আত্মকথা

Now Reading
আত্মকথা

“ছোটবেলা থেকে মাকে দেখতাম ঘরের সব কাজ করে একা নিজের রুমে বসে বসে কাঁদতেন। বুঝতামনা তখন। শুধু মায়ের চোখের জল মুছে গালে চুমু খেয়ে বলতাম আমি তোমার সব কাজ করে দেব মা কান্না করনা ! মা কিছু না বলেই শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে আরো কেঁদে ফেলতেন।

প্রায়ই স্কুল থেকে ঘরে ফিরে দেখতাম বাবা মাকে মেঝেতে ফেলে চড় লাথি মারছে, চুল ধরে মারছে ! আমি ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতাম তখন বাবা আমাকে থামাতে মাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হত কারণ প্রতিবেশী জেনে যাবে বাবার অত্যাচারের কথা।

তবু মাকে দেখতাম বাবার মাথা টিপে দিতে, কখনও পাঁ টিপতে, কখনও বাবাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে, বাবার পছন্দের খাবার বানাতে…। বাবাকে খুশি করতে, বাবার একটু ভালবাসা পেতে মায়ের কত প্রচেষ্টা ছিলো! কিন্তু বাবাকে মায়ের প্রতি ভালবাসাতো দূর একটু সদয় আচরণ করতেও সহজে দেখিনি। শুধু দুটি কারণে মায়ের প্রতি বাবার খুব সদয়ভাব বা আদিখ্যেতা দেখতাম। এক, যখন প্রতিবেশী বা আত্মীয় স্বজন নেমন্তন্নে আসতেন এবং দুই, যখন মা নিজের সমস্ত গয়না বাবার হাতে একটু একটু করে তুলে দিতেন।

এত অত্যাচারের পরেও মা কোনদিন বাবাকে বা আমাদের ছেড়ে যাননি ! বড় হবার পরে সহ্য হতনা মায়ের কষ্ট ! মাকে বলতাম , মা ঐ লোকটাকে সহ্য হয়না ! তুমি কিকরে সহ্য করো ? এই লোকটার থেকে দূরে কোথাও চলে যাই চল ! রোজ তোমার কষ্ট দেখতে আর ভাল্লাগেনা মা !

মা বলতেন, কিকরে ছেড়ে যাই ওকে ! ভালবেসে তার হাত ধরে চলে এসেছিলাম ! তাছাড়া সেই ছোটবেলায় বাবা মা মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের সংসারে খুব কষ্ট আর নানা অবহেলায় ঘরের কোণে পড়েছিলাম। তবে কার কাছে যাই আর কিকরেই বা যাই রে মা ! বাবা মা যার ছোটবেলায় মারা যায় তাঁর সারাটা জীবনই দুঃখ, কষ্টে কাটে মা ! শুধু তোকে ভাল একটা বিয়ে দিতে পারলেই আমার সব কষ্ট মুছে যাবে।

এই বলেই মা আবার সেলাই মেশিনে বসে গেলেন। এই করেই মা আমাকে খুব যত্ন আদরে একটু একটু করে বড় করেছেন। নিজে ভাল কোন কাপড় পরেননি, ভাল খাবার খাননি সব আমার জন্য যোগাড় করে রেখে দিতেন। নিজ হাতে কত সুন্দর করে আমার জন্য জামা বানাতেন ! কত সাজিয়ে দিতেন ! আর সবসময় কপালে, মাথার শিথিতে চুমু খেতেন…। মায়ের কথা ভাবলে অন্যমনষ্ক হয়ে যাই বাকরুদ্ধ হয়ে খোলা আকাশে খুঁজে ফিরি মাকে ! কিন্তু চোখের কোণে জলের কোন অস্তিত্ব অনুভব করিনা !

