3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]

খারাপ লাগছে।মেয়েটা এভাবে অহংকার দেখালো! তার মাঝে কি এমন আছে যে আমি তাকে দেখলে বিয়ের জন্যে ব্যাকুল হয়ে যাব? কথাটায় কেমন যেন একটা অপমান বোধ করছি।ওকে কিছু একটা বলতে পারলে হয়ত মনে একটু শান্তি পেতাম।মেয়েটা এ কাজটা ইচ্ছা করেই করেছে।না হলে এখন মোবাইল বন্ধ করে দিত না।সে জানে এই কথা শোনার পর আমি রেগে যাব,আর যতক্ষণ রাগ মেটাতে পারব না ততক্ষণ আমার কষ্ট হবে।আমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যই হয়ত তার এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনা।

 

দুপুরের দিকে শেফা ফোন করে বলল মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।অবস্থা খুব বেশি ভালো না।স্থানীয় কোন ক্লিনিকে রাখতে চাচ্ছে না।ঢাকায় পাঠাতে হবে।আমি ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করলাম ঘণ্টা খানেকের  মধ্যে।মা ঢাকা এসে পৌঁছলেন বিকেল পাঁচটার দিকে।বার্ডেম হাসপাতালে সুন্দর দেখে একটা কামরা নিলাম।মার সমস্যাটা খুব বেশি শারীরিক না।ডাক্তার বলেছেন,মানসিক ভাবে উনাকে সুস্থ রাখতে পারলে শারীরিক ভাবেও সুস্থ রাখা যাবে।মানসিক দিক থেকে চিন্তামুক্ত করতে পারলেই প্রেশার কন্ট্রোলে  চলে আসবে।

 

মার চিন্তার কারণটা আমি জানি।আশার সাথে আমার বিয়ে নিয়েই যত সব চিন্তার সৃষ্টি।

মানুষের জীবনে অপ্রত্যাশিত অনেককিছুই ঘটে।মানিয়ে নিতে হয়।আমিও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।মানুষের প্রাণশক্তি খুব বেশি প্রখর।এই প্রাণীরা যে কোন কঠিন পরিস্থিতির সাথে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারে।প্রিয়জনদের জন্যে নিজের আশা আকাঙ্ক্ষা অনেককিছুই বিসর্জন দিতে হয়।পিতামাতার চেয়ে বেশি আপন পৃথিবীতে কোন সন্তানের জন্য আর কেউ হতে পারে না।

মার সাথে এত খারাপ সময় আমার আর কখনো যায় নি।মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।সন্ধ্যা বেলায় মার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল।আমি তাঁর মাথার কাছে গিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম,”তুমি যা চাও তাই হবে মা।আমি বিয়েতে রাজি।আশাকেই বিয়ে করব।তুমি কথা বল।“

মা আমার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন।চোখে কষ্ট আর ব্যর্থতার ছাপ সুস্পষ্ট।ক্লান্ত স্বরে তিনি বললেন,”আশা বিয়েতে রাজি না।সে তোকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না।“

“এখন উপায়?”

“আমি অনেক বুঝিয়েছি।কিছুই বুঝতে চায় না।আমাকে বলল,সে নাকি বাসা বদলাবে।সামনের মাসে নাকি গ্রামের বাড়ি চলে যাবে।কাল এসেছিল শেষ দেখা করতে।“

“আর এই জন্যেই তুমি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছ তাই না!”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে শুয়ে আছেন।তাঁকে এখন অবুঝ শিশুর মত মনে হচ্ছে।আমি মায়ের আরও কাছে গিয়ে বসলাম।বললাম,”মা…মেয়েটা যেহেতু বিয়ে করতে চাচ্ছে না,আমাদের তো জোর করা উচিত হবে না।সে ছাড়াও তো দুনিয়ায় আরও অনেক ভালো ভালো মেয়ে আছে।তুমি অন্য কাউকে দেখ।“

মা যেন কিছুটা বিচলিত হলেন।তবে মুখ দিয়ে কিছু বললেন না।আমি পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালাম।দরজা দিয়ে বেরুতে যাব এমন সময় মা খুব শান্ত কোমল গলায় বললেন,”মেয়েটা খুব ভালো রে আহাদ…অনেক লক্ষ্মী।আমার এত ভালো লাগে ওকে…!”

