আত্মকথা

Now Reading
আত্মকথা

“ছোটবেলা থেকে মাকে দেখতাম ঘরের সব কাজ করে একা নিজের রুমে বসে বসে কাঁদতেন। বুঝতামনা তখন। শুধু মায়ের চোখের জল মুছে গালে চুমু খেয়ে বলতাম আমি তোমার সব কাজ করে দেব মা কান্না করনা ! মা কিছু না বলেই শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে আরো কেঁদে ফেলতেন।

প্রায়ই স্কুল থেকে ঘরে ফিরে দেখতাম বাবা মাকে মেঝেতে ফেলে চড় লাথি মারছে, চুল ধরে মারছে ! আমি ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতাম তখন বাবা আমাকে থামাতে মাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত কারণ প্রতিবেশী জেনে যাবে বাবার অত্যাচারের কথা।

তবু মাকে দেখতাম বাবার মাথা টিপে দিতে, কখনও পাঁ টিপতে, কখনও বাবাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে, বাবার পছন্দের খাবার বানাতে…। বাবাকে খুশি করতে, বাবার একটু ভালবাসা পেতে মায়ের কত প্রচেষ্টা ছিলো! কিন্তু বাবাকে মায়ের প্রতি ভালবাসাতো দূর একটু সদয় আচরণ করতেও সহজে দেখিনি। শুধু দুটি কারণে মায়ের প্রতি বাবার খুব সদয়ভাব বা আদিখ্যেতা দেখতাম। এক, যখন প্রতিবেশী বা আত্মীয় স্বজন নেমন্তন্নে আসতেন এবং দুই, যখন মা নিজের সমস্ত গয়না বাবার হাতে একটু একটু করে তুলে দিতেন।

এত অত্যাচারের পরেও মা কোনদিন বাবাকে বা আমাদের ছেড়ে যাননি ! বড় হবার পরে সহ্য হতনা মায়ের কষ্ট ! মাকে বলতাম , মা ঐ লোকটাকে সহ্য হয়না ! তুমি কিকরে সহ্য করো ? এই লোকটার থেকে দূরে কোথাও চলে যাই চল ! রোজ তোমার কষ্ট দেখতে আর ভাল্লাগেনা মা !

মা বলতেন, কিকরে ছেড়ে যাই ওকে ! ভালবেসে তার হাত ধরে চলে এসেছিলাম ! তাছাড়া সেই ছোটবেলায় বাবা মা মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের সংসারে খুব কষ্ট আর নানা অবহেলায় ঘরের কোণে পড়েছিলাম। তবে কার কাছে যাই আর কিকরেই বা যাই রে মা ! বাবা মা যার ছোটবেলায় মারা যায় তাঁর সারাটা জীবনই দুঃখ, কষ্টে কাটে মা ! শুধু তোকে ভাল একটা বিয়ে দিতে পারলেই আমার সব কষ্ট মুছে যাবে।

এই বলেই মা আবার সেলাই মেশিনে বসে গেলেন। এই করেই মা আমাকে খুব যত্ন আদরে একটু একটু করে বড় করেছেন। নিজে ভাল কোন কাপড় পরেননি, ভাল খাবার খাননি সব আমার জন্য যোগাড় করে রেখে দিতেন। নিজ হাতে কত সুন্দর করে আমার জন্য জামা বানাতেন ! কত সাজিয়ে দিতেন ! আর সবসময় কপালে, মাথার শিথিতে চুমু খেতেন…। মায়ের কথা ভাবলে অন্যমনষ্ক হয়ে যাই বাকরুদ্ধ হয়ে খোলা আকাশে খুঁজে ফিরি মাকে ! কিন্তু চোখের কোণে জলের কোন অস্তিত্ব অনুভব করিনা !

স্পষ্ট মনে আছে এইতো সেদিন, তখন আমি সবে ক্লাস এইটে পড়ি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, মা মেঝেতে পড়ে আছেন ! মুখ থেকে কেমন ফ্যানা বের হচ্ছে ! মায়ের পাশে বাবা বসে কাঁদছে আর বলছে,

  • তোর মা বাথরুমে পড়ে গেছে আমি তাঁকে তুলে আনতেই দেখি অজ্ঞান হয়ে গেছে ! এত ডাকলাম সেবা করলাম কিন্তু আর চোখ খুলে তাঁকালোনা তোর মা !

বাবার কান্নায় ততোক্ষণে পাড়া প্রতিবেশীর ভিড় জমে গেছে বাড়িতে। আমি মাকে জড়িয়ে কত ডাকলাম কত চেষ্টা করলাম মাকে সজাগ করতে কিন্তু মা আর সজাগ হননি ! আমাকে জড়িয়েও আর ধরেননি !

মায়ের শেষ গোসলের সময় শুনছিলাম কানাকানি করছিলো মহিলারা ! বলছিলো মায়ের গলায় কালো দাগ আর গলাটাও বেশ ফোলা ! আর মায়ের তলপেটে ক্ষতচিহ্ন ছিলো !

আমি বুঝতে পারিনি তবে এখন বুঝেছি। মাকে খুব কষ্ট আঘাত দিয়ে মারা হয়েছিলো।

কিন্তু মাতো বলেছিলো তাঁর নামে যে কোটি টাকার সম্পদ নানাভাই রেখে গিয়েছেন সেই সম্পদের কিছু অংশ বাবাকে দিয়ে দেবেন তবে কেন মাকে মেরে ফেললো বাবা ? কত কেঁদেছি, না খেয়ে তবু কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারিনি ! কত প্রশ্ন ছিলো কঁচি মনে কিন্তু জবাব খুঁজে পাইনি !

জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা হল যাতে আরো অনেক কিছু বুঝে গেছি। বাবা যখন সুন্দরী এক বড় লোকের মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুললো আর আমাকে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করার সব ব্যবস্থাও করে ফেললো !

প্রথমে বাবা পড়াশুনার খরচ পাঠাতো কিন্তু পরে আস্তে আস্তে কমে গেল টাকার পরিমাণ ! কিকরব ভয়ে টাকা চাইতে সাহস পেতামনা ! কারণ কেউ না জানলেও আমি জানি আমার মাকে বাবা অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে ! তারপর টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাতে লাগলাম। কলেজ ছুটিতে বাড়ি যেতাম কিন্তু জলদি চলে আসতাম ! বান্ধবীদের বাড়ি প্রায়ই গিয়ে থাকতাম !

আমার মামা খুব বড়লোক। কিন্তু কোনদিন মায়ের খোঁজ নেননি ! আমিও তাঁকে কোনদিন দেখিনি। তাঁকে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পাঠানো হয়েছিলো কিন্তু সে নাকি তখন দেশের বাইরে ছিলো তাই আসতে পারেননি শুনেছি ! কিন্তু আর কোনদিনই সে আসেননি। মা হারা অসহায় আমার খোঁজও কোনদিন নিতে চেষ্টা করেননি। হয়তো দায় এড়িয়ে গেলেন !

অনেক কেঁদেছি মাকে ভেবে ! মায়ের ঘরে মায়ের গন্ধ শুকেছি, মায়ের আদর খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি … হায় পোড়া কপাল ! এখন চোখের সব জল শুকিয়ে গেছে। অন্তরের দহনে পুড়ে খাঁক হয়ে গেছে সমস্ত মায়া, ভালবাসা ! চোখে জল নেই শুধু পুরুষ নামের এই কাপুরুষ পশুদের জন্য ঘৃণা আছে !

খুব অল্প বয়সেই জীবন যুদ্ধ শুরু করলাম ! এ যেন বাঁচার কঠিণ এক লড়াই ! টিকে থাকার লড়াই ! এই লড়াইয়ে হয় জিতবো নয় হারবো !জিতলে বাঁচার মতন বাঁচবো আর হারলে একবারে মরে যাবো সিদ্ধান্ত নিলাম ! তাছাড়া ঐটুকু বয়সে মা হারিয়েছি, বাবার অবজ্ঞা অবহেলা আর স্বার্থপরতা দেখেছি ! আমার আর কে আছে ? জীবনের প্রতি মায়া করার তেমন কোন পিছুটানও নেই ! কারো প্রতি কোন মায়া টান অনুভব করিনা !

আমার এতিম মা টা বড্ড বেশী লক্ষী আর বোকা মেয়ে ছিলো তাই অত্যাচার সহ্য করতে করতে মরেই গেলো ! কিন্তু আমি ঐ নোংরা নিষ্ঠুর কাপুরুষদের হাত, পাঁ ভেঙে দেব ! পঙ্গু করে দেব ঐ পশুদের !”

মা হারা এক মেয়ের আত্মকথা ছিলো এগুলো।

কোন এতিম সন্তানের আহাজারি আর আক্ষেপ কান পেতে কখনও কি শুনেছি ? কেন তাঁর চোখে কখনও এত মায়া আবার কখনও এত তীব্র জ্বালা?

তাঁর কন্ঠে কখনও করুণ আর্তনাদ কখনও বেরসিক কর্কশ আওয়াজ !

সাইকো গল্প: গুপ্তঘাতক!

Now Reading
সাইকো গল্প: গুপ্তঘাতক!

“এই ছাড়ো এখন, অফিসে যাবেনা নাকি আজ! নাস্তা বানাতে হবে তো।”
    সুহাস কে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসলো প্রীতু। চুলগুলো পেছনে টেনে নিয়ে খোঁপা করে শাড়িটা ঠিক করে নিবে তখনই আবার প্রীতুকে নিজের দিকে টানলো সুহাস।
 
“থাকুকনা, আজ নাস্তাটা ক্যান্টিনেই করে নেবো। আর একটু থাক।”
 
“হু, বাইরে থেকে খেয়ে খেয়ে আবার গ্যাষ্ট্রিক বাঁধাতে হবেনা তোমার। যাও গোসলে যাও,আমি এক্ষুনি চট করে নাস্তাটা বানিয়ে নিই।” সুহাসকে গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিলো প্রীতু। জানলা দিয়ে সূর্যালোক ঢুকছে অল্পস্বল্প, তারই ফাঁকে পাশের বাসার ঝুমা আন্টির ফুলের টব টা দেখতে পেলো প্রীতু। তখনই একটা কথা মনে পড়লো ওর, “এই জানো, ঝুমা আন্টির সাথে কথা হচ্ছিলো কাল। আহারে! কি কষ্ট মহিলাটার। লোকটা নাকি প্রতিদিন ড্রিংকস করে আসে!
আমি নিজেও তো দেখলাম সেদিন লোকটার নজরও ভালোনা, কেমন নোংরা চোখে তাকাচ্ছিলো!”
 
প্রীতুর কথা শুনতেই একটু শক্ত হলো সুহাসের চোয়াল।
“ওই হোৎকা টা কিছু বলেছে নাকি তোকে? ওর চামড়া ছিলে নেবো একদম আমি!”
 
“না না আমাকে কি বলবে, আমিই তো ওনাকে বারান্দায় দেখলে ভেতরে চলে আসি। যা দু একবার দেখেছি তাতেই বুঝেছি নোংরা লোক। এমন কুৎসিতভাবে তাকিয়ে ছিলোনা!”
 
