রহস্য চারিদিকে পর্ব—৩

Now Reading
রহস্য চারিদিকে পর্ব—৩

রহস্য চারিদিকে     পর্ব—-৩  [ পিরামিডের রহস্য কথা ] ——– সমগ্র পৃথিবীর অসংখ্য রহস্যের সঠিক উম্মোচন আজও কারও কাছে নেই । না বিজ্ঞান সঠিক ভাবে জানে,  না অনুসন্ধানকারী ব্যক্তি । রহস্যের বিচারে  মিশরের পিরামিডের নাম পড়ে  সর্বোচ্চ তালিকায় । প্রাচিন সপ্ত আশ্চর্যের একটি এই পিরামিড ।

great-pyramids-of-giza-seen-from-above.jpg

খ্রিস্টপুর্ব প্রায় ৫০০০ [পাঁচ হাজার]  বছর আগে নির্মাণ হয়েছিলো এই রহস্যময় মিশরিয় পিরামিডের । প্রায় ৭৫ টি পিরামিড আছে মিশরে । এবং আরও অসংখ্য আছে পৃথিবী জুড়ে ।

শুধু মিশরেই নয় পুরো পৃথিবীতে নির্মিত হয়েছে পিরামিড । মিশরের চেয়ে বেশি পিরামিড সুদানে আছে । মেক্সিকোর পিরামিডের বিষয়ে সবারই মোটামুটি জানা আছে ।

135627861.jpg

উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা ছাড়াও চীন, টিটিকাকা হ্রদের নিচে, জাপান সমুদ্র তলে এমনি আরও স্থান যা ভাবনার বাইরে এমন সব জায়গায় পিরামিডের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে ।

937f721864460c445daf9775e82d1e79--black-power-ancient-architecture (1).jpg

এখানে বিস্ময়কর ব্যাপার যেটা তা হোল পৃথিবীর নানা প্রান্তে একই আকৃতির স্থাপত্য নির্মাণ কি করে হোল । বিজ্ঞানীরা এর ব্যখ্যায় বলছেন, কালেক্টিভ কন্সাসনেস অর্থাৎ সামগ্রিক চেতনায় মানুষ এক রকম চিন্তা করে, তাই কাজও  একই রকম করে । সেটাই যদি সত্যি হবে আজকের যুগের মানুষরা  তাদের নির্মিত জিনিসগুলোর গঠন আলাদা আলাদা করছে  কেন ?

ফারাও রাজা খুফুর পিরামিডটি সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় । এটি গিজায় অবস্থিত ।

download (24).jpg

এটির উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট এর পরিধি প্রায় ৭৫৫ বর্গফুট ।

2005.jpg

গিজার চারটি পিরামিডই  সর্বাধিক সৌন্দর্যময় । এগুলো হোল —–  দ্য গ্রেট পিরামিড – দ্য খাফ্রা – পিরামিড অব মেনকাউরে – স্ফিংস ।   গিজার পিরামিডের আর একটি রহস্য, এটার অবস্থান পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে । হাজার হাজার বছর আগের মানুষ এটা কিভাবে জানল যে ভূখণ্ডের মধ্য অংশ কোনটি ?

গিজার তিন পিরামিড আর মেক্সিকোর তিন পিরামিডের সাথে ওরিয়ন নক্ষত্রের কোন সম্পর্ক আছে বলে ধারনা করা হয় ।  এই তিন টি পিরামিড ওরিয়নের  তিন টি নক্ষত্রের সাথে জুড়ে আছে ।

download (17).jpg download (16).jpg

এই দুই সভ্যতাই মানতো যে তাদের দেবতারা  ওই তিন তারা থেকেই এসেছে । যদিও এমন কোন প্রমান আজও মেলেনি যে এই দুটি সভ্যতা পরস্পরের সাথে যুক্ত ছিল বা পরিচিত ছিল ।  তখনকার মিশরীয়রা নিজেদের সূর্যের বংশধর ও দেবতা মনে করতো । তাই তারা বংশের বাইরে কাউকে বিয়ে না করে ভাই বোনকে বিয়ে করতো । সে সময় উন্নত সভ্যতাগুলো মিরামিড  নির্মাণকে যেন অবশ্যম্ভাবী কাজ মনে করতো । পিরামিড নির্মিত সভ্যতাগুলো অনেক উন্নত এবং বহু জ্ঞানের অধিকারী ছিল ।

images (42).jpg

পিরামিডকে এলিয়েন ও স্পেস শিপ এর সাথেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে । এই নিয়ে বহু মিথ ও আছে ।

পিরামিড নির্মাণের পেছনে মিশরের ফারাও বা উঁচু শ্রেণীর কোন ব্যক্তির কবর বা মমি রাখার কথা বলা হয় । কিন্তু আজ অবধি কোন একটি পিরামিডেও কোন মানুষের শবদেহ বা মমি মেলেনি ।  আজ পর্যন্ত যত মমি  পাওয়া গেছে সব  ভ্যালি অফ কিং থেকে মিলেছে । অনেকে বলেন যে চোরেরা চুরি  করেছে । সেটা মানা যায় না, চোর দামি বস্তু চুরি  করতে পারে কিন্তু শব বা মমি নিবে না ।  তারপরও বলা হয় যে এই পিরামিডগুলো মমি রাখার জন্যই তৈরি ।

