মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটি কি বর্তমান বাংলাদেশের করুণ প্রতিচ্ছবি?

Now Reading
মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটি কি বর্তমান বাংলাদেশের করুণ প্রতিচ্ছবি?

অনেক ভালোবাসার দেশ আমাদের বাংলাদেশ, অনেক গর্বের দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। সকল বাংলাদেশি তার মনে লালন করে একদিন আমাদের দেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। দেশের সফলতা আমাদের চোখে পানি আনে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ জিতলে বৃদ্ধ থেকে শুরু করে ছোট বাচ্চাটার  মুখে দেখা যায় প্রসারিত হাসি আর চোখের কোনে চিক চিক করা পানি। ব্যর্থতা এনে দেয় একরাশ কষ্ট আর হতাশা।

বাঙ্গালী অনেক আবেগপ্রবণ জাতি। দেশের প্রতি তার অনাবিল ভালোবাসা থাকার পরও প্রতিনিয়ত তাকে মেনে নিতে হয় দেশের মধ্যে চলা অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, স্বজন প্রীতি, মেধার অবমূল্যায়ন।

crown.jpg

কিছু দিন আগে দেশে প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত হল মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ। যদিও এসব সুন্দরী প্রতিযোগিতা গুলো আসলে মেয়েদের সম্মানিত করছে নাকি তাদের মেধাকে ছোট করছে বিশ্ব জুড়ে এ বিতর্ক অনেক পুরনো। নিয়ম অনুসারে প্রতি দেশ থেকে একজন নির্বাচিত হবেন যিনি মিস ওয়ার্ল্ড অনুষ্ঠানে তার দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। একজন নারী নিজেকে আগা-গোরা ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতিতে মুড়িয়ে আসলে কতটুকু নিজের দেশ ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে তাও যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ। যাই হোক মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ যিনি হয়েছেন, তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করুক বা নাই করুক, কিন্তু ইতিমধ্যেই মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটি কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার একটা প্রতিনিধিত্ব করে ফেলেছে।

নিয়ম অনুসারে আন্তর্জাতিক এই সুন্দরী প্রতিযোগিতায় কোন বিবাহিত, ডিভোর্সি, এবং বাচ্চা জন্মদানকারী নারী অংশগ্রহণ করতে পারবে না। খবর পাওয়া গিয়েছে প্রতিযোগিতায় প্রথম ঘোষণা হাওয়া প্রতিযোগিনী জান্নাতুল নাইম আলভ্রি তার বিয়ের কথা গোপন করে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে তার সত্যতাও পাওয়া গিয়েছে। সম্প্রতি লাইভে এসে তিনি কান্না কাটি করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। পেছনের কারণ যাই থাকুক যেহেতু তিনি তথ্য গোপন করে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেছেন সেহেতু আইন অনুসারে তিনি হয়ত আর এই মুকুটের অধিকারী হবেন না ।

crying.jpg

কিন্তু এই যে তথ্য গোপন করার এই ঘটনা আমাদের কাছে কি খুব বেশি অপরিচিত? আমাদের অধিকাংশ বাঙালি কে যদি জিগ্যেস করা হয় আপনার জন্ম তারিখ কত? তাহলে যেই প্রশ্নটা শুনতে হয় তা হচ্ছে, সার্টিফিকেটের টা নাকি আসল টা? এছাড়াও প্রচুর ছেলেদের ও দেখা যায় প্রেমের টানে হয়ত শিক্ষা জীবনে নিজে নিজে বিয়ে করেছেন। কিন্তু চাকুরীর বায়ো-ডাটায় বেমালুম বিষয় টা চেপে যান, আবার অনেকের বয়সও দুই তিন বছর কমানো। যাতে আরও কয়েক বছর চাকুরীর পরীক্ষা টা দেওয়া যায়। কারণ বিবাহিত জানলে আবার চাকুরী দাতা এটাকে অযোগ্যতাও মনে করতে পারেন।

