৩ টাকার ডিম! এবং লঙ্কাকাণ্ড!!

Now Reading
৩ টাকার ডিম! এবং লঙ্কাকাণ্ড!!

অবশেষে ডিম নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটে গেল ঢাকায়। অনেক দিন ধরে খবর আসছিল ডিম দিবস উপলক্ষে নাকি ৩ টাকায় ডিম বিক্রি হবে।তখন থেকেই মানুষ এ বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠে। অনেকেই এটাকে ভুয়া খবর বলে চালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায় ঘটনা আসলে সত্য ।

খবর অনুসারে, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল এবং সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদফতর যৌথভাবে ডিম মেলার আয়োজন করেছিল। মেলার ঘোষণা অনুসারে মেলায় প্রতিটি ডিম ৩টাকায় দেয়া হবে এবং একজন মানুষ ৯০ টা পর্যন্ত ডিম নিতে পারবে। স্থান ছিল রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষি ইন্সটিটিউট। মেলা শুরু হবার কথা সকাল ১০ টায়। ডিম বিতরণ হবে বেলা ১ টা পর্যন্ত।
কিন্তু মেলার আয়োজকদের হয়ে গেল হিসাবে ভুল। তারা লাখ খানেক ডিমের আয়োজন করেছিলেন বিতরণের জন্য। কিন্তু মেলা শুরু হতে না হতেই তাদের চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ ডিমের জন্য অপেক্ষমাণ। কেও কেও তো ভোর ৬ টা থেকে ডিম নেবার জন্য লাইন ধরেছে। এক এক জন বালতি, ঝুড়ি যা পেয়েছে তাই নিয়ে হাজির। মানুষের লাইন বড় হতে হতে পৌঁছে যায় মনিপুর পাড়া পর্যন্ত। মানুষের ভিড়ে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। মেলা শুরুর ২০ মিনিটের মাথায় শেষ হয়ে যায় বেশির ভাগ ডিম। প্রথমে প্রতি জনের জন্য বরাদ্দ ছিল ৯০ টি ডিম। বাধ্য হয়ে আয়োজকরা সংখ্যা টা কমিয়ে নিয়ে আসেন ২০ এ। তারপরও ডিম দিয়ে কুলাতে পারছিলেন না। অবশেষে ঘোষণা করা হল, ডিম বিক্রি বন্ধ। তখন ও অপেক্ষায় অনেক মানুষ।
অবশেষে যা হবার তাই হল। অপেক্ষমাণ জনতা আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলেন না। শুরু হল হট্টগোল। এবার সবাই হুমড়ি খেয়ে পরল। উত্তেজিত জনতা ডিম না পেয়ে ডিমের কেস ও পেন্ডেল ভাংচুর করেন। কেও কেও তো আরও বেশি সরেস। তারা বাইরে থেকে ডিম কিনে এনে আয়োজকদের উপর ছোড়াছুড়ি শুরু করল। উত্তেজিত জনতা স্লোগান ও বানিয়ে ফেলল , ডিম চোর ডিম চোর, আয়োজকরা ডিম চোর।‘ বাধ্য হয়ে পুলিশ ও শুরু করল লাঠি পেটা । অবশেষে এক তুলকালাম কাণ্ডের মাধ্যমে শেষ হল মহান ডিম আয়োজন।

egg_2.jpg

আসলে যে উদ্যোগ টি নেওয়া হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে কেনই বা ঘটল এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা?