মুলত পিরামিড কেন তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বহু কাহিনী  আছে । আর নানা মতামত  ছড়িয়ে আছে বিশেষজ্ঞদের ।  ২২ বছর ধরে ১ লাখ শ্রমিকের পরিশ্রমে খুফুর গ্রেট পিরামিডটি নির্মিত হয়েছে বলে ভাবা হয় । ৬০ টন ওজন আর ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের বিশাল সব পাথর খণ্ড জোড়া দিয়ে এটি তৈরি হয়েছিলো ।

images (47).jpg  images (49).jpgimages (48).jpg

নিখুত ভাবে কাটা এই পাথর গুলো দিয়ে বানানো পিরামিডের দুটি পাথরের মাঝে চুল পরিমাণও ফাঁকা ছিল না । দর দুরান্ত থেকে বয়ে আনা এমন বিশাল পাথর কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই নিখুত ভাবে কেটে ক্রমান্বয়ে উপরে তূলে কেমন করে এই স্থাপত্য তৈরি হোল তা আজও বিস্ময় । অনুমান ছাড়া কেউই জানেনা তার সঠিক ব্যখ্যা ।

প্রাচিনকালের মিশরীয়রা পরকালে বিশ্বাসী ছিল ।  এবং ভাবত মৃত্যুর পর যখন পুনরায় জীবিত হবে তখন যেন তাদের সকল আরাম আয়েশের ব্যাবস্থা তাদের কবরেই  মজুদ থাকে ।

images (44).jpg images (43).jpg

তাই তারা মৃতদেহকে মমি বানিয়ে রাখত । আর মমির সাথে দিয়ে রাখত জীবনের সকল প্রয়োজনীয় বস্ত । খাবার,  ধন সম্পদ,  মুল্যবান সামগ্রি, দাসদাসী । উঁচু শ্রেণীর ব্যক্তিরা তাদের সেবকদের মমির সাথে জীবন্ত দাফন করতো যেন পরবর্তী জীবনে কোন ক্লেশ পোহাতে না হয় ।

images (45).jpg

মমি তৈরিতে তখনকার মানুষেরা গোপন কোন রাসায়নিক বিশেষ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করতো বিভিন্ন ধাপে। বহুদিন ধরে এই কাজ চলতো ।  মমিকে সুগন্ধিতে ডুবিয়ে রাখত, ব্যান্ডেজে জড়িয়ে রাখত । আজও অজানা তার পদ্ধতি । এই আধুনিক যুগেও মানুষ জানে না সেই  রাসায়নিক ও প্রক্রিয়া গুলো ।

রহস্যময় পিরামিডের আর একটি রহস্য হোল এর অভিশাপ । ১৯২২ সালে ব্রিটিশ প্রত্নত্তবিদ  Howard Carter খুঁজে পান ফারাও তুতেন খামেন এর সমাধি ।

download (18).jpg

৩০০০ বছর পূর্বে মাত্র ১৯ বছর বয়সে  মারা যান এই বিখ্যাত  ফারাও রাজা তুতেন খামেন । তাকে নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে । এই সমাধি নিয়ে আজ পর্যন্ত অনেক গবেষণা হয়েছে কিন্তু সব রহস্যের সমাধান মেলেনি ।

images (51).jpg        images (53).jpg

এই সমাধি আবিস্কারের পেছনে যারা যারা ছিলেন তাদের সবাই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন । প্রথমে মশার কামড়ে ইনফেকশনে ১৯২৩  সালের ৫ এপ্রিল  মারা যান  Lord Carnaval । দ্বিতীয় জন Goerge A Bolt  ফ্রেন্স নদীতে ডুবে মারা যান, ১৯২৩ সালের ১৬ তারিখের মে মাসে । ১০ই জুলাই ১৯২৩ নিজ স্ত্রীর হাতে মারা যান Prince Ali Kamal Fahimi । ভুল চিকিৎসায় অন্ধ হয়ে ব্লাড ইনফেকশনে Lord Carnaval এর সৎ ভাইও  মারা যান ১৯২৩ সালের ২৬ তারিখে । পরের জন ছিলেন Wolf Jewel,  তিনি দক্ষিন আমেরিকার বিত্তশালী ব্যক্তি । তিনি  গুলিতে মারা যান, ১৩ই  নভেম্বার ১৯২৩ সালে । প্রখ্যাত রেডিয়োলজিস্ট  Sir Archibard Dougles fre এক রহস্যময় রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯২৪ সালের ১৫ই জানুয়ারিতে মারা যান  । সুদানের গভর্নর জেনারেল ছিলেন Sir Lee Star, তিনি মারা যান ১৯২৪  সালের ১৯ নভেম্বার এক আততায়ীর হাতে কায়রোতে । এছাড়াও আরও অনেকেই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরন  করেন বিভিন্ন সময় ।

