বিনিময় প্রথা

Now Reading
বিনিময় প্রথা

ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে রিনার সাথে আমার পরিচয়। রাজশাহী থেকে উড়ে আসা একরোখা মেয়ে। ভার্সিটি এলাকার স্থানীয় ছেলে হওয়াতে রিনা আমার সাথে কেমন একটা সমঝোতার ভাব নিয়ে চলতো। যদিও তার সমঝোতার ভাবে আমার কোনো সম্মতি ছিলোনা আবার আমার মাঝেও সমঝোতার কোনো অভাব ছিলোনা।

C.S.E এর প্রোগ্রামিং নামক প্যাঁড়া আমাকে বারবার তার কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য করতো, নাকের ওপর চশমা রেখে ফ্রেমের ওপর দিয়ে শিয়াল-পন্ডিত স্টাইলে আমার দিকে সে যখন তাকাতো, মনে হতো প্রোগ্রামিং না শিখে তার কাছ থেকে তাকানোর স্টাইল টা রপ্ত করতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু সে বড় বেরসিক। রিনা কে বলেছিলাম, তুমি আমাকে প্রোগ্রামিং বোঝাও, আমি তোমাকে মহিলা হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেবো। বিনিময় প্রথা চালু হয়ে গেলো।

আমি তার হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম, সে আমাকে C++ শেখাতে লাগলো। আমি C পর্যন্তই বুঝতাম, তারপরের দুটো ++ আমার বোধগম্য ছিলো না, প্লাস দুটি তার চশমার মাইনাস পাওয়ারের সাথে প্লাসে-মাইনাসে মাইনাস হয়ে আমার অন্তরে তীর হয়ে বিধঁতো। আমি রক্তাক্ত হতাম, তবু মুখ ফুটে কিছু বলতাম না। ভাবতাম, ছেলে-মানুষী করার বয়সটা হয়তো অনেক পেছনে ফেলে এসেছি।

এভাবেই পরের তিনটা বছর কেটে গেল। ক্যাম্পাস রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হলো , সাথে বোনাস হিসেবে পেলাম- রিনার মোবাইল ফোনটাও বন্ধ। সাড়ে পাচঁ মাস আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলো , বিনিময়ে “বিনিময় প্রথার” অলিখিত সূত্রানুসারে আমি হয়ে গেলাম ছিন্ন-ভিন্ন।

এক সন্ধ্যেঁবেলা শেখপাড়া বাজারে ( ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া সংলগ্ন  ) বসে চা-বিস্কুট খাচ্ছিলাম, চায়ের দোকানের ১৪ ইঞ্চি টিভিতে নিউজ ভেসে এলোঃ ‘সাড়ে পাচঁ মাস বন্ধ থাকার পর আগামী শনিবার থেকে আবার ক্লাস শুরু হচ্ছে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে’।

শনিবার। ক্যাম্পাস ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণায় মুখর। হোস্টেলে থাকা ছেলে-মেয়েদের হাতে একটা কিংবা দুটো করে ব্যাগ, লাগেজ, কারো হাতে Ramjii Lall এর ইংরেজি বই, আবার কারো হাতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে ফিলোসফি। কেবল আমার হাতেই ছিলো ১৬৭টা লাল গোলাপ আর সাড়ে ৫ মাসে আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণের রক্তাক্ত হিসাব।

অশান্ত ব্যাকুলতা নিয়ে হাটঁতে লাগলাম। গন্তব্য বেগম রোকেয়া হল। দূর থেকে দেখলাম, রিনা ভ্যান থেকে নামছে, সাথে ব্যাগ, তোশক, বইপত্রে ঠাসা একটা র‌্যাক। গায়ে লাল জামদানী, কপালে টিপ, হাতে চুড়ি। আর তার অপূর্ব সৌন্দর্যের সাথে একজন সুদর্শন পুরুষ। অনিশ্চয়তা নিয়ে সামনে এগোলাম, আমাকে দেখেই রিনা পরিচয় করিয়ে দিলো, সাগর, ইনি আমার হাজব্যান্ড, তিন মাস হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। কথাটা শুনে আমার হাতে থাকা কোনো গোলাপের পাপঁড়ি ঝরে না পড়লেও আমার অন্তরে ফোটা এক রাজ্য গোলাপ মুহূর্তেই যেন ঝরে গেল। হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মোটা ফ্রেমের চশমাটা কোথায়? দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না? ও বললো, আরে না, আমি তো গতমাসে ইন্ডিয়া গিয়ে কর্ণিয়াতে লেন্স লাগিয়ে নিয়ে এসেছি। চশমা অনেক ঝামেলার। আর দ্বিতীয় কোনো কথায় না গিয়ে সমঝোতার ভাব দেখিয়ে আমিও বললাম, আসলেই ঝামেলার।

দেখতে দেখতে আরো দুটো বছর পার হয়ে গেলো। C++ শেখার নেশায় ল্যাপটপের ডিসপ্লেতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখেও চশমা উঠলো। ভার্সিটি ছাড়ার আগের দিন রিনা কে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, আমি যে তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, সে কথা কি আমার আচরণ তোমাকে বোঝাতে পারেনি? তাচ্ছিল্যের সুরে রিনা জবাব দিয়েছিলো, ভালোবাসা? তুমি আমাকে ভালোবাসতে নাকি? তোমার আর আমার সম্পর্ক তো প্রোগ্রামিং বোঝানোর ভেতর সীমাবদ্ধ ছিলো, বিনিময়ে তুমি আমাকে মহিলা-হলে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলে, তাই নয় কি?

এরপর আমার আর আসলে কিছুই বলার থাকেনা। বুঝলাম, “বিনিময় প্রথা”- ভোগবাদ তথা এপিকারিজমের অংশ । আর এপিকারিজমের সাথে প্রেম বা ভালোবাসা – এই দুটো কখনো একসাথে চলতে পারেনা। আসলে আমারই ভুল ছিলো। ভুল ছিলো- ভালোবাসাকে তার নিজের পথে চলতে না দিয়ে তাকে সাইড রোডে নিয়ে যাওয়া, ভুল ছিলো- তার চোখ থেকে মোটা ফ্রেমের চশমাটা নিজের হাতে খুলে নিয়ে তার চোখে চোখ রেখে এই কথাটা না বলা- রিনা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

 

গল্পে উল্লেখিত সময়কালঃ ২০১১-২০১৫
গল্পে উল্লেখিত স্থানঃ  কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়