২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপের হালচাল

Now Reading
২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপের হালচাল

ইতিমধ্যেই ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শেষ করা হয়েছে। পহেলা ডিসেম্বর থেকে  রাশিয়ার মস্কোতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশসহ মোট ৩২টি দল অংশ নিচ্ছে। স্বাগতিক রাশিয়ার সাথে সবার আগে বিশ্বকাপ খেলার টিকিট নিশ্চিত করেছে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবংবর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। মোটামুটি ফুটবলের অন্য সকল জায়ান্টরা বিশ্বকাপের আসরে থাকলেও এবার দেখা যাবেনা চার বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে, ২০১৪ ফুটবল বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান অধিকারী নেদারল্যান্ডসকে এবং কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন চিলি’কে। যুক্তরাষ্ট্রেরও দেখা মিলবেনা এই বিশ্বকাপে, ১৯৮৬ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপ মিস করছে তারা। এছাড়াও চেক প্রজাতন্ত্র, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, তুরস্ক, আইভরি কোস্ট, ক্যামেরুন, ঘানার মতো ভাল দলগুলো বাছাইপর্ব খেলে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে পারেনি।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে সুইডেনের কাছে দুই লেগে ১-০ গোলে হারে ইতালি। এই হারের পর অবসর নেন ইতালির অধিনায়ক ও গোলরক্ষক জিওনলুইজি বুফন। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন চিলি, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচগুলিতে তাদের সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবার। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ছয় নম্বরে ছিলো চিলি। নেদারল্যান্ডস এর ভাগ্যও খারাপ বলতে হয়, ২০০২ সালের পর এই প্রথম তারা বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাজে পারফরম্যান্সের কারনে গত বছর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপও খেলতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। প্লে-অফে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ খেলছে পেরু। পেরুর কাছে নিউজিল্যান্ডের হেরে যাওয়াতে ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া রাশিয়া বিশ্বকাপে আর কোনো দল অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকলনা। অস্ট্রেলিয়াকে ওশেনিয়ার অংশ ধরা হলেও এই দেশ এশিয়ার অনেকটা অংশজুড়েই রয়েছে।

আবার দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে অনেক নাটকীয়তায় লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিক  বদান্যে তৃতীয় স্থানে থেকে সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ১৯৯০ সালের ইতালি ফুটবল বিশ্বকাপের ২৮ বছর পর এইবারই প্রথম বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা পেয়েছে আফ্রিকা অঞ্চলের পিরামিডের দেশ মিশর। রাশিয়া  বিশ্বকাপে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে আরো সুযোগ পেয়েছে মরক্কো, নাইজেরিয়া ও সেনেগাল। এছাড়া এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে পানামা ও ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের চমক আইসল্যান্ড। সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা পেয়েছে আইসল্যান্ড যাদের জনসংখ্যা মাত্র ৩ লক্ষ ৩০ হাজার। এশিয়া থেকে আছে ইরান, জাপান, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়া।

মস্কোর স্টেট ক্রেমলিন প্যালেস কনসার্ট হলে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে।   ফিফা র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী দল সাজানো হয়েছে। যেখানে আটটি গ্রুপের এক নম্বর গ্রুপে থাকবে রাশিয়া এবং এরপরের সাতটি গ্রুপে থাকবে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সাতটি দল। শুধুমাত্র ইউরোপ মহাদেশের সর্বোচ্চ দুটি দল একই গ্রুপে থাকছে, এছাড়া অন্য কোনো মহাদেশ থেকে একটির বেশি দল এক গ্রুপে রাখা হবে না।

এক নজরে রাশিয়া বিশ্বকাপের আট গ্রুপ :

‘এ’ গ্রুপ : রাশিয়া, সৌদি আরব, মিসর, উরুগুয়ে।

‘বি’ গ্রুপ : পর্তুগাল, স্পেন, মরক্কো, ইরান।

‘সি’ গ্রুপ : ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পেরু, ডেনমার্ক।

‘ডি’ গ্রুপ : আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, নাইজেরিয়া।

‘ই’ গ্রুপ : ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা, সার্বিয়া।

‘এফ’ গ্রুপ : জার্মানি, মেক্সিকো, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া।

‘জি’ গ্রুপ : বেলজিয়াম, পানামা, তিউনিসিয়া, ইংল্যান্ড।

‘এইচ’ গ্রুপ : পোল্যান্ড, সেনেগাল, কলম্বিয়া, জাপান।

 

চলুন জেনে নিই রাশিয়া বিশ্বকাপের ম্যাচ গুলো কোন ১২টি দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবেঃ

লুজনিকি স্টেডিয়াম, সেইন্ট পিটসবার্গ স্টেডিয়াম, সচি স্টেডিয়াম, একটেরিনবার্গ অ্যারিনা, কাজান অ্যারিনা , নিঝনি নভগোরোদ ,  রুস্তভ অন ডন অ্যারিনা, সামারা অ্যারিনা, সারাঙ্কস মোর্দোভিয়া অ্যারিনা, ভলগোগ্রাদ অ্যারিনা, মস্কো স্পার্টাক স্টেডিয়াম, কালিনিনগ্রাদ স্টেডিয়াম।

বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকলেও এ দেশের কোটি মানুষ বুঁদ হয়ে থাকেন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে। খুব কম মানুষের ভাগ্যেই সরাসরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সৌভাগ্য ঘটে।  তাই কোটি কোটি মানুষের ভরসা হয়ে উঠে টেলিভিশন।

সেইদিন আমাদের বিপক্ষে স্বয়ং ঈশ্বর খেলেছিলেন

Now Reading
সেইদিন আমাদের বিপক্ষে স্বয়ং ঈশ্বর খেলেছিলেন

বিংশ শতাব্দী শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকা একটি দেশ যেখানে চাঁদাবাজি, খুন, সন্ত্রাস সেখানকার নিত্যনৈমিক ঘটনা সেখানকারই এক চরম মাত্রার নেশাগ্রস্ত লোক আমারো। দিন আনতে পান্তা ফুরোয় আমারোর। যাও আয় করেন তার থেকে বেশি ব্যয় করেন নেশার কাজে। সেই আমারোর ঘরে জন্ম নিলো এক ফুটফুটে ছেলে। নাম রাখা হলো ম্যানুয়েল ডস সান্তোস।
বাবার নেশার কু প্রভাব পড়ল ম্যানুয়েলের উপর। জন্মের পরই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিল তাঁর। ম্যানুয়েলের মেরুদণ্ডের হাড় ছিলো বাঁকা, ডান পায়ের পাতা ছিলো বাইরের দিকে বাঁকানো, বাম পা ডান পায়ের চেয়ে ৬ সেন্টমিটার ছোট এবং ভিতরের দিকে বাঁকানো ছিলো। সাধারণভাবে চিন্তা করলে আমরা এ ধরণের কোনো মানুষকে প্রতিবন্ধী বলেই আখ্যা দেবো। ম্যানুয়েল ছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী। নিজের বয়সের ছেলেদের তুলনায় ছিলেন খুবই খর্বাকৃতির। তাঁর বোন রোসা এজন্য তাঁকে ডাকতেন ‘গারিঞ্চা’ নামে। গারিঞ্চা হলো এক ধরণের ছোট পাখি। তাঁর যখন ৪ বছর বয়স এই গারিঞ্চা নামটি তাঁর বন্ধু এবং পরিবারের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলো। ফলে সবাই তাঁর আসল নাম ম্যানুয়েল ভুলে গিয়ে গারিঞ্চা ডাকা শুরু করল।

