মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা

Now Reading
মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা

রাণী সপ্তম ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিশরের সর্বশেষ রাণী এবং ফারাওদের শেষ সদস্য। তিনি ছিলেন রূপেগুনে অনন্যা । তাঁর রূপের আলোচনা শুধু যে মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিলো তা কিন্তু না।  তাঁর সৌন্দর্যের আলোচনা ছিলপুরো আফ্রিকা আর ইউরোপ জুড়ে। ক্লিওপেট্রা’র পুরো নাম “সপ্তম ক্লিওপেট্রা ফিলোপাটর”। মিশরীয় হলেও  তিনি ছিলেন গ্রীক বংশভূত প্রাচীন মিশরের টলেমি বংশের সদস্য। গ্রেট আলেক্সান্ড্রিয়া’র মৃত্যুর পরে তারেক সেনাপতি রাজ্যের দায়ীত্বভারগ্রহণ করেন এবং টলেমি বংশ স্থাপন করেন। তিনি খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৬৯-৭০ সালে মিশরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।তার মাতার নাম “পঞ্চম ক্লিওপেট্রা” এবং তার পিতা ছিলেন “দ্বাদশ টলেমি অলেটেস”। খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৫১ সালে তার পিতা দ্বাদশ টলেমি অলেটেস’র স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে মাত্র ১৮ বছর বয়সী সুন্দরী ও সুশিক্ষিত ক্লিওপেট্রা  এবং তার ১১বছর বয়সী ভাই  “১৩তম টলেমি” রাজ্য পরিচালোনার দায়ীত্ব পান। তার রাজ্য চলাকালীন সময়ে মিসরেপ্রাচীন মিশরীয় ভাষার পাশাপাশি  গ্রীক ভাষারও প্রচলন লক্ষ করা যায়। তিনি নিজেও বেশ কয়েকটি ভাষায় কতাহ বলতে পারতেন। পরে তিনি রোমের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করে তার রাজ্যের প্রভআব বিস্তার করেন। এবং তখনকার রোম সেনাপতি “জুলিয়াস সীজার” এর সাথে মিলে  তার ভাইকে হটিয়ে তার একার রাজত্ব কায়েম করেন। এর মাধ্যমে রোম এবং মিসর মিলে এক বিশাল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই দুই সম্রাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে জুলিয়াস সীজার বেশ কয়েকবারই মিসরে যাতায়াত করেন এবং জুলিয়াস সীজার এবং ক্লিওপেট্রা’র মধ্যে একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পরে তা আরো ঘনিষ্ট হতে থাকে । কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের কথা যখন পুরো রোম এবং মিশরে ছড়িয়ে পরে তখন রোমান সিনেট সদস্যদের কাছে এটা মোটেও ভালো মনে হচ্ছিল না। সিনেট সদস্যরা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হন নি। একসময় জুলিয়াস সীজার আনুষ্ঠানিক ভাবে মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা কে বিয়ে করার ঘোষণা দেন।