চাকুরীর কথায় আরেকটা বিষয় মনে পরে গেল । এ প্রতিযোগিতায় বিচারকদের পছন্দ কে তোয়াক্কা না করে লিস্টে সপ্তম হওয়া ব্যক্তিকে নাকি প্রথম ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ তিনি ছিলেন আয়োজকদের পছন্দ। এটাও কি আমাদের দেশে খুব নতুন কিছু? পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় কে টপকে লিস্টের নিচে থাকা ব্যক্তিকে চাকুরী দেওয়া হয়েছে। এমন ঘটন তো অহরহই ঘটছে। কথায় আছে যে দেশে জ্ঞানীর স্বীকৃতি নেই, সে দেশে জ্ঞানীর জন্ম হয় না। আমাদের দেশে তার উদাহরণ প্রচুর। দেশে মেধার কোন মূল্যায়ন নেই। যে যত সিস্টেম জানবে তার জন্য উপরে উঠা ততই সহজ। এরকম একটা সংস্কৃতির প্রচলন থাকা যে কতটা ক্ষতিকর তা আমরা ইতিমধ্যেই টের পাওয়া শুরু করে দিয়েছি। মেধার যেহেতু কোন মূল্য নেই,এজন্য মেধার চর্চা এখন কোথাও নেই। এজন্য দেখা যায় দেশের সবচেয়ে প্রাচীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পর্যন্ত গবেষণা পত্রে নকল করার দায়ে অভিযুক্ত।

অনুষ্ঠানটিতে নাম ঘোষণার ক্ষেত্রে যেই নাটক টি করা হল সেটাও ধারনা করা হচ্ছে পূর্ব পরিকল্পিত। কারণ আন্তর্জাতিক কয়েক টি অনুষ্ঠানে ইতিমধ্যেই এমন টা ঘটেছে। ২০১৫ সালের মিস ইউনিভার্স অনুষ্ঠানে স্টিভেন হারভে ভুল করে মিস কলোম্বিয়া কে প্রথম ঘোষণা করেন। তার কিছুক্ষণ পরেই তার ভুল ধরিয়ে দেওয়া হলে তিনি আসল বিজয়ী মিস ফিলিপিন কে বিজয়ী ঘোষণা করেন।

২০১৭ সালের অস্কার অনুষ্ঠানে একই রকম ঘটনা ঘটে।যেখানে উপস্থাপক ছিলেন ওয়ারেন বেটি। সেখানে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় ‘লা লা ল্যান্ড’ কে। একটু পরেই ভুল স্বীকার করে ঘোষণা করা হয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নামটা হবে ‘মুনলাইট’। এগুলোও পাবলিসিটির জন্য সাজানো নাটক হতে পারে।

তবে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে যা হল তা খুবই হাস্যকর। বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণা হল ‘জান্নাতুল হিমি’। একটু পরেই ভুল সংশোধন করে বলা হল আসলে নামটা হবে ‘জান্নাতুল নাইম’। আর বিচারকরা জানালেন তাদের ফলাফল অনুসারে বিজয়ী তো হওয়ার কথা ‘জেসিকা’। পুরো নাটক টা সাজানো ও হয়েছে খুবি কাচা হাতে, যে দর্শকদের কাছেও তা ধরা পরে গিয়েছে ।
তবে অন্যদের নকল করার ইতিহাসটা কিন্তু বাংলাদেশে অনেক পুরনো। বাংলা সিনেমা দেখতে বসলে তা ভালোই বুঝা যায়। সিনেমার গান, ডায়লগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় হলিউড,বলিউডের বিভিন্ন সিনেমার কাট কপি পেস্ট। তবে নকল করা দেখে ততটা কষ্ট হয় না, যত টা কষ্ট পাই নকলের অবস্থা দেখে। তখন বলতে ইচ্ছে করে, ভাই মৌলিক কিছু তো দিচ্ছ না অত্যন্ত নকলটা তো ভালো করে করো।

একটি বিশ্ব মানের অনুষ্ঠানের এই অবস্থা দেখে অনেক বাঙ্গালী হতাশ হলেও এই ঘটনা গুলো আমাদের দেশে কি খুব বেশি অপরিচিত? মোটেও না বরং স্বজনপ্রীতি, তথ্য লুকানো, মেধার অবমূল্যায়ন আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গিয়েছে।

মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটি আসলে আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক অবস্থারই এক  করুণ প্রতিচ্ছবি বহন করছে!