কিছুক্ষণ মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম।তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুটি এখন কেমন ম্লান হয়ে আছে।দুঃখিত,শোকাহত।

 

আমি মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম নিঃশব্দে।হাসপাতালের করিডোরের শেষ মাথায় খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।বাইরে বিশাল আকাশ,তারা গুলো এদিক সেদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছড়িয়ে আছে চারদিকে।আশা মেয়েটার প্রতি একধরনের সম্মান বোধ হচ্ছে।মেয়েটা তার কথা রেখেছে।নিজ থেকে সরে পড়েছে।অথচ আমি মেয়েটাকে নিয়ে কি সব আজেবাজে চিন্তা আর ধারনা মনের মাঝে পুষে রেখেছি।ওকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার।মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল দিলাম।ধরলো না।কয়েকবার চেষ্টা করলাম।লাভ হল না।কিছুক্ষণ পর সে আমাকে একটা মেসেজ দিল।

“আমি আপনাদের পরিবার থেকে সরে এসেছি।আবার কেন যোগাযোগ করতে চাচ্ছেন?আমি আপনার সাথে কোন যোগাযোগ করতে চাচ্ছি না।“

আমি আর কল না দিয়ে একটা ফিরতি মেসেজ পাঠালাম,”আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে কল দিয়েছিলাম।“

পুনরায় মেসেজ,”ধন্যবাদ পেয়েছি আমি।আর কল দিবেন না।“

“আচ্ছা” বলে একটা মেসেজ পাঠাতে গিয়ে দেখি মোবাইল বন্ধ।মেয়েটা আমার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছে।যাই হোক,সে যেহেতু চাচ্ছে না,আমি আর যোগাযোগ করব না।

 

রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেলাম।শেফা এসে বলল,”তোকে মা ডাকছেন।“

আমি মায়ের কাছে গেলাম।মা আমাকে আজ অনেক আদরে খুব কাছে নিয়ে বসালেন।আমি বললাম,”কি হয়েছে মা?কিছু বলবে?”

মা কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন।আমার কাছে কেমন যেন লাগলো।মা এভাবে কোনদিন চেয়ে থাকেন নি।আমি বললাম,”এভাবে চেয়ে আছ যে মা!”

তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন,”তুই আশাকে বলেছিস বিয়েতে যেন রাজি না হয়,তাই না?তুই ওকে খুব শাসিয়েছিস।“

আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।মা এমনটা টের পেলেন কিভাবে!আশা কি তবে মাকে কিছু বলেছে!আমি বললাম,”এমন কথা কেন মা?আমি ওকে কোথায় পাব?ওর সাথে তো আমার কোনদিন দেখা হয় নি।“

“তুই ওর নাম্বারটা আসার সময় নিয়ে এসেছিলি আমি জানি।কাউকে কিছু বলতে হলে এখন আর দেখা করতে হয় না।“

শেফা মাকে বলে দিয়েছে আমি যে আশার নাম্বার নিয়ে এসেছি।শেফার দিকে তাকালাম।সে আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেল।আমি মায়ের দিকে ফিরলাম,”হ্যাঁ মা,আমি ওকে একবার নিষেধ করেছিলাম।তবে এখন আর নিষেধ করব না।আমি প্রথমে মেয়েটাকে বুঝতে পারি নি।আমি এখন রাজি।ও যদি চায় তবে……”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে আছেন।আমি আরও কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।মা কিছু বলছেন না দেখে আমি বললাম,”রাত অনেক হয়েছে।ঘুমিয়ে যাও মা।“

কথা শেষ করে আমি চলে এলাম।আসার সময় করিডোরে দাঁড়িয়ে শেফাকে বললাম,”মাকে কথাটা না বললেও পারতি।“

“মেয়েটা অনেক ভালো।ওর সাথে বিয়ে হলে তুই সুখেই থাকবি।“

“তাহলে ওর আগের স্বামীটা সুখে থাকে নি কেন?কেন বেচারা কষ্টে পিষ্ট হয়ে স্ট্রোক করলো?”

