
নাকি খোকার সাথে সেদিনের সেই অভিমানি রুদ্ধ কন্ঠস্মরের মতোই,দরজাটাও আজো রুদ্ধই থাকবে??

হয়তো খুলবে!!
“মা” তো!!
শত শত ভুলের পরেও খোকা তো সেই ‘আদরের খোকা’ই রয়ে যায়!!

শাওনের গল্প

Now Reading
শাওনের গল্প

সোহেল সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারী করছে, অপারেশন থিয়েটারে তার স্ত্রী প্রসব ব্যাথায় কাৎরাচ্ছে। গত বছরে বর্ষায় কোন এক মেঘলা দিনে সোহেল বিয়ে করেছিলো মমতা কে।

ডাক্তার এসে সোহেল কে বললো তার স্ত্রীর অবস্থা ভালো না সিজার করতে হবে। কথাটি শুনে সোহেল এর মস্তিষ্ক থেকে ঠান্ডা রক্ত ঘাড় বেয়ে নিচে নেমে গেলো।

এখন এতো টাকা পাবে কোথায়, আশেপাশে আত্মীয়স্বজন কেউ থাকেনা, এক রাজ্য চিন্তা মাথায় নিয়ে তবুও বেরিয়ে গেলো সোহেল হাসপাতাল থেকে।

ঘন্টা খানেক বাদে কপালে ঘাম নিয়ে ফিরে আসে হাসপাতালে, এসে রিসিপশনে গিয়ে বলে অনেক কষ্টে দুই হাজার টাকা যোগাড় করতে পেরেছে। রিসিপশনের ভদ্র মহিলা হেঁসে উঠে বলে “টাকা লাগবে না, আপনার ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে, ৩০৮ নম্বর রুমে চলে যান।

সোহেলের মাথা থেকে যেন এক পাহাড় পরিমান চিন্তা সরে গেলো, মুখে ফুটে উঠে আনন্দের হাসি।

দ্রুত হেটে সোহেল চলে যায় ৩০৮ নাম্বার রুমে, গিয়ে দেখে মমতার পাশে একটা শুভ্র সুন্দর বাচ্চা শুয়ে কান্না করছে। সোহেল গিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে “বাবা আমার বাবা” বলে হেসে উঠে, সোহেলের চেহারার সেই আনন্দটা মনে হচ্ছিলো সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাটিও বুঝতে পেরেছিলো, তাই কান্না থামিয়ে চুপ করে রইলো।

মমতার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ডাক্তার এসে বললেন “আপনাকে না দেখতে পেয়ে আমরা শেষে বাধ্য হয়ে নরমাল ডেলিভারী করি। অনেক রক্ত খরন হয়েছে। পারলে ওনার জন্য এবি নেগেটিভ  রক্তের ব্যবস্থা করেন। সোহেল পরিচিত কয়েকজনকে কল করেও এবি নেগেটিভ রক্ত জোগাড় করতে পারেনি।

মমতার জ্ঞান ফিরছেনা, বাচ্চাটা খুদায় কান্নাকাটি করছে, ডাক্তার এসে ইনজেকশন পুশ করে সোহেল কে বলে কি ব্যাপার রক্ত না পেলে তো রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবেনা। সোহেল অসহায় হয়ে চারপাশে খুঁজতে থাকে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে অনেক কে অনুরোধ করে রক্ত দেয়ার জন্য। কিন্তু ওই গ্রুপের রক্ত পাওয়া খুব ই কঠিন।

সোহেল হাসপাতালে ফিরে গিয়ে মমতার পাশে বসে হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বলে আমি মনে হয় তোমাকে বাঁচাতে পারবো না, আমাকে ক্ষমা করে দিও। সোহেল এর চোখের জল মমতার হাতে গড়িয়ে পড়ে, হঠাৎ করে মমতার জ্ঞান ফিরে আসে, কষ্ট করে উঠতে যেয়েও পারছেনা, রক্ত শূন্যতায় তার চোখ মুখ হলদেটে হয়ে উঠেছে।

মমতা সোহেল কে অনেক কাঁপাকাঁপা গলায় বলে আমার ছেলেকে দেখে রেখো!

