আমি কারাগার থেকে বলছি।

Now Reading
আমি কারাগার থেকে বলছি।

যদিও মেয়েটা কালো, তবুও হাসিমুখে বিয়ে
করেছি। কারন বাবার পছন্দ করা ছিল। আর যাই
অমান্য করিনা কেন বাবার কোন কথা ফেলতে
পারিনা।
..
বিয়ের আগে ওকে দেখিনি। শুধু শুনেছি মেয়েটা
শ্যামলা দেখতে। বাঙালী মেয়েদের রূপ অন্যান্য
মেয়েদের তুলনায় আলাদা। তারা সুন্দর হলেও
শ্যামলা, আবার কালো হলেও শ্যামলা। আমি জানি
না আমার হবু স্ত্রী এ দুটার মধ্যে কোন পাল্লায়
আছে।
..
যাইহোক, বাসর রাতে ওকে দেখলাম। প্রতিবেশিদের
যত কানাঘুষা শুনেছি মেয়েটা দেখতে তত খারাপ
না। ওদের কাজই এরকম। কারো ভালো কিছু সহ্য
করতে পারে না। ওদের কোন কথায় কান দিলাম না।
..
বাসরের নিভু নিভু জোনাক আলোতে ওর মুখটা অনেক
সুন্দর লাগছিল। ও খেয়াল করছিল আমি ওর দিকে
অনেক্ষন তাকিয়ে আছি। সে একটু ভিত গলায়
আমাকে জিজ্ঞেস করলো এভাবে কি দেখছেন!
আমাকে ছবিতে দেখেন নি?
আমি জানতাম না কোন ছবির কথা। কেউ আমাকে
বলেনি মেয়ের বাড়ি থেকে ছবি এসেছে। আমি
ওকে বললাম আমি তোমাকে না দেখে বিয়ে
করেছি। তোমাকে আমার বাবা পছন্দ করেছেন।
সে বললো বাবা যদি না করতেন তাহলে করতেন না?
আমি না বললাম। মেয়েটা তখন আর কিছুই বললো না।
চুপ-চাপ থেকে গেল। আমিও ওর সাড়া-শব্দ না শুনে
ঘুমিয়ে পড়লাম।
..
সকালে ঘুম থেকে উঠে লঙ্কা-কান্ড হয়ে গেল।
জীবনেও কল্পনা করিনি আমার সকালটা এরকম হবে।
সোফায় বসে ছিল সে। মেয়েটা গতকাল রাতের
অপ্সরী ছিল না বরং অপ্সরী ন্যায় কোন ভূত ছিল।
আমি লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠি। সে আমাকে
সালাম দিল। আমি কোন জবাব না দিয়ে আম্মুর রুমে
গেলাম। আম্মু আমাকে রাগান্বিত দেখে বললেন কি
হয়েছে বাবা! এই সাতসকাল বেলায় এরকম মুখ
বানিয়েছিস কেন?
আমি টাস করে দরজায় লাথি দিয়ে বললাম তোমরা
আমার জীবনটাকে নিয়ে এভাবে খেলতে পারলে!
আমি কি দোষ করেছি যে আমার এরকম মেয়ে
জুটালে!! কেন!!???
..
আমার হাইস্পিড আর হাইলোডের কথায় রুমে
প্রতিধ্বনি ভাসতে লাগলো। আম্মু কিছু বলছে না।
আমি জোরে জোরে চেঁচাতে লাগলাম। আম্মু শুধু
একটাই কথা বললেন, তোর বাবা সব জানে। এটা শুনে
থমকে গেলাম। মনটা ভিষন খারাপ হয়ে গেল। মনে
হচ্ছিল বাবা আমাকে ইচ্ছে করে তালাবে ফেলে
দিয়েছেন।
..
বাবা তো অন্তত আমাকে মেয়েটার ছবির দেখাতে
পারতেন। আর মেয়ে দেখতে যাওয়ার সময় কি টিনের
চশমা লাগিয়ে গিয়েছেন যে কালো একটা
মেয়েকে আমার জন্য পছন্দ করে আসছেন!
..
মেয়েটা কালো নাহ, অনেক কালো। ছোটবেলায়
আমার নজর না লাগার জন্য মা কপালে যে টিপ
লাগিয়ে দিত ওইটার মত দেখতে কুচকুচে কালো।
একে নিয়ে কিভাবে থাকবো!
..
ভাবছি কোথাও বেরোলে পাচে কেউ জিজ্ঞেস
করবে না তো এই জঙলিটাকে কোথা থেকে নিয়ে
এসেছি! কেউ মজা করার জন্য বলবে না তো
মেয়েটা বাড়ির বউ নাকি কাজের মেয়ে!
..
আব্বুর ভুল ডিসিশনের কথা আমি ভাবছি না, আমি
ভাবছি এই কালো মেয়েটাকে নিয়ে কিভাবে
সংসার করবো! ও কালো হয়েছে, কয়েকদিন দিন পর
আমার সন্তানও কালো হবে। সব কালো হবে।
উফফফফ!!! নাহ!! এটা আমি মেনে নিতে পারবো নাহ।
যা বলার যা শুনার সব কোর্টে। আমি ডিভোর্স চাই।
..
মেয়েটা ততক্ষনে সব জেনে গেছে আমার রেগে
যাওয়ার কারনটা কি। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে
রুমে চলে গেল। ওর চেহারাটা দূর আওয়াজটাও আমার
কানে বিচ্ছিরি শুনাচ্ছিল।
..
আব্বু ঘরে হৈ চৈ শুনে ভিতরে এলেন। মনে হচ্ছিল
বাইরে কোথাও ছিলেন। আমাকে বললেন কি হয়েছে
এত আওয়াজ কিসের! আমার মুখ থেকে কোন কথা
বের হচ্ছিল না। সারা দুনিয়ার সামনে আমি যা-তা
করতে পারি কিন্তু বাবার সামনে কিছুই করতে
পারিনা। মুখ ফুটে বলতেও পারছি না কথাটা। হাত
মুষ্টিবদ্ধ ছিল। ওইগুলো খুলে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস
নিয়ে বেরিয়ে গেলাম।
..
আমি ছাদে বসে ভাবছিলাম কেন আমার সাথে
এরকমটা হল! আমি কি দেখতে খারাপ যে আমার বউও
খারাপ হবে! নাকি আমার টাকা পয়সা কম! আমার
তো সবই আছে তাহলে কেন এরকম মেয়ে আমার
কপালে জুটলো! মাথা ফেটে বেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু
কোন উত্তর পাচ্ছি না। ছাদের রেলিং এর রডে শক্ত
