বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – ষষ্ঠ পর্ব (ফেলুদা)

Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – ষষ্ঠ পর্ব (ফেলুদা)

ফেলুদা। বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত একটি নাম। প্রকাশের দিক দিয়ে অর্ধশত বছর পার করার পরও ফেলুদা আর তার অভিযানের আকর্ষণ পাঠকের কাছে আজও কমে নি। মূলত গোয়েন্দা কাহিনী হলেও ফেলুদার প্রতিটি কাহিনীতে একটা ভ্রমণ কাহিনীর নির্যাস সবসময় মিশে আছে। সে ভূস্বর্গ কাশ্মীর হোক বা রাজেস্থানের সোনালী বালির মরুভূমি।

সত্যজিত রায়ের লেখালেখির হাতেখড়ি অনেক আগে হলেও, মূলত তিনি বিজ্ঞাপন চিত্রের ছবি আঁকা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজের লেখাকে পাঠকদের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলতে বইয়ের জন্যেও ছবি এঁকেছেন তিনি। ফেলুদা সিরিজের লেখা শুরুর আগেই একজন বিখ্যাত পরিচালক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালীর’ মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে প্রথম বছর লিখতে শুরু করেন ফেলুদাকে নিয়ে। প্রথম বইয়ে একেবারে তরুণ ফেলুদা আর সদ্য কৈশোরে পরা তপসে কে নিয়ে লেখা গল্পের নাম ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’। এরপর ফেলুদাকে নিয়ে একে একে লিখে ফেলেন ৩৫টি কাহিনী। লিখতে ভালবাসতেন তিনি। ফেলুদা সিরিজের কোন কোন উপন্যাস মাত্র দুই কি তিন দিনেও লিখে শেষ করেছেন সত্যজিৎ রায়। কেবল গুণী লেখকই না, সেই সাথে তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত একজন চিত্রশিল্পী, অসাধারণ মানের একজন পরিচালক। এমন কি চলচ্চিত্র আর টেলিভিশনের জন্যে চিত্রনাট্য, সংলাপ, সঙ্গীত পরিচালনা করেও নিজের গুনের সাক্ষর রেখেছেন তিনি। উপমহাদেশের একমাত্র অস্কার আসে তারই হাত ধরে ১৯৯২ সালে।

সত্যজিত রায় ছিলেন একজন প্রতিভাশালী শিল্পী এবং পরিচালক। কাজের জন্যে দেশের নানান প্রান্তে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায় ফেলুদা সিরিজের গল্প গুলোতে। স্থান-কাল পাত্রের এমন সুন্দর আর সূক্ষ্ম বিবরণ দেয়ার ক্ষমতা বাংলায় খুব কম লেখকরই আছে বলে আমার বিশ্বাস। ফেলুদার কাহিনী বাংলা ভাষার বাইরে নানান ভাষায় অনূদিত এবং সমাদৃতও হয়েছে ব্যাপক ভাবে। একেবারেই মৌলিক ধারার সিরিজ এই ফেলুদা। বিদেশী গল্পের কোন রকম ছায়া এতে চোখে পড়ে না।

১৯৬৫ সালে যখন লেখা শুরু হয় তখন ফেলুদার বয়স ছিল মাত্র ২৬ আর একেবারে শেষের দিকে এসে ফেলুদার বয়স বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫। ফেলুদার চরিত্রটি মোটেও অন্যসব খামখেয়ালী গোছের গোয়েন্দাদের মত নয়। সূক্ষ্ম বুদ্ধির জোরে রহস্য সমাধানে তার জুড়ি মেলা ভার। পুরো নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র। এককালে ভালো ক্রিকেট খেলতো এ বিষয়ে জানা যায় তার অতীতের গল্প থেকে। পড়ালেখা শেষ করে চাকুরীতেও যোগ দিয়েছিল সে। কিন্তু সারাক্ষণ মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকা রহস্যের পোকা আর গোয়েন্দাগিরির নেশা তাকে একসময় পুর-দুস্থ গোয়েন্দা বানিয়ে ফেলে। রোজ সকালে যোগ ব্যায়াম করা ফেলুদার অভ্যাস। আর বদ অভ্যাস বলতে কেবল ঘন ঘন চারমিনার ধরানো। বিশ্লেষণী ক্ষমতার ঝলক শার্লক হোমস শুরু করে দিয়ে যাবার পর থেকে অনেক গোয়েন্দাই সে পথ অনুসরণ গেলেও, এর বাস্তবিক ব্যাবহারের চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায়  ফেলুদার কাহিনী গুলোতে।

