আমার শহর জ্যামের ঘোরে

Now Reading
আমার শহর জ্যামের ঘোরে

বাইরের দেশে মানুষরা দিনে অনেক কাজ করে।তারা কঠোর পরিশ্রম করে।আমরা করি না।আমরা অলস।এটা আমাদের জন্যে বিশাল একটা হতাশা।না…সবটুকুই হতাশা নয়।সব দোষ শুধু নিজেদের উপর নিলে চলবে না।কিছু দায়ভার পারিপার্শ্বিক সুযোগ সুবিধার উপরও দেয়া যাক।

 

একটি মানুষ প্রতিদিন কতটুকু সময় পায়?এর সংক্ষিপ্ত এবং একমাত্র উত্তর চব্বিশ ঘণ্টা।একটা মানুষের হাতে প্রতিদিন চব্বিশটা ঘণ্টা সময় থাকে।একটা মানুষ এই সময়ের ভিতর কি কি করতে পারে?অনেককিছু।হিসাব করে বলা কঠিন।সময়ের সুন্দর পরিকল্পিত ব্যবহার আমাদের অনেক সাফল্য এনে দিতে পারে।

চব্বিশ ঘণ্টা সময় চারটি খানি কথা নয়।এখন কথা হচ্ছে আপনি আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়টা ব্যবহার করতে পারবেন কি না।

 

গতকাল ৮ নভেম্বর ২০১৭;রোজ বুধবার আমার হাতে ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা সময়ই ছিল।কিন্তু সারাদিনে আমি কাজে লাগাতে পেরেছি মাত্র দুই ঘণ্টা।কেন? আমার নিজের অবহেলার কারনে? মোটেই না।

সকাল ১১টায় বাসা থেকে বের হয়েছি পুরান ঢাকার দিকে যাব।থাকি মোহাম্মদপুরে।বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনুষ্ঠানের মঞ্চনাটকের জন্যে কিছু সরঞ্জাম কিনতে হবে শাঁখারিবাজার থেকে।বেলা বারোটার দিকে বাসে উঠলাম শ্যামলী থেকে আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যখন নামি,ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটা।হাতে গুণে হিসাব করলে তিনটা ঘণ্টা আমি এবং আমার মত জ্যামে বসে থাকা মানুষ গুলো নিছক গাড়িতে বসে কাটিয়ে দিলাম।শাঁখারিবাজারে আমার কাজ শেষ হল বিকেল পাঁচটার দিকে।বাসে উঠতে উঠতে বাজলো সাড়ে পাঁচটা।আমি যখন আমার বাসায় এসে পৌঁছাই তখন রাত সাড়ে আটটা।আবার গেল তিন ঘণ্টা।তাহলে সারাদিনে আমার তিন ঘণ্টার কাজের জন্যে বাড়তি ছয় ঘণ্টা মোট নয় ঘণ্টা খরচ করতে হয়েছে।

 

এটা হল মাত্র একটা দিনের হিসাব।এভাবে প্রত্যেকটা দিন আমার মত কোটি বাঙ্গালির কতটুকু সময় অযথা অকারণে জ্যামে আটকে থেকে অলসভাবে গাড়িতে বসে কেটে যাচ্ছে কেউ সেই হিসেব কখনো করে দেখেছে কি?স্বল্প উন্নত দেশের মানুষ আমরা।দূষিত পরিবেশ,তুলনামূলক অনুন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা,জনসংখ্যার আদিপত্যে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব_____এ সব নিয়ামকের কারণে উন্নত দেশ গুলোর মানুষের চেয়ে আমরা এমনিতেই আয়ু কম পাই।জীবনে সময় খুব কম,কিন্তু তবুও আমরা উন্নত দেশ গুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ঠিকই টিকে আছি।জীবনের সবটুকু সময় ব্যবহার না করতে পারলেও আমরা ঠিকই বছর বছর বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে আমেরিকা,যুক্তরাজ্য,কানাডা,জার্মানি,জাপান সহ পৃথিবীর বিভিন্ন সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভুরি ভুরি মেধাবী ছাত্র রপ্তানি করছি।তারা সেখানে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নামযশ জমাচ্ছে।কেউ কেউ বড় মাপের বিজ্ঞানীও হচ্ছে; নাসার মত গবেষণা সংস্থায় কাজ করছে।জীবনের অধিকাংশ সময় জ্যামে কাটিয়ে দেয়ার পরও আমাদের দেশ থেকে বড় মাপের কবি,সাহিত্যিক,লেখক বের হচ্ছে,দার্শনিক ইতিহাসবিদ তৈরি হচ্ছে_____খেলাধুলা,শিক্ষা সংস্কৃতি কোনদিক থেকে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই।বরং দিন দিন আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