আমি মনে হয় ওকে এক ফোটা দুধ ও খাইয়ে যেতে পারবো না, বড় হলে ওকে বুঝিয়ে বলবা, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়!

এই বলে মমতা চোখ বন্ধ করে ফেলে, সোহেল দোড়ে গিয়ে ডাক্তারের কাছে বলে, ডাক্তার এসে দেখে মমতা মারা গেছে।

সোহেল বাচ্চাটির দিকে তাকাতে পারছেনা, এতটা দুর্ভাগ্য নিয়ে ও পৃথিবীতে এসেছে।

বিকেল বেলায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি নামলো, মানুষ মরার পরে প্রকৃতি কেমন যেন নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। অন্ধকার হয়ে উঠে চারপাশ।

সোহেলের মা শাওন কে ফিডারে করে দুধ পান করাচ্ছেন। সোহেলের চাকুরীতে ফিরে যাবার সময় হয়েছে। “শাওন” নাম টি মমতা অনেক আগেই রেখে দিয়েছিলো। কি জানি হয়তো তার মনে হয়েছিলো জন্মের পর সন্তানের নাম রাখার সময়টুকু ও পাবেনা।

শাওন কে কোলে তুলে কপালে আদর করে সোহেল কাজে চলে যায়। শাওন তার দাদীমার কাছে বড় হতে থাকে, সোহেল আসে মাঝেমধ্যে।

গত মাসে সোহেল আরেকটা বিয়ে করে, শাওনের বয়স তখন ৬ মাস, তার লালনপালনের জন্য একজন “মা” খুব দরকার, সোহেলের মা প্রায় অসুস্থ থাকেন, যে কারনে বাধ্য হয়েই সোহেল কে আবার বিয়ে করতে হয়। কিছুদিন ভালোই কাটতে থাকে, কিন্তু সোহেলের পরের স্ত্রীর পেটে সন্তান আসার পর থেকেই চিত্র পাল্টাতে থাকে। শাওনের দিকে আগের মত খেয়াল রাখা হয়না। এতে করে সোহেলের মার সাথে তার স্ত্রীর মনমালিন্য শুরু হয়। এবং তা অনেক কঠিন পর্যায়ে চলে যায়। সোহেল কোন পথ খুঁজে না পেয়ে তার স্ত্রীকে তার কাছে নিয়ে যায়, ওইখানে বাসা ভাড়া করে থাকা আরম্ভ করে। শাওন আগের মত তার দাদী্মার কাছে বড় হতে থাকে।

পাড়ার সবাই শাওন কে অনেক স্নেহ করে, ওর মুখটাতে সবাই কিসের যেন মায়া খুঁজে পায়।

কিন্তু এই স্নেহ শাওনের মন কে শান্ত করেনা, শাওন এখন ৮ বছরের শিশু। সে গল্প শুনেছে তার “মা” তার জন্মের পরেই দুনিয়া ছেড়ে ওই আকাশে চলে গেছে।

আকাশে তাকিয়ে প্রায় শাওন তার মা কে ডাকে। আর সব শিশুর মত অবাধ্য হয়ে সারাদিন দুষ্টামি করে, দাদীমার হাতে মার ও খায়। সোহেল মাঝেমধ্যে খোঁজ খবর নেয়। সন্ধ্যায় গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সবাই নিজের ঘরে ঘরে ডুকে যায়। দূর থেকে বাচ্চাদের পড়ার আওয়াজ ভেসে আসে…অ…আ..ক…খ…।

সাথে সাথে পাশের ঘরে কোন মা তার সন্তান কে বাবা বাবা বলে আদরের সুরে বুকে জড়িয়ে ধরে। শাওনের কানে সে সব শব্দ ভেসে আসতে থাকে প্রতিনিয়ত।

পাশে দাদীমা অসুস্থতায় কাৎরায়। জানালা দিয়ে আকাশে তাকিয়ে তারাগুলো কে দেখতে থাকে, ওর বিশ্বাস ওর “মা” ও ওকে দেখতে পান। একসময় ঘুম এসে যায় আর শাওন ডুবে যায় স্বপ্নের রাজ্যে। যে রাজ্যে তারাগুলোর সাথে তার “মা” কেও দেখতে পায় শাওন।

