জীবনের গল্প

Now Reading
জীবনের গল্প

“জন্মের সাথে সাথেই মা মারা গেলেন। মায়ের আদর, মায়ের গন্ধ কিছুই পাইনি। নানীর কাছেই শৈশবের কিছু সময় কেটেছে। বাবা রিকশা চালাতেন। মাঝেমাঝে এসে আমাকে দেখে যেতেন। নানীর ছায়ায় একটু একটু বড় হতে লাগলাম কিন্তু হাঁটতে পারতাম না। নানী বহু কষ্ট করে কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছিলেন বাবাও চেষ্টা করেছেন কিন্তু তেমন কোন ভালো ফল হয়নি। ডান পাঁ সম্পূর্ণই অকেঁজো। একটা লাঠি কিনে দিয়েছিলেন বাবা। সেটা ভর করে হাঁটতাম তাও খুব কষ্ট হত।নানী গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ‌নানীর অক্লান্ত পরিশ্রমে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলাম। কিন্তু নানীও একদিন মারা গেলেন।

তারপর বাবা নিয়ে আসলেন তার কাছে, ওখানে আর কেউ রইলো না আমায় দেখার মত। তবে পড়াশুনা হলনা। বাবাই বা কি করতেন ! সারাদিন আমার পেছনে বসে থাকলে খাবে আর খাওয়াবে কি ! কোনরকম দু’বেলা খেয়ে দিন কাটতো। আর সারাদিন সামনের খোলা মাঠের কোণে বসে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখতাম। চলতে থাকে কোনরকম….।

একদিন বাবা সন্ধ্যারাতে নিজের রিকশায় করে এক সুন্দরী লাল শাড়ি পরিহিত মহিলাকে ঘরে নিয়ে ফিরলেন। বললেন এ তোর নতুন মা। তোকে অনেক আদর করবে, তোকে কষ্ট করে চুলার পাশে বসে আর ভাত সিদ্ধ করতে হবে না।

প্রথম প্রথম ভালো দেখাশুনা করত নতুন মা। কিন্তু সংসারে নতুন সন্তান আসার সাথে সাথেই রুপমতীর আসল রুপ বেরিয়ে পড়ল। খেতে দিত না। ঘরের সমস্ত বাসন ধুতে হত কাপড় কাঁচতে হত! বসেবসে সব কাজ করাতো সৎ মা। যদি করতে না পারতাম অথবা ভুল হত তবেই জুতাপেটা করত, চড় থাপ্পর আরও কত কি….!

শারীরিক অক্ষমতার কারণে অথবা অসুস্থ থাকলে সেদিন না খেয়ে থাকতাম ! বড় গলায় ডেকে বলতাম, ” ও মা মা খিদা লাগছে অনেক ! পান্তা দাও তাতেই হবে। সব পান্তাতো ফেলেই দেবে !” কখনও দয়া হত আবার কখনও বাবা এলেই শুধু খেতে পেতাম। তবে বাবার ধারে কাছে কখনও ভিড়তে দিত না। যদি সব বলে দেই বাবার কাছে ! মাঝে মাঝে খোলা আকাশের দিকে তাঁকিয়ে চিৎকার করে মাগো মাগো ডাকতাম… হায় নসিব নানীও চলে গেলেন ! বাবাও বেশ উদাসীন ছিলেন আমার প্রতি।

একদিন সুযোগ পেয়ে বাবাকে বলেছিলাম সৎ মায়ের সব অত্যাচারের কথা। কিন্তু কোন কাজে আসেনি ! বাবাকে রুপমতী অনেক আগেই বস করে রেখেছিলো বুঝতে পারিনি। বাবা বিশ্বাস করেনি আমার কথা উল্টো চড় মারল ! বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে সৎ মা দরজা বন্ধ করে অনেক মেরেছিলো সেদিন…! রাতে প্রচন্ড জ্বর ওঠে ! কত আর সহ্য হয় ! ঠিক করলাম হাঁটতে নাহয় খুব কষ্ট হয় কিন্তু এক পাঁ আর দুটি হাত তো আছে ! গতরে খেটে খাব ভিক্ষা বা দয়ায় কেন বাঁচব !

নানী আদর করে মাঝেমাঝে হাতে টাকা গুঁজে দিতেন ! লুকিয়ে জমিয়েছিলাম সেগুলো স্কুলের টিফিন না খেয়ে।বাবাও আগে মাঝেমধ্যে কিছু চকলেট আবার কখনও টাকা দিতেন জমাতে ! জমিয়েছিলামও গোপনে। সিদ্ধান্ত নিলাম এগুলো নিয়েই পালাবো শহরে। কত কাজ একটা কিছু ঠিকই খুঁজে নেব।

বাবা যতই অবহেলা করুক তবু বাবাকে ছেড়ে যাবা সময় মন টানছিলোনা। বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো ! এই বাবাইতো ছিলো আর কে ছিলো আমার ? আর হয়ত কোনদিনই বাবাকে দেখা হবেনা ! বাবা, মা সমস্ত স্মৃতি মায়ার বন্ধন ছিড়ে চলে যাচ্ছি। বুকের ভেতর খুব হাহাকার হচ্ছিলো…আর পেছনে ফিরে তাঁকাচ্ছিলাম যেন মনে হচ্ছিলো মা বুঝি দাঁড়িয়ে আছেন আমাকে যেতে বাঁধ সাধছেন ! কিন্তু মাকে তো দেখিনি তবু কেমন যেন লাগছিলো…।

কাঁক ডাকা ভোরে অক্ষম পাঁ আর শরীরে জ্বর নিয়েই মনের জোরে পালিয়ে শহরের রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি ক্ষুধা ও জ্বরের কষ্টে হাতের পোটলা বুকে চেঁপে নিস্তেজ ঘুমিয়ে পড়লাম। ওখানে এক কোণে ঠাঁই নিয়ে পড়ে থাকলাম। আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম খেয়াল করলাম এক চাচা আমার থেকে একটু দূরে জুতা পলিশ, সেলাই করে বেশ ভালোই কামাচ্ছেন ! এগিয়ে পাশে বসলাম কাজের কৌশল শিখতে। চাচাও আগ বাড়িয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন তারপর সবকথা খুলে বললাম তাঁকে !

অল্প সময়েই ভালোই সম্পর্ক হল চাচার সাথে। আমাকে রোজ তাঁর পাশে বসিয়ে কাজ করতেন মাঝেমাঝে কিছু খেতেও দিতেন। তারপর চাচার পাশে অল্প কিছু পুঁজি দিয়ে আমিও কাজে লেগে গেলাম। চাচা তাঁর বাড়িতে নিতে চাইলেন কিন্তু যাইনি ! এই অক্ষম শরীরের বোঝা কাউকেই আর দেবনা ভেবেছিলাম…।

কোন রকম খেয়ে বাকী কিছু টাকা জমাতাম আর কিছু টাকা দিয়ে বই কিনে সুযোগ পেলেই পড়তাম স্টেশনের হালকা আলোতে। চলে যেত কোনমতে দিন…

একদিন চাচা এলেননা ! এক মাস কেটে গেলো চাচা এখনও এলেননা। ভাবলাম চাচার কোন বিপদ হল কিনা ! বাড়ির ঠিকানা জানতাম। কষ্ট করে চাচার খোঁজে গেলাম। শুনি চাচা হঠাৎ ক’দিনের তীব্র জ্বরে মারা গেছেন। তাঁর একটা মেয়ে রেখে গেছেন। মেয়েটি বাসাবাড়ির কাজ করে চলে কোনরকম।

রোজ একবার আসতাম মেয়েটির খোঁজ নিতে। তারপর আস্তে আস্তে কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে গেলাম মেয়েটির সাথে। মাঝেমাঝে কিছু টাকা জোর করে মেয়েটিকে দিয়ে আসতাম…! মেয়েটিও একসময় আর বাঁধা দিত না। মেয়েটিও যেন আমারই অপেক্ষায় থাকতো ! বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম দুজনে ! করেও ফেললাম বিয়ে…!

তারপর সুখে দুঃখে আত্মত্যাগে দু’যুগ পেরিয়ে গেছে আমাদের একসাথে ! আমাদের একমাত্র মেয়ে আলেয়া আজ সম্পূর্ণ সরকারী খরচে ডাক্তারি পড়ছে। স্রষ্টার অপার মহিমা ! তিনি আমার সন্তানকে আমার মতন অক্ষমতা দেননি ! একটা সময় মরে যেতে ইচ্ছে হত! মায়ের কাছে নানীর কাছে চলে যেতে মন চাইতো! কিন্তু এখন আরো অনেকদিন বাঁচতে ইচ্ছে হয়। একজন সৎ দয়ালু ডাক্তারের গর্বিত পিতা হয়ে বাঁচতে ইচ্ছে হয়।”

জীবনের গল্প ! সত্যিকারের গল্প।

শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!

Now Reading
শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!

৫ম শ্রেনিতে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সাইকেলে বই গুলোকে বাধা অবস্থাতে রেখেই দৌড়ে চলে গেলাম রাস্তার পাশে গর্তটিতে। যেখানে আমরা ক্রিকেট খেলি! হঠাৎ বড় খালা এসে বলল, কালকে তর খালু দেশে আসবে। তুই আমাদের সাথে এয়ারপোর্ট যাবি। যা গিয়ে রেডি হ। কথাটা শোনতেই শরীরের মধ্য দিয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে চোখ বোঝে এক দৌড়ে চলে গেলাম বাড়িতে। মা আমি এয়ারপোর্ট যামু!

-তরে কে কইল?

