3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

অপেক্ষা

Now Reading
অপেক্ষা

“অপেক্ষা”
 
তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ল্যাপটপ,ইন্টারনেট,মোবাইল এগুলা ব্যবহার করা একদম প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।এগুলোর সবগুলোই ছিল তোমার সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম।এখন তুমিই নাই এগুলো সব অর্থহীন আমার কাছে।কিন্তু আজকের দিনে না এসে পারিনা।এই দিনটাতে আমি তোমাকে হারিয়েছি তাই ভাবি যদি এই দিনেই তোমাকে আবার ফিরে পাই।
 
আজ আমার বিয়ে।অনেক ব্যস্ততম একটা দিন।তবুও হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও আজ একটু ইন্টারনেট ব্যবহার করছি।জানিনা তোমাকে পাব কিনা।কিন্তু প্রতিবার যা করি তাই করছি।তোমার সাথে হওয়া চ্যাট গুলো দেখছি
 
-ঐ তেলচুরা(আমায় ও এইটাই ডাকত)
-কি গুবরে পোকা(আমি এইটাই ডাকতাম)
-খাইবার দিছে আজ?
-দিবেনা কেন?
-দিবে কোন দুঃখে?
-কেন আমি কি করছি?
-তেল চুরি করছ
-চুপ গুবরে পোকা আর গন্ধ ছড়াইয়ো না
-হুরর গরু
-ঐ গরু তুমি আমি কেমনে?
-আমার Doubt আছে তুমি আসলেই মেয়ে কিনা
-হাট এখান থেকে
-ওরে আমার সোনা আর রাগ করেনা
-ঐ মেজাজ খারাপ করবানা
-ওকে sweetheart আর বলবনা
-এখন এই ফাউল কথাগুলো বলছো কেনো?
-এগুলো বললে কি হইছে?এগুলা তো দুষ্টামি
-না এগুলা বলবানা
-না আমি এরকম দুষ্টামি মাঝে মাঝে করব।তোমার কি?
-আমার না তো কার?
-হুহ!
-আচ্ছা ঠিকাছে কইরো
 
এরকম দুষ্টুমি হাসি মান অভিমানের মধ্যে দিয়েই আমরা থাকতাম।আর তুমিই ছিলে আমার জীবনের একমাত্র মানুষ যে আমার সবথেকে কাছের এবং সবথেকে বেশি প্রিয়।অথচ তুমিই সবথেকে বেশী দূরে থাকতে।সীমানার ওপারে।মানে আমার পাশের দেশে।কিন্তু কয়েক মাস এভাবে চলার পর বুঝতে পারলাম আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।আমি জানতাম তুমিও আমাকে ভালবাসো কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সংকোচ থাকত মনের ভিতর।তাই সরাসরি বলতে পারতামনা।বিভিন্ন ধরনের রূপক করে বলতাম।হয়ত এটাই আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল ছিল।যদিও তোমার সাথে আমার মিলন অনেকটা অসম্ভবই ছিল।কারন দূরত্বটা অনেক ছিল।তবুও এটাকে আমি আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুলই বলি।কারন যদি আমি সরাসরি বলতাম তাহলে তুমি কিছু হলেও করতে।কি করব বলো আমিও বোকা আর তুমি আমাকে বুঝতে পারতেনা।
 
-এই গুবরে পোকা জানো আমি একজনকে ভালবাসি।তার সাথে আমার সারাদিন কথা হয়।খুব বেশীদিন হয়নি তার সাথে পরিচিয় হয়েছে।কেমন জানি একটা আবেশে জড়িয়ে গেছি।কিন্তু তার আর আমার মাঝে অনেক দূরত্ব।
 
এই সহজ কথাগুলো তুমি বুঝতে পারলেনা।এগুলার সবকিছুই তো তোমাকে ঘিরে ছিল।আর তুমি কি করলে….
 
-তেলচুরা আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।তাই তোমার সাথে ঐরকম দুষ্টামি করতে চাইতাম।কিন্তু তুমি এখন অন্য কাউকে ভালবাস।তাই কোনো মানেই হয়না তোমাকে আর বিরক্ত করার।তুমি ভাল থেকে।আমি সরে গেলাম চিরতরে।তবে তোমার জন্যই অপেক্ষা করব।যদি জীবনের কোন গলিতে দেখা হয়ে যায়।বিদায়!
 
পরের দিন এই মেসেজটা দিয়ে তুমি আমার সাথে সবরকম যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে।আর সেটা আজকের এইদিন।জানিনা তুমি আসলেই অপেক্ষা করছ কিনা।হয়ত তুমি করবেও।কারন তুমি অনেক মহান।আমি বোধ হয় তোমার মত মহান হতে পারবোনা।আমি এই ৬ বছর করেছি।অনন্ত কাল পর্যন্ত করতাম।কিন্তু বাবা-মা কে কি বলব।তাই পরাজিত হয়ে গেছি।
 
আমি সামিরা এখন বিয়ের পিড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।এখনও একটা আশা করছি।যদি বরটা তুমি হও তাহলে হয়ত কাঁদতাম আর বলতাম আগে বলতে পারলেনা তাহলে একটু ভাল করে সেজে আসতাম।
 
কিন্তু সব আশা পূরন হয়না।তাই আমার অপেক্ষা এখানেই সমাপ্তি হল………….

আমার উনি

Now Reading
আমার উনি

“এই যে ম্যাডাম, শুনছেন?”
“জ্বি বলুন।”
“কী বলবো?”
“আপনি কী বলবেন তা আমি কী জানি?”
“আমি কি আপনাকে বলেছি যে কিছু বলবো?”
“তো ডাকলেন যে?”
“ডাকলাম কোথায়? আমিতো কেবল জিজ্ঞেস করেছি আপনি শুনছেন কিনা।”
“আমি শুনছি কিনা তা জেনে আপনার কী হবে?”
“আসলে আপনার কান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করতেই জিজ্ঞেস করেছি শুনছেন কিনা।”
“অদ্ভুত! আমার কান ঠিক থাকলেই আপনি কী করবেন?”
“এটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলেইতো কী করবো আমি?”
“আপনিই বলুন না কী করবেন।”
“যাক বাবা, ভুলে গেছি। মনে হলে অন্যদিন বলবো। আজ চলি।”
“হা হা হা! অদ্ভুত আপনি। ভীতুর ঢেঁকি। আচ্ছা, যান তাহলে আজ। আমিও চলি।”

কোনমতে চলে এসেছিলাম সেদিন। আসলে আমি গিয়েছিলাম ওকে প্রপোজ করতে। ‘ওকে’ করে কেন বলছি? আমি কি তার নাম জানি না? সারাদিনইতো তার নাম আওড়াতাম। এখন ‘ওকে’ করে কেন বলছি? উফ! তার নাম ভুলে গেছি আমি! এমন কেন হলো? তার নামইতো আমার বেশি মনে থাকার কথা অথচ তার নামই এখন ভুলে গেলাম? নাহ, ব্যাপারটা মানা যায় না। অবশ্য না মানা গেলেও করার কিছু নেই। যেই গুরু, সেই কাউ।

ওকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে যখনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়েছিল আমার মনে হয়েছে আমি আর আমি নেই। আমি কোনো এলিয়েন হয়ে গেছি। আমার হৃদপিন্ডটা কোনো এক বিশেষ পদার্থে তৈরি যার ভর এক মণেরও বেশি। ধড়াম ধড়াম শব্দে এটি স্পন্দিত হচ্ছে যার শব্দ আমার কান ছাপিয়ে তার কানেও মনে হয় চলে যাচ্ছে। আমার মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাকে প্রপোজ করার কথা ভুলে গেছি। আমার দেহের ভেতর কোথাও শর্ট-সার্কিট হয়েছে, যার দরুণ আমার দেহের বাইরে ঘাম নামক বিন্দু বিন্দু পানির কণা জমছিল। শুনেছি ঘাম নামক এই পানির কণার স্বাদ নাকি নোনতা। কখনো চেখে দেখা হয়নি। সেই সময় একটু চেখে দেখা যেত। অবশ্য সেই সময় আমার জিহবাটা কাজ করতো কিনা সন্দেহ ছিল। শর্ট সার্কিটের কারণে জিহবার ইলেক্ট্রিসিটির লাইনটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিনা কে জানে। শরীরটাও বেশ দুর্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল দেহের পাওয়ার প্লান্টে গোলমাল হয়েছে। যেকোন সময় বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারি। অবশ্য মনে মনে তাই চাইছিলাম যেন বিস্ফোরিত হলেও অন্তত তার চোখের সেই দৃষ্টির বাইরে যেতে পারি। তবে ভাগ্য ভালো দেহের অক্সিলিয়ারি পাওয়ার সিস্টেম দ্রুত চালু হয়ে কোনোভাবে আমাকে সেই অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিল।

তবে একটা প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর এখনো আমি পাচ্ছি না। সে আমাকে ভীতু কেন বলেছিল? কয়েকদিন আগে কুকুরের দৌড়ানি খেয়ে তার সামনে দিয়েই পালিয়েছিলাম বলে? এতে ভীতু ভাবারতো কোনো কারণ নেই। তাকে কুকুর দৌড়ানি দিলে সে কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো? তাহলে কেন ভীতু বললো? আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে তাকে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম এটা সে বুঝতে পেরেছে? যদি বুঝতেই পেরে থাকে তাহলেতো এটাও বুঝে ফেলেছে যে আমি আর ভয়েই প্রপোজ করিনি পরে। ইশ! কী লজ্জা! এখন আমি ওর সামনে আবার যাবো কিভাবে? আমাকে আশেপাশে দেখলেই বা সে কী ভাববে? ছোটবেলায় একবার কুকুরের কামড় খাওয়ার পর থেকেই কুকুরকে আমি ভীষণভাবে এড়িয়ে চলি। দেখলেই ভয় করে। এখনতো মনে হচ্ছে তার কামড় না খেয়েও তাকে আমার এড়িয়ে চলতে হবে। হয়তো দেখলে ভয় পাবো না, কিন্তু যে লজ্জাটা পাবো তা কি যেকোনো প্রকার ভয়ের থেকে বেশি নয়? বুঝেছি আমার এ জীবনে তাকে আর প্রপোজও করা হবে না, পাওয়াও হবে না। আমার পিউর লাভের এভাবে সমাপ্তি খুবই বেদনাদায়ক। যাই, এবার একটু ঘুমুই। কাল থেকে তাকে এড়িয়ে চলার প্রস্তুতি নিয়ে চলতে হবে।

“এই যে মিস্টার, এতদিন কোথায় ছিলেন? আমার কান ঠিক থাকলে আপনি কী করবেন তা এখনো মনে হয়নি?”

যাক বাবা, ধরা খেয়ে গেলাম। এতো প্রস্তুতি নিয়ে এড়িয়ে চলেও কোনো লাভ হলো না। কিন্তু এখন আমি কি উত্তর দিব? আর আজ যদি কোনো উত্তর না দিই তাহলেতো ও আমাকে পেলেই এটা জিজ্ঞেস করবে আর আমি প্রতিনিয়ত লজ্জার চুকা কামড়ে লাল হবো। উফ! দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনি কিছু একটা উত্তর দিতে হবে। খোদা, আজ একটু সহায় হও। আজ যেন আর এলিয়েন না হই, পাওয়ার সাপ্লাইয়েও যেন আর গন্ডগোল না হয়।

“ইয়ে মানে……ইয়ে মানে আরকি ইয়ে…”
“কিসব ইয়ে ইয়ে করছেন? আমি ইয়ো ইয়ো সং শুনতে আসিনি। কান ঠিক থাকলে কী করবেন সেইটাই বলুন।”
“আসলে হয়েছে কি আপনার কানটা অনেক সুন্দর। ওটা ঠিক আছে কিনা তাই জানতে ইচ্ছা হয়েছিল।”
“কান সুন্দরের সাথে ঠিক আছের কী সম্পর্ক?”
“যেমন ধরুন অভিনেত্রী সারিকা, ওর চেহারাটা কত সুন্দর অথচ কন্ঠটা কেমন ঘেড়ঘেড়ে। তাই ভেবেছিলাম আপনার এতো সুন্দর কানেও কোনো ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা আছে কিনা।”
“কানে আবার কীরকম ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা থাকে?”
“ইয়ে মানে হতে পারে না যে আমি খুব সুন্দর কন্ঠে কথা বললাম অথচ আপনি সেটা ঘেড়ঘেড়ে কন্ঠে শুনলেন কিংবা একেবারেই শুনলেনও না, আই মিন বয়রা, হতে পারেন না?”
“কী!!! আপনি আমাকে বয়রা বললেন? আপনার বাড়িতে আজ বিচার দিব।”
“না না, আপনাকে আমি বয়রা বলিনি। আপনি বয়রা হলে কি আমাকে আজ এভাবে উন্মুক্ত জেলখানায় বন্দী হয়ে জেরায় পড়তে হতো?”
“ওতসব আমি বুঝি না। এক হয় এবার আসল সত্যটা বলুন, নাহয় আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে বিচার দিব যে আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সুন্দর কান খুঁজেন। খুঁজে পেলে সেটা ঠিক আছে কিনা জানার জন্য রাস্তার মাঝেই ডাকও দেন।”

ফাইস্যা গেছি, পুরা মাইনকা চিপায় ফাইস্যা গেছি। খোদা, আমার বুদ্ধিটা একটু খোলে দাও। সত্য না বলে এবার উপায় নাই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সত্য বলে দেওয়াই ভালো হবে। আর এমন সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবেও না। এইতো আমার বুদ্ধি খুলতে শুরু করেছে। এবার তাহলে আরেকটু ভাবি। সেদিন যেভাবে আমাকে ভীতু বলেছে তার মানে ও জানে আমি তাকে প্রপোজ করতে চাচ্ছি। আর জানার পরেও ও যেহেতু আজ নিজেই আমাকে ডেকেছে তার মানে ও চায় আমি তাকে প্রপোজ করি। আর ও যেহেতু চায় আমি তাকে প্রপোজ করি এর অর্থ বেশিরভাগ সম্ভব ও রাজী। মেয়েদের বুক ফাটেতো মুখ ফাটে না স্বভাবের কারণেই হয়তো ও সরাসরি কিছু বলতে পারছে না, আমাকে দিয়েই বলাতে চাচ্ছে। সুতরাং সমস্যা সব ডিশমিশ। এবার প্রপোজটা করেই ফেলি। তবে একটু ভিন্নভাবে করলে কেমন হয়? উইল ইউ মেরি মি কিংবা তোমাকে পছন্দ করি ভালোবাসি কমন হয়ে গেছে, কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে! একটু ভিন্নভাবে এপ্রুচটা নিই। কান নিয়েই যেহেতু কথা হচ্ছে তাই কান দিয়েই প্রপোজ করি।

