মহাকাব্যিক “সেলফিনামা ”একাত্মতা ও সার্বজনীনতার প্রতীক

Now Reading
মহাকাব্যিক “সেলফিনামা ”একাত্মতা ও সার্বজনীনতার প্রতীক

আপনাকে একটা প্রশ্ন করি ? না… না… আমার সকল পাঠকের কাছে রইল এই খোলা প্রশ্ন আপনি কখনো আপনার নিজেকে আয়নায় দেখেছেন বা দেখতে চেয়েছেন ?অবশ্যই;

কোন না কোনসময় চেষ্টা করেছেন আসলে আপনি কতটুকু সফল তার জবাব আপনার কাছে আছে তাই না? আপনি যদি এখনো চেষ্টা না করেন তবে অবশ্যই একবার চেষ্টা করে দেখবেন ।এই ব্যস্ততার দৌড়ে আমরা নিজের জন্য সময় বরাদ্দ রাখি না বললেই চলে।

আমাদের দৌড়ের একটা আলটিমেট লক্ষ্য থাকে যা পূরণে সদা তৎপর বলা চলে। মানুষ নিজের স্বকীয় স্বত্তার সাথে স্বীয় জগতে কিছু সময় কাটায়। এখানে কেউ চরম মাত্রায় হিংসুক আবার কেউ পরম দয়ালু। এই যে চরিত্রের ভিন্নতা তা আপনি আমি বাইরে থেকে  অবলোকন করতে পারব না। মানুষ নিজের অবয়ব বা প্রতিবিম্ব দেখার জন্য আয়না বা দর্পণের আবিস্কার করেছে।আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন অনেক সময় আমরা দেখি একবারে আনমনে আয়নায় নিজেকে অবলোকন করে যায় কেউ কেউ তখন নিজের চোখের সাথে একটা দ্বন্ধ শুরু হয়, চোখের সাথে দ্বন্ধের কারণে নিজেকে তো ভাল করে দেখা হয় না ।কেবল রুপচর্চা বা পরিচর্যার জন্য আয়নার ব্যবহার হয় না।

নিজেই নিজেকে দেখার যে একটা সুপ্ত বাসনা তা মানুষের চারিত্রিক গুণ বলা যায়।মূলত এই ধরনের চেষ্টা হতে প্রথম সেলফি নেয়ার যে ধারা তা চালু হয়। এই যে সেলফির সুত্রপাত মূলত ৮০ দশকের দিককার ঘটনা। ক্যামেরায় নিজেই নিজের ছবি নেয়ার যে প্রচেষ্ঠা তা ভার্চুয়াল জগতে মূলত সেলফি তোলার প্রথা বলে সম্যক পরিচিতি লাভ করে।

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে সেলফোনের বহুবিধ কল্যাণ আর স্থিরচিত্র নির্ধারণের নানান প্রযুক্তির প্রভূত কল্যাণ মানুষকে আরো আগ্রহী করে তোলেছে সেলফির প্রতি। এটা কেবল প্রচলিত একটা ট্রেন্ড বললে ভুল হবে কেননা এর মধ্যে দিয়ে নিজের প্রতি একটা ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হয়।

প্রথমদিকে সেলফি তোলার যে প্রবণতা তা যখন বাড়তে থাকে তখন নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়, প্রথমত মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে ।এই সময়ে নিজেকে একাকী উপস্থাপনের একটা রীতি চালু হয়ে যায়। যেকোন অবস্থানে বা স্থান,কাল,পাত্রভেদে এই সেলফি জনপ্রিয় হতে থাকে। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন প্রথম দিককার অধিকাংশ সেলফিতে মানুষ নিজেকে একা উপস্থাপন করতে যেন বেশ স্বস্তি পেয়ে আসছিল। এই তো গেল মানুষের আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা তারপরে যেটা আরো বড় করে দেখা দিল তা খোদ তরুণীদের মধ্যে এই সমস্যা প্রবল আকারে দেখা দিল।

সেলফিতে নিজের সাবলীল উপস্থাপন বা সুন্দর ছবির জন্য তারা চিকিৎসকের কাঁচির নিচে যেতে কুন্ঠাবোধ করল না। একটা পরিসংখ্যানে দেখা যায় সেলফির প্রচলনের পর থেকে অধিকাংশ তরুণী যারা মুখে সার্জারি করেছে তাদের অধিকাংশের অভিযোগ ছিল তাদের মুখের অবয়ব সেলফিতে ভাল আসে না,তাই তারা এই পন্থা বেছে নিয়েছে। এটা মানুষের কৌতুহলী প্রচেষ্ঠা মিটাতে গিয়ে একটা ভিন্নমাত্রার প্রচেষ্ঠা বলা যেতে পারে।

এই সমস্যার বাইরে গিয়ে যে সমস্যা প্রকট রুপ ধারণ করল তা হল ভার্চুয়াল জগতে নিজের সেলফির মাধ্যমে একটা শো – অফ করার ট্রেন্ড চলে আসল। এই সময়ে আপনি কোন এ্যাঙ্গেল বা কোন ব্যাকগ্রাউন্ড পিছনে রেখে ছবি তুলছেন তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়ে আসছিল আসলে আপনি সেলফিটা ঠিকমতো তুলেছেন কিনা,নয়তো ষোলো আনাই বৃথা।

