আমি কালো, তা কি আমার অপরাধ?

Now Reading
আমি কালো, তা কি আমার অপরাধ?

আমার জন্ম হয়েছিলো এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা এক বেসরকারি অফিসে কেরানির কাজ করতেন। একে মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছিলাম, তার ওপর কালো বলে বাবা নাকি নাক শিটকেছিলেন। আমার জন্মের সময় দাদাভাই বেঁচে ছিলেন না, দাদিমা নাকি আমার জন্মটা মঙ্গলস্বরুপ নেয়নি তাই দাদিমা কখোনই মন থেকে আমাকে ভালোবাসতে পারেননি।

আমার বয়স যখন চার বছর তখন আমাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেইদিনের কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। কালো বলে আমার পাশে কেউ বসতে চাইছিলো না। অবশ্য প্রতিদিন ক্লাসে আমাকে একাই একটা বেঞ্চে বসতে হতো। আমি সব সময় আমার ক্লাসের বান্ধবিদের সঙ্গে কথা বলতে চাইতাম, কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতো না, এমনকি খেলার মাঠেও কেউ আমার সঙ্গে খেলতো না।

আমি পড়াশুনায় অনেক ভালো ছিলাম। ক্লাসে সব সময় আমি প্রথম হতাম। পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে আমি বৃত্তি পাই। এতে আমার বাবা আমার ওপর অনেক খুশি ছিলেন, কিন্তু আমার দাদিমনি কখনোই আমাকে ভালো চোখে দেখতেন না। তার মতে “মেয়েদের পড়াশুনা করে লাভ নাই, বরং বিয়ে দিয়ে দিলেই ভালো, তার ওপর আবার আমি কালো, তাই যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো”। দিদিমনির এই কথাগুলো শুনে আমি অনেক কান্না করেছিলাম। আমি কালো বলে আমার পরিবার, আত্নিয়-স্বজন ও স্কুলের বন্ধুরা কেওই আমাকে আপন করে নিতে পারেনি।

এদিকে হঠাৎ করে আমার বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবারে অভাব নেমে আসে। এছাড়া আমার ছোট আরেকটি ভাই ছিলো। আমার বাবার জমানো কোন টাকা ছিলো না। বাবার অফিস থেকে যে টাকা পাওয়া গিয়েছিলো তা দিয়ে মা আমাদের চার জনের সংসার ঠিকঠাক ভাবে চালাতে পারছিলেন না। তাই একদিন মা আমাকে ডেকে বললেন ‘‘তোমাকে পড়াতে গিয়ে আমি তোমার ছোট ভাইটাকে পড়াতে পাড়ছিনা, অনেক তো হলো, তোমার বাপকে খেয়েছো, এখন শান্ত হও, কাল থেকে তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না”। আর সেখানেই আমার স্কুল জীবনের সমাপ্তি।

আমার মনে হয় কালো হয়ে জন্ম নেওয়াটা আমার জীবনে অভিশাপ ছিলো। একটা প্রশ্ন সব সময় আমার মনের মধ্যে খেলা করতো ‘‘আমাদের পৃথিবীর অর্ধেক সময় দিন, আর অর্ধেক রাত।তাই বলে কি কেও রাতকে ঘৃণা করে? কালো রং কি কারো পছন্দ নয়?” মাঝে মধ্যে মনের অজান্তেই ভাবতাম হয়তো কোন একদিন কোন এক রাজকুমার আমাকে ভালোবেসে তার সঙ্গে নিয়ে যাবে। আবার ভাবতাম কালো মেয়েদের জীবনে কি রাজকুমার আসে?

কিছুদিন যেতে না যেতেই দিদিমা আমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলো। আমাকে নাকি বুড়ি বুড়ি লাগে, আমাকে নাকি কেও বিয়ে করবেনা। তাই সময় থাকতে আমাকে বিয়ে দিতে হবে।

হঠাৎ করে একদিন ঘটক সাহেব আমাদে বাড়িতে হাজির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। ছেলে বিদেশে থাকে, দেখতে অনেক ফর্সা, কিছুদিন বাদেই দেশে আসবে বিয়ে করার জন্য। আমার মা প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না, কিন্তু দাদিমা বললো এত ভালো ঘর আর পাওয়া যাবেনা, বউমা বিয়ে দিয়ে দাও। এতে মাও রাজি হয়ে গেলেন। তখন আমার ছোট্ট ভাইটি আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলো ‘‘আপু বিয়ে হয়ে গেলে তুই কি অন্য বাড়িতে চলে যাবি, আমাগো সাথে আর থাকবি না? ছোট ভাইয়ের ওই কথাটি শুনে আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। সত্যিই তো বিয়ের পর সবাইকে ছেড়ে আমাকে একা চলে যেতে হবে।

আমি সবে কিশোরী, বিয়ে কি জানলেও সংসার কি তা আমার জানা নেই। স্বপ্ন ছিলো মনের রাজকুমার একদিন এসে আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবে রুপ নেয়নি। তাই চিন্তা করলাম যাকে বিয়ে করবো তাকেই আমার মনের রাজকুমার বানাবো।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেলো। ছেলে বিদেশ থেকে আসার পরই আমার বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়েতে যৌতুক হিসেবে অনেক টাকা চাওয়া হয়েছিলো। মা বলেছিলো যৌতুকের টাকা বিয়ের পর আস্তে আস্তে দিয়ে দেবে। বিয়ের পর বুঝতে পারলাম আমাকে বিয়ে দিয়ে সবাই প্রাণে বেঁচে গেছে।

বাসর রাত সব মেয়েদের জীবনে স্বপ্নের রাত। কিন্তু সেটা কিসের স্বপ্ন কোনো মেয়ে কি সেটা বলতে পারবে? আমি নিজেও সেটা বলতে পারবো না। মনে পড়ে বাসর রাতে যখন আমি একা বসে ছিলাম, মনের ভেতর কেমন যেনো একটা ভয় কাজ করছিলো। হঠাৎ ঘরে একটা মানুষের প্রবেশ। আমার পাশে এসে বসলেন। আমার মনে কতনা ভয় আর কথা। ভেবেছিলাম মানুষটি আমাকে আলিঙ্গন করবে যতটুকু প্রতিবেশীদের কাছে শুনেছিলাম। কিন্তু সেই ভাগ্য আমার কপালে জোটে নায়। আমার স্বামী আমাকে বললেন “তুমি কালো তার পরেও আমার মায়ের ইচ্ছেতে আমি তোমাকে বিয়ে করেছি, কিন্তু ভুলেও আমার কাছ থেকে স্বামীর অধিকার পাওয়ার আশা করো না।”

সেইদিন রাতেই বুঝেছিলাম আমাকে আজীবন এই কালোর নরক থেকে কেউ ভালোবেসে উদ্ধার করবে না। আমি সারারাত কেঁদে সেটা মেনে নিয়েছিলাম। আমি মেয়ে,তাই কাওকে কিছু বলতে পারবো না, সব কিছু  নিরবে সইতে হবে। আমার স্বামী কখনোই আমাকে মেনে নিতে পারেনি। আমি শুধু ছিলাম তার ভোগের বিলাশ। প্রথম রাতে যন্ত্রনায় কেঁদে ছিলাম, কারণ ২৮ বছরের এক হায়েনার কাছে আমি ষোড়সী এক হরিণ।

আচ্ছা, একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালো না বেসেও কি করে তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে? প্রথম দিকে মনে হতো আমি তার টাকায় কেনা ভোগের বস্তু,পরে মেনে নিয়েছিলাম। আর,একদিন তার ভোগের ফল স্বরুপ এক সময় অনুভব করলাম আমার শরীরের মধ্যে অন্য এক মানুষের অস্তিত্ব। অবশ্য আমি গর্ভবতী সেটা যানার আগেই আমার স্বামী বিদেশ চলে গিয়েছিলো, পরে শুনেছে। আমার স্বামী বোধহয় কথাটি শুনার পর খুশি হতে পারেনি। আমি কালো বলে নিজেকে নিজেই গৃণা করতাম, কিন্তু সেই আমি আমার ভেতরের মানুষটার জন্য নিজেকে আস্তে আস্তে ভালোবাসতে শুরু করলাম।

একদিন আমরা প্রসব ব্যথা শুরু হলো। আমার কোলে একটা ফুটফুটে ছেলে জন্ম নিলো। আমি মা হলাম। আমার ছেলে দেখতে তার বাবার মতো ফর্সা হলো। আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম যে আমার ছেলে দেখতে আমার মতো কালো হয়নি। আমি আমার স্বামীকে ফোন করে বললাম আমাকে না ভালোবাসো, তোমার ছেলের মুখটা দেখতে একবার হলেও দেশে আসো, তোমার ছেলে আমার মতো কালো হয়নি। সে দেশে এসেছিলো যখন ছেলের বয়স এক বছর। ছেলেকে দেখে সে অনেক খুশি হয়েছিলো। আমি তাতেই খুশি ছিলাম। তারপর সে আবার বিদেশ চলে যায়।

আমি কালো তাই হয়তো কালো রেখা আমাকে সব সময় বেশি ভালোবাসে। পাঁচ বছর পর আমার স্বামী যখন দেশে ফিরলো, তখন সে আরেকটা বিয়ে করলো। তার নাকি আমার এই মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা। তাই আমাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। অনেক অনুরোধ করলাম একটু আশ্রয়ের জন্য। কিন্তু সে তার সুন্দরী বউয়ের পাশে আমাকে রাখতে চায়না। শেষে বলেছিলাম আমার ছেলেকে আমায় দিয়ে দিতে। হাজার হোক নাড়ী কাটা ধন। কিন্তু আমার ছেলে থেকেও আমাকে বঞ্চিত করা হলো।

শেষে যখন বাপের বাড়িতে ছিলাম সবাই একটা কথাই বলতো, বাপটাকে খেয়ে শেষে স্বামীর সংসারটাকেও টিকিয়ে রাখতে পারলো না।

এই পৃথিবীটা পুরুষ শ্বাসিত। পুরুষ কৃষ্ণ হলেও সে পুরুষ, আর মেয়ে তার কি দোষ? সৃষ্টিকর্তা কালো নারীদেরকেও মন দিয়েছে, ভালোবাসা দিয়েছে। কালো হলেই কি সে বেঁচে থাকার অযোগ্য? ভলোবাসার অযোগ্য? বরং সমাজে সেই সকল মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নেই, যারা মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দেয় না। তারা রুপের মহিমা নিয়ে জন্ম নিলেও, মনের ভেতরটা থাকে কুৎসিত নিয়ে জন্মায়।