3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

পথের শেষে [১ম পর্ব]

Now Reading
পথের শেষে [১ম পর্ব]

সন্ধ্যার একটু পর তারা মেসে ফিরে এলো।সবাই বেশ ক্লান্ত।রিকা হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে টয়লেটের দিকে গেল ফ্রেস হতে।

“রোজ রোজ এই একি ঝামেলা আর সহ্য হয় না…”, বিড়বিড় করতে করতে ফিরে এল সে।তার ভুরু জোড়া বিরক্তি আর বিষন্নতায় কুঁচকে আছে।সবাই একবার তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চাইলো।তারপর আবার যে যার মত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।এই সমস্যাটা তাদের নিত্যদিনের একটা অংশ হয়ে গেছে এখন।টয়লেটে পানি নেই।রোজ সন্ধ্যা হলেই পানি থাকে না।সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পানির লাইন বন্ধ থাকবে।এটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে।আজ সকালে সবাই ঘুরতে বেরিয়েছিল একসাথে বেঁধে।সারাদিন বাসায় কেউ ছিল না বলে বালতিতে পানি জমিয়ে রাখতে পারে নি।

ক্লান্ত, বিমর্ষ মুখে সবাই বসে আছে।সারাদিনে কত জায়গায় ঘুরেছে তারা।ধানমন্ডি লেক,চন্দ্রিমা উদ্যান তারপর একসাথে খাওয়া দাওয়া আরও কত কি! একঝাঁক তরুণী রাস্তা দিয়ে দল বেঁধে হাঁটছে,হাসাহাসি আর দুষ্টামি হৈ চৈ করছে,চারদিকের মানুষ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল।

সারাদিন হেঁটে পায়ে ব্যথা শুরু হয়েছে খুব।নেতিয়ে পড়েছে পুরো শরীর।এমন ক্লান্ত মুহূর্তে কারও মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না।অথচ সারাদিন সবাই বাচালের মত কি বকবক করেছে! এখন সবাই মুখ ঘোমরা করে বসে আছে বোবা মানুষের মত।কপালে চিন্তার ছাপ।অপেক্ষা শুধু একটা মুহূর্তের।কখন পানি আসবে,আর তারা একটু পরিচ্ছন্ন হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে শুবে।সমস্ত শরীরে ধুলাবালি গিজগিজ করছে।

দেখতে দেখতে আধঘণ্টার মত পার হল।এখনো পানি আসছে না।রিকা উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের উড়নাটা ঠিক করে নিল।চুল গুলো বেঁধে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল একটা।পাশ থেকে রিমা প্রশ্ন করলো,”কোথায় যাচ্ছিস?”

বাড়িওয়ালার বাসায়।

কেন?

আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকব?পানির লাইনটা ছাড়ছে না কেন জিজ্ঞেস করে আসি।

আমি ফোন করেছিলাম তো।তিনি বলেছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইন ছেড়ে দিবেন।

আর কতক্ষণ গেলে সেই কিছুক্ষণ পূর্ণ হবে শুনি!

রিকা প্রচন্ড রেগে গেল।রাগে তার শরীর কাঁপছে।ফেমিলি ফ্ল্যাট গুলোতে পানির কোন সমস্যা হয় না, মেসে কেন হবে?বাড়ির মালিকদের কি বিশ্রী ধারণা_____ মেস গুলোতে পানির অপচয় বেশি হয়।

 

দাঁড়া আরেকবার ফোন করে দেখি।

কথা শেষ করে রিমা টেবিলের উপর থেকে মোবাইলটা হাতে নিল।রিকা বলল, ”থাক, দরকার নেই।আমি যাচ্ছি।এভাবে মোবাইলে কথা বললে উনারা আরও একঘণ্টায়ও পানি ছাড়বেন না।ঠিকি রাত আটটা পর্যন্ত আটকে রাখবেন।“

রিমা বলল, ”তুই এখন এই ক্লান্ত শরীরে ছয়তলা থেকে আবার দোতলায় নামবি?”

এ ছাড়া আর উপায় কি?তোরা কেউ যাবি আমার সাথে?

প্রশ্ন শেষ করে রিকা সবার দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো একবার।মেয়েরা একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।কেউ কিছু বলছে না দেখে রিকা একাই দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো।বাড়িওয়ালার বড় ছেলেটার চোখ ভালো না।মেয়েদের দিকে বিশ্রী চোখে তাকিয়ে থাকে।এলাকার মাস্তান টাইপের আজেবাজে ছেলেদের সাথে তার সারাদিন আড্ডা।কানে দুল পড়ে,দাঁড়ি চুলে কুরুচিপূর্ণ স্টাইলে চেহারাটা কেমন জঘন্য করে রেখেছে।দেখলেই ঘেন্না লাগে।

মেয়েরা কেউ ছেলেটার সামনে পড়তে চায় না।তবু কোথাও কিছু হয়েছে কি না, দেয়ালের রঙ, পানির লাইন, গ্যাসের পাইপ সবকিছু দেখার নাম করে কিছুদিন পর পর মেয়েদের মেসে চলে আসে ছেলেটা।খামোখা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে অনেকক্ষণ থাকে এখানে।বারান্দায়, আনলায় ঝুলিয়ে রাখা মেয়েদের কাপড়, অন্তর্বাস ও অন্যান্য মেয়েলি জিনিষ এসবের দিকে কানা চোখে তাকায়।এ বাসায় সব ফ্ল্যাটে ফ্যামিলি থাকে।শুধু সবার উপরে ছয়তলায় মেয়েদের একটা মাত্র মেস।মেয়েরা অন্যান্য ফ্ল্যাটে খোঁজ নিয়েছিল,বাড়িওয়ালার ছেলে কিছুদিন পর পর এমন তদারকি করতে আসে কি না।সবাই জানালো,কিছুদিন পর পর তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত একবারও আসে নি।

রিকা একদিন ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ”আপনি তো সব ফ্ল্যাটে গিয়ে এমন তদারকি করেন না।আমাদের এখানে কেন করেন?”