 

যে জাতি এত সব প্রতিবন্ধকতা থাকার সত্তেও অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস করে,বিশ্বজয়ের পরিক্লপনা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ায়,একবার গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবুন,সে জাতিকে দিনের সবটুকু সময় ব্যবহার করতে দিলে তারা কি করতে পারে!

উন্নত দেশ গুলোতে যে ট্রাফিক জ্যাম একেবারেই নেই এমন ধারনা ভুল।সেই সব দেশেও জ্যাম আছে।অবশ্যই আছে।তবে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করতে হয় না।স্বল্প সময়ের জ্যাম।তারা তাদের কাজ শেষ করে বিনোদনের জন্যে পর্যাপ্ত সময় পায়,বিশ্রামের সুযোগ পায়,মন ফ্রেস থাকে।পরবর্তীতে কাজ করার সময় পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে,ক্লান্তিহীন কাজ করতে পারে।বিষন্নতা এসে মনকে ভারাক্রান্ত করে না।

আর আমরা খুব সকালে ঘর থেকে বের হই জ্যাম ঠেলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে আর সেখান থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়।ব্যক্তিগত কাজ গুলো সেরে আমরা ঠিকমত ঘুম আর বিশ্রামের সুযোগ পাই না,চিত্ত-বিনোদন আর মনোরঞ্জনের কথা না হয় বাদই দিলাম।আমরা এক ঘেয়ে জীবনের ক্লান্তিকর অনুভূতি বয়ে বেড়াচ্ছি।মানুষের মস্তিষ্ক কখনো একটানা যন্ত্রের মত কাজ করতে পারে না।বিশ্রাম দরকার হয়,চিত্ত-বিনোদন দরকার হয়।একটানা একটা কাজ দীর্ঘ সময় ধরে করতে গেলে মস্তিষ্ক ঠিকঠাক কাজ করতে চায় না।তাই মাঝেমাঝে কাজের ফাঁকে একটু বিনোদন আবশ্যক।এই ধরুন গান শোনা,মুভি দেখা,কিছুক্ষণের জন্যে কোথাও থেকে ঘুরে আসা,বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া ইত্যাদি।

 

আমাদের এই প্রতিবন্ধকতা কিন্তু আময়াদেরই সৃষ্টি।অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা,ট্রাফিক আইন পালনে অনিহা ও যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা না থাকা,ফিটনেস বিহীন গাড়ি,ভিআইপিদের বেশি সুবিধা দেয়া ইত্যাদি কারণেই কিন্তু জ্যাম গুলো বাঁধে।এই সমস্যা গুলো সমাধান করা খুব বেশি কঠিন নয়।শুধু কর্তৃপক্ষের একটু সদিচ্ছা আর সতর্ক দৃষ্টি দরকার।এই সমস্যা গুলোর সমাধান হলে হয়ত ঢাকা শহর থেকে জ্যাম একেবারে উদাও হয়ে যাবে না,তবে অনেকক্ষাণি কমবে,মানুষের ক্লান্তি আর দূরাবস্থার কিছুটা হলেও সমাধান মিলবে।কিন্তু হতাশার কথা হচ্ছে আমরা কেউই এ বিষইয়টা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি না।দিন তো কেটে যাচ্ছে,এই জ্যাম মাথায় নিয়েই জীবনে উন্নতি করতে হবে_____এই ধরনের মানসিকতা আমাদের মাথায় গেঁথে গেছে।আমরা এখন সমাধান করার চেষ্টা না করে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।আমরা ধরেই নিয়েছি জ্যাম নামক সমস্যার কোন সমাধান নেই আর এই সমস্যার সাথে মানিয়ে চলতে আমরা বাধ্য।

সরকার,প্রশাসন,সাধারণ জনগণ সবাই একসাথে কাজ করলে এই সমস্যার সমাধান মিলতে খুব বেশি দেরি হবে না।

 

