3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (শেষ পর্ব)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (শেষ পর্ব)

আজ প্রথমেই কিছু কথা বলে নিই। অনলাইনে একটা রোমান্টিক ঘটনা বা গল্পের প্রতি মানুষের এত আবেগ, চাহিদা, অনুরোধ, ভালোবাসা- এর আগে কখনোই দেখিনি যা এই ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি। এটা আমার জীবনের বাস্তব ঘটনা নাকি আসলেই কি , তা আমি রহস্য হিসেবেই রেখে দিতে চাই। শেষটা পাঠকদের মাঝে কিছু একটা জানার প্রবল আগ্রহ আর হাহাকার রেখে শেষ করে দিচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না, শেষটা নিজেদের মতো করে মিলিয়ে নিবেন একটা নিছক গল্প ভেবে। শুধু এতটুকুই বলবো, ঘটনা আজ যেখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এর পর যেকোন কিছু লেখা বা বলাটা শুধু শুধু বাড়িয়ে বলা হবে।

আজ এতগুলো দিন যারা এক একটা পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, তাদের সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইলো। আপনারা কমেন্টে কিংবা আমার ফেসবুক ইনবক্সে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, ভালো কিছু মন্তব্য করেছেন – বলেই আজ শেষ পর্ব পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আপনাদের সকলের প্রতি আমার সালাম; পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, ভালোবাসুন নিজের দেশ, মানুষ, ভাষা ও ঐতিহ্যকে। ভালোবাসা অবিরাম…………

 

সপ্তম পর্বের পর থেকে……………

 

খাট কেনার কথা শুনে ইসাবেলার ভ্রু কুচঁকে গিয়েছে। সে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, কি হলো, নতুন এই খাট দিয়ে কি হবে? ওকে এক সাইডে ডেকে নিয়ে বললাম, এই খাট আমার জন্য, মানে যতদিন তুমি থাকবে। ইসাবেলা তো সেই রেগে-মেগে অস্থির। আমি ওকে শান্ত করে বললাম, শোনো, একটা পুরুষ আর একটা মেয়ে পাশাপাশি থাকা মানে কি জানো? আগুনের পাশে মোম রাখা। আর আগুনের পাশে মোম রাখলে গলে যাবে এটাই স্বাভাবিক, তো তোমার মতো এতটা আকর্ষণীয় একটা মেয়ের পাশে আমি যদি রাতে ঘুমায়, নিজেকে কন্ট্রোল করাটা খুব বেশী কঠিন, ব্রাসেলস-এ থাকতে বুঝেছি। শয়তান ইবলিস এসে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভর করে, আর আমি চাইনা শয়তান কোনো সুযোগ পাক। তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো।

ইসাবেলা শান্ত ভদ্র বুঝমান মেয়ে, আমার কথা সহজেই বুঝে নিল, বললো, আমি চাইনা আমার কারণে তোমার কোনো ক্ষতি হোক। ব্যস, একটা খাট কিনে নিলাম, কোম্পানি গাড়িতে করে দিয়ে গেল। পরদিন একসাথে ভার্সিটি গেলাম, বন্ধুদের সাথে ইসাবেলাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বন্ধুরা তো খুব দুষ্টু। একজন তো বলেই ফেললো “মামা, সেই একটা মাল পটিয়েছিস!” বললাম, এইসব মাল টাইপের শব্দ উচ্চারণ করবিনা তো, তোর বোন থাকলে তাকে কেউ মাল ডাকলে কি তোর ভালো লাগবে বল? যাইহোক জানি বন্ধু একটু মজা করেছে, আকর্ষণীয় ফিগার এর কোনো মেয়েকে দেখলেই আজকাল একটা জেনারেশান তাদেরকে মাল বলে সম্বোধন করে, এটা খুবই খারাপ মনে হয় আমার কাছে।

আমার ক্লাস টাইমে ইসাবেলা ক্যান্টিনে বসে রাগবি খেলা দেখছিল। আমার ক্লাস শেষ হলে আমি আর ও একসাথে ভার্সিটি ক্যান্টিনে খেয়ে নিলাম। খেয়ে বাসায় এসে কাপড় ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে আমি ঘুম, বিকেলে আরেকটা ক্লাস আছে। আর ইসাবেলা গিয়েছে কাজ খুজঁতে। ও আমার সাথেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ও কাজ পেয়ে গেল একটা শপিং-এ। আর আমি এদিকে ভার্সিটি, ক্লাস, পরীক্ষা – এইসব নিয়ে ব্যস্ত। রাতে দুজন একসাথে ডিনার করি বাসায়, মুভি দেখি। ও অংকে ভালো হওয়াতে আমার জন্য খুব সুবিধা হলো। তাছাড়া ব্রিটিশ একসেন্ট শুনতে শুনতে আমি দিনে দিনে সেটাতেও পারদর্শী হয়ে উঠছিলাম।

আল্লাহর রহমতে সব গুলো টেষ্ট পাস করি, ফলে ফাইনাল এক্সামে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনা, ইসাবেলাও খুব খুশি, আমাকে বলে, এইবার তো তাহলে নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশনও ফেরদৌসকে আটকাতে পারবেনা। একটা কথা বলে রাখা ভালো, নেদারল্যান্ড-এ উচ্চশিক্ষায় প্রথম দুই বছর খুব বেশী ক্রিটিক্যাল, একবার দুই বছরে মিনিমাম ৬০ ক্রেডিটের ঝামেলা পার করে ফেলতে পারলে বাকি সময়টা অনেক ইজি হয়ে যায়, যদিও অনেকের অনেক বিষয় যা পাস করতে পারেনি, পরে পাস না করতে পারলে ভার্সিটি সেই স্টুডেন্টকে বের করে দেয় আর নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি না হতে পারলে মহাবিপদ।

সেমিষ্টারে ভালো রেজাল্ট করাতে মশিউর ভাই আমাকে তথা আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। ডিসেম্বর মাস, কনকনে ঠান্ডা বাইরে। মাইনাস ৫ কিংবা ৭; তুষারপাত এই সময়ে নরমাল। আমস্টারডামের সব লেক বরফে জমে গিয়েছে। স্কেটিং করে সবাই। দেখতে দারুণ লাগে।

ভাই এর বাসায় ঢুকেই বিরিয়ানির ঘ্রাণে তো আমার মাথা নষ্ট। আর ইসাবেলা তো ঘ্রাণ শুকেই পেট ভরিয়ে ফেলবে এমন অবস্থা। ধুমসে খাওয়া শুরু করে দিলাম, সেই স্বাদ, যেন বহুকাল বিরিয়ানি খাইনি। কিন্তু ইসাবেলার তো অবস্থা কেরোসিন, মশিউর ভাই এর খেয়াল ছিলোনা যে আমাদের সাথে একজন নন-দেশী খাবে, ভাই তাই ঝাল দিয়ে রান্না করেছে, আর ইউরোপিয়ানরা ঝালকে খুব ভয় পায়, বরফ পানির সাথে বিরিয়ানি খেতে হলো ওকে। আর খাওয়া শেষে আইস মুখে নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট বসে ছিল, সেদিন আমার ওদিকে তাকানোর সময় ছিলো না। আমি বিরিয়ানিতে মজে গিয়েছিলাম, শেষে পেটে একবিন্দু ফাঁকা জায়গা না নিয়েই বাসায় এসেছিলাম, অতিরিক্ত খাওয়ার মজা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ইসাবেলা তো বলেই বসলো, আমার ঝাল খেয়ে কষ্টের সময় তোমাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, এখন বোঝো কেমন মজা?

পরদিন আমি বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম, ভুলে মোবাইল রেখে এসেছিলাম, ইসাবেলা ছিল বাসাতে। আম্মু ওদিকে কল দিয়েছিল। আম্মুর সাথে কথা বলে ও জানতে পারে সেই গিফট এর কথা। বাসায় এসে দেখি সবকিছু এলোমেলো মানে ইসাবেলা রাগে কাপড় এলোমেলো করে রেখেছে। মেয়ের রাগ আছে বেশ, তেজী।  আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোথায় সেই গিফট যেটা তোমার মা আমার জন্য পাঠিয়েছে? কি করেছো?

আমি ওকে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু মেয়ে এইবার একদম বেঁকে বসেছে। ওর সামনে সেই গিফট প্যাক রাখলাম, বললাম, দেখো আজ পর্যন্ত ওপেন করিনি, তোমাকে বিশেষ কোনো দিনে উপহার দিবো বলে, কিন্তু তারপরেও তার অভিমান ভাঙ্গার নয়, রাতে ডিনার না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু রাত হলে ( দেশে তখন সকাল ) আমি আম্মুকে কল দিয়ে সব ঘটনা বলি, আম্মু যদিও জানেনা ও আমার বাসাতেই থাকে, মাইন্ড করতে পারে না বুঝেই। আম্মু বলে ওর সাথে আমাকে আবার কথা বলিয়ে দিও, আমি বুঝিয়ে বলবো। পরদিন ব্রেকফাষ্ট আমার সাথে করেনি রাগ করে। বাসায় এলে ওকে বললাম আমার আম্মু তোমার সাথে কথা বলবে। আমার আম্মুর সাথে দেখলাম তার দারুণ ভাব হয়ে গিয়েছে অলরেডি। আম্মু দেশে যেতে বলেছে আমাদেরকে, যেহেতু আমার এক্সাম শেষ। আমি আসলে দেশে যেতে চাইছিলাম না একদম, ভাবছিলাম ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজ করে কিছু টাকা জমালে খারাপ হতোনা। তারপরেও কিছু কথা ভেবে দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, আর ইসাবেলাও খুব চাপাচাপি করছিল, বলছিল ক্রিসমাস আর নতুন বছরটা সে আমার পরিবারের সাথে বাংলাদেশে কাটাতে চায়।

কি আর করা, আম্মু-আব্বুর চাওয়া, ইসাবেলার আগ্রহে ক্রিসমাসের আগেই ইতিহাদ এয়ারলাইন্সে দুইটা টিকেট কেটে নিলাম বার্লিন টু ঢাকা। ভার্সিটিকে জানিয়ে দিলাম আমি ফেব্রুয়ারিতে ব্যাক করবো, ইসাবেলা হয়তো ফিরে আবার রটার্ডামে মশিউর ভাই এর KFC তে জয়েন করবে, কারণ ওখানে স্যালারি ভালো, পুরোনো কাজের স্থান তার।

ফ্লাইট ছিল ১৮ই ডিসেম্বর, ২১শে ডিসেম্বর আমার ছোট বোনের জন্মদিন। আমরা পনেরো তারিখে বার্লিন চলে গেলাম, ইসাবেলার জার্মান বান্ধবী লিনার বাসায় ছিলাম, তার সৌজন্যে পুরো বার্লিন ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সবার জন্য কেনাকাটা করে নিলাম। ছোট বোনের জন্য একটা ল্যাপটপ জন্মদিনের গিফট।

আচ্ছা, একটা কথা বলে নিই, বার্লিন থেকে আসার মূল কারণ হলো বার্লিন-ঢাকা ফ্লাইটের ভাড়া কম, অনেক কম।

বার্লিনে হঠাৎ একটা ইন্ডিয়ান পার্লার খুঁজে পেয়েছিলাম সৌভাগ্যবশত। (মালিক কোলকাতার মহিলা – সুপ্রিয়া দেবী)। ফ্লাইট ছিলো বিকেলে, লিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাগেজ নিয়ে ইসাবেলাকে সকালেই নিয়ে গেলাম সেই পার্লারে শাড়ি পড়াতে। সুপ্রিয়া তো খুব খুশী ব্রিটিশ কন্যাকে বাঙ্গালী সাজে সাজাতে পেরে। আম্মু টিপ, চুড়ি গায়ে জড়ানো চাদঁর, নূপুর- সব দিয়েছিল যা প্রয়োজন সাজার জন্য। আমি বাইরে বসা ছিলাম, ইসাবেলার সাজতে প্রায় দুই ঘন্টা লেগে গেল, ও যখন বাইরে এলো, মনে হচ্ছিলো এক অপরূপা সুন্দরী যেন তার রূপের সকল সৌন্দর্য নিয়ে আমার সামনে এসে বলছে, আমাকে শুধু তোমার করে নাও। শাড়ির ওপর একপাশে চাঁদর, টিপ, চুড়ি, পায়ে নূপুর। জানিনা কতক্ষণ ওর দিকে এক পলকে তাকিয়ে ছিলাম, ইসাবেলার ডাকে ঘোর ভাঙলো, বললো, চলো এবার, দেরী হয়ে যাবে নাহলে।

