“ ইউটিউবে ” অজ্ঞ আর মূর্খ নির্মাতাদের হিড়িক

Now Reading
“ ইউটিউবে ” অজ্ঞ আর মূর্খ নির্মাতাদের হিড়িক

Screenshot - 5.jpgScreenshot - 5_2.jpgScreenshot.jpg

মানুষের প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে তার মনের খোরাক বা স্বস্তির জন্য বিনোদনের দরকার হয়। তাই স্বভাবত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সর্বদা রুচিশীল কিছু বেছে নেবে এটা স্বাভাবিক। যখন গ্রামোফোন বা রেডিওতে মানুষ গান শোনে মনের খোরাক মেটাত তখন গান ছিল কেবল শ্রবণের বিষয়।এখানে যে ইন্দ্রিয়সুখ বা কানে যে আরাম বোধ হত তা দীর্ঘসময় স্থায়ী হত। তখনকার গানে মনযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না।তখন শিল্পীর সাথে শ্রোতার একটা আত্মার সম্পর্ক হতো তাকে অনুধাবণ করতো বা করার চেষ্টা করতো।

আমাদের চারপাশে যখন প্রযুক্তির উন্নয়ন হতে লাগল তখন বহুমাত্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা দ্রুত আমাদের আবেগ অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করার চেষ্টা করতে লাগলাম।

এখন আপনি যদি কাউকে প্রশ্ন করেন গান বলতে তার কাছে আসলে ধারণাটা কি ? আপনি বক্তার কাছ থেকে সোজা কথায় উত্তর পাবেন গান বলতে মূলত এখানে কিছু ভিজ্যুয়াল থাকতে হবে ।কোন গীতিকার কি বলল না বলতে চাইল তা ধীরে ধীরে শুনে বোঝার সময় বা কোথায় ? পারিপার্শ্বিকতায় আমরা বেগবান ছুটে চলছি নিরন্তর কোন এক অজানা গন্তব্যের পানে।

মোটের উপর বর্তমান সময়ে গান বলতে যা বোঝায় তা হল সোজাসাপ্টা পারিভাষিক ভাষায় মিউজিক ভিডিও। এখানে গানের মর্ম বা কাহিনি বোঝার জন্য বিন্দু মাত্র চিন্তা করতে হবে না। এই গানে এক বা একাধিক ক্যারেক্টার থাকবে যাদের গতিবিধি আপনাকে গানের বা গানের মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে যে গল্প বলার চেষ্টা করেছে তার কাছে নিয়ে যাবে।

এখন দর্শক হিসেবে আপনার কাজ কি হতে পারে ?

হ্যাঁ… সত্যিই তো ! আপনি শুধু ভিডিও দেখে যাবেন। আপনার মস্তিষ্ক আপনাআপনি গ্রহণ করে ফেলবে গীতিকার বা গায়কের সমস্ত ভাষ্য। গানের বিষয়টা যে শ্রবণের মাধ্যমে উপলব্ধির একটা যোগসাজেশ আছে তা আমরা ভুলতে বসেছি। বিশ্বায়নের প্রভাবে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ইউটিউবের মতো মাধ্যমগুলো পৌঁছে যাওয়ায় এই বিষয়টা একটা ব্যাপক প্রসার পেয়েছে।

আমাদের দেশীয় সঙ্গীতের অঙ্গন জুড়ে বিশাল একটা প্রভাব রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের সৃষ্টিকর্মের।আধ্যাত্মিক গান আর বাউলের চর্চা যে হয় না তা কিন্তু না। এইসব কিছুর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার টানে নির্মিত গানগুলো এখনো শুনতে ভাল লাগে।তাই সঙ্গীতপ্রেমী সকলের হৃদয়ে দেশমাতৃকার একটা স্থান রয়েছে।

দেশে স্যাটেলাইট চ্যানেল আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদেরকে বিদেশী সঙ্গীতের সাথে পরিচিত করেছে।স্বাধীনতা পরবর্তী প্রজন্ম বাংলাদেশী আবহে ব্যান্ডসঙ্গীতের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিদেশী ঘরানার আলোকে গানের ক্ষেত্রে শোনার চেয়ে দেখার বিষয়টা যেন প্রাধান্য পেল।

একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করি দেশীয় মিউজিকের প্রতি ভাললাগা থেকে একটা সময়ে নিয়ম করে বর্তমানে নির্মিত মিউজিক ভিডিওগুলো দেখতে বসতাম। একদিন টিভি দেখতে গিয়ে আনমনে বসে আছি এইসময় পাশে এক ছোট বোন এসে বলতে লাগল ভাইয়া… এগুলো কি দেখছো বসে বসে? এই গানগুলোতে হয়তো নায়িকা মারা যাবে নয়তো নায়ক মারা যাবে। কথাটা শোনার পর একটু খেয়াল করে দেখলাম আসলেই বিষয়টা তো সত্যি। এখানে বিয়োগান্তক পরিণতি দাঁড় করিয়ে দর্শক ধরে রাখার একটা প্রচেষ্টা চলছে। কয়জন লোক মিউজিক ভিডিও দেখার সময় গান মনযোগ দিয়ে শোনে ?

বর্তমানে প্রচলিত ধারায় আধুনিক শিল্পীরা তাদের গানের সিডি বা ডিভিডি প্লেয়ার বের করতো। ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগ তো শেষ হলো বলে। এখন মানুষের কাছে সিডি বা ডিভিডি প্লেয়ারের গান বাজানোর সময় বা সুযোগ নেই বললে চলে। তাই এখন শিল্পীরা এক ধাপ আধুনিক হয়ে গানগুলোকে অনলাইনে বা ইউটিউবে আপলোড করে, যেখান থেকে সরাসরি তা দর্শকের নাগালে যাচ্ছে।

আপনি হারমোনিয়াম আর তবলার ছন্দে সুর মিলিয়ে করা গান শোনে যে নীরেট আনন্দ পাবেন তা অন্য কোথাও পাবেন বলে মনে হয় না।

আধুনিক প্রযুক্তির আরো একটি মাধ্যম যা কিনা সঙ্গীতে বিরুপ বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলল তা হল অটো টিউনার নামে একটি সফটওয়্যার। যার কল্যাণে যে কেউ আজকাল বেসুরো গলায় গান তোলে হরদম গেয়ে যাচ্ছে। ইউটিউবে আপলোডের যে নিয়ম তার উপর অটো টিউনার সব মিলিয়ে গানের স্বকীয়তার উপর একটা কালো থাবা যেন বসে আছে।

মানুষ তো অনুকরণ প্রিয় তাই তারা নিজেদের মধ্যে একটা কৃত্রিম দ্বন্ধ আর শো-অফ করার প্রথা নিয়ে আসে। যেখানে আপনাকে শিখে গান করতে হবে সেখানে যদি আপনি প্রযুক্তির সহয়তায় কিছু একটা ফলপ্রসু করেন তা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই এই যে সঙ্গীত বিষয়টি মূলত শেখার এবং চর্চারও বিষয়।

ইউটিউবে অজ্ঞ আর মূর্খ মিউজিশিয়ানদের দৌরাত্ম্য বলতে যা বোঝাতে চেয়েছি তা হল আপনি যদি কোন কাজে দক্ষ না হয়ে করবেন তা কোন অর্থে ভাল প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে না।

তাছাড়া ইউটিউব এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদৌলতে মিউজিক ভিডিও নির্মাণ এবং প্রচার কৌশল একটি শিল্প হয়ে গেছে। এই শিল্পের বিশাল এক দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হয়ে আছে। এখন শুধু বাস্তবায়ন করা দরকার সঠিক পরিকল্পনার।

 

ইউটিউবে চ্যানেল চালু এবং তা ব্রডকাস্ট করার পদ্ধতি অনেকটা সহজ হওয়ায় এই দৌরাত্ম্য বেড়ে চলছে। এখন কোন প্রচারিত গান বা যে কাউকে দিয়ে যুতসই ভাবে অটো টিউনারের সাহায্যে একটা গান গাইয়ে নিল।

ব্যস কেল্লাফতে…………..