“দ্যা গ্রেটেস্ট থ্রি মিনিটস ইন ফুটবল হিস্ট্রি” একজন ফুটবল প্রিয় সমর্থক এর কাছে হয়তোবা এই বিষয়টা অজানা নয় আর এই বিস্ময়কর ঘটনার জন্মদাতা গারিঞ্চা এর কথাই বলতেছি যাকে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা তাদের অফিসিয়াল ট্রিবিউটে তাকে বর্নণা করেছে একটি নামে; “দ্যা চ্যাপলিন অফ ফুটবল”ফুটবলের চ্যাপলিন । কখনও তাকে বলা হয়েছে “দ্যা ফরগটেন লিজেন্ড”আবার আবার কখনও তাকে প্রবল ভালোবাসায় ‘ও আঞ্জো ডি পারনাস টর্টাস’নামে অবিভূত করা হয়েছে।

শারীরিক গঠনের দিক থেকে দেখলে মনে হবে সে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধ কিন্তু মানসিক দিক দিয়ে অন্য যে কারো থেকে অনেক অনেক গুণ বেশী বুদ্ধিমান ।শারীরিক দূর্বলতা নিয়ে জন্মগ্রহনের কারনে বার বার তাকে নিজেকে প্রমাণ করতে দেওয়া হই নি ,সহ্য করেছেন অনেক অপমান , অনেক কষ্ট ।বাঁকা পা নিয়ে ফুটবল খেলবে ? যেই দেখতো-শুনতো সেই একটা উপহাস আর অবিশ্বাস মিশ্রিত চোখে ইগনোর করতো তাকে,তারপরেও দমে যান নি এই মহান প্লেয়ার ।
একে একে অনেক ব্যর্থতার পরে ,অনেক তিরস্কার ,উপহাসের পরে , অনেক কষ্ট অনেক অপমান এর পরে অবশেষে ফুটবল ঈশ্বর কৃপা করলেন গারিঞ্চার উপরে ।ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো এই জাদুকরের ।ট্রায়েলের সুযোগ পেলেন তৎকালীন ব্রাজিলীয়ান বড় ক্লাব বোটাফগোতে ।কিন্তু এখানেও অনেক বাঁধা, নিজেকে প্রমাণ করতে হবে বেষ্টদের বিপক্ষে । তারপরেই তো শুরু করতে পারবেন নিজেকে অনন্য পর্যায় নিয়ে যাবার অভিযান ।
বাঁকা পায়ের ছেলেটে যখন বোটাফগো ট্রেনিং গ্রাউন্ডে পৌঁছায় তখন তার সামনে খাঁড়া করা হয় জাতীয়দলের সেরা লেফটব্যাক নিল্টোন সান্তোসকে ।ট্রায়েলের সময় সবাই গারিঞ্চার অদ্ভুত বাঁকা পা দেখতে পেলেন,নিল্টন সান্তোস তাকে এ নিয়ে স্লেজিংও করতে লাগলেন ।আর গারিঞ্চা কি করলেন? সিম্পল, তিনি ন্যাশনাল টিমের দেশ সেরা লেফট ব্যাককে ড্রিবল করে চলে গেলেন !!!
ট্রায়াল শেষে নিল্টন সান্তোস গারিঞ্চাকে নিয়ে ক্লাব প্রেসিডেন্টের কাছে গেলেন আর বললেন;এই প্লেয়ারটাকে তাড়াতাড়ি সাইন করো, যাতে আমাকে তার বিপক্ষে খেলতে না হয় !
১৯ জুলাই ১৯৫৩ তে বোটাফোগোর হয়ে অভিষেক হয় গারিঞ্চার। ম্যাচটি বনসাক্সেসোর বিপক্ষে। নিজের প্রথম ম্যাচেই তাঁর দল জেতে ৫-০ গোলে। আর গারিঞ্চা? তিনি করেছিলেন হ্যাট্ট্রিক! এরপর গারিঞ্চা নিয়মিত তাঁর প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি এবং জুনিনিহো মিলে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নতুন এক ধরণের আক্রমণাত্মক মেজাজ নিয়ে আসেন। গারিঞ্চা দুর্দান্ত খেললেও ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান নি।এতে তাঁর জেদ আরো চড়ে যায়। ১৯৫৭ সালে বোটাফোগোকে ক্যাম্পেনাও কারিয়োকা জেতান। সেখানে ২৬ ম্যাচে ২০ গোল করেন গারিঞ্চা। যা ছিলো ওই টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই পারফরম্যান্স তাঁকে ১৯৫৮ বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পাইয়ে দেয়।

১৯৬২ বিশ্বকাপের পর গারিঞ্চা রিও তে ফিরে আসেন। ১৯৬২ সালে ফ্লাম্যানঙ্গোকে হারিয়ে বোটাফোগোকে আবারও ক্যাম্পেনাও কারিয়োকা জেতান। গারিঞ্চা ১২ বছর খেলেছিলেন বোটাফোগোর হয়ে। তাঁর ক্যারিয়ারই ছিলো ১৯ বছরের। অর্থাৎ বোটাফোগোতে বেশিরভাগ কাটান গারিঞ্চা। বোটাফোগোর হয়ে ৩ বার ক্যাম্পেনাও কারিয়োকা জেতেন যা ছিলো ব্রাজিলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা। সব মিলিয়ে বোটাফোগোর হয়ে ৫৮১ ম্যাচে ২৩২ গোল করেন। এবং তিনি বোটাফোগোর সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় এবং ক্লাবের প্রতীকও বটে।

১৯৬৬ সালে গারিঞ্চাকে করিন্থিয়ান্সের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। তাঁদের হয়ে মাত্র ১৩ ম্যাচে খেলেন গারিঞ্চা। করেন ১০ গোল। এর দুই বছর পর নিজ দেশ ছেড়ে কলম্বিয়ার পর্তুগিজা কারিয়োকা তে যোগ দেন। সেখানে ৩৩ ম্যাচে করেন ৭ গোল। একই বছর আবারও নিজ দেশের টান অনুভব করেন গারিঞ্চা। ফিরে আসেন ব্রাজিলের ফ্লাম্যাঙ্গোতে। ফ্লাম্যাঙ্গোর হয়ে ২৪ ম্যাচে করেন ৪ গোল। এরপর চলে যান ওলারিয়াতে। সেখানে ৭ ম্যাচে করেন ৭ গোল।গারিঞ্চা ক্লাবে যেমন ছিলেন রাজা তেমনি জাতীয় দলে ছিলেন সম্রাট। ১৯৫৪ বিশ্বকাপের দলে জায়গা পান নি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে নিজের যোগ্যতা দেখিয়ে নির্বাচকদের বাধ্য করেন তাঁকে দলে নিতে। অবশ্য এর আগেই ১৯৫৫ সালে জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক হয় চিলির বিপক্ষে। জাতীয় দলে খেলেছেন ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত। ঠিক সেই সময় উত্থিত হয়েছিলনের ফুটবল আকাশের আরেক নক্ষত্র, কালোমানিক পেলে। পেলে এবং গারিঞ্চা কে নিয়ে ব্রাজিলের আক্রমণ হয়ে গেলো ঠেকানোর অসাধ্য।

