ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই

Now Reading
ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই

image_4765.jpg

 

গতিশীল সমাজে গতিশীল আমরা। সমাজের চিরন্তন বাস্তবতা আমাদের মেনে নিয়ে বাবা-মার কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। লেখাপড়ার স্থানে, কর্মস্থলে কিংবা প্রবাসে। তাই বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে বাবা-মাকে মনে করিয়ে দিই, আমরা তোমাদের ভুলিনি।

বাবা সারাজীবন আমাদের বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন। বুঝতে দেননি চলার পথের প্রতিবন্ধকতা।

 

বাবা নির্ভরতার অন্য নাম। বাবা মানে নির্ভরতা, নিরাপত্তা, বিশালতা। বাবাহীন জীবন ধূসর মরুর ঊষর বুক, শ্বাপদ সংকুল বনে দুরু দুরু হৃদকম্পন; বাবাহীন জীবন ছোট্ট ডিঙ্গি নিয়ে উত্তাল সাগর পাড়ি দেয়ার দুঃসাহসিক চেষ্টার নাম।

বাবার কাঁধে চড়ে প্রথম মেলায় যাওয়া। বাবার হাত ধরে প্রথম স্কুলের সিঁড়িতে পা রাখা। বাবার বুকে মাথা রেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা। বাবার নিরাপদ আশ্রয় যার আছে, তার নেই কোনো ভয়। বনস্পতির ছায়ায় যেন নিশ্চিন্ত জীবন। বাবার মমতাভরা হাতখানি মাথায় ছোঁয়ালে অসম্ভবকে জয় করে আনাও খুব সম্ভব।

 

মানুষ বয়সে যত বড়ই হোক বাবার কাছে সে থাকে সেই ছোট্ট শিশুটিই । মাতৃগর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বাবা যখন সন্তানের মুখ দেখেন কিংবা কোলে তুলে নেন, সেদিনের সেই অনুভূতি অতুলনীয়, যা আজীবন বাবার হৃদয়ে অবশিষ্ট থাকে।

কোনো বাবা সন্তানের কাছে বন্ধুর মতো, কেউ-বা পথপ্রদর্শক। এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অনেকেই বাবাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাবেন। দেবেন নানা উপহার কার্ড, মগ কিংবা প্রিয় পোশাক। কেউ কেউ হয়ত বাবাকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন, খাবেন ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে। অন্যদিকে যাদের বাবা বেঁচে নেই, তারা হয়তো আকাশে তাকিয়ে অলক্ষ্যে বাবার স্মৃতি খোঁজে বেড়াবেন।

বাবা তার দায়িত্ব ও পিতৃত্বসূলভ আচরণ তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বহাল রাখতে চান। সময়ের পরিবর্তনে বাবাও একদিন সন্তান নির্ভর হয়ে পড়ে, কিন্তু বাবা সব সময়ই বাবা। সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা বাবাকে দিয়েছে মহতের স্থান।

বাবার তুলনা চলে বটগাছের সাথে । যিনি শত-সহস্র ঝড়-ঝঞ্ঝা নীরবে সহ্য করতে রাজি, কিন্তু তার সন্তানদের প্রতি অতি ক্ষুদ্র আঘাত কিংবা কষ্টের ছিটেফোঁটা লাগাতেও নারাজ । দাম্পত্যের সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে অনেক বাবা তার সন্তানদের ভালো রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেন । নিজের শরীর আবৃত কিনা সেদিকে তার সামান্যতম খেয়াল নেই। কিন্তু সন্তানের শরীর উন্নত ও দামি পোশাকে মুড়িয়ে রাখতে সদা ব্যস্ত । নিজে না খেয়ে ভাগের সকল খাদ্য ছেলে-মেয়ের পাতে তুলে দিতে যিনি এতটুকু কার্পণ্য দেখাননি কোনদিন তিনিই-বাবা । জীবন-যৌবনের সকল সুখ-শান্তি ত্যাগ করে শুধু সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে যিনি সকাল থেকে রাত আবার রাত থেকে সকাল পর্যন্ত খেটে যান তিনিই শ্রদ্ধেয় বাবা । শরীরের রক্ত পানি করে বাবা তার সন্তানের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এঁকে দিয়ে যান । বাবা ত্যাগের দর্শন গ্রহণ করে সন্তানকে ভোগের নিশ্চয়তা দিতে সদা বদ্ধপরিকর ।

 

বাবা শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নির্ভরতা। রয়েছে এক বিশালতা। বাবা শব্দটি অনেক কঠিন কাজকে করে দেয় সহজ; পাহাড় সমান বিষণ্ণতাকে শুষে নেয় নিমিষেই। বাবা তো সেই জন, যার হাতে হাত রেখে হাঁটি হাঁটি পায়ে আমরা এগিয়ে যাই নতুন পৃথিবীর সন্ধানে। যার কাঁধে চড়ে আমরা প্রথম জানতে পারি পৃথিবী রূপ কি।