ছেলেটা দুইগাল চওড়া করে বিশ্রী একটা হাসি দিয়ে বলল, ”আপনাদের প্রতি আমার আলাদা মহব্বত আছে।পিতামাতা বাড়িঘর সবকিছু ছেড়ে এখানে এসে পড়ালেখা করছেন, দেখা শুনার কেউ নাই, অভিভাবক নাই, তাই আপনাদের সুবিধা অসুবিধা, হালচাল দেখা আমার দায়িত্ব মনে করি।“

রিমা বলল, ”আপনার দায়িত্বে আমরা সন্তুষ্ট।অনেক খুশি হয়েছি আপনার আন্তরিকতা দেখে।আপনাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না।আমাদের কোন সমস্যা হলে আমরাই আপনাকে জানাব।“

তারপরও ছেলেটার আসা যাওয়া কমে না।মেয়েরা ভদ্রভাবে অনেকবার বলেছে।লাভ হয় নি।বাড়িওয়ালার কাছেও বলেছিল।তাও কাজ হল না।দ্বিতীয়বার বাড়িওয়ালাকে বলার পর বাড়িওয়ালা বলল, ”সে তো আর তোমাদের কোন ক্ষতি করছে না।বাড়ির মালিক হিসেবে ঘরের সবকিছু ঠিক আছে কি না সেটা দেখার অধিকার ওর আছে।তোমরা যদি বল যে তোমাদের সাথে সে বাজে আচরণ করে, অসভ্যতামো করে তাহলে না হয় একটা কথা ছিল।“

মেয়েরা কিছু বলতে পারলো না।খারাপ কোন আচরণের প্রমাণ তাদের হাতে নেই।তারা ভেবেছিল একবার বলবে, “আপনার ছেলের নজর খারাপ।“

পরে কি ভেবে আর কথাটা বলে নি।এটা বলার মত কোন কথাও না।এ কথা বললে বাড়িওয়ালা বলবে, “আমার ছেলে এমন না।তোমাদের চিন্তা ভাবনায় সমস্যা আছে।মন খামোখা খুঁতখুঁত করছে।অশ্লীল চিন্তা।“

প্রমাণ ছাড়া সব নালিশ ভিত্তিহীন।মেয়েরা জানে, বাড়িওয়ালা ঠিকি তার ছেলেকে নিষেধ করেছিল, কিন্তু সে শুনে নি।তাই এখন বাড়িওয়ালা নিজের দায় বাঁচাতে কথা ঘুরাচ্ছে।

 

সিঁড়ি বেয়ে রিকা নেমে আসলো দোতলায়।স্থির হয়ে দাঁড়ালো বাড়িওয়ালার দরজার সামনে।কলিং বেলে চাপ দিল দুইবার___ ঢং ঢং করে ঘণ্টার মত বেজে উঠলো সেটা।……………( চলবে )…

জীবনের কালবৈশাখ

Now Reading
জীবনের কালবৈশাখ

#ঝড়

পশ্চিম আকাশটা ঘন কালো রঙের জমাট পিন্ড হতে দেখেই হাতের গতি বেড়ে গেলো ফাহিমার। ঝড় শুরু হওয়ার আগেই পাতাগুলো বস্তায় ভরে শুকনো জায়গা খুজে পৌছুতে হবে নাহলে সারাদিনের এত খাটুনি সব বৃথা!

পাতাগুলো জমানো শেষ, বস্তাটাও প্রায় ভরে এসেছে এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এলো রুহুল। ফাহিমার ছোট সৎ ভাই।

-আফা, মাও জলদি বুলায়। মোক্ পাঠালো, যা তো বুইনা কট্টুক আগালে দ্যাখে আয় গিয়ে। মুই হাঁপাতি হাঁপাতি এলুম,মাগো! কিমুন হাঝ জমি আসিছে আকাশত! জলদি জলদি চলেক্।
দ্রুত শ্বাস নেয়ার ফাঁকে এতগুলো কথা বলে রুহুল আবার হাঁপাতে লাগলো।

ভাইয়ের কথা শুনে ফাহিমা আরো জলদি পাতা ভরা শুরু করলো।

– মরন আমার। মুই যেন বসি বসি ঘাস চিবুচ্চি! এত মুখ না চালাই হাত চালাই সায়াইয্য কর দিকিনি মুর সাথ্।
রুহুলকে কষে একটা ধমক লাগালো ফাহিমা।

মনে মনে গজ গজ করছে ও।
ইহ! নিজে করবার পারলোনা আবার জলদি করি যাবার জন্য তাড়া দেয়া কিসের জন্যি! মুক্ যেনো চাকরানী পেইয়ে গ্যাছেনে তিনি। সৎ মেয়ে বলি এত আলগা দরদ বেইয়ে পরিছে একেবারে।হুহ!

গজ গজ করতে করতে বস্তা ভরা শেষ হলো ফাহিমার। রুহুলকে নিয়ে বস্তাটা মাথায় নিয়ে হাটছে যত দ্রুত সম্ভব। হাটছে আর বার বার আকাশের দিকে সভয়ে দেখছে দুজনেই,না জানি কখন কাল বৈশাখি তার তান্ডব শুরু করে দেয়!

-“জলদি পা চালা ছ্যামড়া।”
রুহুলকে ধমক দিলো ফাহিমা। নিজেও পা দ্রুত করলো। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় চলে এসেছে ওরা।
মোয়াজ্জিনকে দেখা যাচ্ছে মসজিদের চালা বাঁধছে গুনা দিয়ে। আগের বারের ঝড়ে চালা উড়ে চলে গিয়েছিলো বল্লা পাড়া গ্রামের আম গাছের উপর! এইবার আবার চালা হারানো চলবেনা মুয়াজ্জিনের।

উঠানে বস্তাটা রাখতেই মুরগীর বাচ্চাগুলো হাতে নিয়ে মা এগিয়ে এলো।

-মাইও রে, গরুডা ছুটি গ্যাছে, ধরি আনতো জলদি করে।

-হ যাচ্চি। কোন দিক গ্যালো?

-পুব দিক।

হনহন করে পুব দিকে হেটে চলেছে ফাহিমা। মার উপর রাগ করেছে। সামান্য একটা গরু ঠিক মতো বেঁধে রাখতে পারলোনা।

-হ সৎ মেইয়ে তো, তাই আবার পাঠালে!