গারিঞ্চা এবং পেলে যে ম্যাচে একসঙ্গে খেলেছেন সে সব ম্যাচে কখনো হারে নি ব্রাজিল। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে অর্থাৎ গারিঞ্চার শেষ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির কাছে একটি ম্যাচে হেরে যায় ব্রাজিল, কিন্তু সেই ম্যাচে গারিঞ্চা খেললেও পেলে খেলেন নি।১৯৫৮ বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগের কথা। ইতালির ফিওরেন্তিনার বিপক্ষে বোটাফোগোর খেলা। গারিঞ্চার পায়ে বল এলো, একে একে গোলকিপারসহ ৪ জন কে কাটালেন, সামনে ফাঁকা গোলপোস্ট। টোকা দিলেই গোল। কিন্তু এ কি! গারিঞ্চা গোলপোস্টের সামনে গিয়ে থেমে গেলেন। কেবল থামলেনই না, পিছন ঘুরে দাঁড়ালেন। তিনি আসলে অপেক্ষা করছিলেন একজন ডিফেন্ডার ছুটে আসার জন্য, একজন এগিয়েও এলো তাঁকে থামাতে, কিন্তু কিসের কি! গারিঞ্চা তাকেও কাটালেন, এরপর গোল করলেন! তাঁর এই অবিশ্বাস্য কান্ডকারখানাতে তিনি ও তাঁর সতীর্থরা মজা পেলেও বোটাফোগোর কোচ খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে এভাবে অসম্মান করায়। তাতে গারিঞ্চার কি এসে যায়!

শুরু হলো ১৯৫৮ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের প্রথম ২ ম্যাচে গারিঞ্চাকে মাঠে নামানো হলো না। যদিও ম্যাচ ২ টি ব্রাজিল জিতে। এরপর ৩য় ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে গারিঞ্চা নামলেন। একই ম্যাচে অভিষেক হলো পেলের! সোভিয়েতরা ছিলো ফুটবল পরাশক্তি। তাদেরকে সেই বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার মনে করা হয়েছিলো। ব্রাজিল কোচ ভিসেন্তে ফিওলা প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিতে ফন্দি আঁটলেন। বুদ্ধিটি ছিলো কিক অফের সাথে সাথে সোভিয়েত কে আক্রমণ করা। কিক অফ করার সাথে সাথে বল পেলেন গারিঞ্চা। তিন জনকে কাটিয়ে শট নিলেন, তাঁর শট ফিরে এলো পোস্টে লেগে। এরপর ম্যাচের ১ মিনিটও যখন পার হয় নি, গারিঞ্চা বল সাজিয়ে দিলেন পেলেকে। পেলের শটও ফিরে এলো ক্রসবারে লেগে! সেই সময়টাকে বলা হয় ফুটবলের সেরা তিন মিনিট। ব্রাজিল ম্যাচটি জেতে ২-০ গোলে। কোয়ার্টারে সামনে পড়ে ওয়েলস।

ব্রাজিল ১-০ গোলের কষ্টার্জিত জয় পায়।সেই ম্যাচের পরে ওয়েলস ডিফেন্ডার মেল হপকিন্স গারিঞ্চাকে নিয়ে বলেন-

‘গারিঞ্চা পেলের থেকেও ভয়ংকর। সে একজন ফেনোমেনন এবং তাঁর অদ্ভূত ক্ষমতা আছে, তাঁর পায়ের অসামঞ্জস্যের কারণে বুঝা যায় না সে কোনদিকে যাবে, সে ডান দিকেও যেতে পারে আবার বাম পাকে ডান পা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আর তাঁর জোরালো শট তো আছেই’।

ফাইনালে মুখোমুখি ব্রাজিল-সুইডেন। ব্রাজিল ১-০ তে পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু একটু পরেই গারিঞ্চার গতির তোড়ে তাঁর মার্কার ছিটকে গেল, গারিঞ্চা ভাভার উদ্দেশ্যে ক্রস বাড়ালেন, ভাভা সমতা ফেরালেন। প্রথমার্ধ শেষ হবার কিছুক্ষণ আগে ঠিক একইভাবে গারিঞ্চা ভাভাকে বল বাড়ালেন, ভাভাও ঠিক একইভাবে গোল করে ব্রাজিলকে ২-১ এ এগিয়ে দিলেন। ব্রাজিল প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতলো, দুঃখে প্রলেপ পড়ল মারাকানা ট্র্যাজেডির এবং গারিঞ্চা বিশ্বকাপের সেরা একাদশে জায়গা পেলেন।গারিঞ্চার সতীর্থরা যখন বিশ্বকাপ জয় উদযাপন করছিলেন, গারিঞ্চা এক পাশে বিমর্ষ মনে বসে ছিলেন। আসলে গারিঞ্চা এমনকি ফুটবলের নিয়মগুলোই ভালো করে জানতেন না। তিনি ভেবেছিলেন বিশ্বকাপও লিগের মতো আর ব্রাজিল প্রত্যেক দলের সাথে দুবার করে খেলবে!

১৯৬৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল গেল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। গারিঞ্চা তখন হাঁটুর মারাত্মক ইঞ্জুরিতে ভুগছেন। তবুও প্রথম ম্যাচে তিনি খেললেন, ব্রাজিল বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতলো, গারিঞ্চা ফ্রি কিক থেকে একটি গোলও করলেন, যেটি আবার তিনি ডান পায়ের বাইরের দিক দিয়ে নিয়েছিলেন। পরের ম্যাচে গুডিসন পার্কে ব্রাজিল হাঙ্গেরির কাছে ৩-১ গোলে হেরে গেল, ব্রাজিলের হয়ে এই একটি ম্যাচেই গারিঞ্চা হেরেছিলেন, কাকতালীয়ভাবে এটিই ছিলো ব্রাজিলের হয়ে তাঁর শেষ ম্যাচ। কারণ হাঁটুর ইঞ্জুরি এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছিল যতে তাঁর ক্যারিয়ারই সংশয়ের মুখে পড়ে যায়।

পরের ম্যাচে ব্রাজিল পর্তুগালের কাছে হেরে যায় এবং প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। গারিঞ্চা ব্রাজিলের হয়ে ৫০ ম্যাচে ১২ গোল করেন।১৯৭৩ সালে গারিঞ্চা অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বয়স হয়ে গিয়েছিল ৪০। অবসরের সিদ্ধান্ত নেবার আরেকটি কারণ ছিলো, প্রথমবারের মতো নানা হয়েছিলেন গারিঞ্চা। তাঁর মেয়ে এডেনি আলেক্সান্দ্রা নামক এক কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।