-দেহ খালায় আইছে।

অজানা কোন সুখ এসে মনের মধ্যে তার অস্থিত্ব জানান দিচ্ছিল। অতি উত্তেজনায় কাপতে ছিলাম। আমি ঢাকা যামু!! বাড়ির সমস্ত ছেলে মেয়ে গুলোকে দৌড়ে দৌড়ে নিজের আনন্দের খবরটা জানিয়ে দিলাম। সবাই অনেকটা কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার অনেকটা হিংসাও! আর আমি এমন ভাব নিয়া তাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম, মনে হয় তাদের বুঝাতে চা্চ্ছি দেখ বেটারা আমি ঢাকা যাইতেছি, সো আমেরিকা যাওয়া কোন ব্যাপারনা! সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। রাতের অলসতা আমার উত্তেজিত স্নায়ুকে হার মানাতে পারেনি। এপিঠ ওপীঠ করে কোন মতে রাত ২টা বাজিয়েছি। ৩টার সময় আমাদের গাড়ি ছাড়ার কথা। কিন্ত গাড়ি ছাড়ে প্রায় সারে ৪টার দিকে। কোন রকমে রাবেয়া আপুকে হার মানিয়ে ড্রাইভারের পাসের ছিট-টা দখল করি। গাড়ি চলে। ঘূর্ণায়মান গাড়ির চাকার সাথে তাল মিলিয়ে সকালটাও চলে আসে খব দ্রুত। আর আমি জানালা দিয়ে মাথা বের করে হা করে তাকিয়ে থাকি রঙ বেরঙের দালান গুলোর দিকে। কি যে এক অদ্ভুদ অনুভূতি! প্রতিটা ভবনের তলা গুনতে শুরু করি। আলামিন একবার ঢাকা এসে গ্রামে গিয়ে ১০ তলা বিল্ডিং-এর কথা বলছিলো। আমি প্রাইমেরি স্কুলের একতলা ভবনের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম, ইশ ১০ তলা বিল্ডিং যেনো দেখতে কেমন! ছোটখাট বিল্ডিং গুলো ছাড়া কোন বিল্ডিং-এরই পুরাটা গুনে শেষ করতে পারিনা। একটা গুনতে না গুনতে গাড়ি আরেকটার কাছে চলে যায়। আরেকটার পর আরেকটা! ঢাকা শহরে এত বিল্ডিং? অবাক হয়ে যাই। শেষমেশ ১২ তলা পর্যন্ত একটা গুনেছি। আমার বুকের ভেতর অঝরে কাঁপতে থাকা ছোট্ট হৃদয়টাতে তখন আনন্দের উপচে পড়া ভিড়, প্রবল উত্তেজনা। বাড়ি গেলে গল্প হবে! তবে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম একটা বিল্ডিং-এর উপর। দুই-তলা। কিন্তু রাস্তায় চলে! এ কেমন বাড়ি? প্রবল উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে রাবেয়া আপুকে বলি, আপু দেখো বিল্ডিং কেমন গাড়ির মত চলে! রাবেয়ার আপুর সাথে সবাই তাকালো। তারপর যেটা ঘটলো সেটা দেখে আমি হঠাৎ করেই কেমন চুপসে যাই। হাওয়া ভর্তি বেলুনের সবটুকু হাওয়া বেড়িয়ে গেলে যেমন চুপসে যায় ঠিক তেমন চুপসে যাওয়া। সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা। রাবেয়া আপুকে দেখে মনে হচ্ছিলো গাড়িতে জায়গা থাকলে সে হাসতে হাসতে শুয়েও পড়তো। কি এমন বললাম? আমার খুব করে ইগোতে লাগে। তারপর আমায় অবাক করে দিয়ে ড্রাইভার বলে এটা বিল্ডিং না, এটা দোতলা বাস। আমার মধ্যে যেন হঠাৎ করে শক লাগে। আমি প্রথমবারের মত মনে হয় ততোটা আশ্চর্য হয়েছিলাম। দোতলা বাসও হয়? অথচ আমাদের গ্রামের একমাত্র বিল্ডিং প্রাইমারি স্কুলটাও একতলা! কি অদ্ভুদ ঢাকা!  আমি আবার উত্তেজনা অনুভব করি। খানিক আগে আমাকে নিয়ে করা তাচ্ছিল্যের হাসাহাসি নিমিষেই ভুলে যাই। মনযোগের সবটুকু দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাহিরে। এই শহরে বাসে বাসে পত্রিকা, বাদাম, বুট  বিক্রি করা হয়। কি আশ্চর্য, পানিও বিক্রি করা হয়! অথচ আমাদের টিউবওয়েলের পানি খাওয়ার মত কেউ নাই। একদুইবার পানি তোলার পরে সারাদিন নিথর পরে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি পানি কিনেছিলাম শুধু এই ভেবে, ঢাকার পানি মনে হয় অন্যরকম। কেমন বোতলে করে বেঁচে! পানির বোতল কোলে নিয়ে বসেছিলাম। এ পানি খাবোনা, গ্রামে নিয়ে যাবো বলে! সকালের ঢাকার রাস্তা, মানুষ, হকার, গাড়ি, বিল্ডিং এমনকি রাস্তার ধূলাবালিও আমায় মুগ্ধ করেছিল সেদিন। আমার প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিলো এসব কিছু আমার জন্য, শুধুই আমাকে মুগ্ধ করার জন্য। আমার মুগ্ধ হৃদয়ে অজস্র গল্প বুনা হয়েছিল সেদিন। আমাকেও যে গল্প করতে হবে আলামিনের সাথে!

এটাই ছিল আমার প্রথম ঢাকা আসা।

………………………………

পড়াশোনা নামক পার্ট টাইম চাকরিটা নিয়ে যখন এই শহরে পাড়ি জমাব, বিদায় ক্ষনে আমার মা চোখের পানি গুলো গড়গড় করে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্ত আমি সেই কান্নার অর্থ বুঝিনি। তখন আমার চোখে মুখে ছিল শহরের রঙিন দালান গুলোর টগবগে স্মৃতির মিহীন ক্যানভাস। মনে ছিল ইচ্ছা। আমিও সেই যেকোন একটা দালানের বাসিন্দা হবো।  

পরিশেষে আজ এই স্বপ্নের শহরে আমার বসবাস। ধূলা-বালি ও কালো ধূয়ায় মিশ্রিত দূষিত বাতাস আর যান্ত্রিক যন্ত্রনার অসহনিয়তা আমার আবেগে জড়ানো সকল স্বপ্নকে ভেঙ্গে এনে দিয়েছে বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাটা শহুরে জীবনে কতটা সুখের তা আমার মত একজন ব্যাচেলরই বলতে পারবে। এই বাস্তব জীবনে অনেকবার আকাশে তাকিয়েছি। কিন্ত কখনো রংধনু দেখিনি। দেখেছি ঘন কালো মেঘ। কখনো দোয়েল পাখিটাকে শূন্যে ভাসতে দেখিনি। দেখেছি উড়োজাহাজ। মানুষের প্রতি মানুষের মমতাহীনতা, একটাকার আশায় কাছে এসে হাত পাতা বৃদ্ধ ভীখারির পেটে লাথি দেয়া আর স্বার্থপরায়নতার কর্মকান্ড গুলো আমার দৃষ্টি শক্তিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। আর এই ঝাপসা চোখে মধ্য রাতের অন্ধকারে রাস্তার পাশের লেম্পের আলোতে আমি প্রায়ই খুঁজে বেড়াই কবি গুরুর ফটিককে। কারন এই মুহুর্তে আমিও যে ফটিকের পথের অনুসারি!

পাগলামির কারনে মায়ের হাতে মার খেলে নিজের প্রতিশোধের আগুন জালিয়ে দিতাম ছোট ভাইয়ের পিঠে। তারপর যা ঘটত তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তত থাকতাম। রিপিট মায়ের হাতে ধাওয়া খেয়ে বাড়ি থেকে পলাতক। সন্ধ্যা হতেই মা যখন নামাযে দাড়াতো তখন পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে খাটের নিচে লুকিয়ে যেতাম। ততক্ষনে দেখতাম পাগল দাদিটা কয়েকবার পুরো গ্রামে আমাকে খুজে বেরিয়েছেন। চোখে না দেখলেও রাতের অন্ধকারে তার পা গুলো অনবরত চলত সজিবের খোঁজে। আর মা? সন্তান কে মেরে নিজেকে অপরাধী ভেবে গভীর শোকে বসে থাকত খাবারের প্লেট নিয়ে।

আর আজ এই স্বপ্নের শহরটাতে অনেক বার না খেয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্ত কোন মায়াবি হাতের স্পর্শ আমি পাইনি। ভাইকে না মারা সত্ত্বেও মধুমাখা কণ্ঠে কখনো শোনিনি বাবা খেয়ে ঘুমা। আজ আমার শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চমকায়। উত্তেজনায় কাপি। রাতে ঘুম হয়না। যখন ভাবি গ্রামে যাব। স্নায়ু গুলো রাতের অলসতার কাছে হেরে গিয়ে যদি চোখের দুটি পাতা এক হয় তখন স্বপ্ন দেখি,………ঘুরে বেড়াচ্ছি সবুজে ঘেরা ধান ক্ষেতের লাইল ধরে, শাস নিচ্ছি প্রানভরে। যে বাতাসে নেই ধুলা-বালি আর কালো ধূয়ার বিষ। আছে শুধুই অক্সিজেন। তরতাজা অক্সিজেন! সু্যোগ পেলেই ঢিল মেরে দিচ্ছি কারো আম গাছে। বাবু,উজ্জ্বল,সুমন দের সাথে সাইকেল দৌড়াচ্ছি আধা-ভাঙ্গা সেই চিরচেনা পিচঢালা পথটি ধরে।

