ইয়োরু-সান নি তোদোকে অথবা রাত্রিনামা

Now Reading
ইয়োরু-সান নি তোদোকে অথবা রাত্রিনামা

এই শহরে রাত্রি নামে কেউ থাকে না।

এখানে রক্ত মাংসের কোন পুতুল পাওয়া যাবে না যার নাম রাত্রি।

এই পৃথিবীর প্রাচীন বা আধুনিক,

সরস বা নীরস,

মৃত বা জীবিত,

কোন বায়ুতেই রাত্রি কখনো নিঃশ্বাস নেয় নাই।

এই শহরের কোন বয়সী বৃক্ষের পাতাকে শখ করে কখনো সে একটু ছুঁয়েও দেখে নাই।

ঝিগাতলার মোড়ে প্রচন্ড রোদে রাজা সিটি বাসে বসে

সে কখনোই কপালের ঘাম মুছে অতি বিরক্তি নিয়ে

পাঁচ পাঁচটা সেকেন্ড নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে নাই।

 

রাত্রির স্রষ্টা আমি।

তাকে আমি নিজের মতো করে, একদম

নিজের হাতে বড় যত্ন করে তৈরি করেছি।

(হাতে কীভাবে? মাথায় হবে, মাথায়।কিন্তু “নিজের মাথায় সৃষ্টি করেছি” খুবই বিশ্রী শোনাচ্ছে।)

সে আমার অলস অনুর্বর মস্তিষ্কের ফসল, শুনেছি

অলস মস্তিষ্ক নাকি শয়তানের আস্তানা

তারপরো, তারপরো কীভাবে কীভাবে যেন এই অলস মস্তকে,

এই গোবর ভরা দুর্গন্ধময় মৃত্তিকার রুক্ষ বুকেই

শত আলোকবর্ষের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের মতো এক পদ্মফুলের জন্ম!

সেই পদ্মফুলটার নামই রাত্রি।

 

রাত্রি আমার নিজস্ব সৃষ্ট ভ্রম, রাত্রি কুহক,

এই পৃথিবীর কোন মানব সন্তান কখনো রাত্রিকে দেখে নাই।

রাত্রি আমার হ্যালুসিনেশন, আমার মানসিক রোগ।

সে মিথ্যা জেনেও মাঝেমাধ্যে মাঝরাতে আমি তোতাপাখিটাকে খামচে ধরে

রাত্রির আত্নাকে টান দিয়ে বের করে নিয়ে আসি,

আত্নাটাকে হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখি।

কোনটা সত্য,কোনটা মিথ্যা, কোনটা সঠিক,কোনটা বেঠিক

শাশ্বত কিংবা বিভ্রমের জাগতিক সীমাকে অতিক্রম করে

আমি দেখি, অবাক হয়ে দেখি!

একজন অপ্সরীর স্নিগ্ধ শরীরের সুমিষ্ট ঘ্রাণে আমার ঘরটা জীবন্ত হয়ে উঠছে!

নেশা নেশা লাগে, আমার মাথা বনবন বনবন বনবন করে ঘোরে।

এটা কি বোধ? এটা কেমন বোধ? এটাই কি জীবনানন্দের সেই বোধ

যেটা তাকে মড়ার খুলির মতো করে ধরত?

আমার কিন্তু ভালোই লাগে, হ্যাঁ খুব ভালো লাগে।

খুব খুব খুব ভালো।

 

রাত্রি আমার মাদক,আমার মারণনেশা!

এই মাদককে আমিই আবিষ্কার করেছি, বানিয়েছিও নিজেই,

স্বেচ্ছায় মিশিয়েছি নিজের শরীরের প্রতিটা কোষে, রক্তে,

স্বেচ্ছায় খুঁড়েছি নিজের কবর এবং সেই কবরে আমি ঢুকেও গেছি।

দেখেন আগুনের সাথে নেশার কি অবাধ সম্পর্ক!

সিগারেট,ইয়াবা থেকে গঞ্জিকা এরা নিজেরাও আগুনে পোড়ে

যে নেয় তাকেও ধীরে খুব ধীরে কিন্তু পোড়ায়,

কিন্তু রাত্রি নামক মাদকটা কি অসম্ভব রকমের শীতল!

আমার মুঠো করা হাতও ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে।

তারপরো আমি অজানা অনলে পুড়ে ছাই হয়ে যাই!

আমার সৃষ্ট নরকে আমারই দহন ঘটে!

আমি পুড়ি হ্যাঁ আমি জেনে শুনেই পুড়ি।

রাত্রি নামক মাদকটা কিন্তু নিজে পোড়ে না, আমাকে পোড়ায়,

ভীষণভাবে পোড়ায়।

এবং জানেন পৃথিবীর সব মাতব্বর,সকল সবজান্তাওয়ালাদের

দ্বারে দ্বারে গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি,

সাধুর পায়ের তলায় পরে থেকেছি দশ কোটি বছর,

শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক , যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিকের জুতা পালিশ করতে করতে চকচকা বানিয়ে দিয়েছি,

খরচ করেছি কোটি কোটি কোটি কোটি সেকেন্ড

কিন্তু নাহ! কেউই পারল না সন্ধান দিতে!

কারো কাছেই এই মাদক থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় নেই।

এই আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় পার্থিব কোন সত্তাই জানে না।

কোন মতব্বরের বাচ্চা শালারা কিছুই বলতে পারল না।

কি ভয়ংকর কথা, না?