“আগের স্বামীটা একটু পাগলাটে ছিল।একঘুয়ে।মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল তার।“

“আমি লোকটাকে জানি।খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতেন।“

“ভালো মানুষ কখনো বউ পেটায়?”

“রাগ উঠলে মানুষ বদলে যায়।হয়ত উনার রাগ একটু বেশিই ছিল।মেয়েটা নিশ্চয় এমন আচরণ করতো যে লোকটা অনেক রেগে যেত।“

 

শেফা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।আমি হেঁটে চলে আসলাম।কথা বলতে ভালো লাগছে না।

পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর শুনলাম যে আমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল।গায়ের লোম গুলো কাঁটা দিয়ে উঠলো মুহূর্তে।আজিজুর রহমান মারা গেলেন।খবরটা পেলাম মায়ের মুখে।তিনি নাকি স্ট্রোক করেছেন।শুনে কেমন যেন মানতে পারছিলাম না কথাটা।মস্তিষ্ক যেন এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ গ্রহন করতে চাইছে না। কাল রাতেই আমি তার সাথে কথা বলেছি।হ্যাঁ, খুব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতই তিনি সুন্দর ভাবে কথা বলেছিলেন।দেখে একটুও অসুস্থ মনে হয় নি।আমার মনে আছে,তিনি বলেছিলেন____হয়ত আর দেখাই হবে না।কোনদিন আর দেখা হবে না।চাইলেও না।মানুষটা কি জানতেন আজ তিনি চলে যাবেন? অদ্ভুত!

লোকটার সাথে আমার পরিচিয় খুব অল্প দিনের।তেমন কোন ভাব জমে উঠে নি।সামান্য কথাবার্তায় আর ভদ্র লোকের অমায়িক ব্যবহারে কেমন যেন মায়া বসে গেছে।লোকটা খারাপ কি ভালো এতকিছু জানি না,শুধু বলতে পারি তাঁর মাঝে কোন মন্দ আচরণ দেখি নি।

 

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হল।তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে মা অনেক সুস্থ আছেন।খবরটা মা জেনেছেন আশার কাছ থেকে।মেয়েটা ভোর বেলায় মায়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করে গেছে কিছুক্ষণ।বাবাও ছিলেন।তখন আমি আর শেফা দুজনই ঘুমিয়ে ছিলাম।

 

হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হলাম।নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম আজিজুর রহমানের বাড়ির দিকে।লোকটাকে শেষবার একটু দেখে আসি।সেই সাথে আরো একটি কাজ হবে।আশা মেয়েটাকে আজ দেখতে পাব।

বাড়ির সামনে গিয়ে নিছক হতাশ হলাম।দরজায় তালা দেয়া।লোকমুখে জানলাম,খুব সকালে আজিজুর রহমানের লাশ পরিবার এসে দেশের বাড়ি নিয়ে গেছে।মনে মনে একটু দুঃখিত হলাম।একবার দেখতে পারলে ভালো হত।ভদ্রলোকের দেশের বাড়ি কোথায় আমি জানি না।জানলে যাওয়া যেত হয়ত।হতাশ মুখে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা আজ এতটাই সুস্থ যে তাঁকে রিলিজ দেয়া হল।আশা মেয়েটার সাথে একবার দেখাই মাকে আমূলে বদলে দিল।অবাক হলাম।মানুষের মাঝে আত্মার বন্ধন কতটা সুদৃঢ় হতে পারে তা ভেবে আমাদের শুধু অবাক হতে হয়।