হাটতে হাটতে কলুদের আম বাগানে চলে এসেছে ফাহিমা। গরুটার দেখা নেই এখনো। আকাশটা এখন একদম ঘন কালো কালির রূপ ধরেছে, চারদিক রাতের মতোই আঁধার,বাতাসও থেমে আছে সেই কখন। ভয়ঙ্কর ঝড় আসবে, তারই লক্ষণ।

হঠাৎ ঝড়টা শুরু হলে কি করবে ভেবে চিন্তিত হয়ে বিপন্ন, উদভ্রান্ত চোখে গরুটাকে খুজতে শুরু লাগলো আবার। সামনে আবছা আলোয় একটা ঝোপ নড়ে উঠতে দেখে আস্তে এগিয়ে গেলো ফাহিমা। গরুটা নয়তো? কিছুতেই ভয় পাওয়ানো চলবেনা ওটাকে এখন নয়তো আবার ছুট লাগাবে।

ঝোপটার আরেকটু কাছে যেতেই ওপাশে একটা ছায়া নড়ে ওঠলো। না না, একটা না! তিনটা ছায়া! পেছন থেকেও একটা ছায়া এগিয়ে এসে জাপটে ধরলো ফাহিমার মুখ!
তখনই বিকট শব্দে বাজ পড়লো কাছেই কোথাও।

শো শো শব্দে বাতাস শুরু হলো।
কাল বৈশাখি!
ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে গেলো সব।
সেই সাথে ফাহিমার জীবনটাও!

ইউরোপে মিলেছে ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব!! সত্যি নাকি গুজব?

Now Reading
ইউরোপে মিলেছে ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব!! সত্যি নাকি গুজব?

আমার বড় ভাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে থাকেন, তার কাছ থেকে জেনেছি গত কয়েকদিন ধরেই ইউরোপিয়ান টেলিভিশনে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছিল, ফ্রান্সে নাকি সত্যিকার ভ্যাম্পায়ারের খোঁজ মিলেছে। আর সেই খবর একটি টেলিভিশন চ্যানেল আর এফ.এম রেডিওতে প্রচারের পরেই আশেপাশের দেশগুলোতেও এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সত্যতা যাচাই না করেই নিউজ প্রচারের জন্য প্রশাসন এই সংবাদ প্রচারে বাঁধা দেয় লোকজনের মনে অহেতুক ভীতি না ছড়ানোর জন্য। হঠাৎ কি হয়েছিল যে এমন খবর মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেল?

ঘটনাটি ঘটেছিল ফ্রান্স এর তুলুজ নগরীতে। আর দশদিনের মতই ফরাসি নাগরিক মারিয়ানা কাজ শেষে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফিরছিল। আচ্ছা আগে মারিয়ানার পরিচয় দিয়ে দেয়া উচিত। মারিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী। গ্রীস্মের ছুটিতে সময় কাটানোর জন্য কাজ করে, বয়স ২৫ এর বেশি নয়। যুবতী মারিয়ানা বেশ সাহসী হলেও সেদিন কেন জানি তার মনে মৃদু ভয়ের উদ্রেক হয়েছিল, হয়তো রাতে রাস্তার ধারে থাকা গাছগুলোর বাতাসের শব্দ শুনে। কিংবা কোন এক অজানা কারণে। যদিও সে এমন রাতে একা একা মূলত কখনো বাড়ি ফেরেনি, দোকানের মালিক পৌঁছে দিত। কিন্তু মালিক অসুস্থ থাকায় লাঞ্চ হাওয়ারের পর আর কাজে আসেনি, তাই কি আর করা? বাধ্য হয়ে মারিয়ানা একাই বাড়ি ফিরছে।

বাড়িতে যেতে হলে মারিয়ানাকে একটা ছোট ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। একটু ঝোপ টাইপের এলাকা। বেশ পুরোনো। দ্বিতীয় বিশ্ব-যুদ্ধে মৃত সৈনিকদের কবর দেয়া হয়েছিল পাশেই যদিও তা পরে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল, এটা মারিয়ানা জানতো, তাই ভয়টা যেন বেশি করে জেঁকে বসেছিল। মারিয়ানা ভয় দূর করার জন্য গান গাইছিল আনমনে। হঠাৎ তখন ঝরে পড়া পাতার মর্মর শব্দে মারিয়ানার সংবিৎ ফিরলো। কিছুটা ভয় পেল তাই দ্রুত পদে হাটঁতে লাগলো। শব্দটা আরো তীব্র হতে লাগলো। আরেকটু সামনে ব্রিজ পার হবার পরেই মারিয়ানা ঘাড়ে কিসের ছোঁয়া পেয়ে যখনই ঘাড়ে হাত দিতে যাবে তখনই দুইটা সুঁচ যেন তার ঘাড়ের নিচ দিয়ে ঢুকে যেতে লাগলো। মারিয়ানা চিৎকার দিয়ে পাতার ভেতর পড়ে গেল।

পরদিন দুপুর বেলা, মারিয়ানা হাসপাতালে। ইমারজেন্সি প্যারিসে নিয়ে আসা হয়েছিল হেলিকপ্টারে করে। মারিয়ানার জ্ঞান ফেরে বিকাল নাগাদ। তার ঘাড়ে জখম হওয়ার দুটি দাগ দেখতে পাওয়া যায়। মারিয়ানা উপরে উল্লেখিত ঘটনার বাইরে আর কিছুই বলতে পারেনা! যে খবর তাক লাগিয়ে দেয় তা হলো ডাক্তারি রিপোর্ট। ডাক্তারি রিপোর্টে আসে ঐ দুইটা গর্তে দাঁত টাইপের কিছু প্রবেশ করেছিল। ব্যস, এর পরেই ধারণা করা হয় যে ওটা ভ্যাম্পায়ার ছিল।