পরিশেষে কিছু আশার কথা বলি।সবাই বলে বাঙ্গালিরা অলস জাতি,আরাম প্রিয় জাতি।না,এই ধারনা সম্পূর্ণ ভুল।আমাদের যথেষ্ট মেধা যেমন আছে,তেমনি কঠোর পরিশ্রম করার সামর্থও আছে।আমরা বাঙ্গালিরা জীবনের খুব কম সময় কাজে লাগাতে পারলেও; এই কম সময়ে বড় ধরনের সাফল্য এনে বিশ্ববাসীকে বারবার অবাক করেছি।ড. জাহদ হাসান,আতিক উজ জামান,রুবাব খান,জামান নজরুল ইসলাম………এভাবে বলা শুরু করলে সারাদিনেও শেষ হবে না।আমরা এগিয়ে যাচ্ছি,এবং আরও দ্রুত বেগে ছুটে যেতে পারব যদি জ্যামে আটকা পড়ে আমাদের মূল্যবান সময় গুলো এভাবে নষ্ট না হয়।

 

 

// আমাদের শহরটা ছোট।বিশ্ববাসী বারবার গলা ফাটিয়ে বলে এই শহর বাসের অযোগ্য।
তবু আমরা বেঁচে থাকি।আমাদের প্রখর প্রাণশক্তি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
এই জ্বালাময়ী বিশ্রী কোলাহলের মাঝেও আমাদের কবি গুলো কবিতা লিখে,গল্পে গল্পে সাহিত্য সাজায়।ম্যাথমেটিক্সের সাথে বিন্ধুত্ব পাতান ছেলেটা ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের রহস্যময় জটিল ধাঁধাঁর সমাধান করে ফেলে,এক কোণে বসে গভীর সন্তর্পনে কোন এক ইতিহাসবিদ পুরনো দিনের কথা সামনে তুলে আনে……কেউই তো থেমে নেই।দিন চলে যাচ্ছে তো!

এই অবহেলিত শহরে,ময়লার স্তুপে জমে দুর্গন্ধময় কিলবিল করা জীবাণু আর কীটপতঙ্গের সাথে,বখাটে যানবাহনের প্যা পু চিৎকার সাথে নিয়ে আমরা দিব্যি হেসে খেলে বেঁচে আছি।হোক না বাসের অযোগ্য,মানুষের প্রাণশক্তি খুব কঠিন।যে কোন পরিস্থির সাথে তারা  খাপ খাইয়ে চলতে জানে…//

পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [১১তম পর্ব]

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর শুনলাম যে আমার শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল।গায়ের লোম গুলো কাঁটা দিয়ে উঠলো মুহূর্তে।আজিজুর রহমান মারা গেলেন।খবরটা পেলাম মায়ের মুখে।তিনি নাকি স্ট্রোক করেছেন।শুনে কেমন যেন মানতে পারছিলাম না কথাটা।মস্তিষ্ক যেন এমন একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ গ্রহন করতে চাইছে না। কাল রাতেই আমি তার সাথে কথা বলেছি।হ্যাঁ, খুব সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতই তিনি সুন্দর ভাবে কথা বলেছিলেন।দেখে একটুও অসুস্থ মনে হয় নি।আমার মনে আছে,তিনি বলেছিলেন____হয়ত আর দেখাই হবে না।কোনদিন আর দেখা হবে না।চাইলেও না।মানুষটা কি জানতেন আজ তিনি চলে যাবেন? অদ্ভুত!

লোকটার সাথে আমার পরিচিয় খুব অল্প দিনের।তেমন কোন ভাব জমে উঠে নি।সামান্য কথাবার্তায় আর ভদ্র লোকের অমায়িক ব্যবহারে কেমন যেন মায়া বসে গেছে।লোকটা খারাপ কি ভালো এতকিছু জানি না,শুধু বলতে পারি তাঁর মাঝে কোন মন্দ আচরণ দেখি নি।

 

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর পেয়ে মনটা বেশ খারাপ হল।তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে মা অনেক সুস্থ আছেন।খবরটা মা জেনেছেন আশার কাছ থেকে।মেয়েটা ভোর বেলায় মায়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করে গেছে কিছুক্ষণ।বাবাও ছিলেন।তখন আমি আর শেফা দুজনই ঘুমিয়ে ছিলাম।