সুপ্রিয়াকে ধন্যবাদ আর বাংলাদেশ আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে এলাম আমরা। ট্যাক্সিতে ওঠার পর খুব আবেগী কন্ঠে ইসাবেলা আমাকে আর আমার আম্মুকে ধন্যবাদ জানালো। ইসাবেলা অনেক খুশী যা তার চোখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম। ভালোবাসার মানুষের চোখ দেখেই অনেক কিছু আন্দাজ করা যায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন অস্ট্রিয়ান, খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন, শুভকামনা জানালেন যেন একসাথে থাকতে পারি সারাজীবন।

ট্যাক্সি থেকে Berlin Tegel Airport-এ নামার পর থেকে শুরু করে বিমানে ঢোকা পর্যন্ত এমনকি বিমানে ঢোকার পরেও বেশ ভালোবাসাময় বিড়ম্বনা পোহাতে হলো ইসাবেলাকে, সাউথ এশিয়ানরা তো আছেই, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান সবাই এসে শুধু ইসাবেলার সাথে সেলফি তোলে আর আমাদের কথা জানতে চায়, সবাই মোটামুটি ভাবে যে আমি ইন্ডিয়ান আর ইসাবেলাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছি, কিন্তু তাদের ভুল ভাঙ্গে আমাদের সাথে কথা বলার পরে। আমরা দারুণ উপভোগ করেছি। জার্মান ইমিগ্রেশন অফিসার যখন আমাদের সাথে সেলফি তুললেন, তখন আরেকবার দেখলাম, ভদ্র জাতির ভদ্রতা আর উদারতা। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম, এদিকে বিমান বালাও সেলফিতে আক্রান্ত, অনেক দেশী ভাই তাদের ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যাচ্ছেন যারা জার্মিনিতেই স্থায়ী। তারাও এসে দেখা করে গেলেন, মনে হচ্ছিলো, আমরা বিশেষ করে ইসাবেলা সেলিব্রেটি হয়ে গিয়েছে এক জামদানী শাড়ি পরাতে কিংবা বাঙ্গালীয়ানা সাজে সাজার কারণে। নিজের দেশকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়াতে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।

বিমান আর কিছুক্ষণ পরেই আবু-ধাবির উদ্দেশ্যে রওনা দিবে, দুই ঘন্টা ট্রানজিট, তারপর আবু-ধাবি থেকে ঢাকা। বিমান ছাড়ার আগে আম্মুকে কল দিলাম, বললাম, আম্মু আমরা আসছি। ইসাবেলা ভাঙ্গা বাংলায় বললো, আম্মু তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

বিমান আকাশে উড়লো।

ইসাবেলা আমার বুকে নিশ্চিত ভরসায় মাথা গুজে দিল। পরম মমতায় ওকে আগলে রাখলাম !!

( শেষ )

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৬)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৬)

পঞ্চম পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলার বাবা খুব রসিক মানুষ। মজা করে কথা বলেন। এসেই বললেন, একটা ইংলিশ সিংহী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। ভাগ্যিস, বেঙ্গল টাইগার হাতে আচঁড় মারেনি! এটা শোনা মাত্র লজ্জায় ইসাবেলা আমার হাতটাও ছেড়ে দিল। আমরা সবাই হেসে উঠলাম। ওর ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠলো।

ইসাবেলা যখন লজ্জা পায়, ওকে খুব মায়াবী লাগে দেখতে। ইচ্ছে করে, সারাজীবন ওর ঐ লাজুক মুখ দেখে যদি সময়টা কাটিয়ে দিতে পারতাম!

এরপর আরো কিছু গল্পগুজব করে বাসায় এলাম সবাই। ইসাবেলার রুমে গেলাম প্রথম। ঢুকেই মনে হলো, একটা ছোট বাচ্চার রুমে ঢুকেছি। খুব বেশি সাজানো গোছানো আর পুতুলে ভরা। সাথে অনেক  ট্রফি। কাছে গিয়ে দেখলাম ট্রফিগুলো সব ক্রিকেটের। আমি তো একেবারেই অবাক! এতদিন দুজন দুজনাকে জানি অথচ সে যে মহিলা লীগে এক সময় ক্রিকেট খেলতো তা আমাকে বলেইনি।

জিজ্ঞেস করলাম, কেন বলোনি যে তুমি ক্রিকেট খেলতে? ও যা বললো, তা একটু কষ্টদায়ক। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করতে গিয়ে তার হাতের হাঁড়ে ফাটল ধরেছিল। বহু দিন ভুগেছিল, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। তাই ক্রিকেটের প্রতি তার মায়া উঠে গিয়েছিল। আর ক্রিকেট খেলেনি। এমনকি ক্রিকেট খেলাও নাকি সে সহ্য করতে পারেনা।

বললাম, তুমি এগুলো বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছো না মনে হচ্ছে। থাক বাদ দাও। ইসাবেলাকে বললাম, আমি আজ রাতে সবার জন্য রান্না করি, কেমন? ওরা সবাই তো খুব খুশি। পাশের শপ থেকে বাসমতী চাল আর দুইটা চিকেন আনলাম। বাসায় এসেই রান্না শুরু করে দিলাম। ইসাবেলা আমাকে হেল্প করলো।

আমি সত্যিই জানিনা আমি কেমন রান্না করি, আমার রান্না ভালো কি মন্দ আমার বন্ধুরাই ভালো জানে। তবে বন্ধুরা খেয়ে কোনদিন খারাপ বলেনি। কিন্তু সেদিন জানিনা কি হলো, আমার চিকেন-কারী খেয়ে ওরা সবাই মুগ্ধ। এমনকি আমার নিজের কাছেও অনেক সুস্বাদু লেগেছিল। একটু ধনিয়া পাতা দিতে পারলে আরো স্বাদ হতো কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শহরের একটু বাইরে হলে এমন সমস্যা হবে এটাই স্বাভাবিক তাছাড়া ইংরেজরা ধনিয়া পাতার সাথে মনে হয়না অতটা অভ্যস্ত।

ইসাবেলার বাবা আমার রান্না খেয়ে তো বলেই ফেললো, “এখানে অনেক টুরিস্ট আসে পাশের ইকো পার্কের জন্যে। আমি একটা রেস্টুরেন্ট খুলে বসি,  তুমি শেফ হও”।

বাংলাদেশী খাবার মানুষ খুব পছন্দ করবে। ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্নদের কাছে  যদিও এগুলো ইন্ডিয়ান ফুড নামেই পরিচিত। আই মিন, কারী, মসলা জাতীয় খাবার গুলো। কিন্তু আমি কখনোই ইন্ডিয়ান বলতে আগ্রহী নই। কারণ,  খাবার প্রায় সিমিলার বলে বাংলাদেশী ফুড তো ইন্ডিয়ান ফুড হবেনা তাইনা?

উনাকে বললাম, আমি যে রেষ্টুরেন্টে রান্না করবো, সেখানে শুধু বাঙ্গালী খাবার তৈরী হবে। সাথে ডাচ, পর্তুগীজ, ইটালিয়ান আর ইংরেজি খাবার তো অবশ্যই। কিন্তু কোথাও লেখা থাকতে পারবেনা ইন্ডিয়ান ফুড। কারণ, মানুষ বাংলাদেশী ফুড খেলেও বলবে ইন্ডিয়ান ফুড। ব্যাপার টা এমনই দাঁড়িয়ে গিয়েছে দেখলাম। তাই আমি চাই আমার দেশের খাবারকে হাইলাইট করতে। এর আগে এক ফরাসি মালিককে একই কথা বলেছিলাম, সে রাজী হয়নি, কিন্তু পরে ঠিকই কল করেছিল,  আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

ইসাবেলার বাবা উদারমনা বাংলাদেশ প্রেমী। তিনি বলেলন, আমিও তো এটাই চাই। উনার কথায় খুব বেশী খুশি হলাম আর আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, আমি যদি কোনদিন ইংল্যান্ডে স্থায়ী হবার চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশী শেফ হিসেবে দায়িত্ব নিবো। উনিও আমার উত্তরে খুশি হয়ে মজা করে বললেন, “কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার শেফ হলে মন্দ হবেনা, আমি অবশ্য দুইটার জন্যই পে করবো, কারণ আমার পুরোনো ল্যাপটপটা প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায় আর আমি ওটাকে এতটাই ভালোবাসি যে ছাড়তেও পারিনা, নষ্ট হয়ে গেলে ঠিক করে দেবে।” উনি বেশ পুরোনো একটা ডেল এর ল্যাপটপ ব্যবহার করেন যেটা ডাক্তারি ভাষায় এক কথায় কোমায় চলে গিয়েছে, মাঝে মাঝে জীবিত হয়, আবার কোমায় চলে যায়।

রাতে ঘুম আসেনা। আকাশে ভরা পূর্ণিমা চাঁদ। ইসাবেলা খুব টায়ার্ড থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার একদমই ভালো লাগছিলো না। ওকে তারপরেও ফেসবুকে নক করলাম। কল দিলাম। ঘুম জড়ানো কন্ঠে যখন ফেরদৌস নাম ধরে ডাকে, আমার হৃদয়ে কেমন একটা শিহরণ বয়ে যায়। লিখে বা বলে বোঝাতে পারবোনা এই অনুভূতি। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখনও কেন ঘুমাওনি?

বললাম, তুমি একটু বারান্দায় এসো। বাইরে অনেক সুন্দর পূর্ণিমা চাঁদ। ও চোখ মুছতে মুছতে এলো। বিধাতা যেন ওর চোখে মুখে পূর্ণিমাতিথি ঢেলে দিয়েছেন। এসেই বললো, আমাকে এমন মাঝরাতে না ডাকলে কি হতো না? নাহ, হতো না। তোমার সাথে আমার খুব প্রয়োজনীয় কথা রয়েছে। যা না বলা পর্যন্ত আমি একটুও শান্তি পাচ্ছি না। আমায় একটু শান্তি দাও তুমি, প্লিজ। আমার করুণ চাহনি দেখে মনে হলো ওর চোখের ঘুম চলে গিয়েছে। বলে, প্লিজ এভাবে কথা বলে না ফেরদৌস। আমার সাথে কেন এভাবে অসহায় চোখে কথা বলবে? তুমি কি চাও আমি কষ্ট পাই,  বলো?

আমি বললাম, তুমি কেন কষ্ট পাবে? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? নাকি আমরা শুধুই বন্ধু? আসলে কি?  তুমি আমাকে কোন দৃষ্টিতে দেখো আমি পরিষ্কার জানতে চাই! কষ্টটা কি আমার বেশি না? এভাবে আর কতদিন? আমি তো দিনেদিনে বিরহের অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। না আমি রাতে ঘুমোতে পারি, না আমি কাজে মন বসাতে পারি, এভাবে চললে তো আমি কয়দিন পর সামনের সেমিস্টারে ফেইল করে বসবো, আর নেদারল্যান্ড সরকার আমাকে বের করে দিবে। কি হবে আমার তখন??

ও বলে, কি আর হবে, তুমি ইংল্যান্ড এর বাসিন্দা হয়ে যাবে। নেদারল্যান্ড সরকার তোমার পরীক্ষায় পাশ না করার দায়ে বের করে দিলেও ইংল্যান্ড সরকার তো তোমাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাবে। নাকি?

আমি ওর কথার আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করি, মানে কি? কি বোঝাতে চাচ্ছো তুমি? ইংল্যান্ড সরকার বা ইমিগ্রেশন কেন আমাকে আমন্ত্রণ জানাবে? আমি তো এখানে কিছুই না একজন শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ছাড়া কিংবা এমন ভিআইপি কেউও হয়ে যায়নি।

আমার কথা শুনে ইসাবেলা হেসে দেয়। সেই ভুবনভোলানো হাসি আমার অন্তর-আত্নাকে কাপিঁয়ে তোলে।

সে আমাকে বলে, এইবার তো শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ভিসা নিয়ে কয়েকদিনের জন্য অতিথি হয়ে এসেছো। ইন কেস, কথার কথা বলছি, তুমি যদি আমার কারণে ফেইল করে বসো আর এইজন্য নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে না রাখতে চায়, পরেরবার ইংল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে সারাজীবন থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে! কি জনাব, এখনো আমার কথা কি তোমার মাথায় ঢোকেনি? নাকি মাথা একদম গোল্লায় গেছে যে এই সামান্য ব্যাপারটিও ধরতে পারছো না?

( আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, আচ্ছা, আপনারা কি ইসাবেলার কথাটা ধরতে পেরেছেন? নাকি আমার মতো এখনো বুঝে উঠতে পারেননি? )

 

চলবে…….

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (পঞ্চম পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর (পঞ্চম পর্ব)

চতুর্থ পর্বের পর থেকে,

পারমাণবিক যে লাভা ধীরে ধীরে ফাটল বেয়ে নেমে আসছিল পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অংশকে গ্রাস করতে, বিশেষজ্ঞরা এর নামকরণ করেন ‘এলিফেন্ট ফুট’। আকৃতিতে কিছুটা মিল থাকায় হাতির পায়ের সাথে মিলিয়ে এই নাম রাখা হয়। এর আকার প্রায় দুই মিটার আর সব মিলিয়ে ওজন হবে ২০০ টন। উত্তপ্ত লাভার মত এই পদার্থকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক পদার্থগুলোর একটি বলে গণ্য করা হয়। ‘এলিফেন্ট ফুট’ এর তেজস্ক্রিয়তা এতোটাই বেশি যে, বিশেষ পোশাক ছাড়া এর কাছাকাছি গেলে ৪ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে মৃত্যু ঘটতে পারে একজন মানুষের। এই গলিত মৃত্যুর ধারা জলাশয়ের পানির সংস্পর্শে এলে যে বিস্ফোরণ ঘটবে সেটি হবে হিরোশিমার আণবিক বিস্ফোরণের কমপক্ষে দশগুণ বড়!

পারমাণবিক এই টাইমবম্বকে পানির সাথে মিশতে না দেবার একটাই উপায় তখন সামনে খোলা ছিল। চুল্লীর নিচের জলাশয় থেকে সব পানি অপসারণ করে ফেলতে হবে। এরপর এই জলাশয়কে এমন ভাবে আটকে দিতে হবে যাতে করে উত্তপ্ত লাভা আর এগুতে না পারে। পরিকল্পনার চূড়ান্ত হবার পরই এর ত্রুটিও সবার চোখে ধরা পরে। বিস্ফোরণের ফলে, জলাশয়ে থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্যে যে এক জোড়া গেট ভালভ ব্যবহার হতো সেগুলো অকেজো হয়ে পরে। জলাশয়ের ভেতরে প্রবেশ না করে সেই ভালভ খোলার আর কোন উপায় নেই। এদিকে ধীর পায়ে হলেও ‘এলিফেন্ট ফুট’ নামের মৃত্যু নেমে আসছে ফাটলের গা বেয়ে। সোভিয়েত কর্তারা সিদ্ধান্ত নেয়, বাইরে থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সরাসরি জলাশয়ে পৌঁছাতে হবে। ৪০০ খনি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর নিচের সেই জলাশয়ে যাবার পথ হিসেবে ১৬৮ মিটার (৫৫১ ফিট) সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু করে। এমন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার আতংক আর মৃত্যু ভয় ছাড়াও, বৈরি আবহাওয়াও তাদের কাজ আরও কঠিন করে তোলে। অবশেষে শেষ হয় সুরঙ্গ তৈরির কাজ। যে খনি শ্রমিকরা এ কাজে অংশ নিয়েছিল তাদের এক-চতুর্থাংশ বয়স ৪০ পেরুনোর আগেই মারা যায় তেজস্ক্রিয়তার কারণে।

মাটির নিচের পথ ধরে জলাশয়ে প্রবেশ করেন পানি নিষ্কাশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মীরা। সেখানেও বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। গেট ভালভগুলো পানির নিচে ডুবে রয়েছে। চুল্লীর সরাসরি নিচে থাকা এই পানি কতটা বিষাক্ত হতে পারে সেটা পরিমাপ না করলেও ভালভাবেই কল্পনা করা যায়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও দেশের স্বার্থে আর ইউরোপবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন অকুতোভয় তরুণ ভ্যালেরি বেজপালভ, অ্যালেক্সি আনানেকো এবং বরিস বারানভ তেজস্ক্রিয় পানিতে নেমে ভালভ খুলে জলাশয়ের পানি বের হওয়া নিশ্চিত করেন। এ ঘটনার ২০ দিনের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার সাথে লড়াই করে তিনজনই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তাদের মৃত্যুর সময় নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। দ্বিতীয় এই বিস্ফোরণ আটকানো সম্ভব হলেও হাঁফ ছাড়বার উপায় নেই সোভিয়েত কর্তাদের। মধ্যরাতের চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীর বিস্ফোরণে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য চুল্লীর ছাদে আর আশেপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল সেখান থেকেও ছড়াচ্ছে বিষাক্তটা। অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয় এই বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না করা গেলে পার্শ্ববর্তী চুল্লীর কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই সাথে মানুষের শারীরিক ঝুঁকি তো রয়েছেই।

নতুন এই সমস্যা নিয়ে আবার ভাবতে বসে সোভিয়েত বিশেষজ্ঞরা। ততদিনে তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা সবাই জেনে গেছে। এর অসীম শক্তি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে অবলীলায়। সিদ্ধান্ত আসে পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণে দূর নিয়ন্ত্রিত রোবট ব্যবহার করা হবে। মহাশূন্য অভিযানে পাঠানোর জন্যে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার এ ধরনের রোবট নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। রোবটের সাহায্যে শক্তিকেন্দ্রের ছাদের উপরের পারমাণবিক বর্জ্য (যার বেশির ভাগ ইউরেনিয়ামের টুকরো)নিচে ফেলা হবে। নিচে বিশালাকার ক্রেনের সাহায্যে এই দূষিত পদার্থগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় মাটিতে পুঁতে ফেলা হবে যাতে দূষণ ছড়াতে না পারে।

তেজস্ক্রিয়তা কেবল জীবিত প্রাণীদের উপরই নয় সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির উপরও প্রভাব ফেলে। সরাসরি সংস্পর্শে এলে পুরোপুরি বিকল করে দিতে পারে যে কোন যন্ত্রকে। দুইদিন কাজ করার পর তাই একে একে বিকল হতে থাকে সোভিয়েত রোবট। ঘনিয়ে আসা এই বিপদের সমাধানে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেয়া অভিযান পরিচালকরা। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এ কাজে মানুষ ব্যবহার করার। তেজস্ক্রিয়তা-রোধী বিশেষ পোশাক আর টুপি পরে ছোট ছোট দলে ভাগ মানুষ প্রবেশ করবে ইউরেনিয়ামের টুকরো ভরা ছাদে। মাত্র একবার ছাদ থেকে দূষিত ইউরেনিয়ামের টুকরো বাইরে ফেলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে যাবে তারা। কারণ ৪৫ সেকেন্ড সময়ের বেশি পারমাণবিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা একশ ভাগ। পালা করে নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা এই অসম্ভব কাজ করতে থাকে। একই সাথে চলতে থাকে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা। যার নাম ‘প্রোজেক্ট সার্কোফেগাস’। স্টিল আর কনক্রিটের বিশাল এক কাঠামো এই সার্কোফেগাস। ক্ষতিগ্রস্ত চার নম্বর পারমাণবিক চুল্লীকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে এই কাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০০ টন তেজস্ক্রিয় কোরিয়াম, ৩০ টন বিষাক্ত ধুলো আর ১৬ টন ইউরেনিয়াম আর পটাশিয়াম সার্কোফেগাস এর ভেতর ঢাকা পরে। দুর্ঘটনার ২৪ দিনের মাথায় এর কাজ শুরু হয় এবং ২০৬ দিনের মাঝে এই বিশাল কাঠামো কাজ শেষ করা হয়। বেশ কয়েকটি ধাপে সার্কোফেগাস এর কাজ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আলাদা আলাদা অংশ তৈরি করে এনে একসাথে জোড়া দিয়ে কাঠামোটি দাড় করানো হয়। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে পুরোপুরি ভাবে ঢেকে দেয়া হয় অভিশপ্ত এই পারমানবিক চুল্লীকে।

অদ্ভুত হলেও সত্যি এতো বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান ছিল অনেক বেশি। কাগজে কলমে চেরনোবিলের এই বিপর্যয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ধরা হয় মাত্র ৩১ জন। পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের কর্মরত ব্যক্তিদের বাইরে সেই তালিকায় আছে প্রাথমিক ভাবে আগুন নেভাতে যাওয়া দমকল কর্মী এবং পানির ভালভ খুলতে যেয়ে মারা যাওয়া সেই তিন বীরের নাম। বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায় লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বিপদকালিন কাজে অংশ গ্রহণ করেছিল। এদের মাঝে অনেকেই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হয় এবং স্বাভাবিক সময়ের আগে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু সেসব নিবেদিতপ্রাণ মানুষের কোন তালিকা বা পরিচয়য়ের নথি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। চেরনোবিলের মৃত্যু কূপের সাথে তাদের নাম পরিচয়ও ঢাকা পরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল ক্ষমতার আড়ালে।

এভাবেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ মানব ইতিহাসের ভয়ানক এই বিপর্যয় সামাল দেয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে পতন হয়, সেই কবর খোঁড়ার প্রথম ধাপ শুরু হয়েছিল এই চেরনোবিল দুর্ঘটনার মাধ্যমে। অদৃশ্য এই মৃত্যু-দূতকে সার্কোফেগাস কি সত্যি ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছে সঠিক ভাবে? একত্রিশ বছর পরে আজও কতটা বিপজ্জনক চেরনোবিল এলাকা? সেসব থাকবে ধারাবাহিক এই সিরিজের শেষ পর্বে।

 

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)

চতুর্থ পর্বের পর……….

ইসাবেলার ইমারজেন্সী নক পেয়ে মনে হলো আমি হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে চলে যাচ্ছি। কারণ অনেক আশা নিয়ে ফোনটা বের করেছিলাম গিফট গুলো দেবো – এই কথা বলার জন্য। অথচ………?

যাই হোক, ব্যাপার না, সময় সব সময় আপনার সাথে ভালো আচরণ দেখাবে এমনটা নয়, সময় বড়ই অদ্ভুত। এই সময়ের সাথে সাথেই আমাদের চলতে হয়, আরো কত কি! সময় নিয়ে এখানে মহাকাব্য লিখতে চাইনা। তাহলে ইসাবেলা কষ্ট পাবে, আমার প্রিয় পাঠকেরা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন।

মশিউর ভাই এর কাছে পরে জেনেছিলাম, বাবার কি এক ব্যবসায়িক কাজে ইসাবেলা হঠাৎ লন্ডন গিয়েছে নাকি। নিজের দেশ, নিজের শহর বলে কথা। আমি আর কথা বলিনি তারপর। আমাকে সে ফেসবুকে কল দিয়েছিল, কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কথা হয়নি, আবার আমি যখন কল দিয়েছিলাম, সে ফোন কেটে দিয়ে মেসেজ করেছিল, বাবা-মা এর সাথে কথা বলছে। এভাবেই আমাদের ব্যস্ততা আমাদেরকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। আমার মনে সে যে ঝড় তুলেছিল, তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আমি এমন প্রেমে পরবো জানলে এই শহরে কোনোদিন আসতাম না। কিন্তু আপনারাই বলেন, প্রেম কি বলে কয়ে আসে? নাহ! প্রেম আসে হঠাৎ বৃষ্টির মতো করে। আবার এসে চলেও যায় দমকা হাওয়ার মত।

দুই সপ্তাহ কেটে গেল, ইসাবেলার কোনো খোঁজ নেই। অথচ সে গিয়েছিল এক সপ্তাহের জন্য। এদিকে তার জায়গাতে এসেছে নতুন ইটালিয়ান সেকশন বস। ব্যাটা বেশী একটা সুবিধার না, মূর্খ টাইপের কিন্তু কাজে ওস্তাদ। মশিউর ভাই এর বন্ধু সে, আর আমি যেহেতু এতদিন ইসাবেলার স্থানে কাজ করেছি, সবাই আমাকে একটু সম্মানের সাথেই দেখে। আসলে যে যত ভালো কাজ পারবে, তার সম্মানটাই বেশী। আবার কেউ কাউকেই ছোট করে দেখেনা। সবাই সবাইকে সম্মান করে বলেই এরা এতো উন্নত।