***************************

 

জীবনে সফল হওয়ার কৌশল

Now Reading
জীবনে সফল হওয়ার কৌশল

মানুষের জীবনে সময় অতী মূল্যবান তাই সময়ের সৎ ব্যাবহার করা প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য অপরিহার্য। একজন ভাল ছাত্র বা ছাত্রী হতে হলে প্রথমে একজন ভাল মানুষ হওয়া দরকার। ছাত্রছাত্রীদের উচিৎ সর্বদা সত্য কথা বলা, সৎ কাজ করা এবং অসৎ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সময়মত নামাজ কায়েম করা অপরিহার্য।

ছাত্রছাত্রীদের ভাল বন্ধু অতী জরুরী কারন একজন ভাল বন্ধু যেভাবে একজন ছাত্রকে প্রভাবিত করে একজন অভিভাবকও অনেকসময় তা পারে না। পড়াশুনার পাশাপাশি প্রথম থেকে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার যেমন প্রচুর পড়াশুনা করা, সময় অনুযায়ী সকল কাজ সম্পন্ন করা, বড়দের শ্রদ্ধা করা, ছোটদের স্নেহ করা, বড়দের কথা শোনা, ভাল কাজে আগ্রহী হওয়া, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং দুর্বলদের সাহায্যে এগিয়ে আসা।

রেজাল্ট খারাপ হয়েছে এই জন্য মন খারাপ না করে বরং ভাল করে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া দরকার। এবং যেই অংশটি আপনি বুঝতে পারছেন না যেই অংশটি অন্য কারো কাছ থেকে ভালকরে বুঝে নেওয়া দরকার।  এর পাশাপাশি শিক্ষকদের সহোযোগীতা নেওয়া অতী জরুরী। শিক্ষকদেরও উচিৎ যারা ভাল বুঝে তাদের জন্য সময় বরাদ্দ করার পাশাপাশি যারা কম বুঝে তাদেরকেও যথাসম্ভব সাহায্য করা।

অপরদিকে ছাত্রছাত্রীদের বয়স কম বিধায় খারাপ জিনিসের প্রতি আসক্তি হওয়ার সম্ভবনা থাকে তাই অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে। যখন একজন ছেলে বা মেয়ের টাকার দরকার হয় তখন অভিভাবকদের উচিৎ প্রয়োজনে টাকা দিয়ে সাহায্য করা। এবং কি কারনে টাকা দরকার সেই বিষয়টি জানা। এছাড়া পড়াশুনা চলাকালীন তার হাত খরচ দিতে হবে। অনেক সময় ছোট ছেলে মেয়ে কিছু কিনতে চাইলে অভিভাবকরা এড়িয়ে চলেন এটা ঠিক না বরং যতদুর সম্ভব তাকে কমের মধ্যে কিছু কিনে সান্তনা দেওয়া উচিৎ তানাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে এবং   সন্তুানেরা বিপথে যেতে পারে তাই সময় থাকতেই সাবধান।

মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েদের শাসন করাও দরকার কারন তারা বুঝে না। না বুঝে বোকার মত একটি কাজ করে বসে। তারা গেমস খেলতে চায়, গান দেখতে চায়, গান শুনতে চায়, বাহিরে বেরাতে যেতে চায়, মোবাইলে বন্ধুর সাথে কথা বলতে চায়, সিনেমা দেখতে চায়, ইন্টারনেটে ইউটিউব ভিডিও দেখতে চায়, নাটক দেখতে চায়, মারামারি করতে চায় ইত্যাদি আরো কত কিছু যে করতে চায় তা বলে বুঝানো যাবে না।  সবকিছুর জন্য একটি সময় বেঁধে দিন যেমন তুমি বিকাল বেলায় বন্ধুদের সাথে খেলতে পারবে কিন্তু সন্ধ্যার সময় পড়তে বসতে হবে। আবার অনেকের দুপুরে না ঘুমালে রাতে পড়তে পারে না তবে বেশী রাত জাগা উচিৎ না। বেশিী রাত জাগলে একজন ছাত্র বা ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার স্বরনশক্তি লোপ পেতে থাকে। তাই রাত ১২ টার আগে বিছানায় যাওয়া অতী জরুরী একটি বিষয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়লে পড়াটা মনে থাকে। তাই কেউ যদি ১০ টায় ঘুমিয়ে ৫ টায় উঠে পড়তে পারে তাহলে খুব ভাল হয়। তবে অনেকে আছে রাত ১০ টায় ঘুমালেও সকাল ৮ টার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারে না, এটা ঠিক নয়।

ছাত্রছাত্রীদের বেশী জোরে না পড়ে মিডিয়াম আওয়াজে পড়াশুনা করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। কারন বেশী জোরে পড়াশুনা করলে ব্রেনের উপরে বেশী চাপ পড়ে এবং আসে পাশের লোকজন বিরক্ত হয়। বেশীক্ষন কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকলেও চোখের উপর চাপ পড়ে এবং পরিশেষে চশমা ব্যাবহার করতে হতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত চাপে ছাত্রছাত্রীদের চোখও নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সময় থাকতেই সাবধান হতে হবে। খারাপ কাজের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করতে হবে।

পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের রুটিন মাফিক পড়াশুনা করা উচিৎ। এর পাশাপাশি প্রতিদিন কি কাজ বা পড়াশুনা করবে তার একটি রুটিন করে সেই অনুযায়ী কাজ করলে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। যেমনঃ সকালে ইংরেজী গ্রামার পড়বো, বিকালে কম্পিউটারে কাজ করব বা বাংলা টাইপ শিখব, রাতে অংকের ২ নম্বর অধ্যায় রিভাইজ দিব ইত্যাদী।

Success-Story-Bjpg-816x459.jpg

ছাত্রছাত্রীদের মোবাইলে বেশীক্ষণ কথা বলা উচিৎ না বরং তারা গ্রুপ গ্রুপ করে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে।কয়েকজন ভাল ছাত্র বা ছাত্রী মিলে পড়াশুনা করলে ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে তবে কোন আড্ডাবাজি চলবে না পড়ার সময় শুধু পড়াশুনা চালিয়ে যেতে হবে। শিক্ষকদের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা জরুরী ভিত্তিতে করা উচিৎ কারন একজন শিক্ষক যেভাবে বুঝাতে পারবেন অন্য কেউ সেভাবে নাও বুঝাতে পারেন। তবে হাল ছেড়ে দেওয়া উচিৎ হবে না সবসময় চেষ্টা করে যেতে হবে। চেষ্টা করলে সোনার হরিণ একদিন না একদিন ধরা পড়বেই।

পরিশ্রম করতে হবে বুঝেশুনে অর্থ্যাৎ না বুজে তোতা পাখির মত মুখস্থ করলেও তেমন কাজ হবে না প্রতিটি জিনিস সম্পূর্নভাবে বুঝতে হবে তবেই সফলতা আসবে। ভাল নোট সংগ্রহ করতে হবে। সমসময় অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে হবে এবং নানা বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। কোন কিছু না বুঝলে শিক্ষকদের কাছে বারবার জিজ্ঞাসা করতে হবে এবং পড়া আদায় করে নিতে হবে। কোচিং এ না বুঝলে বাসায় শিক্ষক রেখে বুঝতে হবে। এই বিষয়ে অভিভাবকদের এগিয়ে আসা দরকার। তবে বেশী চাপ দেওয়া উচিৎ হবে না। অভিভাবকরা যতই চাপ দিক না কেন ছাত্র কতটুকু বুঝল সেটা হচ্ছে আসল বিষয়।

