আমরা মারাত্মক আধুনিক

Now Reading
আমরা মারাত্মক আধুনিক

সেদিন দিয়া বাড়ি ঘুরতে গিয়ে দেখলাম ভদ্র পোশাক পরা একজন মহিলা বিপুল উতসাহিত হয়ে রাস্তার মাঝে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। ঘটনা বুঝতে একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম উনার সাথে ২-৩ জন চেলা পেলা হাতে “ডস্লার” নামক দামী বস্তু নিয়ে মোছড়া মুছড়ি করছেন। আর বুঝতে বাকি রইলো না ভদ্রমহিলার ফেসবুকের কভার পিক শেষ হতে চলেছে, উনার নতুন ছবি দরকার। এজন্য রাস্তায় শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। রাস্তায় শুয়ে বসে হামাগড়ি দিয়ে ছবি তোলা বর্তমান প্রজন্মের মারাত্মক আধুনিক একটি রীতি। আধুনিক আরো অনেক মজার মজার রীতি আছে আমাদের, যেমন আব্বাজান বিদেশ থেকে পানির বোতল আর মৌজা এনেছেন, ইমিডিয়েটলি ফেসবুকে লাইভ এ এসে পড়তে হবে। লাইভ এ এসে কন্ঠ যতটুকু সম্ভব চিকন করে বলতে হবে যে এই পানির বোতল জাতীয় বস্তুটি বিদেশ থেকে কেনা..

কোনো ছেলের হাতে “ডস্লার” দেখলেই মেয়ে কাত হয়ে যাবে, কারন এই ছেলেটি ই পারে তার ছবি তুলে ফেসবুকে তার ফলোয়ার বাড়িয়ে দিতে..

আগে মানুষ কিছু টাকা জমিয়ে রেস্টুরেন্ট এ যেতো ভালো খাওয়া-দাওয়া করার জন্য,কিন্ত এখন খাওয়ার আগে প্রধান দায়িত্ব সে কি খাচ্ছে তার ছবি তোলা & যত দ্রুত সম্ভব ফেসবুকে চেক ইন দেয়া।

এই ফেসবুকের জ্বালায় আমার নিজের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।

একবার আমরা ৩ বান্ধবীরা পরিকল্পনা করলাম সারাদিন একসাথে থাকবো,সারাদিন ৩ জন মিলে রান্না করবো খাবো, খাওয়ার পর ঘুরতে যাবো। খুব খুশিতে সেজেগুজে গেলাম। যাওয়ার পর পর ই বাছাবাছি শুরু হলো, কার ক্যামেরা সবচেয়ে স্ট্রং। ক্যামেরা বাছা শেষ হলো। বসলো মেকাপ বক্স নিয়ে,ছবি তুলে ফেসবুকে দিবে.. খুব সুন্দর দেখাতে হবে কিন্তু….

আচ্ছা ভাবলাম এতদিন পর একসাথে,, স্মৃতি ধরে রাখার জন্যেও কয়েকটা ছবি তুলা লাগে..

ছবি তোলা শুরু হলো.. হায়রে, ৪-৫ ঘন্টা মনে হয় একসাথে ছিলাম, তার মধ্যে ৪.৫ ঘন্টা শুধু সেল্ফি তোলা হয়েছে, বিরক্ত হয়ে বাসায় আসলাম,

দেখলাম তারা ছবি আপ্লোড দিয়েছেন… “ওয়াও!! ওই হ্যাড সো মাছ ফান টুডে”!!!!

মাথায় রক্ত উঠে গেলো, ওই শালারা ফান কখন করলি? ছবি তুলেও তো কুলাইতে পারলিনা.. উত্তর দিলো এটাই মজা,তুমি বুঝবানা… আচ্ছা আসলেই কি তাই? এটাই কি মজা? আমি মনে হয় তাহলে এবনরমাল,কারন এই যুগের ফান গুলা ধরতে পারিনা আমি.. হয়তো আমার ব্রেইন এর ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে কম আছে,আমি বুঝিনা।