১৯ ডিসেম্বর ১৯৭৩ এ গারিঞ্চার শেষ ম্যাচ আয়োজন করা হয়, এতে মুখোমুখি হয়েছিল ফিফা বিশ্ব একাদশ এবং ব্রাজিল। ম্যাচটি হয়েছিল মারাকানা স্টেডিয়ামে। ম্যাচটি দেখতে এসেছিল প্রায় ১ লক্ষ ৩১ হাজার দর্শক। ফিফা বিশ্ব একাদশে মূলত আর্জেন্টাইন এবং উরুগুইয়ান খেলোয়াড়েরাই ছিলেন। অপরদিকে ব্রাজিল দলে খেলেছিলেন পেলে, কার্লোস আলবার্তো সহ ১৯৭০ বিশ্বকাপজয়ী দলের কয়েকজন সদস্য। গারিঞ্চা প্রথমার্ধ খেলেছিলেন। ম্যাচের এক পর্যায়ে রেফফারি খেলা থামিয়ে দেন যাতে গারিঞ্চা উঠে যেতে পারেন। গারিঞ্চা উঠে যাওয়ার সময় সকল দর্শকসহ খেলোয়াড়েরা তাঁকে অভিবাদন জানায়। গারিঞ্চার মাঠ থেকে বেড়িয়ে যাবার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় একটি যুগের।গারিঞ্চা যতটা না ভালো ফুটবলার ছিলেন তাঁর থেকে ভালো মদখোর ছিলেন।

ফরেস্ট গাম্প (১ম পর্ব)

Now Reading
ফরেস্ট গাম্প (১ম পর্ব)

Forrest-gump-original.jpg

ধরুন আপনার আই কিউ গড়পড়তা লেভেল এর চেয়েও কম। আপনার বিকলাঙ্গতা মানুষের কাছে কৌতুকের বিষয়। আপনার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আপনাকে আপন করে নিতে পারে না। কিন্তু দিনশেষে আপনি হয়ে গেলেন একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। ব্যাপারটা কিন্তু একদমই অস্বাভাবিক কিছু না। কেননা আপনি নিজেই আপনার নিয়তির কারিগর। ১৯৮৬ সালে উইনস্টন গ্রুম তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফরেস্ট গাম্প’ এ এমন একজন মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৯৪ সালে এই উপন্যাস এর উপর ভিত্তি করে পরিচালক রবার্ট জেমেকিস পরিচালনা করেন ফরেস্ট গাম্প মুভিটি। মূল চরিত্রের নাম ফরেস্ট গাম্প। সে একজন কম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু সে দয়ালু, ভদ্র এবং খেলাধুলায় অস্বাভাবিক রকমের ভাল। ২০ শতকের শেষের দিকে আমেরিকায় ঘটা বেশ কিছু ঘটনা তার দ্বারা অনুপ্রাণিত।

কাহিনিঃ

ফরেস্ট গাম্পের জন্ম হয় ১৯৪৪ সালের ৬ জুন। সেই দিনটি ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঘটিত নরম্যানডে ল্যান্ডিং এর দিন। বাবার অনুপস্থিতির কারণে সে তার মায়ের সাথে বাস করত। গৃহযুদ্ধের কনফেডারেট জেনারেল নাথান বেডফরড ফরেস্ট এর নামের সাথে মিল রেখে মা তার নাম রেখেছিলেন ফরেস্ট গাম্প। তিনি ছিলেন কু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান এর প্রথম উইজার্ড। ধারণা করা হয় তিনি ফরেস্ট গাম্পের পূর্বসূরি ছিলেন। আসলে আমরা অনেক সময় এমন কিছু অর্থহীন কাজ করি যার কোনো মানে হয় না। এটি তেমন একটি ঘটনা। ছোটবেলায় ফরেস্ট এর পায়ে বেশ জোড় ছিল। কিন্তু তার শিরদাড়া বাঁকা থাকার কারণে হাঁটতে অসুবিধা হত। এজন্য তার পায়ে ব্রেস লাগানো হয়। এরপর জানা যায় যে তার আই কিউ গড়পড়তা লেভেল এর চেয়েও কম। এ কারণে স্থানীয় স্কুলের প্রধানশিক্ষক প্রথমে তাকে স্কুলে ভর্তি করতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু তিনি  ফরেস্ট গাম্পের মায়ের সাথে এক রাত কাটান যার বিনিময়ে ফরেস্ট স্কুলে ভর্তি হয়। মা তাকে সবসময় বলতেন কেউ যেন তাকে এটা বলতে না পারে যে সে সবার থেকে আলাদা। কেননা একজন অতি বুদ্ধিমান ব্যক্তিও যদি বোকার মত কোনও কাজ করে তাহলে সে বোকা হিসেবেই গণ্য হবে । ফরেস্ট তার মায়ের সাথে একটি বড় বাড়িতে বাস করত। তাই টাকার বিনিময়ে তারা ভ্রমণকারীদের তাদের বাসায় থাকতে দিত। এদের মধ্যে ছিলেন তরুণ এল্ভিস প্রিসলি যিনি কিনা ফরেস্টের অদ্ভুত নাচের ভঙ্গি থেকে ‘হিপ ডান্সিং’ নামে নতুন নাচের মুদরা আবিষ্কার করেন এবং তার ‘হাউনড ডগ’ গানে ব্যবহার করেন। স্কুলের বাসে জেনি কারেন নামে একটি মেয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। ফরেস্টের কাছে মনে হয়েছিল যে জেনি তার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। ফরেস্ট আর জেনি একসাথে অনেক সময় কাটাত; বিশেষ করে একটা বড় গাছের কাছে তারা বেশি সময় কাটাত। ফরেস্ট যেমন ছিল জেনি তাকে সেই ভাবেই গ্রহণ করেছিল। জেনি তাকে পড়তে শিখিয়েছিল। এছাড়া ফরেস্টকে নিয়ে যারা কৌতুক করত তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছিল। কিন্তু জেনি তার জীবনে অনেক অসুখী ছিল। অনেক ছোটবেলায় তার মা মারা যায়।  তার বাবা তাকে আর তার বোনদের নির্যাতন করত। এ কারণে তাকে তার নানীর বাসায় নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে প্রায় সে  পালিয়ে ফরেস্টের কাছে চলে আসত। একদিন তিনজন ছেলে ফরেস্টকে নিয়ে কৌতুক করে ফল ছুড়ে মারছিল এবং সাইকেল নিয়ে ফরেস্টকে তাড়া করছিল। জেনি ফরেস্টকে পালিয়ে যেতে বলে। দৌড়ানোর সময় হটাত করে তার পায়ের ব্রেস খুলে যায় এবং  সে অস্বাভাবিক গতিতে দৌড়াতে থাকে। এরপর থেকে তাকে আর কোনদিন পায়ে ব্রেস পড়তে দেখা যায় নি ।