করে ধরে আছি। হয়ত রাগ চেপে রাখছি। ইচ্ছে
করছিল রডটা চ্যাপ্টা করে দিই। তখন হঠাৎ পিছন
থেকে আব্বুর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আব্বু ডাকছেন।
হাত নরম হয়ে গেল। রড ছেড়ে দিলাম। তাকিয়ে
দেখি রড যেভাবে ছিল সেভাবেই আছে। শুধু আমার
হাত লাল হয়ে গেছে। আর প্রচন্ড রেগে যাওয়াতে
মুখটা গরম লাগছিল।
..
আব্বুর আদেশ মেনে আব্বুর পিছন পিছন উনার রুমে
গেলাম। আম্মুর চেহারা দেখে বুঝে গেলাম উনি সব
আব্বুকে বলে দিয়েছেন। তারমানে এখন আর নাটক
করা যাবে না। যা বলার ক্লিয়ারকাট বলবো। আব্বু
নরম স্বরে বললেন,
..
-সকাল বেলা তোমার আচরনের কারনটা জানতে
পেরেছি। কেন আমি ওই মেয়ের সাথে বিয়ে
দিয়েছি এটাই জানতে চাচ্চো তো!
..
আমি মাথা নিচু করে হ্যাসূচক জবার দিলাম। আব্বু
বললেন,
..
-তার আগে আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। কেন
প্রিমাকে এক্সেপ্ট করতে পারছো না! সে কি
বিবাহিতা! নাকি সে কি ধর্ষিতা! নাকি দেখতে
কালো!!
..
আব্বুর প্রশ্ন শুনে চমকে গেলাম। এমনিতেই সহজ কিছুর
উত্তর দিতে পারিনা আর এটা তো………..। আমি
বরাবরের মত চুপ থেকে গেলাম। কিছুই বলতে
পারলাম নাহ। উনি বললেন, “মেয়েটার গায়ের রঙ না
দেখে মনটা দেখতে, মন কে ভালোবাসতে। গায়ের
রঙ তো একদিন খসে পড়ে যাবে কিন্তু মন নাহ। তাই,
আমি যা বলছি তাই করো। মেয়েটাকে নিয়ে সুখে
থাকো। আর আমি তোমার বাবা। কোন বাবা তার
ছেলের খারাপ চায় না। যেদিন বাবা হবে সেদিন
টের পাবে”।
..
আব্বুর কথা শুনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল নাহ। সব
বুঝেছি ভান করে রুমে চলে গেলাম। এসে দেখি সে
কাঁদছে। আমার মনে ওর জন্য কোন দয়া জন্মালো
নাহ। আর হবেই বা কেন! সে কে! কি হয় আমার!
ধোকা খাইয়ে বিয়ে দেয়া হয়েছে!
..
এখন আর এসব বলে লাভ নেই। কয়েকটা দিনের তো
ব্যাপার। একটু এডজাস্ট করে চলতে হবে। আমি তাকে
বললাম,
..
-তুমি এই বিয়েতে খুশি?
-আপনার কেমন লাগছে?
-বুঝতে পারছো না কেমন লাগছে!
-বুঝি। তবে আপনি যা চাইবেন তা-ই হবে।
-তা তো হবেই। শুধু কয়েকটা দিনের ব্যাপার। এই
কয়েকদিন স্বামী-স্ত্রীর মত থেকে যাই, পরে
আলাদা হয়ে যাবো।
-আলাদা বলতে?
-ডিভোর্স!
..
কথাটা যেন ওর কানে তীরের মত বিধলো। এক কান
দিয়ে ঢুকে অন্য কানে বের হল। যতক্ষন কথা বললাম
এই এতটুকু সময় ছিলল যে তার চোখে জল ছিল না।
এখন আমার কথা শুনে আবার! আমি ওসব সহ্য করতে
পারিনা। প্রচন্ড রেগে যাই। মারা-মারিও তো করা
সম্ভব নাহ। কোনরকম রাগ চেপে ধরলাম।
..
বিয়ের দু-মাস চলে গেল। আমি সোফায় ঘুমাই আর সে
বিছানায়। সকালে ওর ঘুম ভাঙার পর আমি আবার
বিছানায় চলে যাই। আব্বুর সামনে ওর সাথে ভালো
ব্যবহার করছি। অনেক যত্ন নিচ্ছি। আমার রুমে
আসলেই সব উল্টো হয়ে যায় যেন বাবার কাছে ধরা
না খাই।
..
কোন দরকার ছাড়া ওর সাথে কথা বলিনা। রুমে
যতক্ষন থাকে সবসময় বই একটা পড়ে। আর কাজ হাতে
থাকলে কাজ। আমি অফিস শেষ করে বাসায় যখন
ফিরি তখন অনেকের খাওয়া শেষ হয়ে যায়। রাত্র
১২টা পর্যন্ত আমার জন্য কে ওয়েট করবে! ঠিক তখন
সে আমার সামনে হাজির। টেবিলে সবকিছু রেখে
রুমে চলে যায়। আমার খাওয়া শেষ হলে আমি রুমে
আসলে সে বেরিয়ে যায়। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি
সে খাচ্ছে। একটা মানুষ পেলাম যে আমার কথা
ভাবে কিন্তু মানুষটা ভুল। ওর ভাবা না ভাবা নিয়ে
আমার কিছু যায় আসে নাহ। কোর্টের আলোকে
আমাদের কমপক্ষে ছয়-মাস একত্রে থাকতে হবে।
একত্রে থাকা মানে এক ছাদের নিচে আলাদা হয়ে
থাকা। তাই আমি ওকে নিয়ে বেশি মাথা ঘামাচ্ছি
না।
..
একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। চোখে অল্প জল
জমে আছে। হয়ত কোন খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। পানি
এক গ্লাস খেয়ে ঘুমোতেই যাবো তখন দেখি
বিছানায় প্রিমা নেই। ওয়াশরুমের লাইটও তো বন্ধ।
বেলকোনির দরজাও ভিতর থেকে লাগানো। তাহলে
সে গেল কোথায়! কেবল মাত্র সোফা থেকে
নামলাম তখন দেখি বিছানার ওপাশে সে নামাজ
পড়ছে। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। সেকেন্ডের
জন্য মাথায় আসছিল ও পালিয়ে গেল না তো! যাক!
