২০১৬ সালের ব্যবসা সফল সিনেমা . . .( পর্ব – ১ )

Now Reading
২০১৬ সালের ব্যবসা সফল সিনেমা . . .( পর্ব – ১ )

লাগ ভেল্কি লাগ ভেল্কি

আয়নাবাজির ভেল্কি লাগ।

সত্যিই যেন আয়নাবাজির ভেল্কির মত আমাদের দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছে। অল্প কয়েক দিনেই দেশের চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়ানো শুরু করেছে। কিন্তু এর পিছনে আসলে কি রয়েছে? কিভাবে ঘটল দেশের চলচ্চিত্রে এমন আমূল পরিবর্তন? কিছুদিন আগেও দেশের চলচ্চিত্র গুলো নিয়ে দেশের মানুষের নাক ছিটকানো অবস্থা ছিল। সিনেমা হল গুলোতে কেউ ছবি দেখতে তো যেতই না এমনকি দেশের মানুষই ছবি নিয়ে অনেক অনেক বাজে মন্তব্য করত।

বাংলাদেশের পুরোনো দিনের ছবিগুলো দেশের সম্পদ হয়ে ছিল এতদিন। রাজ্জাক, আলমগীর, শাবানা, মৌসুমি তারা আমাদের যে সব ঐতিহ্যপূর্ণ চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে গিয়েছিল সেই ঐতিহ্য আমরা অনেক আগেই হারিয়েছি। দেশের চলচ্চিত্রে স্থান নিয়েছিল নোংরামি, অসভ্যতা, অপসংস্কৃতি। তেমনি ছবিগুলো ছিল খুবই বাজে কোয়ালিটির। আমি বাজে কোয়ালিটি বলতে ছবিতে ব্যবহৃত ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় গুলোকে বুঝাচ্ছি। তবে চলচ্চিত্র জগতে অসাধারণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় ২০১৬ সালের কিছু ব্যবসা সফল ছিনেমা গুলোতে। যেগুলো বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব দরবারে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

অসাধারণ গল্প নিয়ে তৈরি ছবি গুলো সব ধরণের গুণাবলির দিক দিয়ে ছিল সয়ংসম্পূর্ণ। স্টোরি টেলিং, ক্যামেরা, সাউন্ড, অভিনয় থেকে শুরু করে গ্রাফিক্স সবই ছিল যেন অসাধারণ। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে দেশের চলচ্চিত্র জগত। ‘আয়নাবাজি’ দেখে কারোর মন ভরে নি, ‘মুসাফির’ দেখে কেউ উপভোগ করে নি, ‘আইসক্রিম’ দেখে কেউ রোমাঞ্চ পায় নি, ‘শিকারি’ দেখে কেউ বলে নি অভিনয় ভালো হয় নি, ‘অজ্ঞাতনামা’ দেখে কারোর মন কাঁদে নি এমন হয়ত কোথাও শোনা যায় নি। ২০১৬ সালকে দেশের চলচ্চিত্র জগতের উন্নতির স্বর্ণযুগ বলা যেতেই পারে। আর কেউ বলুক বা নাই বলুক আমার মতে ২০১৬ সাল দেশের চলচ্চিত্রের মোড় পাল্টে দিয়েছে। সেই সাথে দেশের সিনেমা হল গুলোর ও কদর বেড়েছে। এখন মানুষ সিনেমা হলে স্ব-পরিবারে গিয়ে সিনেমা দেখে আসছে। যা কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে দুঃস্বপ্ন ছিল। ঠিক এমন করেই যখন পাল্টে গিয়েছে দেশের চলচ্চিত্র তখন সেই সব চলচ্চিত্র নিয়ে কথা না বললেই নয়। কথা বলব সেই সব ব্যবসা সফল ও অসাধারণ গল্প নিয়ে গড়া চলচ্চিত্র নিয়ে।