 

রাত্রি কখনো ঢাকা কলেজের গলিতে দাঁড়ানো মামার ভেলপুরি খায় নাই।

আমি তাকে সেই ভেলপুরি খাওয়াই।

রাত্রি কখনো ২৭ নাম্বারে দুপুরে ধুম করে নামা ঝুম বৃষ্টি

রিক্সায় বসে বসে অবাক হয়ে দেখে নাই।

আমি তাকে সেই বৃষ্টি দেখাই।

রাত্রি কখনো মতিঝিল থেকে হেঁটে হেঁটে আরামবাগের রাস্তা হয়ে কমলাপুর কবরাস্থানের পাশের চটপটি ফুচকার দোকানটার ফুচকা খায় নাই।

আমি তাকে সেই ফুচকাও খাওয়াই।

এই পৃথিবীর যা আমাকে আনন্দ দেয়,

যা আমাকে হাসায়, যা সচল রাখে আমার হৃদয় নামক রক্ত পাম্পের যন্ত্রটাকে,

যা আমার জট ধরা চুলকেও উড়ায় মন খারাপ করা বাতাসে,যা আমাকে দুই হাতে আগলে রাখে

তার সবটুকু হ্যাঁ সবটুকুই আমি নির্দ্বিধায় রাত্রির হাতে তুলে দেই।

শুধু একটা, একটা আনন্দই আমি কখনো তাকে দিতে পারি না

আমার একটা নেশা আছে, যে নেশা আমাকে খুবলে খুবলে খায়,

যার নির্দয় কঠোর আঘাতে ফিনকি দিয়ে উঠে রক্ত,

আফসোস, এই রক্তের কোন রঙ নেই।

আমার একটা “রাত্রি’’ আছে

কিন্তু হায়!

রাত্রির কোন “রাত্রি” নেই।

এই আহত হওয়ার আনন্দ সে ছুঁয়ে দেখতে পারে না।

এই আনন্দ গলির পথ তার অচেনা।

এই ব্যাপারে সে অজ্ঞ।

 

আমি যে বৃষ্টি দেখেছি সেই বৃষ্টির সীমায় রাত্রি কখনো ছিল না,

আমি যে কৃষ্ণকায় মেঘের নীচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা গাছের পাতা ছিঁড়ে গেছি

সেই মেঘের আলো রাত্রির কর্নিয়াকে কখনোই স্পর্শ করে নাই

আমি যেই ট্র্যাফিক জ্যামে বসে আজকে সন্ধ্যার বৃষ্টি দেখে ফেললাম সেই জ্যামে রাত্রি কোন অস্তিত্ব কি আছে?

কোথায় তুমি রাত্রি?

আমার কোনো অংশে কি তুমি আসলেই আছ?

 

তারপরো বাসে বসে বসে এই বেরসিক বৃষ্টি দেখে কেন আমার তোমাকে স্মরণ হয়?

কেন আমার তোমার কথাটাই মনে করতে হলো?

কেন মনে পড়তেই হলো?

কেন এতকিছু লিখে যেতে হলো?

কে বলবে?

কে জানে!

 

যেহেতু আমার হাতেই রাত্রির জন্ম,

সেহেতু একদিন আমার হাতেই তার বিনাশও হওয়ার কথা।

মাঝেমধ্যেই ভাবি নিজ হাতে তাকে খুন করে গুম করে ফেলি

কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হয়

রাত্রি নিজেই তো একটা মারণাস্ত্র!

তাকে আমি খুন করব কীভাবে?

বুলেট দিয়ে কাউকে হত্যা করা যায় সেটা সত্য

কিন্তু বুলেটকে আবার হত্যা করে কীভাবে?

রাত্রি একটা মারণাস্ত্র, রাত্রি আমারই বানানো ফ্র্যাকেন্সটাইন যে তার স্রষ্টার বিনাশের খলনায়ক(?)

রাত্রি আমার কাপুরুষতার পরিচয়,

রাত্রি আমার প্রশ্রয় দেওয়া সত্যের ক্ষয়,

রাত্রি আমার ঢাল-

যাকে ব্যবহার করে আমি খুব একটু আলাদা সেজে নিই!

তবে আমাকে হত্যা করার অধিকার এবং সামর্থ্য খুব সম্ভবত শুধু রাত্রিরই আছে।

এক্ষেত্রে আমার কি কিছু করার আছে?

যে স্বেচ্ছায় শূলে চড়তে চায় তাকে কে ঠেকিয়ে রাখবে বলেন!

 

আচ্ছা এত কথা রাখো, রাত্রি একটু শোনো তো

খুব ভালো করে ,আরে একটু মনোযোগ তো দাও,

এই লেখাটা একটু দেখ তো

পুরা লেখাটাতে কি একটা বাক্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা না?

পুরা লেখাটার প্রতিটি বাক্যই কি “তোমাকে ভালোবাসি,রাত্রি” বলছে না?

ইয়োরু মানে জানো তো?

ইয়োরু অর্থ হলো রাত,রাত্রি,নিশা,নিশি,যামিনী।

একটা বিষয় জানো

যত সহজে আই লাভ ইউ বলে ফেলা যায় তত সহজে কিন্তু “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলা যায় না।

নিজের ভাষাটা বড় আপন,বড় কাছের,বড়ই বোধ্য, লজ্জাটা একটু বেশীই লাগে।

আমারো লইজ্জা করে,খুব খুব লজ্জা!

“ইয়োরু-সান, সুকি দেশিতা।

হোন্তোনি সুকি দেশিতা।

হোন্তো দা!

হোন্তো হোন্তো হোন্তো!

সুকি সুকি সুকি!’’

 

আমার আকাশে,

আমাদের আকাশে আজ সন্ধ্যায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল

তোমার ওখানকার খবর কি?

তোমাদের ওখানে কি আজ বৃষ্টি নেমেছিল?

তোমার আকাশে কি এখন আর বৃষ্টি হয়?