সাধারণত পুরুষেরাই মিসর শাসন করেছিলেন । এদের মধ্যে অল্প সংখ্যক নারী ফারাও ছিলেন । দুর্দান্ত সাহসী এই নারীরা মিশরের ফারাও হিসাবে ছিলেন অদ্বিতীয় ।

হাতসেফসুত = তিনি ছিলেন ১৮ শতকের  পঞ্চম ফারাও রানী ।

images (39).jpg images (36).jpg

সিংহের গুহায় জন্ম নেয়া এবং ২২ বছর মিশর শাসন করা একজন চমৎকার ফারাও রানী ছিলেন তিনি । তিনি সিংহ পাশে নিয়ে বসতেন । শোনা যায় পুরুষের বেশ নিয়ে নকল দাড়িও লাগাতেন তিনি । নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামে গেলেই তার সম্পর্কে সব তথ্য জানা যাবে ।

নেফারতিতি =  আখমেননের সম্মানিত রানী ছিলেন তিনি । তার নামের অর্থ – ‘সুন্দর নারী আসছে’ ।

images (41).jpg

তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না । ধারনা করা হয় তিনি ফারাও এর কন্যা । আখেনাতেনের দূর কোন আত্মীয় অথবা বহিরাগত নারী । তার ৬টি কন্যা সন্তান হয় । কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার বা পরবর্তী জীবনের কোন প্রমান নেই । নেফারতিতি ও তার স্বামী নতুন কালচার ও বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন । তারা একেশ্বরবাদী ছিলেন । ধর্মীয় অনেক পরিবর্তন করেছিলেন । তার রাজত্বের ১২ বছর পর হটাতই  তিনি অদৃশ্য হয়ে যান । কোথায় গেলেন কেন গেলেন কেউ জানে না ।  তার অন্তর্ধানের অনেক সম্ভাবনা নিয়ে ভাবা হয়েছে । কিন্তু সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি ।

 

ক্লিওপেট্রা =  অত্যন্ত ইতিহাস বিখ্যাত বিতর্কিত মিশরিয় রানী ক্লিওপেট্রা । তার অসাধারন সৌন্দর্য, রাজনীতি, চাতুর্য, নির্দয়তা, রাজ্যলোভ ও প্রেম এর কারনে তিনি পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে আছেন ।

images (34).jpg images (35).jpg

৬৯ খ্রিষ্টপূর্বে তার জন্ম হয়  মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় । রাজত্ব পাওয়ার জন্য তিনি তার ভাই টলেমীকে মেরে ফেলেন জুলিয়াস সিজারের সহায়তায় ।

hqdefault (1).jpg

রোমের রাজা জুলিয়াস সিজারকে আপন সৌন্দর্য জালে আবদ্ধ করেন । হয়ে যান মিশরের রানী ।  পরবরতিতে তার ছোট ভাই এবং বালক রাজা ও ছোট বোনকে হত্যা করেন রাজত্বের জন্য । মিশরের পর এবার রোমের রাজত্ব পাবার জন্য যুদ্ধবাজ রানী  ক্লিওপেট্রা  সিজারের সেনাপতি আন্টনিও কে বিয়ে করে এবং তাকে দিয়ে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করে রোম সাম্রাজ্যের রানী হওয়ার জন্য । এদিকে সিজার এর পুত্র ওকটাভিয়াস সিজার এর সাথে ক্লিওপেট্রার যুদ্ধ হয় ।

download (21).jpg

যুদ্ধে ক্লিওপেট্রা হেরে গিয়ে অজ্ঞাতবাসে চলে যায় । সেখানেই তার মৃত্যু হয় । তার মৃত্যু নিয়ে জনশ্রুতি আছে । সেগুলো হোল — ওকটাভিয়াসই ক্লিওপেট্রাকে মেরে ফেলে, ক্লিওপেট্রা হতাশায়  অধিক মদ্যপানের কারনে মৃত্যু হয়  অথাবা সাপের কামড়ে মৃত্যু । মৃত ক্লিওপেট্রাকে যখন পাওয়া যায় তখন তার শরীরে সাপ জড়ানো  ছিল । কিন্তু আসলেই কিভাবে এই অপার সৌন্দর্যের অধিকারী রানী ক্লিওপেট্রা মারা যায় তা আজও অজানা এক রহস্য ।

the-death-of-cleopatra-1899-louis-marie-baader-1828-1920-france-french-fegwm1.jpg

 

এছাড়াও কিছু রানী যারা ইতিহাস বিখ্যাত তারা হলেন- রানী আনোকসুনামুন । যিনি  ছিলেন রাজা তুতের স্ত্রী, রানী নেফারতারি তিনি  ছিলেন ফারাও রামেসিস ২  [ দ্বিতীয় ] এর স্ত্রী ।,

 

 

 

 

 

 

 

সেলিনা জান্নাত

ঢাকা-রচনাকাল

©২২/০৭/২০১৭ইং