আমি বুঝিনা কিভাবে খোলা মাঠে খেলতে না গিয়ে ছবি আপ্লোড দেয়াতে বেশী আনন্দ কাজ করে… এগুলা তো ভালো কথা, বর্তমান যুগের আরেক আধুনিকতা হচ্ছে কথায় কথায় এডাল্ট ফান করা. না আমার এডাল্ট ফান ভালো লাগেনা.. বন্ধু-বান্ধবিরা মিলে মজা করার সময় অসংখ্য মজার কাজ করা যায়, তাই বলে কথায় কথায় স্ল্যাং ব্যাবহার করলেই তা আধুনিকতা হয়ে যায় কিনা আমার জানা নেই, হয়তো জানতে চাই ও না। দিনে ৫০ বার নিজের ছবি আপ্লোড করে যদি এটেনশন পাওয়ার মাধ্যমে কেউ সুখ খুজে পায় তাহলে আমি হয়তো এবনরমাল, কারন এসবের মধ্যে আমি সুখ খুজে পাইনা.. কি পেয়েছি এই আধুনিকতায় আমরা? মুল্যবান জিনিস গুলো কি হারিয়ে যায় নি? আজকাল কার তরুন-তরুনী এমন কি কিশোর-কিশোরী দের কাছে “Love” আর “Breakup” শব্দ গুলি অতিমাত্রায় সহজ হয়ে ওঠেছে.. ইচ্ছে হলো প্রেম করছে, একজন আরেকজন কে স্পর্শ করছে,ইচ্ছে হলো ছেরে দিচ্ছে, আরেকজনের কাছে চলে যাচ্ছে…

সত্যিকারের ভালোবাসা কি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছেনা? আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠছে মানুষ মারাত্মক ভাবে। উগ্র-অশ্লীল ভাবে চলাকে ভাবছে স্মার্টনেস, আর ভদ্র ভাবে যে চলছে তাকে বলছে ক্ষেত, আন্সমার্ট..

ভালো মানুষ কে বাধ্য করছে যুগের সাথে তাল মিলানোর জন্য। কিন্তু সঠিক এবং হালাল নিয়ম তো সারাজিবন এক ই থাকবে। এর পরিবর্তন হবেনা। যুগ বদলালেও নিয়ম বদলাবেনা..

বাংলাদেশের মানুষ আমরা, ফ্রেন্ডস বলে একজন ছেলে কি একটা মেয়েকে জড়ায় ধরতে পারে? মেয়েটার কি একটু খারাপ লাগেনা? আমি বুঝিনা এসব, আমার হয়তো মাথা মোটা।

আমি নিজে দেখেছি দোস্ত দোস্ত বলে মেয়েটা ছেলেটা টাকে ইচ্ছামত জাপ্টে ধরছে,ছেলেটাও দোস্ত বলে গড়িয়ে পরছে মেয়েটার ওপর।

এটা ফ্রেন্ডশিপ?

একদিন একটি ইসলামিক লেকচার শুনছিলাম, যেখানে একজন বিখ্যাত আলেম কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো আপনাদের ধর্মে ছেলে মেয়ে সেপারেট রাখার লজিক টা কি?

তিনি বলেছিলেন, যেনো আপনি রাস্তায় বেপর্দায় থাকা একটি সুন্দরি মেয়েকে দেখে নিজের

ওয়াইফ এর সাথে তুলনা করে আফসোস না করেন।

আরেকটা বিষয় এখন খুব জ্বালাচ্ছে, তা হলো প্র‍্যাংক..

যেকোনো কিছু নিয়ে প্র‍্যাংক করা..অর্থাৎ কাউকে বোকা বানানো.. ছোটখাটো মজা চলেই, কিন্তু সিরিয়াস ভাবে যখন কাউকে প্র‍্যাংক করে বসে তখন সিচুয়েশন টা কি হতে পারে? মানুষ টি অসুস্থ হয়ে যেতে পারে।

একজন মানুষ এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পরে আছে মানুষ তাকে হাসপাতাল নিবেনা, তার সাথে ২ টা সেল্ফি তুলে আপলোড দিবে.. “#গরীব মানুষ।“

এটা আধুনিকতা? এই কি অবস্থা? কারো কোনো সম্মান নেই, এক জনের ওয়াল থেকে ছবি নিয়ে বাজে ক্যাপশন দিয়ে আরেকটি পাব্লিক গ্রুপে দিয়ে দিচ্ছেন কেউ.. এটা কি এখন কার স্টাইল? সভ্যতা? নাকি আধুনিকতা?

সভ্যতা কিন্তু সবসময় আগাতে থাকে পেছায় না.. কিন্তু এক্স্যাক্টলি কোন দিকে সভ্যতা আগাবে তা কিন্তু নির্ধারন করে সাধারন মানুষ। আমরা যদি সভ্যতার অর্থ ধরে নেই ফেসবুকে ফলোয়ার এর সংখ্যা বাড়ানোই মূল উদ্দেশ্য, তাহলে আমাদের পরের প্রজন্ম হয়তো  জানবেও না, মনুষ্যত্ব বলতেও কোনো একটা বিষয় ছিলো। দায়িত্ব টা আমাদের, আমাদের মা বাবা যে শিক্ষা দিয়ে আমাদের বড় করেছেন তার কিছু অংশ যেনো অন্তত ধরে রাখতে পারি..