 

হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হলাম।নাস্তা সেরে বেরিয়ে পড়লাম আজিজুর রহমানের বাড়ির দিকে।লোকটাকে শেষবার একটু দেখে আসি।সেই সাথে আরো একটি কাজ হবে।আশা মেয়েটাকে আজ দেখতে পাব।

বাড়ির সামনে গিয়ে নিছক হতাশ হলাম।দরজায় তালা দেয়া।লোকমুখে জানলাম,খুব সকালে আজিজুর রহমানের লাশ পরিবার এসে দেশের বাড়ি নিয়ে গেছে।মনে মনে একটু দুঃখিত হলাম।একবার দেখতে পারলে ভালো হত।ভদ্রলোকের দেশের বাড়ি কোথায় আমি জানি না।জানলে যাওয়া যেত হয়ত।হতাশ মুখে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা আজ এতটাই সুস্থ যে তাঁকে রিলিজ দেয়া হল।আশা মেয়েটার সাথে একবার দেখাই মাকে আমূলে বদলে দিল।অবাক হলাম।মানুষের মাঝে আত্মার বন্ধন কতটা সুদৃঢ় হতে পারে তা ভেবে আমাদের শুধু অবাক হতে হয়।

 

মাকে বিকেল বেলায় শেফার বাসায় পৌঁছে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।অনেকদিন পর মনটা একটু হালকা লাগছে।আজিজ সাহেবের জন্যে একটু খারাপ হয়ত লাগছে,তবে তা খুব বেশি জোরালো না।মৃত্যু আর নিয়তির উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

 

ঢাকায় পৌঁছে বেশ ভালোই ছিলাম।একদিন শেফা জানালো,আশা মেয়েটা এবার তার বাড়িতে আসা যাওয়া শুরু করেছে।মার সাথে আবার তার ভাব জমে উঠেছে।আমি আশ্চর্য হলাম।বললাম, “মেয়েটা তোর ঠিকানা জানলো কি করে?”

আশা জানালো,”মায়ের কাছে মেয়েটার মোবাইল নাম্বার আছে।“

খবরটা শুনে নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছে।এতদিন মেয়েটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর একবারের জন্যেও মার কাছে জানতে চাইলাম না মেয়েটা কে খুঁজে বের করার কোন উপায় আছে কি না।অবশ্য আমি নিজেই মাকে জানাতে চাই নি খবরটা।আমার পক্ষ থেকে সাপোর্ট পেয়ে গেলে পরে মেয়েটাকে আর আলাদা করতেই পারব না।

আমি শেফাকে বললাম,”থাক না,মেয়েটা যদি মায়ের সাথে একটু কথাবার্তা বললে মা একটু সুস্থ থাকেন তবে ক্ষতি কি! তোর যদি কোন অসুবিধে না হয় তাহলে আসুক।“

 

কিছুদিন পর আরেকটা খবর শুনে আমি আরও বেশি অবাক হলাম।শেফা ফোন করে আচমকা আশা মেয়েটার প্রশংসা শুরু করলো।মেয়েটা খুব ভালো,মায়াবী,মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারে……হেনতেন।

আমি নড়েচড়ে বসলাম, “তুইও মেয়েটার খপ্পরে পড়ে গেলি!”

“আরে দূর……খপ্পরে পড়তে যাব কেন?মেয়েটার মনে কোন খারাপি নেই।“

শেফার সাথে তর্কে গেলাম না।সেও মেয়েটার কাছে কাবু হয়ে গেছে।আমার ভয়টা পুনরায় বাড়তে লাগলো।এতদিন নিশ্চিন্তে ছিলাম এই ভেবে যে,মা বাবা দুজনেই এখন শেফার কাছে আছেন।আশা মেয়েটার মনে কোন দুষ্ট বুদ্ধি থাকলেও শেফা সামলে নিবে।সুবিধা করতে পারবে না।কিন্তু এখন দেখছি শেফা নিজেই বদলে গেছে।

 

