3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

মা

Now Reading
মা

1501518015391.jpgকখনো ভাবিনি।

তোমাকে এভাবে হারিয়ে ফেলব।
অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমায় নিয়ে।
তোমায় পৃথিবীর সব থেকে সুখি করতে চেয়েছিলাম।
মা….পারিনি আমি।
আমার জ্ঞান হবার পর থেকেই দেখেছি তোমাকে যন্ত্রনা পেতে।
অনেক আশা ছিল তোমায় একটা সুন্দর জীবন কাটাতে দেখব। মাঝে মাঝে তোমায় হাসাতে পারলে পৃথিবীর সব থেকে সুখি মনে হতো নিজেকে। আমি সেই দিনটা পৃথিবীর সব থেকে অসহায় ছিলাম মা।
যে দিন তোমায় হাসপাতালের ট্রলিতে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমার নাক, মুখ, কান দিয়ে রক্ত পরতে দেখেছিলাম মা। তোমায় হারানোর ভয়ে আমি অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম মা। চোখের সামনে তোমাকে যন্ত্রনায় ছটফট করতে দেখে আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম মা। চোখের পানি আটকিয়ে রাখতে পারেনি তোমার এই পাগলটা। আব্বুর বুকে মাথা রাখা তোমার সেই রক্তাক্ত মুখটা দেখে মা। এখন কেউ খুব সকালে এসে বলে না,
ওঠ উঠে নামায পর। এখন খুব অলস হয়ে গেছি মা। যে মানুষটার সুস্থ্যতা আর সুখের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায পরতাম, তাকেই তো সুস্থ্য এবং সুখি দেখতে পেলাম না। নামায ছাড়িনি মা। তোমায় যখন খুব দেখতে ইচ্ছে করে তখন নামায পরি শুধু তোমায় স্বপ্নে এক পলক দেখার আশায়। মা তোমায় অনেক মিস করি মা। প্রতিটা সেকেন্ড মিস করি। আমি রুমের লাইট বন্ধ করে শুয়ে থাকলে শুধু তুমি বুঝতে তখন আমার মাথা ব্যাথা করত। তুমি বুঝতে ডিম লাইট জ্বালানো থাকলেও আমার রাতে ঘুম আসে না। আমার মাথা ব্যাথা করলে তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। ব্যাথা কোথায় হারিয়ে যেত বুঝতেই পেতাম না।  এখন আমি হাজার বার নিজের মাথায় হাত বুলালেও ব্যাথা যায় না মা। খুব সকালে আব্বু কখনো তোমায় জাগিয়ে দিলে তুমি আমার রুমে এসে আমায় ঠেলে একটা বালিস নিয়ে আবার ঘুমিয়ে পরতে। মা আমি ওই জন্যই নিজের সাথে দুইটা বালিস নিয়ে ঘুমাতাম। আমি কখনো না খেয়ে বাইরে গেলে বারান্দায় বসে কেউ আর কাঁদে না মা। তোমার মতো করে কেউ আমাকে ভালবাসতে পারে না মা।
মায়ের কথা মনে হলেই আমার ছায়াশীতল শাখা প্রশাখা বিস্তৃত একটি ছায়াবৃক্ষের কথা মনে পড়ে। মায়ের কথা মনে হলেই আমার মায়াবী জোছনার কথা মনে পড়ে যার আছে আধার নিবারক হিমেল আলো অথচ উত্তাপ নেই। মায়ের কথা মনে হলেই আমার চৈত্রের গরম লাগা ভরদুপুরে একটি শান্ত শীতল সরোবরের কথা মনে পড়ে যার জলে ঝাঁপ দিলে মুহূর্তে জুড়িয়ে যায় দেহ মনের উত্তাপ। আর মনে পড়ে সেই দুটি চোখ অফুরন্ত স্নেহ ঝরা সেই দৃষ্টি যা সর্বক্ষন ছায়ার মতো আমার যাত্রাপথে নিবদ্ধ থাকত। সেই শুভ দৃষ্টির অমৃত পরশ সর্ব বিপদ আপদ থেকে আমাকে আগলে রাখত। মায়ের কথা মনে হলেই চলার পথে অদৃশ্য বনফুলের হাওয়ায় মেশা অমৃতময় সৌরভের কথা মনে পড়ে। যা নিমিষে অস্তিত্বের পরতে পরতে মোহময় আমেজ ছড়িয়ে সারাক্ষন এ মনটাকে মাতিয়ে রাখে সুমধুর সুগন্ধে। আমার চলার পথে নিরন্তর আমায় ক্লান্তিহীন প্রেরনা যোগায়। আর আমি একটু একটু করে এগিয়ে চলি আরো এগিয়ে চলি এক সময় গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
তোমার কারনে এই পৃথিবীর আলো দেখা। পথ চলতে, কথা বলতে শিখিয়েছ। ভালবাসি তোমায় মা। কষ্ট দেই বলে sorry মা। আমরা যত অপরাধই করি না কেন তুমি তাও কখনো মুখ ফিরিয়ে নাও না। আমাদের সব অপরাধকে ক্ষমা করে কাছে টেনে নাও মা। ভুল করি বলে sorry  মা। promise  করছি আর কষ্ট দিব না। তুমি গর্ব করে বলতে পারবে আমি তোমার সন্তান। আমার কারনে আর তোমাকে অপমানিত হতে হবে না। আব্বুর কাছে মিথ্যা বলতে হবে না। রাতের পর রাত আর খাবার টেবিলে বসে থাকতে হবে না। আমার জন্য আর কাঁদতে হবে না মা। promise করছি আর এমনটি হবে না মা। ভালবাসি তোমাকে মা। ইতি তোমার সন্তান। কারনে অকারনে বাবা মাকে কষ্ট দেয়া বন্ধ করেন। ভুলে যাবেন না তাদের ঋণের কথা।
মা এমন একটি সম্পদ যা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর কোথাও তা আর খুজে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বুকে এক তুকরো বেহেশতের নাম মা। প্রতিটি সন্তানের জন্য আল্লাহর দয়াময় নিয়ামত হলো মা। যার মা নেই সেই জানে ব্যাথার স্বরূপ কেমন। শ্রেষ্ঠ ভালো বাসার প্রতিক হচ্ছে ‘ মা ‘ । মা কে ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার । যত্ন করে রাখো অমূল্য রত্ন, চলে গেলে ছেড়ে পৃথিবী হবে অন্ধকার ,আলো হলেও তুমি দেখিবে অন্ধকার । জগতে তুলনা নাই মায়ের সমান। মা যে আমার নেই গৃহে বুঝতে পারি জ্বালা, জগতে আছে শুধু ঊচ্চ ভালোবাসা ‘ মা ‘ । মা পৃথিবীর সব ব্যপারে স্বার্থপর হলেও সন্তানের ব্যপারে সব সময় নিঃস্বার্থ। অতি ছোট্ট একটি শব্দ এবং সবচেয়ে সুন্দর ও মধুর শব্দটি হচ্ছে মা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে মা, তার নেই কোনো উপমা-তুলনা। পূথিবীর সব কিছু বদলাতে পারে,কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনো বদলায় না! মায়ের মত আপন কেহো নাই। মা হলো শুধুই মা। মধুর আমার মায়ের হাসি    তোমায় বড় ভালবাসি। মা আমার জান্নাত। আমার মা আমার পৃথিবী।

গল্পঃ নীলাঞ্জনা

Now Reading
গল্পঃ নীলাঞ্জনা

arjansoul_1417015196_1-01.jpg

অফিস থেকে বাসায় ফিরে রাসেল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত এগারোটা। বাসায় কেউ নেই। রেহানা এখনো হাঁসপাতাল থেকে আসেনি। রেহানা তার স্ত্রী। পেশায় একজন ডাক্তার। সরকারী হাঁসপাতালে ডিউটি শেষ হলে ধানমণ্ডিতে একটা বেশ নাম করা প্রাইভেট হসপিটালে বসে। সব কাজ শেষ করে রেহানা বাসায় ফিরে প্রায় সাড়ে বারোটায়। ততক্ষণে রাসেল খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পরে। রাসেল একটি সরকারী ব্যাংক এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অফিস অনেক আগেই শেষ হয়, কিন্তু বাসায় এসে এতটা সময় একা থাকতে ভাল লাগে না। অফিস শেষে রেস্তোরায় বা কফি-শপে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠে। আর বৃহস্পতিবারে বারে গিয়ে ড্রিংক করে। এই হল রাসেলের বর্তমান জীবন-যাপন।
আজ বৃহস্পতিবার ছিল। রাসেল কিছুটা অন্যমনস্ক। সে রেহানাকে ফোন দিল। রেহানা বলল আজ তার আসতে দেরী হবে। সুতরাং রাসেল যাতে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পরে। দাম্পত্য জীবন নিয়ে রাসেলের কোন অভিযোগ নেই। দিব্যি কেটে যাচ্ছে দিন। দুইজনের সংসার। বাচ্চা-কাচ্চা নেয় নি এখনো। যে যার মত জীবন উপভোগ করছে।
রাসেল ফ্রেশ হয়ে এসে সোফায় বসলো। আজ ড্রিংক করে আসায় কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না তার। একটা সিগারেট ধড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হল। ভিজে মাটির ঘ্রাণ, দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির ছিটে রাসেলকে কেমন উদাস করে দিচ্ছিল। কেন যেন তার ইচ্ছে হচ্ছিল কেউ একজন এক কাপ চা বানিয়ে দিত তাকে। অথবা পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরে একসাথে এই বৃষ্টি রাত উপভোগ করত। হঠাৎ যেন রাসেলের অতৃপ্ত যৌবন কাউকে খুঁজছে। কিন্তু কে সে? রাসেল ভেবে পায় না। রেহানা? কিন্তু রাসেল তো রেহানাকে ঠিক মত বুঝতেই পারে না। তাহলে কে সে? নীলাঞ্জনা? হ্যাঁ, নীলাঞ্জনা। রাসেলের জীবনে এক নীলাঞ্জনা ছিল। দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দে রাসেল যেন কল্পনায় ডুবে যাচ্ছিল।
তখন রাসেল সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। জীবনে অর্থ, লোভ-লালসা কিছুই ছিল না তখন। শুধু ছিল শ্বেত-শুভ্র মন, আর পবিত্র এক ভালবাসা। কলেজে যেত। ঘুরে বেড়াত আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত। একদিন কলেজ থেকে বাসায় আসার পথে রাসেলের জীবনে শুরু হয় নতুন এক উন্মাদনা। সেদিন হাস্যোজ্জল কিছু স্কুল ফেরত মেয়েদের মধ্যে একটি মেয়ে রাসেলের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। সেই মেয়েটি ছিল নীলাঞ্জনা। রাসেল যেন চোখ ফেরাতে পারছিল না। তার সকল অনুভূতিগুলো যেন থমকে গিয়েছিল। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। খোলা চুলে বাতাস যেন ইচ্ছে করেই দোলা দিচ্ছিল। এরপর থেকে প্রতিদিন রাসেল দূর থেকে নীলাঞ্জনা কে দেখত আর অদ্ভুত মুগ্ধতায় হারিয়ে যেত অন্য এক দুনিয়ায়। এভাবে প্রায় এক মাস রাসেল নীলাঞ্জনাকে দেখে কাটিয়ে দিল। একদিন সে চিন্তা করলো নীলাঞ্জনার সাথে কথা বলবে। সেদিন রাতে রাসেলের আর ঘুম আসছিল না। দেখা হলে কি বলবে নিজের মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছিল। কয়েকবার আয়নার সামনে রিহার্সালও করল। পরদিন রাসেল রাসেল রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ তার বুক ধর-ফর করা শুরু হল। নীলাঞ্জনা আসছে। যত কাছে আসছে রাসেলের হৃদকম্পন বাড়তে থাকে। নীলাঞ্জনা যখন কাছে চলে এসেছে তখন রাসেল ডাক দিল,
নীলাঞ্জনা।
নীলাঞ্জনা বেশ অবাক হয়ে বলল,
আমাকে ডাকছেন?
হুম।
কিন্তু আমার নাম তো নীলাঞ্জনা না।
এই একটা কথায় রাসেলের সারা রাতের প্রস্তুতি কর্পূরের মত ঊবে গেলো। সে ইতস্তত করে বলল,
না, মানে, আমি তোমাকে নীলাঞ্জনা বলে ডাকি।
কখন! আপনার সাথে তো আগে কখনো কথা হয় নি। কে আপনি?
না, মানে, আমি রাসেল। তোমার নাম কি?
বৃষ্টি।
বাহ খুব সুন্দর নাম। কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস নাইন।
কিন্তু আপনি আমাকে কি বলার জন্য দাড় করালেন?
না, কিছু নাহ। এমনি।
এমনি-এমনি মানুষকে দাড় করিয়ে সময় নষ্ট করবেন না। আসি।
না, নীলাঞ্জনা, দাড়াও। কিছু কথা ছিল।
আমার নাম বৃষ্টি। নীলাঞ্জনা না।
সে যাই হোক। আমি নীলাঞ্জনা বলেই ডাকব। নীলাঞ্জনা আমি গত এক মাস ধরে তোমাকে দেখছি। খোলা চুলে তোমার হাসি আমি এক মুহূর্তও ভুলতে পারছি না। ভালবাসি তোমাকে। অনেক ভালবাসি। ভালবাসবে আমাকে?
নীলাঞ্জনা অবাক দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর রাসেলের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কিছু না বলে হেঁটে চলে গেল। রাসেলও একসাথে অনেকগুলো কথা গড়-গড় করে বলে নিজেকে একটু অদ্ভুত লাগছিল। সে চুপ-চাপ দাঁড়িয়ে রইল।
পরদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। রাসেল ছাতা নিয়ে নীলাঞ্জনার স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু পর স্কুল ছুটি হলে নীলাঞ্জনা যখন বের হল, রাসেল দৌড়ে গিয়ে নীলাঞ্জনার মাথায় ছাতা ধরল। নীলাঞ্জনা কিছু না বলে নিঃশব্দে হাঁটছিল। রাসেলও চুপ-চাপ হেঁটে যাচ্ছিল। হাঁটতে-হাঁটতে একটা সময় তারা নীলাঞ্জনার বাসার কাছে চলে আসে। তখন নীলাঞ্জনা রাসেলের দিকে তাকাল। একটু হেসে বলল,
ভালবাসি। আর ‘নীলাঞ্জনা’ নামটাও অনেক সুন্দর।
রাসেল হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। রাসেলের যেন কথা আটকে গেছে। কিছু বলতে পারছিল না সে। নীলাঞ্জনা সেই চীরচেনা হাসি দিয়ে চলে গেল। রাসেল হাত থেকে ছাতাটা ফেলে দিয়ে খুব জোড়ে দৌড়াতে শুরু করল। এক দৌড়ে কলেজের মাঠের মাঝখানে গিয়ে থামল। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল সে। অঝর ধাড়ায় বৃষ্টি পড়ছিল তার সারা শরীরে। প্রথম প্রেমে হতাশ হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সফল হতে পেরে সে সব চাইতে খুশি। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব চাইতে ভাগ্যবান ব্যক্তিটি সে।
হঠাৎ রাসেলের কল্পনায় ছেদ পড়ল। ফোন বাজছে। রেহানা ফোন করেছে। রাসেল ফোন ধরল। ওপাশ থেকে রেহানা বলল,
বাহিরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। আজ আর বাসায় আসছি না। আমি গাড়ি নিয়ে খালার বাসায় যাচ্ছি।
হুম। সাবধানে যেয়ো।
আমি পৌঁছে ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
রাসেল আর কিছু না বলে ফোন রেখে দিল। রান্নাঘরে গিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসলো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে ভাবছিল, কত সুন্দর ছিল নীলাঞ্জনার সাথে কাটানো সময়গুলো। কতবার নীলাঞ্জনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে ছিল সে। নীলাঞ্জনা আদর করে বলত, ‘ঘুমিয়ে পড় বাবু’। আর রাসেল সাথে-সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলত। প্রায় চার বছরের প্রেম। চার বছর পর পরিবর্তন হল অনেক। রাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল। নীলাঞ্জনা কলেজে। হঠাৎ রাসেলের বাবা মারা গেল। অনেক দায়িত্ব এসে পড়ল রাসেলের উপর। লোভ-লালসাহীন ছেলেটি হঠাৎ টাকার পেছনে ছোটা শুরু করল। ভার্সিটিতে ক্লাস, তারপর পায়ে হেঁটে টিউশনি, ঘামে ভেজা শরীর এসব কিছুই রাসেলের নির্বিঘ্ন জীবনটাকে অনেক জটিল করে দিল। আস্তে-আস্তে সে ভুলে যাচ্ছিল কীভাবে ভালবাসতে হয়। ভুলে যাচ্ছিল প্রথম প্রেম নীলাঞ্জনাকে। নীলাঞ্জনাও সব বুঝত। সেও কোন অভিযোগ করত না। সময় যত কাটতে থাকে জীবন তত কঠিন হতে থাকে রাসেলের। তার একটাই চিন্তা কবে মিলবে মুক্তি। একটা সময় সে ভুলেই যায় নীলাঞ্জনার কথা। সে জীবন গুছাতে অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নীলাঞ্জনা ঠিকি মনে রেখেছিল রাসেলকে। সে শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনত। কিন্তু কখনো বলতো না রাসেলকে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শেষ করে রাসেল ভাল সরকারী চাকরী পেয়ে গেল। কিন্তু ততদিনে নীলাঞ্জনার কি হল এসব নিয়ে একটুও ভাবে নি রাসেল। এরই মধ্যে তার পরিচয় হয়েছিল রেহানার সাথে। রেহানা তখন ডাক্তারি পড়ছে। রাসেল যখন বেকার তখন প্রায়ই তার পাশে ছিল রেহানা। কিছুদিন পরই রাসেল রেহানাকে বিয়ে করল। কিন্তু হঠাৎ নীলাঞ্জনা কোথায় হারিয়ে গেল রাসেল জানে না। কখনো জানার প্রয়োজন বোধও করেনি।
চা শেষ করে রাসেল ফোন টা হাতে নিলো। অনেক দিন আগে সেভ করা নীলাঞ্জনার নাম্বারটা বের করে ফোন দিল। রিং হচ্ছে। রাসেলের বুকে যেন প্রথম প্রেমের ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। প্রায় পাঁচ বছর পর সে নীলাঞ্জনার সাথে কথা বলবে। ফোন রিসিভ হল। ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ হ্যালো-হ্যালো করে যাচ্ছে। রাসেল চুপ করে রইল। একটু পর ফোনে শুনতে পেল, একটা বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। হয়ত ঘুম ভেঙে যাওয়ায় কাঁদছে। আর চীরচেনা একটা মেয়ে কণ্ঠ পরম মমতা অথবা ভালবাসায় বলছে, কাঁদে না বাবু; ঘুমিয়ে পড়।

গল্পঃ চন্দ্রকথন

Now Reading
গল্পঃ চন্দ্রকথন

শুভ্র আজ সকাল থেকেই কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করছে।আজকের দিনটা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আজ একটা জায়গায় যেতে হবে তার। সকাল-সকাল নাস্তা সেরে বেরিয়ে পরল। বাসে উঠে চুপ-চাপ বসে বাহিরের প্রকৃতি দেখছিল আর ভাবছিল।অনেক দূর যেতে হবে তাকে। তবুও প্রতিবারের মত এইবারও শুভ্রর পুরনো স্মৃতি গুলো ভাবতে-ভাবতে সময় কেটে যায়। একটা সময় বাস পৌঁছে গেল। আরও পাঁচ কিলো পথ রিকশায় যেতে হবে। বাস থেকে নেমে সে ঘড়ি দেখল। রাত আটটা বেজে গেছে। চারদিক বেস নিরব। আজ পূর্ণিমা। শুভ্র জানে কিন্তু সে কেন যেন আকাশের দিকে তাকাল না। আশে-পাশে কোন রিকশা দেখছিল না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর শুভ্র দেখতে পেল, টিম-টিমে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে খুব দ্রুত গতিতে একটা রিকশা আসছে। রিকশাটা কাছে আসতেই শুভ্র বলল, ‘মামা যাবেন।’
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘কোথায়?’।
শুভ্র বলল, ‘মায়া নদীর ঘাটে’।
মামা বলল, ‘উঠেন’।
শুভ্র দেরি না করে উঠে বসলো। নিরিবিলি পথ ধরে চাঁদের আলয় আগিয়ে চলছে রিকশা। রিকশা যত এগিয়ে যাচ্ছিল, শুভ্রর মনে একটা নারী চেহারা স্পষ্ট হচ্ছিল। একটা সময় রিকশা মায়া নদীর ঘাটে পৌঁছে গেল।
মামা বেস তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘মামা নামেন, চইলা আসছি।’
শুভ্র রিকশা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট মামা কে দিয়ে বলল’ ‘ভাড়া রাখেন’।
মামা পাঁচশো টাকার নোট টা হাতে নিয়ে বলল, ‘ ভাংতি নাই’।
শুভ্র বলল, ‘মামা আমার কাছেও তো নাই। আশে-পাসে কোন দোকানে ভাংতি পান কিনা দেখেন’।
মামা বলল, ‘সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে’। শুভ্র আশে-পাসে তাকিয়ে দেখল আসলেই সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
রিকশাওয়ালা মামা টাকাটা ফেরত দিয়ে বলল, ‘ভাড়া লাগবে না, যান।’
শুভ্র কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞাস করল, ‘মামা আপনার নাম? না মানে পরে আপনাকে খুজে টাকাটা দিয়ে যাব।’
মামা বলল, ‘ জুবায়ের প্রামাণিক।’
এরপর শুভ্র আস্তে আস্তে মায়া নদীর তীরে এগিয়ে গেল।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শুভ্র এবার চাঁদের দিকে তাকাল। শুভ্রর চোখে পানি জমতে থাকল। চাঁদের আলোয় তার চোখ জ্বল-জ্বল করছিল। হঠাৎ চোখ মুছতে গিয়ে শুভ্র দেখল তার থেকে প্রায় আট-দশ হাত দূরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখও জ্বল-জ্বল করছে। শুভ্র সন্ত্রস্ত পায়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেল। দেখল লোকটা আর কেও না, সেই রিকশাওয়ালা মামা, জুবায়ের মামা।
শুভ্র ডাকল, ‘জুবায়ের মামা’।
জুবায়ের মামা চমকে তাকিয়ে বলল, ‘ মামা আপনে? এত রাতে নদীর পারে কি করেন?’
শুভ্র উত্তর না দিয়ে বলল, ‘আপনে কি করেন?’।
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভালবাসার শব্দ শুনি’।’
শুভ্র বলল, ‘ তাই নাকি? কিভাবে?’
জুবায়ের মামা ইতস্তত করে বলল, ‘মামা সে অনেক কথা। আপনে বুঝবেন না।’
শুভ্র নাছোড়বান্দার মত বলল, ‘ বুঝব, আপনার অনেক কথা গুলো বলেন, আমি শুনব।’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ আচ্ছা বলতেসি, কিন্তু শোনার পর কিন্তু হাসবেন না।’
শুভ্র জুবায়ের মামাকে আশ্বস্ত করল, সে হাসবে না।
জুবায়ের মামা বলতে শুরু করল-
মামা তখন আমার জুয়ান বয়স। পড়া-লেখা করি নাই। অনেক দূর থিকা চাচা-বড় ভাইগো সাথে কাজের জন্য এই গ্রামে আসি। তখন এই গ্রামে সব চেয়ে প্রভাবশালী আর অনেক জমির মালিক ছিল আব্দুল মতালিব। আমরা সবাই তারে হুজুর বইলা ডাকতাম। আমার চাচারা তার জমিতে কামলা খাটতো, হুজুরের বাইরের ঘরে থাকত, হুজুরের ঘরেই খাইত। হুজুর আবার মুজুরিও দিত। তো নতুন আইসা আমিও চাচাগো সাথে কামলা খাটা শুরু করলাম। ভালই কাটতেছিল দিনগুলা। হুজুরও খুব ভাল পাইতেন আমারে। হুজুরের সংসারে ছিল তার স্ত্রী, এক ছেলে আর তার ছোট মেয়ে। ছোট মেয়ের নাম ছিল নাজমা বেগম। বয়স খুব বেশি হইলে পনের কি ষোল। কিন্তু সে ছিল খুব চঞ্চল, আর দেখতে ছিল পরীর মত। আমরা যখন জমিতে কাজ করতাম, তখন নাজমা জমির আশে-পাসে ঘুইরা বেরাইত। আমি দেখতাম সে আমার দিকে বেস নজর রাখত। আমিও তাকায় থাকতাম পরীর দিকে। আস্তে-আস্তে আমি তারে ভালবাইসা ফেললাম। সেও যে আমারে ভালবাসত আমি বুঝতাম। একদিন অনেক সাহস কইরা গোপনে ওরে বললাম। ভাবছিলাম লজ্জা পাইবো। কিন্তু সে আমারে অবাক কইরা দিয়া বলছিল ‘এতদিনে বুঝলেন?’ এরপর থেকে আমাদের প্রেম শুরু। আমি ওরে পরী কইয়া ডাকতাম। যখন হুজুর কোন কাজে শহরে যাইতেন, তখন আমি আর পরী এই মায়া নদীর তীরে হাইটা বেরাইতাম। প্রায় এক বছর পর হুজুর কইল পরীর নাকি বিয়ে ঠিক করছেন। ভিন গ্রামের চাকুরীজীবী ছেলে। সামনে মাসেই বিয়ে। দুই দিন পর হুজুর বিবাহর কেনা-কাটা করতে শহরে গেলেন। আমি আর পরী আবার নদীর তীরে আসলাম। আমার খুব মন খারাপ ছিল। পরীরও মনে হয় মন খারাপ ছিল, কিন্তু সে আমারে বুঝতে দিল না। হঠাৎ কইরা পরী বলল, ‘চল পালায় যাই।’ আমি বললাম, ‘কেমনে? কই যামু? আমার কাছে তো টাকাও নাই।’ পরী বলল, ‘ওইসব আমি বেবস্থা করমুনে। তুমি এখন যাও। আমি রাইতে বাইরের ঘরে আসলে তুমি বাইর হইও।’ আমরা যে যার মত চইলা আসলাম। ভোর রাইতে পরী বাইরের ঘরে আসলো। আমি নিঃশব্দে বাইর হইলাম। পরী আমার হাতে একটা গামছা বান্ধা পোটলা দিল। দেখলাম ভেতরে সব সোনার গয়না। পরীরে আমি যতবারি কিছু বলতে যাই পরী আমার মুখ চাইপা ধরে। দেখলাম পরীর চোখে পানি। নিঃশব্দে কাঁদতেছিল। ওর কান্না দেইখা আমি ওরে জড়াইয়া ধরলাম। মনে হইতছিল অন্য এক দুনিয়ায় আছি। হঠাৎ একটা শব্দ পাইয়া চেতন ফিরল। দেখলাম হুজুর ওযু করার পানি হাতে আমার দিকে তাকায়া আছেন। হুজুর তখন আর কিছু বললেন না। পরী দৌড়াইয়া ঘরে ঢুইকা গেল। আমি হতবুদ্ধি হইয়া দাঁড়াইয়া ছিলাম। দেখলাম হুজুর নামাজে গেলেন। নামাজ থেকে আইসা আমারে ডাকলেন। আমি বের হইয়া দেখলাম হুজুরের সাথে আরও দুইজন কামলা। তারা আমারে বেদম মাইরধর করল। প্রায় আধঘণ্টা পর হুজুর আমারে বললেন, ‘তোর জিনিসপত্র গুছাইয়া চইলা যা। আর একটা কথা, আর কোন দিন যাতে তোরে এই গ্রামে না দেখি।’ আমি সব গুছাইয়া যখন বাইর হইলাম তখন পরী দৌড়াইয়া আইসা একটা চিঠি আমার হাতে দিয়া আবার দৌড়াইয়া চইলা গেল। আমি গ্রাম ছাইড়া বের হইয়া চিঠিটা খুললাম। দেখলাম পরী লেখছে, ‘অনেক ভালবাসি তোমারে। সারাজীবন ভালবাসমু। জানি অনেক কষ্ট হইতাছে তোমার। যত দিন আমারে ভুলতে পারবানা ততদিন প্রতি পূর্ণিমা রাইতে ওই মায়া নদীর পারে আসবা। দেখবা ওই চাঁদ তোমার সব কষ্ট ভুলায় দিব। আর আমারে কখনো দেখতে আইস না। ভাল থাইক।’ এরপর আমি পাশের গ্রামে কষ্টে-বিস্টে থাকা শুরু করি। রিকশা চালাই। আর প্রতি পূর্ণিমা রাইতে এই মায়া নদীর পারে আসি।
জুবায়ের মামার কথা থামল। কিছুক্ষণ নীরব থাকল। এরপর শুভ্র বলল, ‘আপনার পরী এখন কেমন আছে?’
জুবায়ের মামা বলল, ‘ভাল, দুইটা ছেলে সন্তান আর স্বামীরে নিয়া ভালই আছে।’
শুভ্র বলল, ‘আপনি বিয়ে করেছেন?’
জুবায়ের বলল, ‘না মামা। অপেক্ষা করি কবে এই চাঁদ আমার সব কষ্ট ভুলাইয়া দিবে।’
শুভ্র চুপ করে রইল। জুবায়ের মামা বলল, ‘মামা আপনে এইখানে আসছেন ক্যান?’
শুভ্র একটু চুপ করে থেকে বলল আমারও একটা গল্প আছে। হয়ত সেই গল্প অন্যরকম। তবে সেই গল্পেও চাঁদটা খুব কষ্টের। সেই গল্পও ভালবাসার গল্প। আবার কোন পূর্ণিমাতে আপনাকে সেই গল্প শোনাবো।
এরপর মায়া নদীর তীরে দুই জন নীরব বসে থাকে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে কি যেন বলে। চাঁদের সাথে তাদের যেন কত কথা। আস্তে-আস্তে সময় যায়, আর চাঁদটাও সরে যেতে থাকে। অস্ফুট স্বরে শুভ্র বলতে থাকে, ‘চন্দ্রমায়া, চন্দ্রমায়া অনেক ভালবাসি তোমাকে’।

Page Sidebar