 

মাকে বিকেল বেলায় শেফার বাসায় পৌঁছে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।অনেকদিন পর মনটা একটু হালকা লাগছে।আজিজ সাহেবের জন্যে একটু খারাপ হয়ত লাগছে,তবে তা খুব বেশি জোরালো না।মৃত্যু আর নিয়তির উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

 

ঢাকায় পৌঁছে বেশ ভালোই ছিলাম।একদিন শেফা জানালো,আশা মেয়েটা এবার তার বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করেছে।মার সাথে আবার তার ভাব জমে উঠেছে।আমি আশ্চর্য হলাম।বললাম, “মেয়েটা তোর ঠিকানা জানলো কি করে?”

আশা জানালো,”মায়ের কাছে মেয়েটার মোবাইল নাম্বার আছে।“

খবরটা শুনে নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছে।এতদিন মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর একবারের জন্যেও মার কাছে জানতে চাইলাম না মেয়েটা কে খুঁজে বের করার কোন উপায় আছে কি না।অবশ্য আমি নিজেই মাকে জানাতে চাই নি খবরটা।আমার পক্ষ থেকে সাপোর্ট পেয়ে গেলে পরে মেয়েটাকে আর আলাদা করতেই পারব না।

আমি শেফাকে বললাম,”থাক না,মেয়েটা যদি মায়ের সাথে একটু কথাবার্তা বললে মা একটু সুস্থ থাকেন তবে ক্ষতি কি! তোর যদি কোন অসুবিধে না হয় তাহলে আসুক।“

 

কিছুদিন পর আরেকটা খবর শুনে আমি আরও বেশি অবাক হলাম।শেফা ফোন করে আচমকা আশা মেয়েটার প্রশংসা শুরু করলো।মেয়েটা খুব ভালো,মায়াবী,মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে……হেনতেন।

আমি নড়েচড়ে বসলাম, “তুইও মেয়েটার খপ্পরে পড়ে গেলি!”

“আরে দূর……খপ্পরে পড়তে যাব কেন?মেয়েটার মনে কোন খারাপি নেই।“

শেফার সাথে তর্কে গেলাম না।সেও মেয়েটার কাছে কাবু হয়ে গেছে।আমার ভয়টা পুনরায় বাড়তে লাগলো।এতদিন নিশ্চিন্তে ছিলাম এই ভেবে যে,মা বাবা দুজনেই এখন শেফার কাছে আছেন।আশা মেয়েটার মনে কোন দুষ্ট বুদ্ধি থাকলেও শেফা সামলে নিবে।সুবিধা করতে পারবে না।কিন্তু এখন দেখছি শেফা নিজেই বদলে গেছে।

 

এমন দুশ্চিন্তায় যখন আমার সময় কাটছে,তার কিছুদিন পর এমন ভয়াবহ একটা খবর পেলাম যা শুনে আমার টনক নড়ে উঠলো।আমার বিয়ে।আমাকে জানানো ছাড়াই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।শেফা এক সন্ধ্যায় ফোন করে বলল,”আশার সাথে মা তোর বিয়ে ঠিক করেছেন।“ তার কথা বলার ভঙ্গি আর হাস্যজ্জল অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলাম নাটের গুরু হিসেবে সেও বেশ খুশি।সবকিছু এতদিন পরিবার আর সবার সুখের জন্যে মেনে নিয়েছি।এমন একটা কাজ আর কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।পিতামাতা তাঁর সন্তান কে নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করাতেই পারেন।হোক না মেয়েটার কোন রূপ-গুণ নেই।তাই বলে একটা বিধবাকে পছন্দ করবেন?সব পুরুষের মত আমারও কুমারী মেয়ে ঘরে আনার স্বপ্ন থাকাটা খুব বেশি অন্যায় নয়।

 