এখন একটু শান্তি পেলাম। চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা
করলাম। তখন প্রিমা কি জানি বলছিল। স্পষ্ট শুনা
যাচ্ছিল না। আমি আবার উঠলাম। আস্তে আস্তে ওর
পিছনে গিয়ে দাড়ালাম যেন সে টের না পায় আমি
জেগে আছি। তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে সে
মোনাজাত করছিল…
..
“হে আল্লাহ, তুমি কেন আমাকে কালো করে
পৃথিবীতে পাঠিয়েছো! জন্মের পর মা-বাবার আদর
পাইনি। পাড়া-প্রতিবেশির লোকেরা আমায় নিয়ে
মা-বাবাকে কটাক্ষ করতে দ্বিধা করেনি।।
ভাইবোনদের কে জিজ্ঞেস করত এই কালো প্যাচা
কি তোর বোন! ওরা লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিত।
তাদের কাছে কোন উত্তর ছিল বলার।
..
স্কুলে সামনের ব্রেঞ্চে বসা আমার নিষেধ ছিল।
একা পিছনের ব্রেঞ্চে বসতে হয় যেন আমার গায়ের
রং অন্য কারোর গায়ে না লাগে। আচ্ছা, এটা কি
কোন ছোঁয়াচে রোগ! না তো! তাহলে কেউ আমার
সাথে মিশে না কেন! কথা বলতে চায় না কেন? এটা
কি আমার দোষ ছিল যে আমি কালো! টিভিতে
দেখায় ক্রিম মাখলেই মানুষ সাদা হয়ে যায়। তাহলে
আমি কেন সাদা হই না! আমি কি এতটাই কালো!!!
..
বয়সের চেয়েও দ্বিগুন বার পাত্রপক্ষ দেখতে এসে
একি কথা বলে যায় “কালা কাউয়াকে লাইটের
নিচে বসালেও দেখা যাবে না আর বিয়ে করতে
বসছে”! কালো বলে কেউ আমাকে নিতেও চাচ্ছে না
আবার নিজের কেউ রাখতেও চাচ্ছে না। আমি
কালো বলে কি আমার বেঁচে থাকাও দায় পড়বে!
..
শেষে কিভাবে জানি আমার বিয়েও ঠিক হয়ে
গেল। বড় ঘরের ছেলে, শিক্ষিত সুন্দর ছেলের সাথে
আমার বিয়ে ঠিক হল। মনে করেছিলাম হয়ত এখান
থেকেই আমার নতুন জীবন শুরু হবে। কিন্তু তা আর হল
না। ঘুটঘুটে কালো থাকার জন্যে বিয়ের পরের দিন-ই
আমার স্বামী ডিভোর্স চায়। আমার সাথে নাকি
উনাকে মানায় নাহ। উনার মত আমারো দুই-হাত, দুই-
পা, দুই-কান, দুই-চোখ, এক মাথা আছে। সবই এক তবুও
নাকি মানায় না। শুধু পার্থক্য হল উনি সুন্দর আর আমি
কুৎসিত!
..
কেন তুমি আমাকে কালো রং দিয়ে বানিয়েছো!
অন্য কোন রং দিলেই তো পারতে!
..
হয় তুমি আমাকে বদলিয়ে দাও নয় মৃত্যু দাও। এভাবে
আমি আর বাঁচতে পারবো না। তোমার দরবারে
কতবার হাত পেতেছি কিন্তু আমায় কিছইু দাওনি।
শেষ বারের মত একটা জিনিস-ই চাইবো, আমার
স্বামী যেন সুখে থাকেন। আমার কালো ছায়া যেন
উনার ওপর না পড়ে”
আমিন।
..
আমি ওর মোনাজাত শুনে দু-পায়ে দাড়ানোর শক্তি
হারিয়ে ফেলেছি। হাঁটু গেড়ে ঠাস করে নিচে
পড়লাম। সে তার পিছনের আচমকা শব্দ শুনে আঁতকে
যায়। সঙ্গে সঙ্গে পিছনে তাকায়। আমি ওর পিছনে
এভাবে পড়ে থাকবো সেটা সে কল্পনা করে নি।
ওসব কিছু না ভেবে সে আমাকে তুলে বিছানায়
শুয়ালো। আমার সারা শরীর কাঁপছে। আমি স্থির
হয়ে শুতে পারছিলাম না। আবার বসতেও পারছিলাম
না। গায়ের লোম সব দাড়িয়ে গিয়েছে।
..
এত সবের পরেও আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। সে
ছুটা-ছুটি করছে এদিক থেকে ওদিক। পাগলের মত
ওষুধ খুজছে। মনে হচ্ছে কয়েক সেকেন্ডের ভেতর
আমাকে ওষুধ না দিলে আমি মারা যাবো আর তার
আপ্রান চেষ্টা চলছে আমাকে বাঁচানোর। আমি
ওকে বললাম আমাকে পানি দাও ভিষন তৃষ্ণা
পেয়েছে। সে দৌড়ে এসে আমাকে পানি দিল।
আমি কিছুক্ষন জোরে জোরে নিশ্বাস নিলাম।
তারপর উঠে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
..
সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে বারবার আমি ওখানে
গেলাম কি করে! আমি নিশ্চুপ রইলাম আর ঘুমিয়ে
যাওয়ার ভান ধরলাম। সে মনে করেছে আমার শরীর
খারাপ আমাকে আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না তাই
আর ডাকে নি।
..
কিন্তু আমি ঘুমাতে পারিনি। চোখের দু-পাতা এক
করতে পারিনি। ওর প্রতিটা কথাগুলো কানে
বাজছে। নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হচ্ছে।
আমি কিভাবে মেয়েটাকে এত কষ্ট দিতে পারলাম!
ও তো আমার স্ত্রী! আমি কিভাবে ওর মনের কথা
বুঝতে পারলাম না! এতদিন যে আমায় ভালোবেসে
এসেছে আমি কেন তার ভালোবাসা বুঝতে পারিনি!
আমি কি সাদা-কালোর মধ্যে এতটাই অন্ধ হয়ে
গিয়েছি যে একটা মানুষকে চিনতে পারলাম না!!
..
নিজেকে অনেক ভাবে স্বান্ত্বনা দিচ্ছি কিন্তু