জেনি আর ফরেস্ট এর মাঝে হাইস্কুল পর্যন্ত অনেক ভালো বন্ধুত্বতা থাকে। আর একদিন ফরেস্টকে  নিয়ে কৌতুক করার সময় সে স্কুলের ফুটবল মাঠের ভেতর দিয়ে চলে যায়। এতে খেলার ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু সে আলাবামা ক্রিমসন টাইড এর হেড কোচ পল বিয়ার ব্রাইনট এর মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফরেস্ট আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয় এ  ফুটবল বৃত্তি পায়। অস্বাভাবিক গতির সাহায্যে সে তার দলকে অনেক খেলায় জিতিয়ে দেয়। এরপর সে অল আমেরিকান ফুটবল দলের সদস্য হিসেবে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সাথে দেখা করার সুযোগ পায়। ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট অল আমেরিকান ফুটবল দলের সদস্য হওয়ায়  ফরেস্টের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চান। ফরেস্ট সততার সাথে জবাব দেয় ‘আই গটটা পি’। কেননা সে ফিফটিন ডক্টর পিপার পান করেছিল। ফরেস্ট আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয় এ বর্ণ বিভেদ লোপ দেখে। যখন অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা কালো  ছাত্রছাত্রীদের ব্যঙ্গ করছিলো তখন ফরেস্ট এগুলোর কিছুই বুঝতে পারছিল না। সে জেনিকে চমকে দেওয়ার জন্য চকলেট নিয়ে তার ক্যাম্পাসে যায়। সেখানে সে জেনিকে তার বয়ফ্রেন্ড এর সাথে গাড়িতে দেখতে পায়। সে ধারণা করে যে জেনির বয়ফ্রেন্ড বিলি তাকে আঘাত করছে। এই ভেবে সে ড্রাইভারের পাশের দরজা খুলে ফেলে এবং বিলিকে আঘাত করে। বিলি সেখান থেকে চলে  যায়। প্রথমে জেনি অনেক বিরক্ত হয়। কিন্তু পরে সে ফরেস্টকে তার রুমে নিয়ে আসে। যদিও ফরেস্ট এ ব্যাপার নিয়ে সন্দিহান ছিল।

১৯৬৭ সালে কলেজের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এক আর্মি অফিসার এর সাথে ফরেস্টের দেখা হয়। তার সাথে কথা বলার পরে সে আর্মিতে যোগ দেয়। সেখানে বেঞ্জামিন বুফোরড ব্লু নামে একজন কালো যুবকের সাথে দেখা হয়। তাকে বুব্বা বলেও ডাকা হয়। তার ইচ্ছা যে সে একটা চিংড়ির নৌকা কিনবে যাতে তার পরিবারের চিংড়ি রান্না করার প্রথা বজায় থাকে…………..(চলবে)।

