রহস্য চারিদিকে পর্ব—-২

Now Reading
রহস্য চারিদিকে পর্ব—-২

 

প্রথম পর্বের পর

পৃথিবী বলুন,  আকাশ বলুন, সাগরে বলুন, পাতালে বলুন—অথবা মহাকাশে কিম্বা বিগ ব্যাং এর পর ন্যানো সেকেন্ড থেকেই শুরু হয়েছে রহস্যের জাল বুনুন । আপনি বলবেন বিজ্ঞান তো এক সময় সবই প্রমান করে দিবে । আমিও বলি হয়তো ঠিক কথা । কিন্তু যতক্ষণ না প্রমান হচ্ছে ততক্ষন সেটা একটা গভীর রহস্য । সর্বত্র সবখানে সব সময় চারিদিকে রহস্য ঘিরে আছে । আছে গল্প,  গাঁথা, কাহিনী ।  আছে সত্য মিথ্যার অসংখ্য মিথ । আছে অবিশ্বাস্য ব্যখ্যাহীন অমীমাংসিত ঘটনা । আমি তুমি সে , সকলেই কিছু শুনেছ, দেখেছে, কিম্বা অনুভব করেছে । কেউ বিশ্বাস করেছে , কেউ করেনি । কেউ হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, কেউ ভয় পেয়েছে । কেউ গবেষণা করছে, কেউ এড়িয়ে যাচ্ছে । এসবে কম বেশি সন্দেহ সবাই করে তো বটেই , যার সাথে ঘটেছে সেও বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাখ্যাহীন জালে আবদ্ধ হয়ে যায় এক সময় । আর নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে থাকে, যেমন–  ‘’ আরে ? আমার সাথেই এটা ঘটেছিল ? আসলেই কি এমন কিছু হয়েছে ? এমনও কি হয় ? এটা কেমন করে হতে পারে ? এর কি ব্যাখ্যা ?’’ ইত্যাদি ।

-আমি এই সব কাহিনীর কিছু কিছু আপনাদের  সামনে তূলে ধরবো । এর কিছু নির্ভেজাল ভাবেই সত্য । যার সাথে ঘটেছে , সে ছাড়া অন্য সবাই সত্য মিথ্যার পাল্লার এপাশ ওপাশ দুলতে থাকে । থাকুক । কিন্তু রহস্য সব সময়ই কৌতুহলজনক । আবিস্কারে তাইতো এতো আনন্দ ।

এই পৃথিবীতে বাস্তবিক ও কাল্পনিক , দুই ধরনের মানুষ আছে । কিছু প্রজাতি এমনও আছে যাদেরকে না বাস্তবিক না কাল্পনিক বলা যাবে । এটা এ জন্য যে না এদের উপস্থিতির কোন সঠিক উপযুক্ত প্রমান আছে আর না এদের অস্তিত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে । এরা এতটাই রহস্যময় হয় যে এদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান কারও কাছে নেই ।

 

-এমনই একটি প্রজাতির নাম ভ্যাম্পায়ার । ড্রাকুলা নামেও  এরা খুব পরিচিত । এরা না পুরোপুরি মানুষ না জানোয়ার । না জীবিত না মৃত । ইতিহাস ও নানান দলিল দস্তাবেজ দ্বারা এটাই বলা যায় , এরা সময় সুযোগ মত রাতের আঁধারে কবর থেকে উঠে এসে মানুষ বা জানোয়ারের রক্ত পান করে ভোর হবার আগেই আবার কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ে । আবার রাত হলেই শিকার খুঁজতে বের হয় । এভাবেই চলতে থাকে ।

dracula.jpg

hqdefault.jpg

-বিজ্ঞানও এটা মানছে যে ভ্যাম্পায়ার আছে, তবে তা কোন সুপারন্যাচারাল কিছু নয়, বরং এটা একটি রোগ । মানুষ বা জানোয়ারের রক্ত পান করার রোগ । রোগী ব্যক্তির রক্ত পান করা একটি নেশা ।  কোন জীবিত প্রাণীর রক্ত পান করলে তাদের ভালো লাগে, শক্তি অনুভব করে । রক্ত পান করতে না পারলে অস্থির উদ্ভ্রান্ত হয়ে বেহুশও হতে পারে । এখনও এর কোন চিকিৎসা আজও পাওয়া যায় নি ।