“হুম, এরপর থেকে আরো সাবধানে থাকিস।”
 
রেডি হয়ে প্রীতুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো সুহাস।
 
” বারান্দায় কম যাস একটু। আমি অফিসে যাচ্ছি এখন।”
 
 
সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিক্সা থেকে নেমে কি ভেবে আবার পিছিয়ে হেটে গেলো আবার সুহাস। পাঁচটা লাল গোলাপ কিনলো। “অনেকদিন ফুল দেয়া হয়না প্রীতুকে।”
 
সুহাস আসার সময় হয়েছে। আসলে তো আর কাজে হাত ই দিতে দেবেনা, তাই রান্না শেষ করে চট করে কফির কাপটা বসিয়ে দিলো প্রীতু।  বেডরুমটা গোছাতে এসে শব্দটা শুনলো।
 
ঠুক ঠুক ঠুক!
জানলায় কেও টোকা দিচ্ছে!
“হেই প্রীতু, জানলাটা খোল।”
 
দৌড়ে গেলো ওদিকে অবাক প্রীতু। “তুমি এদিক দিয়ে কেনো?”
 
“বিয়ের আগে তো অনেকবার উঠেছি পাইপ বেঁয়ে,  আজ আবার ভাবলাম একটু ঝালাই করে নিই। নিত্যনতুন পদ্ধতিতে ভালোবাসা অটুট থাকুক প্রতিদিন। হা হা হা।”
 
মনে মনে খুশি হলেও একটা ধমক দিলো প্রীতু।
“হয়েছে এখন নিচে নেমে সিড়ি বেঁয়ে এসো। এই বয়সে আর সুপারম্যান সেজে কাজ নেই।”
     “ফুলগুলো নে, আমি আসছি।”
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লো দুজন। সুহাস শুয়েই ঘুম! বেচারা সারাটাদিন অফিসে কত খাটাখুটি করতে হয়।
    প্রীতু সুহাসকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। পাশের ফ্ল্যাটের ঝুমা আন্টির মৃদু সুরে কান্না শুনতে পাচ্ছে। “বেচারি! কত কষ্টেই না আছে।”
 
 
 
সকালে নাস্তা রেডি করে বারান্দা থেকে সুহাসের প্যান্ট টা আনতে গিয়ে পাশের বাসার খোলা বারান্দা দিয়ে চোখ গেলো প্রীতুর। ভেতরে মানুষ,পুলিশ সব গিজগিজ করছে!
 
     “ঝুমা আন্টির বর সুইসাইড করেছে! কাল রাতেও ড্রিংক করে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মাঝ রাতে উঠে ঝুমা আন্টি দেখেন লোকটা রক্ত বমি করছে অনবরত। মেঝেতে বিষের বোতল গড়াচ্ছে!”
 
 
লোকটার মৃত্যুর খবর শুনে আড়মোরা ভেঙে উঠে বসলো সুহাস। “এত হাইপার হচ্ছিস কেনো! দেখ গিয়ে তোর ঝুমা আন্টিই হয়তো আর সহ্য করতে না পেরে বিষ দিয়ে মেরে ফেলেছে!”
 
প্রীতুও ভাবলো, হুম স্বামী এমন হলে জীবনটা আসলেই দূঃসহ হয়ে যায়। কত আর সহ্য করবে মহিলাটা!
 
“যাগ্গে, যেভাবেই মরুক মরতে তো হতোই একদিন। তাইনা?”
 
অফিস যাওয়ার আগে প্রীতুর গালে ঠোট ছোঁয়ালো সুহাস। “পাশাপাশি বারান্দায় একটা বদ লোকের কাছে বউকে রেখে যেতে টেনশান করতে ভালো লাগতো নাকি প্রতিদিন আমার? এরচে মরে গিয়ে নিজে উদ্ধার পেয়েছে, নিজের বউটাকেও শান্তি দিলো, সাথে আমিও।”
  হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো সুহাস। ওর রসিকতায় প্রীতুরও হাসি পেলো।
 
 
বিকেলে সুহাসকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো অফিস থেকে ফেরার পথে প্রীতুকে যেনো শপিং থেকে নিয়ে যায় ও। এরমাঝে কেনাকাটা সেরে নিলো প্রীতু।
 
বাইকে করে ফিরছে। কলোনীর এই মোড়টায় সবসময় একটু জ্যাম। গাড়ি,রিক্সা এসবের। এরই মাঝে ছোট্ট গোল চত্ত্বরটায় ছেলেগুলো বসে থাকে। এই বাসাটায় আসার পর থেকেই এদের দেখে আসছে প্রীতুরা। বাইকটা ওদের কাছাকাছি আসতেই একজন চিৎকার করে ওঠলো, ভাবীজান, সবসময় জামাইর বাইকে বসলেই হইবো? দেবরদের দিকেও নজর দিয়েন একটু।” সবকটা হো হো করে হেসে ওঠলো!
 
 প্রীতু বাইকের পেছনে আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে, বাইকটা ঘুরিয়ে দিতে গেলো ওদের দিকে ভয়ে ফিসফিস করে প্রীতু বললো, সুহাস প্লিজ! জলদি চলো এখান থেকে!”
 
 
বাসায় ফিরেও অনেক্ষন থম মেরে থাকলো সুহাস। অনেকটা সময় লাগলো প্রীতুর ওকে স্বাভাবিক করতে।
 
 
পরদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছে সুহাস। মোড়ে এসে রিক্সা থামিয়ে হেটে চললো। আবছা আলোছায়ায় হাটছে।
মোড় পেরুনোর সময় দেখলো একজন পিছু পিছু আসছে ওর।
 
আগের দিনের ওই বখাটেটা, হাতে আধ খালি মদের বোতল টা হাটার তালে তালে আগুপিছু করছে।
 
  মাথাটা হালকা ঝুকে আছে ছেলেটার,
 সামনে ঝাকড়া চুলগুলো চোখ দুটোকে ঢেকে দিচ্ছে বার বার!
 
মাতাল নাকি ছোকরা!
হাটতে হাটতে পেছনে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো সুহাস। আগের রাতে এই ছেলেটাই টিজ করেছিলো প্রীতুকে। মনে হতেই রাগে শক্ত হয়ে গেলো সুহাসের হাতের মুঠো।
হাটতে হাটতেই আবার পেছনে তাকালো ও।
 
 
 
বাসায় ফিরতেই অবশ্য মনটা খুশিতে নেচে ওঠলো সুহাসের। সব ওর পছন্দের খাবার রান্না করেছে প্রীতু! মেয়েটাকে এজন্যই এত ভালোবাসে ও।
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে আছে দুজন। প্রীতুকে কাছে টানলো সুহাস।
 
– আচ্ছা প্রীতু, মানুষের মৃত্যু সর্বোচ্চ কতটা দ্রুত হতে পারে বলে তোর মনে হয়?
 
– আমি কি করে বলবো! কিভাবে মরছে তার উপর হয়তো নির্ভর করবে।
 
– আচ্ছা, মনে কর একটা মাতাল পানিতে পড়ে গেলো পা পিছলে, বোতলটা আগে পানি দিয়ে ভরবে নাকি মাতালটার পেট?
 
     অনেক আগে আমাদের গ্রামে একবার এমন হয়েছিলো বুঝলি। সকালে সবার এটা নিয়ে সে কি জল্পনা কল্পনা! হাহ হাহ হাহ…
 
– আহ রাত দুপুরে মৃত্যু নিয়ে এমন রসিকতা করোনা তো!
       বিরক্ত হলো প্রীতু। যেনো ভয়েই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে।
 
 
 
তীব্র কলিংবেলের শব্দে ধড়মড় করে ওঠে বসলো সুহাস। এত সকালে আবার কে এলো!
 
দরজা খুলে দেখে একজন সামনে দাড়িয়ে। গায়ে পুলিশের পোশাক।
 
-কি ব্যাপার?
 
– আপনি সুহাস ভৌমিক?
 
-জ্বি! কেনো?
      একটু অবাক হলো ও। ওর কাছে এদের কি কাজ!
 
– আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। গত সন্ধ্যায় কোথায় ছিলেন আপনি?
 
– ছয়টা নাগাদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি! কেনো কি ব্যাপার?
 
– কেও পিছু নিয়েছিলো আপনার?
 
– জানিনা! আমার বাসায় ফেরার তাড়া ছিলো।
 
– গতরাতে একজন মারা গেছে।
পুকুরে ডুবিয়ে মারা হয়েছে তাকে। তার সাথের সঙ্গীরা সর্বশেষ আপনার পিছু পিছু যেতে দেখেছিলো ওকে, ওরা সবাই বয়ান দিয়েছে।
 
আপনাকে আমার সাথে একটু থানায় যেতে হবে এখুনি….
 
– “কি হয়েছে! ও কেনো থানায় যাবে?”
            কথাবার্তার শব্দে প্রীতু উঠে এসেছে ততক্ষনে। অফিসারের শেষ কথাগুলো কানে গিয়েছে ওর।
 
– আপনি? মিসেস সুহাস…?
 
-জ্বি, কি করেছে আমার হাসব্যান্ড!
 
– হয়তো তেমন কিছুই না। আপনি কোনো চিন্তা করবেননা, এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক ভেবে নিন।
     “আর তাছাড়া…..”
            প্রীতুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলালো অফিসার,তেলতেলে হাসি দিলো একটা।
                “আমরা তো আছিই, চিন্তার কিছু নেই,জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমিই আবার উনাকে পৌছে দেবো।” প্রীতু অজানা একটা ভয়ে থমকে গেলো একদম।
 
 
অফিসার তখন সুহাসের দিকে ফিরেলো,
 
– আমি গাড়িতে বসছি, আপনি একটু জলদি আসুন।
 
অফিসার সরে যেতেই প্রীতু জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে। কেঁদে ফেললো ভয়ে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সুহাস,
 
– লোকটা কেমন বাজে ইঙ্গিত করে গেলো তোকে!
 
তুই একটুও ভাবিসনা আমি যাবো আর আসবো। তোর দিকে যে বাজে নজর দিলো শেষ করে দিয়ে আসবো একদম।
 
– মানে!
       প্রীতুর পানিমাখা চোখে অবিশ্বাস।
 
-হুম, তোকে ভালোবাসি আমি। তুই শুধু আমার। অন্য যেই হোক সে, তোর দিকে খারাপ নজর দিলে মরতেই হবে। তুই কি ভেবেছিস এমনি এমনি পাইপ বেয়ে উঠতাম আমি? প্র্যাক্টিসটা ঝালাই করে নিচ্ছিলাম আসলে, দোতলা বেয়ে ওই হোৎকা টার মদে বিষ মিশিয়ে আসা মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিলোনা।
 
 জানিস তো, তোর জন্য সব করতে পারি আমি প্রীতু!
 
   এখন থাক, এই শালাকেও শেষ করে আসি। চিন্তা করিসনা,
  কোনো প্রমাণ থাকবেনা এটায়ও। ফিরে এসে ওই ছোকড়াকে কিভাবে খুন করলাম সেই গল্পটা বলবো…।
 
 
 
 

ম্যানস্ পার্লার!

Now Reading
ম্যানস্ পার্লার!

