গরম কিংবা ঠান্ডায় ব্যাটারির পারফরমেন্স কেন ভিন্ন হয় ?

Now Reading
গরম কিংবা ঠান্ডায় ব্যাটারির পারফরমেন্স কেন ভিন্ন হয় ?

আমরা সবাই ব্যাটারি ব্যাবহার করে অভ্যস্থ । এইটা আমরা যেমন সেলফোনে ব্যাবহার করি ঠিক তেমনই টর্চ লাইট কিংবা ক্যামেরা ফোনেও ব্যাবহার করে থাকি । প্রযুক্তিভেদে হয়ত ব্যাটারি ভিন্ন হতে পারে কিন্তু, তাদের সবার মধ্যে একটা সাধারন বৈশিষ্ঠ্য বিদ্যমান থাকে আর তাহলো এসবগুলোই কেমিক্যাল এনার্জি কে ইলেক্ট্রিক্যাল এনার্জিতে রুপান্তর করে । তবে, এইটা ছাড়াও আরেকটা জিনিস হয়ত আমরা খেয়াল করেছি তাহলো অত্যাধিক গরমে এগুলো কেমন যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছে আবার খুব বেশি ঠাণ্ডা জায়গায় রাখলেও কেন জানি ঠিকমত চলছেনা !
কাজেই, আজকের পর্বে আমরা ব্যাটারি কি ? কিভাবে কাজ করে ? কিংবা কেন বেশি গরমে রাখলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় এবং ঠাণ্ডাতে রাখলেই বা কেন ঠিকমত কাজ করেনা তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে পুরো বিস্তারিত আলোচনা করবো ।

ব্যাটারি কি ?
ব্যাটারি হল একধরনের কন্টেইনারের ন্যায় যা কিনা এক বা একাধিক সেল নিয়ে তৈরি হয় । আর এর প্রধান কাজ হল কেমিক্যাল এনার্জি কে ইলেক্ট্রিক্যাল এনার্জিতে রুপান্তর করা । মোটামুটি সকল ব্যাটারিতেই ৩টি প্রধান অংশ থাকে তাহলো- ২টা ইলেক্ট্রোড অ্যানোড এবং ক্যাথোড, ইলেক্ট্রোলাইট এবং সেপারেটর । (চিত্র দ্রষ্টব্য) ইলেক্ট্রোলাইট এর উপাদান কি হবে কিংবা ব্যাটারিতে কয়টা সেপারেটর থাকবে তা মূলত কি ধরনের ব্যাটারি তার উপরেই নির্ভর করে । এই দুই ইলেক্ট্রোড ব্যাটারির দুই প্রান্তে লাগানো থাকে । যেমন- ক্যাথোড লাগানো থাকে ব্যাটারির পজিটিভ অংশে এবং অ্যানোড লাগানো থাকে ব্যাটারির নেগেটিভ অংশে । আর এদের মাঝে থাকে সেই ইলেক্ট্রোলাইট যা মূলত ইলেক্ট্রিসিটি প্রবাহের জন্য দায়ী আয়ন ধারন করে থাকে । আর, এই অ্যানোড আর ক্যাথোড কে আলাদা করার জন্য সেপারেটর ব্যাবহার করা হয় যাতে তাদের মধ্যে কোন শর্ট সার্কিট তৈরি না হয় ।

 

58649ff9-0218-45bd-a94f-2fae4ac5f0e5.png.jpg

 

ব্যাটারি কিভাবে কাজ করে ?
আমরা জানি, ইলেক্ট্রনের প্রবাহের ফলেই সৃষ্টি হয় কারেন্ট । তার মানে, এই ব্যাটারিতেও নিশ্চয় এই ইলেকট্রন প্রবাহিত হয় নাহলে, আমরা কারেন্ট পাচ্ছি কিভাবে ? যখন, ব্যাটারির মধ্যে কেমিক্যাল রি-অ্যাকশান চলতে থাকে তখন অ্যানোড কিংবা ক্যাথোডের মধ্যে একধরনের ইলেক্ট্রিক্যাল পার্থক্য তৈরি হয় । এর ফলে, অ্যানোডে ইলেকট্রন এসে জমা হতে থাকে । ইলেকট্রন গুলো তাদের এই পার্থক্য কমানোর জন্য রি-অ্যারেঞ্জ হবার চেষ্টা করে । সেইজন্য তারা ক্যাথোডের দিকে যেতে চায় । কিন্তু, সমস্যা হল ইলেক্ট্রোলাইটের মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রনগুলো যেতে পারেনা তাদের অন্য কোন মাধ্যম দরকার । তাই, যখনই অ্যানোডের সাথে ক্যাথোডের তার দিয়ে কোন সংযোগ ঘটানো হয় তখন আসলে সেই মাধ্যম তৈরি হয়ে যায় । অর্থাৎ, পুরো একটি সার্কিট তৈরি হয় । এর ফলে খুব সহজেই অ্যানোড থেকে ক্যাথোডে ইলেক্ট্রন প্রবাহ অর্থাৎ, কারেন্ট প্রবাহিত হতে থাকে আর তাদের মাঝে যেই ইলেক্ট্রিক্যাল পার্থক্য তা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে । আর এর মাঝে যদি কোন লোড রাখা হয় (যেমন- ইলেক্ট্রিক বাল্ব) তা সেই কারেন্ট কনজ্যুম করতে থাকে । তবে, এভাবে একটা সময় এসে ইলেক্ট্রন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় আর তখন সেই লোডও বন্ধ হয়ে যায় ।