চোখের জল আটকাতে পারছিলাম না। হয়ত আজ এখনই
সব জল শুকিয়ে যাবে। হয়ে যাক সব মরুভুমি তবুও ওকে
আর দূরে রাখা যাবে না। যাকে দু-মাস আগে বিয়ে
করেছি , তাকে যে স্ত্রীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত
করেছি কাল সব ফিরিয়ে দিব। হ্যা কাল-ই। কাল
তাকে নতুন জীবন দিব। কালো বলে আর অবহেলা
করবো না। এতদিন যা ছিল সব ভুলে-ভরা ছিল। এখন
সবকিছু শুদ্ধ করে নতুন সকালের সূচনা করবো। এখন শুধু
সকালের অপেক্ষায়।
..
চোখটা বন্ধ করে শুয়েছিলাম যেন হাল্কা বিশ্রাম
নিয়ে উঠে যাই। কিন্তু কখন যে ঘুম লাগল টের-ই
পেলাম না। চোখ খুলে দেখি ১১টা বাজে। উঠে
দেখি সে বিছানায় নেই। আমি ওকে খুজতে রুম
থেকে বের হলাম। আম্মুকে জিজ্ঞেস করতেই
যাচ্ছিলাম ও কোথায় তখন ওকে দেখতে পাই।
কাপড়ের বালতি নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকেছে। ইচ্ছে
করছিল এখনই ওর কাছে যেতে কিন্তু না, এভাবে
যাবো না। আজকে অন্যরকম হয়ে যাবো। তাক
লাগিয়ে দেয়ার মত যাবো।
..
ঝটপট ফ্রেশ হয়ে বাইরে থেকে এক গুচ্ছ গোলাপফুল
কিনে আনলাম। কাপড় মেলতে এখন সে ছাদেই
থাকবে। তাই আর রুমে না গিয়ে ছাদে যেতে
লাগলাম। ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছি
কিভাবে শুরু করবো। ওর সামনে হঠাৎ করে এভাবে
দাড়ালে তার কি রিয়েকশন হবে! সে চমকে যাবে
তো! হ্যা, ওকে চমকানোর জন্যই তো যাচ্ছি। ভাবতেই
আমার মুখের এককোণে হাসি ফুটলো।
..
তখন হঠাৎ-ই কিছু একটা নিচে পড়ার শব্দ হল। মনে
হচ্ছিল কিছু সিঁড়ি থেকে পড়ছে। আমি মাথাটা একটু
তুলতেই প্রিমার পড়ে যাওয়াটা দেখতে পেলাম।
আমি এক পা বাড়াবার আগেই সে আমার পায়ের
কাছে এসে পড়লো। ওর নাকে-মুখে রক্ত। মাথা
অনেকটা ফেটে গেছে। আমি ওর অবস্থা দেখে
প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি তবুও ফেললাম না। হাত
থেকে ফুলগুলো পড়ে গেল। আব্বু আম্মু তারা দৌড়ে
আসলেন। আমি মুর্তির মত দাড়িয়ে থাকলাম। আব্বু
ড্রাইবারকে কল দিয়ে বের হতে বললেন। আমি
প্রিমাকে কোলে নিয়ে গাড়িতে যাই। এই প্রথম
আমি তাকে স্পর্শ করেছি। আলাদা একটা শিহরণ
আমায় ছুঁয়ে গেল। তাও ভুল সময়ে।
..
গাড়ি যত দ্রুত যাচ্ছিল ওর রক্তে আমি তত লাল হচ্ছি।
ওকে বাহুতে বসিয়ে হাত দিয়ে চেপে রক্ত বন্ধের
চেষ্টা করছি কিন্তু পারছিনা। রক্ত ওর ঝড়ছে কিন্তু
কষ্ট পাচ্ছি আমি। বুঝতে পারছিনা এ কেমন কষ্ট।
..
প্রিমার রক্তে গাড়ি যখন পুরোটা লাল হয়ে যায়
আমরা তখন হাসপাতালে পৌছলাম। ততক্ষনাৎ তাকে
ইমার্জেন্সি রুমে তাকে নেয়া হয়। আমি ছানা-মাখা
রক্তে ভিজে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসি। ভাবতেই
পারছিলাম না এরকম কিছু হবে।
..
কিছুক্ষন পর ডাক্তার এসে বললো অনেক রক্তক্ষরণ
হয়েছে ইমিডিয়েটলি ৫ ব্যাগ রক্ত লাগবে। আব্বু
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন রক্তের গ্রুপ কি।
ডাক্তার বললো বি পজেটিভ। আমি তখন বললাম
আমার রক্তের গ্রুপও বি পজেটিভ। আমি আব্বু আর
আমার ছোট ভাই কেবিনে গেলাম। ডাক্তার বললো
আমি একা এত রক্ত দিতে পারবো না। তাই আব্বু আর
ছোটভাইয়ের গ্রুপ একি থাকায় রক্ত দিলাম।
..
প্রায় ৪ ঘন্টার অপারেশনের পর ডাক্তার বের হল।
আমরা সবাই ডাক্তারের কাছে এগিয়ে গেলাম।
ডাক্তারের মুখ নিচু করা। কিছুই বলছেন না। আব্বু
ডাক্তারকে বললেন আমার বউমা কেমন আছে! কি
করছে! আম্মু জিজ্ঞেস করলেন আপনি চুপ করে
আছেন কেন কিছু বলুন! ডাক্তার তখন আব্বুর কাধে
হাত রেখে মাথা নাড়িয়ে নাসূচক ইশারা দেখালেন।
..
আমি ইশারা দেখে দাড়ানো অবস্থায় পড়ে যাই।
ভাই এসে আমাকে সামলালো। আব্বু ডাক্তারকে
বলছেন আবার বউমাকে দেখতে! ওর কিছু হয়নি, ওকে
ভালো করে চেক করুন!! আব্বু নিস্তেজ হয়ে মাটিতে
ঢলে পড়লেন। আম্মু উনাকে চেয়ারে নিয়ে বসালেন।
আমি নির্বাক হয়ে যাই। ডাক্তারের কথা আমার
বিশ্বাস হচ্ছিল না।
..
তাই আমি অটি-র ভিতর ঢুকে যাই। ওর থেতলানো
মাথায় সেলাই, নাকে ব্যান্ডেজ দেখে আমি আঁতকে
যাই। পা যেমন আমার চলতেই চাচ্ছিল না। তবুও একটু
একটু করে এগুলাম। আমি কোনদিন ওকে ওর নাম ধরে
ডাকিনি। আজ ডাকছি।
..
“প্রিমা, ও প্রিমা!”
..
সে কোম রিসপন্স করছে না। আমি ঢোক একটা গিলে