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আবার বাড়ি গেলাম।স্পষ্ট করে বাবা মাকে বললাম আমি এই বিয়েতে রাজি না।অনেক তর্ক বিতর্ক হল।পিতামাতার সাথে এমন বিশ্রি ভাবে ঝগড়া আমার এর আগে আর হয় নি।দফায় দফায় সকাল বিকাল এ নিয়ে ঘরের ভিতর ঝামেলা লেগেই আছে।শেষে আর কিছু করতে না পেরে রাগ দেখিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম।আসার সময় শেফার সাহায্যে মায়ের মোবাইল থেকে আশার মোবাইল নাম্বারটা চুরি করে আনলাম।মেয়েটার সাথে কথা বলে সবকিছু শেষ করতে হবে।

পুরানো তিমির [৪র্থ পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৪র্থ পর্ব]

আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি।ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়।মর্নিং ওয়াক করা হয় না অনেকদিন।প্রথম প্রহরের সিগ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ভালো লাগছে খুব।চারপাশ সতেজ আর চুপচাপ।রাস্তা-ঘাটে তেমন লোকজন নেই।আমি আর আমার মত মর্নিং ওয়াকে বের হওয়া গুটি কয়েক লোক এদিক সেদিক হাঁটছে।ফাঁকা রাস্তায় গা দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে বের হই নি।বরং এই বাড়িটার খোঁজেই আজ মর্নিং ওয়াকের আয়োজন।সাদা রঙের পাঁচতলা দালান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধার ঘেষে।সামনে উঠোনের মত ছোট একটু ফাঁকা জায়গা।

আশা নামের মেয়েটি এখানে থাকে?

বাড়িটা আবার ভালো করে দেখে নিলাম।হ্যাঁ,এটাই।মা এই বাড়ির কথাই বলেছেন।মেয়েটা থাকে নিচতলার রাস্তার পাশের প্ল্যাটটায়।কিছুক্ষণ বাড়িটার চারপাশে ঘুরঘুর করলাম।প্রায় আধ ঘণ্টার মত হবে।কাউকেই দেখলাম না।কোন মেয়ে মানুষ তো দূরের কথা,কোন পুরুষ মানুষও না।এই বাড়ির সবাই মনে এখনো ঘুমে নিথর হয়ে আছে।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস কারো নেই হয়ত।

 

আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলাম।অন্য সময় হলে একটা বাড়ির পাশে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরাঘুরি করছি কেন___এই নিয়ে লোকজন নানা ধরনের সন্দেহ করত।কেউ কেউ এসে হয়ত জিজ্ঞেসও করত, “কি ভাই সাহেব,ধান্ধা কি?”

এই কাক ডাকা ভোরে সেই সন্দেহ করার মত মানুষ এখনো রাস্তায় বের হয় নি।পুরো শহর চুপচাপ।লোকজন নেই বললেই চলে।

ভাবলাম,অনেকক্ষণ তো হল।এবার ফিরে যাওয়া উচিত।বাসায় ফিরে দেখি মা নাস্তা তৈরি করছেন।আর বাবা জায়নামাজে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন।আমি নিশ্চুপে আমার ঘুরে ঢুকলাম।ভালো লাগছে না।নিজেকে খুব হতাশ লাগছে।ঘুম নষ্ট করে মর্নিং ওয়াক করে কোন লাভ হল না।ব্যর্থ মিশন।জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখছি।পূর্বের আকাশটা লাল টকটকে হয়ে ফেটে পড়ছে।সূর্যটা আকাশের গর্ভ ভেদ করে আস্তে আস্তে উঁকি দিচ্ছে পৃথিবীর প্রান্তরে।টুকরো টুকরো সোনালি মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়ছে এদিক সেদিক।রাতের অন্ধকার কুয়াশার মত হাওয়ায় মিশে গিয়ে আবার আলোকিত হচ্ছে এই বিশ্ব।

