বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী – পর্ব ১

Now Reading
বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী – পর্ব ১

শুরু করলাম নতুন ধারাবাহিক, বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী। আমি মূলত বাংলাদেশের বিশেষ বিশেষ প্রাচীন জায়গাগুলোর বর্ণনা দেব। আজকের ঐতিহাসিক জায়গাটির নাম ঃ মহাস্থানগড়

মহাস্থানগড় – এই প্রাচীন পুরাকীর্তি প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে গড়ে উঠেছে। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. উত্তরে শিবগঞ্জ উপজেলায় করতোয়া নদীর তীরে এর অবস্থান। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নগরী। একসময় এই নগরী পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামে সবার কাছে পরিচিত ছিল। বাংলার রাজধানীও ছিল এই মহাস্থানগড়। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী হিসাবে বিবেচিত ছিল। এখানে অনেক হিন্দু রাজা এবং অন্যান্য ধর্মের রাজারা শাসন করেছেন। এখন এই জায়গাটি কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে, এখন সেখানে গেলে শুধুমাত্র ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যাবে। মজার ঘটনা হল, ২০১৬ সালে এটিকে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

মহাস্থানগড়ে কেন শহর স্থাপন করা হল এটি নিয়ে নানা মত আছে। তবে ধারণা করা হয়, এইখানে শহর পত্তনের মূল কারণ হল এটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম উচ্চতম অঞ্চল। মহাস্তানগড়ের শেষ অংশটুকু “গড়” শব্দের অর্থ হল উচ্চথান। অর্থাৎ এই জায়গাটিকে স্বাভাবিক ভূমির চেয়ে উঁচু হিসাবে বোঝানো হয়েছে। সাধারণত ১৫-২০ মিটার উপরের অঞ্চলগুলোকে বন্যামুক্ত ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চল বলে ধরা যায়। সেই হিসাবে এখানে বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ছিল না। বসবাসের জন্য এটি একটি নিরাপদ জায়গা ছিল। এর ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৬ মিটার উঁচু, যেখানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬ মিটার উঁচু। এছাড়া এই স্থানটি বেছে নেওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে করতোয়া নদীর অবস্থান ও আকৃতি।