ওর হাত ধরি। হাত বুলাতে থাকি আর ডাকতে থাকি।
কিন্তু সে কোন উত্তর দিচ্ছে না। আমার চোখ জলে
ভরে যায়। কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছে
চোখের পানিতেই ডুবে গিয়েছি। শেষে আমি
জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
..
আমার যখন জ্ঞান ফিরে আমি নিজেকে একটা রুমে
আবিষ্কার করি। জ্ঞান ফিরতেই আমি প্রিমাকে
খুজতে থাকি। আর নার্স আব্বুকে খুজছে যেন বলতে
পারে আমার জ্ঞান ফিরেছে। নিজেকে অনেক
দুর্বল মনে হচ্ছিল তবুও ওকে খুজতে বের হয়েছি।
কয়েকটা নার্স আমাকে প্রায় অচেতন অবস্থায় ধরে
রাখে। মেডিসিন একটা আর তার সাথে ইঞ্জেকশন
দিল। কয়েকমিনিট দুর্বল ছিলাম তারপর শরীরে
আস্তে আস্তে একটু এনার্জি পেলাম।
..
প্রিমার লাশ নিয়ে সবাই বাসায় ফিরছিল।
চারিদিকে কান্নার আওয়াজ। হয়ত কেউ হারানোর
ব্যথায় কাঁদছে, নয়ত সে আর বেঁচে নেই তাই কাঁদছে।
কিন্তু আমি কাঁদছি কষ্টে, নিজের কষ্টে কাঁদছি।
তাকে আমি যত কষ্ট দিয়েছি সব যেন উল্টো ঘুরে
আমার বুকেই বিধছে। নিজেই নিজেকে আজ মেরে
ফেললাম।
..
কফিনে করে ওকে কবরে নিয়ে যাচ্ছি। কয়েকমাস
আগে আমি তাকে বিয়ে করে গাড়ি করে আমার
বাসায় এনেছিলাম। আর আজকে……..। সারাটা
রাস্তা আমার চোখের জলে ভিজছিল। সাথে সাথে
আবার শুকিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু চোখ থেকে ঝড়া বন্ধ
হচ্ছে না। এ কেমন শাস্তিভোগ করছি আন্দাজা-ই
নেই।
..
সাড়ে তিন ফুট মাটির নিচে যখন ওকে রাখা হল
আমার কান্নার বেগ বেড়ে গেল। আমার ইচ্ছে
করছিল যেন ওর পাশে যাই। কিন্তু মানুষেরা আটকে
রাখলো। বড় বড় বাশের ওপর যখন সবাই মাটি
ছিটিয়ে দিচ্ছিল আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছিল। ও
দূরে চলে গিয়েছে তবুও মনে হচ্ছে কেউ যেন আমার
পাশ থেকে ওকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এগুলো আমি
সহ্য করতে পারছিনা, একটুও না।
..
প্রিমা যখন প্রথমবার আমার সামনে কাঁদছিল তখন
বিচ্ছিরি লাগছিল শুনতে। এখন ইচ্ছে করছে ওর
কান্না শুনেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে। কিন্তু
ভাগ্যটা সাথে নেই। শুনেছিলাম দাঁত থাকতে দাঁতের
মর্ম দিতে হয়। আজ সেটার মানে বুঝতে পেরেছি।
..
ওকে দাফন করে যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন
রাস্তায় পুলিশ আটকালো। কিছু বুঝার আগেই ওরা
আমাকে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়।
..
যেতে যেতে বুঝতে পারলাম কেউ একজন আমার ওপর
কেস দিয়েছে। নিজের স্ত্রীকে হত্যার কেস। এটা
শুনার আগে যদি আমার কান ফেটে যেত তাহলে দুঃখ
পেতাম না।
..
গ্লাস যেভাবে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়
সেভাবে আমার ভরসাও আমাকে ছেড়ে দিল।
নিজের ওপর আর কোন নির্ভরতার আশা দেখতে
পাচ্ছি না। এরই মধ্যে আমাকে নিজের স্ত্রীর
হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হল।
..
আজ প্রায় ৪ বছর পেরিয়ে গেল। আমি কারাগারে।
পুরনো দিনের কথাগুলো মনে করছিলাম। মনে করছি
আমার প্রিমার কথা যাকে একবিন্দু ভালোবাসা
দিতে না পেরেও আজও পাগলের মত ভালোবেসে
যাচ্ছি। ও চলে যাওয়ার পর আমার যখন নতুন
কারাবাস শুরু হয়েছে তখন আমি আত্মহত্যার পথ
বেছে নিয়েছিলাম। কিন্তু পিছু নামতে হল। সে দুয়া
করেছিল আমি যেন আমি সুখে থাকি, ভালো থাকি।
তাই আজও ওকে ছাড়া ভালো থাকার চেষ্টা করছি।
মুখে তো বলছি ভালো আছি কিন্তু ভেতর থেকে
জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি মিথ্যে কথা বলতে
বলতে।
..
যে কালো মেয়েকে বলেছিলাম লাইটের নিচে
বসলেও দেখা যাবে না আজ সেই মেয়েকে চার
দেয়ালের অন্ধকার রুমের মধ্যে চেহারা দেখি। চোখ
বন্ধ করলে দু-চোখের আধারেই তার মুখ ভাসে। সব
অন্ধকার জায়গায় ওরই ছবি ফুটে উঠে। এক রুমের
মধ্যে শত বোল্টেজের আলোকসজ্জ্বায় কোন এক
অন্ধকার জায়গা যেমন বেমানান ঠিক একিভাবে
প্রিমা বেঁচে থাকতে আমার জীবন ছিল। আর ওর
মৃত্যুর পর পুরো রুম অন্ধকার শুধু ওই কোন এক জায়গায়
একটু আলো যেমন আবছা আশা দেখায় সেরকম জীবন
চলছে। হয়ত এরকমই চলতে থাকবে যতদিন না পর্যন্ত
সে আলো দিচ্ছে বা নিজে অন্ধকারে না যাচ্ছি।
..

