সাগরতলের এক বুদ্ধিমান প্রাণীঃ ডলফিন

Now Reading
সাগরতলের এক বুদ্ধিমান প্রাণীঃ ডলফিন

ডলফিন মানেই আমাদের কাছে বিদেশী “জন্তু” হলেও আমাদের দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা জাতের ডলফিন। আমাদের দেশের অনেক নদী ও সমুদ্রসীমায় সাঁতার কাটে এরা। নদী খালগুলোয় হঠাৎ চোখে পড়ে এদের। নৌকায় করে চলতে ভয়ে হঠাৎ ভুশ করে ভেসে উঠে আবার আবার ডুবে যায় মেটে রঙের একটি প্রাণী। কাউকে জিজ্ঞাসা করলে হেসে বলে উঠে “শুশুক”।কিন্তু এটি নিখাদ এক প্রজাতির ডলফিন। আমাদের দেশে রয়েছে ডলফিনের কয়েক প্রজাতির এই দুর্লভ সম্পদ। এই ডলফিনকেই নিয়ে আজকের লেখা। দেখা যাক আমদের দেশের এই দুর্লভ সম্পদ গুলোকে-

সাগর মহাসাগরের প্রাণীকুল নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভাবনার যেনো শেষ নেই। তারা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন এসবের রহস্য উদঘাটনে। সফলও হয়েছেন, হচ্ছেন। তারপরও থেমে নেই তারা। আর থামবেনই বা কেনো? সাগরের হাজারো প্রাণীর রহস্যও হাজারো রকম। এসব রহস্য উদঘাটন করে তা মানবকল্যাণে ব্যবহার করাই তাদের উদ্দেশ্য। আসলে সাগর তলে কত প্রজাতির প্রাণী রয়েছে তার আসল হিসাব দেয়া কারো পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। আজ আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি সাগর তলের এক অদ্ভুত প্রাণী যাকে আমরা কমবেশি সাগরে হারানো নাবিকের ডাঙায় আসার পথের সাহায্যকারী হিসেবেই চিনি, আর সে হলো ডলফিন। যার বুদ্ধিমত্তা শিয়ালের চাইতেও বেশি ঠিক মানুষের পরে।

বুদ্ধির দিক দিয়ে শিয়ালকে আমরা চালাক বলে স্বীকার করে থাকি। তবে কুকুর, বানর, হাতি, ঘোড়াও কিন্তু চালাকিতে পিছিয়ে নেই।এদের বুদ্ধিমত্তার নজির আমরা সব সময় দেখি। এই ধরনের একটি বুদ্ধিমান প্রানীর হচ্ছে ডলফিন। ডলফিন এর বুদ্ধিমত্তা মানুষের পরে যদিও আমরা ভুলে শিয়ালকে মানুষের চেয়ে প্রানীদের মধ্যে সর্বোচ্চ বুদ্ধির প্রাণী বলে থাকি। ডলফিনের বুদ্ধিমত্তা, ক্রীড়া দক্ষতা ও বন্ধুসুলভ স্বভাবের জন্য ডলফিন খুবই জনপ্রিয়। পানির নিচের সংবাদ পৌঁছানো আহত ডুবুরীদের ও তাদের হাঙ্গরের শিকার থেকে রক্ষা এবং তাদের ডুবোজাহাজ খোঁজার জন্য ডলফিন ব্যবহৃত হয়। এজন্য ডলফিনকে মানুষের বন্ধু বলা হয়।

আকার-আকৃতিঃ
সাধারণত ডলফিন গড়ে ২.৪ মিটার লম্বা ও ওজন ৭৫ কেজি হয়।এদের গড় আয়ু প্রায় ৫০ বছর অর্থাৎ আপনি একটু ডলফিনকে পালন করলে আপনার সারা জীবনে পোষা প্রানী হিসেবে ডলফিনকে সাথে পাবেন। ডলফিন অর্থ ঠোঁট, এদের নাক ঠোঁটের মত হয়। শরীর লম্বাটে, লোমহীন। এদের ১৬০-২০০ টি ধারালো দাঁত থাকে। এরা সারা জীবনে একটি মাত্র বাচ্চা দেয়। এদের শরীরে চর্বির একটি স্তর তাদের শরীরকে ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা করে।
স্বভাবঃ প্রতিটি ডলফিন আলাদাভাবে শিস বাজাতে পারে। এ শিসের সাহায্যে এরা নিজেদের মধ্যে তথ্যের আদান প্রদান করে থাকে।ডলফিন বাচ্চা প্রসবের কয়েকদিনের মধ্যেই তার বাচ্চাকে এই শিস বাজানো শিখায়। এ ইইসের মাধ্যমে তারা তাদের মাকে সহজেই সনাক্ত করতে পারে।

প্রজাতিঃ
সামুদ্রিক ডলফিন প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩২ টি এবং স্বাদু পানির ডলফিনের সংখ্যা ৫টি। এরা দক্ষিন আমেরিকা ও দক্ষিন এশিয়ার বাসিন্দা। বাংলাদেশে ৪ প্রজাতির সামুদ্রিক এবং ১ প্রজাতির স্বাদু পানির ডলফিন রয়েছে।

পৃথিবীর খুব কম দেশের নদীতে মিষ্টি পানির ডলফিন দেখা যায়।আমাজন নদীতে মিষ্টি পানির ডলফিন আছে। মায়ানমার এর ইরাবতী মোহনায় কিছু ডলফিন আছে। চীনের ইয়াংজি নদ এবং পাকিস্তানের সিন্ধু নদে মিষ্টি পানির ডলফিন দেখা যায়। আর ভারত, নেপাল, বাংলাদেশের নদীগুলোতে মিষ্টি পানির গাঙ্গেয় ডলফিন আছে। অবশ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি সিন্ধু নদের ডলফিন গাঙ্গেয় ডলফিনের একটি প্রজাতি। আমাদের দেশে যেসব ডলফিন রয়েছে সেগুলো এখন আপনাদের কাছে তুলে ধরছি।