(শুরুতেই বলে রাখি, এটি নিতান্তই একটি কাল্পনিক গল্প, কোনো বিশেষ ব্যাক্তি বা গোষ্ঠিকে লক্ষ্য করে এ লেখা নয়)
সুমনের তাড়ায় মা কুলসুম বেগম প্রায় দিশেহারা বোধ করছেন। বাবাহারা ছেলে, তার এহেন পরিস্থিতিতে তিনি কি করবেন কার কাছে যাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেননা!
গেলো দুদিন কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখেছেন ছেলেটাও চুপচাপ ছিলো। আজ আবার কি হলো যে দশটার আগেই কোর্টে যেতে হবে বলে বারবার তাগাদা দিচ্ছে তাকে! রুটি সেঁকা শেষে টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে সুৃমনের পাশে বসলেন কুলসুম।
– বাবা, কি হয়েছে বলবি একটু?
-কোর্টে যেতে হবে মা, থানা থেকে কল দিয়ে বললো আজকে শুনানি হবে।
-শুনানি! কিসের?
-তোমাকে তো বলেছিলাম মা, আমি ওদের নামে মামলা করেছি!
 “ম্যানস্ পার্লারের” নামে যা তা করে বেড়াবে আর আমরা এসব সহ্য করে যাবো? নূন্যতম সেল্ফরেসপেক্ট নেই নাকি দেশটায় কারো!
ছেলের কথায় কুলসুম বেগম আৎকে উঠলেন একটু। এতক্ষনে যেনো মাথাটা পরিষ্কার হলো তার!
   “সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার”।
নিচে ছোট ছোট করে পার্লারে কি কি সার্ভিস দেয়া হয় তার সারসংক্ষেপ দেয়া।
“চুল ছাঁটাই”
“শেভিং ও ফেসিয়াল”
“বডি ম্যাসেজ ও বডি ওয়াক্সিং”
“ফুল বডি ক্লিনিং”
       এরকম আরো অনেক কিছু।
 টানা এক মাস পরীক্ষা আর চাকুরী করে সুমন চুল ছাঁটার সময়ই পাচ্ছিলো না। শেষে সন্ধ্যারাতে মা কুলসুম বেগম একপ্রকার জোর করেই পাঠালো ওকে চুলগুলো কেটে আসার জন্য। এক ঘন্টাবাদে ফিরে এলো সুমন, চোখমুখ টকটকা লাল হয়ে আছে ছেলেটার! কুলসুম বেগম তো অবাক। এরইমাঝে কি এমন হলো বাইরে!
অনেক জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব নেই ছেলের মুখে। নিরাশ হয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাবেন তখনই মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সুমন! জন্মাবধি এতটা বিস্মিত আর ভীত হননি কুলসুম বেগম।
সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার টা পরিচালনা করে মূলত জনাকয়েক হিজরা। প্রায় দুবছর হলো পার্লারটা শুরু হয়েছে। সেক্টর সমিতির কাছে হিজরাদের একটা দল এসে নিজেরাই প্রস্তাব দেয় যে ওরা কিছু করতে চায়! অনুমতি পেলে সেক্টরের ভেতর একটা সেলুন কাম পার্লার দেবে।
নিজেরাই চালাবে ওটা। সবাই বরং খুশিই হয়েছিলো,ভেবেছিলো
   “যাক এদের সুমতি হয়েছে তবে! অযথা চাঁদা চেয়ে সেক্টরের মানুষদের আর হয়রানি করবেনা।”
কোর্ট প্রাঙ্গনে ঢুকেই তব্দা খেয়ে গেলো কুলসুম বেগম। পুরো মাঠ জুড়ে হিজরার দল গিজগিজ করছে! সুমনও এসব দেখে চুপ মেরে গেছে একেবারে।
মাকে নিয়ে সোজা কোর্টের হলরুমের দিকে হাটছে সুৃমন। চারপাশের সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে ওদের। সবার চোখে কৌতুহলী দৃষ্টি। কাছাকাছি কোনো ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজলো।
বড় হলঘরটায় কোর্টের শুনানি শুরু। পুরো হলরুমটায় মানুষ ভর্তি। কিছু টুকটাক কাজের পর মামলার বাদী সুমনের ডাক পড়লো কাঠগড়ায়। উকিল সাহেব জেরা করতে শুরু করলেন,
– আপনিই তো মামলার বাদী..?
-জি আমিই…..
-আচ্ছা, একটু বিস্তারিত বলুন জাজ কে।
সামনের সীটে বসা মার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করলো সুমন,তারপর বললো,
-ওরা,, আমাকে মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্ট করার চেষ্টা করছিলো…
– ওখানে কি শুধু আপনিই ছিলেন?
– না আরো দুজন ছিলেন, একজন কে আমি ঢুকতেই ঝগরা করতে করতে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলাম…
-আচ্ছা! তো আপনার সাথে ঠিক কি হয়েছিলো বলুন,
ইতস্তত করছে সুমন, লোকটা ঠিক কি জানতে চাইছে বুঝতে পারছেনা ও, মামলার বিবরনিতে তো দিয়েছেই সব!
-বললাম তো হ্যারেজমেন্ট…..
-এভাবে বললে তো হবেনা মি. সুমন! আরো একটু ডিটেইল…… আর একটু বিস্তারিত….একটু খুলে খুলে… বলুন..?
প্রশ্নটা শুনেই হলভর্তি মানুষ সব হো হো করে হেসে উঠলো। বেশ একটা রসিকতা হলো যেনো এইমাত্র!
উকিলের চোখে মিচকে হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পেলো সুমন। এবং লোকটার মতলব বুঝতে পেরেই স্তব্ধ হয়ে ভাবলো, “এই অপমানের নরকের ভেতর মাকে এনে ভুল করলাম!”
আরো টুকটাক কথার পর সাতদিনের জন্য মুলতবি হলো শুনানি। মাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সুমন।
পেছন থেকে হাহা হিহি হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে ক্রমাগত, সেই সাথে টিটকিরির সুর…
– “কি করেছিলো ওরা…!
– “কি কি হয়েছিলো রে তোর সাথে…..?
– “কি কি করলো একটু খুলে বলনারে জাদু…আমরাও শুনি একটু…..”
লজ্জায় না কার উপর অযথা রাগে টলতে টলতে কোর্টের গেইট দিয়ে প্রায় পালিয়ে এলো মা ছেলে।
বাসার সামনে আসতেই দেখে দরজা জুড়ে পাঁচ ছয় জন হিজরা বসে আছে! এদেরকে চেনে ওরা, এলাকায় চাঁন্দা নেয় নিয়মিত। ওরা এখানে কেনো এখন!
কাজল নামে হিজরাটা এগিয়ে এলো।
– কি রে সুমনদা, একেবারেই কোর্টে গিয়ে উঠতে হলো? আমরা কি ছিলামনা নাকি?
ছেলে কিছু বলার আগেই কুলসিম বেগম এগিয়ে গেলেন।
– কাজল এসোনা ভেতরে এসে বসো। কি হতে কি হয়েছে ছাড়ো ওসব। আমরা মামলা তুলে নেবো কালই…
– মা!
ধমকে উঠলো সুমন। এত কিছুর পর কিসের মামলা তুলে নেবে বলছো তুমি?
বক কাটা চুলের হিজরাটা এগিয়ে এলো। হাতে একটা পাখির পালক, ওটা দিয়ে অনবরত কান খুঁচাচ্ছে!
এগিয়ে এসে সুমনের থুতনিতে হাত বুলিয়ে দিলো বব কাট। আস্তে আস্তে গলার দিকে নামলো হাতটা,
– “শুনো বেবি, অযথা বিপদ বাড়িওনা। নিজেও ভালো থাকো, আমাদেরও আমাদের কাজ করে ভালো থাকতে দাও।”
হাতটা এখনো সুমনের গায়ে হাতিয়ে বেড়াচ্ছে। গা ঘিনঘিন করে উঠলো সুমনের,ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো হাতটা।
হেসে উঠলো অন্যরা। বব কাটের অপমানে মজা পেয়েছে ওরা। বব কাট ঝট করে ফিরলো কুলসুম বেগমের দিকে, “দেখো মেয়ে, ছেলেকে সামলে রাখ্, বিপদ বাড়াইসনা।”
কথাটা বলেই গটমট করে চলে গেলো ওরা। কুলসুম বেগম কি করবেন কাকে থামাবেন বুঝে উঠতে পারছেননা যেনো।
সাতদিন পর।
কোর্টের শুনানি আবার আজ।  এর মাঝে যথেষ্ট খেটেছে সুমন। লুকিয়ে পার্লারের কাষ্টোমারদের রেজিষ্ট্রী খাতা জোগার করেছে। ওতে সবার নামধাম আর নম্বর ধরে ধরে কল দিয়েছে, আরো জোরালো প্রমান দরকার, স্বাক্ষীও লাগবে ওর জন্য।
অনেক কষ্টে দুজন লোককে রাজী করিয়েছে কোর্টে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য। “হিজরাদের বিরূদ্ধে লাগতে যাওয়া ঠিক না” বলে অনেকেই বুঝাতে চেয়েছে সুমনকে। সবাই ভয় পায় ওদের!
মা কে রেডী হতে দেখে নিষেধ করলো সুমন। মাকে ওভাবে অপমানিত হতে দেখতে ভালো লাগবেনা আবারো।
– তুই পারবি একা যেতে?
আমি আসিনা সাথে….. মায়ের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো সুমন।
– পারবো মা, টেনশান করোনা। আমি পৌছে কল দেবো।
সুমন বেরিয়ে গেলে দরজাটা লাগিয়ে প্লেইটগুলো গুছিয়ে ফেলবে ভেবে ডাইনিংরুমে পা বাড়াতেই বাইরের রাস্তায় ভীষণ শব্দে চমকে উঠলো কুলসুম বেগম।
দৌড়ে গিয়ে দেখলেন,
      “ট্যাক্সিটাকে একদম পিষে ফেলেছে কার্গো গাড়িটা!!”
ঢং ঢং করে দশটা বাজার বেল পড়লো কোর্টের অফিসে।
আজ শুনানির দ্বিতীয় দিন।
উকিল,জাজ সবাই মামলার বাদীর জন্য অপেক্ষা করছেন।
এক পক্ষের শুনানির পরও যখন বাদী পৌছলোনা, জাজ দ্বিতীয় দিনের মতো মুলতবি ঘোষনা করে উঠে পড়ছেন তখনই রক্তাক্ত শাড়িতে টলতে টলতে এ্যম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে ভেতরে ঢুকলেন কুলসুম বেগম।
উকিলের দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে বললেন,
               ” ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্টের প্রমান চাচ্ছিলেন, নিন নিয়ে এসেছি এ্যাম্বুলেন্সে করে, হাঁড়গোর গুড়িয়ে দিয়েছে একেবারে,
নিন আপনাদের জন্য জ্বলজ্যান্ত প্রমান নিয়ে এসেছি এইবার!”

রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!

Now Reading
রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!