সমাপ্ত

আমার ছেলেবেলা

Now Reading
আমার ছেলেবেলা

খুব সম্ভবত আমাদের সময় পর্যন্তই ছেলেবেলা বলে কিছু একটা ছিল। নব্বই দশক পার করে যারা জন্মেছে, তাদের জীবনে ছেলেবেলা নামক কিছু নেই বলে আমার ধারণা। এরা প্রত্যেকেই জন্মের দু’বছরের মধ্যে বড় হয়ে যায়। দুই বছর বয়স পর্যন্ত যা কিছু করেছে সেগুলো যেহেতু মনে থাকে না, সেজন্য তাদের শৈশব বলে কিছু নেই।

আমার কথা শুনে আপনার ভ্রু কুচকে হয়তো মনিটরের দিকে তাকাবেন। কিন্তু আমার এই মনে হওয়ার পেছনে কিন্তু যুক্তি আছে। এই ঢাকার রাস্তায় একটু চোখ কান খোলা রেখে চললেই দেখবেন, বয়সে এগারোর বেশী হবে না অথচ চিপা জিনস আর গায়ে বিপ্লবী টিশার্ট চাপিয়ে এরা এমন ভাবে হেঁটে যায়, মাঝেমাঝে নিজের বড় ভাই ভেবে ভুল করে ফেলে মন।

অথচ এই শহুরে হাবভাব কিন্তু এই বছর পাঁচেক আগেও এতটা ছিল না। আমরা যারা গ্রামে ছিলাম, তারা আসলেই গাঁইয়া ছিলাম। এখনকার তো গ্রামের ছেলে মেয়েরাও ঢের স্মার্ট। আমার ছোট বোনটাও তো, জিনস পড়তে শিখে গেছে। অথচ আমাদের সময়ে, গ্রামের রাস্তায় জিনস পরা কাউকে দেখলে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। অবশ্য ব্যাপারটা ভাল নাকি খারাপ সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ওটা ছিল আমাদের ছেলেবেলার সংস্কৃতি।

এখনকার প্রজন্ম আম চুরি, ডাব চুরি বলে আলাদা যে একটা রোমান্সকর ব্যাপার ছিল, সেটা তারা কখনোই পাবে না। তবে আমার ছেলেবেলায় চুরি টুরি খুব একটা করা হয়ে ওঠেনি। গাছে উঠতে পারতাম না বলে, চোরের দলে আমাকে কেউ নিত না। আমার শৈশবের প্রায় সবটুকু জুড়েই কেবল, নদীতে দাপাদাপি করে কেটেছে। বাড়ির সাথে লাগোয়া একটা ক্যানেল ছিল। দিনের মধ্যে আট দশ ঘণ্টা সেখানে গা ডুবিয়ে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে মা কলমি কাছে ডাল ভেঙ্গে পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত।

এই কলমি গাছের ডাল নিয়ে একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যাবে। আরেকটা লেখা এই কলমি গাছের ডাল নিয়ে লিখব ইনশা আল্লাহ। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে, ওটাকে একটা বিভীষিকার সাথে তুলনা করা যায়। কলমির ডালের একেকটা মার, শরীরে একেকটা অপকর্মের সাক্ষী হয়ে বেঁচে ছিল দীর্ঘকাল ।

একদিনের গল্প বলি। আমি তখন ক্লাস টু অথবা থ্রিতে সম্ভবত পড়ি। একদম চৈত্রের দুপুর। মা আমাকে দুইটাকা দামের আইসক্রিম আনতে দিয়েছে কয়েকটা। যেহেতু চৈত্র মাস, বাড়ির সাথের লাগোয়া ক্যানেলটার পানি শুকিয়ে একদম অল্প হয়ে গেছে। আর তখনই দেখলাম ব্যাপারটা। আর খুশিতে নিজে নিজেই দুই তিনিটা ছোট ছোট লাফ দিলাম। এক ঝাঁক পুঁটি মাছ পানি গরম হয়ে যাওয়াতে লাফিয়ে লাফিয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসছে! আমাকে আর পায় কে! আইসক্রিম এর কথা একদম ভুলে গিয়ে মাছ মারতে শুরু করে দিলাম।