 

battery.gif

 

বেশি তাপমাত্রায় ব্যাটারি কেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় ?
এইবার আসি আমাদের মূল আলোচনায় যার কারণে কারণে মূলত আমাদের এত কিছু ব্যাখ্যা করা । আর তাহলো ব্যাটারি বেশি তাপমাত্রায় কেন তাড়াতাড়ি শেষ হয় ? বিষয়টা কি আসলেই সত্যি নাকি আমাদের দৃষ্টিভ্রম ? যাইহোক, এইটা সত্যি সত্যিই ঘটে থাকে আর এর জন্য দায়ি মূলত কেমিস্ট্রির পার্টিকুলার রুল যাকে বলা হয় “Arrhenius Equation । এই ইকুয়েশন অনুসারে তাপমাত্রা যত বেশি হব তত দ্রুত কেমিক্যাল রি-অ্যাকশান হবে । আর দ্রুত কেমিক্যাল রি-অ্যাকশান হওয়া মানে দ্রুত ব্যাটারি নিঃশেষ হওয়া । আর ঠিক সেই কারনেই, আমরা যখন আমাদের মোবাইল ফোন কোন গরম জায়গায় (যেমন- প্যান্টের পকেট !) রাখি তখন মনে হতে থাকে ব্যাটারি যেন খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে ! আবার ঠিক একই কথা সেই ক্যামেরা কিংবা টর্চের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । নিচে এরকম একটা ছবি দেয়া হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে ব্যাটারির পারফরমেন্সের সাথে তাপমাত্রা কিভাবে জড়িত ।

 

bbf48b6d-d37e-4360-ce27-6bdac49474aa.png.jpg

 

তাহলে, কি ঠাণ্ডা অবস্থায় ব্যাটারি ধীরে শেষ হবে ?
এখন সবার মনে হয়ত প্রশ্ন আসবে যেহেতু খুব বেশি তাপমাত্রায় ব্যাটারি খুব দ্রুত ড্রেইন হয় তাহলে আমরা যদি তাপমাত্রা খুব কমিয়ে ফেলি তখন কি হবে ? তখন কি ব্যাটারির লাইফ টাইম বেড়ে যাবে ? যেহেতু রি-অ্যাকশান খুব স্লো হবে তাহলে তো সেরকম কিছুই হবার কথা ! এই অনুমানের আংশিক সত্য । মানে এখানে, রি-অ্যাকশান স্পীড স্লো হবে বিষয়টা ঠিক আছে কিন্তু, ব্যাটারির লাইফ টাইম বাড়বে তা ঠিক নয় । এখানে, আসলে, প্রয়োজনীয় কারেন্টটুকুই পাওয়া যায়না । আর, মূলত এই স্লো ডিসচার্জ রেটের কারনেই, অনেকে ব্যাটারি ডিপ ফ্রিজ বা ঠাণ্ডা কোন জায়গায় রাখার কথা বলেন । কিন্তু, যদিও তা রাখাটা খুব বেশি জরুরি নয় বরং ব্যাটারিগুলোকে সাধারন তাপমাত্রায় রাখা হলেই তা যথেষ্ট ।
তবে, এই ঠাণ্ডা সমস্যার একমাত্র সল্যুশন হল ব্যাটারি ব্যাবহারের পুর্বে একে কিছুটা গরম করে নেয়া । তাই বলে আগুনের কাছে নিয়ে গরম করাটা হয়ত ঠিক হবেনা ! ব্যাটারি যদি পেন্সিল ব্যাটারির মত ছোট হয় তাহলে, প্যান্টের পকেটে রাখলেই হবে । এর ফলে দেহ থেকেই প্রয়োজনীয় তাপ শোষন করতে পারবে । আর যদি গাড়ির ব্যাটারির মত বড় সাইজের হয় তাহলে, সাধারন তাপমাত্রায় থাকা অবস্থায় ইনসুলেটেড অবস্থায় রাখতে হবে । যাতে ঠাণ্ডা জায়গায় আনা হলেও তা যেন তাপ হারাতে না পারে ।

যাইহোক, আশা করি সবাই গরম এবং ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় ব্যাটারি কিভাবে কাজ করে কিংবা কেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় তা বুঝতে পেরেছে । যদি, তাও নতুন কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে কমেন্ট সেকশনে প্রশ্ন করা যেতে পারে, উত্তর দেবার চেষ্টা করব । আজকে এই পর্যন্তই আশা করি সবার ভালো লেগেছে । সবাইকে ধন্যবাদ ।

 


 

References:

  1. https://goo.gl/gVrAzv
  2. https://www.duracell.com/en-us/help/faq/how-can-i-get-a-better-life-out-of-my-batteries
  3. http://www.qrg.northwestern.edu/projects/vss/docs/power/2-how-do-batteries-work.html
  4. https://www.thoughtco.com/why-batteries-discharge-quickly-cold-weather-607889