ছোটখাটো ছিমছাম হোটেল কাম কুঁড়ে ঘরটায় ঢুকেই অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করলো মনে। এয়ারকুলারের মৃদু শব্দটা ছাড়া চারপাশ চুপচুপে নিরব! ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম আমি।
সকালটা হবে নিরব আলোয় আলোকিত, সন্ধ্যেটা নামবে ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে তাল মিলিয়ে ঝুপ করে,টুপ করে ওঠে পড়বে মস্ত থালার মতো একটা চাঁদ!
একজন লেখকের জীবনে আর কি চাই?
ওহো! একটু ভুল হলো।
 সাগরিকা পাশে থাকলে মন্দ হতোনা অবশ্য। মৃদু বাতাসে ওর আঁচল উড়ে যেতো পতপত করে, আমি সেই শব্দে গল্পের লাইন খুজে বেড়াতাম নিরবে!
অফিসের চাপ সামলাতে সামলাতে মনটা আকুপাকু করছিলো গত কয়টা মাস। তিনদিনের ছুটি পেতেই তাই দৌড়ে পালালাম ঢাকা থেকে। পুরোটা রাত বাসে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাত সকালে এসে পৌছুলাম বান্দরবান শহরে।
 তারপর সারাটা দিন চাঁন্দের গাড়ির লক্কর ঢক্কর সেরে বগা লেকের এই কুঁড়েতে এসে ঠাই নিয়ে তবেই শান্তি!
     দুদিন দুরাতের জন্য গুনতে হয়েছে হাজার খানেক টাকা! তাতে কি?
এমন প্রাকৃতিক শান্তির জন্য লাখ খানেক ঢালতেও আমার হাতে আটকাতো না।
ভরপেট খেয়ে অনেক দিন পর এমন নরম ঘুম দিলাম। বয়স কম তারপরও এই বয়সেই গ্যাস্ট্রিক বাঁধিয়ে বসেছি আমি, প্রতি রাতেই ব্যাথা ওঠে।
  তাইতো আমার বালিশের তলায় একপাতা করে সারজেল, রেনিটেড থাকাটা বিচিত্র কিছু নয় আজকাল। অথচ আজ রাতে ঘুমই ভাঙলোনা একবারের জন্যও!
এজন্যই বোধহয় ডাক্তাররা পথ্যের সাথে সাথে মানসিক ব্যাপারটায়ও জোর দেন!
খুব ভোরে গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বগা লেকের পথে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা। আজ একটু লেখালেখি করবো ভেবে জলদি শুয়ে পড়লাম।
মাঝ রাতে ঘুমটা ভেঙে গেলো!
বাইরে ক্রমাগত ঠুন ঠুন করে বিশ্রী একটা শব্দ হচ্ছে! এত রাতে এ কেমন বিরক্ত বাপু!!
ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে এসেই থমকে গেলাম আমি।
আকাশে মস্ত একটা রূপালি থালা, চারদিকে যেনো স্বর্গীয় সোনালি আভা ছড়িয়ে আছে!
ঠুন ঠুন ঠুন..!
একটু থেমেছিলো,এখন বিরক্তিকর শব্দটা আবার শুরু হলো।
    “এমন সৌন্দর্য্য ফেলে কোন বেরসিক করছে এই কাজ?” চোখ কুঁচকে সামনে তাকালাম। সবই আলোকিত কিন্তু পরিষ্কার নয়। মোলায়েম চাঁদের আলোয় সবটুকু ঢাকা।
কুঁড়ে থেকে চাদরটা এনে গায়ে জড়িয়ে সামনে এগুলাম। শব্দটার কোন বিরামই নেই। হচ্ছেটা কি এত রাতে!
সামনে এগুলাম। আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে শব্দটা।
   “ওইতো, একটা বড় জারুল গাছ দেখা যাচ্ছে।
ঠুন ঠুন ঠুন…..
শব্দের তালে তালে নড়ছে গাছটাও!”
“এত রাতে গাছ কাটছে! চোরাকারবারি নয়তো?”
      ভাবনাটা মাথায় আসতেই দমে গেলাম একটু। পাহাড়ি এলাকার এসব চোরাকারবারিরা খুব ডেঞ্জারাস হয় শুনেছি!
     “দেখে ফেললে আবার প্রমান লুকোবার জন্য খুনখারাবি করে ফেলবেনা তো!”
সাহস সঞ্চয় করে আর একটু এগুলাম। গাছের গোড়ায় মানুষের অবয়বটা এখন স্পষ্ট প্রায়। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম,
– “এই কে ওখানে অত রাতে? কি হচ্ছেটা কি এখানে!”
শব্দটা থেমে গেলো। ছায়া টা হাতের কুঠার চালানো থামিয়ে আমার দিক পেছন ফিরে এক হাত কোমরে রেখে সোজা হয়ে দাড়িয়েছে!
 আবারো চিৎকার দেবো কিনা ভাবছি, পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে সাই করে ঘুরলাম। আমার কুঁড়ের ম্যানেজার ঘুসং চাকমা হেটে আসছে দ্রুত।
-“ছ্যার! কি করছিন কি আপনি? এত রাতে বাইরি আসিছেন কেনো?”
জবাব দিতে যাবো এমন সময় পেছনে উত্তপ্ত ধমক শুনতে পেলাম! জারুল তলায় এখন দুজনের মানুষের আবছা ছায়া! “পাশের লোকটা কোথা দিয়ে এলো দেখলামনা তো!”
“এ্য গনশা, তুলি লে যা এরে এহানথুন। সূয্যি আওয়ার আগি ফিনিশ করি দে। বড় বেশি বারিছে।”
      আমার পাশ থেকে ঘুসং জোর গলায় বলে ওঠলো ওদের লক্ষ্য করে। বিড়বিড় করে ওদের নিজস্ব ভাষায় কিছু বললো,গালি দিলো সম্ভবত।
আমার দিকে তাকালো ম্যানেজার। দুহাত কঁচলাচ্ছে, মুখে তেলতেলে শীতল হাসি একটা!
– “ছ্যার এই শীতে বেশিক্ষন থাকতি নেইকো, যান ঘুমানগে, আর অন্ধকারে কি দিখতে কি দিখিলেন কারোক বলিয়েননা।”
         লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেনো ঝিলিক মেরে ওঠতে দেখলাম আমি। অজানা একটা ভয় ঢুকি ঢুকি করছে ভেতরে। লোকটা কি কিছু ইঙ্গিত করতে চাইলো? খারাপ কিছু কি ঘটতে চলেছে…..!
পেছনে চিৎকার শুনতে পেলাম তখনই। একজন অন্যজনকে মাটিতে চেপে ধরে রেখেছে!
      চাঁদের আলোয় স্পষ্ট ঝিলিক মারতে দেখলাম ওপর দিকে তোলা দুহাত লম্বা চাপাতি টা! এক হাতে দুহাত চেপে ধরে রেখে,চাপাতি সহ হাতটা ঝপ করে নিচে নামিয়ে আনলো লোকটা!!
    মুখ ফসকে চিৎকারটা বেরিয়ে এলো আমার। ছুটতে শুরু করলাম…
চিৎকার করতে করতে কোনদিকে যাচ্ছিলাম জানিনা, একটা কুঁড়ের দরজায় সজোরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েই কুঁকড়ে গেলাম আমি। তারপর আর কিছুই মনে নেই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি মস্তবড় একটা জাদরেল চেহারা ঝুকে আছে আমার উপর! গায়ে পুলিশের পোশাক!
বুকের একপাশে লিখা, ক্যাপ্টেন ইয়ান চাকমা!
আমাকে চোখ খুলতে দেখেই লোকটা কথা বলে ওঠলো,
– মশায় তো তাজ্জব করে দিলেন! তিন বছর আগের খুনিকে ধরিয়ে দিলেন,তাও সজ্ঞানে না অজ্ঞানে! কি করে করলেন বলুনতো?
সিআইডির কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন?”
অবাক আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। কি বলছে কিছুই বুঝতে পারছিনা!
আশপাশের অনেকজনের কথা থেকে যা বুঝলাম,
   “প্রায় তিন বছর আগে ঘুরতে এসে এক পর্যটক আততায়ীর হাতে খুন হয়। অনেক খুজেও পুলিশ কোনো হদিস করতে পারেনি। গত রাতে চিৎকার করতে করতে আমি পাশের পুলিশ ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছিলাম।
বার বার করে খুন, ঘুসং, গনশা আরো কি কি নাকি বলছিলাম!
তা থেকেই ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে নতুন করে পুলিশের সন্দেহ হয়।
খানিক জেরা করতেই ঘুসং হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে! গত তিন বছর ধরে অজানা এক ঠুন ঠুন শব্দে লোকটার নার্ভ নাকি এমনিতেই শেষ! সে এসব থেকে মুক্তি চায়!
কিন্তু রহস্যের ব্যাপার হলো, ওর হাট ভাড়া নেয়া বাদে আমাদের আর কথাই হয়নি,তাছাড়া ঘুসং হলফ করে বলেছে গত রাতে সে বাইরে বের ই নাকি হয়নি! আমি তবে এত কিছু কি করে বললাম?
পরদিনই তল্পতল্পা গুটিয়ে প্রায় ভুতে তাড়া খাওয়া মানুষের মতো ঢাকায় পালিয়ে এলাম।
রহস্যটা রহস্যই রয়ে গেলো আমার কাছে!
থাকুক, ওটা নিয়ে আর ভাবতেও চাইনা আমি।
প্রকৃতি রহস্যময়।
সে তার চারপাশে ঘটনা ঘটায়,
 আবার অদৃশ্য একটা চাদরে তা জড়িয়ে রাখে!
 আমরা তো নগন্য সন্তান তার। প্রকৃতি নিজে না চাইলে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন যে নগন্য মানুষের সাধ্যের বাইরে!

ভালোবাসি! নাহয় নাইবা বললাম!

Now Reading
ভালোবাসি! নাহয় নাইবা বললাম!

দমবন্ধ হওয়া একটা পরিবেশ।

দেয়ালের এক কোণায় উঁপুর হয়ে পড়ে আছে ছেলেটা। হাত দুটো ভয়াবহ ভাবে মুচড়ে পেছনে এনে বাঁধা।

গার্ড দরজাটা খুলে দিতেই আস্তে করে রুমটায় প্রবেশ করলাম। পেছনে ঘটাং করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো পরক্ষণেই।

আবছা আলোয় চোখ সয়ে আসতে একটু সময় লাগবে,তাই দাড়িয়ে রইলাম। সয়ে এলে দেখলাম আমাকে ঢুকতে দেখে ছেলেটাও চোখ খুলেছে,বড় বড় সুন্দর চোখ দুটো! ছেলেদের এত সুন্দর চোখ হতে সচরাচর দেখা যায়না। ওর দিকে তাকিয়ে আমার সবচেয়ে মিষ্টি হাসিটা দেয়ার চেষ্টা করলাম।ওপাশ থেকে প্রতিউত্তরের আশা তাকিয়ে থাকলাম। নাহ ছেলেটা শুধু তাকিয়েই আছে পাল্টা হাসলোও না।

হঠাৎ কেমন যেনো লাগলো! শুধু তাকিয়ে আছে তাই নয়, ছেলেটা হাসছেও। কিন্তু মুখে নয় চোখে!

আগেও দেখেছি কিছু কিছু মানুষ আছে মুখে একদমই হাসি নেই কিন্তু চোখ দুটো যেনো হেসে উপচে পড়ছে! সবসময়ই ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ অস্বস্তিকর মনে হয়!

রুমটায় প্রবেশ করেছি পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময়, এর মাঝে তাকিয়ে থাকা ছাড়া ছেলেটা এমন কিছুই করেনি যাতে তাকে অসুস্থ্য বা খুনে বলা যায়।

এভাবে আসলে হবেও না, আগেই জানতাম। কারো সাইকোলজি বুঝতে হলে তাকে তার নিজস্ব জগৎ দিতে হয়। নাহলে কিছুই অনুভব করা যায় না।

আস্তে করে ঘরটা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। ভাবছি ফেরার পথে একবার ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ সাইফ এর সাথে কথা বলে যাবো।

ক্যাপ্টেনের কথা ভাবতেই মনে পড়লো, লোকটা জবাব পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আছে। মানুষটা পারেও বটে, এত সেল্ফ কন্ট্রোল পুলিশ প্রধানের ব্যাক্তিত্ত্ব্যের সাথেই যায়! আমার দেখা অসম্ভব অমায়িক আর নম্র একটা মানুষ! এত ভালো লাগে লোকটাকে শেষ নাগাদ না আবার আমি নিজেই…

যাহ! কি সব ভাবছি অসভ্যের মতো! এসব বিয়েসাদী আমার পক্ষে হবেই নাহ!