“এই যে মিস্টার…, এতো কী ভাবছেন? সত্য বলতে ভয় হচ্ছে? আজ কোনো ভয় টয় মানবো না। এক হয় সত্য বলবেন নাহয় বাড়িতে বিচার যাবে, হু, বলে রাখলাম।”
“আচ্ছা বলছি।”
“হু, বলেন।”
“আপনার ওই সুন্দর কান দুটোকে, মধ্যরাতে, ফিসফিসিয়ে কথা শোনাতে চাই, এবং তা বাকিটা জীবনের প্রতিটা দিনের জন্য। দিবে আপনার কানটা ওই অধিকারটুকু?”
“কানকেই জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো বলতে পারে না, কেবল শুনতে পায়।”
“তবে কান কথা শুনে সে কথা যাকে পৌঁছে দেয় তাকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো কথাটুকু শুনে নিজের কাছে রেখে দেয়নি। যাকে পৌঁছে দেওয়ার তাকে ঠিকই দিয়েছে। তবে সে কেন উত্তর দিচ্ছে না?”
“তাকে সরাসরি একবার জিজ্ঞেস করেই দেখুন না উত্তর দেয় কিনা।”
“আচ্ছা মেয়েতো বাবা!”
“হুম, আমি আচ্ছা মেয়েই। এখনো সময় আছে ভেবে দেখার। সময় থাকতে সাবধান।”
“যা ভাবার অনেক আগেই ভাবা হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো ভাবাভাবি হবে না। আচ্ছা, বলছি।”
“হুম, বলুন।”
“বাকীটা জীবনের প্রতিটা মধ্যরাতে আপনার কানে ফিসফিসিয়ে কথা বলার অধিকারটুকু দিবেন আমায়?”
“উফ! কী ক্ষ্যাত! আপনি করে বলে! আপনি করে বললে দিবো না।”
“ওরে বাবা! এ কার পাল্লায় পড়লাম! আচ্ছা তুমি করে বলছি।”
“কার পাল্লায় পড়েছেন পড়ে বুঝাবো। এবার বলুন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম, “বাকীটা জীবনের প্রতিটা রজনীর মধ্যাংশে তোমার কানে ফিসফিসিয়ে লজ্জা নম্রত কন্ঠে কথা বলার অধিকারটুকু দেবে আমায়?”

এরপর ওর উত্তর কী হয়েছিল তা বোধ করি না বললেও চলবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই যে ওর নাম ভুলেছি আর মনে পড়েনি। ওকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায়ও নেই! জিজ্ঞেস করলেই নিশ্চিত বারোটা বাজাবে। সম্পর্ক হতে না হতেই তা হুমকীর মুখে পড়বে। আবার আমি চাইলেই অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে ওর নামটা জেনে নিতে পারি। ও হয়তো জানবে না ওর নাম ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা, কিন্তু আমি মনে করি আমার ভেতর ওর যে সত্তাটুকু আছে তাকে অপমান করা হবে। আমি ওর নাম ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি তা কেমন করে হয়? ওয়েট! ওয়েট!! আমার ফোনেইতো ওর নাম আছে। ওর নামে কয়েকটা কবিতা লিখেছি, সেগুলো ওপেন করলেইতো কবিতার মাঝে ওর নাম পাবো। কিন্তু না, আমি এটাও করবো না। আমি জানি ওর নামটা আমার মনের কোথাও না কোথাও আছে। হয়তো আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। তবে ধরা এক সময় ঠিকই পড়বে। কিন্তু ততদিন? ততদিন ওকে মনে মনে কী নামে ডাকবো? “ও” কেমন হয়? আই মিন “আমার ও”। না না, এটার চেয়েও আরেকটা আদুরে নাম দেওয়া যায়। “উনি”। রুনি, মুনি, ভুনি কত নামইতো হয়। আমি নাহয় আপাতত মনে মনে ওকে “উনি” বলেই ডাকলাম।

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik

অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব

Now Reading
অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

তার প্রতি যে আমি একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করছিলাম এটা সত্যি। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম এই আকর্ষণ শুধু ভাললাগার নয়। আমার কল্পনার জগতে তার ছিল নিত্য চলাচল। আস্তে আস্তে সে হয়ে উঠছিল আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ যখন হৃদয়ের এত কাছে চলে আসে তখন মনে একটা ভয়ের উদয় হয়, একটা সূক্ষ্ম কিন্তু প্রখর ব্যাথা অনুভূত হয়; ভয়টা হারিয়ে ফেলার আর ব্যাথাটা তার যন্ত্রণার। আমি তাকে হারাতে চাচ্ছিলাম না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল আমার সর্বস্ব দিয়ে হলেও অন্তরের অন্তঃস্থলে তাকে আগলে রাখব, বিস্বাদ নীলিমার কোন স্পর্শ লাগতে দেবো না তার মনে, তার চোখে জমতে দেবো না কাল মেঘ। সে কে এই প্রশ্নটা বোধ হয় মন থেকে তখন উধাও হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক।

তার একটা নাম দেয়া প্রয়োজন ছিল। ‘নাম’ যদিও কেবল একটা সম্বোধন তবুও আমি চাচ্ছিলাম এমন একটা ‘বিশেষ্য’ যার মাধ্যমে তাকে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত করা যায়। আমি মনে মনে যে নামটা ভেবে রেখেছিলাম সেটা তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে সামর্থ্য না হলেও সার্বিক বিবেচনায় সার্থকতার পাল্লাটাই হয়তো বেশি ভারী হবে।

আমার অনিদ্রায় কাটানো রাতটা ব্যর্থ হয়ে গেল যখন পর পর দুই দিন তার দেখা না পেলাম। প্রথম দিন তেমন কিছু মনে হয় নি। আমি তার জন্য আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে গেলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিনও যখন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো সেটা আমি আর স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলাম না। মনের মধ্যে একটি শুন্য স্থানের সৃষ্টি হয়েছিল। এটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক সেটা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আমার তখন ছিল না।

দ্বিতীয় দিন আমি তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। মনের মধ্যে একটি ক্ষীণ আশা ছিল তার দেখা পাব। কিন্তু ভাগ্য আমাকে নিরাশ করার প্রতিজ্ঞা করে বসে ছিল সেদিন। তার এই হঠাৎ অনুপস্থিতি আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল। আমি কিছুই ভেবে বের করতে পারছিলাম না। আমার ধীর পদক্ষেপ আমাকে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আমার মন ওই আধঃ আলোকিত জায়গাটাতেই পরে ছিল।

এর পরের দিনটা আমার একদমই ভাল কাটেনি। মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম যাতে সেদিন তার সাথে দেখা হয়। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ও তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু ফলাফল শুন্য।

সেদিন রাতে পড়ানো শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। রোড পার হবার জন্য দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনি আমার পিঠে একটা হালকা স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি পিছন ফিরতেই দেখলাম আমার বিসন্নতার কারণ হওয়া সেই রাজকুমারী আর তার চিরচেনা হাসি। আমার তখন কেমন লাগছিল তা বর্নমালায় ব্যাক্ত করার মত না। আমি জানি না এইটুকু সামান্য ঘটনায় কারো প্রেমে পড়া যায় কিনা। কিন্তু আমি নির্লজ্জের মত তার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম সেই মুহুর্তে। আমার গত তিন দিনের এত বিষণ্ণতা, হতাশা সব ডুবে মরেছিল তার হাসিতে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম; কোথায় ছিলে এত দিন?

সে বলল; এত দিন কোথায়? মাত্র দুই দিন।

– আমার কাছে এই দুটি দিন, দুটি বছর ছিল।

– পড়াতে গিয়েছিলে? নাকি সিনেমা দেখতে?

– সিনেমা কেন দেখতে যাব?

– তাহলে ডায়লগ কেন দিচ্ছো?

এরপর কি বলবো আমি বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর ও বলল; ‘চল’।

কোথায় যাব জানতে চাইলে তার কাছ থেকে যে কোন উত্তর পাবো না তা আমি নিশ্চিত। তাই কোন কথা না বাড়িয়েই তার সাথে চলা শুরু করলাম।

আমরা যেখানে পৌছালাম, সেটা একটা লেকের পাড়। আমাদের আড্ডা দেবার আর একটা জায়গা। রাতের এই সময়টাতে সেখানে মানুষের চলাচল এতটা নেই। ল্যাম্বপোস্টের আলোয় আমরা হাটছিলাম। নীরবতা ভেঙে সে বলল; “তুমি যে এই দুই দিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আমি জানি। আমার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলে সেটাও খেয়াল করেছি। আমি ইচ্ছে করেই আসলে আসিনি এই দুই দিন। দেখতে চেয়েছি আমার ছোঁয়াচে পাগলামী তোমার মাথা কতটা খারাপ করতে পারে।”

– তারপর কি দেখলে?