আর এতে পুরো ইউরোপ এবং আফ্রিকা জুড়ে আলোড়ন ছড়িয়ে পরে। জুলিয়াস সীজার তার কথামত মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় রাণী ক্লিওপেট্রা’র রাজমহলে রাণী ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করেন।এতে রোমান সিনেট সদস্যরা ব্যাপক সমালোচনায় লিপ্ত হন। রাণী ল্কিওপেটড়া যখন অন্তঃসত্ত্বা তখন সম্রাটজুলিয়াস সীজার আবার রোমে ফিরে আসেন। এবং তার শাসন কার্যক্রম যথাযথ পরিচালনা করতে থাকেন। কিছুদিন পরেই  জুলিয়াস সীজার আর রাণী ক্লিওপেট্রা’র ঘরে একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। জুলিয়াস সীজারের নাম অনুসারেতার সন্তানের নাম রাখা হয় ”সীজারিওন”। পুত্রসন্তানের সংবাদে খুশিতে আত্মহারা হরেন পরেন  জুলিয়াস সীজার। এভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকটি বছর। সীজারিওন এখন ৮ বছরের বালক।ভবিষ্যৎ মিশরের সম্রাট।  জুলিয়াস সীজার তার স্ত্রী রাণী ক্লিওপেট্রা এবং তাদের একমাত্র পুত্র সীজারিওনকে  রোমে আসার আমন্ত্রণ জানান। রাণী ক্লিওপেট্রাও তার নিমন্ত্রনকে স্বাদরে গ্রহণ করেন। এবং তার প্রমোদতরী নিয়ে রোমের দিকে যাত্রা শুরু করেন।  সে এক জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে রাণী ক্লিওপেট্রা এবং রাজপুত্র সীজারিওনকে বরণ করা হয়। বলা হয় এমন জমকালো আয়োজন আগে কখনো রোমানরা দেখেনি। আর এটাই সিনেট সদস্য আর আবাকি রাণীদের চোখের কাল হয়ে যায়। জুলিয়াস সীজার এখন শুধুই তার প্রিয়তমা স্ত্রী আর পুত্রকে নিয়ে ব্যস্ত। আর তার পিঠপিছে চলছে  জুলিয়াস সীজার কে হত্যার পরিকল্পনা। জুলিয়াস সীজারকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তারই ভাতিজা এবং সিনেট সদস্যরা। জুলিয়াস সীজারের খুব কাছের লোক ছিলেন সেনাপতি মার্ক এন্টোনি। যিনি সবসময়ই  জুলিয়াস সীজারের সাথেই থাকতেন এবং সম্রাটের অনুপস্থিতিতে রাজ্য পরিচালনা করতেন। কিছুদিন পরেই খবর আসে সিনেট সদস্যরা সম্রাট জুলিয়াস সীজারকে বিশেষভাবে সম্মানী দিতে চান এবং তাকে সিনেটে আসার আমন্ত্রণ জানান।জুলিয়াস সীজার এতে বেশ খুশী হন এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী রাণী ক্লিওপেট্রা কে বলতে থাকেন যে, কাল সিনেট সদস্যরা আমাকে বিশেষ সমান প্রদান করবেন। এদিকে সিনেট সদস্যরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যখন জুলিয়াস সীজার সিনেটে উপস্থিত হন তখনই  কোন একজন মার্ক এন্টোনিকে সরিয়ে নেন। আর সিনেট হলের ভেতরেই সিনেট সদস্যরা মিলে নির্মম ভাবে  হত্যা করে জুলিয়াস সীজারকে। এবং তারা তাদের আনন্দ উৎসব পালন করেন। ঐ রাতেই মার্ক এন্টোনির বিশেষ সহযোগীতায় রাণী ক্লিওপেট্রা আর তার সন্তান সীজারিওন রোম ত্যাগ করে তাদের জন্মভূমি মিশরে চলে যান।   এবং জুলিয়াস সীজারের ভালোবাসার অবসান হয়। বিদায়কালে মার্ক এন্টোনি রাণী ক্লিওপেট্রার প্রেমে পরে যান।