– ড: সারা

পেছনে ডাক শুনে পঁই করে ঘুরতে গিয়েই বিপত্তিটা বাঁধিয়ে ফেললাম। পা ফঁসকে পড়ে যাচ্ছি শক্ত ফ্লোরে! সেদিনই দেখে গেছি ফ্লোরটাতে নতুন টাইলস বসানো হচ্ছে ঠক ঠক করে, প্রথম সংঘর্ষটা কি আমার সাথেই হতে হবে!

চোখমুখ কুঁচকে ফেললাম আতঙ্কে,
“খোদা! আর যাই হোক পড়ে গেলে জ্ঞানটা যেনো হারিয়ে ফেলি। চোখ খুলে একগাদা মিটমিটে হাস্যরত চোখকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা সহ্য করতে পারবোনা।”

ঝপ করে পড়লাম। ফ্লোরে না, দুটো শক্তিশালী হাতের মাঝে! সেকেন্ড খানেক ঝুলিয়ে রেখে সোজা করে দাড় করিয়ে দিলো আমাকে নিজের পায়ের উপর! ক্যাপ্টেন সাইফ! “এভাবে পেছন থেকে ভয় পাইয়ে দিয়ে এখন আবার হিরো সাজা হচ্ছে” রেগে উঠতে গিয়েও সামলে নিলাম। ক্যাপ্টেনের মুখ একেবারেই নিরিহ হয়তো ইচ্ছাকৃত হয়নি ব্যাপারটা। আর দোষটা তো আমারই, অযথা ডাক শুনলেই ভয় পেতে হবে কেনো!

ওড়নাটা টেনেটুনে ঠিক করে নিলাম।

-আপনি কি আমার সাথেই কথা বলতে এসেছেন? ভেতরে আসুন।
কথা কটা বলেই ক্যাপ্টেন পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।পিছু পিছু ঢুকলাম আমিও।

-জ্বী বলুন। ছেলেটাকে কেমন দেখলেন?

-এভাবে বেঁধে রেখে সাইকোলজি বুঝা যায়না। তাকে তার নিজস্ব জগৎ দিতে হবে।

-ইই মীন, আপনি তাকে ছেড়ে দিতে বলছেন!

-হুম।

-আমি জানি আপনি আপনার পেশাগত ক্ষেত্রে টপ। যেভাবে চাইছেন দিচ্ছি,শুধু একটা প্রশ্ন “আপনি নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে কি ভেবেছেন?”

হালকা হেসে ক্যাপ্টেন সাইফের চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম,
-জনগনের নিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব তো পুলিশ প্রধানের। আমি শুধু আমার রোগীর ব্যাপারটা দেখছি।

তিনদিন পর।
ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করছি। ক্যাপ্টেন সাইফ নিজেই নিয়ে আসছেন তাকে। পাঁচ মিনিট পর দেখা গেলো দুজনকে। ছেলেটার হাতে হ্যান্ডকাফ বাঁধা। চোখে সেই একই দৃষ্টি,নিরব হাসি!

-হ্যান্ডকাফ টা খুলে দেবেন প্লিজ।

ক্যাপ্টেন একবার শুধু তাকালেন আমার দিকে তারপর খুলে দিলেন বাঁধন। গাড়ির চাবিটা নিয়ে ছেলেটাকে বললাম গাড়িতে উঠতে। ক্যাপ্টেন দাড়িয়ে থাকলেন ওখানেই।

অনেকটা দূর চুপচাপ গাড়ি চলার পর এই প্রথম কথা বললো ছেলেটা।

-ক্যাপ্টেনকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন ডক্টর। বেচারা নিজের কেবিনেটের গ্লাসের উপর টেনশানের বোঝা নামাচ্ছে এখন! কোথায় যাবেন তাও জানিয়ে আসেননি।

স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। মনে মনে চমকে গেছি ভীষণ। ক্যাপ্টেনকে জানিয়ে আসিনি এটা জানলো কিভাবে?

স্টীয়ারিং ঘুরিয়ে ঘ্যাচ করে গাড়িটা থামালাম।
-“আমি নিজের কাজে অন্য কাউকে নাক গলাতে দেইনা। তাই কি করবো,কোথায় যাবো না জানিয়ে আসাটাই তো স্বাভাবিক।” হেসে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম।

চোখ দুটো এখন আর হাস্যরত বড় বড় লাগছেনা। নিজস্ব স্বাধীনতা পেয়ে হায়েনার মতো কুতকুতে লাগছে এখন। “চলুন হেটে আসা যাক খানিক।”

গাছগাছালি বেশ ভালোই এদিকটায়। পাশাপাশি হাটছি আমরা। ছেলেটার সাইকোলজি অনেকটাই পরিষ্কার এখন। বললাম,

-খুনটা কেনো করলেন?

আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো ছেলেটা। চোখ দুটোয় আনন্দ যেনো ঝিলিক মেরে ওঠলো!

-ভালো লেগে গিয়েছিলো।

-মানে?

-কিছু কিছু মেয়েমানুষ আছেনা দেখলেই গলাটা টিপে ধরতে ইচ্ছে করে? মেয়েটাকে দেখে তেমনটাই হয়েছিলো।

থমকে দাড়ালাম আমি। ছেলেটার দিকে তাকালাম।

-মিথ্যে বলছেন। আমি অলরেডী ডিএনএ টেষ্ট রিপোর্ট দেখেছি। সৎ মায়ের উপর এত বছরের পুষে রাখা রাগ তার মেয়ের উপর ঝেরে দিলেন। সেই অন্যান্য খুনগুলোর মতোই পুরনো ব্যাপার।

হু হু করে হাসলো ছেলেটা।
-এটা অনুমান করা তো পানির মতো সহজ ব্যাপার। এজন্য একজন টপ সাইকিয়াট্রিস্ট কে দায়িত্ব কেনো দিলো বুঝলাম না!

-“অনুমান করা সহজ। কিন্তু একজন সিরিয়াল কিলার কে সহজ সরল ভাষায় অপরাধ স্বীকারর করানো অত সহজ নয়। ওটাই আমার কাজ ছিলো।”

নিমিষে হিংস্র হয়ে গেলো তার দৃষ্টি। হাতে একটা চকচকে তার! এটা কোথায় পেলো!
এক পা দুপা করে এগিয়ে আসছে তারটা নিয়ে।

-খুন করা আমার পেশা না মিস, নেশা। খুন করতে আমার ভালো লাগেনা শুধু,রক্তে অক্সিজেন জোগায়।
শান্তি পাই।
ঠিক যেমন বাজার থেকে এনে কৈ মাছটাকে বালতি ভরা পানিতে ফেললে লাগে ওর!

ম্যানিয়াকটার দিকে তাকিয়ে থেকে পিছু হটছি। হঠাৎ ঘুরে দৌড় দিলাম। কোথায় যাচ্ছি জানিনা, শুধু ভাবছি সাইকো টার নাগালের বাইরে যেতে হবে!

দৌড়াতে দৌড়াতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম মাথার কাছেই! ফুঁপিয়ে ওঠলাম আমি, সাইকো টা চলে এসেছে!

শক্ত হাত দুটো এগিয়ে এলো মুখের সামনে! চেনা দুটো হাত!
মুখটাও অতি চেনা!
ক্যাপ্টেন সাইফ!!

শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আমি।
মানুষটাকে চোখ বুজেও অনুভব করা যায়, ভরসা রাখা যায়!

ফিসফিস করে বললাম, “উত্তর টা পেয়েছেন তো?”

সেও ফিসফিস করে বললো, “অনেক আগেই পেয়ে গেছি। আর কিছু বলোনা একদম চুপটি করে ধরে থাকো।”

প্রতিদিনের সংবাদে ধর্ষণ : নিয়মিত শিরোনাম

Now Reading
প্রতিদিনের সংবাদে ধর্ষণ : নিয়মিত শিরোনাম

ধর্ষণ। কথাটা আজকাল আমাদের সবার কানে লাগতে লাগতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। ধর্ষণ কি সেটা হয়তো আমাদের মতো পূর্ণবয়স্কদের বারংবার বলার দরকার নেই। তবুও আরেকবার পরিষ্কার করার জন্য বলি, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষণ হলো কোনো মেয়ের সম্মতির বিরুদ্ধে জোর করে তার উপর যৌনাচারই হলো ধর্ষণ। ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধই নয়, এটি জঘন্য থেকে জঘন্যতর একটি অপরাধ। অন্তত আমার চোখে এটা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ। একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় কালের নাম এই ধর্ষণ। একটা মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কিছু ছোট বড় স্বপ্ন নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। তার পরিবারেরও তাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন থাকে। সে বড় হয়ে তার পরিবারের মুখ উঁচু করবে। আর এসব স্বপ্ন ভেস্তে দেওয়ার জন্য এই ভয়ংকর অপরাধ ধর্ষণ যথেষ্ট।
আজকাল টেলিভিশনে কোনো সংবাদের চ্যানেলের শিরোনামে চোখ রাখলেই বিশ শতাংশ শিরোনাম যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের। বাকি আশি শতাংশ অন্যান্য। দেখা যায়, এক স্থানে গৃহবধূকে গণধর্ষণ, কোনো স্থানে আবার ছাত্রীকে ধর্ষণ, শিক্ষিকা ধর্ষণ, কিশোরীকে ধর্ষণ, এমনকি দেখা যায়, বৃধাও এরকম পৈশাচিক আচারণের হাত থেকে রক্ষা পায় না। বৃদ্ধার কথা না হয় একটু কম হাইলাইট করছি। কিন্তু সবচেয়ে হতবাক হয়ে যেতে হয় তখন যখন শোনা যায়, দশ বছরের নিচের শিশুদেরও ধর্ষণের শিকার হতে হয়। মুখের ভাষা তখন চোখের পানিতে পরিণত হয়।