আবেগের আরেক নাম রিয়াল মাদ্রিদ

Now Reading
আবেগের আরেক নাম রিয়াল মাদ্রিদ

রিয়াল মাদ্রিদ!
নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা জার্সি পরিহিত দূর্বার কয়েকজন ফুটবল খেলোয়াড়ের ছবি।যারা কিনা প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিচ্ছে নিজেদের ফুটবল জাদুতে!শেষ মিনিট অব্ধি যারা ঠোঁট কামড়ে লড়ে যাচ্ছে নিজেদের দূর্গ রক্ষার জন্যে।আয়তাকার ফুটবল মাঠটাতে যারা একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তার করে পুরো বিশ্বকে মোহিত করে রেখেছে সাদা জাদুতে।ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশে বসে সেই সুদূর স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ক্লাবটির সুখে আমরা হাসি,কষ্টে কাঁদি!আনন্দ বেদনার এক অদ্ভূত শিহরণ বইয়ে যায় আমাদের ভেতর দিয়ে।
এর কোনো কিছুই কিন্তু একদিনে আসেনি।সব গল্পের যেমন একটা শুরুর গল্প থাকে তেমনি রিয়াল মাদ্রিদ সিএফ এরও একটা শুরুর গল্প রয়েছে।হাসি-কান্না,আবেগ-অনুভূতির মিশেলে গড়া ক্লাবটির শুরুর গল্পটা কেমন ছিলো?
সময়টা উনিশ শতকের শেষের দিকে।ইস্টিটিউশন লিবরে দে এনসেনাঞ্জা’র(The Free Educational Institution)ছাত্ররা তখন প্রথম পরিচিত হয়েছিলো চর্মগোলকের খেলাটির সাথে।তারা চিন্তা করলো একটা ফুটবল ক্লাব খুললে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ।১৮৯৭ সালে তারা খুলে ফেললো তাদের ফুটবল ক্লাব।নাম দিলো ‘Football Club Sky’.
তারা প্রতি রবিবার সকালে মঙ্কলাতে খেলতে যেতো।১৯০০ সালে এসে ফুটবল ক্লাব স্কাই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।একটার নাম ছিলো ‘New Foot-Ball De Madrid’ এবং অপরটি ‘Madrid Football Club’.
জুলিয়ান পালাসিওসকে করা হয় মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
৬ই মার্চ,১৯০২।মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবকে অফিসিয়ালি প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।নতুন বোর্ড গঠন করে রিয়াল মাদ্রিদের প্রথম অফিসিয়াল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বার্সেলোনায় জন্মগ্রহণ করা কাতালান ব্যবসায়ী জুয়ান পাদ্রোস।পরবর্তীতে ১৯০৪ সালে জুয়ান পাদ্রোসের ভাই কার্লোস পাদ্রোস মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।১৯০৫ সালে তার অধীনেই মাদ্রিদের ট্রফি কেসে প্রথম ট্রফি যুক্ত হয়।প্রথম ট্রফিটা ছিলো কোপা দেল এয়নটামিয়েন্টো দে মাদ্রিদ যা বর্তমানে কোপা দেল রে নামে পরিচিত।১৯০৯ সালে মাদ্রিদের প্রতিষ্ঠাকালীন চারজন ফাউন্ডারের একজন অ্যাডোল্ফো মেলেন্ডেজ প্রেসিডেন্ট হয়ে আসলে মাদ্রিদ তার প্রথম অফিসিয়াল হোমগ্রাউন্ড পায়।১৯১০ সালে মাদ্রিদ শহরের ক্যালে ও’দোননেলের পাশে প্রতিষ্ঠিত “ক্যাম্পো দে ও’দোনলেল” ছিলো মাদ্রিদের প্রথম হোমগ্রাউন্ড। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত এ মাঠটিই মাদ্রিদ তাদের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করে।১৯১২ সালে এর সংস্কার করা হলে এ মাঠে গ্যালারিতে বসতে পারতো মাত্র ২০৬ জন।বাকিরা সাইডলাইনের পাশে,গোলবারের পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতো।এ স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজে সান্টিয়াগো বার্নাব্যু নিজে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।১৯২০ সালে স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আল্ফোন্সো মাদ্রিদকে রয়াল তথা রাজকীয় টাইটেল ব্যবহারের অনুমতি দিলে মাদ্রিদের নামের সাথে যুক্ত হয় “রিয়াল।”যারই পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রিদ হয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।১৯২৩ সালে ২২,৫০০ লোক ধারণক্ষমতার “এস্তাদিও চামার্টিন” হয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদের হোমগ্রাউন্ড।১৯২৯ সালে স্পেনে “স্প্যানিশ ফুটবল লীগ” তথা লা-লীগা শুরু হলে প্রথম সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার চেয়ে মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যাবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় হয়ে শেষ করে।১৯৩২ সালেই রিয়াল মাদ্রিদ জিতে নেয় তাদের ইতিহাসের প্রথম লা-লীগা টাইটেল।
এর পর স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে মাদ্রিদের স্টেডিয়ামের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়।পুরনো খেলোয়াড় ও সদস্যরাও দলচ্যুত হয়ে যায়।মাদ্রিদের জেতা সব ট্রফি চুরি হয়ে যায়।মোটামুটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় রিয়াল মাদ্রিদ।এই অবস্থায় মাদ্রিদের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান মাদ্রিদেরই সাবেক খেলোয়াড় সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তে।১৯৪৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজই ছিলো স্টেডিয়াম সংস্কার।১৯৪৩ সালে সে প্রকল্প হাতে নিয়ে ১৯৪৭ সালের মাঝে শেষ করেন মাদ্রিদের নতুন স্টেডিয়াম ‘নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিন’ এর কাজ।তৎকালীন সময়ে এর ধারণক্ষমতা ছিলো ৭৫,১৫৪।পুরাতন প্লেয়ারদের ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দলে সাইন করান তৎকালীন সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে।এছাড়া ফেরেঙ্ক পুসকাস,মিগুয়েল ম্যুনোজ,ভিসন্তে দেল বস্ক,মলায়োনি,সান্তা মারিয়া,অ্যামানসিও,পিরি,নেটজার,সান্তিলানা,জেন্
তো,জুয়ানিতোদের নিয়ে তৈরি করেন প্রথম লস গ্যালাক্টিকোজ।অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদেরই সাবেক অ্যামেচার খেলোয়াড় মিগুয়েল মালবো ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রিয়াল মাদ্রিদের ইউথ অ্যাকাডেমি ‘লা ফেব্রিকা’।
বিধ্বস্ত রিয়াল মাদ্রিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর গল্প শুরু হলো এখান থেকেই।শুরু হলো পুরো বিশ্ব শাসন করার গল্প।রিয়াল মাদ্রিদের সত্যিকারের ‘রিয়াল মাদ্রিদ’ হয়ে ওঠার গল্প।
১৯৫৫ সাল।নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিনের সংস্কার কাজ সবে মাত্র শেষ হয়েছে।নতুন করে আবার ঢেলে সাজানোর পর এ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা হলো ১,২৫,০০০।মাদ্রিদের বোর্ড ডিরেক্টররা চিন্তা করলেন সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তের সম্মানার্থে স্টেডিয়ামের নামটাই বদলে ফেলবেন।তাদের কথামতো নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিনের নাম বদলে রাখা হলো ‘এস্তাদিও সান্টিয়াগো বার্নাব্যু’।
(পরবর্তীতে অবশ্য সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর ধারণক্ষমতা কমানো হয় স্টেডিয়ামের অন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে।বর্তমানে এর ধারণক্ষমতা ৮৫,৪৫৪।)