 

( পাদটীকাঃ ইয়োরু একটা জাপানী শব্দ। ইয়োরু-সান নি তোদোকে এর অর্থ “To, miss Yoru” অথবা এভাবেও বলা যায় “Reach, miss Yoru.” যে কয়টা জাপানি বাক্য ব্যবহার করেছি সেগুলোর বঙ্গানুবাদ করে দিলাম,

“ রাত্রি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

আসলেই ভালোবাসি।

এটা সত্য!

সত্য সত্য সত্য!

ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি!

 

জাপানি ভাষার প্রতি বেশ দূর্বলতা এবং টুকটাক ভাষাটা জানা থাকার কারণে রাত্রির সাথে এই লুকোচুরিটা খেলা গেল।হা হা হা )

পড়ালেখার কচকচানি

Now Reading
পড়ালেখার কচকচানি

এসএসসিতে যখন আমার মাত্র ০.০৬ এর জন্য জিপিএ ফাইভ মিস হয়ে যায় তখনই আমি জীবনের প্রথম পৃথিবীর চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হই। বাবা মা থেকে শুরু করে সবার একটাই কথা ,ছেলে গেল। ছেলের ভবিষ্যত শেষ। এই ছেলে দিয়ে আমি কী করব! আত্মীয় স্বজনরা আসেন, এসে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করেন আর যাওয়ার সময় শুনিয়ে যান ওনার দেবরের শালার কাজিনের ফুফুর ভাগ্নের মেয়ে গোল্ডেন পেয়েছে, শুনছি মেয়ে নাকি নটরডেমে(What the **** is that) ভর্তি হতে চায়। পাশের বাসার আন্টি আসেন। এসে প্রচুর চা নাস্তা খান আর যাবার সময় শুনিয়ে যান আমার যে জিপিএ তাতে আমি কোথাও কোন ভাল কলেজে চান্স পাব না! 

এই তো গেল পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনদের কথা। এবার বলি আমার কথা।

স্কুলে শেষ দু বছর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে যখন ক্লাস টেনে টেস্ট পরীক্ষা আসে, তখন আমার হুঁশ হয় যে আমাকে এবার ভালো করতে হবে। চারদিকে যে অবস্থা জিপিএ ৫ না পেলে আমার ইজ্জত শেষ। শুরু করলাম পড়াশোনা। প্রতিদিন সকাল বেলা উঠি উঠে প্রাইভেটে যাই বিভিন্ন ব্যাচে যাই প্রাইভেট পড়ার জন্য। প্রাইভেট থেকে স্কুলে, স্কুল থেকে আবার প্রাইভেটে। প্রাইভেট থেকে এসে সন্ধ্যায় বাসায় পড়তে বসা। সব মিলিয়ে ভালই পড়াশোনা হচ্ছিল। এর মাঝে টেস্ট পরীক্ষা আসে, দেই ,রেজাল্টও বের হয়। পুরো স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় মাত্র ৪টা এ প্লাস। এর মাঝে আমি কেমনে যে ঢুকে গেলাম আমি নিজেও জানিনা! সবাই অবাক। এইটা কেমনে হল! আমি সেই পরিমাণ ভাব নিয়া চলা শুরু করলাম। ধরাকে সরা জ্ঞান করে  চলার ফল বেশিদিন ভাল হয়না বলে গুরুজন লেভেলে বলা হয়ে থাকে। গুরুরা হয় বৃদ্ধ আর বৃদ্ধদের কথা আমার মত ১৬ বছরের ছেলে তখন কেন শুনবে!

এর ফল আসতে বেশিদিন সময় লাগেনা। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে কেমিস্ট্রি পরীক্ষার সময়েই আমি বুঝে যাই যে ড্যাড অলওয়েজ উইনস। পরীক্ষার হলে বসে নিজের চুলটা খালি ছেঁড়া বাকি রেখেছিলাম তখন। ইশ! কেন যে তখন জৈব যৌগটা আরেকটু ভালমতন পড়লাম না! পরীক্ষার হলে কোনমতে বের হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। হায়রে সামনের পোলাটা না থাকলে আজকে শর্টের সময় গেছিলাম আরেকটু হলেই…

ফিজিক্সের সময়ও একই কাহিনী। টেস্টে এ প্লাস পেয়ে আমার মাঝে একটা ফালতু আত্মবিশ্বাস এসে গেছিল, যে অনেক পড়াশোনা করে ফেলেছি, টেস্টে যখন এ প্লাস পেয়েছি তখন আসলটাতেও পাব! যাই হোক পরীক্ষা শেষ হল। ভাবলাম যে ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রিতে এ প্লাস না পেলেও চলবে, বাকিগুলায় পেলেই এ প্লাস! আশার পালের হাওয়ার পানে চেয়ে রইলাম, তিনমাস পর রেজাল্ট।