পরবর্তীতে সারা এলাকা তন্ন তন্ন করেও ভ্যাম্পায়ারের খোঁজ মেলেনি। কিন্তু পুলিশের নতুন কিছু তথ্যই মিডিয়াকে এমন খবর ফলাও করে প্রচার করতে সাহায্য করে। পুলিশ যে কয়দিন টহলে ছিল ঐ এলাকাতে, সেই কয়দিনই তারা এমন কিছুর টের পেয়েছে যাতে তারাও ভাবতে আরম্ভ করে ওটা ভ্যাম্পায়ার ছিল। একজন পুলিশ সদস্য সেই ব্রিজের পাশেই এক রাতে ঘাড়ে কিছুর স্পর্শ পেলে ব্যাপারটা আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যদিও সেই পুলিশ সদস্য জর্জ আনাবেলের বাস্তবিক কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি।

এরপরেই সেই রিপোর্টের সূত্র ধরে মিডিয়াও একটু রস মিশিয়ে গণ মাধ্যমে একবেলা প্রচার করলেই তা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যস! মানুষের মাঝে আতংকও ছড়িয়ে পড়ে, তারা রাতে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়- এই নিয়ে বিভিন্ন দেশের অনলাইন পোর্টাল থেকে শুরু করে কিছু ম্যাগাজিন ও জাতীয় দৈনিক রিপোর্ট লেখা শুরু করে দেয়। কিন্তু শেষমেষ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে একসময় সেই সংবাদ মিলিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু মানুষের মনে প্রশ্ন রয়ে যায়, মারিয়ানা কিংবা সেই পুলিশ অফিসার কি সত্যিই কোনো ভ্যাম্পায়ার এর আক্রমণের শিকার হয়েছিল নাকি তা অন্য কোনো প্রাণী ছিল?

ইউরোপে কি তাহলে সত্যিই ভ্যাম্পায়ারের অস্তিত্ব রয়েছে? পরবর্তী অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য এই কেস লন্ডনের একটি বিশেষ টিমের কাছে গিয়েছে। দেখা যাক, তা সত্যি নাকি গুজব – এর রহস্য উদঘাটিত হয় কিনা!

পারমিতার দিনলিপি পর্ব (০২)

Now Reading
পারমিতার দিনলিপি পর্ব (০২)

প্রথম পর্বের পর

নীলা এক নিঃশ্বাসে বারকয়েক আমার কাছ থেকে জানতে চেয়েছে,আমি আসলে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?

আমি নিজেই তখন একটু ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম।দু-মিনিটের মধ্যে আমি নীলাকে একটা রুমের সামনে নিয়ে দাঁড় করালাম।ভেতর থেকে একজন মাঝবয়সী লোক এসে আমাকে ডেকে নিল।আমার হাতে একটা সাদা কাগজও ধরিয়ে দিল।উনি যখন আমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে দিতে লাগলেন,তখন নীলা আমার দৃষ্টি আর্কষণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।আপনারাও হয়তো নীলার মতো বিরক্ত হয়ে পড়েছেন তাই না?আসলে আজকের দিনটা আমার আর নীলার জন্য খুবই আবেগঘন একটা দিন,কেননা আজকের পর নীলার অন্ততপক্ষে একটা দুঃখ আমি ঘুচাতে পেরেছি বলে মনে করব।গতরাতে মারা যাওয়া পারমিতার জন্ম দেয়া যে কন্যা সন্তানটি ছিল তা পারমিতার ইচ্ছার কারণেই আমি দত্তক নিচ্ছি।এই কাজটা আমি লিগ্যালী করছি কেননা ভবিষ্যতে যেন কোন সমস্যায় পড়তে না হয়।নীলা যেখানে সন্তান জন্মদানের অপরাগতার দায় মাথায় নিয়ে আমাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছে,সেই অর্থে তার জন্য এটা নিঃসন্দেহে ভাল কিছু হবে।আজকের পর নীলাকে মা ডাকার জন্য তো কেউ আসছে বাসায়।আমাদের দুজনের ঘরটা আলোকিত করে রাখবে এই ফুটফুটে শিশুটি।

আপনাদের মনে উৎকন্ঠা কেনই বা আমি পারমিতার মেয়েটিকে এতো সহসাই পেয়ে যাচ্ছি।এই বিষয়ে রহস্যে উন্মোচনের জন্য আপনাকে একটু পিছনে যেতে হবে।পারমিতা বিয়ের পর থেকে দুটো সন্তানের জন্ম দিয়েছে যার দুটোই মেয়ে ছিল।এই মেয়ে সন্তান জন্মানোর দায় বা অপরাধ নিয়ে মেয়েটি দুনিয়া ছেড়েছে।তার মনে হয়তো আক্ষেপ থাকবে কেনই বা সে একটি মেয়েকে এখানে ছেড়ে গেছে।শেষ মুহুর্তে আমার কাছে হয়তো তার শেষ অবলম্বনকে নিরাপদ ভেবেছে তাই ডাক্তারের কাছে আমার কথাই নাকি বলে গেছে।এই বিষয়ে পারমিতার শ্বশুড়বাড়ির লোকের কোন আপত্তি নেই।তারা অনেকটা উদাসীন বললে চলে।এটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যও বটে।আমার আর নীলার কোল জুড়ে আলো আসলেও আমাদের চারদিকে একটা ঘোর অন্ধকার নেমে আসল।এই যে দত্তক নেয়া সন্তানের জন্য আমাদের অনেকে বাঁকা চোখে তাকাতে লাগল।এই বিষয়টা নতুন করে নীলার জন্য বিব্রতকর।একটা সময় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এই শহরের কাঠিন্য আর বাস্তবতার জটিল ক্যানভাসের বাইরে গিয়ে কোথাও ঘর বাঁধব যেখানে আমাদের নতুন কোন পরিচয় হবে।আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।ছোট্ট মেয়েটিকে দত্তক নেয়ার রাতে আমি শহর ছাড়লাম।রাতের আকাশের একলা চাঁদটাই যেন আমাদের যাত্রাপথের সাথী ছিল।