জরিনা বিবির জরির শাড়ি

Now Reading
জরিনা বিবির জরির শাড়ি

“অ বউ! যাওতো অহন তুমি, যাও!
 এদ্দিন পর পোলাডা বাড়ি আইতেয়াছে, তরা কইরা একটা নতুন শাড়ি পইড়া লওগা যাও।” উঠানের একপাশ থেকে শ্বাশুরির কথাগুলো শুনে বিরক্তিতে মুখ বাঁকালো জরিনা।
      “হুও,নতুন শাড়ি পইড়া লও!
 আওনের পর থিক্যা পোয়াইত্তা বেডির মতন কোলের কাছে বওয়াইয়া রাহে আবার কয় বউ নতুন শাড়ি পড়গা! শাড়ি পড়ুম না তর মাথা খামু বুড়ি!”
     আপনমনে বিড়বিড় করলো জরিনা। এসব কথা জোরে বলতে নেই, বিয়ের আগেই শ্বাশুরির তর্জন গর্জনের খবর সব জানা, এসব বললেই এখন কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে!
রান্নাবান্না সহ হাতের কাজ সব শেষ করে গোসল শেষে  মোটা পাড়ের নতুন শাড়িটা পড়লো জরিনা। মাথায় তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ে খোঁপা করলো একটা। তারপর দক্ষিনের ঘরটা ঝারমোছ করলো একটু।
এমনিতে শ্বাশুরির ঘরেই নিচে পাটি পেতে শোয় জরিনা, বুড়ির আবার বোবায় ধরে প্রায় রাতে তাই একলা থাকতে দিতে নিষেধ করে গেছে ছেলে। “মার জন্য দরদ একেবারে অফুরন্ত!
তাই বলে আজও নিশ্চয় জরিনাকে এঘরে শুতে বলবেনা!”
 প্রায় দুমাস পর শহর থেকে আসছে রহমত, নিজের ঘরদোর অগোছালো দেখলে কি মনে করবে মানুষটা!
কাজ শেষ করে বাইরে বের হতেই দূরের মেঠো পথে দেখা গেলো রহমতকে। মা’কে জড়িয়ে ধরে এদিকেই আসছে।
“এ্যহ বুড়ির রং দেখলে বাঁচিনা, পুলা যেন নাই আর কোনো বেটির!” বিড়বিড় করে গাল বকলো একটা জরিনা, তারপর হাসিমুখে মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীকে সালাম করলো এগিয়ে গিয়ে!
পানির ঘটিটা এগিয়ে এনে রাখলো উঠানের কোনের পেয়ারা তলায়। পাক ঘরের দরজায় একটা বিড়াল দেখে তেড়ে গেলো ওদিকে!
শহরে ইট ভাটায় চাকুরি করে রহমত। ছুটিছাটা কম দেয় ওরা। সারা বছরই তো কাজ লেগে থাকে। তারপরও মাস দু মাসে একবার এসে ঘুরে যায় গ্রাম থেকে।
 নতুন বউ, এভাবে কাছ ছাড়া রাখলে নজর অন্যদিকে চলে যাবে জানে রহমত। তাই যখনই সুযোগ হয় একবার দেখে যায়। গ্রামের মেয়েগুলো বড় কোমল হয়, এক রাতেই দুমাসের অভিমান ভুলে যায় ওরা!
খেতে বসে জরিনার শ্বাশুরি মুখ বাঁকালো।
– আল্লাহ! আ লো বউ, তর বাপের কি লবনের আড়ত আছিলোনি? এত কইলাম তবুও যদি একটু কম লবন দিতি। এহনই এমুন, আমি মইরা গেলে পুলাটারে ত আমার লবন খাওয়াইয়াই খুন করবি মুখপুড়ি!!
      বলতে বলতে নিমিষেই চোখ ছলছল করে ওঠলো শ্বাশুরি মোমেনা বিবির। “তুই কি বুঝবি পুলা পালন কত কষ্ট!”
– “মা রাহো না! কই অত তো লবন অয়নাই…
      রহমত আস্তে করে বউয়ের পক্ষ নিতে চাইলো।
– থাউক, তুমি চুপ করো। অত পিরিত দেহাইয়া কাম নাই আর!
      মোমেনা বিবি ছেলেকে ধমকে ওঠলেন।
    “লও বউ, খাইয়া সব গোছাইয়া ওডো, বিছনাডা গুছাইছো নাকি আমারই যাওন লাগবো?”
বাতের ব্যাথায় কাতর পা টা নিয়ে কাঁতরাতে কাঁতরাতে ওঠলো মোমেনা বিবি। ছেলেটা এতদিন বাদে আসছে, মা কে কম ভালোবাসে তা না, তারপরও কিসের টানে মাস না যেতেই ছুটে আসে তা না বুঝবার মতো অত বোকা নয় মোমেনা বিবি!
কুঁলকুচা করতে করতে উঠোনে নেমে গেলো মোমেনা। ওজু করে, দুরাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাবে এখন নিজের ঘরে। “আইজ আর বোবায় ধরলে রক্ষা নাই” ভাবতেই কেমন লেগে ওঠলো। বয়সের সাথে সাথে মৃত্যুভয়টা বেশ জাকিয়ে বসছে মনের ভেতর!
মা চলে যেতেই জরিনার দিকে তাকালো রহমত। ঘোমটা টা খসে পড়ে গেছে এখন। মুখটা কালো করে রেখেছে জরিনা। শ্বাশুরির কথাশ রাগ করে বসে আছে বোকা মেয়েটা!
রহমত ওর হাত টা ধরতেই মুখ ঝামটা দিয়ে ছাড়িয়ে দিলো..
– “ছাড়েন, রঙ্গ কইরা কাম নাই। মার লগে তো কইতারলেন না একটা কতাও। কেমুন আমার বাপ-মা তুইল্লা খোঁচা মাইরা গেলোগা!”
– “বউ রাগ কইরোনা। মা কিন্তু তোমারে অনেক ভালোবাসে, এমনে বকাবকি করে আরকি। বুঝোনা ক্যান?”
– অত বুইজা কাম নাই আমার। যান বিছনা করা আছে ঘুমানগা।
– তোমারে ছাড়া ঘুমাইছি আমি কোনোদিন? চলো রাগ পরে কইরো, কি আনছি দেখবা আসো,,,,
      জরিনাকে একপ্রকার জাপটে ধরে ঘরে গিয়ে খিল দিলো রহমত। ব্যাগ খুলে একে একে বের করতে শুরু করলো আলতা, চুলের কাঁটা,পুতির মালা আরো টুকটাক জিনিস। এসব দেখেও জরিনার রাগ কমলোনা!
“কই পাইছেন এইসব, লাগবোনা আমার লইয়া যান, ফিরাইয়া দেনগা।” মুখ বাঁকিয়ে বললো জরিনা।
এত যত্নে আনা জিনিসগুলোর প্রতি অবহেলা দেখে একটু খারাপ লাগলো রহমতের।
“আইচ্ছা কি লাগবো তোমার? কও? পরেরবার ঠিক তাই আনুম!”
-আনবা? সত্যি?
-হু। কি লাগবো?
– “শাড়ি।
   লাল জরির একটা শাড়ি আইনা দেও আমারে। দিবা?”
    জরিনার চোখ দুটো চকচক করে ওঠলো। যেনো চোখের সামনেই শাড়ি দেখতে পাচ্ছে ও! চকচকে লাল পাড়ের জরিওয়ালা শাড়ি একটা!!
– ঠিক আছে দিমু!
দুদিন থেকেই কাজে ফিরে গেলো রহমত। জরিনার শ্বাশুরি ছেলেকে একদম বাসে তুলে দিয়ে এলো গিয়ে! জরিনার খুব শখ একদিন স্বামীকে এগিয়ে দেয়। “হুও বুড়ি না মরলে আর পারুম আগাই দিতে? পুলার লগে লগে তো তার না গেলে পেডের ভাত হজম অয়না!” শ্বাশুরির উপরে বেজায় রাগ জরিনার। মাঝে মাঝে তো স্বামীর উপরও রাগ লাগে। “মার কতার ওপর কোনো কতা নাই এ কেমুন জামাই পাইলাম খোদা!
  এমুন মা ন্যাওটা জামাই দিয়া মাইয়্যা মাইনষের কপাল পোড়াও ক্যান?”
একটা পাটিতে শুয়ে ঘুমের ঘোরে রাগে গজগজ করে জরিনা। কখনো বা আবেগে তেল চিটচিটে বালিশ ভাসায়! ভোরের আলোয় এই শ্বাশুরির সাথেই সব কাজে সমানতালে হাত চলে আবার!
রহমত গেছে আজ  চল্লিশ দিন। পাশের গ্রামের কালা ভাইজান এসে বলে গেছে কাল পরশু নাগান বাড়ি আসবে রহমত। একসাথেই কাজ করে ওরা শহরে। সংসারের টুকটাক কিছু জিনিস পাঠিয়েছে কালা ভাইয়ের হাতে শহর থেকে। যাওয়ার সময় চুপিচুপি জরিনার হাতে একটা পানের ডাবা গুজে দেয় কালা ভাই, ফিসফিস করে বললো, রহমত ভাইজান কইছে আফনের লাইজ্ঞা ছারপ্রেরাইজ আনবো!”
     বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো কালা মিয়া। লজ্জায় মিইয়ে গেলো একেবারে জরিনা। কোনোমতে বিদায় দিয়েই পালাল লোকটার সামনে থেকে। “মানুষটার একেবারে লজ্জা শরম নাই, এইসব কতা কেও বাইরের লোকরে কয়?” ভাবতেই রাগ ওঠে গেলো ওর। “আসুক এইবার!”
সাত সকালে ওঠে ঘরদোর গুছিয়ে,  উঠান ঝাঁট দিয়ে সব ময়লা পেয়ারা তলায় জমাচ্ছে জরিনা। ওর কাজের গতিতে শ্বাশুরিও অবাক। আপন মনেই গজগজ করছে মোমেনা বিবি, “মাইয়্যা মাইনষের রঙ্গ দেইখ্যা আর বাঁচিনা! এদ্দিন ঘুম ভাঙতেই চায়না,  আর আইজ সোয়ামীর কাছে ভালা সাজনের লাইগ্গা এত কারবার! আমরা যেন বউ আছিলামনা কোনদিন! রঙ্গ লাগছে মনে!”
জরিনা কোনো কথা বলেনা। চুপচাপ কাজ করে আর আড়চোখে দূরের পথে তাকিয়ে দেখে। মানুষটার ছায়াও নেই ওখানে!
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্য। রহমত মনে হয় আজ আর আসবেনা। খেয়েদেয়ে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে জরিনা।
মাঝরাতে পিঠে কারো জোর ধাক্কায় ঘুম ভাঙে জরিনার। মোমেনা বিবি চিৎকার করছে সমানে, “আ লো মুখপুড়ি ওঠ! সব তো শেষ অইয়া গেলোগা!
দৌড়ে ঘরের বাইরে আসে জরিনা।
থমকে দাড়ায় এসে,
দরজার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওপারে শুয়ে আছে রহমত! পুরো শরীর,
 আগাগোড়া ছোঁপ ছোঁপ রক্ত লাগানো লাল কাপড়ে মোড়ানো!
লাল শাড়ি!!
সাথে হলুদ জরির পাড়!!

ভুতের সাথেই বসবাস!

Now Reading
ভুতের সাথেই বসবাস!