এমন দুশ্চিন্তায় যখন আমার সময় কাটছে,তার কিছুদিন পর এমন ভয়াবহ একটা খবর পেলাম যা শুনে আমার টনক নড়ে উঠলো।আমার বিয়ে।আমাকে জানানো ছাড়াই আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।শেফা এক সন্ধ্যায় ফোন করে বলল,”আশার সাথে মা তোর বিয়ে ঠিক করেছেন।“ তার কথা বলার ভঙ্গি আর হাস্যজ্জল অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলাম নাটের গুরু হিসেবে সেও বেশ খুশি।সবকিছু এতদিন পরিবার আর সবার সুখের জন্যে মেনে নিয়েছি।এমন একটা কাজ আর কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।পিতামাতা তাঁর সন্তান কে নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করাতেই পারেন।হোক না মেয়েটার কোন রূপ-গুণ নেই।তাই বলে একটা বিধবাকে পছন্দ করবেন?সব পুরুষের মত আমারও কুমারী মেয়ে ঘরে আনার স্বপ্ন থাকাটা খুব বেশি অন্যায় নয়।

 

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আবার বাড়ি গেলাম।স্পষ্ট করে বাবা মাকে বললাম আমি এই বিয়েতে রাজি না।অনেক তর্ক বিতর্ক হল।পিতামাতার সাথে এমন বিশ্রি ভাবে ঝগড়া আমার এর আগে আর হয় নি।দফায় দফায় সকাল বিকাল এ নিয়ে ঘরের ভিতর ঝামেলা লেগেই আছে।শেষে আর কিছু করতে না পেরে রাগ দেখিয়ে ঢাকায় চলে আসলাম।আসার সময় শেফার সাহায্যে মায়ের মোবাইল থেকে আশার মোবাইল নাম্বারটা চুরি করে আনলাম।মেয়েটার সাথে কথা বলে সবকিছু শেষ করতে হবে।

পুরানো তিমির [৯ম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৯ম পর্ব]

খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।বাইরে কাঁকডাকা ভোর।আবছা অন্ধকারের ধার বেঁয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ডাল।কালো কালো মেঘ গুলো এদিক সেদিক ভেসে বেড়াচ্ছে।আজ মনে হয় বৃষ্টি হবে।এমন মেঘলা সকালে আমি ঘুম থেকে উঠেই বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।বৃষ্টির গুটি গুটি ফোঁটা শরীরে নরম পরশ বুলাচ্ছে।আশার বাড়িতে গিয়ে কোন লাভ হবে না জানি।কাল রাতেই খোঁজ করে দেখেছি কেউ নেই।তবু একবার গেলাম।মানুষের পরিকল্পনা গুলো যখন অগোছালো থাকে তখন মানুষ খুব বেশি উদ্দেশ্যহীন কাজ করে।আমারও তাই হচ্ছে।আশা মেয়েটাকে কোথায় খুঁজবো,কোত্থেকে খোঁজা শুরু করব কিছুই জানি না।জানলে না হয় কিছু একটা পরিকল্পনা সাজান যেত।শুধু জানি মেয়েটাকে খুঁজে পেতে হবে।যে ভাবেই হোক পেতে হবে।উদ্দেশ্যহীন ভাবে,যখন যেখানে মন চাচ্ছে খুঁজছি।ভাগ্যে থাকলে হয়ত পেয়েও যেতে পারি___মনের ভিতর এমন একটা সম্ভাবনা।নিজের মায়ের জন্যে একটা মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারব না,এমন পরাজয় মেনে নেয়া কঠিন।

আশার বাড়ির সামনে গিয়ে ভিতরের দিকে উঁকি দিলাম।উঁকি দিয়ে মোটামুটি চমকে উঠলাম।আজ আশার ঘরের দরজাটা খোলা।কোন তালা ঝুলান নেই।আমি মনে মনে কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব করছি।গভীর সন্তর্পনে,নতুন একটা আশায় নিশ্চুপে বাড়ির ভিতরে পা দিলাম।দরজায় কড়া নাড়তেই আজিজুর রহমান সাহেব দরজা খুলে বেরিয়ে আসলেন।মুখখানা বিমর্ষ,তবু আমাকে দেখে মুচকি হাসার চেষ্টা করলেন।সৌজন্য সূচক ভদ্র হাসি।আমিও মুচকি হাসলাম।এসব হাসির কোন অর্থ নেই।তবু হাসতে হয়,এটাই নিয়ম।

নাকের ডগায় ঝুলে থাকা চশমাটা ঠিক করতে করতে আজিজুর রহমান বললেন, “আরে…ভাইসাব কেমন আছেন? আপনার টাকা পেয়েছেন?”