তিনমাস গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরলাম,ক্রিকেট খেললাম,ফুটবল খেললাম। ফ্রেন্ডদের অনেকেই হয় স্পোকেন আর নয়তো কম্পিউটারের ক্লাস করায় তখন ব্যাস্ত কিন্তু আমি  ওসব কিছুর ধার না ধরেই উড়াধুড়া চলাফেরা করতাম। রাত হলে ঘুমাতাম পিডিএফ পড়তাম আর দিন হলে রোদে রোদে ঘুরতাম। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি টেস্ট পরীক্ষার আগে এক বালিকাকে প্রপোজ করেছিলাম অনেক আশা নিয়া,কিন্তু বালিকা এখনো সাড়া দেয় নাই! প্রতিদিন বালিকার আশায় পথ চেয়ে বসে থাকতাম এই বুঝি বালিকা ফোনে কোন মেসেজ দিল! এই বুঝি বালিকা রাস্তা দিয়ে এল! এই বুঝি এসে বলল ভালোবাসি তোমায়! কিন্তু না, বালিকা আর আসে না, এসে বলেনা ভালোবাসি, এসে হাতটা আর ধরে না।  এরমাঝে রেজাল্ট বের হল। রেজাল্ট পেয়ে সকলেই হায়হায় করে উঠল। আর কী কী করল সেটা আগেই বলেছি। রেজাল্টের দিন সন্ধ্যায় বালিকা ফোন দিয়ে খোজখবর নিল। ভালমন্দ সান্ত্বনা দিল। সারাদিনের সকল কষ্ট দূর হয়ে গেল বালিকার একটু খানি মাত্র ২ মিনিটের জন্য কন্ঠ শুনেই। এর কয়েকদিন পরই বালিকা ভালোবাসি বলে দিল। আরও বলেদিল যদি কখনো ছেড়ে যাই তবে মেরে আমার ঠ্যাং গুঁড়ো করে দিবে! ঠ্যাং ভাঙ্গার ভয়েই হোক আর যেভাবেই হোক বালিকাকে আমি ছাড়ি নাই, বালিকাও এখন পর্যন্ত আমাকে ছাড়ে নাই…

তো যাই হোক সবাই যখন ধরে নিল যে আমার দ্বারা আর কিচ্ছু হবেনা, আমি তখন বিভিন্ন কলেজের ফর্ম কাটায় ব্যাস্ত। এতক্ষণে বলা উচিত ছিল কিন্তু আমার বলা হয় নাই। আমি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার এক অঁজপাড়াগায়ে থাকতাম। নটরডেম,রাজউক,ক্যান্টপাবলিক কলেজে আমার অতি অল্প জিপিএ নিয়ে ভর্তি হওয়া তো দূরে থাক ফরমই কিনতে পারব না। কী করা যায় এটা নিয়ে যখন ভাবছি তখনই বিমান বাহিনী আমার এলাকায় একটা মহৎ কাজ করল! বি এ এফ শাহীনের একটা শাখা একটা আগে থেকেই ছিল, সেটাকে কলেজ পর্যন্ত বর্ধিত করে দিল। অনেক আশা নিয়ে ভর্তি হলাম। এবারে আমি শুরু থেকেই সিরিয়াস। যেভাবেই হোক আমাকে মেডিকেলে চান্স পেতেই হবে, জিপিএ ফাইভ পেতেই হবে।

প্রথম থেকেই একটু আধটু সিরিয়াস থাকায় আর ডিফেন্সের কলেজে একটু চাপ বেশি থাকায় অলওয়েজ পড়াশোনা করা লাগত। যার ফলে প্রথম দিককার ক্লাস টেস্টগুলোতে ভাল করে স্যারদের সুনজরে এসে পড়লাম। বলা হয়ে থাকেনা যে ফার্স্ট ইম্প্রেশন ইজ দ্যা লাস্ট ইম্প্রেশন। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা এল হায়ার ম্যাথে টেনেটুনে পাশ করলেও  বাকিগুলায় ভালভাবে পাশ করে যৌথভাবে ৫ম হলাম( আমার জীবনের সবচেয়ে কম র‍্যাংকিং!)। কলেজের প্রথমদিকেই স্যাররা বেশ ভালো মতন মোটিভেট করত যে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা কিছুই না সব পরীক্ষার বাপ হচ্ছে গিয়ে এডমিশন টেস্ট। তুমি এইচএসসির পরে কোন লাইনে যাবা এটা এখন থেকে লক্ষ্য ঠিক করে সে অনুযায়ী পড়াশোনা শুরু কর।

আমার প্রথম থেকেই না বুঝে মেডিকেলের জন্য বেশ ভালমতন একটা ঝোঁক কাজ করত। আমি ডাক্তার হবই এই কথা আমি একশ বার লিখে আমার পড়ার টেবিলে টানিয়ে রাখতাম। কিন্তু একদিন বায়োলজি সেকেন্ড পার্ট বই অর্থাৎ জোলোজি বই দেখে, আর পরিচিত একজনের মেডিকেলের বই দেখে আমার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় ( বলা ভাল দৌড়ে পালায়!)।

ডাক্তার হবার কাহিনী তো শেষ এখন বাকি রইল কী ? ইঞ্জিনিয়ারিং। আমাকে যেমনেই হোক বুয়েটে চান্স পেতে হবে নাইলে আমি শেষ। এই কথা ৫০০ বার লিখে দেয়ালে টানিয়ে দিলাম! ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স পাবার জন্য কী কী করা লাগে সব করলাম। ফিজিক্স বইয়ের আগাগোড়া যত সূত্র আছে সব দু বছরে আয়ত্ব করে ফেললাম। খালি সূত্রই শিখলাম না সূত্রর প্রয়োগ করাটাও শিখে নিলাম ভালোমতন। আফটার অল আমি মনে মনে তখন ডিক্লেয়ার করে দিলাম আমার এলাকায় ফিজিক্স নিয়ে আমার সাথে কেউ কখনো পারবে না!( মনে মনে কারণ আমি ভিতু  বলে কথা! দু বছর পড়েই একটা ছেলে তার শিক্ষকদের টক্কর দিবে এটা কেমন কথা!)

