অবসরের পর

Now Reading
অবসরের পর

ফেনী স্টেশনে সন্ধ্যা থেকেই বসে ছিলেন রমেনবাবু, খেয়াল নেই কখন যে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে।
চায়ের দোকানের ছেলেটা দোকান বন্ধ করতে করতে বলল,

“কাকু আর কতক্ষণ বসে থাকবেন এভাবে? ঘড়িটা দেখুন, বারোটা বাজতে যায় যে!”

হাত ঘুড়িয়ে ঘড়িটার দিকে দেখে, বাড়ির পথে রওনা হলেন। বেশিদুর নয়, স্টেশন থেকে মাত্র কুঁড়ি মিনিটের হাটাপথ।

বাড়ির অমতে অমৃতাকে বিয়ে করেছিলেন রমেনবাবু, অব্রাহ্মণ মেয়ে বলে বাবা সাফ জানিয়ে ছিলেন তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম।

রমেনবাবুরা চারভাই, কারো সাথে সেভাবে যোগাযোগ নেই।
তাদের দুজন বিদেশে, আর একজন পৈতৃক ভিটে পুরান ঢাকার বাবুবাজারে থাকে, অবশ্য পৈতৃক বলতে গেলে নেই(ফ্ল্যাটবাড়ি)।

রমেনবাবু বাড়ির বড়ছেলে কিন্তু বাপ-মায়ের মুখাগ্নি পর্যন্ত করতে পারেন নি। বাবার কঠোর নির্দেশ ছিল, মায়ের বেলাতেও সেটা অক্ষুণ্ণ ছিলো।

অতএব, রমেনবাবু ওনার স্ত্রীকে নিয়ে এসে বাসা ভাড়া করে বসবাস করা শুরু করলেন।
সংসারে সুখের খামতি ছিলনা ওনাদের, কিন্তু ওনারা সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
ডাক্তারবদ্যি করে লাভ হলনা, তারপর ওঝা, হাকিম, ঝাড়ফুঁক করেও যখন কিছু হলনা তখন রমেনবাবু হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।
স্ত্রী অমৃতাকে বোঝাতেন তিনি,
‘অমন অনেকেরই বাচ্ছা হয়না, তাতে কি!’

তবুও অমৃতার চোখের জলে রোজ রাতে বালিশ ভিজত।
একটি নারীর কাছে মা না হতে পারার যন্ত্রণাটা বুঝতেন রমেনবাবু।
তাই কিছু বলতেন না তিনি স্ত্রীকে।

একটা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকতা করতেন রমেনবাবু। অবসরের একবছর আগে তিনি সেই স্কুলের প্রধানশিক্ষক হন।
দীর্ঘদিন তিনি রিটায়ার করেছেন। বর্তমানে তিনি সাড়ে সাতহাজার টাকা পেনশন পান।
তারমধ্যেই অমৃতার ওষুধ, রেশন, বিদ্যুৎ বিল, বাড়িভাড়ার পরে আর কিছুই বাঁচেনা।

কিন্তু,
বিগত দুইমাস ধরে পেনশন বন্ধ, বেশকিছু সরকারী কারণে দেরী হচ্ছিল।
গতকাল সব একসাথে পাবার কথা, কিন্তু আরো দিন দশেক মতো লাগবে পেনশন পেতে।
বাজারে একগাদা ধার,
ওষুধ, মুদী দোকান, বাড়িভাড়া!
ভেবেছিলেন গতকাল সব মিটিয়ে দেবেন, তা আর হলো কই!!

অমৃতা বাতের ব্যাথায় চলতে পারেননা, হার্টের সমস্যার সাথে আবার শ্বাসকষ্টও আছে।
রমেনবাবু অবশ্য এখনো প্রায় সুস্থ।

তিনদিন আগে অমৃতার ওষুধ শেষ, শতকষ্টেও অমৃতা ‘ভালো আছি নামক হাসি মুখে’ কাজকর্ম করে চলেছেন।
কাল রাতে অমৃতার শ্বাসকষ্টটা খুব বেড়েছিল।

তাই তিনহাজার টাকা ধারের জন্য আজ এক পুরানো বন্ধু প্রণব কে ফোন করেছিলেন সকালে। সে আজ দুপুরবেলায় তার বাড়িতে আসতে বলেছিলেন।

তিনহাজার টাকা দিয়েছিলেন প্রণব।
এতোদিন পর দেখা, তাই চায়ের আড্ডা হলো ঘন্টাদুয়েক।
আড্ডা শেষে সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পথে রওনা হলেন রমেনবাবু।

ফেনী স্টেশনে তখন খুব ভিড়, লোকালে কোনোরকমে ঝুলন্ত অবস্থায় এক পা দিতেই ট্রেন ছাড়ল, আর সেই ভিড়ে রমেনবাবুর হাতব্যাগটা কে টান মেরে নিয়ে চলে গেল!

স্টেশনে বসে সুইসাইড করার কথা ভাবছিলেন।
হঠাৎ, ছলছল চোখে তার অমৃতার ভাঙাচোরা মুখটা মনে পড়ল, মনে পড়ল তার সারাজীবনের ভালোবাসার কথা।

সেই মামাবাড়িতে বড়ো হওয়া অভিভাবকহীন লাজুক মুখের মেয়েটির ফুলসজ্জার রাতের ভয় মেশানো কথাটি কানে বাজলো আবার!

”কোনোদিনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো!”
কথা দিয়েছিলেন মৃত্যুর আগে অবধি হাতটি ধরে থাকবেন রমেন,তাই সুইসাইড আর করা হলনা।

রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে একমনে ভাবছিলেন রমেনবাবু! তিলেতিলে অমৃতার……

“আরে মাস্টারমশাই না!
ও মাস্টামশাই!! শুনুন!!”

মুখ ঘুরিয়ে রমেনবাবু পিছনের দিকে তাকালেন। দেখলেন,
একটা রিক্সা থেকে একজন নেমে এসে প্রণাম করলো তাকে। আর বলল,

– আমি গনেশ মন্ডল, গনা।
আপনার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছিলাম বলে সেই আপনি আমাকে বেতের বাড়ি মেরে ইস্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন! মনে পড়ছে মাস্টামশাই!

– হ্যাঁ! মনে পড়ছে, তা তুমি এখন রিক্সা চালাও?

– হ্যাঁ, কিন্তু আমার আরো দুটো রিক্সা আছে, সেগুলো ড্রাইভার চালায়। তা আপনি এতো রাতে, আপনার চোখে জল! কি হয়েছে বলুন না!

রমেনবাবু সমস্তকিছু বললেন,সব শোনার পর গনা বললো,

– মাস্টামশাই, আমি আপনাকে টাকাটা দিচ্ছি।
বদলে আপনি আমার এক ছেলে ও এক মেয়েকে পড়ানো শুরু করুন।আমার পরিচিত রিক্সাওলাদের বললে ওরাও তাদের ছেলেমেয়েদের আপনার কাছে পাঠাবে।
আপনি আবার শুরু করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

– কিন্তু আমিতো স্কুলের বাইরে পড়াইনি কখনো!

– মাস্টামশাই,আপনি কিন্তু এখন আর স্কুলেও নেই,
চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে আসি।
কাল সকালে ওদের আপনার বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।

রিক্সাটার সীটে বসে রমেনবাবু যখন উজ্জ্বল চোখে নতুন করে শুরু করার কথা ভাবছিলেন,তখন গনার ফোনের কথোপকথন কানে এলো,

“চারু! আমাদের বাচ্ছারাও পড়াশুনোয় এবার ভালো হবে গো! মাস্টারমশাই কে পেইচি…”