আমার ধারণা ছিল, আমার মা হয়তো এত গুলো মাছ দেখে খুশি হবে। আমাকে আদর করে কপালে একটা চুমু বসিয়ে দেবে। কিন্তু তারপরের গল্পটা খুব একটা বিস্তারিত না। ছোট্ট একটা পার্ট। আম্মুর কলমির ডাল ভাঙ্গা আর আমার একটা উসাইন বোল্ট দৌড়।

মাঝে মাঝে আফসোস হয়। এই ইয়ো ইয়ো প্রজন্ম কখনো কলমির ডাল চিনবে না। কখনো মায়ের মারের ভয়ে উসাইন বোল্ট হয়ে উঠবে না। হবেই বা কী করে? এই ঢাকায় কি আর গ্রামের মত মেঠো পথ আছে?

আমি একটা ছেলেকে চিনি। বাবা মা দুজনই নয়টা পাঁচটা অফিস করে। ছেলেটা একা একা থাকে। কাজের মেয়ের কাছে। অবশ্য ঠিক কাছে না। কারণ মেয়েটা ওর কাছে ঘেঁসতেও সাহস পায় না। সারাদিন দরজা বন্ধ করে প্রথম কয়েকদিন ফিফা খেলার মধ্যেই আটকে থাকলেও। ইদানীং নেটের রাজত্বে হানা দেয়া হয় বেশী। এভাবেই একসময় পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে গেল। এই ছেলেটা কিন্তু একা না। নিজেই অনেক গুলো ছেলের প্রতিনিধিত্ব করে। অথচ আমাদের ছেলেবেলায় আমরা কম্পিউটারই চিনতাম না।

তবে হুম, খারাপ সব সময়ই ছিল। ঐ সময়টাতে ভিউ কার্ডের প্রচলন ছিল। হাটে গেলে নায়ক নায়িকাদের ছবির কার্ড পাওয়া যেত। আরও একটু খুঁজলে অশ্লীল ছবিও পাওয়া যেত। অনেকে কিনত, অনেকে কিনত না।

তসলিমা নাসরিনের আমার মেয়েবেলা পড়েছিলাম। তার স্বভাব মতই অশ্লীল বাক্য বানে জর্জরিত উপন্যাসটিও একটা শৈশবের কথা বলে। কিন্তু এই প্রজন্মের শৈশব বলে কিছু নেই। আবারও লেখার প্রথমে ফিরে যাই। শৈশব বলে কিছু নেই কারণ, এরা কখনো নিজেকে ছোট ভাবতে শেখেনি। হাঁটতে শেখার পর থেকেই নিজেকে তুলনা করেছে কোনো একজন সুপারস্টার এর সাথে। ওদের চলাফেরা, হাঁটার ধরন – সব কিছুতেই এক অস্বাভাবিক বড় মানুষের ভাব।

কিন্তু আমাদের সেই সময়টাতে আমরা ছোটই ছিলাম। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, আমার বড় ভাইটা ঈদের সালামীতে ২০ টাকা পাবে আর আমি পাব দশ টাকা। কারণ আমি ছোট। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, বাংলা সিনেমায় নায়ক নায়িকা একটু খানি কাছে আসলে আমাদের টিভির ঘর ছেলে উঠে যেতে হবে। আমরা মেনে নিয়েছিলাম, মাগরিবের আজানের আগেই আমাদের বাসায় ফিরতে হবে।

পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই নিয়ম মানতে চায় না। কিন্তু এখন মনে হয়, কোনো কোনো নিয়মের মাঝেও একটা মাদকতা থাকে। যে নেশার তোপে বার বার বুদ হতে মন চায় ইট কাঠের এই বড় বেলাতে।

ইয়ো ইয়ো প্রজন্ম, একটা শৈশবের মাদক আসুক তোমাদের মাঝে। নেশাগ্রস্থ হও, ছোট বেলার উন্মাদনায়।