বাড়িটায় এসে আমি অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। চারিদিকে এখনো যদিও মালামাল অগোছালো হয়ে আছে তবুও সকালবেলার এই আলসেমিটা দারুন উপভোগ্য মনে হচ্ছে। কারন আর কিছুই না, অনেক ঝক্কি ঝামেলা শেষে হুটহাট হোস্টেল ছেড়ে মাঝ মাসে এমন একটা বাড়ি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপারই বটে!

যদিও বাবু বাজারের এই বাড়িটা আমার কর্মক্ষেত্র থেকে একটু বেশিই দূরে, তবু দিনশেষে বাড়ি ফিরে একাকী নিজের মতো করে কজন থাকতে পারে?

ভালোই যাচ্ছে দিনকাল। রোজ সকালে ওঠে হুটুপুটি করে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে টিস্যুতে মুড়ে, তালায় চাবি লাগিয়ে ছুটে বড় রাস্তার মুখে এসে সিএনজি নেয়া। সারাদিন অফিস-কাজ-আড্ডা শেষে বাজার করে বাড়ি ফেরা। এই তো জীবন!

বিপত্তিটা ঘটলো হটাৎ ই।
যেদিন সাত সকালে কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে জটাধারী বুড়িটাকে দেখলাম।

এ বাড়িতে এসেছি প্রায় তিন মাস হতে চললো। কেওই আসেনি। যাওবা এলো একজন এ এই বুড়ি! দরজা খুলতেই দু পাঁটির চারটে করে দাত দেখিয়ে হাতের থালাটা এগিয়ে ধরলো। আমি তখন অফিসে যাবো বলে তৈরী হয়েছি। যারপরনাই বিরক্ত হলাম,

-কি আজব এই এলাকায় কি ভিক্ষে করার টাইম টেবল নেই নাকি? এত সকালে এখন আপনাকে কি খেতে দেবো! এখন যান তো,অন্যদিন আসুন

বিরক্ত হয়ে ওর মুখের সামনে দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। এসবকে বেশি প্রস্রয় দিলেই মাথায় চড়ে বসবে।
মিনিট পাঁচেক পরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা দিলাম। বুড়িটাকে কোথাও দেখলাম। এক্ষনের মাঝেই উধাও! এরা এত দ্রুত হাটে কি করে!

সারাদিন অফিস শেষে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরে রান্না বান্না করে খেয়ে শুতে যেতে যেতে রাত এগারোটা বেজে গেলো। ঘুম আসতে আসতে আরে দু ঘন্টা। ফোন হাতে নিয়েই কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা, হঠাৎ মাঝ রাতে ঘুমটা ভেঙে গেলো। কেনো ভাঙলো বুঝতে পারছিনা। কিছু একটা শব্দ শুনেছি।

“ঠক ঠক ঠক…!”

বাইরের দরজায় শব্দ হলো!
এত রাতে!

ঝট করে ওঠে সিড়ি বেয়ে নেমে এলাম একদম দরজার সামনে। চুপচাপ দাড়িয়ে আছি। টানা ছয় মিনিট পর আবারো, “ঠক ঠক ঠক!”

এক টানে ছিটকিনিটা খুলে দরজাটা খুললাম। সামনেটা একেবারে ফাঁকা! বাইরে হু হু করা দক্ষিনা মৃদু হাওয়া। আমি দাড়িয়ে আছি আহাম্মকের মতো। ভয়ডর পাইনি, নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। দু দুবার ভুল শুনলাম নাকি হ্যালুসিনেশন বুঝতে পারছিনা!

প্রায় বিশ মিনিট পর হুশ হলো। আস্তে করে পিছিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। রুমে এসেই বসে বসে ভাবছি ব্যাপারটা কি হলো!
একা থাকতে থাকতে পাগল হয়ে গেলাম নাকি!

কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। ঠিক সময়ে এলার্ম না বাজলে আজ অফিসে ঠিকই লেইটে পৌঁছুতাম।

অফিস শেষে আজ বাইরে থেকেই খেয়ে নিলাম। রান্নার ঝামেলাটা গেলো। ফ্রেশ হয়ে জলদিই শুয়ে পড়েছি, একটুক্ষন বাদে ঘুমিয়ে গেলাম…

ঘুম ভেঙেই টেবিল ঘরিটায় চোখ গেলো। তিনটা দশ!
বিরক্ত লাগলো নিজের উপরই। “কি দরকার ছিলো জলদি শুয়ে পড়ার? এখন বাকি রাতটুকু কি করবো?”

শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছেনা। ওঠে নিচে এসে বসতেই দরজায় খুট করে শব্দ হলো! তারপরই…..

“ঠক ঠক ঠক!”

আবারো!

-কে!
-ঠক ঠক ঠক!
-কে বাইরে!
-ঠক ঠক ঠক…!

হাত পা সমানতালে কাঁপছে আমার! এক লাফে চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে দরজার কাছে এসে ছিটকিনি খুলে ছিটকে বেরুলাম….

-কে কে এখানে!

কেও নেই!
চাঁদের আলোয় ফকফকা চারদিক। মৃদু বাতাসে গাছের পাতা দুলছে।
দুতলার জানলাটার পর্দাটা বাতাসে দুলে দুলে বাইরে আসছে আর ছায়া ফেলছে উঠোনে………..
……………………………।

 

 

আজ তিনদিন হলো নতুন ফ্ল্যাটে ওঠেছি। দিনে ব্যাস্ত থাকি রাতে জেগে বসে থাকি।
মাঝে মাঝে দরজায় শব্দ হয়, “ঠক ঠক ঠক!”

-“কে?” কখনো চিৎকার করে জিজ্ঞেস করি আবার কখনো ঘুমে জড়ানো নিস্তেজ কন্ঠে।

বিনিময়ে জবাব একটাই পাই, “ঠক ঠক ঠক!”

ছেলেবেলা

Now Reading
ছেলেবেলা

আজ ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৭,

আমি মুসফিক, এই লেখালেখি করি আর কি, কিন্তু ফটোগ্রাফির ইচ্ছা ও মনের মধ্যে আছে। আজকে কেন জানি কি মনে করে বের হলাম, রাস্তার ধারে ঝলমলে রোদ এসে গায়ে আছড়ে পড়ছে। সারাটা পথ ফাকা। একটি ছেলে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে তার সাইকেল নিয়ে। ভাল ভাবে চালাতেও জানে না, যেমন পারে তেমন ভাবেই আসছে কিন্তু আসতে চাইছে দ্রুত। এসে থামল আমার সামনে। সে বলে; ভাই আপনের হাতে এইডা ক্যামেরা না? ওই যে ছবি উঠায়। অবাক দৃষ্টি তে ওর দিকে চেয়ে, একটু হেসে বললাম হ্যা। শুনলাম তোমার নাম কি? উত্তরে সে বলে, আমার একটা ছবি উঠায় দিলে আমি নাম বলবো। আমি ওকে সামনে দাড় করালাম আর ওই পিচ্চি ছেলেটা ওই ভাবে দাড়ালো। ছবি দেখালাম সে অনেক খুশি মনে বলল, ভাই আমার নাম সোহাগ। এই বলেই চলে গেল।

এতক্ষন আমি এই ছবির পেছনের কাহিনী বলছিলাম। আসলেই অনেক সুন্দর ছিলো আমার আপনার, আমাদের ছেলেবেলা। সারাদিন খেলা করতে করতেই বেলা বয়ে সন্ধ্যা নেমে আসত। ঠিক-ই পেতাম না। তখন জীবন টা এখনকার মত এতোটা জটিল ছিল না। ছিল সাদা-মাটা কাগজে বানানো এক ঘুড়ি, যার মাঝে আম্মুর কাছ থেকে নেওয়া কাঠিম সুতোর সুতা বেধে আকাশে চেলে দিয়ে দৌড়ে বেড়াতাম সারা মাঠ। মানুষ আসলে ঠিক-ই বলে, সময় আর স্রোত কারোর জন্যে অপেক্ষা করে না। আর আমাদের ছোটবেলার ভাবনা গুলো-ও ছিলো অন্যরকম। ছোটবেলায় ভাবতাম বড় হলে আম্মু আব্বু কে দেখিয়ে দিবো আর বড় হয়ে ভাবি, নাহ! সেই আগের দিন গুলো-ই ভাল ছিল অনেক। আর আফসোস ও করি যে যদি আবার আর একবার সেই ছেলেবেলায় ফিরে যেতে পারতাম!

এখন তো কিছু করার নেই বড় হয়ে গেছি, বুঝতে শিখেছি আর জীবনের এই আঁকাবাঁকা পথ ধরেই চলতে হবে কারন সৃষ্টিকর্তা আমাদের কে তো বাচার জন্যে সৃষ্টি করেননি, করেছেন লড়াই করার জন্যে। জীবন যুদ্ধে লড়াই করে যে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে সেই হবে বিজয়ী।

আমাদের আশেপাশে এমন হাজারো সোহাগ আছে যাদেরকে আমরা কোন পাত্তা-ই দেইনা। কখনো কি তাদের মুখে আমরা হাসি ফুটিয়ে দেখেছি, লুটেছি সে শান্তি যে শান্তি অন্যকে খুশি করার মধ্যে মেলে? আমরা কি এমনো সোহাগ দের কাছে ভালো মানুষ হতে পেরেছি? আমরা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবি। জীবনে কি করলাম আর কি করবো এই ভাবতে ভাবতেই দুশ্চিন্তায় ভুগি আর সেই দুশ্চিন্তা মেটাতে এদিক সেদিক ছুটি। কিন্তু একবার অন্তত এমন পরিস্থিতিতে পড়লে এমন কোন সোহাগের মুখে হাসি ফুটিয়ে দেখেন, দুশ্চিন্তা থাকবে না, শান্তি অনুভব করবেন আপনি যেমনটা আমি আজ করেছি।

বাঁচুন, বাঁচতে দিন। আর সেইটা অবশ্য-ই ভাল ভাবে হতে হবে।

 

যুবসমাজ জুড়ে চলছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের আগ্রাসন

Now Reading
যুবসমাজ জুড়ে চলছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের আগ্রাসন

বর্তমানে ভার্চুয়াল জীবনের একটা কমন বিষয় হলো প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। স্বভাবগত কারণেই আমাদের বিপরীত লিঙ্গের দিকে আকর্ষণ কাজ করে। তাদের সাথে চ্যাট করতে ভালো লাগে।ভালো  একটা বন্ধুত্তের সম্পর্ক গড়ে উঠে। চ্যাট করতে করতে একটা সময় সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে জড়িয়ে আমরা কি পেয়েছি এবং কি হারিয়েছি তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

আমাদের যুবসমাজ কি এতটা বোকা?