পুরানো তিমির [৮ম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৮ম পর্ব]

ঢাকায় ফিরে, বিশ দিনের মাথায় আমি ভালো মানের একটা বাসা ঠিক করলাম।সময় করে কিছু ভালো মানের আসবাব পত্র কিনে নিলাম।কিছু কেনাকাটা বাকি আছে।সেগুলো শেষ হলেই বাবা মাকে মোটামুটি সামনের মাসে ঢাকায় নিয়ে আসা যাবে।

 

সবকিছু ভালোই এগুচ্ছিল।একদিন বিকেলে শেফা ফোন করে বলল,মা’র অবস্থা ভালো না।তিনি আশার জন্যে খুব চিন্তিত।রাতে ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকেন।আমি বিশেষ চিন্তিত হলাম না।ধীরেধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনের ভিতর কেন যেন একটা জোর পাচ্ছি।জানি না ঠিক হবে কি না।তবে মনের ভিতর আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে দোষ কি?

শেফাকে বললাম মাকে যেন ভালো মানের  ডাক্তার দেখায়।পরদিন সকালে শেফাকে ফোন করে জানতে পারলাম মাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে।শরীরের অবস্থা যে খুব বেশি ভালো এমনটা নয়।শেফা বলল,তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ডাক্তার বলেছেন,”উনাকে যে ভাবেই হোক দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে হবে।প্রেশার ঠিক রাখা জুরুরী।রাতে যেন ভালো ঘুম হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।“

 

দিন কয়েক পরে শেফা জানালো মায়ের অবস্থা খুব বেশি খারাপ।ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি।একটা ক্লিনিকে ভর্তি করান হয়েছে।আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের কাছে গেলাম।আমি যখন পৌঁছাই মা তখন ঘুমাচ্ছিলেন।আমি মায়ের মাথার কাছে গিয়ে বসলাম।কিছুক্ষণ পর মা প্রলাপ বকতে শুরু করলেন……”আহাদ…বাবা আহাদ,আশাকে মেরে ফেলবে,জলদি যা,ওকে বাঁচা…”

আমি চুপচাপ মায়ের কপালে হাত রেখে বসে আছি।

আরও কিছুক্ষণ পর…”আশা…আশা,আমি কাল পায়স রাঁধব,চলে আসিস।“

তারপর আবার নিরবতা।ঘড়ির কাটায় কিছু পার হল।আবার প্রলাপ, “দরজাটা কেউ খুলতো,আশা এসেছে।মেয়েটা কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে! কেউ গিয়ে দরজাটা খুল…”

 

আমি আর মায়ের কাছে বসে থাকতে পারলাম না।উঠে চলে এলাম বারান্দায়।বারান্দায় এসে দেখি,শেফা এক কোণায় বসে মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে।

“কি হয়েছে শেফা! কাঁদছিস কেন?”

আমি কাছে যেতে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, “আহাদ রে…মা তো মনে হয়……’

“কি সব যা তা বকছিস! ডাক্তার ঔষধ দিচ্ছেন।সব ঠিক হয়ে যাবে।“

আশার কান্না বন্ধ হচ্ছে না।মুখে হাত চেপে আরও কিছুক্ষণ কাঁদলো সে।তার কান্না দেখে আমারও কেমন চোখ ভার ভার লাগছে।আমার পক্ষে আর এখানে থাকা সম্ভব নয়।।আমি ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে নেমে এলাম পথে।বাইরে ভীষণ কড়া রোদ।গা পুড়ে যাচ্ছে।এমন মধ্য দুপুরে আমি সোজা হাটা দিলাম।আমিও যেন ঘোরে ডুবে যাচ্ছি।এমন কড়া রোদ আমার অনুভূতিতেই লাগছে না।কি করছি বা কি করব কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না।

 

বাইরে খনিক ঘুরাঘুরি করে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।এসে দেখি মা জেগে উঠেছেন।খাবার খাচ্ছেন।মাকে এখন বেশ সুস্থ লাগছে দেখে আমি একটু স্বস্তি পেলাম।মার পাশে বাবাও বসে আছেন।শেফা এখন আর কান্না করছে না।বেশ চঞ্চল হয়েছে।আমরা সবাই যখন মা সুস্থ হয়ে গেছে ভেবে খুশি,মা আমাকে ডেকে তখন বললেন, “আহাদ তোর অফিস নেই?এখানে কেন এসেছিস?”

“তোমাকে দেখতে এসেছি।“

“আমাকে দেখার কি আছে?সেদিনই না বাসা থেকে গেলি।এত ঘন ঘন দেখতে আসার কি আছে!”

“তুমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে মা।তাই তোমাকে দেখতে এলাম।“

“কে বলল আমি অসুস্থ?এসব এদের বাপ মেয়ের চালাকি সব।আমাকে খামোখা এখানে এনে শুইয়ে রেখেছে! তুই চলে যা।“

আমি একটু ধাক্কা খেলাম।মা আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন বুঝতে পারছি না।হয়ত আমার উপর খুব রেগে আছেন।আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, ‘কেন মা,আমি আসাতে তুমি খুশি হও নি?”

“না হই নি।তুই থাকলে আশা আসতে পারে না।ও লজ্জা পায়।মেয়েটা ভীষণ লাজুক।অনেকদিন তো আমার কাছে ছিলি,এবার কাজে যা,অফিস কর।আমি মেয়েটাকে অনেক দিন দেখি না।“

 

মায়ের কথা শুনে শেফা যেন মূর্ছা খেল।আঁচলে মুখ চেপে পাশের ঘরে চলে গেল সে।বাবাও উঠে চলে গেলেন নিঃশব্দে।আমি নির্বাক মুখে বোকার মত চেয়ে আছি।মা কেমন অদ্ভূত আচরণ করছেন।তবে কি শেফা যা বলেছে তাই ঠিক? মার কি সত্যি সত্যি মাথা খারাপ হচ্ছে!