সকালের কুয়াশাস্নাত ভোরে নতুন শহরে আমাদের পদযাত্রা শুরু হলো।যেখানে নতুন একটা স্বপ্নকে অবলম্বন করে শুধু ভালবাসার শক্তিতে পথচলা।আমার চাকরির সুবাদে যদিও বেগ পেতে হয়েছে এসব করতে,তবে আমার কিছু শুভাকাঙ্খী ছিল যারা আমাকে বেশ সহায়তা দিয়েছে।তাদের সেই বন্ধুসুলভ ভালবাসা কখনো ভুলবার নয়।সেদিনের সকালটা আমার জীবন স্মৃতির পাতায় চিরসজীব হয়ে থাকবে।নীলা আমাকে এই অকৃত্রিম উপহারের জন্য বারকয়েক শুকরিয়া জানিয়েছে।আমি এই মেয়ের নাম কি রাখব তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম কেননা তার জন্য উপযুক্ত কোন নাম যে পাচ্ছিলাম না।একটা সময় সিদ্ধান্ত নিলাম তার নাম আমি পারমিতা রাখব।কেননা আমি এই পারমিতাকে তো আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না।পারমিতার স্বপ্নগুলো না হয় আমার বাহুডোরে থেকে লালিত হবে।কোন এক উজ্জ্বল দিনে উপযুক্ত মঞ্চে মঞ্চায়িত হবে সমস্ত নাটকের পালা।

পালাবদলের খেয়ায় ভেসে আমি আর নীলা আজ অনেকটা পরিণত।আমাদের এখন অনেক দায়বদ্ধতা নীলা তো আমাকে প্রতিদিন পাঠ শিখিয়ে যায়।এই বিষয়টা আমার বেশ ভালোই লাগে কেননা তাদের মা মেয়ের ভালবাসা আমাকে প্রেরণা জুগিয়ে যায় নিরন্তর।আমি আমার নতুন বাসার দেয়ালে পারমিতার প্রতিবছরের একটা করে ছবি রেখেছি।আমার চোখের সামনে এই যে ভালবাসার মানুষের বেড়ে উঠা তা আমি ফ্রেমবন্দী করে রেখেছি।পারমিতা আধুনিক একটা সমাজে বেড়ে উঠছে যেখানে প্রতিটা পদক্ষেপ বন্ধুর আর কোন এক অজানা বিপদের হাতছানিতে মোড়ানো।আমাদের উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা বেড়ে যায় যখন দেখি পারমিতার বয়সী কোন মেয়ে কোথাও এক নরপশুর কুলিপ্সার শিকার হয়।

পাশাপাশি বিশ্বায়নের প্রভাবে আমার মতো হাজারো বাবা-মা তাদের সন্তানের সামনে মেলে ধরেছে কোন এক সুবিশাল সিলেবাস।যেখানটায় প্রতি পাতায় থাকে বিস্তৃত কোন এক স্বপ্নের বয়ান।আমি আর নীলা পারমিতাকে এই ক্ষেত্রে ভিন্ন আঙ্গিকে তার জানার জগতটাকে খুলে দিয়েছি।পারমিতা যেদিন নিজের স্বপ্নের কথা লিখতে শিখেছে বা বুঝতে শিখেছে স্বপ্ন আসলে কি ?সেদিন ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে লিখেছে সে নাকি শিক্ষিকা হতে চাই।তার কাছে ব্যাখা চাওয়া হলে বলে স্কুলের টিচারকে নাকি তার খুব ভাল লাগে।তাই ভাললাগার কাজটা করতে অর্ন্তপ্রাণ মেয়েটি।এবার বুঝলাম তার স্বপ্নের গন্ডি বড় হওয়া দরকার।আমি নিজে তার এই কাজে সাহায্য করলাম।

পারমিতা বন্ধু দিবস আর ভালবাসা দিবসে লেখা উইশ কার্ডে আমার জন্য দুটো কার্ড বরাদ্দ রাখে,কেননা আমি নাকি তার ভালবাসার এবং বন্ধু দুটো শাখায় পছন্দের পাত্র।আমি আর নীলা এখনো কোনদিন পারমিতাকে স্কুলের যে স্থান অধিকারের প্রতিযোগিতা তাতে উৎসাহিতও করি নি।মেয়েটা আমার প্রথম ধাক্কা খেয়েছে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়।আমাদের আসলে খেয়ালই ছিল না,চারিদিকে এতো সাজসাজ রব এই সম্মানের যুদ্ধের জন্য তা তো ঘূর্ণাক্ষরে খেয়াল করিনি।কোমলমতি এই মেয়েটি যখন প্রথমবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় বসতে গেছে তখন সে আসলে এই ফলাফল নিয়ে এতো বাগবিতন্ডা হয় তার সম্পর্কে অবগতও ছিল না।পরীক্ষা শেষে যেদিন পারমিতার রেজাল্ট আসে সেদিন নাকি সবাই তাকে কটাক্ষ করেছে।কেননা পারমিতা যে এ+ পাই নি।অনেকে নাকি গোল্ডেন না পাওয়ায় স্কুলে কেঁদেছে,এইসব বিষয় আমাকে বাসায় এসে হাসতে হাসতে বলেছে।আমি সেদিন খুব ভাগ্যবান মনে করেছিলাম কেননা আমি যে তাঁকে কোন দৌড়ের সওয়ারী করি নি।এটা নেহায়েৎ তার সৌভাগ্য বটে।সেই থেকে আজ অব্দি মেয়েটি আমার মাঝারি মানের স্টুডেন্ট হয়ে দৌড়াচ্ছে।এই দৌড়ে কোন ক্লান্তি নেই কেননা তার তো কোন প্রতিদ্বন্ধী নেই।এখানে প্রতিনিয়ত নিজের সাথে নিজের একটা হালকা প্রতিযোগিতা হয়।এমন সুন্দর একটা ট্র্যাক কোন বাবা-মা হয়তো তাদের সন্তানকে দিতে পারবে না।তবে এমনটাই করা উচিত।পারমিতা মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে আজ উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে।এই সময়ে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।কিশোরী থেকে আজ সে আঠারো বছরের তরুণী হওয়ার পথে।এই বয়সন্ধির পরিবর্তনে তার সাথে ছিল নীলা।এখন সময়ের প্রেক্ষিতে এসে মেয়ে পারমিতাই যেন নীলার মা বনে গেছে।একটা দুর্ঘটনায় নীলার পা বিকল হয়ে যাওয়াতে সে এখন হুইল চেয়ারে বন্দী।এই সময়ে নীলার কাছে একমাত্র অবলম্বন পারমিতা।পারমিতা ধীরে ধীরে মাতৃসম গুণাবলী গুলো রপ্ত করছে এমনটাই মনে হলো।

এই দুর্বার তারুণ্য আর আঠারোর গন্ডিতে সবসময় কোন এক অভূ্তপূর্ব ঘটনার জন্মের অপেক্ষায় থাকি।আমি তার চোখে আমার সমস্ত স্বপ্নের রং দেখি আর আমার স্বপ্ন ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে

আমি কি স্বপ্নের পানে পৌঁছাতে পারব ? এই প্রশ্ন না হয় সময়ের জন্য তোলা থাক……..