আমরা যদি একটু খেয়াল করি তাহলে দেখতে পারবো এই ভার্চুয়াল জীবনের সাথে জড়িয়ে অনেক মেয়েই তাদের সবটা হারিয়েছে। অনেক সময় ছেলেরাও। তাও আমরা ভূল করি। ভার্চুয়াল জগতের আবেগ গুলো বড়ই অদ্ভুত। কত সহজে একটা মানুষকে মনের উচ্চ স্থানে জায়গা দেই আবার  ঠুনকো কোন কারণে একমিনিটেই ছুড়ে ফেলে দেই। কারো সাথে সম্পর্ক গড়তে যেমন সময় লাগে না, ঠিক তেমনি ঠুনকো আঘাতে সম্পর্ক গুলো ভেঙে চুরমার হতেও সময় লাগে না। যে মানুষ টি আজ আমাদের ক্লোজ লিষ্টে আছে, দু’দিন পর সেই মানুষটিই চলে যায় আমাদের ব্লক লিষ্টে অথবা আমাদের আইডির ঠিকানা হয় তাদের ব্লক লিষ্টে ; নাহয় হয়ে যাই দুজনের দু’চোখের বিষ !

কেউ দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে থাকলেও খুব তুচ্ছ একটা কারণে ঘৃণার সম্পর্ক শুরু হয়। বিশ্বাস কেমন জানি ঠোনকো একটা বিষয় হয়ে গেছে। কত সহজে একটা মানুষকে বিশ্বাস করে,কথা বলে,একজন অন্যজনকে নিজেদের গোপন কথা শেয়ার করে। অনেক সময় ব্যক্তিগত  ছবি ও আদান প্রদান করে। আবার ঠিক তাকেই কোন একটা কারণে অবিশ্বাস করে। ভেঙ্গে যায় বিশ্বাস নামক ভিত্তিটা।

সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়ায় মেয়েদের থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত ছবিগুলা আবার ভার্চুয়াল সাইডে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমন ধাক্কা খেয়ে মেয়েদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা ঘৃণা শুরু হয়। অনেক মেয়ে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার ছেলেরা ও মেয়েদের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে নানান অনৈতিক কাজে জড়ায়। আবার স্বভাবগত কারণে মেয়েটা কোন ছেলের প্রতি এবং ছেলেটা কোন মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আবার ভূল করে।

তবে হ্যাঁ এটা শুধু ভার্চুয়াল জীবনেই হয় না। বাস্তব জীবনেও হয়। তাই বলছি বাস্তব জীবনে যেখানে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে সেখানে ভার্চুয়াল জীবন কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

তবে একটা কথা না বললেই নয়। তা হলো ভার্চুয়াল জীবনের সবটাই যে মিথ্যে তা বলা যাবেনা। মানুষ ভার্চুয়াল জীবন থেকেও সত্যিকারের মানুষ খুঁজে পেয়েছে। এমন মানুষ যার কাছে চোখ বন্ধ করে নিজেকে তোলে দেওয়া যায়। তবে তা খুবই কম। যেমন কিছুদিন আগে একটা নিউজ পড়েছিলাম। “ছেলেটা এবং মেয়েটার ফেইসবুকে পরিচয় তারপর বন্ধুত্ব। পরিচয়ের পরই মেয়েটা জানতে পারে যে ছেলেটার দুইটা কিডনি নষ্ট। মেয়েটা চাইলেই ছেলেটাকে ছেড়ে চলে যেতে পারতো।  কিন্তু যায়নি। ছেলেটাকে একটা কিডনি দান করবে বলেছে এবং বিয়ে করে ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়েছে।”

ভার্চুয়াল জীবনে এমন আরো কিছু ভালোবাসার নিদর্শন আমরা দেখতে পারলেও তা খুবই কম।

একেবারে অবিশ্বাস করে জীবন চলে না। সব মানুষ খারাপ হয়না। তবে অনেক খারাপের ভিতর থেকে বা কারো কাছ থেকে ধোঁকা খাওয়ার পর কাওকে খুব সহজে বিশ্বাস করা যায় না বা উচিৎ না। মনে রাখবেন অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। কাওকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করা ও উচিৎ না। ভার্চুয়াল জীবনে হোক অথবা বাস্তব জীবনে কাওকেই অতিরিক্ত ভালবাসবেন না,কাওকে এতটা বিশ্বাস করবেন না যার কারণে আপনাকে সব হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় বা খারাপ পথে পা এগিয়ে দিতে হয় অথবা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব। আমাদের ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা আছে। আমরা জানি আমরা কিভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারবো।আর কোন কাজটা করলে আমরা ভালো থাকবো। ভালো থাকা মানে এই না যে কোন একজনকে বিশ্বাস করে নিজের সবটা বিলিয়ে দিব। এবং তার থেকে প্রতারিত হয়ে আবার নিজেকে শেষ করে দিব। ভার্চুয়াল লাইফে নিজেকে জড়ান। তবে লিমিট মেনে।  মনে রাখবেন মাত্রারিক্ত কোন কিছুই ভালো না। বর্তমান যুবসমাজ ভার্চুয়াল লাইফে একটু বেশি জড়িয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল লাইফ যুবসমাজের কাছে এক ধরণের নেশায় পরিণত হয়েছে। যে নেশা থেকে বের হয়ে আসা সত্যিই খুব কষ্টের।

আমি নেশা বলেছি এবং এর জন্য যঠেষ্ট কারণ আছে।একটা মানুষ যখন নেশাগ্রস্থ হয় আমরা তাদের ভিতর কি কি অনিয়ম দেখতে পাই?

১.ইনসমনিয়া(নিদ্রা রোগ)

২.খাবারে অনিয়ম।

৩.পরিবার থেকে দূরে থাকা।

৪.বাস্তব জীবন থেকে কিছুটা দূরে চলে যাওয়া।

ভার্চুয়াল জীবনে জড়ানোর পরেও যুবসমাজের ৬০% এ সব অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা যুবসমাজ ভার্চুয়াল জীবনে জড়িয়ে যাওয়ার পর নিজেদের পরিবারকে কতটা সময় দেই? ভার্চুয়াল জীবনে জড়ানোর পর আমরা অনেকে ভূলে যাই যে আমাদের একটা পরিবার আছে। অনেক সময় ভার্চুয়াল কাওকে সময় দিতে গিয়ে নিজের পরিবারের কারো না কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করছি।

আমার লেখা কথাগুলো কতটা সত্যি তা যে বা যারা আমার লেখাটা পড়ছেন তারা একবার ভেবে দেখেন।

যুবসমাজের কাছে একটাই অনুরোধ, ভার্চুয়াল লাইফ আমাদের সব কিছুনা। নিজের বাস্তব মানুষদের সময় দিন। পরিবার,আত্মীয়দের সময় দিন। তাহলে হয়তো আমরা ভার্চুয়াল লাইফে ভূলটা কম করবো। লিমিট রেখে চলুন।

মানুষ মানুষের জন্য !!

Now Reading
মানুষ মানুষের জন্য !!

প্রত্যেকের দিন সব সময় এক রকম যায় না। কখনো সুসময় আসে কখনো দু:সময় অাসে। এক সময়কার প্রাচুর্যশালী ব্যাক্তি এখন পথের ফকির, আপনার চারপাশে ভালোভাবে তাকালে এমন অনেক নজির আপনি খুজে পাবেন।

এখানে একজন ব্যাক্তির জীবন থেকে কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি, তার অনুরোধে আত্নসম্মানের খাতিরে নাম ও পরিচয় গোপন রাখার হলো(কিছু ছদ্ম নাম ব্যাবহার করা হলো):

সালাটি ছিল ২০০৫, আরিফ সাহেব সদ্য বিবাহ করেছে, অনেকটা বেকার অবস্থায়। বিয়েটা  পরিবারের চাপে পড়ে করতে হয়। আরিফ সাহেব মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান,তাসফিয়া উচ্চ বিত্ত পরিবারের কন্যা। বিবাহটা অনেকটা হঠাৎ করেই হয়ে যায়।

অনেকটা অগোছালো অবস্থায় এবং সম্পূর্ন বেকার অবস্থায় আরিফ সাহেব বিবাহ করেন। আগেই বলেছি পরিবারের চাপে পড়ে তাতে বিয়ে করতে হয়, নিজেকে গোছানোর মতো কোন সুযোগ সে পায়নি।