ফিজিক্সে খুব ভাল বেসিক আমার সেই ৯-১০ থেকেই ,এটা আরও শাণিত হয় ইন্টারমিডিয়েটে উঠে। কিন্তু শুধুমাত্র ফিজিক্স দিয়েতো আর বুয়েটে চান্স পাওয়া যায় না ম্যাথ আর কেমিস্ট্রিও লাগে। আর দূর্ভাগ্যবশত যদি বুয়েটে না পাই তবেতো কুয়েট,চুয়েট,রুয়েটে দৌড়াতে হবে ওখানে তো আবার ইংরেজী লাগে। এখন উপায়! ফেসবুকে  বুয়েট কুয়েট রুয়েট চুয়েট এডমিশন হেল্পলাইন নামে একটা পেজের মাধ্যমে এক বড়ভাইর সাথে পরিচয় হয়,(এই ভাইর কাছেই ভার্সিটিতে উঠে জীবনের প্রথম র‍্যাগ খাই!) ভাই নানানরকম সাজেশন দেন। বলেন যে কলেজে থাকা অবস্থায় ভুলেও এডমিশন টেস্ট নিয়া বেশি মাথা ঘামাবা না,ভার্সিটির কোয়েশ্চন গুলা সমাধানের চেষ্টা করবা না,আর ভুলেও বিচিত্রা,প্লাস সিরিজ, রকেট সিরিজ এই টাইপের বইগুলা এখন কিনবা না। জাস্ট এইচএসসির উপযোগী পড়াশোনা করে যাও। আমি ভাইয়ের কথা রাখলাম, কোন আউলফাউল কাজ করলাম না আঁতেলদের মতন পড়াশোনা করে গেলাম!(ভুয়া কথা খালি রাতেই পড়তাম,তাও বেশি হলে ৩-৪ ঘন্টা!)

ফিজিক্সে আমার বেসিক খুব ভালো, কিন্তু ম্যাথে একেবারে যাচ্ছেতাই,কেমিস্ট্রির অবস্থা আরো খারাপ। কেমিস্ট্রি নিয়ে ভুগতে হল না। কলেজের যে কেমিস্ট্রি স্যার ছিলেন তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই ইন্টারমিডিয়েটের কেমিস্ট্রি পড়ানোর জন্য একজন বস পাবলিক। যে জিনিসগুলা আগে মাথার উপরে দিয়া যেত, সেগুলা মাথার মধ্য দিয়ে যাওয়া আরম্ভ করল! কেমিস্ট্রি বুঝা শুরু করলাম , খুব বেশি না তবে আগের তুলনায় ভাল। সব কিছুই ভাল মতন বুঝতাম তবে জৈব যৌগ পড়লে মাথা আউলায়া যাইত! এই জৈব যৌগ এমন একটা জিনিষ কেউ যদি টানা তিরিশ দিন এটা পড়ে আর ৩১ নাম্বার দিন না পড়ে তবে ৩২ নাম্বার দিন আবার গোড়া থেকে সব ভুলে যাবে! নানান কষ্টের মাঝে থেকেও জৈব যৌগ পড়াটা শেষ করলাম। কেমিস্ট্রিকে আয়ত্তের মাঝে নিয়ে এলাম। বাকি রইল ম্যাথ। পুরানা দিনের একটা স্কুলে পড়েছিলাম। স্যারগুলা থাকত সব প্রাইভেট পড়ানোর ধান্দায় যার ফলে প্রাইভেট পড়ে অংক মুখস্ত করে এসএসসি পাশ করেছিলাম। বেসিক বলতে সম্বল ছিল পীথাগোরাসের সূত্র অতিভুজ ২ =লম্ব + ভূমি। এই সম্বল নিয়ে আর যাই হোক বুয়েটে চান্স পাওয়া যায় না! এবারো বাঁচিয়ে দিল কলেজের টিচার, ওনার পাল্লায় পড়েই মূলত আমার ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে স্বপ্ন জেগে ওঠে। ম্যাথের ফার্স্ট যে বিষয়ের বেসিক তিনি আমার ভাল করেন সেটা হচ্ছে গিয়ে জ্যামিতি। ওনার পাশাপাশি ইউটিউব ঘেটে চমক হাসান ভাইয়ের গণিতের রঙ্গে সিরিজ, জাফর ইকবাল স্যারের গণিত সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, হুমায়ুন আহমেদ স্যারের বই, অন্যরকম পাঠশালার কিছু ভিডিও দেখে আমার বেসিক পুরোপুরি ভাল হয়ে যায়। যেকোনো টাইপের ম্যাথ দিলে করতে পারতাম কিন্তু বইয়ের ম্যাথগুলা কেন জানি করতে পারতাম না, এ নিয়ে আমার দুঃখ জীবনেও যাবে না( ভার্সিটিতে আসার পরও এই জিনিসটা কাটে নাই। কোর্সের ম্যাথ করতে পারি না। করতে গেলে মাথা ঘুরায়।)। তারপরও হাল ছাড়ি নাই। গণিত অলিম্পিয়াডে মাহমুদুল হাসান সোহাগ ভাইয়ের একটা কথা মনের মাঝে একদম গেঁথে যায়।

“জীবনে কোন কিছু পেতে হলে কখনো হাল ছাড়া যাবে না। আঠার মতো লেগে থাকা শিখতে হবে। ”

ভাইয়ের কথা মানার জন্য আমি লেগে থাকার থিওরিটা প্রথম এপ্লাই করি রুবিক্স কিউব মেলানো শিখার সময়। এবং হাতে হাতে ফল! শিখে যাই রুবিক্স কিউব মেলানো  ( আমার এখনো মনে আছে পথে প্রান্তরে যেখানেই থাকতাম ভাব নেয়ার জন্য রুবিক্স কিউব মিলাতাম তখন) । দ্বিতীয়বার এপ্লাই করি ম্যাথ বুঝার জ

ন্য আর ম্যাথ সলভের ট্যাকনিক গুলা আয়ত্তের জন্য। এখানেও দারুণ ফল। সোহাগ ভাই আর তার উদ্ভাসের পুরো ফ্যান হয়ে যাই আমি। সিদ্ধান্ত নেই যে যদি ভার্সিটি কোচিং করতেই হয়, উদ্ভাসে করব।