জুলিয়াস সীজারের ভাতিজার মৃত্যুর পরে মার্ক এন্টোনি সেনাপতির দায়িত্ব পান। দায়ীত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই মার্ক এন্টোনি আবার রাণী ক্লিওপেট্রা কে রোমে আসার আমন্ত্রণ জানান এবং রাণী ক্লিওপেট্রা তার নিমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন। রোমান দূতকে আরো বলেন যে তিনি আর কখনোই রোমের মাটিতে পা রাখবেন না। তিনিও মনে মনে মার্ক এন্টোনিকে পছন্দ করতেন। পরে রাণী ক্লিওপেট্রা তার কথামত প্রমোদতরী নিয়ে রোমে যান ঠিকই কিন্তু তিনি তার প্রমোদতরী থেকে নামেন নি। ভূমধ্যসাগরে তার নৌকাতেই তিনি অবস্থান করেছেন এবং মার্ক এন্টোনিকে ডেকে পাঠিয়েছেন।এবং ভালোবাসার টানে মার্ক এন্টোনি সব ভুলে গিয়ে রাণী ক্লিওপেট্রার প্রমোদতরীতে যান রানীর সাথে দেখা করতে।নাচগান, ফুল-ফল আর নানান রকমের খাবারের মাধ্যমে রাণী ক্লিওপেট্রা তার নৌকায় মার্ক এন্টোনি কে স্বাগত জানান। “অবশেষে আপনি রোমে আসলেন” এমন কথার জবাবে রাণী ক্লিওপেট্রা মার্ক এন্টোনিকে আবার মনে করিয়ে দেন যে তিনি বলেছিলেন তিনি আর রোমের মাটীতে পা রাখবেন না। এবং নানা রকমের আলাপচারীতার মাধ্যমে তাদের মাঝে সম্পর্ক আরো গভীর হয়। মার্ক এন্টোনিও জুলিয়াস সীজারের মতন  মিশরে বেশকিছুদিন অবস্থান করেন। এবং তার মিশরে যাতায়াত বেড়ে যায়।এতে আবার সে সিনেট সদস্যরা ভ্রুকুন্ঠিত করে। এবং সিনেত দুটি দলে বভক্ত হয়। একদল মার্ক এন্টোনির পক্ষে আরেকদল বিপক্ষে। কিন্তু এসব  নিয়ে মোটেও মাথা ঘামান নি মার্ক এন্টোনি। তিনি এখন শুধু তার প্রিয়তমা রাণী ক্লিওপেট্রা কে নিয়েই ব্যস্ত।এদিকে মার্ক এন্টোনি যখন রোমে অবস্থান করেন তখন তাকে সরাসরি কেউ কিছু না বললেও তার পিঠপিছে কমবেশি সবাই আলোচনা করত। একসময় মার্ক এন্টোনি বেশকিছু সময়ই মিশরে অবস্থান করেছিলেন। এসময় সিনেটে তার বিপক্ষের একজন একটি হুইল প্রকাশ করেন যাতে লেখা ছিলো ” আমার মৃত্যুর পরে আমাকে মিশরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় কবর দিও –মার্ক এন্টোনি” এমন খবর প্রকাশ পাওয়ায় আম্ররক এন্টোনির পক্ষের সিনেট সদস্যরাও তার বিপক্ষে অবস্থান করেন এবং মিশরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দু পক্ষেরই এই যুদ্ধে সম্মতী ছিলো এবং পানিপথে রোম আর মিশরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে মিশেরর হয়ে নিজ রাজ্যে রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন মার্ক এন্টোনি। এবং এই যুদ্ধে তাদের বেশিরভাগ রণতরী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মার্ক এন্টোনিও আহত হন। এতে করে ভীষণ ভাবে ভেঙ্গে পরেন মার্ক এন্টোনি এবং রাণী ক্লিওপেট্রা। তার কিছুদিন পরেই আবার রোমানরা স্থলপথে মিশর আক্রমণ করে। তখন পুরো ইউরোপে রোমানদের দাপট থাকায় তুলনামূলকভাবে মিশর কম শক্তিশালী ছিলো। সেই স্থলপথের আক্রমণেই মিশর রোমানদের কাছে তাদের পরাজয় স্বীকার করে। কিন্তু রাণী ক্লিওপেট্রা আর মার্ক এন্টোনি এখনো পরাজয় মেনে নেন নি। যদিও তারা পরাজয় নিশ্চিত জানত। তারা তাদের রাজমহলের সব সদস্যদের মুক্ত করে দেন এবং রাণী ক্লিওপেট্রার পুত্র সীজারিওনকে এক বিশ্বস্ত দাসীর সাথে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেন। কিন্তু শেষ রেহাই হয়নাই তার পুত্রের। রোমানদের কাছে প্রাণ হারায় মাত্র ১১ বছর বয়াসী সীজারিওন। যদিও তার মা রাণী ক্লিওপেট্রা আদৌ জানতে পারেন নি যে তার পুত্র আর জীবিত নেই।(বিশেজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী) হারের ক্ষোভে রাণী ক্লিওপেট্রার মহলেই আত্নহত্যা করেন মার্ক এন্টোনি।এবং তার ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে আর পরাজয়ের দুঃখে রাণী ক্লিওপেট্রা এবং তার দুই ঘনিষ্ঠ দাসী/সহযোগী মিশরীয় গোখরা সাপের দংশনে ১২ই আগস্ট ৩০ খৃষ্টপূর্বাব্দ একই মহলে পৃথক স্থানে আত্মহত্যা করেন কিংবদন্তী রূপসী নারী মহারাণী “ক্লিওপেট্রা”।আর এরই মাধ্যমে শেষ হয় ফারাওদের বংশ। কিন্তু তাদের সমাধি আজ পর্যন্ত কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মিশরের ঐতিহ্য, সাজসজ্জা এবং সৌন্দর্য