আমি ইসাবেলার নাম্বারে, ভাইবারে, ফেসবুকে কোথাও কল করে পাচ্ছিলাম না। এদিকে আগষ্ট মাস শেষের দিকে। সেপ্টেম্বরে আমি চলে যাবো EINDHOVEN – আমার ভার্সিটি খুলে যাবে। হঠাৎ মনে পড়লো, আমাদের অফিসের ডিরেক্টরিতে তার লন্ডনের স্থায়ী ঠিকানা দেখেছিলাম, ব্যস, মশিউর ভাই ঠিকানা বের করে দিল। পরদিনই আমি DEN HAAG এ অবস্থিত ইংল্যান্ড অ্যাম্বাসিতে চলে গেলাম। আমার আগে ভিসা থাকায় নতুন ভিসা পেতে খুব একটা অসুবিধা হলোনা। দশদিনের মাথায় শর্ট টার্ম ভিজিট ভিসা পেয়ে গেলাম। এর মধ্যে একবার ওর সাথে কথা হয়েছিল, ও বলেছিল ও অনেক ভেতরের একটা গ্রামের দিকে ছিলো একটা কাজে। সেখানে নেটওয়ার্ক একটু ঝামেলা করে। এখন নাকি ও বাসাতেই আছে। ও বাসাতে থাকলেই হবে, ওকে চমকে দেবো।

দুপুর নাগাদ LONDON CITY AIRPORT- এ পৌছালাম, একটা বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিলাম, ওদের বাসা একেবারে শহরে না, একটু গ্রাম অঞ্চলের দিকে। মাঝে একটা ট্রেন মিস হওয়াতে পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যাঁবেলা। বাসার দরজাতে নক করলাম। প্রায় ৩মিনিট পর এক বয়স্ক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বুঝলাম সে ইসাবেলার বাবা। নিজের পরিচয় দিলাম, উনি খুব খুশী হয়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসতে দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ইসাবেলা কোথায়? সে কি বাসায় নেই? ওর বাবা জানালো, ও নাকি আবার সেই গ্রামাঞ্চলে গিয়েছে তার মা’র সাথে। মাঝে এসে দুইদিন ছিলো কিন্তু আবার যেতে হয়েছে। সমস্যা হলো, ওদিকে হঠাৎ বন্যায় বেশ কিছু গ্রাম তলিয়ে গিয়েছে।uk flood.jpg

কি ভাবছেন, ইউরোপেও বন্যা হলে শহর কিংবা গ্রাম তলিয়ে যায়? হ্যাঁ, আসলেই তাই, অনেক জায়গা আছে যা খুব নিচু এলাকা, বাঁধ শক্ত হলেও প্রবল জোয়ারে পানি চলে আসে। মানুষ মারাও যায়। এটা খুবই সাধারণ ঘটনা। তো, ইসাবেলা গিয়েছে সেই সব দূর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে। নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ নেই বললেই চলে। নাহ, আমি আসলে এইবার হতাশ হইনি তার সাথে দেখা হলোনা বলে, বরং ইসাবেলা আর তার পরিবারের উদারতায় আমি মুগ্ধ। তার বাবার সাথে কথা বলে জানলাম, উনি উচ্চশিক্ষিত এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। নিভৃতে থাকার জন্য শহরের এক কোণায় স্থায়ী হওয়া, দুইদিন ছিলাম ওদের বাড়িতে। ওর বাবা অনেক ভালো রান্নাও জানেন। আমাকে ইংলিশ ফুড খাওয়ালেন, নিজের গাড়িতে করে অনেক স্থান ঘুরিয়ে আনলেন। ফ্যামিলি ফটো এলব্যামে দাদা-দাদীর সাথে ছোট ইসাবেলাকে দেখালেন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও অনেক ভালো জানেন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব দিকেই উনি খোজঁ রাখেন, উনার পূর্ব পুরুষদের একজন সম্পর্কে তার চাচা নাকি এক সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে আমাদের বেঙ্গল অঞ্চলে দায়িত্বরত ছিলেন এবং সেখানেই একজন বাঙ্গালী নারীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছিলেন।

এদিকে আমি কি করবো তাই ভাবছিলাম, ইসাবেলার সাথেও মনে হয়না সহজে দেখা হবে। যেহেতু এক সপ্তাহের জন্য এসেছি, তাই ভাবলাম, লন্ডনে গিয়ে মামাতো ভাই এর সাথে দেখা করে আসি। ইসাবেলার বাবাকে বললাম, ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হলে অবশ্যই যেন আমার কথা বলেন আর আমার সাথে যেন যোগাযোগ করে। মামাতো ভাই এর বাসায় গিয়ে ছিলাম দুইদিন। সারা লন্ডন শহর ঘুরেছি। ইসাবেলা ছাড়া ঠিক ভালো লাগেনি। অথচ ইচ্ছা ছিলো ইসাবেলার সাথে লন্ডনের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ঘুরে বেড়াবো। ভালোবাসার নতুন এক অধ্যায় শুরু করবো। তার টোল পড়া গালে আমার ভালোবাসা একেঁ দেবো। নাহ! কিছুই হয়নি। ওর বাবা আমাকে কল দিয়ে জানালো, “ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হয়নি, তুমি আমার এখানে এসো, দেখি আমরা সেখানে যেতে পারি কিনা, এতো কষ্ট করে এলে, আমি কোনো উপকারে আসতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো”। হাতে ছিলো আর দুইদিন। রিটার্ন টিকেট কাটা আছে, যেতেই হবে, তাছাড়া ভার্সিটিতে Re-enrollment করতে হবে। ডেডলাইন পার হয়ে গেলেই বিপদ।

ওদের বাড়িতে পৌছালাম। সকাল বেলাটা একা একা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করেই কাটলো। বিকেলে রওনা দেবো। রওনা দেয়ার আগে পাশেই একটা কফি শপে টিভি দেখছিলাম আর কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কফি শপে ইসাবেলার মতো কেউ ঢুকেছে। প্রথম পলকে পাত্তা না দিলেও আবার বাধ্য হয়ে ভালো করে দেখলাম এটাই ইসাবেলা, ঘাড়ে ব্যাগ, সাথে একজন মহিলা, মানে ওর মা। তার মানে ওরা এখানে এসে পৌছেই বাসায় না গিয়ে সরাসরি কফি শপে ঢুকেছে কিছু খেতে কিংবা কিনতে। আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম যে আমার মনের ইচ্ছাটা তিনি পূরণ করেছেন। দেখলাম ওরা সামনের দিকে একটা টেবিলে কফি আর কেক নিয়ে বসেছে। আমি ধীর পায়ে ইসাবেলার পেছনে গিয়ে পেছন থেকে দুই হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরলাম আর ওর মা কে ইশারা দিয়ে জানালাম আমি ফেরদৌস। ওর মা ওর মুখোমুখি বসা ছিল। আমাকে দেখে ওর মা খুব খুশি। আমার কন্ঠ শুনলে চিনে যাবে বিধায় ওর মা ইসাবেলা কে জিজ্ঞেস করলো, কে বলোতো? প্রথমে কি বুঝেই বলে, কে? বাবা তাইনা? আমি তো চুপিচুপি হাসি আর ওর মা ও হাসে, ও বুঝতে পারে ওর বাবা না। তাই দুই হাত দিয়ে আমার হাত, আঙ্গুল স্পর্শ করে হঠাৎ বলে ওঠে, Who is this? I know this hand, Ferdous? বলেই আমার হাত সরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে আমি। পাগলের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরেই কান্নাকাটিঃ Oh Ferdous, I missed you, I missed you too much! I tried a lot to make a connection but I couldn’t. I am so sorry. পুরো কফি শপের সব মানুষের নজর এদিকে। সবাই হাত তালি দিয়ে ওঠে। ও লাজুক স্বভাবের হওয়াতে হাত তালির শব্দে লজ্জা পেয়ে শান্ত হয়। আমার হাত সে মোটেও ছাড়বেনা। হাতের আঙ্গুলগুলো হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিয়েছে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো, ওর মা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসছিল। আমাকে পেয়ে ইসাবেলার খুশী ধরেনা, আর আমার কথা নাই’বা বললাম। এই কয়দিন কিভাবে কি হয়েছে সব বললাম, এর মধ্যে ওর বাবাও কফি শপে এসেছে আমাকে খুজঁতে কিন্তু এসে দেখে এদিকে মিলনমেলা বসে গিয়েছে।

চলবে…………….

চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর ( চতুর্থ পর্ব)

Now Reading
চেরনোবিল – অজানা মৃত্যুর শহর ( চতুর্থ পর্ব)

চেরনোবিলের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রর দুর্ঘটনা এবং প্রিপিয়াট শহর নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই সিরিজের বিগত পর্বগুলোতে। এই পর্ব এবং আগামী পর্বে থাকবে বিস্ফোরণ ঘটার পরে ইউক্রেন অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন কিভাবে সেই দুর্যোগ মোকাবেলা করেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

গভীর রাতে যে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার প্রাথমিক ধাক্কা সকাল হতেই সামলে নেয় স্থানীয় দমকল বাহিনীর কর্মীরা। শক্তিকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রনকক্ষ আর কর্মচারীদের যাতায়াতের অংশের আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু চুল্লীর মূল অংশ যেখানে পারমাণবিক জ্বালানী রয়েছে সেখানের আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। বিষাক্ত এই জ্বালানী নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে যায়। প্রচণ্ড উত্তাপ ছাড়াও এর থেকে উৎপন্ন তেজস্ক্রিয় বাষ্প বাতাসে মিশে ক্রমাগত দমবন্ধকারী ধোঁয়া সৃষ্টি করতে থাকে। বর্ণ গন্ধহীন এই বিষ এতোটাই ক্ষতিকর আর ভয়াবহ ছিল যে, সেই বাতাসে কয়েক মিনিট নিঃশ্বাস নিলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়া নিশ্চিত। সেই সাথে মৃত্যুর সম্ভাবনাও বেড়ে চলে প্রতি মুহূর্তে। পারমাণবিক চুল্লীর আশেপাশের এলাকায় সেই বাতাস দ্রুত ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। মেঘের সাথে তেজস্ক্রিয় কণা মিশে সৃষ্টি হয় ভয়ানক তেজস্ক্রিয় মেঘের। হাওয়ায় ভেসে সেই মৃত্যু দূত এগুতে থাকে দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপের অন্য দেশগুলোর দিকে।

আন্তর্জাতিক ভাবে পারমাণবিক বিপর্যয় নিয়ে যতই লুকোচুরি করুক সোভিয়েত ইউনিয়ন, দুর্ঘটনার মোকাবেলা তাদের মুখ ফিরিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনীর মত, দেবতাদের সাথে মানুষের অসম লড়াইয়ের এক কাহিনী যেন শুরু হয় চেরনোবিলের পারমাণবিক চুল্লী আর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের মাঝে। প্রাথমিক ভাবে প্রিপিয়াট শহর আর এর আশেপাশের মানুষজন সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় তাদের মূল যুদ্ধ। সামরিক প্রহরার মাধ্যমে প্রথমেই সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ চেরনোবিলের সাথে সমগ্র ইউক্রেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই সাথে দুর্ঘটনা এলাকার ত্রিশ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে কেউ বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা নেয়। এই প্রস্তুতির অনেকটুকুই অফল হয় কারণ, পারমাণবিক বিষাক্তটা আর এর ভয়াবহতা তখনও সবার কাছে নিতান্তই তাত্ত্বিক বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে চেরনোবিল অঞ্চলে অবস্থানরত সৈন্য এবং বিশেষজ্ঞ কর্মীদের বায়ু বিশুদ্ধিকরণ মুখোশ এবং বিশেষ পোশাক পরার নির্দেশ দেয়া হলেও অনেকেই সেই বিষয়ে অনীহা দেখায়। ফলাফল স্বরূপ সমস্যা সমাধানকারী দলের সদস্যরাও আক্রান্ত হতে থাকে পারমাণবিক বিষাক্ততায়।