চলবে…………..

 

 

পারমিতার দিনলিপি

Now Reading
পারমিতার দিনলিপি

 

 

ঘড়িতে রাত তিনটা বেজে দশ মিনিট।

একটু পরে ভোরের আলো ফুটবে আর চারদিকে পরিস্ফুটিত হবে নতুন আলোয়।আমার জীবনে এমন ঘোর আমানিশার অন্ধকার চলে আসবে তা কখনো ভাবতে পারি নি।বছর দুয়েক আগে পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে করেছিলাম আমি আর নীলা।বিয়ের পর তার স্বভাবসুলভ স্বাভাবিকতার জন্য তার সাথে মানিয়ে নিতে আমাকে বেগে পেতে হয় নি।আমাদের জীবনে প্রেম-ভালবাসার মত আপেক্ষিক বিষয়গুলো বেশ মধুর হয়ে ধরা দিতে লাগল।

একটা সময়ে একটা কালো থাবা যেটা কিনা ধীরে ধীরে ভর করতে লাগল দুজনের মাঝে।পরিবার,সমাজ আর পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় একটা সময়ে সবাই নীলাকে সন্তান নেয়ার জন্য চাপ দিতে লাগল।মূলত দুজনের উপর চলে আসল।বিয়ের এতদিন পর সন্তান না হওয়ার দরুণ নানা তিরস্কার বা কটু মন্তব্যগুলো যেন নীলাকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়তে লাগল।এই মেয়েটি স্বভাবে চাপা স্বভাবের হওয়াতে কখনো আমাকে বলে নি সে এতো কষ্ট সয়ে আসছিল।গত কয়েকদিন ধরে তার মন খারাপ দেখেছি কিন্তু নিজে কিছু না বলায় আর আমি আর জানতে চাইনি।তার কষ্টের বোঝাটা এতখানি ভারী হবে ভাবতে পারি নি।

আমি অফিসে চলে যাওয়ার পর শুনতে পেলাম সে নাকি আত্মহত্যার জন্য চেষ্টা করেছে। এই যাত্রায় ডাক্তার তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে কিন্তু আমি এখনো তার মুখোমুখি হতে সাহস পাচ্ছি না। নীলা এখন শংকামুক্ত হয়েছে আসলে কি এখনো শংকামুক্ত হতে পেরেছে।এই সমাজের মানুষগুলো তো তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু ফেলতে দিবে না।নীলা যে কখনো সন্তানের মা হতে পারবে না তা আমাকে বিয়ের প্রথম দিন বলে দিয়েছিল।আমি অনেকটা নিজের অবহেলায় বিষয়টা পরিবারের সাথে মোকাবেলা করে নিতে পারি নি।এটা আমার চরম ব্যর্থতা।

রাত সাড়ে তিনটা……..

হঠাৎ দেখি হাসপাতালের করিডোরের সামনে ছোট একটা জটলা।আমি একটু আগ্রহী হয়ে গেলাম।একটা রোগীকে নিয়ে বাগবিতন্ডা চলছে।পরিবারের লোকজন সিদ্ধান্ত দিতে পারছিল না রোগীকে কি অপারেশন করাবে নাকি নরমাল ডেলিভারী করাবে।মেয়েটি সন্তানসম্ভবা ছিল তাই ব্যাথায় কাতরাচ্ছিল।আমি নিজে তার দুরবস্থা দেখে কর্তব্যরত ডাক্তারকে রাজি করালাম তাকে যেন তাড়াতাড়ি অপারেশনে নিয়ে যায়।আমি এই সময় তাকে রাখা বেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।

এই সময় নরম একটা হাত খুব শক্ত করে আমার হাতে চেপে ধরল। আমি খুবই অবাক হলাম আর সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল।মেয়েটির হাতটা ঠকঠক করে কাঁপছিল।আমি পিছন ফিরে তাকাতে দেখি একজোড়া চোখ ছলছল করছে আর আমাকে কাঁপা গলায় কিছু একটা বলছে।এই সময় তার স্বর খুবই অস্পষ্ট ছিল।আমি তার চোখের পানে তাকিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। এসময় তার কাছে গিয়ে জানতে পারলাম …..

সে বারবার বলছে ভাইয়া আমার সন্তানটাকে বাঁচান…. এই কথাটা

আমি তাকে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওযার কারণ হলো এই মেয়ে তো আমার গ্রামের তাকে বছর দুয়েক আগে দেখেছিলাম কি স্বর্তস্ফূর্ত মানসিক অবস্থায়।আজকে এই অবস্থায় যেখানে সে প্রতিটি মুহুর্ত নিঃশ্বাসের সাথে পাঞ্জা লড়ছে।যেখানে দুটো পক্ষে রয়েছে জীবন আর মৃত্যু।

ইতিমধ্যে ডাক্তার তাকে নিয়ে অপারেশন রুমে চলে গেল।আমি বাইরে লম্বা টুলটাতে পা দুটো টেনে বসে আছি।আমি এবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।এইতো সে মেয়েটা যে কিনা আমার কাছে এসেছিল কলেজ ভর্তি হতে গিয়ে কিছু কাগজপত্র সই করিয়ে নিতে।আমার কাছে আসার একটা কারণ ছিল তার বাড়ি আমার বাড়ি একই গ্রামে।বাড়ি থেকে আসার সময় নাকি বাবা বলে দিয়েছে কোন কাজে সমস্যা হলে যেন আমার কাছে আসে।

আমার রুমে ঢুকতে ভদ্রতার খাতিরে বলেছিল…..

স্যারঃআমি পারমিতা ।আসতে পারি ?

