বাঙ্গালীর হুজুগেপনাঃ ফেইসবুক হোক্স

Now Reading
বাঙ্গালীর হুজুগেপনাঃ ফেইসবুক হোক্স

হুজুগে বাঙ্গালিয়ানার একটা বড় খাত হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি।  আমরা অনেক সহজেই ম্যানুপুলেট হতে পারি।  ডেমো হিসেবে ধরে নেন, রেডিও**** ডট কম ধরনের ফেইসবুক পেইজ গুলো।  এখানে পোস্ট করা “আমিন না বলে যাবেন না”, “একটি শেয়ার হলে ফেইসবুক এক টাকা দান করবে”, “লাইক দিলে নাম্বার দিব” ইত্যাদি পোস্ট গুলোতে লাইক কমেন্ট আর শেয়ারের ঝড় দেখছেন? এই মুহুর্তে এই পোস্টটি পড়ছেন, এমন অনেকেই উপরে উল্লেখিত ক্যাটাগরির পোস্ট গুলোতে নিজের মুল্যবান সময় দিয়েছেন বা দিচ্ছেন এমন আছেন।

কখনো ভেবে দেখেছেন যে আসলে সত্যটা কি? ফেইসবুকের একটা পেইজে একটা ছবিতে দেখলেন টমেটোর বিচিগুলা এমন ভাবে বিন্যাস করে যাতে দেখলে মনে হয় তাতে “আল্লাহু” লেখা বা আকাশে মেঘের দল এমন ভাবে উড়ে যাচ্ছে যার আকৃতি দেখতে “আল্লাহু” নামের মতন দেখায়।  সকল ধর্মের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, নশ্বর এই দুনিয়াতে কোন কিছুই অবিনশ্বর নয়।  একমাত্র সৃষ্টিকর্তা অবিনশ্বর হিসেবে ছিলেন , আছেন এবং থাকবেন সবসময়।  আপনি “আমিন” বলে “আল্লাহু” লেখা টমেটো খেয়ে ফেললেন? “আমিন” তো এখন আপনার পেটের ভিতরে, তাইনা?

শুনতে হাস্যকর লাগলেও যা হচ্ছে , সেটা এমনই।  মেঘের মাঝে “মহান আল্লাহ” এর নাম কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে, ভাবেন তো আল্লাহর নাম মিলিয়ে গিয়েছে (ওয়াস্তাগফিরুল্লাহ) – শুনেই তো আমার টুঁটি  চেপে ধরতে ইচ্ছা করছে আপনার।  ভাবছেন – “নাফরমান, ব্যাটা বলে কি”? শুনুন , প্রযুক্তি যে কতদুর এগিয়ে গিয়েছে আর সেটার অন্যতম উদাহারণ হিসেবে “ফটোশপ” এর ফটো এডিটিং লেভেল যে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা “আমিন” সাহেবদের ধারণার বাইরে।  আমির খান অভিনীত “পিকে” ছবির একটা ডায়লগ মনে পড়ে গেল কথা প্রসঙ্গে যেখানে তিনি বলেন – “এত বড় মহাবিশ্বের এত এত গ্রহের মাঝে ক্ষুদ্র একটা গ্রহ এই পৃথিবী। সেখানের অনেক রাষ্ট্রের মাঝে ছোট একটা রাষ্ট্রের ছোট একটা শহরের ছোট একটার এলাকার অনেকের মাঝে একজন আপনি, আপনি হবেন সৃষ্টিকর্তার রক্ষণাবেক্ষণকারী”? উনার নাম হেলা ফেলার কিছু না যে আমিন বলে টমেটো গিলে ফেললেন, বাতাস এসে মেঘ সরিয়ে নাম মুছে দিবে।

অনেকেই বলবেন – “ভাই এইগুলা ঈমান নষ্ট করার জন্য হিন্দু-ইহুদীদের কাজ”। ভাই থামেন, মানলাম ধর্ম রক্ষা করা বেশ কঠিন কাজ এখন, কিন্তু এত খারাপ সময়ও আসেনাই আমাদের যে অন্য ধর্মের লোকের কথায় ঈমান হালকা করে ফেলব। আর তাদের ও খেয়ে দেয়ে কাজ নাই, কাজ ফেলে আমাদের ঈমান নষ্ট করার জন্য বসে আছে! এত সস্তা ঈমান নিয়ে চলেন কিভাবে? মানুষকে দোষ দেয়ার আগে সারাদিন গীবৎ করা বাদ দেন, পজেটিভ ভাবতে শিখেন, খারাপ জিনিস দূরে ঠেলে ভাল জিনিস আয়ত্ব করতে শিখেন।