সংসার শুরু করার পর সংসার চালানোর চিন্তা, তাই তিনি হন্যে হয়ে চাকুরী খুজতেঁ থাকেন। অনেক খোঁজা খুজির পর তার কাছে একটা বায়িং হাউজে মার্চেন্ডইজিং জব এর অফার আসে, এক বনধুর মারফতে। কিন্তু বিধি বাম, ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে নিরাশ হতে হয়। অভিজ্ঞতা ছাড়া নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। যেহেতু রেফারেন্সের চাকুরী, বন্ধুটি পরামর্শ দিলো কোন ট্রেনিং সেন্টার থেকে কোচিং করে অভিজ্ঞ হয়ে আসার জন্য। কিন্তু ট্রেনিং সেন্টারে কোচিং করতে লাগবে বেশ কিছু  টাকার মতো। এ পরিমান টাকা আরিফ সাহেবের পক্ষে যোগাড় করা অসম্ভব।

বাসায় এসে তার স্ত্রী তাসফিয়াকে জানালো। তার স্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বললো, কোন চিন্তা করো না, আমি আমার মা’য়ের কাছ থেকে তোমার জন্য টাকা এনে দেবো। কোর্স করলে যদি চাকুরী হয় এবং চাকুরী যেহেতু নিশ্চিত, টাকা আনতে কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু আরিফ সাহেব রাজী হচ্ছিলেন না, আত্নসম্মানের খাতিরে।

অনিচ্ছা সত্বেও স্ত্রীর পিরাপীরীতে, আরিফ সাহেব  স্ত্রী তাসফিয়াকে সাথে করে  শ্বশুর বাড়ি গেলেন। আরিফ সাহেব টাকা ঠিকেই পেয়েছিলেন কিন্তু সাথে পেয়েছিলেন কিছু অকথ্য অপমান এবং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য, তার শ্বশুরী এবং শ্যালকের কাছ থেকে। দিনটি ছিল ২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিল। রাত ১১টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত শ্বাশুরী আর শ্যালক মিলে তার দারিদ্রতা,বেকারত্ব,আর্থিক অবস্থা, পৈতৃক অবস্থা ইত্যাদি উত্থাপন করে তাকে যাচ্ছেতাই অপমান করে।

অপমানের তীব্রতা এত বেশী ছিল যে, আরিফ সাহেব সে রাতে এক ফোটাঁও ঘুমাতে পারেনি। আরিফ সাহেবেন ভাস্য: ” আমি নিজে থেকে তো টাকা চাইতে আসি নাই, আমার স্ত্রী বড় মুখ করে আমাকে নিয়ে এসেছিলো তার মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দেবে, এই কথা বলে, এখন উল্টো অপমান আমাকেই সহ্য করতে হচ্ছে।”

শুশুর বাড়ি আনিয়ে তাকে চরমভাবে অপমান করা হলো,অসহায়ত্বের সুযোগে। আরিফ সাহেবের, রাগে দু:খে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে, আল্লাহ দরবারে দু’হাত তুলে চোখেরে পানি ফেলল। তারপর কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।

এটা ছিলো এক জন আরিফ সাহেবেন ঘটনা, এরকম হাজারো আরিফের মতো অসহায় যুবক বাংলাদেশে আছে। সাহায্য সহযোগীতা করে নয় শুধু মাত্র উৎসাহ, সহমর্মিতা এবং সঠিক গাইড লাইনের মাধ্যমে তাদেরকে আমরা পথ দেখাতে পারি। সবাই রাজা বাদশার ঘরে জন্মায় না। তাই বলে তার অস্বচ্ছলতা বা দারিদ্রতায় আপনি তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেন, এটা হওয়া উচিৎ নয়। বিশেষ করে দেখা যায়, আমাদের পারিবারিক জীবনে এক ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। আত্নীয় স্বজনদের মধ্যে কেউ দরিদ্র থাকলে স্বচ্ছল আত্নীয়রা তাকে পাত্তা দেয় না বা পরিচয় দিতে চায় না। পাছে, যদি সে সাহায্য চেয়ে বসে। একটি কথা চিরন্তন সত্য যে, আজ যে ধন বা টাকা পয়সা আপনার হাতে আছে, আল্লাহ যদি তা কেড়ে নেয় কাল ঐ সকল দরিদ্র আত্নীয় স্বজনদের কাতারে আপনিও সামিল হবেন, তখন কিভাবে মুখ লুকাবেন ?

কারো দারিদ্রতা, অসহায় অবস্থ্যায়, দুরাবস্থায়, দুর্দিনে তাকে উপহাস,অপমান,প্রবঞ্চনা করা উচিৎ নয়। আপনাকে সাহায্য করতে হবে না, আপনি কাউকে ধনী বা গরীব বানাবার ক্ষমতা রাখেন না। সকল ক্ষমতা আল্লাহর হাতে। আপনি সমবেদনা, সহমর্মিতা জানাতে পারেন। তার জন্য দো’য়া করতে পারেন।

এক জন ব্যাক্তি গরীবের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছে, এটা তার অপরাধ নয়। বরংচ  অপরাধ সেটাই আপনি তার দারিদ্রতাকে তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য করেছেন।

মহান আল্লাহর দরবারে ধনী-গরীব কোন ভেদাভেদ নাই। মসজিদে যেমন ধনী এবং গরীব এক কাতারে নামাজ পড়ে। মৃত্যুর পর যেমন ধনী এবং গরীব একই মাটির কবরে শায়িত হয়।  তবে কেন এত ভেদাভেদ, এত উচু নীচু ফারাক ?

আমরা কি পারি না আমাদের মানবিকতাকে জাগ্রত্ব করতে ?  প্রাচুর্যের অহংকার, দম্ভ রোধ করতে। মানবিকতা, সহানুভুতিকে জাগ্রত করতে।

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায় সময়, রয়ে যায় স্মৃতি। আরিফ সাহেব আজও দীর্ধ প্রায় বারো বছর যাবৎ বুকের মাঝে বয়ে চলছে, শ্বশুরবড়ির সেই অবজ্ঞা, অপনাম। তার প্রতিটি দীর্ধশ্বাস এখনো তাকে অশ্রুশিক্ত করছে। এখনো সেদিনের কথা মনে করে আরিফ সাহেব নীরবে কাঁদেন। এ যাতনা বিরহের নয়, এ যাতনা না পাওয়ার নয়। এ যাতনা সহানুভুতিহীনতার। আরিফ সাহেবের মতো প্রতিটি মজলুমের দীর্ধশ্বাস গুলো আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ-আকুতি হয়ে ডুকরে কাঁদছে। আর যেন কোন আরিফ সাহেবকে অসহায় অবস্থায় অবজ্ঞার সম্মুখীন হতে না, দারিদ্রতার কারনে।

আজ এ লেখাটি কিছু ব্যাক্তি বিশেষকে উপলক্ষ্য করে লেখা। যারা এর সাথে যারা সম্পৃক্ত শুধু তারাই বুঝতে পারবে। এ লেখার সাথে যদি কারো জীবনের কোন ঘটনা মিলে যায় তার কাছে ক্ষমা প্রার্থী। কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, এখান থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য লেখাটির অবতারনা।

এটি একটি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা তাই এখানে কোন প্রকার রেফারেন্স প্রদান করা সম্ভব হলো না।

 

স্বপ্নের প্রহর।

Now Reading
স্বপ্নের প্রহর।

স্বপ্নের প্রহর।

আমাদের বড় স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে যায়,আর ছোট স্বপ্ন গুলো মনের অজান্তেই ভুলে যাই।
তাই স্বপ্ন না দেখাই ভালো,আমার তো মনে হয় স্বপ্ন ভাইরাস । যা কিছু ক্ষেত্রে হয়ত ভাল কিন্তু যখন বেড়ে যায় তা সারানো দূর্ভোগ হয়ে যায়।

মনে পড়ে যায়, সেই ছেলেটির কথা,ওর দেশ প্রেম নিজেকে ওর কাছে অনেক ছোট মনে হল,যদি ও ছেলেটি বয়সে আমার ছোট। দুষ্টামি করে আমায় মোটা ভাই ডাকত।তখন আমি সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি,আর ও বোধয় ক্লাস সিক্সে।

লেখার সময় ওর স্বর গুলো কানে বেজে উঠল।

ভাই, জীবনে আর কিছু করি আর না করি, দেশের জন্য কিছু একটা করবই।
৭১ থাকলে যুদ্ধে নামতাম।কিন্তু তা পারি নাই। তাই যে ভাবেই হোক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তে ঢুকে দেশের সেবা করবই।

শুনে আমি বললাম, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে, করতে পারে চাপার বড়াই।

আমার কথার পেক্ষিতে বলল, ভাই মজা নিলেন আমি কিন্তু সিরিয়াস। আমার ইচ্ছা স্বপ্ন সব একটাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

শুনে তারপর বললাম বেশ তো,চেষ্টা কর ক্যাডেটে চান্স পাওয়ার।আর ও বললাম,
তোরাই তো দেশের অহংকার আমরা তো সব জংকার।

আমার কথা শুনে হেসে বলল, ভাই দোয়া করবেন। এই বছর ক্যাডেটে পরীক্ষা দিব।

তারপর কয়েক মাস পড়ে সেই ছোট ভাইয়ের ফোন কল,,,, ধরার পর

ভাই আমি লিখিত পরীক্ষায় পাশ করছি,
আলহামদুলিল্লাহ্‌।
এখন ভাই মেডিকেল বাকি।
ইনশাআল্লাহ ভালো হবে।
ভাই দোয়া করবেন বলে ফোনে কথা শেষ হল।