তার নামটার মধ্যে একটা মুগ্ধতা জড়িয়ে আছে।আমি সেদিন তার যাবতীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দিলাম।সে আমার ভরসায় তার কয়েকজন পরিচিতদের কাগজও আমার কাছ থেকে সই করে নিয়েছে।এই বিষয়টা নিয়ে আমি বেশ হেসেছিলাম।তারপর থেকে কলেজে পড়ার সময় তার খোঁজ খবর নেয়া হতো।পারমিতা খুবই স্বপ্নবিলাসী ছিল..।সে খুবই দুরদর্শী ছিল ভবিষ্যতে নাকি একজন উদ্যেক্তা হয়ে অবহেলিত আর পীড়িত নারীদের কর্মসংস্থানে কাজ করবে এমনটায় বলেছিল আমাকে সেদিন।

একটা সময় আমার কাজের ব্যস্ততা আর অন্যান্য ব্যস্ততায় তার খোঁজখবর নেয়া হয়ে উঠে নি।কেউ একজন বলেছিল তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা হয়তো বিয়ে দিয়েছে।এই মেয়ের সাথে সেদিনের পর এমন ক্রান্তিলগ্নে এসে আবার দেখা হবে ভাবতে পারি নি।আমি তার সম্ভাব্য পরিণতি আর ভবিষ্যতের চিন্তা করে একটু ভীষণ্ণ হয়ে পড়লাম।এমন সময় একজন চিকিৎসক রুম হতে বের হল।আমি পারমিতার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেন খুবই বাজে অবস্থা ।এখন কিছু বলা যাবে না।আমার চিন্তা আরো বেড়ে গেল।

পারমিতাকে নিয়ে আসা লোকগুলোকে দেখছি না তাদের কথাবার্তা বেশ অসংলগ্ন ছিল।তাই আমি নিজে তাদের কিছু বলতে যায় নি।এই সময় নীলার কেবিনে গিয়ে একটু দেখে আসতে হবে।তাই সেদিকে গেলাম।এতক্ষণ নীলার কথা খেয়াল ছিল না।নীলা ঘুমাচ্ছে বেশ ক্লান্ত ছিল।তার শরীরের উপর বেশ ধকল গেছে।আগামীকাল ভোরে কথা বলব।এখন ঘুম ভাঙ্গিয়ে তার সাথে কথা বলাটা অনুচিত হবে। ফোন বেজে উঠায় আবার চলে গেলাম পারমিতার ওখানে…..

সেখানে গিয়ে দেখি সব নীরব নিস্তব্ধ।আমার জন্য এখানেও খারাপ কিছু অপেক্ষা করছে না তো ? আমি নিজে নিজে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম।ওখানকার চিকিৎসক এসে আমাকে টেনে একপাশে নিয়ে গেল তখন আমি বেশ ভীত হয়ে পড়লাম।আমার আশংকা সত্যিই হল।এই অল্প বয়সে নিজের জীবন স্বামী সংসার সন্তান এইসব নিয়ে অনেক বড় একটা যুদ্ধ করেছে মেয়েটি।একটা সময় বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে বিদায় নিল নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে।আমি আমার পরিচিতদের ফোন করে তার বাড়িতে ফোন দিয়ে তার অন্তিমযাত্রায় যেন কমতি না থাকে সেই অনুযায়ী চেষ্টাটুকু করলাম।

সকালের আলো ফুটল।আমার জীবনের এক বর্ণনাতীত রাত কাটালাম যেখানে হারানোর শংকা-উদ্বেগ যেমন ছিল কষ্টও ছিল।পারমিতার মৃত্যুটা আমাকে অনেকদিন তাড়িয়ে বেড়াবে।আমি চোখ বন্ধ করলেই তার ভেজা চোখজোড়া আমার সামনে ভেসে আসে।

নীলা সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠেছে…আমাকে দেখে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।আমি বিচলিত না হয়ে তাকে স্বান্তনা দিতে লাগলাম।আমি যদি তাকে বুঝতে দিই যে কষ্ট পেয়েছি তবে সে আরো কষ্ট পাবে।একজন নার্সের সাহায্য নিয়ে নীলাকে একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে আমি দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছি।

এই সময় নীলা আমার কাছে বারকয়েক জানতে চাইল কোথায় নিয়ে যাচ্ছি ?

আমি অনেকটা গুরগম্ভীর স্বরে বললাম তুমি আমার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছিলে ? তাই না?

আমি তোমাকে মুক্তি দিতে নিয়ে যাচ্ছি।আজকের পর তোমাকে কেউ আর কোন কষ্ট দিবে না।

এই কথা শোনার পর নীলা একটা কথাও বলল না।দেখলাম খুব জোরে হুইল চেয়ারের হাতল ধরে আছে।আমি হুইল চেয়ার নিয়ে করিডোর ছেড়ে বাইরে আসতে আমার দিকে একবার তাকানোর চেষ্টা করেছে।

আমার মস্তিস্কে এই সময় কি চলছে তা আমি নিজেই অনুভূতির ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।একটা উন্মাদনা আমার মাথায় ঝেঁকে বসেছে।এই কাজ শেষ না করে আমার নিস্তার নেই।এটা বুঝলাম।

চলবে………

চারু! একটি মেয়ের নাম

Now Reading
চারু! একটি মেয়ের নাম

চারু! নামটা বড্ড সেকেলে তাই না। চারু মানে সুন্দর। আর এই চারু নামটা ঠিক আমার গায়ের রঙের বিপরীত। দাদু খুব শখ করে নাম রেখেছিলো। বড় হয়েছি কলকাতায়। কলকাতার বড়বাজার এ। ছোট থেকেই ছুটে বেড়িয়েছি এখানে ওখানে। কখনো বাবার কাজের জন্য ছুটেছি এই শহর থেকে ঐ শহর। কখনো ছুটেছি মায়ের হাত ধরে দাদুর বাড়ি। বাবা-মায়ের ঝগড়া সে নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিলো। সকালে বা রাতে এইটা ওটা নিয়ে তারা ত্বর্কে লেগেই থাকতো। আমি সেই ত্বর্কের সময় লুকিয়ে কান্না করতাম, দরজার আড়ালে। তখন মা’ও আমার সাথে কান্না করতো। ছোট ছিলাম বলেই মনে হয় কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু মা ঘুমাতো না। কান্না করেই যেতো। আমি বড় হয়েছি বলতে গেলে দাদুর কাছেই। বাবা-মা অফিস করতো আর আমি একা একাই থাকতাম। আমার সহযোগী ছিলো এক আন্টি আর দাদু। আন্টি সপ্তাহে ৩ দিন আসতেন। বাকি সময় আমি আর দাদুই থাকতাম। দাদু বই পরতো আর আমি একা একাই থাকতাম প্রায় সময়। খেলার সাথী তেমন এলাও করতো না কেও। তাই বলতে গেলে একা একাই বেড়ে উঠা।

