ধর্ষণ বনাম পারফেকশন

Now Reading
ধর্ষণ বনাম পারফেকশন

আমার এক আপু আছে, পড়ছে মেডিকেলে, স্বপরিবারে থাকে সৌদিতে। আমার চেয়ে বয়সে খুব বেশি বড় নয়, প্রায় এক বছরের মত হবে আরকি। অবশ্য দুজনে পাশাপাশি দাঁড়ালে মনে হবে আপু আমার চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড়। তবে দোষটা আপুর নয়, আমারই; আমাকে বয়সের তুলনায় অনেক ছোট ছোট লাগে। অনেকের আমার লেখা পড়ার পর যখন আমাকে দেখতে ইচ্ছা হয় তখন প্রোফাইলে গিয়ে আমার পিকচার দেখার পর তাদের এক্সপ্রেশনটা হয় অনেকটা এরকম- “এ্যাঁ! এতো একেবারে পিচ্চি! এই ছেলের থেকে এই লেখা কেমনে সম্ভব!”
বিষয়টা হাস্যকর হলেও এটাই সত্যি। এবং এই ধরনের এক্সপ্রেশনের মুখোমুখি আর না হতেই ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আমার ছবি সরিয়ে নিয়েছিলাম। তবে পরে চিন্তা করে দেখলাম এভাবে আর কতদিন, যা সত্য তাই মানুষ দেখুক। আমি লিখি আমার ভালো লাগা থেকে, আমকে ভালো লাগাতে নয়। কোনো লেখা আমার সেটা বিশ্বাস করুক না করুক, লেখার মর্মার্থ বুঝতে পারলেই হলো। তাই আবার ফটো দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তবে হুট করে তুলে সেই ফটো আপলোড দিইনি। বিশেষভাবে বন্ধুদের নিয়ে ঐতিহ্যবাহী একটি জায়গায় গিয়ে ফটোসেশন করে সেখান থেকে নিজের সবচেয়ে ভালো লাগার ফটোটি আপলোড দিয়েছি!

যাহোক, অহেতুক বকবক অনেক করলাম। এবার লেখাটির মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। প্রসঙ্গটি ছিল আমার এক সৌদি প্রবাসী মেডিকেল পড়ুয়া আপুকে নিয়ে। আপু আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ না হলেও একেবারে তারচেয়ে কমও নয়। অনেকটা বলা যায় ব্রাদার ফ্রম ডিফারেন্ট মাদার (ব্রাদারের জায়গায় সিস্টার হবে। ছন্দ মেলাতে ব্রাদার ব্যবহার করেছি!)। আপুর সাথে আমার প্রায়ই কথা হয়, নানা রকম বিষয় নিয়ে। আমার কোনো সমস্যা বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমি প্রায় সময়ই আপুর পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করি। এর পেছনেও কারণ আছে। কারণটা হলো আপুটা অনেক ম্যাচিউর। শুধু অনেক ম্যাচিউর বললেও ভুল হবে, মারাত্মক ম্যাচিউর। উনার চিন্তা-ভাবনা ও কথাবার্তা অনেক উঁচু স্তরের। উনার সাথে কথা বলার সময় আমি অনেক কিছু শিখতে পারি, এজন্যেই উনাকে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। উনার কিছু উক্তি নিয়ে মাস তিনেক আগে আমি “লাইফ ইজ আ লুডু” শিরোনামের একটি লেখাও লিখেছিলাম। তো কয়েকদিন আগে উনার সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে কোনো একটা বিষয় নিয়ে উনি বলছিলেন, “Whenever a guy proposes, I straightly tell them that no relationship before marriage. Also tell them that I was raped when I was 8 and they get disappeard!”

রেপড না হয়েও রেপড হয়েছে বলার কারণটা যদিও আমি বুঝেছিলাম তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম, “Why do you lie?”

তারপর আপুর উত্তরটা ছিল এরকম, “No guy wants an imperfect girl. They propose, they reject as if I am a tissue paper. They draw it out, then they trash it down.”

আপুর উত্তরটা একটু খেয়াল করে দেখুন তার চিন্তা-ভাবনাটা কোন লেভেলের! আমরা প্রায় সবাই সবসময় পারফেক্ট সঙ্গী খুঁজি এবং অন্যদের কাছে নিজেকে সবসময় পারফেক্ট প্রমাণ করার চেষ্টা করি। এতে কিন্তু আসলে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হই। কেননা বলতে গেলে কেউই সবদিক থেকে পারফেক্ট না। কেউ ভেতর থেকে পারফেক্ট, কেউবা বাইরে থেকে পারফেক্ট। আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি তা হচ্ছে কারোর বাইরের পারফেকশন দেখে তার কথা শুনে তার ভেতরটাও পারফেক্ট মনে করি। এবং এরপর যখন তাকে গ্রহণ করার পর তার থেকে আর সেই পারফেকশনটা পাই না তখন আফসোস করি এবং ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে যায়। আমাদের সমাজের অধিকাংশের মানসিকতা এমন যে আমরা একজন ধর্ষিতা নারীকে দেখে ঘৃণায় থুথু ফেলি আর বয়ফ্রেন্ডের সাথে সেভেরাল টাইমস সেক্স করা মেয়েটার ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথাই থাকে না। ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়ে করতে আমাদের জাত যায় আর অন্যের এক্স-গার্লফ্রেন্ডকে আমরা স্বচ্ছন্দে বিয়ে করতে পারি। মাসকয়েক আগে আমার প্রকাশিত অত্যন্ত সাড়া পাওয়া “সতীত্ব কিংবা ভার্জিনিটি” শিরোনামের একটি লেখায় আমি একটি উক্তি করেছিলাম এমন- “I wouldn’t say that raped girl non-virgin who never wished to have sex before marriage. Rather I would say that girl non-virgin who never had sex yet, but wished to have sex without marriage.”

একজন ধর্ষিতাকে বরং আমাদের সম্মান করা উচিৎ এজন্যে যে সে নিজেকে স্বেচ্ছায় বিলিয়ে দেয়নি। সুতরাং, বিচার করুন স্বেচ্ছায় বয়ফ্রেন্ডের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেওয়া মেয়েটি ভালো নাকি একজন ধর্ষিতা মেয়ে ভালো।

আমি এমন একটি মেয়েকে চিনি যাকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই চারিত্রিক দিক দিয়ে অনেক ভালো হিসাবে জানে। এই জানার পেছনে একটি কারণও আছে। তার ফ্যামিলি অত্যন্ত ধার্মিক এবং সবার কাছে এসব দিক থেকে তাদের অনেক গ্রহণযোগ্যতাও আছে। আমি নিশ্চিত সেই মেয়েটির যদি কখনো কোনো বিয়ের প্রস্তাব আসে তবে তারা তাকে ফুলের মতই পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ভেবে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে। অথচ তার ব্যাপারে গূঢ় সত্যটি কেবল আমি এবং আমার খুব ক্লোজ কয়েকজন ফ্রেন্ডই জানে। সে তার এক্স-বয়ফ্রেন্ডের সাথে বলতে গেলে এমন কিছু নেই যা করেনি। হ্যাঁ, এক্স-বয়ফ্রেন্ড বলছি এ কারণে যে সে পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় তার সাথে ব্রেকাপ করে এখন অন্যজনের সাথে সম্পর্কে আছে। না জানি সেখানেও কিছু বাদ রেখেছে কিনা। এমনকি সে সুযোগ পেলে অন্য ছেলেদের বাইকের পেছনে উঠেও ঘোরাঘুরি করে। প্রথমদিকে যখন তাকে দেখি তখন দেখতাম সবসময় বোরকা কিংবা অন্তত হিজাবটুকু পড়তো। এখন যদিও দূরে অন্যত্র থাকে, তবুও মাঝে মাঝে বিভিন্নভাবে শুনি এখন নাকি অনেক ফ্যাশন করে, এডভান্সড পোশাক-আশাক পড়ে এমনকি কনসার্টেও নাকি যায়। বুঝেন এবার তার লেভেলটা! অথচ এই ব্যাপারগুলো তার পরিবার কিংবা আত্মীয় স্বজন কেউই ঘুণাক্ষরেও জানে না কিংবা কোনোভাবেই জানার কথা না। এই মেয়েটি কি তবে একজন পতিতার চেয়েও খারাপ না? অথচ বাইরে থেকে তাকে বিচার করলে একটি ফুলের মতই পবিত্র মেয়ে হিসাবে উঠে আসবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একজন ধর্ষিতা এবং তার মাঝে তাকেই সবাই পারফেক্ট হিসাবে সম্মতি দিবে!

এই উদাহরণটি দিলাম এটা বুঝাতে যে কাউকে বাইরে থেকে দেখে তার পারফেকশনের বিচার করা ঠিক না। বরং যে মেয়ে তার ইমপারফেকশনগুলো নিজে থেকে বলে দেবে সেই হলো প্রকৃত পারফেক্ট। আমার যদি কোনো মেয়েকে ভালো লাগে এবং তাকে প্রপোজ করার পর সে যদি আপুর মত উত্তর দেয় যে সে কখনো কোনো একসময় ধর্ষিত হয়েছিল তবে আমি তাকে যেকোনো মূল্যেই চির জীবনের জন্য গ্রহণ করার চেষ্টা করবো। এরা পারফেক্ট না হতে পারে, কিন্তু কখনো বেঈমানী বা প্রতারণা করতে জানে না।
অপরদিকে অন্যের ব্যবহৃত এক্স-গার্লফ্রেন্ড যদি নিজেকে পুরোপুরি পারফেক্ট দাবী করে আমার জীবনে আসতে চায় এবং সাপোজ আমি যদি গ্রহণও করি তাকে তখন মনে মনে আমার একটা কথাই থাকবে- তোমাকে পার্ট টাইম হিসাবে ভালোই ব্যবহার করা যাবে। বিশ্বাস করুন, এদেরকে আপনার পার্ট টাইম হিসাবে নিতে হবে না, এরা আসেই পার্ট টাইমের জন্য। আপনার চেয়ে অন্য ভালো কাউকে পাক, তখন প্রতারণা এরা ঠিকই করবে।

শুরু করেছিলাম আপুকে নিয়ে, আর এতো এতো বকবক করতে করতে শেষে এসে ঠেকলাম কোথায়! তবে আপুকে নিয়ে বলার আরো অনেক কিছু আছে। কিন্তু আজ আর নয়, অন্য কোনো একদিন আপুর অন্য কোনো একটা প্রসঙ্গ নিয়ে আসবো। আজ আরো বকবক করতে গেলে পাঠক আমাকে বিশাল দৌড়ানি দিবে। সুতরাং, আজ আর নয়।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন; পারফেক্ট না খুঁজতে যেয়ে ইমপারফেকশনের মধ্য দিয়ে আসল পারফেক্টকে চিনতে শিখুন।

এ লেখায় উল্লেখিত আমার অন্য সেই লেখা দুটির ফেসবুক লিংক-
লাইফ ইজ আ লুডু
সতীত্ব কিংবা ভার্জিনিট

ফেসবুকে আমি: Rihanoor Protik