বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – নবম পর্ব ( ঋজুদা)

Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – নবম পর্ব ( ঋজুদা)

ঋজুদা, অন্ধকারে ঘেরা জঙ্গলের মাঝে শিকারি টুপি মাথায় আর শক্তিশালী হান্টিং রাইফেল হাতের চরিত্রটির সাথে হয়তো রহস্য-রোমাঞ্চ প্রিয় অনেক পাঠক খুব বেশি পরিচিত নন। আত্মজীবনী বাদে বাংলা সাহিত্যে শিকারের কাহিনী কেন্দ্র করে লেখা সিরিজ আর নেই। মূলত অ্যাডভেঞ্চার নির্ভর হলেও রহস্যের হাতছানি ঋজুদার বেশিরভাগ কাহিনীতেই লক্ষ করা যায়।

বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা চরিত্র নিয়ে লেখালেখি করেছেন অনেক বরেণ্য লেখক তাদের অভিযান এবং কর্মপন্থা আলাদা হলেও তাদের মধ্যে পেশাদার শিকারি কেউ ছিলেন না। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক বুদ্ধদেব গুহ, ঋজুদা সিরিজের মাধ্যমে সেই শিকার কাহিনীই লিখেছেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় জন্ম বুদ্ধদেব গুহের। মূলত বন, অরণ্য আর প্রকৃতি বিষয়ক লেখার জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন করছেন। পূর্বভারতের বন-জঙ্গল, পশুপাখি ও বনের মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহুদিনের। প্রকৃতির টানে ঘুরে বেরিয়েছেন দেশের ভেতরে আর বাইরের বহু বন জঙ্গল। তিনি কেবল একজন কীর্তিমান লেখকই নন, সেই সাথে একজন সফল পেশাজীবী। পেশায় তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। কাজের সুবাদে বাংলাদেশের রংপুর, জয়পুরহাট এবং বরিশালে বেশ কয়েক বছর কাটান তিনি। বুদ্ধদেব গুহের প্রথম প্রকাশিত বইয়ের নাম ‘জঙ্গল মহল’। এরপর সকল বয়সের পাঠকের জন্যে বহু উপন্যাস ও গল্প লিখেছেন তিনি এবং এখনো লিখে চলেছেন।

বুদ্ধদেব গুহ মূলত সামাজিক উপন্যাসের জন্যে বিখ্যাত হলেও, ঋজুদা সিরিজের মাধ্যমেই মূলত শিশু-কিশোরদের জন্যে লেখা শুরু করেন তিনি। ১৯৭৩ সালে সিরিজের প্রথম বই ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’ প্রকাশিত হয়। কেবল সাহিত্যের চর্চায় নয় বন-জঙ্গল আর সেখানের গাছ আর প্রাণী সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান অসাধারণ। কাহিনীর মাঝে গাছপালা আর প্রাণীদের সূক্ষ্ম বিবরণগুলো পড়লে তাঁকে সাহিত্যিক থেকে বেশি জীববিজ্ঞানী বলে মনে হয়। শিকারের বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়েও লেখকের অগাধ জ্ঞান। কেবল বন্দুক বা পিস্তল লিখেই কাজ সারার লোক তিনি নন। কোন আগ্নেয়াস্ত্র কিভাবে কাজ করে, নামের আর কাজের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ঋজুদা সিরিজের কাহিনীগুলোতে। অপূর্ব লেখনী শক্তির জোরে সেইসব বিবরণকে বুদ্ধদেব গুহ এমন ভাবে গল্পের সাথে মিশিয়েছেন যে সেগুলোকে কাহিনীর অংশ বলেই মনে হয়। সফল পেশাজীবী, দক্ষ শিকারি আর কীর্তিমান লেখকই নন তাঁর প্রতিভা সঙ্গীতের জগতেও বিস্তৃত। একসময় নিজে  রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন আর পুরাতনী টপ্পা গানের বিষয়ে তিনি একজন বিশেষজ্ঞ। বুদ্ধদেব গুহের লেখা বিখ্যাত উপন্যাসের মাঝে মাধুকরী, একটু উষ্ণতার জন্যে, কোয়েলের কাছে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

লেখক বুদ্ধদেব গুহ জঙ্গলকে যেমন ভালবাসেন তেমনি বন্য প্রাণীদেরও ভালবাসেন, সেটা ঋজুদা সিরিজের কাহিনী থেকে সহজেই বোঝা যায়। গভীর সব জঙ্গলের গহীনের অসাধারণ বিবরণ পাঠকদের একেবারে নিয়ে যায় ছায়া ঘেরা গা ছমছমে শিকারের রাজ্যে। কাহিনী এগিয়ে চলে কখনো মানুষ খেকো বাঘের শিকারকে কেন্দ্র করে, আবার কখনো অন্য প্রাণীদের জন্যে হুমকি হয়ে ওঠা পাগলা হাতির নিধনে। বনের কাছে বাস করা নিম্ন আয়ের মানুষের সাদাসিধে জীবন, সেই সাথে ছায়া ঢাকা ডাকবাংলোর বিবরণ একই সাথে ভ্রমণ কাহিনী আর সেই সাথে শিকার কাহিনীর আনন্দ দেয়। এই সিরিজের আরও এক মজাদার বিষয় খাবারের বর্ণনা। সাধারণত রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের বইয়ে খাবার-দাবারের বিবরণ বেশিরভাগ লেখকই এড়িয়ে যান। কিন্তু ভোজন-রসিক লেখকের চমৎকার লেখনীর ছোঁয়ায় বইয়ের পাতা জুড়ে যেন খাবারের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। মোগলাই খাবারের বিবরণ থেকে গাছ পাঁঠার রান্নার রহস্য শিকারের কাহিনী থেকে কম রোমাঞ্চকর মনে হয় না। একজন শক্তিশালী লেখক সাধারণ কোন কাহিনীকেও কেবল মাত্র বলবার ধরনের মাধ্যমে করে তুলতে পারেন অসাধারণ।