উনার প্রশ্ন শুনে একটা ধাক্কা খেলাম।সামান্য একদিনের কিছুক্ষণের আলাপচারিতায় এই লোকটা আমাকে মনে রেখেছে!তার স্মরণশক্তি এত তীক্ষ্ণ!এত স্পষ্ট!

আমি আবার মুচকি হেসে ধাক্কাটা সামলে নিলাম।তারপর হাসি মুখে বললাম, “জ্বি পেয়েছি।আজ সকালে টাকা নিতে এখানে এসেছি।ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে যাই।সাথে টাকা পাওয়ার খবরটাও দেয়া হল।“

তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন।তার প্রমান মুখের হাসি।মুখে একটু আগের বিমর্ষ ভাবটা আর নেই।প্রাণ চঞ্চল,যেন জেল্লা ফিরে এসেছে।আমাকে নিয়ে তিনি ভিতরে ঢুকলেন।সোফার দিকে ইশারা করে বসতে বললেন।

আমি বসলাম।

আজিজুর রহমান ভিতরে চলে গেলেন।ফিরলেন অনেকক্ষণ পর।হাতে এক গ্লাস বেলের শরবত।তাতে দুই টুকরো বরফ কুচি দেয়া।আমার দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,”আপনি জার্নি করে এসেছেন,নিন ঠান্ডা শরবত খান।ভালো লাগবে।“

আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম।লজ্জিত কণ্ঠে বললাম,”আমার জন্যে এত কষ্ট করছেন কেন?”

তিনি চওড়া একটা হাসি দিয়ে বললেন,”এক গ্লাস শরবত বানাতে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় না ভাই।“

“এইটুকুই বা করবেন কেন?অপরিচিত লোক,কোথাকার কে……”

আজিজুর রহমান শান্ত কণ্ঠে বললেন, “মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।“

 

দার্শনিকদের মত একটা বাণী দিয়ে ভদ্রলোক আবার ভিতরে চলে গেলেন।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।সুন্দর একটা উক্তি____মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।কথাটা শুনে মুগ্ধ হলাম।তারমানে যে ভালোবাসতে জানে তার মনে কোনদিন অতৃপ্তি,অশান্তি আসবে না।যে ভালোবাসতে জানে তার মন চির প্রশান্ত।

 

ভদ্রলোককে যত কাছ থেকে দেখছি ততই অবাক হচ্ছি।তার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছি বারবার।অথচ এই লোকটাই রাত হলে বউ পিটায়।নিজ চোখে না দেখে কেউ কি একথা বিশ্বাস করবে?করবে না।মানুষের রাগ উঠলে মানুষ হিংস্র হায়না হয়ে যায়।রূপ বদলে যায় মুহূর্তে।এই পৃথিবী কত বিচিত্র……কত ভারসাম্যহীন!

 

ভদ্রলোক দ্বিতীয়বার ফিরে আসলেন দুই কাপ চা হাতে।একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, “নিজে বানাতে হয়েছে তো তাই আসতে একটু দেরি হল।আপনাকে একা বসিয়ে রাখলাম।কিছু মনে করবেন না।“

আমি মুচকি হেসে বললাম,” না না কিছু মনে করব কেন?………আপনি চা বানালেন……আপনার স্ত্রী বাসায় নেই?”

“না নেই”,লোকটা একটা ভারী নিশ্বাস ফেললেন।

আমি মনে মনে দুঃখিত হলাম।এবারও তাহলে আশাকে পাওয়া যাচ্ছে না।শুরুতে মনে একটা ক্ষীণ আশা জন্মেছিল,হয়ত এবার পেয়ে যাব।পেলাম না।

আমি মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বললাম, “বাবার বাড়ি বেড়াতে গেছে না কি?”

লোকটা গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “না…”

কিছুক্ষণ দু’জনেই নিরব ছিলাম।চা শেষ করে ভদ্রলোক শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমার বউ বাবার বাড়ি যায় নি।অন্যকোন আত্মীয় স্বজনের বাড়িও যায় নি।এমন পরিস্থিতিতে আপনি হলে কি বলতেন? আমার বউ উদাও হয়ে গেছে____এমন কিছু?”