গবেষণা নাকি বলে, একা একা থাকা মানুষ গুলোর নাকি আয়ু কম থাকে। আর রোগের বেলায় সবার উপরে। জানিনা কতটা সত্য কিন্তু হতেও পারে সত্য। প্রথম ভালোবেসেছিলাম সেই ক্লাস ৮ এ। আমার ক্লাসেই পড়তো। সারা ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আমার সাথেই প্রাইভেট পড়া, আমার সাথেই বাড়ি আসতো। যদিও ওর বাড়ি অন্য এলাকায় ছিলো। আমাকে নোট’স দিয়ে হেল্প করতো সারাক্ষন। স্কুলে কেও আমার সাথে বাজে ব্যবহার ও করতে পারে নি। আসতে আসতে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হয়ে গেলো। কিভাবে কি হলো নিজেও জানি না। চলছিলো এভাবেই দিন। আমার নিজের ফোন ছিলো না। লুকিয়ে লুকিয়ে দাদু বা দোকান থেকে ফোন করতাম। ওর কাছেও ছিলো না ফোন। বাসার ফোন দিয়েই কথা বলতো। স্বল্পবয়ষি দুই কিশোর-কিশোরীর চলছিলো দিন এই ভাবেই। আমি সারাজীবন একা একাই বড় হয়েছিতো তাই ভয় পেতাম, কিছু পাওয়ার সময়।

শুভ্রর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতাম সবটা সময়। আমি কখনো চাইতাম না কোন কারনে কষ্ট হোক বা শুভ্র’ও কখনো বাজে ব্যবহার করতো না। ভালোই চলছিলো দিন-গুলো। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম দুই জনেই। ভর্তি হলাম এক ই কলেজে। কলেজে উঠেই যেন নিজেকে বদলে যেতে দেখলাম। খুব চুপচাপ স্বভাবের হলেও সব সময় চাইতাম সবার সাথে মিশতে। কিন্তু পারতাম না। কাওকেই আপন ভাবতে কষ্ট হতো। আমার মাঝে মাঝেই মাথা ব্যথা হতো। ছোট বেলা থেকেই। ভেবেছিলাম সাধারন ব্যথাই হবে। হয়তোবা ভুলছিলাম।

একদিন ডাক্তার দেখালাম। Neurologist অতুল কুমার সেন। আমার নানান টেষ্ট এর রিপোর্ট দেখে তিনি যে কথাটা আমাকে বলেছিলো, এখনো সেটা আমার কানে বাজে। প্রতিনিয়ত। “Miss Charu, you have brain cancer . There are approximately 1 month as the time in your hands. I would be happy to speak the words of someone in your family. But since there is no one, so it will be up to you to accept this fact. কথাগুলো যেনো আমার মনে গেথে গিয়েছিলো। আমি ডক্তরের চেম্বার থেকে যেনো হাটতে পারছিলাম না। চেম্বার থেকে বের হবার সময় শুভ্র ফোন করে বললো যে ওর বাবা আর নেই। আমার খুব কান্না পেলো কথাটা শুনে। আমি দেখতে গেলাম ওর বাবাকে। শুভ্র আমাকে ধরে খুব কান্না করলো। আমিও খুব কান্না করলাম। আমি ওকে কিছুতেই বলতে পারিনি যে আমার ক্যান্সার ধরা পয়েছে। এমনি ওর বাবা হারানোর কষ্ট, তার উপর আমার কথাগুলো বলে আরো কষ্ট দিতে চাই নি আমি। তাই আড়াল করে গেলাম সব কিছু। কেও কিছু জানলো না। সময় চলে যাচ্ছিলো। শুভ্র কে সাপোর্ট দিচ্ছিলাম মেন্টার্লি। কিন্তু আমি? নিজে নিজে যেন যুদ্ধ করছিলাম সারাটা সময়। কেনো আমার সাথে এমন হলো। ওদিকে বাবা-মা ও কিছু জানলো না। জমানো যা ছিলো সব দিয়েই শুভ্রর জন্য, বাবা-মা এর জন্য সবার জন্য এইটা সেইটা কিনে দিলাম। এক একটা দিন যেনো খুব তারাতারি ই চলে যাচ্ছিলো। আমি একা থাকতাম। মাথার এক্সট্রা চুল আনিয়ে নিয়েছিলাম। যাতে কেও সন্দেহ না করে। শুভ্রর সাথে দেখা করেছি ২ বার। সামনে গেলে যদি বলে দেই আমার কথা। তাহলে খুব কষ্ট পাবে ও। আমি তো কষ্ট দিতে চাই না। আচ্ছা, ভালোবাসা কি এমনি। নিজের মৃত্যু জেনেও অন্যকে খুসি রাখার চেষ্টা। আমি জানি আমার চলে যাওয়ার তারিখ। এক একটা সময় চলে যাচ্ছিলো আর মনে হচ্ছিলো কত কাজ করার ছিলো আমার। কত স্বপ্ন ছিলো। কিছুই পূরন হলো না আমার। সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, শুভ্রর জন্য চিঠি লিখেছি আলাদা আলাদা করে। এক বন্ধুকে বলেছি ২ দিন পর যেনো সেই চিঠিগুলো আমাদের বাসায় দিয়ে দেয়। আমার হাতে আর ২ দিন আছে। জানিনা আমি আর লিখতে পারবো নাকি। আমার এই ডাইরিটা কেও পাবে বলেও মনে হয় না। এই জন্মে আমার কিছু পাওয়া হলো না। ঈশ্বর যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে পরের জন্মে যেন আমি শুভ্রকে আমার করে পাই।