প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাব এবং সেই সাথে ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে সম্পূর্ণ ধারনা না থাকায় বিশেষজ্ঞ দল নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পরে। প্রাথমিক ভাবে তারা সিদ্ধান্ত নেয় বাতাসে বিষাক্ত পারমাণবিক পদার্থগুলো মেশা বন্ধ করতে হবে। সে জন্যে চুল্লীর ভেতর জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানীর উপর বিশেষ আস্তরণ তৈরির কথা তারা চিন্তা করেন। চুল্লীর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বালু আর বরিক এসিডের ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চুল্লীর মুখের ভেতরে বালু আর বরিক এসিড নিক্ষেপের জন্যে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সামরিক হেলিকপ্টার আনানো হয়। ৬০০ জন অভিজ্ঞ পাইলট এই অভিযানে অংশ নেন। পালাক্রমে সারা দিন-রাতে তারা শতশত বার চুল্লীর উপর দিয়ে যাওয়া আসা করেন বস্তা ফেলার জন্যে। সে সময় বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ এতোটাই বেশি ছিল যে হেলিকপ্টার থেকে ধারণ করা ভিডিও এবং স্থির ছবিগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে দুইপাশে অনেকখানি ঝলসে যেতে দেখা যায়। আস্তরণ তৈরির কাজে নিয়োজিত একটি হেলিকপ্টার পার্শ্ববর্তী ক্রেনে ধাক্কা লেগে ভূপাতিত হয়। ঘটনাস্থলে মারা যায় ভেতরে আটকা পরা সকলেই। আস্তরণ তৈরির এই পরিকল্পনা প্রাথমিক ভাবে সফল হয়। কুন্ডুলী পাকিয়ে উঠতে থাকা মৃত্যুর ধোঁয়ার বেগ কমে আসতে শুরু করে। কিন্তু বিস্ফোরণে পারমাণবিক চুল্লী এতোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, রাসায়নিক এই আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা তারপরও সম্ভব হচ্ছিলো না। বালু আর বরিক এসিডের পর সীসার আরও একটি আস্তরণ দেয়া হয় একই উপায়ে। তেজস্ক্রিয়তা বাইরে বের হওয়া বন্ধের জন্যে সীসা ব্যবহার করা হয়েছিল।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিক ভাবে জানার জন্য সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে গোপনে তদন্তে পাঠানো হয় কেজিবিকে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভিডিও ধারণ করে কেজিবি। কিন্তু সেই ভিডিও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাইরে প্রচার করেনি। সোভিয়েতদের সাথে স্নায়ুযুদ্ধের বিপরীত শক্তি আমেরিকার গোয়েন্দা বিমান চেরনোবিল থেকে গোপন ভিডিও চিত্র পাঠানোর পর আমেরিকা সহ বিশ্বের অন্য সব দেশ জানতে পারে আসল ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বীকার করতে বাধ্য হয় ইউক্রেনের পারমাণবিক চুল্লী বিস্ফোরণের কথা। মৃত্যুর বালি ঘড়ি উল্টে যাবার পর স্বীকার অস্বীকারে যদিও খুব বেশি পার্থক্যের সৃষ্টি করে না। ইউক্রেন, রাশিয়া আর বেলারুশের গণ্ডি পেরিয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পরতে শুরু করে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে সহ অন্যান্য দেশে। স্বাভাবিকের তুলনায় চার-পাঁচগুণ তেজস্ক্রিয়তা ধরা পরে এই সব অঞ্চলে। ফ্রান্স আর যুক্তরাজ্যের নানান অংশেও বিষাক্ত মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মত অদৃশ্য কোন ভিনগ্রহবাসীর আক্রমণে যেন আক্রান্ত হতে থাকে গোটা ইউরোপ। খবর আসতে থাকে তেজস্ক্রিয় বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বিভিন্ন স্থানে ফসল নষ্ট হবার। সেইসব এলাকার মানুষ এমনকি গবাদি পশু আর বন্যপ্রাণী সবই তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় ।

বাইরের দেশগুলো যখন নিজেদের দেশের বায়ু নিরাপদ রাখতে লড়ছে তখন ইউক্রেন তথা সোভিয়েত ইউনিয়নের সামনে নতুন আরও একটি বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয়। প্রাথমিক তদন্তের শেষে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত চুল্লীর ভেতরে ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীতে তখনও পারমাণবিক বিক্রিয়া চলছে। এই ১৮৫ টন পারমাণবিক জ্বালানীর ঠিক নিচেই রয়েছে ৫ মিলিয়ন গ্যালন ধারণ ক্ষমতার জলাধার। এই জলাধারের পানিই ব্যবহৃত হত চুল্লীর শীতলীকরণে কাজে। ক্রমাগত জ্বলতে থাকা পারমাণবিক জ্বালানির উপর যে আস্তরণ দেয়া হয়, সেই সীসা, বালি আর বরিক এসিড পারমাণবিক জ্বালানীর সাথে মিশে উত্তপ্ত লাভার মত এক পদার্থের সৃষ্টি করে। ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক চুল্লীর একেবারে তলানিতে জমে থাকা এই জ্বলন্ত লাভা আর জলাধারের মাঝে ছিল কেবল একটি কনক্রিট স্ল্যাব। বিস্ফোরণের ফলে সেই স্ল্যাবে ফাটলের সৃষ্টি হয়। কেবল বিস্ফোরণ নয় সেই সাথে পারমানবিক কেন্দ্রের ত্রুটিপূর্ণ গঠন এর জন্যে দায়ী। উত্তপ্ত রাসায়নিক লাভা ধীরে ধীরে স্ল্যাবের ফাটল দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে।  পারমাণবিক এই লাভা পানির সংস্পর্শে আসলে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধ্বংস হবে পুরো পারমাণবিক চুল্লী, সেই সাথে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটবে পার্শ্ববর্তী অন্য তিনটি চুল্লীতেও। যার ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে ইউরোপের অর্ধেকের বেশি দেশ আর সেই সব এলাকার অনেক অংশ অন্তত পাঁচ লক্ষ বছরের জন্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ অন্যদিকে শতাব্দীর ভয়াবহতম বিস্ফোরণের সম্ভাবনা, কিভাবে এই সব কিছুর সমাধান করে ক্ষমতাশীল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কোন উপায়ে তারা আটকে দেয় অদৃশ্য এই মৃত্যু দানবকে, সেই প্রশ্নের জবাব থাকবে আগামী পর্বে।

 

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৪)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৪)

তৃতীয় পর্বের পর থেকে……..

 

আমি আসলে ঠিক কি জবাব দেবো,  বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

দোটানায় পড়ে গেলাম। আমি যে ইসাবেলাকে ভালোবাসিনা তা নয় কিন্তু। আমি চাইলাম,  একটু ভিন্নভাবে জবাব দিতে, তাই বললাম, আমি তো পাশেই আছি, আর কোথায় যাবো বলো?

জানিনা, আমার জবাব তার কাছে মনঃপূত হয়েছিল কিনা। ওভাবেই এই সেই গল্প করতে করতে তার চোখে ঘুম চলে এলো, আমি তাই তাকে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

বাসায় এসে ভাবতে লাগলাম, ইসাবেলার সাথে যদি সম্পর্কে জড়াই, তবে কি হবে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ? কারণ, আমি আসলে চাইনা কোনো বিদেশী কন্যা আমার জীবনসঙ্গিনী হোক। বিদেশিনীর জীবনধারা ভিন্ন যদিও ইসাবেলা যে মাত্রায় প্রেমামাইসিন খেয়েছে, তাতে করে বলা যায় সে আমার জীবনধারাতে অভ্যস্ত হতে বেশীদিন সময় নেবে না। আর একটা ব্যাপার,  তা হলো ভাষা। আমি যতই ইংরেজি ভালো জানি বা পারি না কেন, তা আমার মাতৃভাষা নয়। আর মাতৃভাষায় আপনি আপনার ভালোবাসার মানুষের সাথে আবেগের যে লেনদেন করতে পারবেন, তা অন্যভাষাতে কখনোই সম্ভব নয়। আর এটাই বাস্তব সত্য।

সারারাত এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো। ফলে কাজেও দেরী।

পৌছানোর পরে মশিউর ভাই একটু রসিকতা করে গান ধরলেন, “কি জাদু করিলা, পিরিতি শিখাইলা…….” আমি বললাম,  ভাই মজা নেন,  তাইনা? উনি বলেন, মজা নেবো কেন? মজা তো আমি এমনিই পাচ্ছি, আজকাল সারারাত এপাশ ওপাশ করেও দেখি সাহেবের ঘুম আসেনা, কাজে আসেন দেরী করে, আপনার সেকশন বসেরও কাজে মনোযোগ কম। মনে হচ্ছে, একটা কাজী অফিস খোলা ফরজ হয়ে পড়েছে? বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন।  উনার কাজই হলো আমাকে ক্ষেপানো,  মজা করা। উনার মজা করার প্রেক্ষিতে আমিও একটু মজা নিলাম, বললাম, ভাই, আপনি কাজী হলে আগে নিজেই নিজের বিয়ে পড়বেন, তাহলে লাইসেন্স পাবেন, আমি লাইসেন্সহীন কাজীর কাছে বিয়ে করবো না। ( কথাগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, মজা করে বলা)

সেদিন কাজ শেষে ইসাবেলা তার BMW তে করে আমাকে শপিং-এ নিয়ে গেলো।  প্রতি সপ্তাহেই সে শপিং করে, কেনাকাটা ছাড়া থাকতেই পারেনা, কিন্তু সবচাইতে অবাক করা ব্যাপারগুলো কি জানেন?

এই কেনাকাটা সে তার নিজের জন্য করেনা, করে ইউরোপের কিছু গরীব দেশের গরীব মানুষের জন্য, সিরিয়া থেকে আসা রিফিউজি বাচ্চাগুলোর জন্য। পথের পাশে পড়ে থাকা হোমলেস মানুষগুলোর জন্য। যদিও হোমলেস মানুষ নেদারল্যান্ড -এ নেই একদমই। হোমলেসদের জন্য একটা সংস্থায় সে ওগুলো দান করে দেয়- চলে যায় অন্য দেশে।

তার এমন গুণ জেনে আমার চোখ থেকে পানি চলে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কত টাকা জীবনে এদিক সেদিক করেছি, অথচ নিজের দেশের না খেয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে কখনো তাকাইনি। হ্যাঁ, আমি স্টুডেন্ট ছিলাম, সেভাবে সম্ভব ছিলোনা,  কিন্তু বন্ধুদের সাথে অহেতুক যে টাকা উড়িয়েছি এদিক সেদিক?

ইসাবেলা এক অন্য মানুষ, অন্য উচ্চতার মানুষ। সে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে,  আমার জন্য H&M,  Denim, Boss যত ব্রান্ড আছে, সেগুলোর পোশাক, পারফিউম গিফট করলো। খুব খুশি হয়েছিলাম তার থেকে গিফট পেয়ে। ভাবছিলাম,  আমি কি গিফট করবো তাকে? আম্মুকে তাই ফোন করে বললাম, আম্মু, একটা সুন্দর জামদানী শাড়ি কিনে পাঠাও আমাকে। আম্মুও মজা করতে ছাড়েনা, বলে শেষমেশ আমার ছেলের শাড়ি পড়ার শখ হয়েছে? আমি জানি, এমন প্রশ্ন কেন করেছে, যাতে করে বলে দিই আসলে কার জন্য লাগবে। আর সেটিই হলো। বললাম,  ধূর, কি যে বলোনা,  পাগল নাকি যে আমি শাড়ি পড়বো?  আম্মু বলে, তো আমার পাগল ছেলেটা কোন পাগলীকে শাড়ি গিফট করবে? – উফফ আম্মু, তুমি খুব চালাক।

কেনরে, চালাকির কি করলাম? আমাকে বলো,  দেখি তার জন্য আরো বাংলাদেশী কিছু পাঠাতে পারি কিনা, শুধুই শাড়ি কেন? আমার দেশের কি আর কিছু নেই? বললাম, আচ্ছা, তোমার আরো যা ইচ্ছে হয়, তুমি কিনে পাঠাও কিন্তু তার নাম বলা যাবেনা। আম্মুও কম যায় না, বলে, নাম দিয়ে কি কাজ সোনা? তুমি আমাকে ভাইবার-এ ছবি পাঠাও, না হলে কোনো পার্সেল নেদারল্যান্ড যাবেনা। কেমন?