বিখ্যাত একটা ভুয়া নিউজ – “আল্লাহর এই নামগুলো আজকে ২০ জন ব্যাক্তিকে পাঠাও, ৭ দিনের মাঝে ভাল খবর পাবে। একজন অবজ্ঞা করেছিল, সে মারা গেছে”। কোরআন এর কোন অংশে বলা আছে ফেইসবুকের মেসেজে আল্লাহর নাম পাঠালে উনি আমাদের মঙ্গল করবেন? হাদিসের কোথাও আমার নবী করীম হযরত মোহাম্মাদ (সঃ) এমন কিছু বলেছেন?

 

আরেক প্রসঙ্গে আসি, “একটি শেয়ার হলে ফেইসবুক একটাকা দান করবে”।  ফেইসবুকের তো টাকা ব্যাংকে পচে গলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যার কারনে আপনার শেয়ার করা পোস্টের জন্য অসুস্থ মানুষকে টাকা দিবে। ফেসবুক চালাতে শিখে গেছেন, গুগল সার্ফিং বা ব্রাউজিং শিখেন নি? ছবিটা একবার গুগল ইমেজ সার্চ নামের অপশনে দিয়ে সার্চ করে দেখেন, আপনি যার অসুস্থতার ছবি শেয়ার করে ফেসবুকের বদৌলতে তাকে টাকা এনে দিবেন, সে বান্দা আরো ৩-৪ বছর আগে মারা গেছে বা সুস্থ হয়ে গেছে। হুজুগে পড়ে যা ইচ্ছা তা শেয়ার করে নিজের এবং অন্যের মুল্যবান সময় নষ্ট না করে প্রোডাক্টিভ কোন চিন্তা করুন, এতে আপনার ও দেশের মঙ্গল হবে। আর ফেসবুক যে কাউকে হেল্প করেনা ব্যাপারটা তেমন না, ফেসবুক ও অনেক সময় অনেক গরীব মেধাবী শিক্ষার্থী বা অসুস্থ রোগীকে সাহায্য করেছে, তবে সেটা একটা অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট দিয়েই করেছে।  আপনার শেয়ার এর কারনে না।

হুজুগেপনার আরেক উদাহারণ  – “আজ রাতে ১২ টায় দুনিয়ার পাশ দিয়ে একটা কিছু যাবে, মোবাইল অফ করে রাখেন, নাইলে মোবাইল ফেটে যাবে আর আপনি মারা যাবেন।” আমি  এই বছর ৩-৪ বার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এমন মেসেজ পেয়েছি।  আপনিও হয়ত পেয়েছেন, শেয়ারও করেছেন।  এক বছরে কয়বার হয় ভাই? আমার এক ফ্রেন্ড এই নিউজ শুনে মোবাইল ল্যাপটপ টিভি ফ্রিজ লাইট ফ্যান সব বন্ধ করে রাতে শুয়ে ছিল। আরেক বন্ধুর সেদিন রাতে রক্তের দরকার ছিল এবং যে বন্ধু সব বন্ধ করে শুয়েছিল তার গ্রুপের রক্তই দরকার ছিল। সারারাত আমি এবং হাসপাতালে থাকা বন্ধু তাকে ফোন করেছি, কিন্তু ফোন বন্ধ। সকালে ভোরে ওর বাসায় গিয়ে দেখি সব অফ, রুমে গুমোট গরম, আর সে ঘামে ভিজে আধমরা। ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করতেই মোবাইল খুলে এই মেসেজ দেখলো। আমরা ওকে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।  হুজুগেপনার লিমিট চিন্তা করেন একবার, কোন দুনিয়ায় আছি।?

এমন আরো হাজারখানেক হোক্স বা ভুয়া নিউজ আমাদের দেশীয় অনলাইনে ঘুরে বেড়ায় যেগুলোকে আমরা সত্য ভেবে শেয়ার করে আরেকজনকে দোটানায় ফেলে দেই।  আমরা একবারও ভাবিনা যে এই খবরের সত্যতা কতখানি, এমনকি আমরা যাচাই করে দেখার চেষ্টাও করিনা।  কেন? আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখলাম।