ক্ষয়িষ্ণু,মুমূর্ষু গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ

Now Reading
ক্ষয়িষ্ণু,মুমূর্ষু গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ

বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতেই অনেক প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে; যেমন : ঘড়িয়াল,সাইগা এন্টিলপ,কোকোনাট ক্র্যাব, লেঙ্গুর চাটো প্রভৃতি ;এই তালিকা নেহাত কম নয়।অদূর ভবিষ্যতে এসব প্রাণীদের গল্প ঠিক যেন রুপকথার মতই শোনাবে।প্রাণী আর উদ্ভিদকূলের প্রধান অভয়ারণ্যগুলো আজকে নগরায়ন, বিশ্বায়ন কিংবা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, ক্রমবর্ধমান জনশক্তির চাহিদার বলি হচ্ছে প্রতিনিয়ত ; পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল রিফ, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ ও এই নীল নকশার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে নি।
মহাশূন্য হতে পৃথিবীর দৃশ্যমান বস্তুসমুহের মধ্যে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের পূর্ব পাশের কয়েকশো দ্বীপপুঞ্জ অন্যতম।অস্ট্রেলিয়ার  কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের উপকূল ঘেঁষে কোরাল সাগরে অবস্থান করা জলজ সম্পদপুষ্ট এই সুদীর্ঘ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্তবস্তু হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।১৯৮১ সালে,ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত হয় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ।আবার, কয়েক যুগ সময়ের পরই এক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে, এই গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে জাতিসংঘের ‘বিপন্ন’ তালিকাভুক্ত করার জন্যে প্রস্তাব দেয়া হয়ে থাকে।এত কম সময়ে এত বড় পরিবর্তত প্রধানত দুটি বিষয়কে ইঙ্গিত করে, ১)বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব এখনই কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে শুরু করছে এবং কত দ্রুতগতিতে জ্যামিতিক হারে তা হচ্ছে ; ২)জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে বিশ্ববাসীর এহেন উদাসীনতা, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত তথা দূরদর্শিতার অভাব। মার্কিন প্রচারমাধ্যম সিএনএন, এই সুবিশাল প্রবাল প্রাচীরঘেরা প্রকৃতির নিজ  হাতে গড়া এই অ্যাকুরিয়ামকে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি বলে ঘোষণা  করে।জাতিসংঘের  অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ প্রবাল অঞ্চলের খনিজ শিল্পের পুঁজি বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। খনিজ শিল্প-প্রতিষ্ঠান গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ নিকটবর্তী অঞ্চলে পোতাশ্রয় নির্মাণ করে,সেখানেই বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে, সমুদ্রপথের সাথে যোগসূত্রিতা ঘটে । ফলে, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের  প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় এখনও প্রতিনিয়ত ক্ষতি হচ্ছে।২০১২ সালের প্রাক্কালে, অস্ট্রেলিয়ান সরকার কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের অ্যাবট পয়েন্টের কয়লা বন্দরটিকে সুবিস্তৃত করার মহাপরিকল্পনা নেয়। কয়লা উত্তোলন, রপ্তানি করা ছাড়াও এই শিল্পের সাথে জড়িত অনেক বহুজাতিক কোম্পানি এই বন্দরটি ব্যবহার করতে চাইছে।আর, স্বাভাবিক ভাবেই পণ্য বহনের জন্যে জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করতে গিয়ে পলিমাটির ব্যবহার শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে,এই ব্যবহৃত পলিমাটিই প্রত্যক্ষভাবে প্রবাল প্রাচীর ক্ষয়ের অন্যতম কারণ।প্রবালপ্রাচীরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ক্ষয়ের সূচনা। আর তা প্রকট আকার ধারণ করে উত্তর প্রান্তে এসে। ৯০০’র অধিক রিফের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে কেবলমাত্র ৬৭টিতে ক্ষয়ের চিহ্ন পাওয়া  যায়নি।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এল নিনো পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে;এল নিনো বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেসব দেশ কৃ্ষিকাজ এবং মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল ( উদাহরণস্বরূপ-অস্ট্রেলিয়া এবং ওসেনিয়ান দ্বীপপুঞ্জ), তারাই এল নিনো দ্বারা অধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে। “এল নিনো” হচ্ছে একটি স্প্যানিশ শব্দ; পূর্ব-কেন্দ্রীয় গ্রীষ্মমন্ডলীয় শান্ত সমুদ্রের পানির গড়পড়তা তাপমাত্রা যখন কমপক্ষে ০.৫°সেলসিয়াস (০.৯°ফারেনহাইট) হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে  তখন সে ধরনের পরিস্থিতিকেই সাধারনত এল নিনো হিসেবে আক্ষ্যা করা হয়।এল নিনোর এসব অবস্থা সমুদ্রে কয়েক মাস যাবৎ বিরাজ করে, তখন অত্যধিক গরম সামুদ্রিক জলরাশি দেখা যায় এবং স্থানীয় মাছ ধরার ব্যবসার উপর বড় একটি প্রভাব দেখা দিতে পারে।বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং এল নিনো- দুটি ঘটনাই পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।১৯৯৮ সালে এল নিনোর প্রভাবে প্রথমবারের মতো বিশ্বজুড়ে প্রবাল প্রাচীরের “ব্লিচিং প্রক্রিয়া” শুরু হয়েছিল,তখন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অর্ধেকের বেশি প্রবাল এর দ্বারা আক্রান্ত যা শতকরা হিসেবে মোট প্রবালের প্রায় ১০ ভাগের কাছাকাছি।এরপর কিছুটা সময় বিরতি রেখে ২০০৯ সালের শেষ দিকে আবার ব্লিচিং শুরু হয়; তবে সেবার খুব বেশি ক্ষতিসাধন হয় নি তাপমাত্রার খুব বেশি পরিবর্তন না হওয়াতে। কিন্তু, অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা অনেক বেশি চিন্তিত; ২০১৬ থেকেই ক্ষয়িষ্ণু এক গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকেই দেখছেন তাঁরা।  বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এল নিনোকে প্রভাবিত করতে পারে-যদিও এখন পর্যন্ত এটি একটি তত্ত্ব মাত্র। অস্ট্রেলিয়ান সরকার তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবসায়িক স্বার্থে আহরণ করে  বিলিয়ে দেবার পাশাপাশি বিপন্ন করে তুলেছে সহস্রাধিক দ্বীপপুঞ্জের জীব-বৈচিত্রকে।  দা গার্ডিয়ানসের মতে, অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের বাণিজ্যিক সুবিধার জন্যে অনুন্নত দেশগুলোতে এবং পলিনেশিয়ান দ্বীপরাষ্ট্রের  কয়েকটিতে  কয়লার যোগান দিচ্ছে ; এতে করে বিশাল জীব-বৈচিত্রের এই অঞ্চল প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাচ্ছে।গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ যে কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের আধার তা নয়; প্রায় দুহাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ,সহস্রাধিক দ্বীপ নিয়ে পৃথিবীর   অন্যতম আকর্ষণীয়  স্থানগুলোর মধ্যে একটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্যে।
অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীরাই সর্বপ্রথম এই সুবিশাল অঞ্চলের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ মূলত নানান বর্ণের  শৈবাল,জু-প্লাঙ্কটন, ফাইটোপ্লাঙ্কটনের জন্য বৈচিত্র্যময়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের পানির উষ্ণতা দিনকে দিন কেবল বেড়ে চলছেই ;প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে প্রায়শই।বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে, তাপমাত্রার তারতম্য ঘটছে যখন-তখন;  এ কারণেই প্রবালগুলো ওদের রঙ হারিয়ে বিবর্ণ হচ্ছে ; মহাসাগরের শৈবাল- জু-প্লাঙ্কটন- ফাইটোপ্লাঙ্কটগুলো ক্রমশ মারা যাচ্ছে; আর এভাবেই সার্বিক বিবেচনায় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ ও ধীরে ধীরে মরতে বসেছে।এখন আসলে যা ঘটছে , বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন “প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় “। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় কোরাল ব্লিচিং টাস্কফোর্সের বিবৃতি অনুযায়ী, এর আগে ১৯৯৯-২০১০ সময়কালে বেশ কয়েকবার ক্ষয়ের মুখে পড়েছিল গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি বেশি গুরুতর।আলোকচিত্রশিল্পীদের ক্যামেরায় বাঁধা পরা কিছু  স্থিরচিত্র দেখে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। মানুষ তার চাহিদা পুরনে স্থলসম্পদের বাইরে এখন ব্লু ইকোনমিতেও মনযোগী হচ্ছে;বিকল্প শক্তির খোঁজে আমরা পরিবেশের উপযোগিতাকে কমিয়ে ফেলছি ; পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে ;অভয়ারণ্য হারিয়ে বিলুপ্ত হওয়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রাণীর নাম।তবে, আপাতত গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ যে মুমূর্ষু অবস্থায় আছে তা কিন্তু বলে দেওয়া যায়।  ডেভিড অ্যাটেনব্রোর প্রামান্যচিত্র “ প্ল্যানেট আর্থ” থেকেই হয়ত পরবর্তী প্রজন্ম গ্রেট ব্যারিয়ার রিফকে নতুন করে চিনতে পারবে।

http://www.gbrmpa.gov.au/visit-the-reef/current-conditions-on-the-great-barrier-reef
http://www.gbrmpa.gov.au/visit-the-reef/current-conditions-on-the-great-barrier-reef/latest-detailed-observed-forecast-and-environmental-conditions
https://www.theguardian.com/environment/2016/jun/07/the-great-barrier-reef-a-catastrophe-laid-bare