বন্দুক কামান সবকিছু নিয়ে যখন আমি রেডি তখন প্রথম যুদ্ধ হিসেবে এল টেস্ট পরীক্ষা। আমি তখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে, বন্দুক কামান সবকিছুই ঝকঝকে টেস্টে পেয়ে গেলাম গোল্ডেন এ প্লাস। আবারো আমার মাঝে চলে এল ড্যাম কেয়ার ভাব , পড়াশোনা ছেড়ে দিলাম। ঘোরাঘুরি শুরু করে দিলাম। এসএসসিতে আমার সাথে যা হয়েছিল তার সবকিছুই ভুলে গেলাম, এবারো হয়তো আগের ফাঁদে পড়তাম কিন্তু বাঁচিয়ে দিল বিএএফ শাহীন! কীভাবে? মডেল টেস্ট নামক পরীক্ষা দিয়ে। যাচ্ছেতাই খারাপ রেজাল্ট করে যখন আত্মবিশ্বাস আবার কমে গেল তখন নতুন করে বন্দুক কামানগুলোর জং ধরা ওঠালাম। ঝকঝকে তকতকে করে ফেললাম ফিজিক্স সব সূত্র, কেমিস্ট্রির সব বিক্রিয়া, ম্যাথের সব ট্যাকনিক। এইচএসসি পরীক্ষা চলে এল। খুবই ভাল পরীক্ষা দিলাম। খালি কেমিস্ট্রি ফার্স্ট পার্ট একটু ঝামেলা বাঁধিয়ে দিল। বেশি সুবিধার পরীক্ষা হল না কিন্তু আমি আশার বীজ বুনে ততদিনে অপেক্ষা করে চলেছি। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা শেষ করে ঢাকায় চলে এলাম এডমিশন টেস্টের কোচিং করার জন্য। এসে প্রথমদিন উঠলাম খালাতো বোনের বাসায়। প্রথমদিন যেয়েই ভর্তি হয়ে এলাম উদ্ভাসে। সাথে করে উদ্ভাসের বিশাল গাট্টি বয়ে আনলাম সেই ফার্মগেট থেকে মিরপুর পর্যন্ত!

খালাতো বোনের বাসায় খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোন সমস্যাই ছিলনা। মোটামুটি রাজার হালেই থাকছিলাম কিন্তু এই রাজার হালে থাকার ফলে পড়ালেখায় মন বসাতে পারছিলামনা। তাই তাদের বাসা থেকে আলাদা হয়ে তিন জন কলেজের ফ্রেন্ড জোগাড় করে চলে গেলাম মেস এ। ঢাকা প্রথমবার দেখে যেরকম বিমোহিত হয়েছিলাম সে মোহ ৯০% কেটে যায় মেসের রুম,রান্নাঘর বাথরুম দেখার পর। তিনজন মানুষ গাদাগাদি করে ফ্লোরিং করে ঘুমাতাম।

এক সপ্তাহের মাঝেই শুরু হয়ে গেল উদ্ভাসের ক্লাস। সবগুলা ভাইয়াই জোশ জোশ ক্লাস নিয়া গেল দিনের পর দিন । উইকলি টেস্টের দিন আসল। প্রথমবার ঢাকায় এক ঘোরাঘুরি করে মোহ না কাটতে কাটতেই পরীক্ষা চলে এল, এ আবার কেমন কথা। কিছুই না পড়ে পরীক্ষা দিলাম। ফলাফল ৩০০ তে ৩০। পরের সপ্তাহে উইকলি টেস্টে ৩০০ তে ১৫। সিরিয়াল ১৫-২০০০০ এর কাছে চলে এল! আমি পুরাই ডিপ্রেসড। এর মাঝে আবার শুনলাম উইকলি টেস্টে ভাল না করলে নাকি স্পেশাল ব্যাচে চান্স পাওয়া যায় না! উদ্ভাসেই যদি এ অবস্থা হয়। এডমিশন টেস্টগুলায় না জানি কী হয়! আমার দ্বারা হয়তো আর হবে না।

ডিপ্রেশন কাটানোর জন্য কলেজের এক ম্যাডামকে ফোন দিলাম, ম্যাডাম আর ওনার তখনকার হাসবেন্ড(ওনার এখন ডিভোর্স হয়ে গেছে) আমার আরেক টিচার মিলে অনেক সময় ধরে বোঝালেন। ডিপ্রেশন একটু কাটল। গেলাম উদ্ভাসের এক টিচারের কাছে, উনি বুয়েটের সিভিলে পড়তেন বর্তমানে পাশ করে বের হয়ে গেছেন। উনিও বেশ ভালভাবে বোঝালেন,” আরে বেটা এগুলা কোন ব্যাপার না, উদ্ভাস খালি কনসেপ্ট বুকের ওই কঠিন প্রশ্নগুলাই করে। এগুলা কখনো ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় আসে না। ভর্তি পরীক্ষায় আসে হচ্ছে অনেক সহজ আর ট্রিকি কোয়েশ্চন। তুই যদি খালি যেকোনোভাবে ভার্সিটিতে চান্স পেতে চাস তবে বেশি করে প্র্যাকটিস কর আর কোয়েশ্চন ব্যাংক সলভ কর। তারপরও যদি তোর উদ্ভাসের লিস্টে প্রথমদিকে আসতে মন চায় তাইলে যা নেক্সট উইকলির জন্য যে কনসেপ্ট বুক আছে ঐটা মুখস্ত করে ফেল!”

