চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খুঁটিনাটি

Now Reading
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খুঁটিনাটি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরমধ্যে একটি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কি বিশ্ববিদ্যালয় নাকি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বর্গ তার উত্তর আমি আজও পাইনি। আপনি যখন\ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, তখন মনে হবে কোনো এক গাছের নিচে বসে ঘুমিয়ে\ পড়তে। প্রায় সব রাস্তার দুইপাশে সারি সারি গাছ। ভরদুপুরেও এসব রাস্তায় ছায়া থাকে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের তৃতীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। চলুন জেনে নেয়া যাক চট্টগ্রাম

বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
আচার্যঃ রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ
উপাচার্যঃ ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
শিক্ষার্থীঃ ২৭০০০ (প্রায়) ছেলেঃ ১৭০০০(প্রায়) মেয়েঃ ১০০০০(প্রায়)
শিক্ষকঃ ৭০০(প্রায়)

অবস্থানঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারী থানায় অবস্থিত।

শুরুর কথাঃ বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে চট্টগ্রামে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় চট্টগ্রামের মানুষ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুভব করে। ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় সম্মেলনে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামবাদী সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ নির্মাণের কথা উপস্থাপন করেন। পরে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার দেয়াং পাহাড়ে কিছু জমি কিনেন। ১৯৪২ সালে নূর আহমদ বঙ্গীয় আইন পরিষদে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক দাবি পেশ করেন। ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তানের দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৬০-১৯৬৫) প্রণয়নকালে চট্টগ্রামে একটি ‘বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৬২ সালের নির্বাচন প্রচারনায় ফজলুল কাদের চৌধুরী এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাধারণ প্রতিশ্রুতি দেন। এবং পরবর্তীকালে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নির্বাচিত হলে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করা হয়। ১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে।

একাডেমিক কার্যক্রমঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৭টি অনুষদে ৫২টি বিভাগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ এবং অন্তর্গত বিভাগসমূহ হলো-

  • কলা ও মানববিদ্যা অনুষদঃ
  • আরবি বিভাগ
  • ইংরেজি বিভাগ
  • ইতিহাস বিভাগ
  • ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
  • ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
  • দর্শন বিভাগ
  • নাট্যকলা বিভাগ
  • পালি বিভাগ
  • ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
  • ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ
  • বাংলা বিভাগ
  • ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব বিভাগ
  • সঙ্গীত বিভাগ
  • সংস্কৃতি বিভাগ
  • আধুনিক ভাষা ইন্সিটিউট

জীব বিজ্ঞান অনুষদঃ

  • উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ
  • জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ
  • প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ
  • প্রাণীবিদ্যা বিভাগ
  • ফার্মেসী বিভাগ
  • ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ
  • মনোবিজ্ঞান বিভাগ
  • মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ
  • মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ

ব্যাবসায় প্রশাসন অনুষদঃ

  • একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ
  • ফাইন্যান্স বিভাগ
  • ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্স বিভাগ
  • ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ
  • মার্কেটিং বিভাগ
  • ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
  • সেন্টার ফর বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
  • হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ

ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদঃ

  • কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
  • ফলিত পদার্থবিদ্যা, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

আইন অনুষদঃ

  • আইন বিভাগ

বিজ্ঞান অনুষদঃ

  • পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ
  • রসায়ন বিভাগ
  • গণিত বিভাগ
  • পরিসংখ্যান বিভাগ

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদঃ

  • লোক প্রশাসন বিভাগ
  • রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
  • অর্থনীতি বিভাগ
  • সমাজতত্ত্ব বিভাগ
  • নৃবিজ্ঞান বিভাগ
  • যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
  • সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট
  • সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ
  • পুলিশ সায়েন্স ও ক্রিমিনোলোজি বিভাগ
  • উন্নয়ন গবেষণা বিভাগ

ইন্সিটিউটসমূহঃ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৬টি ইন্সিটিউট রয়েছে। ইন্সিটিউটগুলো হলঃ