অনেকদিন পর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্র। ওর মত আমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখি আর মডেল টেষ্ট দেই। একদিন ক্লান্ত মনে ফোনের কন্ট্রাক্ট লিষ্টে কোন একজনে র নাম্বার খুজতে ওর নামটি চোখে পড়ল।
সব কিছু মনে পড়তে ই মনের অজান্তেই কল দিয়ে দিলাম, রিং বাজতেই অপর প্রান্ত থেকে একজন মহিলা কন্ঠ স্বর বুঝতে পেরে জিজ্ঞসা করলাম
মাসি কেমন আছেন?
জি ভালো বাবা। তুমি কে বাবা?
পরিচয় দিলাম তারপর জিজ্ঞসা করলাম, মাসি বিজয় আছে?
ও কী ক্যাডেটে চান্স পেয়েছে?
ফোনের অপর প্রান্তে এক নিস্তব্ধতা সৃষ্টি হয়।
আর তার ক্ষনিক পরে শুরু হয় ব্যাকুল কান্না। আর কান্না জড়িত কণ্ঠে শুনতে পেলাম, বাবা প্রার্থনা কর যেন ভগবান ও কে স্বর্গে ঠাই দেয়।
আর শুরু হয়ে ছেলে হারা মায়ের আর্তনাদ…….।

পরে জানতে শারীরিক কিছু দূর্বলতার কারণে ও মেডিকেল থেকে বাদ পরে।আর স্বপ্নের এই ভাঙ্গন ওকে ভেঙ্গে ফেলে আর বিজয় বেছে নেয় আত্মহত্যার আর এরই মাঝেই হয় বিজয়ের পরাজয়।

আমি এখন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
স্বপ্ন!!!
এই সব কথা গুলো আজ স্বপ্নের মত লাগছে।
ঠিক যেন সেই কবিতার মত
“আমি জেগে রই আর স্বপ্ন দেখি,
আমি দিবা নিশি স্বপ্নের পথচারী।
আমার স্বপ্নে শত ব্যাক্ষা যুক্তি,
আমি সেই যে চির নিদ্রার স্বপ্ন দেখি।

_____________________ নিলয়।

 

মধ্যবিত্তের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী

Now Reading
মধ্যবিত্তের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী

বাবা সরকারি চাকরি করেন।আমাদের পরিবার সুখি পরিবার ৯০ দশকের পয়সার মত। যেহেতু বাবা সরকারি চাকরি করেন তাই দাদার বাড়ি আর নানা বাড়ি থেকে অনেক দূরে প্রায় বাংলাদেশের এক প্রান্তে থাকতাম আমরা। তখন শুধু জানতাম ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। আমি যেখানে থাকতাম সেখান কার মানুষের চাহিদা ছিল ৫টি মানে হল মৌলিক চাহিদা আমিও বেতিক্রম না। মা বলে ছোট থেকেই নাকি আমি বন্ধু প্রিয় মানুষ সারাদিন নাকি বাসায় থাকতাম না। ক্ষুদ লাগলেও নাকি আমার কোন অসুবিধা হত না,আমার ভক্ত সমাজ আমকে ধরে নিয়ে তাদের বাসায় নিয়ে যেত। স্কুল আর খেলা এই নিয়ে সময় কেটে  যাচ্ছিল । কোন মতে পরীক্ষায় পাশ করে নতুন ক্লাসে উঠছি বুজতেই পারছেন নতুন বছর শুরু হইছে। সকলে বাবা ঘুম থেকে ওঠালেন ,ঘুমের চোখ ডোলে খুলে দেখি লাল র সবুজ রঙের  খেলোয়াড় দের পোশাক আনছে। আমি মহা খুশিতে লাফালাফি করলাম। পোশাক দেখলাম লালটা ছোট আর সবুজটা বড়,বুঝতে আর বাকি থাকল না।আমি আর বাবা পোশাক পরে সকাল ৬ টায় বেড় হতাম অনেক মজায় মজায়। হাটা হাটি করতাম ৪৫ মিনিট। পরে খাবার রেস্টুরেন্টে বসে সকালের নাস্তা করতাম দুইজন এবং আম্মুর জন্য খাবর নিয়ে বেড় হয়ে বসতাম একটা কেহেরমান এর দোকানে। দোকানের মালিকের সাথে কেহেরমান এর মিল ছিল নাকি কেহেরমান এর সাথে মালিকের তা আমি জানি না কিন্তু সে ছিল আমার কাছে কেহেরমান। যাই হোক আব্বু কেহেরমান কে বলত একটা চা দেও কিন্তু কেহেরমান চা এর সাথে সিগারেট ও দিত আব্বুকে। তাই দেখে আমিও কেহেরমান কে বলতাম একটা চা আর সিগারেট দেও কিন্তু কেহেরমান আমাকে দিতো একটা জুস আর সাদা গোলাপি রঙের পাইপ চকলেট। সেই মজায় মজায় থাকা বিষয়টা বেশি বছর ছিলনা ঘুম কাতুরে মানুষের যা হয়।
নতুন বছরের কিছু দিন যাইতেই শুনলাম ওই এলাকায় নাকি বিদেশী তত্ত্বাবধায়নে একটি নতুন  স্কুল খুলছে। আমার দলের মেম্বাররা অনেকেই ভর্তি হল কিন্তু দলের নেতা মানে আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না । কারন আমার ৫/১০ টাকার খেলনা আর কোমল পানীয় খাওয়ার আব্দার ছাড়া আর কোন কিছু ছিল না। স্কুলের গাড়ি প্রতিদিন বাসার সামনে  এসে ছাত্র দের নিয়ে যাবে, টিফিনে খাবার দিবে, ক্লাস শেষে প্রাইভেট পরাবে আর বিকেল হলে বাসায় আবার সেই গাড়িতে দিয়ে আসবে । আশা করি টাকার কথা কাও কে বলে বুঝাতে হবে না। মাসের অর্ধেক দিন না যাইতেই দেখা গেল দলের নেতা একা একা বিকাল বেলা জলপাই গছের পাতা চাবাইতেছে। কিছুক্ষণ চাবানো হলে বাসায় গিয়ে দরজা টোকা দিলাম কিন্তু দরজাটা আম্মু খুলছেনা। আমি জানি আম্মু ঘুমাচ্ছে, আমি যতক্ষণ বাসায় থাকি আম্মু ততোক্ষণ ঘুমাতে পারে না কারন আমি এই ছোট রাজ্যের দুষ্টু রাজা। অনেক টোকা দিতে দিতে যখন দরজার সাতে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম তখন আম্মু দরজা খুলে দিলো। আম্মুতো আমাকে দেখে পুরাই অবাক এই সময় আমি বাসায়। আম্মু একবার আমার দিকে তাকায় আর একবার ঘড়ির দিকে তাকায় । আমি  ভিতরে ঢুকতেই প্রথম কথা কোন সমস্যা,ঝগড়া করছ, মারামারি নাকি কেউ কিছু বলছে ? আমি কোন কিছু না বলে সোজা বারান্দায় প্রাইভেট সৈনিক দের নিয়ে খেলা শুরু করলাম। এই ভাবে ৪/৫ দিন বাসা থেকে বেড় হইনাই এই কথা শুনে তো আমার চাচা,মামা,খালা সবাই দূর থেকে আমাদের বাসায় এসে হাজির তাদের দেখে কিসের মন খারাপ সব যে কথায় চলে গেল বুজলাম না। কিন্তু দুই দিন পর যখন চলে গেলো ঈশ মনের ভিতর ধুক ধুক আর আড়াল করা চোখের পানি নিয়ে ঘুমায় গেলাম। আমি বাসায় থাকি তাই আব্বু ও বাসায় থাকা শুরু করলো আগের চাইতে বেশি। আমি আর  আব্বু সাজনা ডাঁটা দিয়া তলোয়ারই খেলতাম আর আম্মুর বোকা শুনতাম।
শুক্র বার আমি বাসায় নাই সন্ধ্যা হয়ে গেছে আমি বাসায় আসছি  না! আব্বু আর আম্মু  খুঁজতে বেড় হইছে । বাহির হইয়া দেখে আমার বন্ধুদের বাবা মা তাদের সন্তান দের খুঁজছে। তাদের মধ্যে কথা হতেই আমার আব্বু বুঝল  আমার ঘরে থাকার কারন । আমরা সবাই ক্লাস ৩ তে পরলে কি হবে “ডিপু নাম্বার টু” সিনেমা দেখে সবাই বড় হয়ে গেছিলাম তাই হয়তো পানির ট্যাংকইর উপরে উঠছিলাম কিন্তু কেঁউই নামতে পারি নাই । হয়তো ছোট ছিলাম বা তারেক এর মত কেউ ছিল না । ১৭ জন যখন বাসায় ফেরেনাই সবাই খোঁজ শুরু করলো এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ট্যাংকইর নিচে নেমে আসতে পারলাম। রাতে খাবার টেবিলে আব্বু বলল তোমার বন্ধু দের স্কুলটা অনেক সুন্দর কাল সকলে ঘুরে আসবো । পরদিন সকলে গেলাম স্কুল দেখতে ।পুরো স্কুল ঘুরলাম আধা ঘণ্টা সময় নিয়ে একটু পর আব্বু জিজ্ঞাসা করলো কেমন লাগলো ভর্তি হবা ?
স্কুলে আমি  ক্লাস ৩/৪ শেষ করলাম আর এই দিক দিয়ে আব্বুর সকাল বেলা বাহিরে নাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে । কেন হয়েছি এখন বুজতে পারলেও তখন কার সময় আমি বুজতে পারি নাই । মধ্যবিত্ত পরিবার এর প্রতি জন সদস্য এক জন আর এক জনের চাহিদা পূরণ করে  নিজের ইচ্ছা কে নির্দ্বিধায় মুছে দিয়ে। সরকারি চাকরির বদলী হচ্ছে পেরাসিটামল তিন বেলা খাওয়ার মত । নতুন জায়গা,নতুন স্কুল, নতুন জীবনের শুরু …