আর এখনতো কমবেশি এটাই শুনতে হয় যে নাটোরে বা সিরাজগঞ্জে (কোনো স্থানকে ছোট করার উদ্দেশ্যে বলা হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়েছে।) বা যেকোনো স্থানে তিন বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার। কিছুদিন আগেই টেলিভিশনে সংবাদে দেখলাম, সাড়ে তিন বছর বয়সের এক বাচ্চাও ধর্ষণের শিকার! তাও ধর্ষকের বয়স আটত্রিশ বছর! তার মেয়ের বয়সের থেকেও কম! কি দোষ ছিলো বাচ্চাটার? কি বোঝে ও? হয়তো কেবল একটু আধটু কথা বলা শিখছে। তাহলে এটাই কি দোষ যে ও মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহন করেছে? তাই ওকে ভোগ করতে হবে? সামান্য যৌন ক্ষুধা মেটানোর জন্য এসব জানোয়ারেরা নিজের বাচ্চার বয়সী মেয়েকেও ছাড় দেয় না? এদেরকে তাজা কবর দিলেও গায়ের জ্বালা মিটবে না। বাচ্চাটা হয়তো কিছুই বুঝেনা। এখনো হয়তো উঠানে দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করে আনন্দ করে বেড়ায়। কিন্তু তার পরিবার জানে যে তার জীবন এখন কতটা কঠিন। সমাজে তাদের হয়তো নানা কটু কথাও শুনতে হয় এর জন্য। কারণ এটা আমাদের সমাজ। এ সমাজে সমালোচকের অভাব নেই। তার পরিবার এখন তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে সামনে কালো অন্ধকার দেখে। এক হিংস্র পশুর থাবায় তছনছ হয়ে গেলো এক কোমলমতী শিশুর। এদেরকে মানুষরূপী জানোয়ার বললেও জানোয়ারদের অপমান করা হবে। কারণ, জানোয়ারেরাও এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে না। সদ্য একটা ধর্ষণের সংবাদ সম্ভবত সবারই জানার কথা। বরগুনাতে এক স্কুল শিক্ষিকাকে গণ ধর্ষণ! একজন শিক্ষিকা, যে কিনা দেশের সবচেয়ে মূল্যবান, মানবসম্পদ তৈরীর কারিগর, তাকেও আজ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ত্রাসের শিকার হতে হচ্ছে। তাহলে আজ এই জাতি গড়ে তুলবে কে? হয়তো আর কোনোদিন ঐ শিক্ষক লজ্জায় মানবসমাজে মুখ দেখাতে পারবেনা। নিজ হাতে গড়ে তুলতে পারবেনা দেশের অমূল্য রত্ন গুলো। এক ধর্ষণ নামক কুৎসিত অপরাধের ফলে জাতি হারালো এক দেশ গড়ার কারিগর। এ সকল জানোয়ারের রুচি আজ কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে শুধু চিন্তা করুন। শিক্ষিকার তথা একজন দেশ গঠনের কারিগরকে যদি ধর্ষণের শিকার হতে হয়, তাহলে অন্য সব সেক্টরে যেসব মেয়ে মানুষ নিয়োজিত, তাদের তো নিরাপত্তা নেই বললেই চলে। সংবাদে দেখলাম, এ নিয়ে বরগুনার সকল বিদ্যালয়ের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। তার ধর্ষণের জন্য উপযুক্ত শাস্তির জন্য বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি করা হচ্ছে। কয়েকদিন আগে আবার দেখলাম, এক প্রবাসী ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে দেশে রেখে যায়। এই সুযোগে তার পূর্ব শত্রুরা তার স্ত্রীর উপর বারংবার গণধর্ষণ চালায়। তার দুইটা সন্তানও আছে। এখন সে তার সন্তানদের সামনে মুখ দেখাতেও চরম লজ্জা বোধ করছে। বারবার তার মাথায় আত্মহত্যার কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ, ধর্ষণ এখন প্রতিশোধেরও হাতিয়ার হয়ে গেছে। এসকল মানুষের চিন্তা ভাবনা এতটাই নিচে চলে গেছে যে, কোনো কিছু হলেই তাদের মাথায় ধর্ষণের ব্যাপারটা চলে আসে। এখন কেউ তার স্ত্রীকে দেশে রেখে গেলে অনেকটা শিয়ালের আস্তানায় মুরগি রেখে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় দুজনকেই। ধর্ষণের শিকার হয়ে হাজার হাজার মেয়ে আত্মহত্যা করছে। কারণ তারা সমাজে আর মুখ দেখানোর সাহসটুকু পায়না। একটা পরিবারের সব সুখ-শান্তি পুরো ভেঙ্গে তছনছ করে দেয় ধর্ষণ। পরিবারের সম্মানহানির জন্য অনেক কথা শুনতে হয় ধর্ষিতাকে। ফলে সে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। নিমিষেই শেষ হয়ে যায় স্বপ্নে ভরা এক জীবন।

প্রতিদিন এরকম অনেক রকম ধর্ষণের নিউজ দেখতে হচ্ছে আমাদের। এটা দিন যত যাচ্ছে, ততই সাধারণ একটা ব্যাপারে পরিণত হচ্ছে। ধর্ষণের আক্রমণ দিনের পর দিন বাড়ছেই। কারণ ধর্ষকরা তাদের উপযুক্ত শাস্তি পাচ্ছেনা। এর ফলে কিছু কুলাঙ্গার উৎসাহিত হচ্ছে। এমনকি যৌন ক্ষুধা মেটাতে যাকে যেখানে পাচ্ছে, সেখানেই ধর্ষণ করছে। ধর্ষণের পর শাস্তির ভয়ে ধর্ষিতাকে খুন পর্যন্ত করছে। কেন আমাদের প্রতিনিয়ত সংবাদের শিরোনামে ধর্ষণের সংবাদ শুনতে হবে? এ সব কুলাঙ্গারদের কারণে কেন আমাদের মা-বোনের ইজ্জতভ্রষ্ট হবে? এদেশের আইন ক্ষমতা রাখে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধকে নিশ্চিহ্ন করতে। কিন্তু আইনি ক্ষেত্রেও কিছু অমানুষ থাকে যারা টাকার বিনিময়ে পুরো বিষয়টা ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এসব কুলাঙ্গারদের ইসলামিক বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া অতি আবশ্যক। ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হলে এ সমস্ত কুলাঙ্গার অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। শুনতে হবে না আর যে ঐ স্থানে এক মেয়ে ধর্ষিত।

ঈগলের চোখ!!

Now Reading
ঈগলের চোখ!!

 

 

আপনি কি কখনো নিজের Conscious & Sub-Conscious মাইন্ড নিয়ে ভেবেছেন? এটা আসলে কি ? দেখতেই বা কেমন তার আচরণটাই কেমন ? এই বিষয়গুলো একজন লেখকের লেখনীতে যেভাবে ফুটে উঠে তার চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে ধরা দেয় একজন নির্মাতার চোখে বা ক্যামেরায়। আমাদের প্রত্যেকের আচরণে একটা দ্বিস্তরের পর্দা আছে যার একটার সাথে বাহ্যিকতায় সবাই পরিচিত অন্যটার সাথে কেবল নিজেই পরিচিত,অনেক সময় কেউ কেউ এটা ধরতে পারে না। আমরা নিজেই নিজের সাথে সংলাপ করি, প্রলাপ করি নিজেকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। এই বিষয়গুলো কেউ আমাদের দেখিয়ে দেয় নয়তো নিজেরা কখনো এর সম্মুখীন হয়।

সিনেমা গুলো হচ্ছে সভ্য সমাজে মানুষের আচরণের দর্পণ এই দর্পণে অনেক সময় নিজের অবিকল প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। আমরা সবাই কমবেশি সিনেমা দেখি নিজেদের সময় কাটানোর জন্য কিছু কিছু কালজয়ী সিনেমা আছে যা দেখার পর আমরা একটু নড়েচড়ে বসি। কিছু কিছু সিনেমা আছে যা আমরা বহুবার দেখি মনের খোরাক মেটানোর জন্য।

“আমাদের জীবনটা না খুবই কঠিন এর প্রতিটা বাঁকে বাঁকে রয়েছে রহস্যের মোড়, খুব কাছ থেকে দেখলে এর সবটা দেখা যায় না। একে যদি ভাল করে দেখতে হয় তবে অনেকটা উপর থেকে দেখতে হবে যেমন অনেকটা ঈগলের মত করে।”

ঈগল আকাশে উড়ছে ঠিকই কিন্তু তার শ্যোন দৃষ্টি কিন্তু রয়ে যায় নিচে যেখানে সবকিছু তার কাছে পরিস্কার।এমনই একটা সংলাপ ছিল ঈগলের চোখ ছবিতে। বর্তমানে ধুন্ধুমার এ্যাকশন আর বাহারি স্পটে গানের যুগে কিছু ছবি আছে যা আপনাকে পর্দার সামনে আটকে রাখবে করে রাখবে মন্ত্রমুগ্ধ। আপনি যদি  CRIME থ্রিলারের ভক্ত হন তবে এই ছবিটা একবার হলেও দেখবেন কেননা এখানে নায়কোচিত কোন হাবভাব নেই,নেই কোন আইটেম সং। এখানে  শক্তিশালী একটা গল্প আর সুন্দর নির্মাণশৈলী মূলত গল্পের প্রাণ বলা চলে।যা আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে।

মূল গল্পটি প্রখ্যাত উপন্যাসিক শীর্ষেন্দু মুখোপধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছে অরিন্দম শীল। শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ব্যানারে প্রযোজিত ছবিটি মূলত সিক্যুয়ালের ২য় ধাপ। আগের পর্বটি ছিল এবার শবর…..

এখানে অভিনয় করেছে শ্বাশত চ্যাটার্জী,জয়া আহসান,পায়েল সরকার,অর্নিবাণ ভট্টাচার্য্ সহ আরো অনেকে ছবির ছোট একটা চরিত্রে রয়েছে পরিচালক অরিন্দম শীল।

কাহিনিসূত্র…..

পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিষাণ (অনিবার্ণ) নিজের জীবনের প্রতি বেশ উদাসীন তার স্ত্রী শিবাঙ্গী (জয়া আহসান) নিজেও একজন ব্যবসায়ী। তাদের ঘরে আশ্রিত শিবাঙ্গীর বান্ধবী নন্দিনি (পায়েল সরকার) আর জাহ্নবী। সিনেমার প্রথম দৃশ্যতে দেখা যায় ঘরে ডাকাত ঢুকেছে আর ডাকাতের কবলে পড়ে মারা যায় আশ্রিত নন্দিনি,একই সাথে শিবাঙ্গী গুরুতর আহত হয়ে কোমায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। এই ঘটনার জেরে পুলিশ মামলার তদন্তে নেমেছে যেখানে তারা স্বামী বিষাণকে দোষী প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

এই খুনটাকে ওপেন এন্ড শাট মার্ডার কেস বলে চালিয়ে দিলেও সামনে চলে আসে নানা তথ্য যেখানে শিবাঙ্গীর সাথে বিষাণের ডির্ভোস ফাইল করা ছিল।এখানে ডির্ভোসের ক্ষতিপূরণও ছিল বিশাল। এই ক্ষতিপূরণের ঝামেলা থেকে বাঁচতে বিষাণ তার স্ত্রীকে মেরে ফেলতে চাই নি তো! নন্দীনি আর শিবাঙ্গীকে সরিয়ে জাহ্নবীকে নিয়ে বিষাণ নতুন জীবন শুরু করতে চাই এমন বিষয় বা সন্দেহ সামনে চলে আসে।

এই মামলার তদন্তভার ছিল পুলিশের ধুরন্ধর গোয়েন্দা অফিসার শবরের (শাশ্বত চট্টোপধ্যায়) হাতে। নিজে তার পেশার প্রতি এতটা ডেডিকেটেড যে নিজের যে একটা স্বাভাবিক জীবন তা যেন হারাতে বসেছে । একটা সময় মনোবিদের শরণাপন্ন হলে নিজের সমস্যা কথা জানতে পারেন। গোয়েন্দা অফিসার শবরের সমস্যা হলো ওনি নিজের একটা প্রতিচ্ছবি সকল ক্রিমিনালের মাঝে দেখেন যেখানটায় তিনি একজন মানুষের পরিচয়কে বড় করে দেখেন।

এখন একজন পুলিশ যদি অপরাধীকে এভাবে দেখেন তবে তো অপরাধী পার পেয়ে যাবে,তাই না? তবে তিনি কি করে একজন গোয়েন্দা বিভাগের বড় অফিসার হলেন?

