নির্মম সাইকো: ভালোবেসে খুন!

Now Reading
নির্মম সাইকো: ভালোবেসে খুন!

ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে চিরুনিটা হাতে নিলো আবার রেনু। “যাক এখন একটু শান্তিতে সাজুগুজো করা যাবে!”
অনেক দিন পর নিলয় এর সাথে দেখা করতে যাচ্ছে রেনু। সকাল থেকেই কেমন একটা ফুরফুরে মেজাজে আছে। কখনো খুশি মনে রুম গোছগাছ করছে,কখনো গুনগুন করে গান গাইছে আর মিটিমিটি হাসছে আপন মনেই!
মায়ের পুরনো নীল শাড়িটার ভাজ খুলে ন্যফথালিনের টুকরো দুটো জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলতেই পাশের টিনের চালায় টুংটাং শব্দ তুললো ওগুলো।
 শুনেই ফিক করে দুষ্টুমির হাসি আসলো রেনুর মুখে। ইচ্ছে হলো এক বালতি ন্যাফথালিন এনে ঢেলে দিক, কেমন মধুর শব্দের ঝংকার তুলবে ওগুলো!
চুলগুলো খোঁপা করবে নাকি,ছেড়ে রাখবে বুঝতে পারছেনা। “”নিলয় যেনো কোনটা পছন্দ করে?” চোখ কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করলো রেনু।
একদিন হাটতে হাটতে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিলো, সেই সাথে প্রচন্ড ঝরো বাতাস!
 নিলয় হঠাৎ টান মেরে চুলের কাটা খুলে নিয়েছিলো রেনুর, বলেছিলো, “খোলা চুলেই দারুন লাগে তোমাকে।” ওটা মনে পড়তেই মনে মনে  স্বীদ্ধান্ত নিলো, “আজ চুলটা ছেড়েই যাবো। হালকা ভেজা লম্বা চুল, আঁচল ছেড়ে শাড়ি, ভালোই লাগবে ওর!”
“নীল শাড়ি সাদা পাড়,
সাথে নীল টিপ পড়বো নাকি লাল?” আবারো চিন্তায় পড়ে গেলো রেনু। “আচ্ছা সবই নীল পড়িনা কেনো আজ?
নীল শাড়ি,
নীল টিপ,
নীল চুড়ি,
নীল দুল,
নীল মালা! নিলয় তো চোখই ফেরাতে পারবেনা। ভাবতেই যেনো কেমন লাগছে!”
হঠাৎ দেয়াল ঘড়িটায় নজর গেলো রেনুর। “পাঁচটা পঁচিশ বেজে গেছেে! সাতটার মাঝেই তো নিলয় পৌছে যাবে!”
তাড়াহুরো করে বের হলো রেনু। “ভাগ্যিস কাঁধ ব্যাগটায় আগে থেকেই সব গুছিয়ে রেখেছিলো!  ঢাকা শহরে কোথাও যেতে হলে এক দু ঘন্টা আগে না বেরুলে হয়?”
ধানমন্ডি,ভুতের আড্ডা রেষ্টুরেন্ট।
 আগেও নিলয়ের সাথে অনেকবার এসেছিলো এখানে, ওয়েটার এগিয়ে এসে একটা খালি টেবিলের কাছে পৌছে দিলো রেনুকে
হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর আস্তে করে রেখে চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো ও। চারপাশ থেকে কয়েক জোড়া চোখ অনুসরন করছে বুঝতে পারছে রেনু।”নিলয়টা সব সময়ই লেইট আসবে,ঝর-ঝাপটা যাবে আমার উপর দিয়ে। আর পারিনা উফ!”
প্রায় দুই ঘন্টা পর নিলয় এলো।
-স্যরি, আসতে দেড়ী হয়ে গেলো। কেমন আছো তুমি?
বিরক্তিতে নাক মুখ কালো করে রেখেছে রেনু। নিলয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। ওর কোলের বাচ্চাটা একদম সুমিতার মতো হয়েছে!
 বাচ্চাটার শান্ত ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সুদূর অতীতে ফিরে গেলো রেনুর মনটা।
“নিলয় আর সুমিতা পাশাপাশি স্টেজে বসে আছে। ফটোসেশন চলছে অনবরত। সুমিতাকে অসম্ভব মিষ্টি লাগছে দেখতে, মুখে সারাক্ষন একটা মিষ্টি হাসি ছড়ানো।
রেনুকে কমিউনিটি সেন্টারের ওদের রুমটায় ঢুকতে দেখেই নিলয় চোখ ফিরিয়ে নিলো। সম্ভবত চারদিন আগের রেনুর সুমিতার প্রতি বিশ্রী ব্যবহারটা মনে পড়ে গিয়েছিলো!
নিলয় ভাবতেই পারেনি এতদিনের টিচার-স্টুডেন্টের সম্পর্কের বাইরেও রেনুর মনে আরো কিছু ছিলো!
তাও নাহয় থাকলো, তাই বলে সুমিতাকে নিলয় ভালোবাসে, বিয়ে করতে যাচ্ছে জানতেই রেনু অমন বিগড়ে  গিয়ে উগ্র মূর্তি ধারন করবে নিলয় ভাবতেই পারেনি।
 ওরই সামনে, দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে সুমিতাকে লক্ষ্য করে রেনু যখন ফুলের টবটা ছুড়ে ফেলেছিলো নিলয়ের মুখে কোন কথাই ফুটছিলোনা সেদিন!
সেই ই শেষ। তারপর গত পাঁচ বছর রেনুর আর খোজ রাখেনি নিলয়। শুনেছিলো বার্ডেম হসপিটালে সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ অর্নব এর কাছে চিকিৎসা হচ্ছে রেনুর। নিলয়ের কাছে শেষ খবর এটুকুই।”
 রেনুর চ্যাপ্টারটা সে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো।
 গত পরশু তাই ডঃ অর্নবের ফোন পেয়ে বেশ অবাকই হলো নিলয়।
বললেন, নিলয় সুমিতার সাহায্য দরকার ওনার। নিলয় প্রথমে রাজি হয়নি, পুরনো কাঁসুন্দি ঘেটে আবার কোনো বিপদ আনতে চায়নি নিলয়। কিন্তু সুমিতার চাপাচাপিতেই শেষে দেখা করতে রাজি হলো ও। রেনুকে কল দিয়ে বললো দেখা করতে চায় ওর সাথে।
রেস্টুরেন্টে চুপচাপ বসে এখন দুজনই ভাবছে কিভাবে কথা শুরু করা যায়। রেনুই কথা শুরু করল,
– আপনার পছন্দের নীল শাড়ি পড়েছি আজ। কেমন লাগছে বললেন না?
“নীল তো আমার পছন্দের রং নয় রেনু” বলতে গিয়েও কি ভেবে চুপ করে গেলো নিলয়। এতদিন পর দেখা করেই এত শক্ত কথা বলা ঠিক হবেনা।
– ভালো লাগছে রেনু।
  কিছু খাবে? অর্ডার দেবো?
– “হুম পাস্তা আনতে বলুন। আর আপনার জন্য চিকেন চাপ।” এটাও নিলয়ের সবচেয়ে অপছন্দের খাবার, তবুও নিলয় কিছু বললেনা। ওয়েটারকে ডেকে অর্ডার দিলো।
চুপচাপ খাওয়া শেষ করলো দুজন। নিলয় খেয়াল করেছে, রেনু এক দৃষ্টিতে সেই তখন থেকে তাকিয়ে আছে নিলয়ের  দিকে।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, একদমই ফাকা এখন রেস্টুরেন্টটা। এদিক ওদিক তাকিয়ে দূরের টেবিলে আবছা অন্ধকারে একজনকে দেখতে পেলো নিলয়, কি যেনো খাচ্ছে একমনে!
ওদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেনুকে দেখলো নিলয়। একটু অপ্রস্তুতের হাসি দিয়ে বললো,
  -রেনু, রিমঝিমকে একটু রাখবে? একটু ওয়াশ রুম থেকে আসছি আমি।
-দিন আমি নিচ্ছি।
হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে কোলে নিলো রেনু। নিলয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো, চোখ দুটো সুন্দর চকচককে আভায় জ্বলছে রেনুর। আবছা আধারে যেনো রহস্যময়ী লাগছে দেখতে!
 হেটে এসে মোড় ঘুরেই ওয়াশ রুমের দরজাটার পেছনে লুকালো নিলয়। দূর থেকে রেনুর ডান হাতটাকে কয়েক ইঞ্চি বড় লাগছে এখন!!
  আবছা আলোয় কেমন চকমক করে ওঠলো!
ওটা একটা চাকু রেনুর হাতে!!
হঠাৎ বারংবার চাকুটাকে উপর নিচে ঝিলিক মেরে ওঠতে দেখে গাঁ টা কেমন গুলিয়ে ওঠলো নিলয়ের।
       ওখানে, টেবিলে শুয়ে থাকা রিমঝিমের মতোই বানানো বাচ্চা ডামিটার জায়গায় নিজের সন্তানকে কল্পনা করে ভেতরটা কেমন করে ওঠলো ওর।
কি ভয়াবহ আক্রোশ ওই সাইকো টার ভেতর জমাট বেঁধে ছিলো এতদিন!!
দূরে জমাট বাঁধা অন্ধকারে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো ডঃ অর্নবও।
  “যাক, আক্রোশ মিটলো রেনুর। দীর্ঘ পাঁচ বছরের সিজোফ্রেনিয়া আর মেন্টালি ডিজঅর্ডার সমস্যায় জর্জরিত ওর এই সুন্দরী রোগীটা  হয়তো একটু একটু করে স্বাভাবিক হওয়া শুরু করবে এইবার!!”