Now Reading
মিশরের ঐতিহ্য, সাজসজ্জা এবং সৌন্দর্য

মিশরের সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য :-

মিশর প্রাচীন সভ্যতার দেশ। বিশ্বের সমুন্নত ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্যতম দেশ মিশর। যুগ যুগ ধরে মিশর ভিন্ন রকম রহস্যের শোভা ছড়াচ্ছে। যার প্রতি মানুষ সবসময়ই আকৃষ্ট। বিশ্ববাসীর মিশর সম্পর্কে কৌতুহল এবং আগ্রহের শেষ নেই। বর্তমান বিশ্বের মানুষ আরো বেশী কৌতুহলী এবং আকর্ষিত মিশরীয় অপরুপ সুন্দরী রাণীদের নিয়ে, তাদের অসাধারণ রুপ সৌন্দর্য এবং জীবনযাপন নিয়ে। ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে নেফারতিতি, হাটেম্পশুট, কিংবা প্রথম রাজবংশীয় রাণী মারনেইথ- এরা সবাই বিশ্বের অগণিত মানুষের আগ্রহ আর আকর্ষণের শীর্ষে থেকেছেন আজ অবদি।

সব আকর্ষণীয় রাণীদের সৌন্দর্য চর্চা ও তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে ব্রিটিশ দাতব্য প্রতিষ্ঠান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট চলতি বছর আয়োজন করে বেয়ন্ড বিউটি নামের এক শিল্প প্রদর্শনী। সেন্ট্রাল লন্ডনের টু টেম্পল পেলেসে আয়োজন করা হয় ওই অনুষ্ঠান। এখানে প্রকাশ পায় প্রাচীন মিশরীয় রাণীদের সৌন্দর্য সচেতনতা, আভিজাত্য এবং তাদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা সম্পর্কে।

৩৫০টির বেশি শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয় এখানে। যাতে দেখানো হয়, প্রাচীন মিশরীয়দের সাজসজ্জার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। আজকের দিনে যাকে আমরা বলি ‘বিউটি প্রোডাক্ট’ বা সৌন্দর্য পণ্য। তৎকালীন সময়ে মিশরের এসব রাণীদের দ্বারা প্রভাবিত সাধারণ নারীরাও রাণীদের অনুসরণ করে ব্যবহার করতেন বিভিন্ন প্রসাধনী।

মিশরীয় রাণীদের ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে চিরুনি, তামা বা রুপার তৈরি আয়না, পাললিক শিলা থেকে তৈরি চিত্র অঙ্কনের কাজে ব্যবহৃত প্যালেট, সাজসজ্জার বিভিন্ন বস্তু এবং সুগন্ধি সংরক্ষণের পাত্রসহ সৌন্দর্য চর্চার অনেক বস্তুই প্রদর্শন  করা হয় লন্ডনের অনুষ্ঠানে।

সে সময়ের নারী এবং পুরুষ- উভয়েই সৌন্দর্যের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। সাজসজ্জা এবং ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে পরচুলা ব্যবহার করত প্রাচীন মিশরীয়রা। মৃত্যুর পরেও মৃতদেহের সৌন্দর্যের ব্যাপারে সচেতন থাকতেন মিশরবাসী। মৃতদেহগুলোর ত্বকের স্নিগ্ধতা, শান্ত চেহারা, তাদের চোখে লাগানো সুরমা, তাদের মমি করা লাশের ওপরে লাগানো মুখোশ এবং কাঠের কফিন দেখেই বোঝা যায় তাদের সৌন্দর্য সচেতনতা সম্পর্কে। আধুনিক নৃবিজ্ঞানীরা জানান, প্রাচীন মিশরীয়দের সৌন্দর্য সামগ্রী ব্যবহারের সর্বব্যাপিতা দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। প্রাচীন ‍মিশরীয়রা তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্য বর্ধনে আজকের দিনের মানুষের চেয়েও অনেক বেশি বুঁদ হয়ে থাকতেন। এমনকি সৌন্দর্য পরিমাপের জন্য তাদের ছিল বিশেষ মানদণ্ড। সেসব নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের আত্মভোলা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে! আজকের দিনের যেকোনো ধরনের প্রসাধনীর চেয়ে উন্নত মানের প্রসাধনী ব্যবহার করতেন মিশরের রাণীরা।