– দেখলাম, আমি তোমাকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি বোকা তুমি।

– কিভাবে?

– এই, তুমি এত বেশি বেশি প্রশ্ন কর কেন বলতো?

– আচ্ছা, করবো না প্রশ্ন। কিন্তু আমার মাথায় যে প্রশ্নগুলো ঘুরছে সেগুলোর কি হবে?

– সেগুলো প্রশ্নই থাক। আস্তে আস্তে খুজে নিও উত্তরগুলো।

এরপর কিছুক্ষনের নীরবতা আবারো। সে আর আমি পাশাপাশি লেকের পাড়ে এক ব্যাঞ্চে। সময় তখন রাত দশটার কাছাকাছি। আমি বললাম; “চল ফিরি।” সে কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো। আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম। হঠাৎ সে বলল; “মনে আছে তোমার আর আমার একটা ফার্মেসীতে দেখা হয়েছিল? সেদিনই আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম। তারপর আরো অনেক বার দেখেছি তোমাকে, অনেক জায়গায়। এই দেখতে দেখতেই কবে যে তোমাকে ভাল লেগে গেছে আমি জানি না। অনেকবার ভেবেছি কথা বলবো। কিন্তু পারি নি। ভয় আর দ্বিধাকে উপেক্ষা করতে আমার লেগে গেছে এক বছর চার মাস ছাব্বিশ দিন।”

আমি অবাক হয়ে ওর কথাগুলো শুনছিলাম। আমার বলার মত কিছুই ছিল না তখন। মেয়েটি তখন বলল; তোমাকে না আমার একটা নাম দিতে বলেছিলাম? কি নাম ভেবেছো?

– পরী।

– হা হা হা। আমি জানতাম, তোমার মাথায় এর চেয়ে ভাল নাম আর আসবে না।

– আমার জন্য কি নাম ভেবেছিলে?

– আমি তো কোন নাম ভাবিনি।

– কেন?

– আমার ইচ্ছা। তোমার কি তাতে।

আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়ালাম না। বললাম; আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি?  সে হেসে বলল; “পরীকে ছুঁয়ে দেখতে চাও?” বলে সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

আমি তার হাতে হাত রাখার পর সে বলল; ” আমি পরী নই, মানুষ”।

অনুসন্ধান (৩য় পর্ব)

Now Reading
অনুসন্ধান (৩য় পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

বছর খানেক আগে ডাইরিটার শেষ লেখার মাধ্যমে শেষ করেছিলাম জীবনের একটা পুরনো অধ্যায়ের। এখন কি আবারও নতুন একটা পাতায় নতুন করে লিখতে যাচ্ছি তেমনি কোন কাহিনী? ভয় হচ্ছিল কারণ আগের মত এটাও যদি অসমাপ্ত থেকে যায়? যদি জীবনের পাতা অলেখা থাকতেই আবারও ফুরিয়ে যায় শব্দ গুলো? অসমাপ্ত সকল কিছুতে অনেক ভয় আমার। কেননা, অপূর্ণতা না যোগায় বাঁচার অবলম্বন আর না’ই বা করে পুরোপুরি নিঃস্ব।

সে যা’ই হোক, সবকিছুর পরেও হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা অন্যরকম ভাললাগা কাজ করছিল। একটা মেয়ে আমাকে এভাবে ভাবে, আমি কখন বাইরে যাই, কখন ফিরি তার খেয়াল রাখে, এর থেকে ভাল লাগার আর কি হতে পারে? নিজেকে সিনেমার নায়কের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হচ্ছিল না। একটা অস্থিরতা কাজ করছিল মনে, কিন্তু সে যে ভাল লাগারই সেটা বোঝাও কষ্টকর ছিল না।

পরদিন যথা সময়ে জায়গামত যেয়েও মেয়েটাকে পাওয়া গেল না। আমি চলে না এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যদিও সেদিন সে আসবে কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। তবুও…। অপেক্ষার প্রহরগুলো অনেক বেরসিক হয়। যেন সময় একেবারেই থমকে দাঁড়ায়। আমার মতে অপেক্ষা করার মত বিরক্তিকর কাজ আর নেই। যদিও এই সময়ে এই জায়গায় মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম। তবুও মনে হচ্ছিল আশেপাশের মানুষগুলো চলার পথে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। প্রায় ২০ মিনিট পর তাকে দেখা গেল; আমার দিকেই আসছে। আমাকে দেখে সে তার চলার গতি স্বাভাবিকতার চেয়ে খানিকটা বাড়িয়ে দিল। আমি আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম সে আমার উপর রেগে আছে, রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক।  কেননা আমি এই ২০ মিনিট অপেক্ষা করেই হাঁপিয়ে গেছি, না জানি সে গতকাল কত সময় অপেক্ষা করেছে। তার রাগের মাত্রা কত ডিগ্রি সেটা জানতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। কাছে এসেই সে কোন কথা না বলে আমার শার্টের কলার টেনে ধরল। এমন একটা ভাব যেন আমাকে এখনি শূন্যে নিক্ষেপ করতে পারে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সেদিন তার আচরণে আমি একটুও বিচলিত হলাম না। বরং ভাল লাগছিল। তাই নিজেকে ছাড়ানোর কোন চেষ্টাই ছিল না আমার। এমন একটা পরিস্থিতিতেও যে মানুষের ভাল লাগা কাজ করতে পারে সেটা ভেবেই যেন অবাক হলাম। সে শুরু করল তার কথার গোলা বর্ষণ। আমার শার্টের কলার টানতে টানতে সে বলল;

“ওই, কালকে তোকে কখন থাকতে বলেছিলাম, আসিস নি কেন? কোথায় ছিলি এত রাত পর্যন্ত? বল?”

আমি পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম এই ভেবে যে গতদিন তবু ‘তুমি’ পর্যন্ত ছিল। আজ সরাসরি তুই! আগামীতে কি বলবে কে জানে। আমি অনুতপ্ত আসামীর মত পুরো ঘটনাটার বর্ণনা দিলাম। শুনে সে বলল;

– বন্ধুর জন্মদিন তাহলে আগের দিন বলে দিলি না কেন?

– আমার মনে ছিল না।

দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল; “ কি মনে থাকে তর?”

আমি তার থেকে যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় আমার কলার ধরার জন্য তাকে আমার অনেকটা কাছে সরে আসতে হয়েছে। আর উত্তেজনার বশে কথা বলতে বলতে সে দূরত্বটাও অনেক কমে এসেছিল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম আর প্রত্যক্ষ করছিলাম কথার ভঙ্গিতে কিভাবে তার ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠে, সেই ঠোঁট একটু বেঁকে গেলেই কিভাবে শ্রোতাকে আকৃষ্ট করার জন্য গালে সৃষ্টি হয় টোলের। সে অসম্ভব রকমের সুন্দরী। তার পুরো মুখমণ্ডলে সদ্য জন্মানো একটা অবাধ্য ব্রণ ছাড়া আর কোন দাগ নেই। কিন্তু ডান পাশে থাকা ব্রণটি তার সৌন্দর্যকে একটুও না কমিয়ে বরং আরও বৃদ্ধি করেছে, সমস্ত চেহারাকে করেছে আরও নিষ্পাপ। সে যখন বুঝতে পারলো আমরা এতটা কাছাকাছি, তখন সে এক ঝটকায় আমার শার্টের কলার ছেড়ে দিল এবং স্বাভাবিক দূরত্বে দাঁড়ালো। এতক্ষণ যে মেয়েটি উচ্চশব্দে আমাকে শাসাচ্ছিল, সে’ই এখন মূর্তির মত নির্বাক হয়ে গেছে। লজ্জায় সে কোন কথা বলতে পারছিল না। তার দৃষ্টি ছিল নিচের দিকে। এ যেন সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন চরিত্র। তার নিস্তব্ধতায় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চারপাশ, যেন প্রকৃতিও তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য জানাচ্ছিল সমবেদনা।

কিছুক্ষণের মৌনতা ভেঙ্গে আমি জিজ্ঞাসা করলাম

– রাগ কমেছে আপনার?

সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

আমি প্রশ্ন করলাম

– আচ্ছা, আপনি আমার দিকে এত নজর রাখছেন কেন? কবে থেকেই বা রাখছেন?

– আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই। আমি তো কাউকে কোন কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।

– কৈফিয়ত চাইছি না। শুধু জানার ইচ্ছা।

– সব ইচ্ছাই কি পূর্ণতা পায়?

– তা হয়তো পায় না। কিন্তু যেটাকে ইচ্ছা করলেই পূর্ণতা দেয়া যায় তাকে পায়ে ঠেলাও তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই না?

– তোমাকে বুদ্ধিমান বানানোর ভার তো আমি নিয়ে রাখিনি।

– তাহলে বোকা কেন বানাচ্ছেন?

আজ আসার আগে ভেবেছিলাম ও’কে ‘তুমি’ বলে ডাকবো। কিন্তু সে আমার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ায় সব গুলিয়ে ফেলেছি। শেষ প্রশ্নটা করার পর সে শুধু হাসল। কে যেন বলেছিল; কারও হাসিতে মৃত্যু লেখা থাকে, কেউ হাসির ফাঁদে যে কাউকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তার হাসিতে আমার অনুর্বর আত্মার মৃত্যু ঘটেছিল কিনা জানি না কিন্তু আমি যে আস্তে আস্তে তার ফাঁদে বন্দি হচ্ছিলাম সেটা নিশ্চিত। সে তখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি বললাম ; উত্তর দিচ্ছেন না যে? সে বললঃ

– যদি একটা মানুষ সম্পর্কে সব কিছু জানা শেষ হয়ে যায় তাহলে তার প্রতি আকর্ষণও  ফুরিয়ে যায়, আস্তে আস্তে সে মূল্যহীন হয়ে পরে। আমি মূল্যবান থাকতে চাই তোমার কাছে। না হয় এই অনুসন্ধানের আকর্ষণেই তুমি আমাকে মনে রাখবে, কাছে টানবে।

এর উত্তরে আমার কি বলা উচিৎ ছিল আমি জানি না। তাকে জোর করারও কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি নি। শুধু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম; “তাহলে কি প্রশ্নগুলো বিনা উত্তরেই পরে থাকবে?”

সে বলল; অবশ্যই না। আমারও অনেক প্রশ্ন আছে তোমার কাছে। কিন্তু এখন সে প্রশ্নের সময় নয়। আস্তে আস্তে তোমাকে আবিষ্কার করে নেব নিজের মত করে। আচ্ছা তোমার নাম টা তো বললে না?

– সেটাও ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেই?

– ঠিক আছে। কিন্তু এখন একটা নাম তো চাই, তুমি একটা নাম দাও আমার।

হটাত করে কি নাম দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। যদি তার পছন্দ না হয়? আমার সব থেকে কাছের বন্ধু মাসুমকে তার প্রেমিকা রূপাই নামে ডাকতো। সে মাসুমকে বলেছিল তার ও একটা নাম দিতে। বর্তমানে প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে রোমান্টিকতার একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছদ্ম নাম। আর সে নামের মধ্যেও থাকতে হয় মিল। যেমনঃ রোমিও- জুলিয়েট, শিরি- ফরহাদ। তেমনি রূপাই এর বিপরীতে সাজু ছাড়া অন্য কোন নাম ই যথাযত নয়। তাই মাসুমও তার প্রেমিকার নাম দিয়েছিল ‘সাজু’। মাত্র একবারই সে এই নামে ডাকতে পেরেছিল। আর এতেই তার প্রেমিকা ক্ষেপে গিয়েছিল। মেয়েটির মতে নামটা ছিল ‘বিশ্রী’। আর এমন নাম দেয়ার ফলাফল স্বরূপ তাদের সম্পর্কেরই ইতি টানতে হয়েছিল। যার মাথায় সাহিত্য ঢুকে নি, তার প্রেম হয়তো ততটা গভীর হয়না। আমার যদিও সম্পর্ক ভাঙার কোন ভয় ছিল না, তবুও নাম পছন্দ না হলে এই দুর্ধর্ষ মেয়েটি আমাকে দুই তিন টা ঘুষি মেরে আমার দাঁত ভেঙ্গে দিতে পারে আমি নিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে পরার আগেই আমি বললাম; “নাম রাখার জন্য আমাকে কিছু সময় দাও”। এই প্রথম আমি তাকে তুমি বললাম। সে যে খুশি হয়েছে সেটা তার মুখ দেখে অনুমেয়। সে বলল-‘কতটা সময়?’

– কয়েক বছর।

– আরও কিছু সময় নাও। এই যে ধর দুই তিন যুগ? হবে?

আমি মজা করে বললাম “এর মধ্যেই হয়ে যাবে”। সে বলল; “কালকে নাম বলবে, না হলে কি করি দেখবে। এখন যাই অনেক দেরি হয়ে গেছে”।

যদিও আমাদের পথ একই দিকে তবুও সে আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গেল। আমি তার পথের পাণে চেয়ে রইলাম। তার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল আমার দৃষ্টি। মনে হচ্ছিল এমনই ধীর পদক্ষেপে সে প্রবেশ করছে আমার মনে, আমার শিরায়-উপশিরায় বা তার থেকেও অস্তিত্বের কাছাকাছি যদি আর কোন জায়গা থেকে থাকে তাহলে সেখানটাতেই।

(চলবে…)

অনুসন্ধান (২য় পর্ব)

Now Reading
অনুসন্ধান (২য় পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

অনেক চেষ্টা করেও ঘুমের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। চিন্তার গভীরতা এতটাই প্রবল ছিল যে সেটা ঘুমের দেয়ালকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিয়েছিল। কোন ভাবেই ওই ঘটনাটা  মন থেকে সড়াতে পারছিলাম না। এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যেন মনে হচ্ছিল আমি যদি কোন কার্টুন চরিত্র হতাম তাহলে অবশ্যই আমার মাথার উপর বিশাল আকৃতির একটা বিস্ময়সূচক ও হাজারটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখা যেত।

পরদিন সকাল থেকেই মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। যত সময় যাচ্ছিল ততই সেই অস্থিরতা বাড়ছিলো। আমি রাতের অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু সেদিন সময়কে মনে হয় একটু বেশিই অলসতায় পেয়েছিল, তাই তার বয়ে চলার গতি ছিল মন্থর। আসলে সময়ের জন্য অপেক্ষা করলে সে অপেক্ষা হয় অনন্তকালের, আর তাকে বেঁধে রাখতে চাইলে সে রূপ নেয় সাইক্লোনে। আমি তখনও মেয়েটার প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করিনি। এত সহজে আমি কোন কিছুতেই আকৃষ্ট হই না। আমাকে শুধু টানছিল তার কথা গুলো, আর কিছু প্রশ্ন যার উত্তর জানা ছিল জরুরী। কেননা এগুলোর জন্য আমি স্থির হতে পারছিলাম না।

আস্তে আস্তে সমস্ত পৃথিবীকে আলিঙ্গন করল আধার আর আমার মনে জ্বলে উঠলো একটা আলোকছটা। কিন্তু সেটা ভাল করে জ্বলার আগেই ধপ করে নিভে গেল। ভাগ্যটা সেদিন ছিল বৈরি। পড়ানো শেষ করে বের হতেই বাঁধন ফোন করল। ও বলল “সবাই অপেক্ষা করছে, চলে আয়”। বলেই ফোন রেখে দিল। আমি জানতাম ওরা কোথায় আছে। প্রায় দিন পড়ানো শেষ করে আমরা আড্ডা দেই Exim Bank এর সামনের খালি জায়গাটায়। আমার বাসায় ফেরার রাস্তাও সেটাই। আমি ভাবলাম যে কোন একটা অজুহাত দেখিয়ে ৯ টার মধ্যেই সেখান থেকে চলে আসব। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম বাঁধন, সালমান, রাকিবুল, রিমন আর তারিকুলকে। সালমান সাভার থাকে, এই সময়ে ওর এখানে আসবার কথা নয়। জিজ্ঞাসা করব তার আগেই বাঁধন আমার হাত টেনে ধরে বলল – চল।

– কোথায়?

– ভুলে গেছিস আজ না মিজানের জন্মদিন?

– ও হ্যাঁ। ভুলেই তো গেছিলাম।

– আচ্ছা চল এখন। কেক আনতে হবে। মিজানকে ৯ টায় আসতে বলছি। এর মধ্যে আমরা সব ঠিক করে ফেলব।

আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু এটা নিশ্চিত ছিলাম যে আমার আর আজকে ওই মেয়েটার সাথে দেখা হবে না। যেটা সম্ভব হবে না সেই জিনিস নিয়ে আমি চিন্তায় পরে থাকি না। কারন এতে ফলাফল স্বরূপ মস্তিষ্কে কিছু চাপ আর মনে খানিকটা  হতাশা ছাড়া প্রাপ্তির খাতায় আর কিছুই জমা পরে না। তাই আর কিছু না বলে বাঁধনের সাথে পা বাড়ালাম। সব বন্ধুদের সাথে একত্রিত হওয়ার পর যত প্ল্যান তা বরাবরই আমার আর বাঁধনের করতে হয়; সেটা কোন অনুষ্ঠান হোক বা কোথাও ঘুরতে যাওয়া হোক। আর খাওয়া-দাওয়ার সমস্ত ভার মিজানের; আমার মনে হয় ও এই জিনিসটাই সবচেয়ে ভাল করতে পারে।  প্রতিবার যে কারো জন্মদিনে আমাদের সাথে আরও বন্ধুরা থাকে। কিন্তু এবার শুধু এই কয়েকজন। কেননা সবাই তাদের নিজেদের জীবন গড়তে দূরের পথে পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের বন্ধুমহলে আরও ২ জন আছে, সান্ত্বনা আর সুমাইয়া। যে কোন বিশেষ দিনেই তারা আমাদের সাথে যোগ দেয়। এবার সান্ত্বনা মেডিকেল কলেজে থাকার কারনে আসতে পারে নি। আর সুমাইয়ার অবস্থান এখন নেটওয়ার্কের বাইরে। তাই আমরা যারা এই এলাকাতে থাকি শুধু তারাই আছি।

মজা আর আড্ডার পর্বের যবনিকা টেনে যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন রাত ১০.৩০। অতএব সেই নারীর আমার জন্য অপেক্ষার পালা যে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে সেটা পরিষ্কার। আমার আর রাকিবুলের বাসা একই দিকে। বাসায় ফিরতে আমরা যেখান থেকে পৃথক হই সে পর্যন্ত এসে কোন দিনই আমাদের কথার সমাপ্তি ঘটে না। সেদিনও তার অন্যথা ঘটলো না। তাই সেখানে বসে দুই কাপ চা এর সাথে এই কথা সেই কথায় কেটে গেল আরও আধ ঘণ্টা।

আমি আমাদের বাসার গলিতে ঢুকলাম। আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম সে এখানে নেই। তবুও ওই আধো অন্ধকার জায়গাটার দিকে একবার তাকালাম।  নিরাশ হয়ে অগ্রসর হলাম সামনে। হটাত করে মেয়েটার বাসার বারান্দায় চোখ পড়লো। আমি এই এলাকায় ৬ বছর ধরে আছি কিন্তু কখনও ওইদিকে আমার চোখ যায়নি। আজ হটাত স্বাভাবিকতার বিপরীত । আমি দেখলাম সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই ভেতরে চলে গেল। আমি আমার মত বাসার দিকে ফিরছিলাম। ওদের বাসার ঠিক নিচে আসতেই ঘটল আর একটা অবাক কাণ্ড যেটা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। অবশ্য তার সাথে কথা হবার পর থেকেই জীবনের সব অকল্পনীয় জিনিস গুলো ঘটে চলেছে। আচমকা উপর থেকে আমার মাথা বরাবর কে যেন পানি ঢেলে দিল। বিষয়টা কি হল বুঝে উঠার আগেই আরও একবার পুনরাবৃতি ঘটল সেটার। আমি পুরো কাক ভেজা হয়ে গেলাম। কে এই কাজটি করেছে সেটা না বুঝার কোন কারন নেই। তবুও একবার ২ তলার বারান্দার দিকে তাকালাম।  যাকে কল্পনা করেছি সে’ই। তার হাতে আরও এক জগ ভর্তি পানি। কি সাংঘাতিক! তার মানে তার ইচ্ছা আমাকে আরও একবার ভেজানোর। আমি তার দিকে রাগান্বিত হয়ে তাকাতেই সে থমকে গেছে। আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। কিছু না বলে পেছন ফিরে চলতে শুরু করতেই সে ওই পানিটুকুও আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।

মেঘ বৃষ্টিহীন মাঝরাতে কেউ কাক ভেজা হয়ে বাসায় ফিরবে এটা বোধ করি বাসার অন্যান্য সদস্যরা কখনই চিন্তা করে না। আমার ক্ষেত্রেও তার বিপরীত ঘটল না। আমার ছোট ভাই সৌরভ বরাবরই একটু ড্রামাবাজ। দরজা খুলেই ভূত দেখার মত একটা চিৎকার দিয়ে ভেতরে চলে গেল। আমার বাবা মা ড্রয়িং রুমেই বসে ছিলেন। অনেকক্ষণের প্রশ্ন উত্তর পর্বের পর আমি তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হলাম জন্মদিন উপলক্ষে পানি ছুঁড়াছুঁড়ি খেলার নিদর্শনই আমার সর্বাঙ্গ বহন করছে। আমার মা তার সবচেয়ে পরিচিত ডায়লগ দিয়ে প্রশ্ন উত্তরের পর্ব শেষ করলেন। তিনি বললেন ওদের সাথে আর না মিশতে। আমি যে এত বড় হয়ে গেছি সেটা আমার মা কখনই ভাবেন না। সত্যি, মায়ের কাছে সন্তান সব সময়েই শিশু। আমি হ্যাঁ  সূচক মাথা নাড়িয়ে আমার ঘরে আসলাম। ভেজা শরীরে খাটের উপর বসে পুরো ঘটনাটা আবারও মনে করলাম। এতক্ষণ মেয়েটার উপর অসম্ভব রকম রেগে ছিলাম। কিন্তু এমন দুর্ধর্ষ কাজ কেউ করতে পারে সেটা ভাবতেই সমস্ত রাগ চলে গেল। পাগলের মত উচ্চস্বরে হাসলাম কিছুক্ষণ। আমি একটা ঘটনার কারনে গত ১ বছর ধরে ডাইরি লিখি না। কিন্তু সেদিন পুরনো ডাইরিটা খুজে বের করে শুধু লিখলাম

“অদ্ভুত!… হা! হা!! হা!!!…”

অনুসন্ধান (১ম পর্ব)

Now Reading
অনুসন্ধান (১ম পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

রাত তখন প্রায় ৯ টা। আমি টিউশন শেষে বাসায় ফিরছিলাম। আমাদের বাসায় যাওয়ার গলিতে ঢুকতেই পেছন থেকে শুনতে পেলাম একটা মেয়ে “এই যে, এই যে” বলে কাকে যেন ডাকছে। এই এলাকায় অনেক দিন ধরে থাকার পরও কারো সাথে আমার তেমন পরিচয় নেই। আর যাদের সাথে একটু পরিচয় আছে তাদের কেউ ই মেয়ে নয়। তাই আমাকে কেউ ডাকবে সেটা কল্পনা অযোগ্য। সুতরাং কে কাকে ডাকছে সেদিকে লক্ষ্য করার আমার বিশেষ কোন কারণ নেই। আর সারাদিন পরে বাসায় ফেরাটাই আমার এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ। তাই স্বভাবত বেখেয়ালি ভাব নিয়ে নিজের পথে অগ্রসর হচ্ছিলাম। হটাৎ পেছন থেকে কেউ একজন আমার শার্ট টেনে ধরলো। আমি সাথে সাথে পেছনে ফিরে তাকিয়ে এত অবাক হলাম যে যদি কখনও ঘুম থেকে উঠে নিজেকে পাহাড় চূড়ায়ও আবিষ্কার করি তখনও হয়তো এতটা অবাক হব না।