-বিজ্ঞানকে পাশে রেখে যদি কাহিনী, ইতিহাস ও বর্তমান নানান ঘটনাকে দেখি —

 

-১৭শ শতকের দিকে এমন ঘটনা বেশি শোনা যায় । ১৭শ থেকে ১৭শ ৩০ শতাব্দীকে ড্রাকুলার সময় বলা হয় । ওই  সব দিনে  ইংল্যান্ড ও ইউরোপে লোক ভাম্পায়ারের নাম নিতেও ভয় পেতো ।  ইউরোপে তখন এমন বহু ঘটনার বর্ণনা বিভিন্ন কাহিনী ও পুস্তকে দেখা যায় ।

– রোমানিয়ার ট্রান্সীল্ভ্যানিয়ার রাজা vlad tepes   এর কারপেথিয়ান পর্বতমালার উপর, প্রাসাদ দুর্গ ।ইংরেজ আইনজীবী  জোনাথন পার্কার এর সাথে কাউন্ট ড্রাকুলাকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ভ্যাম্পায়ার কাহিনীটি  এই প্রাসাদ থেকেই শুরু ।

images (9).jpg

লেখক  ব্রাম স্টোকার  ১৮৯৭ সালে তার  উপন্যাসে রক্তপায়ী ড্রাকুলার বর্ণনা  করার পর থেকেই আজ অবধি ভ্যাম্পায়ার চরিত্রটি তুমুল জনপ্রিয় । এবং এর জনপ্রিয়তার কৃতিত্ব একমাত্র এই উপন্যাসেরই ।

tintinrocks_1303922216_6-Dracula-Year-Zero.JPG_595.jpg images (21).jpg

এই গল্পে কাউন্ট ড্রাকুলা তার সঙ্গী তিন নারী সহযোগে রক্তপান করে একে অন্যের এবং ধরে আনা শিকারের । এই কাহিনীর পটভূমিতে অসংখ্য গল্প, নাটক, ও মুভি তৈরি হয়েছে । ও হচ্ছে ।

ইতিহাসের চরিত্র – হাঙ্গেরিতে  ১৫৬০ সালে জন্ম নেয়া এলিজাবেথ বাথরি নামের এই নারীকে  ব্লাড কাউন্টেস নামেও ডাকা হয় ।  এলিজাবেথকে ইতিহাসের ক্রুরতম মহিলা হিসাবে জানা হয় ।

6_244680.jpg

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এ এলিজাবেথ বাথোরি সবচেয়ে বেশি খুন করা নারী রানী । তাকে জীবন্ত ভ্যাম্পায়ার বলা হয় । এই রানী  বার থেকে চৌদ্দ বছরের মেয়েদের ধরে এনে ভীষণ কষ্ট দিয়ে নতুন নতুন কৌশল বের করে মারত । আর ওদের শরীরের রক্ত দিয়ে গোসল করতো । চিরকাল সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য । তার বিশ্বাস ছিল এটা যে যদি যুবতি নারীর তাজা রক্তে গোসল করা হয় তবে সে অনন্তকাল সুন্দর থাকবে । আর তাই ১৫৮৫ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে সে প্রায় ৬৫০ টি মেয়েকে খুন করে,  নৃশংস বর্বর ধূর্ত এই রানী । শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে  আদালত বিচারে এই ঘৃণ্য নারীকে কারাদণ্ড দেয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয় ।

-হটাত করে মৃত শরীরে বিশ্বয়কর ভাবে জান এসে যাওয়া এই ভ্যাম্পায়ার হয়ে যায় প্রচণ্ড শক্তি, দ্রুতগামিতা, এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী । সবচেয়ে বড় কথা  এরা অমর হয়ে যায়, অর্থাৎ কখনও মরে না । আর এদের ছায়া দেখা যায় না । বলা হয় এরা রক্ত পান করার কারনেই এদের এমন সুপার ন্যাচারাল লাভ ।