ভাইয়ের কথা পালন করলাম,তবে দ্বিতীয়টা। কনসেপ্ট বুক  মুখস্ত  করে ফেললাম চারদিন কষ্ট করে। অতঃপর উইক্লি টেস্ট এল, দিলাম। অবিশ্বাস্য মার্ক পেলাম ৩০০ তে ২৮০। মেরিট ১৬৫। জাস্ট এই একটা পরীক্ষা ভাল হওয়ার কারণে চান্স পেয়ে গেলাম তুখোড় ব্যাচে! এরপর পালন করলাম ভাইয়ের প্রথম কথা। কনসেপ্ট বুক দিত, ছুড়ে ফেলে দিতাম। বইয়ের ম্যাথলা আগে করতাম, তারপর করতাম ভার্সিটির কোয়েশ্চন ব্যাঙ্কের অংক। তারপর সময় পেলে গিয়ে করতাম কনসেপ্ট বুকের অংক। এখানে বলে রাখা ভাল যে কনসেপ্ট বুকের অংকগুলা আসলেই মাথার উপরে দিয়া যেত। এগুলো কখনোই কোনো ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় আসবে না, শুধু শুধু এগুলোর পিছনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না।

পুরনো কামানগুলাকে ঘষে মেজে একেকটাকে একে-৪৭ গান বানায়া ফেললাম! উদ্ভাসের পরীক্ষা নিয়া তেমন সিরিয়াস হলামনা। পড়ালেখা খুব সতর্ক ভাবেই করতাম।

এরই মাঝে এইচএসসির রেজাল্ট দিল। জিপিএ ফাইভ ও পেলাম কিন্তু গোল্ডেন মিস করে বসলাম তাও ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রিতে এ প্লাস মিস। তারমানে আমি বুয়েটে পরীক্ষা দেওয়ারই অযোগ্য হয়ে গেলাম। সেই সাথে কুয়েট রুয়েট চুয়েটও অনিশ্চিত। প্রচণ্ড পরিমাণ খারাপ লাগতে লাগল, যে আমি বুয়েট বুয়েট করে সারাদিন চিৎকার দিতাম তার কী হবে… যে আমি সবসময় বলতাম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব, তার কী হবে?  অনেকেই সান্ত্বনা দিত অনেকেই কটু কথা বলত অনেকেই পেছন থেকে বলত যে হুদাই সারাদিন পড়ালেখা করছে কোথাও চান্স পাবেনা দেখে নিস।

আমি সকলের কথা মনযোগ দিয়ে শুনতাম,এক কান দিয়া ঢুকাতাম আরেক কান দিয়ে বের করতাম। এই পৃথিবীতে সবার কথায় কান দিলে আমার চলবে না। সংকল্প করে ফেললাম, যেভাবেই পারি যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেতেই হবে। কারণ আমার বাবার সেই সামর্থ নেই যে আমাকে প্রাইভেটে পড়াবেন। সম্পূর্ণ নতুন উদ্দমে নতুন প্যাটার্নে পড়াশোনা শুরু করলাম( যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের প্যাটার্ণ  আর সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের প্যাটার্ন সম্পূর্ণ আলাদা।) ।

প্রতিদিন একটা একটা অধ্যায় আর তার সাথে কোয়েশ্চন ব্যাংক এর সমাধান চালিয়ে যাই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এর মাঝে তাদের সার্কুলার ছাড়ে আমি স্বনামধন্য বেশ কয়েকটায় এপ্লাই করি( ঢাবি,চুয়েট,কুয়েট,জবি,জাবি,সাস্ট,চবি,কুমিল্লা,নোয়াখালি, এর মাঝে চুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমি শর্টলিস্টেড হই নি)।

প্রথম পরীক্ষা আসে জাহাঙ্গীরনগরে। প্রশ্নের প্যাটার্ণ সম্পূর্ণই আলাদা। দিলাম, হল মোটামুটি। রেজাল্ট দিল পরেরদিন, মেরিট লিস্টে আমার নাম নেই। হতাশ হলামনা , পরেরদিন আরেকটা ইউনিটে জাহাঙ্গীরনগরেই। দিলাম এবারেও হল না। এবং যথারীতি এবারেও হতাশ হলামনা। আমার প্রস্তুতির মাঝে অনেক বড় একটা খুঁত বের করলাম। আমি নিজেকে নিজে জাজ করতে পারি না, ফাস্ট ক্যালকুলেট করতে পারি না। এর মাঝে ফাস্ট ক্যালকুলেট করার গুরুত্ব ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায় অনেক। এখানে সময়ের অভাবে অনেক ভাল ছাত্রও চান্স পায় না। তো যাই হোক। নিজেকে নিজে জাজ করাটা অভ্যাসের মাধ্যমে শিখে নিতে হয় যা অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, অথচ ঢাকা ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার সময় বাকি আর মাত্র ২ সপ্তাহ। তাই করলাম কী ফাস্ট ফাস্ট ক্যালকুলেট করাটা আয়ত্ত করতে লাগলাম। মোটামুটি আয়ত্তে আসার পরও চালিয়ে গেলাম, লেগে থাকলাম। ঢাকা ভার্সিটিতে সকালে পরীক্ষা দিলাম,বিকালে দিলাম জগন্নাথে। দুটোই বেশ ভাল হল। রাতেই ছুটলাম চিটাগাং। ওখানে পরেরদিন পরীক্ষা দিলাম। সন্ধ্যাতেই রেজাল্ট দিয়ে দিল চান্স পেলামনা। হতাশ না হয়ে পরেরদিন বায়োলজি ইউনিটে পরীক্ষা দিলাম। সন্ধ্যায় রেজাল্ট দিল মেরিট লিস্টে ১০০! জীবনের প্রথম কোন ভার্সিটিতে চান্স পেলাম! আহ ভর্তি হব ফার্মেসিতে স্বপ্ন দেখতে লাগলাম শেভ্রন,স্কয়ার,বেক্সিমকো আমাকে লাখ টাকা দামের চাকরি অফার করে টানাটানি করছে। আর ঠিক তখনই কে যে আমার গালে একটা চড় দিল(হয়তো আমার বিবেক) চড় দিয়ে বলল,” খুব তো লাফাইছিলা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব, ইঞ্জিনিয়ার হব। আর এখন! শালা ফার্মাসিস্ট হব!)