প্রায় সব গল্পের শুরুতে দেখা যায় ফেলুদাকে নানান ধরনের বই পড়তে। সব বিষয়ে কিছু না কিছু জেনে রাখবার জন্যে এই প্রয়াস। আজকের গুগল, ইউটিউবের যুগে ফেলুদা কি করত তা জানি না, তবে মনে হয় বই পড়া ফেলুদাকেই যেন বেশি মানাত এ যুগেও। বিপদের মুখে দুর্ধর্ষ সব খুনে বদমাশের সাথে হাতাহাতি করতেও দেখা যায় তাকে। এ বিষয়েও তার যোগ্যতার প্রমাণ দেখা যায় সিরিজের বই গুলোতে। বুদ্ধিমত্তা, বিশ্লেষণ আর তদন্ত সব মিলিয়ে রহস্যের সমাধান করার যে প্রতিভা লেখক তাকে দিয়েছেন, সেগুলো যেন নেহায়েত কল্পনা নয় বরং বাস্তবের সাথে কল্পনার এক উৎকৃষ্ট মিশেল।

গোয়েন্দা থাকবে আর তার সহকারী থাকবে না, সে তো হয় না। ফেলুদার কাহিনীতে সেই চরিত্রের নাম তপসে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফেলুদার সব অভিযান যত্ন করে যে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছে বলে লেখকের দাবি সেই হচ্ছে তপসে। পুরো নাম তপেস রঞ্জন মিত্র। বয়সে ফেলুদার অর্ধেক সম্পর্কে খুড়তুতো ভাই। ছোট বেলা থেকে ফেলুদার সাথে থেকে থেকে গোয়েন্দাগিরির কাজে বেশ অভিজ্ঞ। বিপদে আপদে আর রহস্য সমাধানে সবসময়ই ফেলুদার ছায়া সঙ্গী হিসেবে দেখা যায় তাকে।

থ্রি মাস্কেটিয়ার্স এর তৃতীয় জনের নাম লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু। ছোটখাটো চেহারার টাক পরা এই ভদ্রলোক পেশায় একজন লেখক। ‘জটায়ু’ ছদ্ম নামে বই লেখেন। ‘সোনার কেল্লা’ গল্পে ফেলুদা আর তপসের সাথে তার পরিচয় হয়। সেই বইয়ের নাম আর কাহিনীর বিবরণের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় যে হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন তা সত্যি অসাধারণ। নানান মজাদার কাণ্ড আর কথার মাধ্যমে রহস্য ঘেরা গল্প গুলোকে গতিশীল করে তোলার পেছনে এই জটায়ুর অবদান বিশাল।

একক বই, সমগ্র আর অনুবাদের বাইরে ফেলুদা সিরিজের বেশ কিছু কাহিনী পরবর্তীতে কমিক্স আকারেও প্রকাশ করা হয়। রুপালী পর্দায় ১৯৭৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট নয়বার নিজের কেরামতি দেখিয়েছে ফেলুদা। এর মাঝে ছয় বারই ফেলুদা চরিত্রে দেখা গেছে সব্যসাচী চক্রবর্তীকে। হিন্দি এবং বাংলা টেলিভিশন ধারাবাহিক হিসেবেও ফেলুদা সিরিজ প্রচার হয়েছে বহুবার। ফেলুদা ৩০ নামের বিখ্যাত ধারাবাহিকটি ছোট বেলায় টিভিতে দেখেনি এমন মানুষ কমই পাওয়া যাবে। এমনকি আধুনিক যুগের এনিমেটেড সিরিজ হিসেবেও ফেলুদাকে পর্দায় নিয়ে আশা হয়েছে। কানাঘুষা শোনা যায় এ বছরের শেষ নাগাদ হিন্দি ছবির পর্দায়ও অভিষেক ঘটতে পারে ফেলুদার।

সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর সাথে ফেলুদার কিন্তু মৃত্যু ঘটেনি। যদিও তাঁর লিখে যাওয়া ফেলুদা সিরিজের অসম্পূর্ণ উপন্যাস গুলো কেউ শেষ করেন নি। কিন্তু তার সুপুত্র সন্দীপ রায়ের হাত ধরে টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে চলেছে ফেলুদা। সময়ের সাথে সবকিছুতে যত পরিবর্তনই আসুক গোয়েন্দা কাহিনী ভক্ত পাঠকদের কাছে ফেলুদার আবেদন আজও একই রকম রয়েছে আর থাকবে আজীবন।