বাবা শুধু একজন মানুষ নন, একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা নামটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার এক অনুভব জাগে মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না।

আমার বাবা একজন শিক্ষিত অসুস্থ অবসরপ্রাপ্ত কৃষক। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তিনি ছুটতে চেয়েছিলেন স্রোতের বিপরীতে। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন বলে কিছু আছে। তাই আর পেরে উঠা হয়নি।

আমার বাবা বরাবর ই একজন উচ্চমাত্রার পাঠক। সারাদিন পড়তে খুব ই ভালোবাসেন। সারা দুনিয়ার যে কোনো বই তাকে দিলেই হবে। তার আর কিছুই চাইনা। খাওয়া নাওয়া সব ভুলে যান। আর বই পড়া আমার দুচোখের শত্রু। মহা বিরক্তিকর একটা কাজ মনে হয়।

তার ভালো লাগে বাটা জুতা, লাইফবয় সাবান, পরতে ভালো লাগে লম্বা ঢিলা জামা, খাইতে ভালো লাগে নিরামিষ,,,,,,,,! যা কিনা সব গুলোই আমার বিপরীত। পেশী শক্তি অপব্যবহার করতে তাকে কখনওই দেখিনি। হাড় ভাঙা পরিশ্রমে অভ্যস্ত ছিলেন। সৎ উপার্জনের তাকিদ সব সময় ই ছিলো এখনো আছে। বরাবরের মতো আজো তিনি ভীষণ অতিথিপরায়ণ।

আব্বা চুপচাপ স্বল্পভাষী স্বভাবের। আমি প্রাণখোলা হই হুল্লুর টাইপের। ক্রিকেট নামক এক নেশার মধ্যে তাকে আমি ডুবিয়ে দিয়েছি। ক্রিকেট খুব একটা না বুঝলেও রান উইকেট এর হিসাব টা ভালোই বুঝেন। জয়সুরিয়া তার প্রিয় ক্রিকেটার।

আমার এখনো খুব ভালো করে মনে আছে ভরা পূর্ণিমাতিথিতে তার কাঁধে চেপে বেড়ানো আর জোনাকিপোকা ধরতে চাওয়া। সে যখন জমি চাষ করতো আমি তার জন্যে খাবার নিয়ে যেতাম। আমি আর আব্বা একসাথে মজা করে খেতাম। কতো যে স্বাদ ছিলো সে খাবারের, তা সারা দুনিয়ায় আর কোথাও আমি খুঁজে আজো পাইনি।

আমাকে পড়াতে গিয়ে তিনি আমায় বেধড়ক পিটিয়েছেন। শিক্ষাজীবনে কোনো শিক্ষক ই আমাকে এতো মারা মারেন নাই। তার কাছেই আমার পাঠশালার হাতেখড়ি। মনুষ্যত্বের বীজ তখন ই তিনি আমার মাঝে বপন করেছিলেন।

অভাবের সংসারে তিনি তিনি সবসময় ই আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন। তিনি আজ অসুস্থ। শরীরের সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত। তার বিশ্রাম চাই। আমি তার বিশ্রাম। তার কাঁধের জোয়াল টা এখন আমার কাঁধে। আমি যে বড় ছেলে।

বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এতো দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ এতো অল্প সময়ে কি করে এতো শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা …?

বাবা হলেন অদ্বিতীয় আলো, যার আলোয় আলোকিত হয়েই আমাদের সারা জীবনের পথচলা। আমরা এই সন্তানদের সব দায়- দায়িত্ব নিঃস্বার্থভাবে কাঁধে নিয়ে হাসিমুখে সৃষ্টির শুরু থেকে বিন্দু বিন্দু করে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে কামনা করেন আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। বাবা ছাড়া আর কে দেবেন সন্তানের জন্য এমন বিসর্জন?

যাদের বাবা আজ প্রয়াত, তাদের উপলব্ধি এতটাই তীব্র ও বেদনা বিধুর, যেটা অনেকেই বুঝতে চাইবেন না। সন্তান বাবার ঋণ কখনো পরিমাপ ও শোধ করতেও পারে না। পরিবারের মহীরুহ হয়ে দায়িত্ব পালনে, সন্তান-সংসার পরিচালনায় ব্রতী যিনি, সেই বাবার প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনে একদিন কিছুই নয়।

তোমার কাছে ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই চাওয়ার নেই। অনেক দিয়েছো আমায়। আমার বটবৃক্ষটাকে অনেক ভালবাসি। ভালো থেকো বাবা। সুস্থ থেকো।

“রব্বীর হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগীরা”

-হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।

[সূরা বনী-ইসরাঈলঃ২৪]