যদিও ঋজুদা সিরিজ মূলত অ্যাডভেঞ্চার ধরনের, কিন্তু সেখানে একেবারেই যে রহস্য নেই তা কিন্তু নয়। কখনো খুনে ডাকু ধরবার জন্যে কখনো চোরা শিকারি দমনে ডাক পরে ঋজুদার। সম্ভ্রান্ত পরিবারের লুকানো রহস্য সমাধান করতেও দেখা যায় ঋজুদাকে। রহস্যের খোঁজে কেবল যে ভারতের বনেই চষে বেরিয়েছে ঋজুদা তেমনটা নয়, আফ্রিকার গহীন অরণ্য আর সুন্দরবনের মত জায়গাতেও পদচারণ রয়েছে এই বিখ্যাত শিকারি আর তার দলের।

ঋজুদা সিরিজের নাম থেকেই প্রধান চরিত্রের আঁচ পাওয়া যায়। পুরো নাম ঋজু বোস, কোলকাতার নিজের ফ্ল্যাটে একাই থাকেন। বহুদিনের সঙ্গী পুরনো ভৃত্য ছাড়া আর কেউ নেই। তার পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি বিবরণ পাওয়া যায় না, ছোট বেলা থেকে অরণ্য প্রীতি আর যুবক বয়সের শিকারের কথা কিছু কাহিনীতে উল্লেখ রয়েছে। শিকারের নেশায় এক বন থেকে অন্য বনে ঘুরে বেড়াতেন কখনো বন্ধুদের সাথে কখনো বা অনুচরদের নিয়ে। মধ্য বয়স্ক ঋজুদার বিবরণে শক্ত ধাতের একজন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে তাকে। রুচিশীল এবং প্রায় ধনী বলা চলে এই শিকারিকে। এক সময় কাঠের ব্যবসা করতেন আর অনেকগুলো কুকুর পুষতেন বলে প্রথমদিকের বইয়ে উল্লেখ থাকলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায় না। শিকারে যেমন অসাধারণ হাত তেমনি বুদ্ধির খেলাতেও ঋজুদা নিজের প্রমাণ রাখেন সুস্পষ্ট ভাবে। লেখকের নিজের ছাপ এই চরিত্রের মাঝে দেখা যায়। পুরাতন সঙ্গীতের প্রতি দুর্বলতা আর সুগন্ধি তামাকের পাইপ খাওয়া এর মাঝে উল্লেখযোগ্য।

একেবারে প্রথম অভিযান থেকে ঋজুদার সঙ্গী রুদ্র। দূরসম্পর্কের আত্মীয় সংসারের প্রতি উদাসীন ঋজুদার সাথে গুরু শিষ্য সম্পর্ক তার। ঋজুদার রহস্য ঘেরা আর উত্তেজনাপূর্ণ সব অভিযানের কাহিনী এই রুদ্রই পাঠকদের সামনে নিয়ে আসে। বয়সের তুলনায় শিকারে বেশ অভিজ্ঞ সে, এ ছাড়া লেখাপড়াতেও বেশ পারদর্শী বলেই জানা যায়। বিপদজনক মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় শিকার করবার অথবা সাংঘাতিক কোন অবস্থা থেকে সবাইকে উদ্ধার করবার মত গুন রয়েছে এই চরিত্রের।

কাহিনীর প্রয়োজনে ঋজুদার পুরনো বন্ধু অথবা স্থানীয় পরিচিত জনদের কথা উল্লেখ থাকলেও ঋজুদা এবং রুদ্রের বাইরে সিরিজের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রয়েছে। তাদের একজনের নাম তিতির, সিরিজের একমাত্র নারী চরিত্র। রুদ্রের সহপাঠী এবং ঋজুদার শিষ্য। ছোট বেলা থেকেই শিকারের অসাধারণ হাত আর সূক্ষ্ম লক্ষ্যভেদের সাথে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়ায় ঋজুদার অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী-গুলোয় তিতির চমৎকার মানিয়ে যায়। অপর চরিত্র ভটকাই রুদ্রের সহপাঠী এবং কাছের বন্ধু। অদ্ভুত এই নামের মত তার চরিত্রটিও অদ্ভুত আর মজাদার। কাহিনীর গম্ভীর আর বিষাদ পূর্ণ মুহূর্তগুলো হালকা করতে সেই সাথে একটু হাস্যরসের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভটকাই চরিত্রের বিশেষ অবদান থাকে।

গত চার দশকে ২৫টির বেশি কাহিনী লেখা হয়েছে ঋজুদা এবং তাঁর বাহিনীকে নিয়ে। প্রকাশিত হয়েছে ৫টি সমগ্র। সে কাহিনীর কোন কোনটি ঋজুদার অতীতের শিকারের স্মৃতিচারণ, কোনটা দেশের বাইরে শিকারের রোমহর্ষক কাহিনী আবার কিছু পুরোপুরি গোয়েন্দা কাহিনী। বাংলা সাহিত্যে দাদা রয়েছে অনেক। ফেলুদা, টেনিদা, ঘনাদাদের ভিড়ে নিজের আলাদা অস্তিত্ব ধরে রেখে ঋজুদা এগিয়ে চলুক তার শিকারের অভিযান নিয়ে।