  • ইনস্টিটিউট অব এডুকেশান, রিসার্স এ্যন্ড ট্রেনিং
  • আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট
  • নস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিশ
  • চারুকলা ইন্সিটিউট
  • সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট
  • ইনস্টিটিউট অব ফরেষ্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস

গবেষণা কেন্দ্রসমূহঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রগুলো হলঃ

  • নজরুল গবেষণা কেন্দ্র
  • ইনস্টিটিউট অব এডুকেশান, রিসার্স এ্যন্ড ট্রেনিং
  • ব্যুরো অব বিজনেস রিসার্চ
  • সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট
  • গণিত ও ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র

লাইব্রেরীঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী। এবং দেশের অন্যতম সেরা ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরী। ১৯৬৬ সালে মাত্র তিনশ(৩০০) বই নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এই লাইব্রেরীর বর্তমান সংগ্রহ সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন(৩.৫) লক্ষ। যার মধ্যে রয়েছে বিরল বই, জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপাদান, পান্ডুলিপি এবং অন্ধদের জন্য ব্রেইল বই।

আবাসিক হলসমূহঃ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে সর্বমোট ১২টি আবাসিক হল রয়েছে। যার মধ্যে ৮টি ছাত্র হল ও ৪টি ছাত্রী হল। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ১টি হোস্টেল রয়েছে

ছাত্র হলঃ

  • আলাওল হল
  • এ.এফ.রহমান হল
  • শাহজালাল হল
  • সোহরাওয়ার্দী হল
  • শাহ আমানত হল
  • শহীদ আব্দুর রব হল
  • মাস্টারদা সূর্যসেন হল
  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল

ছাত্রী হলঃ

  • শামসুন্নাহার হল
  • প্রীতিলতা হল
  • দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হল
  • জননেত্রী শেখ হাসিনা হল

ছাত্রাবাসঃ

গোবিন্দ গুণালংকার ছাত্রাবাস

ক্যাফেটেরিয়াঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকয়েকটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে। যারমধ্যে চাকসু ক্যাফেটেরিয়া ও আইটি ক্যাফেটেরিয়া অন্যতম।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারঃ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য রয়েছে একটি মেডিকেল সেন্টার। শিক্ষক ও কর্মচারীদের পরিবারের সদস্যদের জন্যও রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা। এখানে ১১ জন চিকিৎসক ও ৪ টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।রাজনৈতিক চর্চাঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ। যেকোনো শিক্ষার্থী চাইলেই এসব রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে যোগ দিয়ে নিজ নিজ রাজনীতির চর্চা করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট উল্লেখযোগ্য।

শাটল ট্রেনঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাতায়াত ব্যাবস্থার কথা মনে করলেই সবার আগে মনে পড়বে শাটল ট্রেনের কথা। ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য এই শাটল ট্রেন চালু করা হয়। ১০টি বগি বিশিষ্ট দুইটি শাটল ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার(১০০০০) শিক্ষার্থী যাতায়াত করে থাকে। বর্তমানে ট্রেন দুইটি দৈনিক সাত(৭) বার যাতায়াত করে থাকে।জাদুঘরঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে তিনটি(৩) জাদুঘর রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর, প্রাণীবিদ্যা জাদুঘর, সমুদ্র সম্পদ জাদুঘর।

স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্যঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে স্মরণ স্মৃতিস্তম্ভ, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, স্বাধীনতা স্মৃতি ম্যুরাল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।কৃতি শিক্ষার্থীঃ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস(পিএইচডি) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তাছাড়াও একুশে পদক বিজয়ী সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর প্রমুখ এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন।

আশা করছি এই লেখাটি আপনাদের ভালো লাগবে এবং কিছু তথ্য জানতেও সাহায্য করবে। লেখাটি কেমন লাগলো নিচে মন্তব্য করে আমাকে জানাতে পারেন। আর অবশ্যই সময় পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে আসতে পারেন। —- ধন্যবাদ।