নিজেদের আবেদনময়ী করার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন তারা। আজকের দিনের নারীরা নিজেদের চোখকে আকর্ষণীয় (স্মোকি আই) করার জন্য যে রকম সাজসজ্জা করে, প্রাচীন মিশরীয় রাণীরাও নিজেদের চোখকে আকর্ষণীয় করতে সুরমা ব্যবহার করতেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, চোখের চারপাশে ব্যবহৃত ভারী সুরমা তাদের চোখকে সূর্যের তীব্রতা থেকেও রক্ষা করতো। অর্থাৎ, সৌন্দর্য বর্ধন ছাড়া ব্যবহারিক কারণেও চোখে সুরমা ব্যবহার করতেন মিশরিয়রা।

শুধু সুরমা নয়, সব সৌন্দর্য সামগ্রী ব্যবহারের পেছনেই একটি ব্যবহারিক উদ্দেশ্য থাকতো তাদের। তাদের ব্যবহৃত মণি মুক্তাগুলোও ছিল শক্তি ও ধর্মীয় তাৎপর্যের প্রতীক। আবেদনময়ী ভঙ্গিতে থাকা মাটির একটি নারীমূর্তি থেকে বোঝা যায় গায়ে উল্কি আঁকতো প্রাচীন মিশরের নারীরা। নিজের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই এ ধরনের উল্কি আঁকতেন তারা।

 

জগৎবিখ্যাত পরমাসুন্দরী মিশরীয় দুই রাণী:-

 

প্রাচীন মিশরীয় সুন্দরীদের দুই বিখ্যাত রাণী ক্লিওপেট্রা এবং নেফারতিতি। এদেরকে বলা হয় ‘কুইন অব নীল’ বা নীল নদের রানী। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত রাণী ক্লিওপেট্রা হয়ে আছেন ‘সুন্দরীদের আদর্শ’।

১৯১২ সালে রাণী নেফারতিতির একটি চিত্রকর্ম আবিষ্কৃত হওয়ার পর সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বর্তমানে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে ওই চিত্রকর্ম। ধারণা করা হয়, ফারাও আখেনাতেনের স্ত্রী ছিল নেফারতিতি।

ক্লিওপেট্রার জীবনীকার এবং নেফারতিতির ওপর একটি গবেষণামূলক বইয়ের লেখক জয়সি টিলডেলস্লে জানান, প্রাচীন মিশরের ওই দুই রাণীকেই বর্তমানে আবেদনময়তার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্লিওপেট্রার চিত্র প্রমাণ করে, প্রাচীন মিশরের সব রাণীই ছিলেন অনন্য সুন্দরী। তবে ক্লিওপেট্রা ছিলেন এদের চেয়ে ব্যতিক্রম।

নেফারতিতি সম্পর্কে টিলডেলস্লে মনে করেন, তার বক্ষটি আর পাঁচটি মিশরীয় শিল্পকর্মের মতো নয়। এটা সম্পূর্ণ আলাদা। আর এ কারণে ১৯২৩ সালে যখন নেফারতিতির মূর্তিটি জার্মানিতে উন্মুক্ত করা হয়, তখন এটি হৈ চৈ ফেলে দেয়। নেফারতিতির বক্ষের সৌন্দর্যের কারণে বিশ শতকে গণমাধ্যমগুলোতে তিনি একজন তারকায় পরিণত হন।

 

ক্লিওপেট্রা:

প্রাচীন মিশরীয় টলেমিক বংশের এক কিংবদন্তি ছিলেন ক্লিওপেট্রা। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে হয় ক্লিওপেট্রার অসাধারণ রুপ সৌন্দর্য নিয়ে আসলে কি সে? মানবী নাকি দেবী? তাঁকে নিয়ে ইতিহাস লিখতে গিয়ে কল্পনা বিলাসিতাও করেছেন অনেকেই। তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়, বিলাসিতাপূর্ণ এবং মৃত্যু রহস্যে ঘেরা।

তাঁর জীবনীকাররা বলেন, ক্লিওপেট্রা ছিলেন নজরকাড়া  সুন্দরী। তাঁর ঠোঁট ছিল গোলাপের পাঁপড়ির ন্যায়,নাক ছিল সুউন্নত,আর চোখজোড়া ছিল অত্যন্ত মায়াময়। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল বীণার তারের ধ্বনির মতন।জীবনীকাররা আরও বলেন,স্বর্গের দেবতা প্লেটোর ছিল মাত্র চারধরণের তোষামোদকারী কিন্তু ক্লিওপেট্রার ছিল হাজারো ধরণের তোষামোদকারী। ক্লিওপেট্রা বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন। সেটা তাঁর চিত্রকর্ম এবং জীবনী পর্যালোচনা করলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

নেফারতিতি:

বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকেরা অধিকাংশ সময়েই নারীকে রহস্যময়ী বা ছলনাময়ী হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।  তেমনি কিছু কিছু নারীর বিভিন্ন কর্মকান্ড, জীবনযাপন যেন তাদেরকে আরো বেশি রহস্যময় করে তোলে। পৃথিবীর বাঘা বাঘা সব ঈজিপ্টোলজিস্টদের ঘুম হারাম করা এমনি এক রহস্যময়ী রমণী হলেন নেফারতিতি।

তাঁর পুরো নাম নেফার নেফারুআতেন নেফারতিতি। ইতিহাসের ভাষ্যমতে, তিনি ইতিহাসের এমনি এক রহস্যময়ী সুন্দরী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রমণী যে এর আগে তাঁর মত সুন্দরীর আগমন মিশরে ঘটেনি। নেফারতিতি শব্দের অর্থ হলো “সবচেয়ে সুন্দর ব্যাক্তির আগমন” ইংরেজিতে “The beautiful one has come” তাঁর আগমন থেকে শুরু করে প্রস্থান পর্যন্ত সম্পূর্ণ জীবনটাই রহস্যময়তার আচ্ছাদনে ঢাকা। মিশরীয় ইতিহাসে তাঁকে বলা হয় “Most important queen in the History of Egypt.”

মিশরীয় সভ্যতা ও অনিন্দ্য সুন্দরী [রয়েল ব্লাড আর অপরূপা ছিল বলে আজও তাঁর এত অহংবোধ!] পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সভ্যতা হচ্ছে মিশরীয় সভ্যতা। আর সেই রহস্যঘেরা সভ্যতার সবচেয়ে সুন্দরী রাণী মনে করা হয় নেফারতিতিকে। বলা হয় জগদ্বিখ্যাত ক্লিওপেট্রার চেয়েও সুন্দরী ছিলেন তিনি। আখেনাতেনের সঙ্গে নেফারতিতির প্রেম, তার সমাজ ও ধর্ম সংস্কার সর্বোপরি তার সৌন্দর্য এখনো অনেক রহস্যের কারণ। মিশর তো বটেই, গোটা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা সুন্দরীদের একজন মানা হয় নেফারতিতিকে। আর মিশরীয় সভ্যতার ‘সিগনেচার’ বা চিহ্ন হিসেবে পিরামিড আর মমির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এই সুন্দরীর আবক্ষমূর্তির ছবি বা প্রতিলিপি। এই ফারাও সম্রাজ্ঞীর প্রহলিকাময় আবক্ষমূর্তিটি সারাবিশ্বে প্রচণ্ড জনপ্রিয় এবং আগ্রহের বিষয়। মিশরের ফারাও সম্রাজ্ঞীদের মধ্যে এমনকি তখনকার মিশরবাসীদের মধ্যেও তাঁর রূপ ছিল কিংবদন্তির মত।

তথ্যসুত্র : অনলাইন

Page Sidebar