অন্যদিকে ১৯৫৫ সালে ফ্রেঞ্চ ক্রীড়া সাংবাদিক ল’ইকুইপ ইউরোপ জুড়ে একটি টুর্ণামেন্ট শুরু করার প্রস্তাব রাখলে গ্যাব্রিয়েল হ্যানোট,সান্টিয়াগো বার্নাব্যু,বেড্রিগন্যান এবং গুস্তাভ সেবেসরা মিলে একটি প্রদর্শনীমূলক টুর্ণামেন্ট ইউরোপে তৈরি করেন।যেখানে পুরো ইউরোপের প্রথম সারির দলগুলো অংশ নেবে।এর নাম দেয়া হয় ইউরোপিয়ান কাপ।এই ইউরোপিয়ান কাপই আজকের চ্যাম্পিয়নস লীগ।এ টুর্ণামেন্ট শুরু হওয়ার পরই প্রথম পাঁচটি শিরোপাই জিতে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।১৯৫৬-৬০ পর্যন্ত পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপই যোগ হয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফি কেসে।সে দলে ছিলেন জেন্তোর মতো দুর্ধর্ষ উইঙ্গার।মিগুয়েল মুনোজের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার।জুয়ানিতো,দেল বস্কের মতো প্লেয়ার।অালফ্রে
ডো ডি স্টেফানোর মতো গোল স্কোরার! মোটামুটি পুরো ইউরোপ বিশ্বে তখন চলছিলো সাদার রাজত্ব।রিয়াল মাদ্রিদের সামনে পড়লে তখন বুক কাঁপতো না এমন দল খুব কমই ছিলো।সেই পাঁচটি ফাইনালের প্রত্যেকটিতে গোল করার অনন্য রেকর্ড ছিলো ডি স্টেফানোর।১৯৬০ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে তো স্টেফানো হ্যাট্রিকই করে বসেছিলেন।দলও জিতেছিলো ৭-৩ গোলের বিশাল ব্যাবধানে!
তবে ইতিমধ্যেই সদ্য অবসর নেয়া মাত্র ৩৬ বছর বয়সী মিগুয়েল মুনোজের হাতে তুলে দেয়া হয় লস ব্লাঙ্কোসদের দায়িত্ব।টানা চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতা দলকে এমন আনকোরার হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো!অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন এই দল তিনি কীভাবে সামলাবেন!সান্টিয়াগো বার্নাব্যু যে একজন পাকা জহুরী সেটার প্রমাণ দিতে মিগুয়েল ম্যুনোজ সময় নিলেন মাত্র ১ সিজন।প্রথম সিজনে এসেই এই ৩৬ বছর বয়সী কোচ মাদ্রিদকে জেতালেন ইউরোপিয়ান কাপ!টানা পাঁচবারের ইউরোপিয়ান কাপের দলে আগের চারটিতে ম্যুনোজ ছিলেন প্লেয়ার হিসেবে আর এর পরেরটিতে কোচ!বিশ শতকের ষাটের দশক।পুরো বিশ্ব তখন মাতোয়ারা ইংলিশ রক ব্যান্ড ‘The Beatles’ এর জাদুকরী সুরের মূর্ছনায়।বিটলসের ফ্যান্টাসটিক ফোর জন লেনন,জর্জ হ্যারিসন,পল ম্যাকার্টনি,রিঙ্গো স্টাররা তখন পুরো বিশ্বকে তাদের সুরের ঝংকারে বেঁধে রেখেছেন।তাঁদের ‘She loves you’ গানটি তখন পুরো বিশ্বে রাজত্ব করছিলো।এই গানের কোরাস ছিলো ‘Yeah Yeah Yeah!’
৬৬ সালে মাদ্রিদ যখন ষষ্ঠ চ্যাম্টিয়নস লীগ জিতেছিলো তখন চারজন স্প্যানিশ খেলোয়াড় স্প্যানিশ পত্রিকা মার্কায় দেয়া এক ছবির পোজে অবিকল বিটলসের ফ্যান্টাসটিক ফোরের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলো।সেই থেকে মাদ্রিদের সেই জেনারেশনের অদম্য সেই দলটিকে ডাকা হতো ‘Ye Ye Madrid.’
এই ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ টানা পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপজয়ী দলের মতো ভয়ংকর না হলেও অত্যন্ত সমীহ জাগানো দল ছিলো।তারা ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত টানা আটটি লা-লীগা ও একটি ইউরোপিয়ান কাপ জেতে।সেই দলের কোচ ছিলেন মিগুয়েল ম্যুনোজ।ম্যুনোজ ষাটের দশকেই রিয়াল মাদ্রিদকে নতুনভাবে সাজানোর দায়িত্ব নেন।কারণ আগের সর্বজয়ী দলের সদস্যরা ইতিমধ্যেই অনেকেই অবসর গ্রহণ করেছে।আবার কেউ দল ছেড়েছে।তাই ম্যুনোজ নজর দিলেন কম বয়সী প্লেয়ারদের দিয়ে দল সাজাবেন যারা অনেকদিন সার্ভিস দিতে পারবে।এই দল মুনোজকে এনে দিয়েছিলো আটটি লা-লীগা,দুইটি কোপা দেল রে আর একটি ইউরোপিয়ান কাপ।এই দলের ব্যাপ্তিকাল ধরা হয় ১৯৬১ থেকে মতান্তরে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত।১৯৭৪ সালে মিগুয়েল ম্যুনোজের বিদায়ের মাধ্যমে মাদ্রিদের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।মিগুয়েল ম্যুনোজকে এখনো মাদ্রিদের ইতিহাসের সেরা কোচ হিসেবে গণ্য করা হয়।১৯৫৯ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত ১৫ বছর ছিলেন মাদ্রিদ বস।এর মাঝে জেনারেশনের পরিবর্তন হলেও জিতেছিলেন সর্বমোট ১৫ টি ট্রফি।যার মাঝে ছিলো ৯ টি লা-লীগা,১ টি ইউরোপিয়ান কাপ,৪ টি কোপা দেল রে এবং ১ টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।ইতিমধ্যেই ১৯৭৮ সালে সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অভিভাবক হারায় রিয়াল মাদ্রিদ উপর্যপুরি পুরো স্প্যানিশ ফুটবল।১৯৪৩ থেকে ১৯৭৮ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট।ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে এনেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদকে।বানিয়েছিলেন ফুটবল বিশ্বের রাজা।তাঁর মৃত্যুতে পুরো ফুটবল বিশ্বে শোকের মাতম পড়ে যায়।১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপে তিন দিনের শোকও পালিত হয়।
আশির দশকের শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদের আরেকটি নতুন জেনারেশনের আবির্ভাব ঘটে।স্প্যানিশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট জুলিও সিজার ইগলেসিয়াস এ জেনারেশনের নাম দেন ‘লা কুইন্টা দেল বুয়েত্রে’।
এই নামটি নেয়া হয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদের তৎকালীন খেলোয়াড়দের ডাকনাম থেকে।তাঁরা হলেন এমিলো বুত্রাগুয়েনো,মার্টিন ভাজকেজ,মিগুয়েল পার্ডেজা,ম্যানুয়েল সানচেজ এবং মাইকেল।তাঁরা পাচজনই রিয়াল মাদ্রিদের ইউথ অ্যাকাডেমীর গ্রাজুয়েট ছিলেন।এদের পাশাপাশি ছিলেন মেক্সিকান স্ট্রাইকার হুগো সানচেজ,গোলকিপার ফ্রান্সিসকো বুয়ো,রাইট ব্যাক মিগুয়েল পোর্লানের মতো খেলোয়াড়েরা।এই জেনারেশন আশির দশক জুড়ে পুরো ইউরোপে ছড়ি ঘুরিয়েছিলো।জিতেছিলো দুইটি উয়েফা কাপ,টানা পাঁচটি লা লীগা।একটি কোপা দেল রে এবং তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ!
১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো সাঞ্জ ফ্যাবিও ক্যাপেলোকে কোচ হিসেবে নিয়ে আসেন।তখন দলে ছিলো রাউল গঞ্জালেস,ফার্না
ন্দো হিয়েরো,ইভান জামোরানো,ফার্নান্দো রেদোন্দোর মতো খেলোয়াড়েরা।তার উপর নিয়ে আসা হয় ডেভর সুকার,রবার্তো কার্লোস,ক্ল্যারেন্স সিডর্ফ,প্রিড্যার্গ মিজাটোভিচদের মতো প্লেয়ারদের।এর ফলে রিয়াল মাদ্রিদ ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সপ্তম চ্যাম্পিয়নস লীগ টাইটেল অর্জন করলো।ইয়ুপ হেইঙ্কসের অধীনে তারা ফাইনালে জুভেন্টাসকে ১-০ গোলে হারিয়েছিলো।