একটানা অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি ভাবনায় ডুবে গেলাম।আশা নামের মেয়েটাকে আমি কখনো দেখি নি।আমি যে কয়দিন এখানে থাকি,সে কয়দিন সে মায়ের কাছে আসে না।মা বলেছেন মেয়েটা সময় অসময়ে চলে আসে।কখনো দুপুর,কখনো সন্ধ্যায়।ভারী চঞ্চল মেয়ে।

সেই চঞ্চল মেয়েটি আমি এখানে থাকলে আসে না কেন সেটাও এক রহস্য।যে এই বাড়িতে নিত্য আসা যাওয়া করে,ইচ্ছা করে না হোক,ভুল বশতও তো আমার সামনে সে পড়তে পারতো।আমি বাড়ি কখন আসি সে এসব খবর রাখে? না কি মা-ই তাকে কথায় কথায় বলে “আমার ছেলে আসবে।“

বললেও বলতে পারে।মানুষ কথার ছলে গল্প করতে করতে কত শত কথাই না বলে।আমি কোন সমীকরণ মেলাতে পারছি না।মেয়েটা কি আমি থাকলে লজ্জায় আসে না,না কি অন্য কোন কারণ?মেয়েটাকে আমার চঞ্চল মনে হয় না।মনে হয়,ধুরন্ধর চালাক চতুর মেয়ে।বাবা মার বয়স হয়েছে।এই বয়সের মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব।কে জানে মেয়েটা মনে মনে কি ফন্দি আঁটছে।আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এখন থেকে মূল্যবান জিনিষপ্ত্র আর টাকা পয়সা বাড়িতে বেশি রাখবো না।এমনও হতে পারে মেয়েটা খুব ভালো,মনে কোন খারাপি নেই।তবুও সাবধান থাকা ভালো।সাবধানের মার নেই।

 

“কই রে আহাদ,নাস্তা করতে আয়”,মা টেবিলে নাস্তা রাখলেন।

আমি নাস্তা খেতে বসলাম।আমার খাওয়ার সময়,খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।নিজের হাতে সবকিছু পাতে তুলে দেন।একমাত্র ছেলে হিসেবে এইটুকু আদর আমার প্রাপ্য।মায়ের মনে আদরের সীমা পরিমাপ করে বের করা যায় না।দুই তিনটা থাকলে না হয়,সে আদর ভাগ করে দেয়া যেত।এখন তো সবটুকুই আমার।

 

আজ মা আমার পাশে নাস্তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন নি।খাওয়ার মাঝখানে চলে গেলেন।এত বছরের পুরাতন অভ্যাস আজ হঠাৎ এভাবে ভাঙ্গাতে আমি একটু চমকালাম।পরক্ষণেই ভাবলাম,মা’র বয়স হয়েছে।আর কত? হয়ত এখন একটু শরীর খারাপ করছে।দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারছেন না।বিছানায় গিয়ে একটু শুয়ে থাকবেন।

 

আমি বসে বসে নাস্তা করছি।রকমারি খাবারের মধ্যে মা আজ বিশেষ খাবার হিসেবে পায়স রেঁধেছেন।মায়ের হাতের পায়স অনন্য।তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।আমার ফুফুদের মুখে শুনেছি, যৌবনে বাবা মায়ের উপর রাগ করলেই তিনি পায়স রাঁধতেন।সে পায়স খেয়ে বাবা আর রাগ ধরে রাখতে পারতেন না।মা’র প্রেমে পড়ে যেতেন।

হঠাৎ দেখলাম মা হাতে একটা বক্স নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।আমি তড়িঘড়ি করে জানতে চাইলাম, “কোথায় যাচ্ছ মা?”

মা বললেন, “আশাকে একটু পায়স দিয়ে আসি।“

“তুমি পাগল হয়েছ মা?ডাক্তার তোমাকে সিঁড়ি দিয়ে বেশি উঠা নামা করতে নিষেধ করেছেন।অকারণে এখন নিচে নামার কি দরকার?”

