সিরিয়ায় খেল দেখাল আমেরিকা

Now Reading
সিরিয়ায় খেল দেখাল আমেরিকা

সিরিয়ার সামরিক স্থাপনায় একযোগে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট আসাদ ও তার পরম মিত্র রাশিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল আমেরিকা। যে বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা হয়েছে সেখান থেকেই গত সপ্তাহে ডুমায় রাসায়নিক হামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আমেরিকার সাথে তার মিত্র ব্রিটেন-ফ্রান্সও এই হামলায় অংশ নিয়েছে। মিসাইল হামলার পর সকালে দামেস্কের রাস্তা অন্যান্য দিনের মতোই ব্যস্ত ছিল। তবে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা মিসাইল হামলা সিরিয়ায় বিশেষ কোনও প্রভাব ফেলতে পারে নি। এদিকে প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে একটি ছোট্ট ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট আসাদ কালো স্যুট পরিহিত অবস্থায় প্রেসিডেন্ট একটি বড় কক্ষে প্রবেশ করছেন। সেটিকে প্রেসিডেন্টের অফিস হিসেবে সিরিয়ার প্রচার মাধ্যম দাবী করছে আর তারা বলছে আসাদ এখনো অক্ষত আছেন। এদিকে হামলার পর সিরিয়ার বেসামরিক লোকজন রাস্তায় নেমে সেনাবাহিনী এবং প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছে। তারা বলেছে, এই হামলার ভয়ে তারা মোটেই ভীত নন এবং কোন অবস্থাতে সিরিয়ার সেনাবাহিনী এবং বাশার আল আসাদের প্রতি তাদের সমর্থন হারাবেনা। তবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিরাশ হয়েছে প্রেসিডেন্ট আসাদ এর প্রতিপক্ষ সিরিয়ান বিদ্রোহীরা। তারা আশা করেছিল, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সিরিয়ার সরকারী বাহিনী যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা সিরিয়ায় পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে গুরুত্ব দিতেই নারাজ।  সিরিয়ার আসাদ বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি আশা করেছিল, মিসাইলগুলো অপরাধের সরঞ্জামের ওপরে আঘাত হানার পাশাপাশি পেছনে থাকা অপরাধীকেও ঘায়েল করবে।


এই হামলার কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স এর যুক্তি, রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে সিরিয়াকে বাধ্য করতে তাদের এই পদক্ষেপ। তাদের দাবী হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কথিত সেই ‘রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র।

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের এ হামলাকে ‘নৃশংস এবং জঘন্য’ আখ্যা দিয়ে তার নিন্দা জানিয়েছে। মিসাইল হামলার পরে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই হামলার ফলে সিরিয়ার মানুষ সন্ত্রাসবাদ শেষ করতে এখন আরও বদ্ধপরিকর হয়ে উঠবে। মি. আসাদ অভিযোগ করে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলি সিরিয়াতে সন্ত্রাসবাদকে ক্রমান্বয়ে সমর্থন যোগাচ্ছে।

হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাছাইয়ে আমেরিকা ও তার মিত্রদের মাথায় রাখতে হয়েছিল রাশিয়ার কথাটাও । রাশিয়া যেন প্রতিশোধ নিতে পাল্টা হামলা না চালায় সেই ঝুঁকি কমাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বেই সতর্ক করে দিয়েছেন এবং সিরিয়ায় রাশিয়ার সৈন্যদের অবস্থান করা এলাকাসমূহ হামলা চালানো থেকে এড়িয়ে গেছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে এই হামলা চালানোতে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক অঙ্গনে। হামলাকারী তিনটি দেশ যুক্তি দেখাচ্ছে, তা হচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় তাদের এই পদক্ষেপ এবং এই হামলার লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের মওজুদ পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং সিরিয়ায় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে এরকম আরো রাসায়নিক হামলা প্রতিরোধ করা। আমেরিকা ও তার মিত্র দেশসমূহের অভিযোগ, ২০১৩ সালে সিরিয়া রাসায়নিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদে সাইন করা সত্ত্বেও সিরিয়া তা লঙ্ঘন করে চলেছে।

অন্যদিকে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্স সিরিয়ার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলছে রাশিয়া। প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছেন, ” যে দেশটিকে সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে লড়াই করছে তাদের সার্বভৌমত্বের উপর এ হামলা চালানো হয়েছে।” তিনি মনে করেন, আমেরিকা এবং তাদের মিত্রদের এই হামলার ফলে সিরিয়ায় কেবল উদ্বাস্তু বাড়বে যেটি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে। রাশিয়া দাবী করছে আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সিরিয়ায় যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তার অধিকাংশই ধ্বংস করতে সমর্থ হয়েছে সিরিয়ান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। রাশিয়ার বলছে, একশোর বেশি ক্রুজ মিসাইল ছুঁড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা যেগুলোর কোনটিই রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষার ব্যবস্থার ভেতরে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেছেন, পশ্চিমাদের এ হামলার পরিণাম ভালো হবে না। সময়ে এ হামলার পাল্টা জবাব দেবার হুমকিও দিয়েছে রাশিয়া। আমেরিকার নেতৃত্বে সিরিয়ার উপর যে বহুজাতিক হামলা হয়েছে তা  নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই। জাতিসংঘ মহাসচিবও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে নিরাপত্তা পরিষদের মূখ্য ভূমিকাকে সবার উচিৎ শ্রদ্ধা জানানো।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে এক টেলিফোন-বার্তার সুত্র ধরে বাশার আল আসাদ তাঁর দপ্তরের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে জানিয়েছেন, “এই হামলার পরে সিরিয়া এবং সেখানকার নাগরিকরা দেশের প্রতিটি ইঞ্চি থেকে সন্ত্রাসবাদকে ধ্বংস করতে আরও বদ্ধপরিকর হয়ে উঠবে।” অন্যদিকে, মি. রুহানি ওই টেলিফোন বার্তার সময়েই সিরিয়ার প্রতি আবারও ইরানের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন বলে দাবী করা হয়েছে ওই টুইট বার্তায়। শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তাঁর দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনির সঙ্গে এক বৈঠকে সিরিয়ার উপড় এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, “মৃত্যু আর ধ্বংস ছাড়া মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন হামলার অন্য কোনও ফল হবে না।

সিরিয়ায় অর্গেনাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস (ওপিসিডাব্লিউ) কিভাবে তদন্ত করবে, এ বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরোধ দেখা দেয়। তদন্তের ব্যাপারে রাশিয়ার প্রস্তাবনায় আপত্তি জানায় পশ্চিমা দেশগুলি, আর অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলির প্রস্তাবে ভেটো দেয় রাশিয়া। যার ফলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এই অবস্থা যখন বিরাজ করছে ঠিক এমনি একটা সময় নিরাপত্তা পরিষদের তিন সদস্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ক্রুস ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে সিরিয়ার সামরিক স্থাপনায়। তারা যুক্তি দিচ্ছে যে, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সিরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব কোন সম্ভাবনা না থাকায় কেবল আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে তারা রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর করছেন।