এইসব সেলফিতে আতিশয্যে যেমন ছিল তেমনি বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দেয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল বৈকি। এই যেমন কবরস্থানে শুয়ে কিংবা বসে,অসুস্থ দাদা-দাদীকে নিয়ে সাথে চটকদার ক্যাপশনের বাহার।এমনকি কোরবানির ঈদের সময় কোরবানি করা পশুর সাথে যে নানা অঙ্গভঙ্গিতে সেলফি আমরা দিয়ে এসেছি তা দ্বারা কোন না কোনভাবে নিজেকে প্রকাশের চেয়ে নিজের হীনমন্যতার বাড়তি বিজ্ঞাপন করে এসেছি বরাবর।এই যে অযাচিত কিছু সেলফি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমরা দেখেছি তার কিছু কিছু ভাইরাল হয়েছে। নানান মানুষের নানান মত যেমন সেলফির বাহারও তেমন কেননা ক্যাপশন দেখে যাই বোঝা বিফোর শাওয়ার্…. আফটার শাওয়ার্ ….এখানে গোসলের চেয়ে সেলফি মুখ্য। এট এক্সাম হল নতুবা আফটার এক্সাম ….পরীক্ষার চেয়ে সেলফির ক্যাপশনে মনযোগ বেশি ছিল। বাসে বা ট্রেনের সিটে কিংবা চলন্ত ট্রেনের ছাদে নয়তো লঞ্চের ডেকে বসে এমনকি চলন্ত রিকশায় বসে মানুষকে সেলফি নিতে দেখা যায়। একে তো ছিল বাহুল্যতা বা লোকদেখানোর প্রচলন যেটা কিনা একসময়  ট্রেন্ড বনে যায় তবে তা  ভয়ানক সুন্দর ছিল।

সেলফি নিতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে,ব্রীজ হতে পড়ে, গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে, চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় কিংবা বিদ্যুৎস্পৃস্ট হয়ে মারা গেছে প্রায়ই অনেকে।এটা আমাদের সাবধান হওয়ার জন্য যথেষ্ট বলা চলে। এটা নিছক ছেলেমানুষী বা জীবনের প্রতি উদাসীনতা বা অবহেলা ছাড়া আর কিছু না।

বর্তমানে আপনি দেখবেন সেলফিতে নিজেকে একা দেখানোর মানসিকতা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। আমি বলব একাকীত্মকে ভুলে সার্বজনীন হচ্ছে। আপনি হারহামেশাই দেখবেন সেলফি নিতে গিয়ে সবাই দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এটা ভাল দিক, কি বলেন ? আপনি সেলফি তুলতে যাবেন কিন্তু ছবিতে ভাল এক্সপ্রেশন দিতে পারবেন না এখানে আপনার স্মার্টনেসের পারদ উঠানামা করবে। বিশেষত মেয়েদের মধ্যে এটা নিয়ে নিয়মিত স্নায়ুযুদ্ধ চলে,এই বিষয়ে বিশারদেরও কিন্তু দেখা মিলবে।

সেলফি এখন শুধু নিজেকে বা বন্ধুসঙ্গকে প্রকাশের মাধ্যম বলে ব্যবহার হয় না । এই ফ্রেমে স্থান পাই পরিবার,পরিজন,ভালবাসার সহ সকল শ্রেণীর মানুষ।

বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠিত তারকা বা সর্বজনবিদিত ব্যক্তিত্ব যাই বলুন না কেন সবাই জনসম্পৃক্ততার জন্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় এই সেলফিকে।সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে মিডিয়াগুলো নানান প্রচারণার কৌশল হিসেবে সেলফিকে অর্ন্তভুক্ত করে নেয়।

সমাজে বসবাসরত একজন হিসেবে নিজের স্বকীয় কোন ফ্রেমে অন্য কাউকে অংশীদারীত্ব দেয়াটা অবশ্য ইতিবাচক দিক।সমাজ বিজ্ঞানীদের ব্যাখায় সেলফি ও সেলফি যারা তোলে তাদের সম্পর্কে বিশদ ব্যাখা রয়েছে। তবে ভার্চুয়াল দুনিয়ার ভাইরাল কোন ট্রেন্ডের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চান সেলফি তুলে যান। সেলফির যে প্রথা বা ধরণ তা কোনভাবেই যেন আত্মঘাতী  না হয়।

নিজের সকল প্রকার অনুভূতির প্রকাশের জন্য নিজের স্থির চিত্রের চেয়ে যখন হাস্যেজ্বল অবয়ব প্রাধান্য পাই তখন তা প্রকরান্তরে নিজের সুখী মানসিকতাকে বাহ্যিকতায় পরিস্ফুটিত করে তোলে।

প্রচলিত আছে ..ছবি নাকি কথা বলে ।অদূর ভবিষ্যতে হয়তো আমাদের কাটিয়ে আসা অতীত স্মৃতির করিডোরে পদাচারণায় আমাদের সঙ্গী হবে এই বহুামত্রিক সেলফিগুলো।

আমরা একাকীত্মের বেড়াজাল ভেঙ্গে সার্বজনীনতায় নিজের সুখ বা দুঃখকে ভাগাভাগি করি হোক না সেটা সেলফি দিয়ে শুরু……………..