কি আর করা, বাধ্য ছেলের মত তার ছবি পাঠিয়ে দিলাম, আম্মুর তো খুব পছন্দ তাকে, বলে, মেয়ে যদি সত্যিই ভালো হয়ে থাকে, তবে এই বিদেশিনী ঘরের বউ হয়ে এলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। মেয়ের মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, নরম স্বভাবের ভদ্র একটা মেয়ে। কি সুন্দর গালে টোল পড়ে? আম্মু পুরোই পাগল হয়ে গিয়েছে বুঝলাম। আম্মু ফোন করেছিল, বললো, পাঠিয়ে দিয়েছে পার্সেল। তিন-চারদিনের ভেতর পৌছে যাবে।

এদিকে ইসাবেলার সাথে অনেক ঘুরাঘুরি হয় প্রতিদিন। বেলজিয়াম এর রাজধানী ব্রাসেলস গিয়েছিলাম দুজন।  সেখানে গিয়ে হোটেলে তিন রাত এক বিছানায় ছিলাম। কি খুব খারাপ শোনাচ্ছে? ফুল সামার, ডাবল বেডরুম সব বুকড। টুরিস্টে ভরপুর আমস্টারডাম ব্রাসেলস, দুই দেশের রাজধানীই। শেষ দিন রাতের বেলা জিজ্ঞেস করেছিলাম,  তুমি কি সেক্সের প্রতি ইন্টারেস্টেড না? এই যে তিন রাত আমার সাথে একই বিছানায় থাকলে, তোমার ভেতর কোনো নমুনাই তো পেলাম না, অথচ ইউরোপে ভালোবাসা মানেই সেক্স।

ও আমাকে বললো, ইউরোপের ৯৫% মানুষই কিন্তু সেক্স লাইফে বিলিভ করে। ভালোবাসা হলেই সেদিকে ঝুঁকে পড়ে, এটাই ইউরোপিয়ান কালচার। আজ একজনের সাথে,  কাল আরেকজন। খুব ভালো করেই জানো বেশির ভাগ ইউরোপিয়ানরা ৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত জীবনটাকে উপভোগ করে। তো আমি বোধহয় বাকি ৫% এর ভেতর পড়ে গিয়েছি। আর সবচাইতে বড় কথা কি জানো, ভালোবাসার মানুষের প্রতি সম্মান। তুমি একবার বলেছিলে সেই বয়স্ক ডাচ শেফকেঃ যে তুমি নাকি বিয়ের আগে সেক্স করতে আগ্রহী নও। আমি শুনেছিলাম তোমার সেই কথা, তোমার প্রতি সেদিন সম্মানটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের ধর্ম কিন্তু এমনটাই বলে, তোমার কোরআন শরীফে যেমন বলা আছে, আমার বাইবেলেও তেমন বলা আছে। হয়তো আমি, ধর্ম কর্ম তেমন করিনা, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ধর্মের কথাকে। তাছাড়া, আজ একজন, কাল আরেকজন- নাহ এটা কোনো জীবন হতে পারেনা। এর চাইতে তোমাদের দেশে তোমরা অনেক সুখী। তোমরা যদি একজনের সাথে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারো, আমরা কেন পারবোনা বলো?

আমি যতই ইসাবেলার কথা শুনি, ততই অবাক হই। জানিনা, এই মেয়ে কোন ধাতুতে গড়া, এই কিনা ব্রিটিশ কন্যা?

আমরা রটার্ডাম ফিরে এলাম, দেখি মশিউর ভাই পার্সেল রিসিভ করেছে। খুলে মশিউর ভাইকে দেখাতে চাইলাম, উনি বললেন, একবারে ইসাবেলার সামনে খুলতে, সেটাই ভালো হবে।

খুব উল্লসিত আমি এই ভেবে যে ব্রিটিশ কন্যা অবশেষে বাংলাদেশী জামদানী শাড়ি গায়ে জড়াবে। ওকে দেখা করতে বলবো বলে কল দিতে ফোন বের করলাম, ঠিক এমন সময় ইসাবেলার কল, বললো, “ফেরদৌস, আগামীকাল তুমি একটু কিচেনটা সামলাবে তাই সকাল সকাল যেও, আমি বসকে (মশিউর ভাই) বলে দিচ্ছি আসতে পারবো না, ছুটি লাগবে। সপ্তাহখানেকের জন্য লন্ডন যেতে হবে। ইমারজেন্সী”

চলবে…………

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)

 

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলাকে জুস বানিয়ে খাওয়াবো নাকি খাওয়াবো না- এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না; কথার টপিক ঘুরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা-মা কে জানিয়েছ যে তুমি অসুস্থ? ও বললো, থাক দরকার নেই। আমি তো আগামীকাল নাগাদ আশা করি সুস্থই হয়ে উঠবো,  তাদের টেনশন দিয়ে লাভ নেই। এই বলে ও ভেতরে চলে গেল।

DSC 3008.jpg

মশিউর ভাই এসে ইসাবেলাকে দেখে গেল আর গাড়িটা নিয়ে গেল। সাথে আমাকে সতর্কবাণী।  তার গাড়ি বা জরিমানা নিয়ে টেনশন না; টেনশন হলো আমাকে নিয়ে। কারণ এতে করে আমার রেসিডেন্স হারানোর ভয় আছে।

পরদিন থেকে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি এক ব্যাগ আম এনে ইসাবেলার সামনেই কিচেনের এক কোণায় ফেলে রাখলাম। কাজ চলে কাজের গতিতে কিন্তু আড্ডা কমে গেছে। আমিও অত আগ্রহ দেখাই না, ইসাবেলাও হঠাৎ চুপচাপ। এভাবেই সপ্তাহখানেক কেটে গেল। পরের সপ্তাহও ওভাবেই কাটছিল, দেখলাম আমগুলো আর এক সপ্তাহ ওভাবে থাকলেই পঁচে যাবে। যাক না! টেবিলের এক পাশে ওগুলো ছিল। লাঞ্চ শেষ করে মাত্র কিচেনে ঢুকেছি আর ইসাবেলা হিংস্র বাঘিনীর মতো করে এসে আমার হাতটা ধরে দ্রুত পায়ে দোতলার স্টোর রুমে নিয়ে গেল। গিয়েই অঝোরে কান্না। আমি জানতাম, থমথমে আবহাওয়ার পরে এমন ঝড়-বৃষ্টিই আসবে। আমাকে তার প্রশ্ন, “কি করেছি আমি? কি দোষ আমার? সেদিন হসপিটালে আমাকে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে গেলে, আম নিয়ে এসে এক কোণায় ফেলে রাখলে। কথা বলো না ঠিক করে। কি করেছি আমি বলো?”

তারপর আবার কান্না। জানি মেয়েদের চোখের কোণায় কান্না রেডিই থাকে। তারা অনেক কাঁদতে পারে, আর এই অভিমানের কান্নার সৌন্দর্য সেই বুঝতে পারে যে সেই মেয়েকে ভালবাসে। আমি আসলেই অবাক, কারণ ইউরোপিয়ান মেয়েদের আবেগ খুব সামান্যই কাজ করে, এরা অঝোরে সহজে কাঁদতে পারেনা। এদের কাছে কোনো একজনের প্রতি ভালোবাসা আর আবেগ সাময়িক।

কিন্তু এই ব্রিটিশ কন্যা আমার সকল ধারণাকে পালটে দিতে শুরু করলো। আসলে কাছ থেকে কারো সাথে না মিশলে অনুধাবন করাটা বেশ কঠিনই।

সত্যি কথা বলতে আমি অমনটা করেছিলামই আমার প্রতি তার আবেগ কিংবা অনুভূতি বোঝার জন্য। ও চুপ করে তখন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম বুকের ভেতরে। ও ওভাবেই রইলো। বুঝলাম,  অভিমান ভাঙেনি। কপালে ছোট করে একটা চুমু দিয়ে আমি ওকে ছাড়তে যাবো, ঠিক তখনই ও আমার হাতটা টেনে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, বছরের পর বছর যদি ওভাবে নীল নয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম? এমন ভাবতে ভাবতেই নিচ থেকে কলিগের ডাকে ঘোর ভাঙলো। ওরা বুঝতে পারছিলো,  আমাদের ভেতরে এক ঠান্ডা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

আমি নিচে এলেও ইসাবেলা উপরেই রয়ে গেল। পরে ও নিচে নেমে এলো, কোনো কথা হলোনা আর। বাসায় আসার সময় আমগুলো নিয়ে এলাম; আমার মনের অবস্থা তখন খুব খারাপ। শেয়ার করারও কেউ নেউ। মশিউর ভাইকেও বলতে পারছিনা লজ্জায়। ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি, ভালোবাসার আগুন কি ভয়ানক টের পাচ্ছিলাম তখন।

ইসাবেলাকে একটা কল দিলাম, ফোন ধরলো না। কিছু সময় পর ও নিজেই নক করলো, বললো গোসলে ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, এখন কিসের গোসল? ও জবাব দিল, “আমার যখন মন খারাপ থাকত তখন আমি বিয়ার খেতাম, কিন্তু কাউকে প্রতিজ্ঞা করার পর আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে শাওয়ার এর নিচে গিয়ে নিজেকে শান্ত করছি।”

ভালো করছো বলে ফোনটা রেখে দিলাম। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে মশিউর ভাই এর জন্য কিছু আম রেখে সব আম বের করে কেটে ব্লেন্ডার এর ভেতর দিলাম।

আধা ঘন্টার ভেতর পুরো তিন জগ জুস বানিয়ে ৬ লিটারের বড় বোতলে ভরে রওনা দিলাম ইসাবেলার বাসার উদ্দেশ্যে। ওকে না বলেই। ওর বাসার সামনে গিয়ে কল দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, বাসায় আছে কিনা! বললো, হ্যাঁ, ডিনার রেডি করছি, কেন? কিছু বলবে?

আমি ঐ মানসিক কষ্টের সময়টাতেও কিভাবে যেন রসিকতা করে বললাম, তোমার জন্য একটা “ওয়ার্কার-রোবট”  পাঠিয়েছি। দরজা খোলো, বাইরে সে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজা খুলে আমাকে দেখে সে একটুও বিস্মিত হয়না। বুঝেছিল হয়তো যে আমিই হবো কারণ ওয়ার্কার রোবট খুব দামী আর সেটা কেনার সামর্থ সবার নেই। জুসের বোতলটাও কালো কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে এনেছিলাম। আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এদিকে কি কাজে এসেছিলে? বললাম, আমস্টারডাম থেকে এক বন্ধু কিছু জিনিস এনেছিল আমার জন্য; সেগুলো বাস স্টপেজ থেকে আনতে আরকি! জিজ্ঞেস করলো, ডিনার করেছো? না বোধক উত্তর পেয়ে আমার অনুমতি না নিয়েই আমার জন্যও ডিনার রেডি করছিল। দুজন নীরবে ডিনার করলাম। একটা দুইটা কথা হয়েছিল মাত্র। আমি খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, খুব বেশী  আবেগী মেয়েদের অভিমানটাও খুব বেশী হয় আসলে। ইসাবেলার ক্ষেত্রে সেটাই প্রযোজ্য। বড় বেশী অভিমানী।

চিন্তায় চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম, আমের জুস দিয়েও অবশেষে তার রাগ ভাঙবে কিনা।

খাওয়া শেষে ও কিচেনে ঢুকলে আমি সাথে সাথে ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে টেবিলে রাখি আর রান্না ঘরে গিয়ে পেছন থেকে ওর দুই চোখ হাত দিয়ে চেপে ধরি। ও একটু ভয় পায়, জিজ্ঞেস করে, কি করছো তুমি? বললাম, আমাকে ভয়ের কিচ্ছু নেই। আমার সাথে চলো, এই বলে ওর চোখ বেঁধে ওকে টেবিলের কাছে এনে ওর চোখ খুলে দিলাম। আমের জুস দেখেই মুখে হাসি তার। ভাবলাম বেঁচে গেলাম এইবারের মতো। কিন্তু না। এক ঝলক হাসি দিয়েই সে থম করে থমথমে মুখ নিয়ে গাল ফুলিয়ে আবারো চেয়ারে বসে পড়লো।

বুঝলাম কি করতে হবে।

তার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে এক গ্লাস জুস নিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিলাম, বললো, আরো দাও; তিন গ্লাস জুস শেষ করে হঠাৎ আমার বুকের উপর মাথা এলিয়ে দিল। এমন আচরণে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।

ইসাবেলা আমার বুকে মাথা রেখে খুব আবেগী কন্ঠে বললো, “ফেরদৌস, আমি খুব একা, আমাকে ছেড়ে যেওনা প্লিজ।”

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কি জবাব দেবো ভাবছিলাম।  এমন মুহূর্তে আসলে কি জবাব দেয়া উচিত?