 

চারদিকে অসহায়ের মত কোন উপায় না পেয়ে,সন্ধ্যা বেলায় বেরিয়ে পড়লাম আশার খোঁজে।মাকে শান্ত করতে হলে মেয়েটাকে খুব দরকার।আশার বাসায় গিয়ে দেখলাম দরজায় তালা দেয়া।আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তারা অনেকদিন বাসায় আসে নি।আমি মনে মনে ধারনা করলাম তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে গেছে।গ্রামের বাড়ির ঠিকানা আমার জানা নেই।আশপাশের কেউই তাদের ঠিকানা জানে না।যে ভাবেই হোক ঠিকানাটা যোগার কতে হবে।মেয়েটা কে খুঁজে বের করতেই হবে।

 

অনেক রাত পর্যন্ত আমি বাইরে ছিলাম।ঠিকানাটা যোগার করার অনেক চেষ্টা করেছি।পারি নি।শেষমেশ ব্যর্থ সৈনিকের মত ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা তখনও জেগে ছিলেন।বাবা বারান্দায় বসে আছেন শেফার দুই বছরের বাচ্চা কে কোলে নিয়ে।আমি ঢুকতেই মা বললেন,”তুই এখনো যাস নি!”

“তুমি আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছ মা?আমার চেয়েও ঐ মেয়েটা তোমার কাছে বেশি আপন হয়ে গেল?”

“তাড়িয়ে দিচ্ছি কোথায়?অনেক দিন তো আমার কাছে ছিলি।কিছুদিন অফিস করে আবার আসবি।এখন চলে যা।আশা প্রতিদিন দরজায় এসে,তুই আছিস জেনে ফিরে যায়।আসতে পারে না লজ্জায়।“

“মেয়েটা এখানে আবার কখন এলো?আমরা কেউ তো তাকে দেখি নি।“

“তোরা দেখবি কোত্থেকে?ও রোজই আসে।“

 

পরক্ষপণেই আমার মনে পড়লো,আমি  তো মেয়েটাকে চিনি না।কখনো দেখিও নি।সে এখানে আসলেও আমি বুঝতে পারব না।আমি শেফা কে বাবার কাছে পাঠালাম।বাবা মেয়েটা কে চিনে,মেয়েটা এখানে আসলে বাবা নিশ্চয় জানবেন।

শেফা বাবার কাছ থেকে ফিরে এসে জানালো,বাবাও মেয়েটাকে এখানে আসতে দেখেন নি।

ডাক্তার কে বিষয়টা জানালাম।তিনি বললেন মার হেলুসিনেশন হচ্ছে।

শেফা আরও ভয় পেয়ে গেল।আমার হাত চেপে ধরে বলল,”আহাদ…মার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে যাবে না তো!”

“আরে দূর…এসব কি বলছিস?চিন্তায় থাকলে সবারই এমন কম বেশি হয়।“

 

শেফাকে সান্ত্বনা দিয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম।কিন্তু আমি যেন নিজেই সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছি না।চোখের পাতায় এক ফোঁটা ঘুমও আসছে না।মার কি সত্যিই হেলুসিনেশন হচ্ছে? না কি মেয়েটি মায়ের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখছে! মেয়েটার উদ্দেশ্য কি!

পুরানো তিমির [৩য় পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৩য় পর্ব]

তারপর আর বেশি কিছু হয় নি।দিন যেতে যেতে সময়ের সাথে মাও প্রায় ভুলে গেছেন ব্যাপারটা।দিন

কয়েক পরে আগের মতই স্বাভাভিক জীবন যাপন করছি আমরা।আমি আগ বাড়িয়ে কখনো কথা তুলি

নি।নিজ থেকে চাইতাম কথাটা ডুবে যাক।মাও যেন কথাটা ভুলে যান একেবারে।কারণ

এই বিষয়ে মায়ের সাথে যত বেশি কথা বলব,মায়ের মনে তত বেশি কথাটা ঘুরতে থাকবে।বারবার মনে পড়বে।জানি না মাস খানেকের পরিচয়ে একটা মানুষ অন্য একটা মানুষের কতটা আপন হতে পারে! তবে এই কয়দিনে মায়ের যে অদ্ভুত আচরণ দেখলাম,তাতে আমি হতবাক।কোথাকার কোন মেয়ের জন্যে নাওয়া খাওয়া,ঘুম সব কিছুর কথা ভুলে গেছেন।চিন্তায় অস্থির হয়ে প্রেসার বাড়িয়ে ফেলেছেন অনেকক্ষাণি।পরে ডাক্তার এনে কড়া ঘুমের ঔষধ দিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখলাম কিছুদিন।আদ্ভুত……পৃথিবীতে অবাক হওয়ার জন্যে কত কিছুই না ঘটে আমাদের চারপাশে।

কিছু কিছু মানুষের অসম্ভব ক্ষমতা থাকে মানুষকে আপন করে নেয়ার।এই ধরনের মানুষ খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারে।মেয়াটারও মনে হয় এমন কিছু ক্ষমতা আছে।অল্পদিনেই মায়ের খুব আপন লোক বনে গেল।এর পেছনে খারাপ বা ভালো কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে এটা নিয়ে এখন আর ভাবি না।যে চলে গেছে তাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করে লাভ কি!

 

মানুষের স্বভাব হচ্ছে সে নতুন কিছু শুনতে পেলে পুরো ঘটনা জানতে চায়।কৌতুহলি হয়ে উঠে।আমি মনের ভিতর কখনো এমন কৌতুহল বোধ করি নি।এই বাংলাদেশের মেয়েরা প্রতিনিয়ত স্বামীর হাতে কেন নির্যাতিত হয় সেটা আর নতুন করে জানার মত কোন বিষয় নয়।ঘুরেফিরে সেই দু’চারটা ব্যাপার।স্বামী নেশাখোর,মাতাল কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অবিশ্বাস,সন্দেহ,পরকীয়া সংক্রান্ত কিছু অথবা যৌতুক,টাকা পয়সার ব্যাপার।এই তো।আর বাইরে আর কি? মেয়েটাও নিশ্চয় এই কারণ গুলোর মধ্যে যে কোন একটির সমস্যায় ভুগছে।

তবে,একটা বিষয় রহস্য থেকেই যায়।মেয়েটা হঠাৎ করে উদাও হবে কোথায়? হতে পারে তার স্বামীর অন্য জায়গায় পোস্টিং হয়েছে।অথবা অন্য কোথাও ভালো চাকরি পেয়ে আগের চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।কিংবা অন্যকিছু।বাসা বদলের এমন হাজার কারণ থাকতে পারে।সেটা বিষয় নয়।আমার কাছে অবাক লাগে এই ভেবে যে,মেয়েটা যাওয়ার আগে মাকে একবার বলেও গেল না! যার সাথে এত ভাব জমে গেল,তাকে না জানিয়ে,শেষ বিদায় না নিয়ে এভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল! কেন?