বর্তমানে বাঙ্গালীর খুব প্রিয় একটি খাবার হচ্ছে ডিম। সেইসাথে মজাদার যে কোন মুখরোচক খাবার তৈরিতে ডিমের জুড়ি মেলা ভার। সেটা মিষ্টি খাবার হোক , বা ঝাল খাবার। আর শহুরে বাচ্চাগুলোকে তো মাছ, সবজি খাওয়ান খুব ঝামেলার কাজ। কিন্তু, খুব সহজেই খাওয়ান যায় আমিষের এই উৎস ডিম।
প্রতিদিন সকালে আর যাই থাকুক বা নাই থাকুক, ছেলে বুড়ো বাচ্চার ডিম চাই ই চাই। এজন্য ডিমের চাহিদাও অনেক বেশি। আর দুর্মূল্যের বাজারে এত কম দামে ডিম পাওয়ার ঘোষণা তো জনগণের কাছে খুবই আনন্দের একটা সংবাদ। তাই যে যেভাবে পেরেছে পৌঁছে গিয়েছে ৩ টাকার ডিম আনতে। আর অতি উৎসাহী বাঙ্গালী ডিম না পেয়ে হয়ে উঠল হতাশ ও অস্থির। আর সেখান থেকেই হয়ে গেল লঙ্কা কাণ্ড।

আসলে জাতিগত ভাবে আমরা এক ধরনের অস্থিরতায় ভুগছি। কারণ আমরা মনে করি আমরা সোজা পথে কিছু পাব না, আমাদের ঠকিয়ে দিতে পারে বা আমরা আমাদের ন্যায্য পাওনা পাব না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে পদে পদে চলা দুর্নীতি। জনগণ প্রতি মুহূর্তে দেখছে তাদের করের টাকা চুরি করে উঁচু পদের লোকেরা হচ্ছে আরও বড়লোক। বন্যার ত্রাণ যতটা না পাওয়া যায় বন্যা দুর্গতের ঘরে, তার চাইতে বেশি পাওয়া যায় দায়িত্বে রত কর্মকর্তা দের ঘরে। কোথাও কোন নিয়ম নীতি মানা হয় না।
যে কোন জিনিসের জন্য লাইন ধরার চাইতে পদস্থ ব্যক্তির সাথে যদি কোন ভাবে লাইন করা যায় তবেই দ্রুত পাওয়া যাবে কাঙ্ক্ষিত জিনিস টি। আর যাদের ক্ষমতা কম, উঁচু গলায় কথা বলার শক্তি নাই, যারা কোন সিস্টেম করতে পারে না , যাদের কোন বড় পদে থাকা আত্নীয় নেই, তারাই তো বোকার মত থাকে লাইনে দাঁড়িয়ে। এই চিন্তা এখন জনগণের মন ও মগজে ঢুকে গিয়েছে।
এজন্য ই দেখা যায় সব খানে মানুষ এখন অস্থির।তা হোক ব্যাংকের লাইন ,বাসের টিকিটের লাইন বা হোক তা জাকাতের কাপড়ের লাইন। সব জায়গায় অস্থিরতা। সারাটা ক্ষণ টেনশন থাকে কেও আবার সিস্টেম করে আগে চলে গেল নাতো, বা কোন ভাবে লাইনে ঢুকে গেল নাতো, বা তাদেরকে লাইনে দাড় করিয়ে পিছনের রাস্তা দিয়ে সব পাচার করে দেয়া হচ্ছে নাতো।

সোজা পথে কিছু পাওয়া যায়, মানুষ এখন আর তা বিশ্বাস করে না।

সব কিছুতেই তার অবিশ্বাস। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে মানুষ ভুলেই যাচ্ছে এটা একটা অপরাধ। যে সুযোগ পাচ্ছে সে তার মত সিস্টেম করার চেষ্টা করছে। আগে তো কিছু লুকোছাপা থাকত, এখন মানুষ গর্ব করে বলে, আমি আমার অমুক পরিচিত মন্ত্রীকে ফোন দিলাম আর কাজটা পেয়ে গেলাম।
কে কত ক্ষমতাবানের সাথে যোগাযোগ করে কত সহজে অন্যদের টপকিয়ে কাজ করীয়ে আনতে পেরেছে এ এখন বড় গর্বের বিষয়। এটাই এখন বড় যোগ্যতা। তা সেটা নিয়ম বহির্ভূত ই হোক না কেন!

আর সাধারণ মানুষ যারা নিয়মিত না পাওয়ার যাঁতাকলে পিষ্ট তারাও আর ধৈর্য রাখতে পারছে না । যার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে এমন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
ফলে, বিশৃঙ্খলা করা বাঙ্গালির জাতিগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।