একটা মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। ওই জায়গাটায় ল্যাম্প পোস্টের আলো পড়ছে না বলে মুখটা আবছা মনে হচ্ছে। ঠিক চেনা জানা মনে হচ্ছিল না। আমি এতটাই বিস্মিত যে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। এমন ঘটনা আমার সাথে কখনও ঘটতে পারে তা আমার কল্পনাতেও আসেনি। যদি পুর্বে দুই এক দিন এমন পরিস্থিতিতে পরতাম তাহলে হয়তো সেদিনের পরিস্থিতিটা সহজেই সামলে নিতে পারতাম।

যাই হোক, ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙ্গে সে বলল; “কতক্ষণ ধরে ডাকছি শুনতে পাও না? নাকি কানে সমস্যা?”

হয়তো স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয়া যেত কিন্তু আমাকে তুমি করে বলাতে আমি আরও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। একটা সম্পূর্ণ অচেনা মানুষকে প্রথম সম্বোধনেই তুমি বললে যে একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পরতে হয় সেটা তখনই জানলাম।  তবুও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবেই বললাম

  • আমাকে বলছেন?
  • জি, হ্যাঁ।
  • কি বলবেন, বলুন?

এ কথা বলে দুজনেই সামনের দিকে পা বাড়ালাম। অবাক হওয়ার যে আরও বাকি আছে এটা তার কথাতেই বুঝতে পারলাম। সে বলল; “তুমি মাঝে মধ্যে এত রাত করে বাসায় যাও কেন? কোথায় থাকো এতক্ষণ?” আমি তার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম- ‘মানে?’

  • মানে তুমি সাধারণত এই সময়েই বাসায় ফের, কিন্তু মাঝে মধ্যে দেরি কর কোথায়? কালকে কোথায় দেরি করেছ?
  • আপনি কিভাবে জানলেন? আপনি কি আমাকে follow করছেন?
  • ঠিক তা নয়, সে যাই হোক উত্তর দাও।
  • আমি তো আপনাকে উত্তর দিতে বাধ্য নই। আগে আপনি বলুন।
  • তুমি কি ভেবেছ আমি বাধ্য? ঠিক আছে, এর পর থেকে সময় মত বাসায় আসবা। ভাল ছেলেরা এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকে না।

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়েই কথা বলছিল। আর আমি তাকিয়ে ছিলাম সামনের দিকে। আমার একটু বিরক্ত বোধ হচ্ছিল। এমনিতেই আমি কারো দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। সমনের দিকে তাকিয়েই আমি তার কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম এমন সময় খেয়াল করলাম জায়গাটা যথেষ্ট আলোকিত। তখন আমি তার দিকে ফিরলাম। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তখনি লাগল। এই মেয়েটাকে এর আগে একবার দেখেছিলাম। সাধারণত দুই এক বার দেখে আমি কারো চেহারা মনে রাখতে পারি না। কিন্তু একটা ঘটনার কারনে তার চেহারাটা মনে পরে গেল। প্রায় দেড় বছর আগে তার সাথে দেখা হয়েছিল একটি ফার্মেসীতে। সেই ঘটনাটিতে আমিও বেশ লজ্জিত হয়েছিলাম। আর লজ্জা পেয়ে তারও মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল। বোধ করি ঘটনাটির বর্ণনা দেয়া নিষ্প্রয়োজন। এরপর তার সাথে আর দেখা হয় নি। আর ঘটনাটিও এত দিন মনে পরে নি আমার।

আমাকে চুপ থাকতে দেখে সে বলল; কি হল, কিছু বলছো না কেন? আমি বললাম; কি বলবো সেটাই তো বুঝতে পারছি না। আমার কথা শেষ না হতেই সে জিজ্ঞাসা করলো; তোমার নাম টা যেন কি?

আমি বললাম; এত কিছুর খোঁজ রাখেন আর আমার নামটাই জানেন না? সেটাও না হয় অনুসন্ধান করে বের করবেন।  আপনার নামটি কি?

  • তুমিও একটু অনুসন্ধানে বের হও না।
  • দুঃখিত, আঁধারের অনুসন্ধানে আমার কোন আকর্ষণ নেই।
  • তাহলে আলোর অপেক্ষায় থাক। কালকে ৯ টায় দেখা হচ্ছে। দেরি করবে না কিন্তু। আর হ্যাঁ, বিস্ময় কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছি। তোমাকে অনুসন্ধান করার জন্য বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন পরে না। আমি এই বিল্ডিং এর ২ তলায় থাকি। বারান্দা থেকেই তোমার আসা যাওয়া দেখা যায়। শুধু নামটা কোথাও লেখা নেই বলে জানা হয় নি।

এ কথা বলেই সে চলে গেল। আমার বাসা আরও সামনে। তাই অনেক খানি বিস্ময় বয়ে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরলাম। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন। এই মেয়েটা আমায় কেন follow করছে? কত দিন ধরেই বা করছে? এটা কি স্বপ্ন? কল্পনা নাকি বাস্তবতা? বুঝতে পারছিলাম না। আমি দেখতে এতটাও সুন্দর নই বা আমার মধ্য থেকে এতটা গুণেরও প্রকাশ পায় না যে কেউ আমাকে প্রতিদিন follow করবে। আমি কখন বের হই, কখন বাসায় ফিরি তার হদিস এই অপরিচিত একজন কেন রাখবে? আমার মাথায় কোন কিছুই তখন কাজ করছিল না। রাতের সকল আঁধার যেন আমার মনে এসে ভিড় করছিল ক্রমেই। আমি আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। যা হবার আগামীদিন হবে। এখন একটা গভীর ঘুমের প্রয়োজন; প্রয়োজন ভাবনা থেকে বের হয়ে আর একটা অবাস্তব জগতে হারাবার……

(চলবে…)

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

প্রথম পর্বের পর থেকে…..

ইসাবেলার অমন আবেগী প্রশ্নে আমি তার দিকে অবাক চোখে তাকালাম আর উত্তর দিলাম,  “কেউ আমার কাছে আমার মাতৃভাষা শিখতে চেয়েছে আর আমি তাকে তা শেখাবো- এর চাইতে বড় সম্মানের আর কি হতে পারে?”

ইসাবেলার প্রতিউত্তর আমাকে আরো বেশি অবাক করলো। বললো, তোমার দেশ এই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যারা মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছে। দেশকে পাকিস্তানিদের থেকে মুক্ত করেছে। মাতৃভাষার প্রতি এমন নজির তো দেখা যায়না। তাইনা?