আয়নাবাজিঃ

গল্প ও অভিনয়ের দিক থেকে আমি আয়নাবাজি ছবি টিকে রেখেছি এক নাম্বারে। তবে ছবিটি অনেক প্রশংসা, পুরস্কার কুড়ানোর সাথে সাথে হয়েছে ব্যবসা সফল। অমিতাভ রেজা চৌধুরীর প্রথম ছবি হিসেবে ছবিটি এতটা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল হবে তা আশাতীত ছিল। ২০১৬-র ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়ার তিন সপ্তাহের মাথায় ছবিটি আয় করে ২১.৩ মিলিয়ন বাংলাদেশী টাকা। যা পূর্ববর্তী প্রায় সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। ছবিটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে চঞ্চল চৌধুরী, মাসুমা নাবিলা, পার্থ বড়ুয়া। IDMb তে ৯.৬ রেটিং পেয়ে শিকারির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমা আয়নাবাজি। প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে অমিতাভ রেজার এই ছবিতে মোট আয় ১৪০ মিলিয়ন টাকা।

ছবির মূল কাহিনী আয়না নামের একজন মানুষকে নিয়ে। যে কিনা অভিনয় নিয়ে জীবনে অনেক সংগ্রাম করে। কিন্তু অভিনয়ের মাধ্যমে কর্মজীবনে সফল হতে পারে নি। আয়নার মায়ের মৃত্যু, অভিনয়ের অসাধারণ মেধার স্বীকৃতি না পেয়ে পরবর্তীতে সে বাস্তব জীবনে অভিনয়কে প্রয়োগ করতে শুরু করে। আয়না চরিত্রে অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী। অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে যে কোন মানুষের রূপ দিতে পারে আয়না। এভাবেই সে সমাজের নানা ধরণের অসংগতিকে আইনের বেড়া জালের বাইরে রাখে। এছাড়াও ছবিটির মূলে ছিল ঢাকা শহরের কিছু রাজনৈতিক অন্ধকার চিত্র। যা অমিতাভ রেজা অসাধারণ ভাবে ছবিটিতে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ক্ষমতাবান মানুষ তাদের টাকার ক্ষমতায় কিভাবে আইনকে কিনে নেয় এবং আইনের চোখে ধুলা দেয় সেটাই এই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে।

অজ্ঞাত নামাঃ

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পরিবেশিত চলচ্চিত্রটির পরিচালক তৌকির আহমেদ। ছবিটি ব্যবসা সফল না হলেও হয়েছে অ্যাওয়ার্ড সফল। ছবিটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে মোশারফ করিম, নিপুণ আক্তার, ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ। ছবিটি সারা বাংলাদেশে মুক্তি পায় ২০১৬ সালের ১৯ আগস্ট। ট্রাজিক ধর্মী ছবিটির মূল গল্প বেনামী প্রবাসীর কফিন-বন্দি লাশ নিয়ে। একটি গ্রাম্য পরিবারের কফিনটি আবেগের গল্প এ ছবিটিতে রূপ দেয়া হয়। সাথে রয়েছে ছেলে হারানো বাবার আর্তনাদ। ছবিটি শুরুর প্রথম দিকে অনেকটা কমেডি থাকলেও, ধীরে ধীরে মূল কাহিনী দৃষ্টি গোচর হয়। অসাধারণ গল্প শৈলী নিয়ে তৈকির আহমেদ ছবিটি তৈরির মাধ্যমে ২০১৬ সালে আবারো চলচ্চিত্র জগতে আলোচিত হন। ছবিটির কাহিনী ধারা ও অভিনয় ছিল সত্যি প্রশংসা পাওয়ার মত। ইতালীর কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনয়ন পাওয়া সহ মোট ১৫ টি চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এই চলচ্চিত্রটি।

আইসক্রিমঃ

ত্রিকোণ প্রেমের অসাধারণ গল্পের চলচ্চিত্র এটি। ছবিটির পরিচালক দেশের অন্যতম সফল ও নামকরা পরিচালক রেদোয়ান রনি। তরুণ ও নতুন অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে রেদোয়ান রনির ছবিটি ব্যবসা সফল হয়। ছবিটি মূলত তরুণদেরকে আকর্ষণ করে। ফলে সিনেমা হল গুলোর পাশাপাশি রেদোয়ান রনির পুরো টাকা সুদে আসলে উসুল হয়। পুরোপুরি নতুনদের নিয়ে ছবি করে ব্যবসা সফল হওয়া সত্যি অবাক করার মত। ছবিটি গোটা বাংলাদেশে মুক্তি পায় গত বছর ২৯শে এপ্রিল। তরুণ অভিনয় শিল্পী উদয়, রাজ, তুষীর পাশাপাশি ছিল ওমর সানী, দিতি ও এটিএম শামসুজ্জামান।

চলবে . . .