“অকারণে কোথায়?মেয়েটাকে পায়স দিতে যাচ্ছি।যাব আর আসবো।এক দুইবার সিঁড়ি চড়লে কিছু হয়না।“

মা কে আটকান কঠিন কাজ।হিংসায় আমার গা জ্বলে যাচ্ছে।কোথাকার কোন মেয়ে,তার জন্যে মা’র এত আদর?আমার থেকেও বেশি?এই মেয়ের জন্যেই কি মা আজ নাস্তা খাওয়ার সময় দাঁড়ালেন না?এত দিনের অভ্যাস পালটে ফেললেন?পায়স নিয়ে তো পরেও যেতে পারতেন।মায়ের কাছে মেয়েটার এত গুরুত্ব?রাগে আমার মাথা টগবগ করছে।আমার নিজের বোন,পরিবার, কিংবা আত্মীয় স্বজনের জন্যে এমন মায়া দেখালে না হয় মেনে নিতাম।পরের জন্যে এমন আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগে না।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে যেও।আরেকটু পর যাও।এই সাত-সকালে যাওয়ার কোন মানে হয়! হয়ত ওরা এখনো ঘুম থেকেই উঠে নি।“

“বলেছে তোকে! আশা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে।তোদের মত এত অলস না!”

“তাই বলে এত সকালে যাবে! আর যেতে হবে কেন?মেয়েটা তো এখানে আসে।আসলে তখন দিও।“

“তুই বাসায় থাকলে ও আসে না।ওর লজ্জা করে।“

“ঠিক আছে যাবে।আরেকটু পরে যাও।“

“না না,এখনই……পায়স ঠান্ডা হয়ে যাবে।“

আমি আর রাগ সামলাতে পারলাম না।চিৎকার দিয়ে বলে ফেললাম, “পরের জন্যে তোমার এমন দরদ আমার ভালো লাগে না মা।কোথাকার কোন মেয়ে,কে জানে মনে মনে কি চাল চালছে! ওসব লজ্জা টজ্জা কিচ্ছু না……আমার সামনে আসলে মেয়েটার দুষ্ট বুদ্ধি ধরা খেয়ে যাবে এই ভয়ে আসে না।তোমাদের বয়স হয়েছে।এখন তোমাদের মন ভোলান সহজ….“

মা যেন মূর্ছা খেলেন।বজ্রাহত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

“কি বললি তুই! আশার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?”

আচমকা হাতে ধরা পায়সের টিপিন বক্সটা মেঝেতে ছুড়ে মারলেন।পুরো মেঝে জুড়ে পায়স ছড়িয়ে পড়লো।আমি অবাক দৃষ্টতে মায়ের দিকে চেয়ে আছি।দুদিনের পরিচিত একটা মেয়ের জন্যে মা আমার সাথে এমন করলেন!আমি যেন কিছুই ভাবতে পারছি না।একেবারে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম।

মা কেঁদে ফেললেন।আঁচলে মুখ ঢেকে নিজের ঘরে গিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলেন।

“খুশি থাক তুই,খুশি থাক!আমি যাব না আশার কাছে।হল তো?মেয়েটার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?কি খারাপ তোর চিন্তাধারা……ছিঃ!”

 

হই-হুল্লোড়ের মাঝে এবার রুম থেকে বাবাও বেরিয়ে এলেন।এসে আমাকে খুব বিশ্রী ভাবে বকে গেলেন।

“মেয়েটার মাঝে তুই কি খারাপি দেখেছিস?কি দুষ্ট বুদ্ধি আছে ওর মনে?বল!সামান্য একটু পায়েস দিয়ে আসলে কি এমন ক্ষতি হয় শুনি!সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বুড় মায়ের সাথে হৈ চৈ করতে একটুও লজ্জা করলো না তোর!অসভ্য…জানোয়ার…”

 

বাবার মুখের উপর আমি আর কোন কথা বললাম না।উনারা দুজনেই এখন খুব রেগে আছেন।কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।শুধু এইটুকু বুঝে নিলাম,মেয়েটা শুধু মাকে নয়,বাবাকেও কাবু করে ফেলেছে।