জুলাই,২০০০।রিয়াল মাদ্রিদ সদ্যই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ক্লাব নির্বাচিত হয়েছে।প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।এসেই ঘোষণা দিলেন প্রতি সামারে একজন করে সুপারস্টার নিয়ে এসে গড়বেন লস গ্যালাক্টিকোজ।একে একে নিয়ে আসলেন লুইস ফিগো,জিনেদিন জিদান,রোনালদো নাজারিও ডি লিমা,রুড ভ্যান নিস্টলরয়,ডেভিড বেকহাম,ফ্যাবিও ক্যানাভারোর মতো সুপারস্টারদের।আর আগেই দলে রবার্তো কার্লোস,রাউল গঞ্জালেস,গুতি,ইকার ক্যাসিয়াসরা ছিলেন।ফুটবল বিশ্ব দেখলো আরেকটি লস গ্যালাক্টিকোজ।তবে এই দল প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায় নি।একটি চ্যাম্পিয়নস লীগ,একটি লা-লীগা জিতেছিলো।তখনই ঘটলো এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।পেরেজ উচল জয়ী কোচ দেল বস্ককে স্যাক করলেন।ক্লাব ছাড়লেন ম্যাকেলেলে,ফার্নান্দো হিয়েরোসহ আরো বেশ কিছু খেলোয়াড়।এটিই মূলত মাদ্রিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য না পাওয়ার কারণ ছিলো।
তারপর ২০০৫-০৬ সিজনে কিছু প্রমিজিং সাইন করান পেরেজ।যাদের মধ্যে ছিলেন রবিনহো,জুলিও ব্যাপিস্টা,সার্জিও রামোস।কিন্তু তারপরও প্রত্যাশানুযায়ী সাফল্য না পাওয়ায় পদত্যাগ করেন পেরেজ।পেরেজের পদত্যাগের পর নতুন প্রেসিডেন্ট হন রামোন ক্যালদেরন।তিনি এসেই ফ্যাবিও ক্যাপেলোকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন।রিয়াল মাদ্রিদও চার বছর পর প্রথম লা-লীগা জিতে।কিন্তু এ সিজন শেষে ক্যাপেলোকেও স্যাক করা হয়।আবার শুরু হয় রিয়াল মাদ্রিদের দুঃসময়।
২০০৯ সালে পেরেজ আবারো প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাদ্রিদে ফিরে আসেন।ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রেকর্ড ৯৪ মিলিয়ন দিয়ে নিয়ে আসেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে।সেই সাথে এসি মিলান থেকে কাকাকে।কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন ইন্টারের ট্রেবল জয়ী কোচ জোসে মরিনহোকে।প্রথম সিজন ভালো না কাটলেও পরের সিজনেই রিয়াল মাদ্রিদকে রেকর্ড ১০০ পয়েন্ট নিয়ে লা-লীগা জেতান মরিনহো।সেই সিজনে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো লা-লীগায় দ্রুততম ১০০ গোলের রেকর্ডও করেন।রিয়াল মাদ্রিদ সেই সিজনে মোট গোল দিয়েছিলো ১২১ টি।গোল ডিফারেন্স ছিলো +৮৯।মোট ৩২ টি ম্যাচও জিতেছিলো রিয়াল মাদ্রিদ।কিন্তু মরিনহোকে মূলত নিয়ে আসা হয়েছিলো চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতানোর জন্যে।কিন্তু তিন সিজনে সেটি করতে ব্যর্থ হওয়ায় আর দলীয় কোন্দলের কারণে তার পরের সিজনেই রিয়াল মাদ্রিদ ত্যাগ করতে হয় মরিনহোর।
২০১৩-১৪ সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কার্লো অ্যাঞ্চেলোত্তিকে।তাঁকে মেইন অবজেক্ট দেয়া হয়েছিলো ইউসিএল জেতানো।এসেই তিনি টটেনহ্যাম থেকে রেকর্ড ১০০ মিলিয়ন ফি দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে আসেন গ্যারেথ বেলকে।সেই সিজনে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পেয়েছিলেন জিদানকে।রোনালদো,বেল,রামোস,মদ্রিচ,মারিয়াদের নিয়ে মাদ্রিদকে জেতান স্বপ্নের লা দেসিমা তথা দশম চ্যাম্পিয়নস লীগ।টানা ১২ বছর মাদ্রিদিস্তাদের এ ট্রফির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিলো।এর সাথে এসেছিলো কোপা দেল রে।২০১৪-১৫ সিজন আবারো ট্রফিলেস কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ।তাই ডন কার্লোকেও মাদ্রিদ ছাড়তে হয়।তারপর কোচ হিসেবে আসেন রাফা বেনিতেজ।বাজে পারফর্ম্যান্সের কারণে তাকেও বরখাস্ত করে দায়িত্ব দেয়া হয় মাদ্রিদেরই সাবেক খেলোয়াড় জিনেদিন জিদানকে।এসেই তিনি মাদ্রিদকে লা উনদেসিমা তথা এগারোতম চ্যাম্পিয়নস লীগ এবং উয়েফা সুপার কাপ জেতান।১৯০২ থেকে ২০১৭!সময়ের হিসেবে ১১৫ বছর।পৃথীবির অনেক কিছুই বদলেছে শুধু ‘মাদ্রিদিজম’ টাই বদলায়নি।যুগে যুগে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর মাঠ কাঁপিয়ে গেছেন রথী মহারথীরা।রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফিকেসে যুক্ত হয়েছে ১২টি চ্যাম্পিয়নস লীগ,৩২টি লা-লীগা,১৯টি কোপা দেল রে,৯টি সুপারকোপা দে ইস্পানা,১টি কোপা দে লা লীগা,১টি কোপা ইভা ডুয়ার্তে,৩টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ,২টি উয়েফা কাপ,৩টি উয়েফা সুপার কাপ এবং ২টি ক্লাব বিশ্বকাপ।
তবে রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে ১২ টা চ্যাম্পিয়নস লীগ না কিংবা ৩২ টা লা-লীগা,শতাব্দীর সেরা ক্লাবও না।রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে আলফ্রেডো ডি স্টেফানো,সান্টিয়াগো বার্নাব্যু,মিগুয়েল ম্যুনোজদের গ্রেটনেস।রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ।রিয়াল মাদ্রিদ মানে রবার্তো কার্লোস,রোনালদো
,রাউল,জিদান,বেকহাম,ফিগো,নিস্টলরয়দের একসাথে খেলতে দেখা।রিয়াল মাদ্রিদ মানে জিদানের সেই দুর্দান্ত ভলি,ইকার ক্যাসিয়াসের সুপারম্যানের মতো করে করা ফ্লাইং সব সেভ,রোনালদো লিমার অলস ভঙ্গিতে করা গোল,বেকহামের করা ফ্রি-কিক,গ্যারেথ বেলের উইং ধরে দেয়া সেই দৌড় কিংবা বারবার ত্রাণকর্তা হয়ে আসা উড়ন্ত সার্জিও রামোসের হেড!রিয়াল মাদ্রিদ মানে রাউলের ‘রাউল মাদ্রিদ’ হয়ে এক সত্ত্বায় পরিণত হওয়া।রক্তাক্ত চোখে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খেলে যাওয়া কিংবা মাদ্রিদের হয়ে খেলার জন্য মার্সেলোর ব্রাজিল থেকে স্পেনে হেঁটে আসার ইচ্ছা।রিয়াল মাদ্রিদ মানে সবার একসাথে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে ‘আলা মাদ্রিদ’ কোরাস তোলা কিংবা রাত্রি ২ টার দিকে পাড়া জাগিয়ে তোলা কারো চিৎকার।রিয়াল মাদ্রিদ মানে কখনো হাল না ছেড়ে দেয়া।শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত নিশ্চিত পরাজয় জেনেও দাঁতে দাঁত চেপে সাদা জার্সিটার জন্যে খেলে যাওয়া।
“Madridism is a feelings.”
–আলফ্রেডো ডি স্টেফানো।
আসলেই তাই।রিয়াল মাদ্রিদ একটি অনুভূতির নাম।রিয়াল মাদ্রিদ একটি সত্তা।কিন্তু তা বুঝবেন কিভাবে? আজ থেকে অনেক বছর পর যখন দেখবেন সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে কোন স্ট্রাইকার দুর্দান্ত এক গোল দিয়েছে তখন বুঝবেন ডি স্টোফানো,রাউল,রোনালদোরা আবার ফিরে এসেছে।যখন দেখবেন কোন উইঙ্গার দুর্দান্ত এক সলো রান দিয়েছে তখন বুঝবেন জেন্তো,বেলরা আবার ফিরে এসেছে।কিংবা মাঝমাঠে কারো বল কন্ট্রোলিং দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলে ধরে নেবেন মুনোজ,জিদান,মদ্রিচরা ফিরে এসেছে।যখন কেউ নিশ্চিত সব গোল সুপারম্যানের মতো বাঁচিয়ে দেবে তখন ভাববেন ইকার ফিরে এসেছে।আবার যখন কেউ দুর্দান্ত হেডে বিপক্ষ দলের অস্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেবে তখন ভাববেন সার্জিও রামোস,ফার্নান্দো হিয়েরোরা আবার সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরে এসেছে।রিয়াল মাদ্রিদ একটি সত্তা।এ সত্তার কোনো বিনাশ নেই।মাদ্রিদিজমের এই ট্রেন ছুটতে থাকবে যুগ যুগ ধরে।
ডি স্টেফানোর এই উক্তিটাই সম্ভবত মাদ্রিদিজিম কি তা ব্যাখ্যা করার জন্যে যথেষ্ট!
” ঐ সাদা জার্সিটা রক্তে লাল হবে,ঘামে ভিজে যাবে,কাদায় কর্দমাক্ত হবে কিন্তু কখনো পরাজয়ের গ্লানি বহন করবে না। “