বিবেকের চড় খেয়ে বাস্তবে ফিরে এলাম, পরেরদিন ঢাকা ভার্সিটিতে রেজাল্ট দিল ২৬০০ তম হয়েছি। এই রেজাল্ট দিয়ে ভাল কোন সাব্জেক্টে পড়া ইম্পসিবল। তারপরও হতাশ হলামনা। জগন্নাথে সিরিয়াল এল ৪৪০০। এটাও বাদ। সামনে কুয়েটে পরীক্ষা, আবার কয়েকদিন ভালমতন পড়লাম,ফাস্ট ক্যালকুলেট করাটা চালিয়ে গেলাম। খুলনার ডেট এল, চলে গেলাম খুলনায়। মৃদুল ভাই নামে ইউ আরপির একভাইকে বলতেই উনি একুশে হলের ওনার সিটটা আমাকে ছেড়ে দিলাম। ঢাকা থেকে আমার আরো একঝাক ফ্রেন্ড এল। ওদের জন্য রুমের অন্য ভাইরা তাদের সিট ছেড়ে দিলেন। পরদিন পরীক্ষা দিলাম। কোয়েশ্চন মারাত্বক লেভেলের কঠিন, প্রথম আধাঘন্টা খালি মাথা চুলকাইছি, হায় আল্লাহ এসব কী! তারপরও কিছু কিছু দাগালাম। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আশা একেবারেই ছেড়ে দিলাম। কয়েকদিন পর রেজাল্ট দিল, ১৯০০ তম হয়েছি। অনায়াসে সিভিল,ইউ আরপি পাওয়া যাবে। যাক জানে একটু পানি ফিরে এল। চান্স তো কিছু একটায় পেলাম! কিন্তু আমার আত্মীয়স্বজনরা এদিকে হায় হায় রায় রায় রব তুলে ফেলেছেন। এই ছেলে কোথাও চান্স পেলনা! সবখানে খালি ওয়েটিং। তাদের কারো কথায় কোন কান না দিয়ে আমি ফাস্ট সলভিং  ট্রাই করে গেলাম। সাস্টে এর কিছুদিন পর পরীক্ষা।

সাস্টে পরীক্ষা দেবার জন্য সিলেট এলাম,পরীক্ষারদিন সকালে প্রিয়তমার সাথে দেখা করেই তারপর ঢুকলাম পরীক্ষা দিতে। প্রশ্ন হাতে পেয়েই বুঝলাম, এটাই এতদিন দরকার ছিল। সাবধানে ইংলিশ দাগিয়ে শুরু করলাম তারপর ফিজিক্স। ফিজিক্স ২০টার মাঝে আমার ১৯টাই দাগালাম।( এবং সবগুলাই সুদ্ধ)। কেমিস্ট্রি কোয়েশ্চন দেখে আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে গেল। এ কী দেখছি। মনে হচ্ছিল আমি আবার স্কুলের দিনগুলোয় ফিরে গেছি। যখন আমি কেমিস্ট্রি কিছুই পারতাম না। ২০ টার মাঝে মাত্র ৪টা দাগালাম। ম্যাথ ও বেশ ভাল হল। ২০টার মাঝে আনুমানিক ১৮টা দাগিয়েছিলাম।

দুদিন পর রেজাল্ট হবার কথা। হলনা। তিনদিন পরও হলনা!

চারদিনের দিন রাত ১১টায় এক ফ্রেন্ড ফোন দিয়ে বলে তোর রোল বল। বললাম। কিছুক্ষণ পর ফোন দিয়ে বলে কান্ডতো ঘটায়া দিছো!

আমি ভাবলাম এবারো বোধহয় হলনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,

-কি? আসে নাই না?

-আরে শালা ৩৪৭মতম হইছত। জলদি ঢাকায় আয়, অনেকদিন হয় কাচ্চি খাই না!

 

বিস্ময়ে থ হয়ে গেলাম। বলে কী। আমি ৩৪৭! ওর কথা বিশ্বাস না করে নিজে চেক করলাম। আরে আসলেইতো! ৩৪৭! যাক অবশেষে একটা ভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চান্স পেলাম, তাও যেনতেন ভার্সিটিতে না, বাংলাদেশের ২০১৫সালের এক নাম্বার ভার্সিটিতে! যেনতেন সাব্জেক্টে না মেকানিক্যালে!

স্বপ্নটা পূর্ণ হল! পুরোমাত্রায় না হলেও ৭০.% দিয়েই! তা আর খারাপ কী , একজীবনে সবার তো আর ১০০% স্বপ্ন কখনো ফুলফিল হয় না!

 

বিঃদ্রঃ সামনেই এডমিশন টেস্ট। আমার এই আর্টিকেল যদি একজন ডিপ্রেসড ছাত্রকেও হেল্প করে তাহলেই ভাবব যে ৪ ঘন্টা ধরে করা কষ্ট আমার স্বার্থক!

বিঃদ্রঃ ২ঃ  ঘটনার স্থান কাল পাত্র সবটাই কাল্পনিক। ভুলেও কারও সাথে যদি মিলে যায় তবে তাতে লেখকের দোষ নেই। আর যদি লেখকের কোন আত্মীয় এই আর্টিকেল পড়েন তবে ভুলেও এরমাঝে লেখককে মেলাতে যাবেননা!!!