503eb842e2e1793e698debd4f43414d1-1t.jpg

গাঙ্গেয় ডলফিনঃ
আমাদের দেশে খুব চেনা এই গাঙ্গেয় ডলফিনের (Platanista gangetica) গাঁয়ের রঙ হয় কালচে বাদামি অথবা মেটে। আঁটসাঁট লম্বা শরীর, মাথা গোলাকার, ঠোঁট সূচালো, দুই পাশের পাখনা ও খাঁড়া লেজের পাখনা শক্তিশালী, পিঠের দিক্টা সামান্য উঁচু ত্রিকোনা, চোখ অত্যন্ত ছোট। শুশুক প্রায় অন্ধ প্রানী। শুধু আলোর হ্রাস-বৃদ্ধিটা এরা একটু বুঝতে পারে। এরা বাদুড়ের মতো “ইকো লোকেশন” এর মাধ্যমে শিকারের অবস্থান বুঝে নেয়। শুশুক অবশ্য মোহনার লবণ পানির নদীতেও দেখা যায়। তবে এরা সাগরে যায় না।

Mekong_Irrawaddy_Dolphin_breaching_(c)_WWF_Greater_Mekong.jpg

ইরাবতী ডলফিনঃ
বঙ্গোপসাগরে মোহনার নদী কর্ণফুলী, মেঘনা, ফেনী, বলেশ্বরসহ সুন্দরবনের লবণ পানির নদী খালে দেখতে পাওয়া যায় ইরাবতী ডলফিন (Oracaella brevirostris)। এরা শুশুকের চেয়ে গাঢ় বর্ণের। ঠোঁট নেই, মাথা ভোঁতা, দুই পাশের পাখা শক্তিশালী, পিঠের পাখাটি ছোট ত্রিকোণাকার। এরা শুশুকের মতো লাফঝাঁপ করে না, ধীরেসুস্থে ভেসে আবার ডুবে যায়। শুশুকের পাশাপাশি শিকার করে তবে একসাথে দলে দু-তিনটির বেশি দেখা যায় না। ইরাবতী নদীর মোহনার চেয়ে সুন্দরবনের খাঁড়িতে এদের বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী ৫,৮৩২টি ডলফিন এবং ৪৫১টি ডলফিন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ঈষৎ লবণাক্ত পানিতে বসবাস করে।

river_pig.jpg

রিভার ফিনলেস পরপয়েসঃ
আকারে ছোট, কালচে রঙের আরেক ধরনের ডলফিন আমাদের সুন্দরবনের বড় নদীতে দেখা যায়। দেখতে অনেকটা ছোট আকারের ইরাবতী ডলফিনের মতো। নাম রিভার ফিনলেস পরপয়েস। এদের বৈজ্ঞানিক নাম Neophocaena phocanides। এরা অত্যন্ত লাজুক। জাহাজ বা নৌকা থেকে অনেক দূরে ভেসে ওঠে।

Red-Dolphin-400x300.jpg

গোলাপি ডলফিনঃ
সুন্দরবনের বড় নদীর খাঁড়িগুলোর পানি শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে এলে গোলাপি ডলফিন (Souuca chinensis) সাগর থেকে খাঁড়িতে ঢুকে পড়ে। এরা আকারে শুশুকের চেয়ে বেশ বড়। গায়ের রঙ হালকা বাদামির সঙ্গে গোলাপি আভাযুক্ত, তবে বাচ্চাদের রঙ কালচে। এরআআ অত্যন্ত চতুর প্রাণী, চার- পাঁচটি মিলে দল গঠন করে। এরা সাধারণত মাছ খায়, তবে কাঁকড়া, স্কুইডও এদের হাত থেকে রক্ষা পায় না।

Bottlenose-Dolphin-450x350.jpg

বোটল-নোজ ডলফিনঃ
অতলস্পর্শ এলাকায় দেখা মেলা তিন প্রজাতির ডলফিনের একটি হলো বটল-নোজ ডলফিন (Tursiops truncatus)। এরা আকারে মোটামুটি বেশ বড় এবং ঠোঁট লম্বাটে। এরা খুব আমুদে প্রাণী। বটল-নোজ ডলফিন জাহাজ বা জেলে নৌকার কাছাকাছি থেকে সাঁতরাতে ভালোবাসে। একে বলে “বো রাইডিং”। পৃথিবীর যেসব অ্যাকুরিয়ামে ডলফিন শো হয়, সেখানে এই ডলফিনের ব্যাপক চাহিদা।

স্পটেড ডলফিনঃ
এই প্রজাতির ডলফিনও বঙ্গোপসাগরে দেখা যায়। এদের ঠোঁট লম্বাটে, পিঠের পাখার তলার দিকটা ছড়ানো, শীর্ষ দেশ সুচালো। এরাও দলেবলে শিকার করে।

কোন দেশের নদীর পানি গুলো কতটা দূষনমুক্ত সেটা কিছুটা বুঝা যায় সেখানে ডলফিনের অস্তিত্ব দেখে। ডলফিন দূষণমুক্ত পানিতে অবস্থান করে। কিন্তু দিন দিন আমাদের দেশের নদ-নদীগুলোর পানি  দূষিত হওয়ার কারণে এই দুর্লভ প্রাণীটি তার অস্তিত্ব সংকটে। আমাদের উচিত পানি দূষণ যাতে না হয় তার সঠিক খেয়াল করা।