তদন্তের স্বার্থে তিনি জানতে পারলেন শিবাঙ্গীর স্বামী বিষাণ মূলত একটা সাব-কনসাস লাইফের মোড়ক নিয়ে বেঁচে আছেন। বিষাণ আসলে একটা উন্মাদ আর অস্বাভাবিক মানুষ যে কিনা নিজের জীবনের উপর কোন কন্ট্রোলই রাখতে পারে না। এক সময়ে নন্দীনির সাথে বিষাণের পরকীয়ার সম্পর্কটার জের ধরে শবরের চোখে শিবাঙ্গী আর জাহ্নবী খুনি। এতসব কিছুর পরও পুলিশ কূল কিনারা করতে পারছে না।

নিজের জীবনের একটা কালো অতীত অধ্যায় যা বিষাণকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে যেটার জের ধরে তার সাথে স্ত্রী শিবাঙ্গীর মনোমালিন্য চলছে বিয়ের পর থেকে ফলাফল ডির্ভোস আর বিশাল টাকার মামলা,মাঝখানে নন্দীনির সাথে এক্সট্রা ম্যারিটিয়াল এ্যাফেয়ার যার কারণে নন্দীনি তাকে ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল। নিজের ঘরে একটা টিন-এজ মেয়ে জাহ্নবী যাকে কেন্দ্র করে একটা ত্রিমূখী মোড় পেল।ছবিতে বিরতির পূর্বে গল্পের গতি থেমে থেমে আপনাকে খুনীর কাছে নিয়ে যাবে।

এই গল্পে লেখক আর নির্মাতার ভাষা বুঝতে হলে আপনাকে শেষ অব্দি দেখে যেতে হবে। এখানে একটা ক্রাইম থিলারের আদলে পরিচালক মানুষের জীবনবোধের একটা গল্প বলতে চেয়েছেন তার ঢঙে। আমরা আমাদের নিজেদের পারিপার্শ্বিক যে মানুষ সবগুলোকে দেখি তবে তাদের কতটা অবলোকন করতে পারি?

মুখ দেখে যায় চেনা এই টাইপ কথাবার্তা বলি আসলে কি মুখ দেখে কাউকে চেনা যায় ?

ঈগলের চোখ ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০১৬ সালে আপনি যদি এখনো না দেখে থাকেন তবে অবশ্যই আপনার মাস্ট ওয়াচ লিস্টে রাখতে পারেন। এইটুকু বলতে পারি আইটেম গানের রমরমা এই  ‍যুগে আবহ সঙ্গীতের মূর্ছনায় আপনি গল্পের গতিতে এগিয়ে যাবেন।যা দ্বারা নিজের মানসিক স্বত্তাকে না হয় একটু যাচাই করে নিলেন।

হ্যাভ এ গুড টাইম উইথ মুভি।

 

“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?

Now Reading
“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?

কিশোর কবি সুকান্তের কন্ঠে উদাত্ত আহব্বান ছিল নবজাতকের জন্য করে যেতে হবে এই পৃথিবীকে জঞ্জালমুক্ত। এই জঞ্জালের ভেতর নবজাতকের বেঁচে থাকা কতখানি দুস্কর তা হয়তো কবির মনে একটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। সময়ের স্রোতে কবি আজ আমাদের মাঝে নেই। কবির চিন্তা বা উদ্বেগ আজ যেন বার বার ফিরে আসছে প্রতীয়মান হয়ে। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে একটা পরিবারতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখানে বাবা,মা,ভাই,বোন সকলে একটা সৌহার্দ্যের বন্ধনে থাকে।

জন্মের পর মানব শিশুর যে আত্মা তা অনেকটা অবচেতন কেননা তখন তার কোন অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তাড়িত করতে পারে না। একটা সময় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে যোদ্ধায় পরিণত হয়। প্রতিটা শিশুর অন্তরে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোন এক মূর্তমান চরিত্র। এই চরিত্রের গঠন ও লালন পালনের জন্য যাবতীয় কিছু করতে হয় শিশুর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সকলকে। একটা শিশুর মানবাত্মা কাঁচা মাটির পিন্ডের মতো,শিল্পী কাঁচা মাটির পিন্ডকে লক্ষ্য করে তার মনের যে স্বীয় চিন্তা তার প্রতিফলন ঘটায়।

তেমনি সমাজে বসবাসরত মানুষের আচরণ আর ভালবাসা একজন শিশুর মনে একটা শক্ত বুঁনিয়াদ গড়ে তোলে।

মানব জীবনের প্রতিটা স্তরের গুরত্ব রয়েছে তবে শিশুকাল বা জীবনের প্রথম স্তরই যেন সবচেয়ে গুরুত্ববহ। এই সময়ে শিশু সবচেয়ে বেশি মানসিক বা চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে বেঁড়ে উঠে। তাই একজন সচেতন বাবা মায়ের স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে আমরা কি এই দায়িত্ব থেকে সরে আসছি ? এই বিষয় নিয়ে ভাবা উচিত।

সমাজ বিজ্ঞানের আলোচনায় বলা আছে পরিবারের মাঝে  এমনকি বাবা মায়ের গন্ডির মধ্যে শিশুর জন্য একটা নিরাপদ বলয় থাকা উচিত। যেখানটায় শিশুর সার্বিক বিকাশে কোন বাধা আসবে না। আমাদের দেশে একান্নবর্তী পরিবারের প্রথা ভেঙ্গে ক্ষুদ্র পরিবার প্রথা গড়ে উঠছে। যেখানে শিশুর জন্য অপেক্ষা করে বহুমাত্রিক সমস্যা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তার সাথে অনেকাংশে কোন সহায়ক কেউ থাকে না। সমাজ বা পরিবারের ক্ষেত্রে উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে এইসব সমস্যার সুষ্ঠু বিহিত করা জরুরী।

আমরা আধুনিকতার মোড়কে একটা পিছিয়ে পড়া সমাজব্যবস্থায় আছি। এখানে সামাজিক সুরক্ষা আইনগুলো খুবই দুর্বল। যা প্রচলিত আছে তার কোন সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই বললে চলে। সমাজে বেড়ে উঠতে গিয়ে একটা শিশু নানানভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এই সব পরিস্থিতি আমরা যেমন সৃষ্টি করি তেমনি এসবের প্রতিকারও আমাদের হাতে। এখন সময়ের দাবী আমরা কতটা সোচ্চার এই বিষয়াদি নিয়ে। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন নানাভাবে শিশুদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেমন আছে তেমনি অবহেলিত কাজেও আছে। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তদারকি যেমন নাই তেমনি পাশাপাশি রয়েছে উদাসীনতা।

আমাদের দেশে এখনো অনেক শিশু রয়েছে যারা শিশুসুলভ চরিত্রের গন্ডি হতে বের না হতেই তাদের নিয়োগ করা হয়  গৃহপারিচারিকার কাজে। শহরের উঁচু সু-সজ্জিত দালানের ভেতর এই রুপটা খুবই নিকৃষ্ট বলা যায়। আমি নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি।

আমি টিউশনির সূত্রে এক বড়লোকের বাড়িতে পড়াতে যেতাম। আমার স্টুডেন্টের বয়সী একটা কাজের মেয়ে তাদের বাসায় কাজ করে। একদিন দেখি কাজের মেয়েটিকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। চোখের সামনে মেয়েটিকে বারকয়েক মারতে বা খারাপ ব্যবহার করতে দেখে নিজে বেশ অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম।

কলকারখানাগুলোতে দীর্ঘসময়ে কাজের বিনিময়ে যৎসামান্য মজুরি বা নানানভাবে নির্যাতন যা কিনা একটা সভ্য সমাজে শিশুর জন্য বরাদ্দ হতে পারে না। শিশুর মৌলিক অধিকারের কতখানি আমাদের সমাজ দিতে পারছে তা দৃশ্যমান বটে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে শিশুদের উপর বিদ্বেষটা যেন বেড়ে গেছে। বিগত কয়েকবছরে শিশুর প্রতি বিদ্বেষ যে হারে বেড়েছে তা সমাজবিশারদরা একটা সামাজিক উৎকন্ঠা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকাশহরসহ সারাদেশে পরকীয়ার জেরে,সম্পত্তির বিদ্বেষ বা স্বার্থের জন্য এখন শিশুকে হাতিয়ার করছে। কোন তুচছ ঘটনার জেরে যেমন শিশুকে আছাড় মেরে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে। তেমনি শিক্ষিত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার জেরে অবুঝ শিশুকে বেগোড়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

কখনো কখনো অবহেলা বা নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতার ছলে দিনে দুপুরে শিশুকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। যেখানে দিনের আলোয় একজন শিশুকে মেরে তার ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ সাইটে আপলোড করেও এইসব ঘৃণ্য অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এটা আইনের নিছক দুর্বলতা বলে দায় এড়ানো কোনভাবে সম্ভব নয়। একটা পোশাক কারখানায় কর্মরত শিশুকে শাস্তির নাম করে পায়ুপথে বায়ু প্রবেশ করিয়ে খুনের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। হিংস্র বা কুৎসিত মানসিকতার কিছু অধিকারী লোক যারা কিনা এইসব উগ্রতা অনেকটা খেলাছলে ঘটিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যৌন নির্যাতনের মতো  কু-লিপ্সা মেটানোর জন্য হিংস্র জানোয়াররুপী মানুষগুলো শিশুদের ছাড় দিচ্ছে না। ষাটোর্ধ্ব বয়সী লোকের লিপ্সার শিকারে পরিণত হচ্ছে পাঁচ বছরের বয়সী কোন মেয়ে শিশু। নারী পাচারের মতো ঘটনা যেখানে অহরহ ঘটছে যার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই নারী শিশু। এটা সামাজিক অন্যায্যতার প্রতিপাদন বটে। আমাদের দেশে নারী শিশুরা এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে আবডালে একটা অদৃশ্য কালো থাবার ছত্রছায়ায় পড়ে আছে। যেখানে প্রতিমুহুর্তে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নানা উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ। তাদের বেড়ে উঠার স্বাভাবিক সুস্থ পথটা আমরা প্রতিবন্ধকতায় ভরিয়ে রেখেছি।

প্রতিটা পরিবার আর সমাজের শৃঙ্খলে একটা বিব্রতকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সর্বাগ্রে দায়ী বাবা-মা এবং পরিবারের কর্তারা। এখন পারিপার্শ্বিকতায় আমরা নিজেদের স্বার্থকে জড়িয়ে কোমলমতি শিশুকে যেমন রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে আসছি,তেমনি যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ন্যাক্কারজনক ঘটনাও কম ঘটছে না। ইদানীংকালে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার প্রেক্ষাপটে রোষানলের শিকার ও বেঁচে যাওয়া সকল শিশুর প্রতি রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকরা কোন সুবিচার করতে পারছে না। কোন ঘটনার উল্লেখযোগ্য শাস্তির বিধান করতে না পারায় রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নেপথ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্তরালে কেবল পরিবারই যেখানে নিরাপদ একটা বলয় দিতে পারে সন্তানকে। সেখানে আমাদের উদাসীনতা আর অবহেলার কারণে পরিবারের মতো সুরক্ষিত স্থানটা আজ কোন না কোনভাবে শিশুদের জন্য বিপদসংকুল একটা স্থান হিসেবে চিহ্নিত।

আজকের শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতের ধারকের অস্তিত্ব নিহিত। আগামীতে সুন্দর একটা সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য এগিয়ে চলার জন্য আমাদের উচিত গঠনমূলক কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

যেখানে সুন্দর আগামীর পথচলায় প্রতিটা মানবশিশু দাঁপিয়ে বেড়াবে। এমন সুন্দর পথচলা কেবলই নিশ্চিত করতে পারি আমরা। এই পথচলার দ্বার তৈরিতে আসুন আমরা একটা পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যায়।

আপনার সন্তান ঠিক পথে আছে তো?