অস্ফুটভাবে আমার মুখ থেকে বের হয়ে এলো, তুমি কি করে জানো আমার দেশের এত খবর? সে বললো, লন্ডনে এক বাংলাদেশি মহিলার সাথে তার দেখা হয়েছিল, বেশ বয়স্ক।  ৭১’ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয় ও আরো অনেক কথা। এই খবর জানার পর সে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত ঘাটাঘাটি শুরু করে। প্রচুর পড়াশুনা করে।  সেই থেকে নাকি আমার দেশ আর মানুষের প্রতি তার এত আগ্রহ।

প্রথম দিনের কাজের অভিজ্ঞতা, নতুন কিছু বন্ধু পাওয়া, ইসাবেলার মত সেকশন বস পাওয়া, সব মিলিয়ে কাজের ক্ষেত্রে এমন দিন আগে কখনো আসেনি।

কাজ শেষে বাসায় চলে এলাম, মশিউর ভাই পরে আসবে বললো। উনি বাসায় এলে ডিনার করতে বসলাম, জিজ্ঞেস করছিলো, কি অবস্থা, ইসাবেলার সাথে প্রথম দিনেই এত খাতির, না জানি পরে কি হয়? ইসাবেলা কিন্তু লাইফ পার্টনার হিসেবে দারুণ মেয়ে। মশিউর ভাই কি বোঝাতে চাইলেন বুঝলাম, বললাম, নারে ভাই, বিদেশিনী ঘরে আনার ইচ্ছে নেই। উনি, মুচকি একটা হাসি দিয়ে খেতে লাগলেন, আর কিছু বললেন না; তবে খাওয়া শেষে রুমে ঢোকার সময় খোঁচা মেরে বললেন, কয়দিন পর যেন এমন না শুনি,”ভাই, আব্বা-আম্মারে একটু বোঝান”; কিংবা “ভাই, কাজী অফিস কোথায় পাবো?” আমাকে লজ্জা দিয়ে উনি রুমে চলে গেলেন। আমিও মনে মনে হাসতে লাগলাম, নাহ, অস্বীকার করি কি করে, সত্যিই ইসাবেলা কিন্তু দারুণ একটা মেয়ে। ভালোলাগার মত, ঠিক যাকে ভালোবাসা যায়।

পরদিন থেকে ইসাবেলার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো, আর ও আমার সাথে শুধুই দুষ্টুমি করতো। ফুল সাDSC 3009.jpgইজ পিজ্জা এনে একদিন বললো, এই পিজ্জা যদি শেষ করতে পারি, তাহলে আমাকে নাকি Holland – America লাইনে ইংল্যান্ড ঘোরাতে নিয়ে যাবে। বলে রাখা ভালো, Holland – America Line টুরিষ্টদের জন্য খুব নিরাপদ আর বিশ্বাসযোগ্য টুরিজম ভিত্তিক জাহাজ।

অত বড় পিজ্জা সত্যিই শেষ করা সম্ভব নয়। তাই আমিও ওকে ধরলাম, বললাম, ফিফটি-ফিফটি। তুমি যদি তোমার অংশ শেষ করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমি বাংলাদেশে নিয়ে যাবো এবং সেটা আমার ভার্সিটি খোলার আগেই। বেশ, যেমন কথা তেমন কাজ, বুঝতে পারছিলাম, ওর শেষ করতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু ওর চোখে মুখে তখন আমার সাথে বাংলাদেশে যাবার প্রবল ইচ্ছা। ওর ঐ আগ্রহ দেখে আমিও আমার অংশ শেষ করে ফেললাম। ব্যস, ডিল ফাইনাল: আমি আগষ্টের শেষ নাগাদ ওকে দেশে নিয়ে যাবো আর ও আমাকে ফাইনাল এক্সামের পর ইংল্যান্ড নিয়ে যাবে। ওর বাংলাদেশে যেতে ভিসা লাগবেনা,  আমার ইংল্যান্ড এর ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন করে করাতে হবে। ও বললো, আমি ভিসা করিয়ে দেব আমার রেফারেন্সে যেহেতু আমি তোমাকে আমার দেশ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। ভিসা নিয়ে টেনশন করোনা।

KFC এর কাজ তেমন কঠিন না, প্রতিদিন সময় করে সে ৩০ মিনিট বাংলা শিখতো আমার কাছে। আর আমি শিখতাম ব্রিটিশ একসেন্ট। বাংলা শিখতে ওর যতটানা বেগ পোহাতে হচ্ছিলো, ওর ইংরেজি উচ্চারণ শিখতে আমার দাঁত ভেঙে যাচ্ছিলো।

যাইহোক, এভাবেই অনেক আনন্দের সাথে দিনগুলো কাটছিল। মশিউর ভাইও মাঝেমাঝে যোগ দিতো আমাদের আড্ডায়। ডাচ বন্ধুরাও বাংলা শেখার চেষ্টা করতো; আমিও টুকটাক ডাচ শেখার চেষ্টা করতাম। নতুন ভাষা শেখার মজাটাই অন্যরকম।

একদিনের কথা, সেদিন শুক্রবার কিংবা শনিবার ছিল, সঠিক দিনটা ঠিক মনে করতে পারছি না। রাত ১টা বাজে। মশিউর ভাই আমস্টারডাম বন্ধুর বাসায়। আমি একা।  হঠাৎ ইসাবেলার ফোন, বললো, ফেরদৌস তুমি কি এখনই একটু মিউনিসিপাল হসপিটালে আসতে পারবে? কন্ঠ শুনে বুঝতে বাকি রইলো না, ও দারুণ অসুস্থ। তাই কিছু আর জিজ্ঞাসা করিনি, দেরী না করে মশিউর ভাই এর BMW নিয়ে ঝড়ের বেগে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখনও আমার ইউরোপিয়ান লাইসেন্স হয়নি। কন্ট্রোল ধরলে বড় বিপদ, আনুমানিক ১২০০ ইউরো ফাইন। সাথে বোনাস মশিউর ভাইকেও জরিমানা।

ফাইনের কথা ভুলে আল্লাহর নাম ডাকতে ডাকতে পৌছে গেলাম, গিয়ে দেখি ইসাবেলার খুব জ্বর সাথে আরো শারীরিক সমস্যা। আমাকে দেখে একটা হাসি দিয়ে আমার হাত তার হাতের ভেতর নিয়ে বললো, তুমি এসেছো তাহলে? আমি জানতাম তুমি আসবে। বিশ্বাস করো, আমি এখানে একদম একা। দেখার কেউ নেই। এক ঘন্টা হলো হসপিটালে…… ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, চুপ থাকো, আর কারো থাকার দরকার নেই, আমি আছি তো! তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে আমার হাতের পিছে একটা চুমু দিলো আর হাতটা ওর হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিল।  আমি ওর সোনালী চুলে হাত বিলিয়ে দিচ্ছিলাম,  ডাক্তার এসে বললো, চিন্তা করার মত কিছু নেই, আজ রাতেই জ্বর নেমে যাবে। আরো বললো, সে যদি সত্যিই সুস্থ আর ভালো থাকতে চায়, তাকে বিয়ার কিংবা অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে বলুন। তার লিভার বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত।  শুনে খুব বেশি অবাক হলাম, কারণ যে মেয়েকে কখনো ধূমপান করতে দেখলাম না, সে কি করে এত অ্যালকোহল নেয় তা আমার মাথায় ঢুকলো না; আর এতটাই নেয় যে তার লিভারে সমস্যা হয়ে গেছে?

ও তখন ঘুমে বিভোর, রাত তিনটা বাজে। আমার দু-চোখে ঘুম নেই, এক অজানা অস্থিরতা বয়ে চলেছে মনের ভেতরে। নিজেকে বোঝাতে পারছিনা, কেন এই ব্রিটিশ কন্যার জন্য আমার মন এত ব্যাকুল হয়ে পড়েছে? আমি কি তবে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি? এমন ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক খেয়াল নেই!

হঠাৎ আমার গালে কারো হাতের ছোয়াঁতে ঘুম ভেঙে গেল। জেগেই দেখি ইসাবেলা। আমাকে জাগতে দেখে তার মলিন মুখে এক রাশ হাসি ছড়িয়ে পড়লো। আমাকে বললো, “তুমি আমার বিয়ার/অ্যালকোহল নেওয়ার কথা শুনে খুব বিচলিত তাইনা ফেরদৌস? ইউরোপিয়ানদের এই একটা অভ্যাস আছে, জানোই তো; আমার বদ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এই তোমাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো কোনদিন অ্যালকোহল নেব না। তোমার বাবা তোমার জন্য বাংলাদেশ থেকে যে আম পাঠিয়েছে, সেগুলো দিয়ে আমাকে প্রতিদিন জুস বানিয়ে দেবে তো?”

চলবে……………

Page Sidebar