 

চলবে………..

আজ আমার বিয়ে – শেষ পর্ব

Now Reading
আজ আমার বিয়ে – শেষ পর্ব

আমি খুব বেশি চিন্তিত । বিয়ে করলাম বেশি দিন হলো না এর মধ্যে কি সব ঝামেলায় যে পড়লাম । সেদিন রুপা আমার সাথে আর কোনো কথা বলেনি । পরের দিন অফিসে বসে ভাবছি কে এই জান্নাত , হুট করে ফেসবুকের টোন কানে আসলে মানে কেউ একজন ম্যাসেজ দিয়েছে । কম্পিউটারের দিকে চোখ যেতে দেখি আবার সেই জান্নাত ।

কেমন আছেন চাঁদ – ওই পাশ থেকে বলছে
কে আপনার চাঁদ , আর আপনি কে , কেন আমাকে বিরক্ত করছেন । আপনার জন্য আজ আমার সংসারে অশান্তি । বিয়ে করে দুই দিন ও যেতে পারলো না কি শুরু করে দিয়েছেন । আপনাকে আমি কত বার বলেছে আমি বিবাহিত । আমি এক নিঃশ্বাসে সব লিখে গেলাম ।
কিছুক্ষণ পর উত্তর আসলো আপনি জানি আপনি বিবাহিত , আপনার বউ থেকে আমি অনেক সুন্দর । আমার মতো মেয়ে আপনি কোথাও পাবেন না ।
আমি আপনার মতো মেয়ে চাইও না । আমার বউ আমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর । এই কথা লিখতে লিখতেই দেখি আমার নাম্বারে কল । তাকিয়ে দেখি রুপা কল দিয়েছে ।
কি করো – কল ধরার সাথে সাথেই রুপার প্রশ্ন
কিছু না বসে আছি ।
বসে বসে কি জান্নাতের কথা ভাব । কি ব্যাপার ফেসবুকের ম্যাসেজের শব্দ শুনতে পেলাম । ও বুঝেছি জান্নাতের সাথে চ্যাট করছও বুঝি । ভালো ভালো করো ।
এই কথা বলে ,লাইন কেটে দিলো ।
মেজাজ তখন চরম খারাপ , জান্নাতকে ম্যাসেজে খুব কড়া কথা বলে কম্পিউটার বন্ধ করে রেখে দিলাম ।
সন্ধ্যার সময় বাসায় ফেরার পথে রুপার জন্য আইস ক্রিম কিনে নিয়ে আসলাম ।ভাবলাম রাগ বুঝি কমে গিয়েছে ।
কিন্তু না বাসায় এসে দেখি এক পাশে বসে আছে । আমাকে জামা কাপড় এগিয়ে দিচ্ছে কিন্তু কথা বলছে না । আমি তাকে কত ভাবে যে বোঝানোর চেষ্টা করলাম আমি জান্নাত নামের কাউকে চিনি না , সে বিশ্বাস করলো না । যাই হোক গোসল করে খেতে যাবো , দেখি টেবিল আমার সব প্রিয় খাবার । আমি অবাক হয়ে বললাম এই গুলো কি আপনি রান্না করেছেন
না জান্নাত রান্না করেছে ।
এই কথা শুনে আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস পায়নি । খাওয়া শেষে চুপ চাপ উঠে চলে গেলাম বেলকনিতে । একটু পরে দেখলাম রুপাও এসে বসেছে কিন্তু কোনো কথা বলছে না ।
আমি তার হাত ধরে বললাম রুপা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি । বিশ্বাস করো আমি জান্নাত নামের কোনো মেয়ে কে চিনি না । আমার কোনো বন্ধু হয়তো মেয়ের আইডি খুলে ফাজলামো করছে । আমার জীবনে তুমি প্রথম কোনো মেয়ে যার হাত আমি ধরেছি । আমি আল্লাহকে ভয় পাই , তাই নিজেকে গচ্ছিত রেখেছি তোমার জন্য ।
এই কথা গুলো বলে আমি চুপ করে বসে আছি । কিছুক্ষণ পর দেখলাম আমার উনি মানে আমার রুপা আমার কাঁধে মাথা রেখে বলে
আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি । আমি জানি তুমি এমন কিছুই করনি । আর ওই জান্নাত আইডিটাও আমার । বাসায় তেমন কোনো কাজ নেই । কিছু দিন আগে আইডিটা খুলে তোমার সাথে চ্যাট করে সময় পার করতাম । আমি তোমাকে বাজিয়ে দেখলাম যে তুমি কেমন বাজো ।
তুমি খুব ভালো একজন মানুষ । তুমি জানো আমাদের সমাজে কিছু মানুষ পুরুষ থাকে , যারা শুধুই পুরুষ । তারা পুরুষ থেকে মানুষ হতে পারে না । ঘরে বউ আছে কিন্তু বাহিরে পরকীয়া করে বেড়াচ্ছে । বউয়ের গায়ে বিনা কারণে হাত তুলছে । তারা আসলে পুরুষ কিন্তু মানুষ না । আমি জানি না তুমি সেই গণ্ডি থেকে বের হতে পেরেছো কিনা । কিন্তু আমার কাছে তুমি একজন পুরুষের পাশাপাশি একজন মানুষ । আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি তোমার মতো জীবন সঙ্গী পেয়ে । আমি যেমন চেয়েছিলাম ঠিক তেমন আমার মনের মানুষ পেয়েছি । আজ আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই ।

দেখো রুপা একজন বিবাহিত মানুষের জীবনে টাকা পয়সা , গাড়ি বাড়ি এই সব কিছু করার আগে নিজের মধ্যে বিশ্বাস নামক বস্তুটা জন্ম দিতে হবে । তা না হলে সেই সম্পর্ক দিনে দিনে বিষের মতো হয়ে উঠবে । আমি যতই টাকা পয়সা ইনকাম করনি না কেন , যদি একে অপরের প্রতি বিশ্বাস না রাখি তাহলে সুখ নামের পাখিটা কখনো ধরা দিবে না । আমি তোমাকে অনেক বিশ্বাস করি , কারণ আমি তোমার মধ্যে দেখেছি আমার প্রতি এক অন্য রকম ভালোবাসা । আমি শুধু তোমাকে নিয়ে ইহকালে নয় পরকালেও থাকতে চাই । আমি চাই তোমাকে আমার জনম জনমের সাথী করতে ।

আমিও চাই তোমাকে নিয়ে বাঁচতে । তোমার মাঝে বাঁচতে । আমার ভালোবাসা তো আমি তোমার মাঝে দেখেছি । আমি বেশি কিছু চাইনা তোমার কাছে । শুধু বলবো আজ আমাকে যেভাবে ভালোবাসো , ঠিক আজীবন ভালোবেসে দিও একই রকম করে । এই দুনিয়ায় কেন , পরকালে যদি সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে বলা হয় প্লিজ তুমি আমাকেই তোমার সঙ্গী করে নিয়ে ।

রুপা এই কথা বলে আমার বুকের মাঝে মুখ লুকল । আমি তার কথা শোনার সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখছিলাম । যখন সে আমার বুকে মাথা রাখল আমি তখন তার দিকে তাকালাম । কি তার মায়াবী মুখ । আকাশের জোছনা তখন মেঘে ঢেকে গিয়েছে । যাবেই না কেন , চাঁদ যে আমার বুকে আজ মাথা লুকিয়েছে । এই পূর্ণিমা শুধুই আমার ।

প্রথম থেকে সব পর্ব পড়ার জন্য সাইটে প্রবেশ করুন । আমার নামের ওপর ক্লিক করলে সব আর্টিকেল পেয়ে যাবেন

আজ আমার বিয়ে – পর্ব ৫ম

Now Reading
আজ আমার বিয়ে – পর্ব ৫ম

আজ আমার বাসর রাত।অনেক জল্পনা কল্পনা শেষ করে আমার কাছে ধরা দিলো আজকের রাত । আমি তাহারে অবশেষে পাইলাম । এই রকম কিছু কথা আমার মনের মধ্যে বার বার বেজে উঠছিল । বিয়েটা পারিবারিক ভাবে হওয়ার কারণে ঝামেলা একটু কম হয়েছে । আমি কাজ শেষ করে ঘরে ঢুকবো । আমার উনি মানে আমার বউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে । আমি ঘরে ঢুকে প্রথমে তাকে সালাম দিলাম
আসসালামু আলাইকুম , আমি বললাম
ওয়ালাইকুম আসসালাম
আমি আর কোনো কথা না বলে তার পাশে গিয়ে বসলাম । আজ ও আমি প্রথম দিনের মতো চুপ করে বসে আছি । কিন্তু এইবার আর তাকে আগে কথা বলতে দিলাম না ।কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আমি নিজেই বললাম – ওযু করেছেন ?
তিনি হয়তো একটু অবাক হয়েছে আমার কথা শুনে । উনার উত্তর – জী না , এখনো ওযু করিনি ।
আমি বললাম – আমার ওযু আছে , আপনি ওযু করে আসেন দুই জন এক সাথে নামাজ আদায় করে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করি ।
তিনি কোনো কথা না বলে ওযু করতে চলে গেলেন । ওযু করে এসে দুই জন এক সাথে নামাজ পড়ে উঠলাম ।
নামাজ পড়ে উঠে আমি তার কপালে চুমু খেয়ে বললাম আমি আজ অনেক খুশি আলহামদুলিয়াহ ।
উনি আমার কথা শুনে কোনো উত্তর না দিয়ে বলে উঠলেন – আপনার বেলকনিটা অনেক সুন্দর ।
জী আমি নিজের হাতে সাজিয়েছি আমার বেলকনিকে । মাঝে মাঝে আমি এখানে বসে বই পড়ি । আবার চাঁদের জোছনা উপভোগ করি । চলেন আজ আপনাকে নিয়ে বসি , কিছু কথা শেয়ার করি ।
আমি আর উনি চলে গেলাম বারান্দায় । একে অপরের সাথে গল্প করছিলাম নিজেদের জীবন নিয়ে । কে কি করেছি , কিভাবে বিয়ের আগে নিজেদের হেফাজত করেছি ।
ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় ৪ বাজে । আমি তাকে বললাম ফজরের সময় হয়ে গিয়েছে , নামাজ পড়ে শুয়ে পড়ি । আমি নামাজ পড়ে শুয়ে পড়লাম । আমার উনি ও শুয়ে ছিলেন
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চলে গেলেন রান্না ঘরে । মা , মামা , চাচা ও আমার জন্য নাস্তা বানিয়ে আমাকে ঢাক দিলেন ।
সকাল সকাল কানে বাজছে – এই যে লাল জীন ঘুম থেকে উঠেন । ও বলতে ভুলে গিয়েছি আমাকে উনি লাল জীন বলে ঢাকে । অবশ্য আমি কারণ জিজ্ঞেস করেনি ।
আমি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে এসে দেখি সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে । আমি রুটিটা মুখে দিয়ে বললাম – মা আজ তুমি খুব ভালো রুটি বানিয়েছ ।
আমার আমাকে ঝাড়ি দিয়ে বলল আমি আজ রুটি বানায়নি তোমার বউ বানিয়েছে । আমি আর কোন কথা বললাম না । লজ্জা পেয়ে গেলাম অনেক ।খাবার খেয়ে নিজের ঘরে এসে পড়লাম । উনি একটু পর আসলো ।
আপনি নাস্তা খেয়েছেন ? আমি প্রশ্ন করলাম ।