 

বেশ কয়েক মাস আমাদের বেশ ভালোই চলছে।আমি নিয়মিত অফিস করছি,বাড়ি যাচ্ছি,বাবা মাও বেশ সুস্থ আছেন।সবকিছু ঠিকঠাক।আতঙ্কে থাকার মত কিছুই নেই।সহজ ভাষায় বলতে গেলে আমরা এখন সুখী।

একদিন ভোর বেলা।এত সকালে আমি ঘুম থেকে উঠি না।সেদিন উঠলাম মায়ের ফোন পেয়ে।

“হ্যালো মা……কেমন আছ? এত সকালে…কোন সমস্যা হয়েছে?”

আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম।অসময়ে হঠাৎ মায়ের ফোন পেয়ে ভাবলাম কি না কি হল! মা অত্যন্ত সহজ গলায় বললেন,

“কিছু হয় নি।তুই ভালো আছিস? এখনো ঘুম থেকে উঠিস নি?অফিস নেই আজ?”

“আছে,এই তো কিছুক্ষণ পর উঠবো।“

তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা।একটু পরে মা আমতা আমতা করে বললেন,“শুনেছিস আহাদ,আশা ফিরে এসেছে…!”

মায়ের কথা শুনে একটা শীতল প্রবাহ বয়ে গেল আমার মেরুদন্ড বরাবর।কিছুক্ষণ বিস্ময়ে মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না আমার।মায়ের গলা এখন পুরো কিশোরীদের মত।তাঁর খুশি,উচ্ছ্বাস,কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তাঁর বয়স পনের কি ষোল বছর।

“কি রে আহাদ! চুপ করে আছিস কেন? কিছু বলছিস না যে?”

“এমনি।মেয়েটা ফিরে এসেছে ভালোই হল।তোমার চিন্তা দূর হল।“

কথা শেষ করে আমি হাসলাম।মিছে হাসি।মাকে খুশি করার জন্যে ভাব ধরলাম,মেয়েটা ফিরে আসাতে আমিও খুব খুশি হয়েছি।

মনে মনে আমি হতাশ।যতটা না হতাশ তাঁর চেয়ে বেশি রাগ উঠছে আমার।ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে এখনি গিয়ে আবার এলাকা থেকে বের করে দিই।এতদিন আমরা কি সুন্দর সুখে ছিলাম।মেয়েটা আবার কোত্থেকে ফিরে এসে উটকো ঝামেলার মত জট পাকাল।মাকে নিয়ে আমার ভয় শুরু হচ্ছে আবার।মেয়েটা তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করবে সারারাত আর মা এই নিয়ে রাত জাগবেন।বিষয়টা নিশ্চয় আমার জন্যে সুখকর নয়।

ফোনে কথা আর বাড়ালাম না।ঘটনার বিস্তারিত ফোনে শুনতে ভালো লাগছে না।বাড়ি গিয়ে মা’র কাছ থেকে সরাসরি শুনবো।বাবার শরীরের খবর জেনে ফোন রেখে দিলাম।

তার ঘন্টা খানেক পর,সিনিয়র অফিসার কে ফোন করে ছুটি নিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির পথে।

 

বাড়ি ফিরে মার মুখে বিস্তারিত যা শুনলাম তা এই রকম___মেয়েটা গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল।যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মেয়েটার স্বামীর একটা পা,আর হাতের কব্জি ভেঙ্গে গেছে।একটা ট্রাকের সাথে নাকি তাদের বাস মুখোমুখি সংঘর্ষে লেগেছিল।একমাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তার স্বামীকে।বুঝতে পারছি দুর্ঘটনা বড় ধরনের ছিল।কিন্তু ঘটনা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।পুরো ঘটনায় শুধু মেয়েটার স্বামীর কথাই শুনলাম,এত বড় দুর্ঘটনায় মেয়েটার কিছুই হল না?

মাকে জিজ্ঞেস করলাম,”মা,মেয়েটার কিছু হয় নি?”

মা এক মুহূর্তের জন্যে চুপ মেরে গেলেন।তারপর বললেন,”ওর কিছু হয়েছে কি না তা তো বলে নি।“

“কপালে,হাতে বা অন্য কোথাও কাটা-ছেরা দাগ দেখনি?”

মা চুপ করে মনে করার চেষ্টা করলেন,“না,এমন কিছু তো চোখে পড়ে নি।“

“এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল,অথচ মেয়েটার কিছু হয় নি,বিষয়টা কেমন না মা?”

“কেমন হতে যাবে কেন! হয়ত মেয়েটা বলতে ভুলে গেছে।আমিও তো জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি।“ মা রেগে গেলেন, “আর দুর্ঘটনায় গাড়ির সবাই তো আহত হয় না।“

“তা হয় না,ঠিক।কিন্তু সামান্য চোট তো পাওয়য়ার কথা।তার পাশের জনের পা ভেঙ্গে গেল আর সে সামান্য চোটও পেল না?”

“পেয়েছে নিশ্চয়।ওর স্বামী বেশি আঘাত পেয়েছে,সে কথা বলতে বলতে নিজের কথা বলতে ভুলে গেছে।“

 

আমি আর কথা বাড়াই নিই।মেয়েটাকে বেশি সন্দেহ করলে মা বড় ধরনের কষ্ট পাবেন।

তাই হিসাব নিকাশ সব কিছু মনের ভেতরই জমা রাখছি।কোথাও একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।সাথে মনের ভিতর কিছুটা ভয়ও ঘনীভূত হচ্ছে।এই মেয়েটার উদ্দেশ্য কি?