-সাভানা নামক একটি জায়গায় একটি ভ্যাম্পায়ারকে স্পট করা গেছে । সি সি টি ভি ক্যামেরায় ধরা পড়া এই ক্লিপটি প্রায় সত্য হিসাবেই ধরে নেয়া হয় । এখানে আয়নার সামনে দিয়ে যাওয়া মানুষটির  কোন ছায়া বা প্রতিবিম্ব বা রিফ্লেক্সন  আয়নায় পড়ে নি । ওই মুহূর্তে ওই আয়নার সামনে হেটে  যাওয়া আর সবারই ছায়া আয়নায় পড়েছে ।

images (15).jpg download (6).jpg

 

ভ্যাম্পায়ার, পিশাচ, আত্মা এদের কোন ছায়া নেই । এটা বা এই জিনিসটা আসলে কি ? তবে এই ছবিটা নিয়ে বহু প্রশ্ন,  তর্ক ও অনুসন্ধানের বিষয় আছে ।

-অরলিন্স নামে একটি জায়গায় পাঁচ হাজারেরও বেশি ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব বিদ্যমান । অনেক নিউজ রিপোর্ট, বি বি সি নিউজ রিপোর্ট এবং যারা ডকুমেন্টরী বানায় তাদের দাবী যে আমেরিকার অরলিন্স নামক জায়গাটিতে ভ্যাম্পায়ার সোসাইটি আছে । এরা একটি স্বতন্ত্র গ্রুপে বসবাস করে ও রাতে রক্ত পান করে । এরা স্বাভাবিক মানুষের মতই । এই কম্যুনিটিটি নিয়ে  ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কিত অনেক প্রশ্ন উঠলেও অতিমানবীয় কোন কিছু আজও ওদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় নি । শুরুতে এরা দুশো ছিল । এবং ক্রমে  বাড়ছে সংখ্যাটা ।

কোথাও কোথাও রক্ত পানের পাশাপাশি ভ্যাম্পায়াররা মাংসও খায় । এমন কথা ভারতে শোনা যায় । তারা রক্ত চোষা বা রাক্ষস নামে সমধিক পরিচিত ।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের দীপা আহিরওয়ার এর কাহিনীটি তখন ভারতে তোলপাড় তূলে । এটা ২০১১ সালের কাহিনী। তিনি পুলিশে অভিযোগ করেন যে তার স্বামী মহেশ আহিরয়ার নিয়মিত তার রক্ত পান করছেন । মহেশ  মানে তার স্বামী এটা না করলে অর্থাৎ দীপার রক্ত পান না করলে খুব  অসুস্থ হয়ে যান । মহেশ যদিও  তার সুস্থতার জন্যই  এটা করছেন, এবং সিরিঞ্জ দিয়েই দীপার থেকে রক্ত নিয়ে পান করছেন, তারপরও দীপা তার প্রথম সন্তান জন্মের পর অসহ্য হয়েই পুলিশে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন ।

-ভ্যাম্পায়ার নিয়ে অতীতে ও বর্তমানে হাজারো কাহিনী ছড়িয়ে আছে পৃথিবীতে । অনেকেই সেসব ঘটনার ভুক্তভোগী ও সাক্ষী এবং তা বিশ্বাস করে । কোনটা আসলেই সত্যি আর কোনটা মিথ্যা সেটা আমরা কেউ জানি না ।  বিজ্ঞান ও জানে না । বিজ্ঞান এখনও এই রহস্যময় ঘটনার কোন ব্যখ্যা দিতে অপারগ । কোন একদিন নিশ্চয়ই পারবে । কিন্ত  বর্তমান পর্যন্ত এই রহস্য বোঝার ক্ষমতা  বা জ্ঞান বিজ্ঞান পায় নি ।

চলবে————

 

 

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা –রচনাকাল

৩০/০৬/২০১৭ইং

 

প্রথম পর্বের লিংক— http://footprint.press/রহস্য-চারিদিকে-পর্ব-১/