জী আপনারা খেয়ে যাওয়ার পর আমি খেয়েছি ।
কিছু দিন এভাবে কেটে যায় আমাদের নভ বিবাহিত জীবন । কিছু দিনের মধ্যে অফিস খুলে যায় । আমি অফিসে বসে শুধু আমার রুপার কথা ভাবছি । ভালো লাগছিল না ।
কম্পিউটার সামনে ছিল তাই ফেসবুকটা ওপেন করলাম । ওপেন করে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল । অনেক দিন ঢোকা হয় না , যার ফলে অনেক ম্যাসেজ এসে জমা হয়েছে । ম্যাসেজ এ চোখ বুলাতে বুলাতে একটা কবিতা চোখে পড়লো
তোমার চোখের আমি হারিয়ে যেতে চাই স্বপ্ন লোকে । অবাক হলাম কবিতাটা পড়ে । নাম খেয়াল করলাম । উনার নাম জান্নাত । আজ সকালে ম্যাসেজ দিয়েছে আমাকে । খুব দুরু দুরু বুক নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম
কে আপনি ?
সাথে সাথে উত্তর আসলো আপনার মনের মান্নাত । আমি তো আপনারই জান্নাত ।
আপনি কি কবিতা ছাড়া কথা বলতে পারেন না ?
কেন আমার কবিতা আপনার ভাল লাগে না ? আমি তো আপনার জন্য কবিতা লিখি । আপনি জানেন আপনার জন্য কত রাত ঘুমায়নি ?
আরে আজব তো আপনি কে ? আর আমি বিবাহিত , আমাকে আপনি কি সব কথা বলছেন ।
এই কথা বলে আমি আর এক মিনিট ও ফেসবুকে থাকলাম না বের হয়ে পড়লাম ।

মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি বউ কল দিয়েছে । ফেসবুকে থাকার কারণে খেয়াল করা হয়নি । কল ঘুরাতে প্রশ্ন আসলো
খুব ব্যস্ত নাকি আপনি ?
আরে না একটু কাজ ছিল করছিলাম ।
তাই বুঝি ,
জী
আচ্ছা আপনার ফেসবুকের ছবিতে এক মেয়ে কমেন্ট করলো তুমি আমার চাঁদ । আমি তোমার জোছনা ? আপনি না বিয়ের আগে প্রেম করেনি তাহলে এখন চাঁদ জোছনা কোথা থেকে আসছে ?
কি বল এই সব ।মাফ করবেন আপনাকে তুমি করে বলেছি । কি সব বলছেন আপনি । কোন মেয়ে , আর কেনই বা এইসব কোথা বলবে ?
হ্যাঁ অন্য সব মেয়েকে তুমি করে বলতে সমস্যা নাই চাঁদ বলেন জোছনা বলেন ।শুধু আমার বেলায় সমস্যা । মেয়ের নাম জান্নাত । আপনি থাকেন আপনার জান্নাতকে নিয়ে । আমি রাখি ।
এই কথা বলে সাথে সাথে রেখে দিল ।
কি যে বিপদে পড়লাম । কে আবার এই জান্নাত , কি সব যে করছে ।

 

চলবে

সব গুলো লিংক এর জন্য সাইটে প্রবেশ করুন

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

প্রথম পর্বের পর থেকে…..

ইসাবেলার অমন আবেগী প্রশ্নে আমি তার দিকে অবাক চোখে তাকালাম আর উত্তর দিলাম,  “কেউ আমার কাছে আমার মাতৃভাষা শিখতে চেয়েছে আর আমি তাকে তা শেখাবো- এর চাইতে বড় সম্মানের আর কি হতে পারে?”

ইসাবেলার প্রতিউত্তর আমাকে আরো বেশি অবাক করলো। বললো, তোমার দেশ এই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যারা মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছে। দেশকে পাকিস্তানিদের থেকে মুক্ত করেছে। মাতৃভাষার প্রতি এমন নজির তো দেখা যায়না। তাইনা?

অস্ফুটভাবে আমার মুখ থেকে বের হয়ে এলো, তুমি কি করে জানো আমার দেশের এত খবর? সে বললো, লন্ডনে এক বাংলাদেশি মহিলার সাথে তার দেখা হয়েছিল, বেশ বয়স্ক।  ৭১’ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয় ও আরো অনেক কথা। এই খবর জানার পর সে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত ঘাটাঘাটি শুরু করে। প্রচুর পড়াশুনা করে।  সেই থেকে নাকি আমার দেশ আর মানুষের প্রতি তার এত আগ্রহ।

প্রথম দিনের কাজের অভিজ্ঞতা, নতুন কিছু বন্ধু পাওয়া, ইসাবেলার মত সেকশন বস পাওয়া, সব মিলিয়ে কাজের ক্ষেত্রে এমন দিন আগে কখনো আসেনি।

কাজ শেষে বাসায় চলে এলাম, মশিউর ভাই পরে আসবে বললো। উনি বাসায় এলে ডিনার করতে বসলাম, জিজ্ঞেস করছিলো, কি অবস্থা, ইসাবেলার সাথে প্রথম দিনেই এত খাতির, না জানি পরে কি হয়? ইসাবেলা কিন্তু লাইফ পার্টনার হিসেবে দারুণ মেয়ে। মশিউর ভাই কি বোঝাতে চাইলেন বুঝলাম, বললাম, নারে ভাই, বিদেশিনী ঘরে আনার ইচ্ছে নেই। উনি, মুচকি একটা হাসি দিয়ে খেতে লাগলেন, আর কিছু বললেন না; তবে খাওয়া শেষে রুমে ঢোকার সময় খোঁচা মেরে বললেন, কয়দিন পর যেন এমন না শুনি,”ভাই, আব্বা-আম্মারে একটু বোঝান”; কিংবা “ভাই, কাজী অফিস কোথায় পাবো?” আমাকে লজ্জা দিয়ে উনি রুমে চলে গেলেন। আমিও মনে মনে হাসতে লাগলাম, নাহ, অস্বীকার করি কি করে, সত্যিই ইসাবেলা কিন্তু দারুণ একটা মেয়ে। ভালোলাগার মত, ঠিক যাকে ভালোবাসা যায়।

পরদিন থেকে ইসাবেলার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো, আর ও আমার সাথে শুধুই দুষ্টুমি করতো। ফুল সাDSC 3009.jpgইজ পিজ্জা এনে একদিন বললো, এই পিজ্জা যদি শেষ করতে পারি, তাহলে আমাকে নাকি Holland – America লাইনে ইংল্যান্ড ঘোরাতে নিয়ে যাবে। বলে রাখা ভালো, Holland – America Line টুরিষ্টদের জন্য খুব নিরাপদ আর বিশ্বাসযোগ্য টুরিজম ভিত্তিক জাহাজ।

অত বড় পিজ্জা সত্যিই শেষ করা সম্ভব নয়। তাই আমিও ওকে ধরলাম, বললাম, ফিফটি-ফিফটি। তুমি যদি তোমার অংশ শেষ করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমি বাংলাদেশে নিয়ে যাবো এবং সেটা আমার ভার্সিটি খোলার আগেই। বেশ, যেমন কথা তেমন কাজ, বুঝতে পারছিলাম, ওর শেষ করতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু ওর চোখে মুখে তখন আমার সাথে বাংলাদেশে যাবার প্রবল ইচ্ছা। ওর ঐ আগ্রহ দেখে আমিও আমার অংশ শেষ করে ফেললাম। ব্যস, ডিল ফাইনাল: আমি আগষ্টের শেষ নাগাদ ওকে দেশে নিয়ে যাবো আর ও আমাকে ফাইনাল এক্সামের পর ইংল্যান্ড নিয়ে যাবে। ওর বাংলাদেশে যেতে ভিসা লাগবেনা,  আমার ইংল্যান্ড এর ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন করে করাতে হবে। ও বললো, আমি ভিসা করিয়ে দেব আমার রেফারেন্সে যেহেতু আমি তোমাকে আমার দেশ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। ভিসা নিয়ে টেনশন করোনা।

KFC এর কাজ তেমন কঠিন না, প্রতিদিন সময় করে সে ৩০ মিনিট বাংলা শিখতো আমার কাছে। আর আমি শিখতাম ব্রিটিশ একসেন্ট। বাংলা শিখতে ওর যতটানা বেগ পোহাতে হচ্ছিলো, ওর ইংরেজি উচ্চারণ শিখতে আমার দাঁত ভেঙে যাচ্ছিলো।

যাইহোক, এভাবেই অনেক আনন্দের সাথে দিনগুলো কাটছিল। মশিউর ভাইও মাঝেমাঝে যোগ দিতো আমাদের আড্ডায়। ডাচ বন্ধুরাও বাংলা শেখার চেষ্টা করতো; আমিও টুকটাক ডাচ শেখার চেষ্টা করতাম। নতুন ভাষা শেখার মজাটাই অন্যরকম।

একদিনের কথা, সেদিন শুক্রবার কিংবা শনিবার ছিল, সঠিক দিনটা ঠিক মনে করতে পারছি না। রাত ১টা বাজে। মশিউর ভাই আমস্টারডাম বন্ধুর বাসায়। আমি একা।  হঠাৎ ইসাবেলার ফোন, বললো, ফেরদৌস তুমি কি এখনই একটু মিউনিসিপাল হসপিটালে আসতে পারবে? কন্ঠ শুনে বুঝতে বাকি রইলো না, ও দারুণ অসুস্থ। তাই কিছু আর জিজ্ঞাসা করিনি, দেরী না করে মশিউর ভাই এর BMW নিয়ে ঝড়ের বেগে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখনও আমার ইউরোপিয়ান লাইসেন্স হয়নি। কন্ট্রোল ধরলে বড় বিপদ, আনুমানিক ১২০০ ইউরো ফাইন। সাথে বোনাস মশিউর ভাইকেও জরিমানা।

ফাইনের কথা ভুলে আল্লাহর নাম ডাকতে ডাকতে পৌছে গেলাম, গিয়ে দেখি ইসাবেলার খুব জ্বর সাথে আরো শারীরিক সমস্যা। আমাকে দেখে একটা হাসি দিয়ে আমার হাত তার হাতের ভেতর নিয়ে বললো, তুমি এসেছো তাহলে? আমি জানতাম তুমি আসবে। বিশ্বাস করো, আমি এখানে একদম একা। দেখার কেউ নেই। এক ঘন্টা হলো হসপিটালে…… ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, চুপ থাকো, আর কারো থাকার দরকার নেই, আমি আছি তো! তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে আমার হাতের পিছে একটা চুমু দিলো আর হাতটা ওর হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিল।  আমি ওর সোনালী চুলে হাত বিলিয়ে দিচ্ছিলাম,  ডাক্তার এসে বললো, চিন্তা করার মত কিছু নেই, আজ রাতেই জ্বর নেমে যাবে। আরো বললো, সে যদি সত্যিই সুস্থ আর ভালো থাকতে চায়, তাকে বিয়ার কিংবা অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে বলুন। তার লিভার বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত।  শুনে খুব বেশি অবাক হলাম, কারণ যে মেয়েকে কখনো ধূমপান করতে দেখলাম না, সে কি করে এত অ্যালকোহল নেয় তা আমার মাথায় ঢুকলো না; আর এতটাই নেয় যে তার লিভারে সমস্যা হয়ে গেছে?

ও তখন ঘুমে বিভোর, রাত তিনটা বাজে। আমার দু-চোখে ঘুম নেই, এক অজানা অস্থিরতা বয়ে চলেছে মনের ভেতরে। নিজেকে বোঝাতে পারছিনা, কেন এই ব্রিটিশ কন্যার জন্য আমার মন এত ব্যাকুল হয়ে পড়েছে? আমি কি তবে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি? এমন ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক খেয়াল নেই!

হঠাৎ আমার গালে কারো হাতের ছোয়াঁতে ঘুম ভেঙে গেল। জেগেই দেখি ইসাবেলা। আমাকে জাগতে দেখে তার মলিন মুখে এক রাশ হাসি ছড়িয়ে পড়লো। আমাকে বললো, “তুমি আমার বিয়ার/অ্যালকোহল নেওয়ার কথা শুনে খুব বিচলিত তাইনা ফেরদৌস? ইউরোপিয়ানদের এই একটা অভ্যাস আছে, জানোই তো; আমার বদ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এই তোমাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো কোনদিন অ্যালকোহল নেব না। তোমার বাবা তোমার জন্য বাংলাদেশ থেকে যে আম পাঠিয়েছে, সেগুলো দিয়ে আমাকে প্রতিদিন জুস বানিয়ে দেবে তো?”

চলবে……………