ভদ্রলোকের প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেলাম।কি উত্তর দিব বুঝতে পারছি না।আশা মেয়েটা তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে?ভেবেছিলাম কথার ছলে আজিজুর রহমানের কাছ থেকে শশুর বাড়ির ঠিকানা জেনে নিব।এখন সেই ঠিকানাও বেশি কাজে আসবে না।ভদ্রলোক নিজেই তার বউ কে খুঁজে পাচ্ছেন না।

 

আমাকে চুপ থাকতে দেখে ভদ্রলোক রসিকতা করে বললেন, “কি?এই উত্তর আপনারও জানা নেই?হা হা হা…পৃথিবীতে সব উওর মানুষের জানতে হয় না।সবকিছু জেনে গেলে বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে যায়।“

 

ভদ্রলোক অনবরত একটার পর একটা দার্শনিক টাইপ ভাব-গম্ভীর কথা বলে যাচ্ছেন,আর আমি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনছি।শেষমেশ একটু আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে বসলাম,”আপনাদের মাঝে কোন ঝগড়া হয়েছে নাকি?……দুঃখিত,ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম।রাগ করেন নি তো আবার!”

“না…রাগ করব কেন?কোন সংসারে ঝগড়া হয় না বলুন তো!কিন্তু ঝগড়া হলেই তো বউ নিরুদ্দেশ হয় না।নিরুদ্দেশ হওয়ার জন্যে বড় ধরনের ঝামেলা হতে হয়।“

 

আমি তাকিয়ে আছি আজিজুর রহমানের দিকে।তাদের মাঝে কি বড় ঝামেলা হয়েছে,সে প্রশ্ন করব কি না ভাবছি।নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করা চরম অভদ্রতা।

তিনি শান্ত স্বরে বললেন,”ভাইসাব আমি মানুষ ভালো না।খুবই বদলোক।বউ পিটাই।বউ পেটান মানুষ কোনদিন ভালো হয় না।“

 

ভদ্রলোকের শেষ কথায় আমি পুরো হতভম্ভ হয়ে গেলাম।চুপচাপ বসে আছি।ভদ্রলোককে বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে।আমি তার নিতান্ত একজন অপরিচিত মানুষ।আর তিনি আমার কাছে হর হর করে নিজের দোষ-ত্রুটি,সংসারের ঝামেলা সবকিছু বলে দিচ্ছেন!লোকটা সামান্য হলেও অগোছালো,নির্বোধ এই কথা ভাবা খুব বেশি ভুল হবে না।

 

আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,”অনেকক্ষণ সময় কাটান হল।ভাই এবার যেতে হবে।আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।আসি…”

বলতে বলতে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।ভদ্রলোক আমার সাথে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।আমি যখন বাড়ির গেইট দিয়ে বের হব তখন,তিনি পেছন থেকে ডাক দিলেন,”ভাইসাব…”

আমি ফিরে তাকালাম।ভদ্রলোক করুণ গলায় বললেন,”বউ কে পিটাই বলে যে ভালোবাসি না এমনটা নয়।পাষাণের মনেও ভালোবাসা লুকিয়ে।“

 

কথাটা শুনে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেলাম।ভালোবাসা কি এই পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় শব্দ?আবেগ উতলে উঠা উত্তাল ঘূর্ণিঝড়!বাইরে মেঘলা আকাশ,আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,আজিজুর রহমানের চোখ ছলছল করছে____করুণ রোদনের বৃষ্টির মত।

পুরানো তিমির [৭ম পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৭ম পর্ব]

বাড়ি ফিরে শেফার কাছে জানতে চাইলাম সে কি তথ্য উদ্ধার করতে পেরেছে।হতাশ কন্ঠে সে বলল,কোন তথ্যই সে উদ্ধার করতে পারে নি।মার সাথে তার আশা নামের মেয়েটা কে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে।শেফা জিজ্ঞেস করেছিল, “মেয়েটাকে তার স্বামী মারে কেন?”

মা বললেন, “জানি না।“

শেফা বলল, “সে কি কথা?তুমি কখনো জানতে চাও নি?”