এইসব অজ্ঞ নির্মাতারা  এমন অযাচিত কিছু করে যা কোন সৃজনশীল দর্শক যদি উপভোগ করতে যায় তার রুচিবোধ দ্বিধাগ্রস্থ হবে। যেকোন লোকেশনে শ্যুটিং করা,গল্প বলার ধরণ এক আর দৃশ্য উপস্থাপন হয়তো অন্যকিছু। কাস্টিং,কস্টিউম,লোকেশন,সেট সহ নানান আনুষাঙ্গিক জিনিস যা কিনা একটা মিউজিক ভিডিওকে বাহ্যিকতায় পরিপূর্ণ করে তোলে।বর্তমানে ইউটিউবে প্রচারিত গানগুলোতে এসব বিষয়ের প্রতি বাড়তি কোন নজরদারি বা যত্ন নেই বললে চলে। দেশে প্রচারিত কোন গান বা প্রচলিত গানের অনুলিপি বা হুবুহু কপি যখন ইউটিউবে অন্য কোন ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ড বা মূল থিম হিসেবে ব্যবহার করা হয়,তখন সার্বিক অর্থে কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করা হয়।আমাদের দেশের শিল্পীরা এই বিষয়ে নির্বাক কেননা তারা সস্তা প্রচারে বেমালুম খুশি হচ্ছে। মুলত এই অপিরপক্ক নির্মানশৈলী মোটের উপর দেশীয় সঙ্গীত বা মিউজিকের ব্যানারে ইউটিউবের মতো আর্ন্তজাতিক প্লাটফর্মে প্রতিনিধিত্ব করে।এটা প্রকরান্তরে লজ্জার বটে।

আপনি স্ক্রলে Bangladeshi music video  লিখে সার্চ দিলে ভাল গুটিকয়েকের সাথে বস্তাপচা কিছু জিনিস আপনার স্ক্রীনে দেখাবে।এখন কোন ভিনদেশী যদি বাংলা গানের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে এইসব বস্তাপচা বা নিম্নমানের নির্মাণশৈলী দেখে, তবে প্রথমত দেশীয় সঙ্গীতের উপর একটা নেতিবাচক প্রভাব জন্ম নেবে ঐ  দর্শকের মনে।

এমনটাই স্বাভাবিক……

আপনি ইউটিউবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো চ্যানেল দেখতে পাবেন যাদের অনেকে স্বত্তাধিকারীর নেই ভার্চুয়ালজগত সম্পর্কে কোন বাস্তবতাসম্পর্কিত জ্ঞান। এখানে নাবালক ছেলে মেয়ে দিয়ে এডাল্ট টপিক্স বা  কনটেন্টগুলোর ভিডিও নির্মান করা হয়,যা কিনা তরুণ প্রজন্মের জন্য নেতিবাচক একটা প্রভাব তৈরি করবে।

ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর অবাধ ব্যবহারের ফলে এই ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। আপনার কাছে একটা মোটামুটি ভাল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা আর এডিটিংয়ের জন্য একটা কম্পিউটারর প্যানেল আছে,তার মানে এই নয় যে আপনি যা কিছু বানাবেন আর উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে তা পুরো বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ব্যানারে রিপ্রেজেন্ট করবেন!!

এই বিষয়গুলো যত ক্ষুদ্র বা নগণ্য মনে হচ্ছে বাস্তবিক অর্থে এই বিষয়গুলো বা কর্মকান্ডের যে নেতিবাচক প্রভাব তা দীর্ঘমেয়াদে অনেকটা প্রকট হবে।

তাই আমাদের এই শিল্প সংস্কৃতি বিকাশের নামে এই ধরনেরে বাহুল্যতা বা স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এইসব কিছুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং শিল্প সুরক্ষা আইনে এই বিষয়গুলো কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ভবিষ্যতে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য সুরক্ষিত একটা প্লাটফর্ম হতে পারে ইউটিউবে মিউজিক ভিডিও প্রমোশন বা প্রচার।।