স্পষ্ট মনে আছে এইতো সেদিন, তখন আমি সবে ক্লাস এইটে পড়ি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, মা মেঝেতে পড়ে আছেন ! মুখ থেকে কেমন ফ্যানা বের হচ্ছে ! মায়ের পাশে বাবা বসে কাঁদছে আর বলছে,

  • তোর মা বাথরুমে পড়ে গেছে আমি তাঁকে তুলে আনতেই দেখি অজ্ঞান হয়ে গেছে ! এত ডাকলাম সেবা করলাম কিন্তু আর চোখ খুলে তাঁকালোনা তোর মা !

বাবার কান্নায় ততোক্ষণে পাড়া প্রতিবেশীর ভিড় জমে গেছে বাড়িতে। আমি মাকে জড়িয়ে কত ডাকলাম কত চেষ্টা করলাম মাকে সজাগ করতে কিন্তু মা আর সজাগ হননি ! আমাকে জড়িয়েও আর ধরেননি !

মায়ের শেষ গোসলের সময় শুনছিলাম কানাকানি করছিলো মহিলারা ! বলছিলো মায়ের গলায় কালো দাগ আর গলাটাও বেশ ফোলা ! আর মায়ের তলপেটে ক্ষতচিহ্ন ছিলো !

আমি বুঝতে পারিনি তবে এখন বুঝেছি। মাকে খুব কষ্ট আঘাত দিয়ে মারা হয়েছিলো।

কিন্তু মাতো বলেছিলো তাঁর নামে যে কোটি টাকার সম্পদ নানাভাই রেখে গিয়েছেন সেই সম্পদের কিছু অংশ বাবাকে দিয়ে দেবেন তবে কেন মাকে মেরে ফেললো বাবা ? কত কেঁদেছি, না খেয়ে তবু কাউকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারিনি ! কত প্রশ্ন ছিলো কঁচি মনে কিন্তু জবাব খুঁজে পাইনি !

জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন কিছু অভিজ্ঞতা হল যাতে আরো অনেক কিছু বুঝে গেছি। বাবা যখন সুন্দরী এক বড় লোকের মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুললো আর আমাকে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করার সব ব্যবস্থাও করে ফেললো !

প্রথমে বাবা পড়াশুনার খরচ পাঠাতো কিন্তু পরে আস্তে আস্তে কমে গেল টাকার পরিমাণ ! কিকরব ভয়ে টাকা চাইতে সাহস পেতামনা ! কারণ কেউ না জানলেও আমি জানি আমার মাকে বাবা অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে ! তারপর টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাতে লাগলাম। কলেজ ছুটিতে বাড়ি যেতাম কিন্তু জলদি চলে আসতাম ! বান্ধবীদের বাড়ি প্রায়ই গিয়ে থাকতাম !

আমার মামা খুব বড়লোক। কিন্তু কোনদিন মায়ের খোঁজ নেননি ! আমিও তাঁকে কোনদিন দেখিনি। তাঁকে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পাঠানো হয়েছিলো কিন্তু সে নাকি তখন দেশের বাইরে ছিলো তাই আসতে পারেননি শুনেছি ! কিন্তু আর কোনদিনই সে আসেননি। মা হারা অসহায় আমার খোঁজও কোনদিন নিতে চেষ্টা করেননি। হয়তো দায় এড়িয়ে গেলেন !

অনেক কেঁদেছি মাকে ভেবে ! মায়ের ঘরে মায়ের গন্ধ শুকেছি, মায়ের আদর খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি … হায় পোড়া কপাল ! এখন চোখের সব জল শুকিয়ে গেছে। অন্তরের দহনে পুড়ে খাঁক হয়ে গেছে সমস্ত মায়া, ভালবাসা ! চোখে জল নেই শুধু পুরুষ নামের এই কাপুরুষ পশুদের জন্য ঘৃণা আছে !

খুব অল্প বয়সেই জীবন যুদ্ধ শুরু করলাম ! এ যেন বাঁচার কঠিণ এক লড়াই ! টিকে থাকার লড়াই ! এই লড়াইয়ে হয় জিতবো নয় হারবো !জিতলে বাঁচার মতন বাঁচবো আর হারলে একবারে মরে যাবো সিদ্ধান্ত নিলাম ! তাছাড়া ঐটুকু বয়সে মা হারিয়েছি, বাবার অবজ্ঞা অবহেলা আর স্বার্থপরতা দেখেছি ! আমার আর কে আছে ? জীবনের প্রতি মায়া করার তেমন কোন পিছুটানও নেই ! কারো প্রতি কোন মায়া টান অনুভব করিনা !