Now Reading
আপনার সন্তান ঠিক পথে আছে তো?

বর্তমান সময়ে কিশোরদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে, যা রূপ নিয়েছে মারাত্মক আকার। মাঠে ফুটবল খেলার মতোই তাদের কাছে খুন, ছিনতাই, ইভটিজিং, মারামারি এগুলো  এখন ছেলেখেলা হয়ে গেছে। অভিভাবক এবং প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে তা সমাজে আরোও ভয়ানকভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

কিশোর অপরাধ নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই যেটা বলতে হয়, যারা কিশোর অপরাধের সাথে জড়িত, তাদের পরিবারকেই সর্বপ্রথম দায়ী করা উচিত। কেনো না, পরিবারের সঠিক তদারকি যদি থাকত, তাহলে তাদের সন্তানরা বিপথে যাওয়ার সুযোগ পেতো না। ছোটবেলা থেকে কেউ নিজে নিজে ভালো-মন্দের জ্ঞান অর্জন করতে পারে না, সে ভালো-মন্দের জ্ঞানটা পাবে পরিবার থেকে।

মনে করুন, আপনার সন্তান আপনার মানিব্যাগ থেকে ৫ টাকা চুরি করলো, আপনি বুঝতেও পারলেন, কিন্তু ব্যাপারটা আপনি হালকাভাবে নিলেন, মনে করলেন ছোট-মানুষ, বুঝতে পারেনি, পরবর্তীতে সে ঠিক হয়ে যাবে। আর আমাদের ভুলটা এখানেই। আপনি হয়তো ভাবছেন পরবর্তীতে সে ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু, অন্যদিকে আপনার সন্তান ভেবে নিচ্ছে এটা কোনো অপরাধই না, এটা সে করতেই পারে। কারণ, সে দেখলো, এহেন একটা কাজ করার পরে আমাকে কেউ কিছু বলল না, তার মানে এর মধ্যে কোনো ভুল নেই। এভাবে সে একটা ভুল ধারণা তার মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নিলো। এখন আপনাকে বলতে চাই, “বৈকি, বড় হয়ে সে যে একজন ছিনতাইকারী হবে না, চুরিচামারী করবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেন আপনি?”।

ঠিক এভাবেই অপরাধের সূত্রগুলো তৈরি হয়। আমরা সমসাময়িক কিছু ঘটনার উপর আলোকপাত করি, তাহলে আমরা বুঝতে পারবো কিশোর অপরাধের পরিধি কি ভয়ানক আকারে বড় হয়েছে।

প্রথমেই, আমি আমার নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা একটা ঘটনার বর্ণনা দিতে চাই। আমার বাসা মিরপুরের মধ্যেই। ঘটনার সময় আমি ও আমার কিছু বন্ধুবান্ধব এক কফি-শপের দোতালা ছাদে বসে গল্পগুজব করছিলাম, সময়টা ছিলো সন্ধ্যার ৭.৩০ কি ৮.০০টা। গল্পগুজবের একফাঁকে আমি রাস্তার দিকে তাকালাম এবং তখনই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করি। রাস্তার নিয়ন আলো আর দোকানপাটের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, বাইকে করে ১৬-১৭ বছর বয়সী দুইটা ছেলে আস্তে আস্তে চালিয়ে রাস্তায় হাঁটারত এক মহিলার পাশে আসলো, পিছনে বসে থাকা ছেলেটি বিদ্যুৎগতিতে মহিলাটির হাত থেকে তাঁর ভ্যানিটি-ব্যাগটি ছিনিয়ে নিলো, এবং যথারীতি বাইক চালক খুব দ্রুত তার গতি বাড়িয়ে ঘটনার জায়গা থেকে পালিয়ে গেলো। পরে দেখলাম অন্য এক ব্যক্তি তাঁর নিজের বাইক নিয়ে ধাওয়া করার চেষ্টা করলেন, আমি জানি না মহিলাটি পরে তাঁর ব্যাগটি পেয়েছিলেন কিনা। কিন্তু, ঘটনাটি খুব লোহমর্ষক। নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ে এমন দুইটি ছেলে ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত, ভাবা যায়? তারা বাইকটাই বা পেলো কোথায়? নিশ্চয়ই পরিবার থেকে? আচ্ছা, ঐ বয়সে বাইকটা কি খুবই দরকার তাদের? আচ্ছা বুঝলাম, শখের জন্য দিয়েছেন, কিন্তু, বাইকটা নিয়ে সে কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, সে ব্যাপারে কি তদারকি করেছেন? যদি সত্যিই করতেন, তাহলে আজ ঐ ছেলেগুলো এভাবে ছিনতাইয়ের সুযোগ পেতো?

ইদানিং আবার এসব কিশোরদের মধ্যে ‘গ্যাং’ বানানোর এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা শুরুতে মেয়েদের উত্যক্ত করা, রাস্তায় জোরে গাড়ি চালানো, বিভিন্ন রকম পার্টি করা, একসাথে বসে কোনো চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়া, চা-সিগারেট খাওয়া  এসব কার্যক্রম দিয়ে তাদের পরিচিতি প্রকাশ করে। পরবর্তীতে দেখা যায় এসব গ্যাংই বড় বড় অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে, এর মধ্যে থাকে ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, এলাকাবাজী ইত্যাদি।

সাম্প্রতিক একটা ঘটনার কথাই ধরা যাক, উত্তরার ‘নাইন স্টার’ আর ‘ডিস্কো বয়েজ’-এর মধ্যে হয়ে যাওয়া সংঘাতের কথা আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা আছে, পেপার-পত্রিকায় এটা নিয়ে অনেক লেখালেখিও হয়েছে। লোকমুখে জানা যায়, এসব তথাকথিত গ্যাং বা বখাটেদের উৎপাত প্রায় ২ বছর ধরেই দেখা যাচ্ছিলো। আমার কথা, ২ বছরে কি এদের অভিভাবকদের বা প্রশাসনের চোখে কি এই ব্যাপারটি দৃষ্টিগোচর হয়নি? যাই হোক। প্রথম প্রথম এরা এলাকায় অনেক দাপট দেখাতো, রাস্তায় মেয়েদের উত্যক্ত করতো, রাত-বিরাতে পার্টি করা, রাস্তায় বাইক নিয়ে জোরে হর্ন বাজিয়ে শো-ডাউন দেয়া এগুলো ছিলো তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। আরোও জানা যায়, ডিস্কো বয়েজ গ্যাংয়ে নিজেদের মধ্যে কোন্দল চলায় সেখান থেকে দল ভেঙ্গে নাইন স্টার গ্যাংয়ের উৎপত্তি হয়েছে। ডিস্কো বয়েজ আর নাইন স্টার গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘাত কখনো থামেনি, যার ফলশ্রুতিতে গত ৬ জানুয়ারী নাইন স্টার গ্রুপের সদস্য ‘আদনান কবির’ খুন হয়। খুনের ঘটনার বীভৎসতার বিবরণী দিতে গিয়ে তার মা জানান, আদনানের কাছে তার স্কুল-ব্যাগ থাকায় প্রতিপক্ষের দু’টি ছুরির কোপ সে ঠেকাতে পেরেছিলো, কিন্তু, পরে তার মাথায় হকিস্টিক দিয়ে বাড়ি দেয়া হয়, এতে করে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। তার হাতের রগ কেটে দেয়া হয় এবং স্ক্রু দিয়ে তার পেট ছিদ্র করে দেয়। ভাবা যায়, ১৪-১৮ বছর বয়সের এইসব কিশোরদের কাছ থেকে এরকম নির্মম আচরণ? ঘটনাটির বিবরণ এখানেই শেষ করবো, কারণ এরপর আমরা জানি এটা নিয়ে মামলা হবে, থানা হবে, বিচার-সালিশ হবে, কিন্তু যেটা হবে না সেটা হচ্ছে, আদনান তার জীবনটা ফিরে পাবে না। পরবর্তী উদাহরণে চলে যাই আমরা।

ফেসবুক, একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এখানেও কিশোরদের অপরাধমূলক কাজ বন্ধ নেই। আজকাল প্রায় সময়ই দেখা যায় ১২-১৮ বছর বয়সের কিশোররা মদ্যপ অবস্থায় নিজের বা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে সেটা আপলোড করছে, মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে সেটা আবার আরেকজনকে দিয়ে ভিডিও করিয়ে ফেসবুকে ছেড়ে দিচ্ছে, মেয়েদের ফেসবুক আইডি নিয়ে তাদেরকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করছে, নগ্ন ভিডিও-ছবি পাঠাচ্ছে। এগুলো যেনো তাদের কাছে একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে, এসব না করলে আজকাল নাকি বন্ধুমহলে দাম পাওয়া যায় না। এখানেও আমার প্রশ্ন, তাদের অভিভাবকরা কি এসব দেখছেন না? তাঁরা কেনো নজরদারি করছেন না এসব ব্যাপারে?

এরকম উদাহরণ দিতে থাকলে তা আর শেষ হবে না। তাই কথা হচ্ছে, এসব কিশোরদের বিপথে যাওয়ার জন্য কাদেরকে দায়ী করবো আমরা? ওদেরকেই? একটা মানুষ তো জন্মের পরপরই অপরাধ করা শিখে যায় না, কারো না কারো ইন্ধন থাকে অপরাধী হওয়ার পিছে, সাথে থাকে আমাদের উদাসীনতা। আপনার সন্তান টাকা নিচ্ছে আপনার কাছ থেকে, কোনো একটা কারণ দেখিয়ে, আপনি কি খবর নিয়ে দেখেছেন, সে আসলেই সেই কাজে টাকাটা খরচ করছে কি না? আপনার সন্তান ফেসবুক চালাচ্ছে, আপনি কি একটু খতিয়ে দেখতে চেষ্টা করছেন, সে ফেসবুকের ব্যবহারটা কিভাবে করছে? আপনার সন্তান আপনার কাছে দামী মোবাইল চাইছে, গাড়ী চাইছে, বাইক চাইছে, আপনি দিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু, আপনি কি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন সে এসব দিয়ে কি করছে? যখন-তখন আপনার সন্তান তার বন্ধুর কথা বলে বাইরে যাচ্ছে, আপনি কি খোঁজ নিয়ে দেখছেন, কাদের সাথে সে মেলামেশা করছে, কাদের সাথে তার উঠাবসা?

উপরের প্রশ্নগুলো নিয়ে আমরা একটু ভেবে দেখি, আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে আসলে কতটুকু ভাবছি। তাদেরকে বিশ্বাস করতে গিয়ে আমরা তাদের বিপথে ঠেলে দিচ্ছি না তো? আমরা যদি একটু সচেতন হই, একটু নজরদারি করি, একটু ব্যবস্থা নিই, তাহলে হয়তো আদনানের মতো পরিণতি আমাদের আর দেখা লাগবে না।