মহাস্থানগড় উদঘাটনের পেছনে অনেক ব্যক্তি অবদান রেখেছেন। তবে এর ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিতকরণের আগেই বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এই জায়গাটির অনেক বর্ণনা দিয়ে গেছেন। তিনি ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতবর্ষ ভ্রমণে এসেছিলেন। সেই সময়ে তিনি পুণ্ড্রনগরেও এসেছিলেন। ভ্রমণের ধারাবিবরণীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার উল্লেখ করে বর্ণনা করেন।
১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন প্রথম মহাস্থানগড়ের অবস্থান চিহ্নিত করেন। প্রখ্যাত বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯ খৃষ্টাব্দে মহাস্থান গড়ের ধ্বংসাবশেষকে সঠিকভাবে হিউয়েন সাঙ কর্তৃক বর্ণিত পুণ্ড্রনগর হিসাবে চিহ্নিত করেন। এরপরে অনেক পর্যটক এসেছেন এবং তাঁদের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করেছিলেন। ১৯২৮-১৯২৯ সালে মহাস্থানগড়ে সর্ব প্রথম প্রত্নতাত্তিক উৎখনন কার্য শুরু করা হয়। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সন্ধান মেলে ব্রাহ্মী লিপির। সেই লিপি অনুযায়ী জানা যায় পুণ্ড্রনগরের প্রাদেশিক শাসক সম্রাট অশোক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে রাজভান্ডার থেকে খাদ্যশস্য ও অর্থ সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেন। এটি প্রমাণ করে মহাস্থানগড় প্রকৃতভাবেই প্রাচীনতম নগরী।
বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য বিখ্যাত হওয়ার কারণে চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন নিয়মিতভাবে মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করার জন্যে৷ এরপর তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেখানে গিয়ে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষার বিস্তার ঘটাতেন। সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণসেন যখন গৌড়ের রাজা ছিলেন, তখন এই গড় এক অর্থে অরক্ষিত ছিল বলা যায়। কারণ মহাস্থানের রাজা ছিলেন নল, যার সাথে বিরোধ লেগে থাকত তার ভাই নীল এর। এসময় ভারতের দাক্ষিণাত্যের শ্রীক্ষেত্র নামক স্থান থেকে এক অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ এখানে অসেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে। তিনি পরশু বা কুঠার দ্বারা মাতৃহত্যার দায়ে অভিশপ্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনিই দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের অবসান ঘটান এবং নিজেই রাজা হন। এই ব্রাহ্মণের নাম ছিল রাম। ইতিহাসে তিনি পরশুরাম নামে পরিচিত। অনেকের মতে তিনি ছিলেন একজন অত্যাচারী রাজা। এই বিপথগামী রাজা পরশুরামকে উচ্ছেদ করে ইসলাম ধর্মের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আসেন ফকিরের বেষে আধ্যাত্মিক শক্তিধারী দরবেশ হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র:) এবং তার শীষ্যরা। ধর্ম প্রচারক শাহ্ সুলতান বলখী (রঃ) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তি। কথিত আছে, তিনি মহাস্থানগড় অর্থাৎ প্রাচীন পুন্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটা বিশাল মাছের আকৃতির নৌকার পিঠে চড়ে। মহাস্থানগড় পৌছে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন, প্রথমে রাজা পরশুরামের সেনাপ্রধান, মন্ত্রি এবং কিছু সাধারণ মানুষ ইসলামের বার্তা গ্রহণ করে মুসলিম হয়। এভাবে একে একে পুন্ড্রবর্ধনের মানুষ হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকলে রাজা পরশুরামের সাথে স্বাভাবিকভাবেই শাহ সুলতানের বিরোধ বাধে এবং এক সময় সুলতান বলখী পুন্ড্রবর্ধনের শেষ রাজা পরশুরামকে যুদ্ধে পরাজিত করে পুন্ড্রবর্ধন জয় করেন।

মহাস্থানগড়ে অনেক বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। বৌদ্ধ বিহারসমূহের মধ্যে আছে সোমপুর বিহার, হলুদ বিহার, ভাসু বিহার, আনন্দ বিহার, সীতাকোট বিহার।

দর্শনিয়ে স্থানসমূহের মধ্যে উল্লেখ্যযোগোঃ
১। মাজার শরীফ

২। জাদুঘর

৩। খোদার পাথর ভিটা

৪। মানকালীর ঢিবি

৫। বৈরাগীর ভিটা

৬। স্কন্ধের ধাপ

৭। গোকুল মেধ

৮। বিহার ধাপ

৯। ট্যাংরা বৌদ্ধ স্তুপ

১০। কালীদহ সাগর

১১। শীলাদেবীর ঘাট

১২। বেহুলার বাসর ঘর

১৩। পরশুরামের প্রাসাদ

১৪। জিয়ৎ কুন্ড

১৫। ভিমের জঙ্গল ইত্যাদি।

 

যারা ঘুরে আসতে চান, তারা জেনে নিতে পারেন সেখানে কিভাবে থাকবেন। বগুড়া শহরে বেশ কিছু উন্নতমানের কয়েকটি হোটেল ও মোটেল রয়েছে যা রাত্রিযাপনের জন্যে বেশ ভাল। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ্যযোগ্য – ‘সেফওয়ে মোটেল’, ‘রয়েল প্যালেস’, পর্যটন মোটেল। মাঝামাঝি ও অপেক্ষাকৃত ভাল দু’টি হোটেল ‘আকবরিয়া আবাসিক ও আল আমিন কমপ্লেক্স’। আপনারা চাইলে মহাস্থানগড়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি ছোট্ট রেস্টহাউসে বিশেষ অনুমতি নিয়েও থাকতে পারেন।

আজ এই পর্যন্তই, যদি এই লেখাটি আপনাদের ভাললাগে তাহলে সামনে আরও অনেক বিখ্যাত প্রাচীন জায়গার ইতিহাস নিয়ে হাজির হব।