আমার এতিম মা টা বড্ড বেশী লক্ষী আর বোকা মেয়ে ছিলো তাই অত্যাচার সহ্য করতে করতে মরেই গেলো ! কিন্তু আমি ঐ নোংরা নিষ্ঠুর কাপুরুষদের হাত, পাঁ ভেঙে দেব ! পঙ্গু করে দেব ঐ পশুদের !”

মা হারা এক মেয়ের আত্মকথা ছিলো এগুলো।

কোন এতিম সন্তানের আহাজারি আর আক্ষেপ কান পেতে কখনও কি শুনেছি ? কেন তাঁর চোখে কখনও এত মায়া আবার কখনও এত তীব্র জ্বালা?

তাঁর কন্ঠে কখনও করুণ আর্তনাদ কখনও বেরসিক কর্কশ আওয়াজ !

অভিশপ্ত অহংকারী

Now Reading
অভিশপ্ত অহংকারী

এক জমিদারের গল্প। সে ছিলো সেই সময়কার ঐ অঞ্চলের প্রভাবশালী, অহংকারী জমিদার এবং সম্পদশালী জমিদার। তার সাত ছেলে এবং দুই কন্যা ছিলো। দিন রাত চলে লোকজনের আনাগোনা, ভরপুর জমিদার বাড়ি। রঙ্গশালায় রঙ্গ তামাশায় সবসময় থাকতো মাতামাতি। সে জনগনের সুখ দুঃখ দেখার সুযোগ পেতো না কারণ সে নিজের আনন্দ ফূর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো সবসময়। জমিদারের শখ ছিলো শিকার করার। প্রায়ই সে শিকার করতে যেত। সফল হয়ে ফিরে এসে আরো আনন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা থাকতো রঙ্গশালায়। সব সুখ, আনন্দ, সম্পদ, প্রতিপত্তি সব যেন শুধু তার একার এবং একচ্ছত্র ! কিন্তু সব সময় যে একরকম যায় না কারো। সে কথা জমিদারও ভুলে গেছে। বরাবরের মত সে এবারও শিকার করতে তার লোকলষ্কর নিয়ে শিকারে যায়। সাথে তার পুত্ররাও যায়। তার অনুপস্থিতিতে জমিদার বাড়িতে মুখোশধারী কিছু ডাকাত হামলা করে সবাইকে বন্দী করে সব অর্থ, অলংকার লুট করে সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়।

 

পরদিন জমিদার ফিরে সব দেখে শুনে রাগে হুংকার ছাড়তে থাকে আর সমস্ত দাস দাসী পেয়াদাদের শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়। তার ধারণা এ কাজ এই বিশ্বস্ত দাস দাসী দিয়েই হয়েছে। কারণ ওরাই শুধু জানতো জমিদার বাড়ির গোপন কক্ষ ও সম্পদের কথা। তাছাড়া জমিদার বাড়ির চারিপাশ ঘেরা ছিলো জমিদারের তৈরী কৃত্রিম খাল এবং জমিদার বাড়ির আশার সম্মুখ পথে ছিলো কড়া পাহারাদার। পরিচিত চেনা জানা মানুষ ছাড়া এ কাজ কেউ করতে পারেনা। তাহলে এদেরই হাত আছে আর কারো নয় ! কিন্তু রাগ, অহংকারে নিমজ্জিত জমিদার এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে সে এই কথা ভাবেনি, তার অনেক কুচক্রী অসৎ বন্ধুর আনাগোনা ছিলো তার রঙ্গমহলে। অনেকেই তার সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলো। এবং অনেকেই জমিদারের অনৈতিক আচরণ এবং তিরষ্কারের শিকার ছিলো , তারা হয়তো কড়া নজর রেখেছিলো আর সুযোগ খুঁজছিলো প্রতিশোধ নেবার। আজ যখন সুযোগ পেয়েছে তখন সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে !

 

যাই হোক, সে নির্বোধ অহংকারী অত্যাচারী জমিদার অমানুষিকভাবে অত্যাচার করতে লাগলো নিজের বিশ্বস্ত পুরোনো দাসদাসীদের উপরে। নারী, বৃদ্ধ, যুবক কেউ বাদ পড়েনি সেই শাস্তি থেকে। তার এই বর্বর শাস্তি সহ্য করতে না পেরে বেশ কয়েকজন মারা যায়। এদের মাঝে এক মাঝ বয়সী বিধবাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ! কিন্তু সে মৃত্যুর কিছু মুহূর্ত আগে সভায় রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার করে অত্যাচারী জমিদারকে অভিশাপ দিয়ে যায় !

সে অভিশাপ দিয়ে যায়,‌ জমিদারের খুব শীঘ্রয়ী ব্যাথার কঠিণ এক রোগে মৃত্যু বরণ করবে ! তার বংশের সমস্ত প্রদীপ আস্তে আস্তে নীভে যাবে ! তার বংশে কোন পুরুষ থাকবে না সব অকালে মরে যাবে ! জমিদার বাড়িতে শুধু শোক আর শোক থাকবে ! জমিদারের পত্নী, মেয়েরা এবং পুত্র বধুরা সব অকালে বিধবা হবে !

 

সত্যি এই অভিশাপের একবছর পার হতেই জমিদার হঠাৎ কঠিণ ব্যাথার ব্যাধীতে মারা যায়, কোন কবিরাজ তাকে সুস্থ করতে এমনকি বাঁচাতেও পারেনি। তার মৃত্যুর পরে এক এক করে তার সাত পুত্র অকালে মরে যায়। তাদের ঘরেও কোন পুত্র সন্তান ছিলো না জন্মের পরই মারা যায় ! জমিদারের মেয়ে দুটিও অকালে বিধবা হয়ে ফিরে আসে জমিদার বাড়িতে, মায়ের কাছে। কারণ আস্তে আস্তে জমিদারের এই অত্যাচার এবং জমিদার পরিবারের অভিশাপের কথা লোক মুখে ছড়িয়ে পড়ে ! প্রত্যেকে তাদের ঘৃণা অবজ্ঞার চোখে দেখতে থাকে ! জাঁকজমকপূর্ণ জমিদার বাড়ি আস্তে আস্তে লোক শূণ্য হয়ে যায় ! জমিদার পুত্রবধুরা চলে যায় জমিদার বাড়ি ছেড়ে। পড়ে থাকে শুধু জমিদার পত্নী এবং তার দুই কন্যা। কচি বয়স আর অপরুপ সুন্দরী জমিদার কন্যারা কিন্তু অকালে মৃত্যুর ভয়ে কেউ তাদেরকে বিয়ে করতে আসেনা ! খুব কষ্টে, অভাবে কোনরকমভাবে দিন কাটতে থাকে তাদের। একসময় তারাও মরে যায় আর মরে পড়ে থাকে তাদের নিথর দেহগুলো জমিদার বাড়িতে। কিন্তু কেউ খোঁজও নিতে আসেনি তাদের…! পরবর্তীতে ঐ জমিদার বাড়ি এক অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি হয়ে থেকে যায় ! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কখনও আসতে রাজি হয় না এখানে। মাটির উপরে জীবন্ত কবরের মহল হয়ে থেকে যায় এ বাড়ি…..।

 

এভাবে কত রাজবাড়ি জমিদার বাড়ি অন্ধকার অভিশপ্ত ভূতুড়ে বাড়ির পরিচয়ে যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে…!

 

কোন নিরপরাধ কোন দুর্বলের উপরে অত্যাচার করে কেউ কোনদিন রেহাই পায়না। কারো ক্ষতি করে কারো কোনদিন ভালো হয়না। অহংকার, হিংসা, লোভ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় আর এটাই চিরন্তন সত্য।