“চেয়েছি।মেয়েটা বলতে চায় না।ওসব কথা তুললে ও শুধু কাঁদে।“

 

বিকেলে বাজারে হারুন ভাইর মুখে যা শুনলাম,সব কিছুই শেফা কে বলেছি।দু’জনেই চিন্তিত আমরা।কিভাবে কি হচ্ছে ধরতে পারছি না।

আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাবা মাকে ঢাকায় নিয়ে যাব।ঢাকায় নিতে হলে কম না হলেও দু’মাস সময় লাগবে।ভালো একটা বাসা খুঁজতে হবে,বাসার জন্যে কিছু আসবাবপত্র কিনতে হবে,আরও কত কাজ!

সিদ্ধান্ত হল,ঢাকায় না নেয়া পর্যন্ত বাবা মাকে শেফা তার কাছে নিয়ে রাখবে।

 

মা কে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম।বাবাও সামনে ছিলেন।আমাদের কথা শুনে মা কিছু না বলে বাবার দিকে তাকালেন।বাবা গম্ভীর।কিছুক্ষণ চুপচাপ কি যেন ভেবে নিলেন।তারপর বললেন, “আমরা তো এখানে ভালোই আছি।হঠাৎ আমাদেরকে তোর কাছে নিতে হবে কেন?”

আমি কিছু বললাম না।বাবার সামনে আমি বিশেষ জোর গলায় কথা বলতে পারি না।ভয় না কি সম্মান বোধ জানি না।বাবাদের কাছে মেয়েরা একটু বেশি আদর পায়।তাই শেফা বাবার সামনে ভালো ভাবেই আলাপ চালাতে পারে।আমার পাশে দাঁড়িয়ে শেফা বলল,”বাবা, তোমাদের বয়স হয়েছে।এই সময়ে কখন কি হয় বা কি দরকার হয় ঠিক নেই।আল্লাহ না করুক,কিছু একটা হয়ে গেলে তোমাদের তখন দেখবে কে?”

বাবা আগের চাইতে আরও গম্ভীর গলায় বললেন, “দেখো…আমরা এখানে বেশ ভালোই আছি।আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না।আমাদের অসুবিধা হলে তো আমরা তোমাদের জানাতাম।তোমরা ছাড়া আর কাওকে বলার মত তো আমাদের কেউ নেই।“

শেফা বলল, “তারপরও বাবা…! তোমাদের এখানে একা রেখে যেতে আমাদের খারাপ লাগে।“

বাবা বললেন,”বেশ নিতে যখন চাও আমরা না হয় তোমাদের সাথে গেলাম।আমি হয়ত ঠিকি মানিয়ে নিব,কিন্তু তোমাদের মা এখান থেকে যেতে চাচ্ছে না।সে তোমাদের কাছে গিয়ে কতটা ভালো থাকবে জানি না।“

 

মা একেবারে মনমরা হয়ে গেলেন।তবে কিছু বললেন না।বাবা মুখফুটে সম্মতি দিয়ে দিয়েছেন।তিনি আর এর মাঝে প্রতিবাদ করতে পারেন না।তিনি শুধু গভীর করে একটা দম ফেললেন।আফসোসের গভীর নিঃশ্বাস।

আমি আর শেফা বেশ খুশি।ভেবেছিলাম,মা বেঁকে বসবেন।এত ভালোয় ভালোয় তারা রাজি হয়ে যাবেন ভাবি নি।রাতেই আমরা অনেকক্ষাণি গোছগাছ সেরে নিলাম।দরকারি জিনিসপত্র ভালো করে গুছিয়ে কাজ অনেকটা এগিয়ে রাখলাম।

 

রাত যখন গভীর হল,সেই দিন রাতে,সেই পুরানো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।বহুদিন,বহু সময় পর আশা আর তার স্বামীর মাঝে ঝগড়া বেঁধেছে।মা জেগে উঠলেন।সাথে বাবাও।মা অস্থির হয়ে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছেন।বাবাও চিন্তিত।তবে তিনি এতটা অস্থির হন নি।বিছানার এক কোণায় হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন।আমি আর শেফা আমার ঘরে বসে ভাবছি কি করা যায়।

ঝগড়ার বেগ আরও বাড়লো।মেয়েটার কান্না শোনা যাচ্ছে।এমন সময় মা ছুটে এসে বললেন, “আহাদ……আহাদ,আশাকে মারছে।জলদি যা,জলদি যা ওকে বাঁচা।“

মা পাগলের মত হয়ে গেলেন।শেফা মাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছে।এমন পরিস্থিতি দেখে আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম।মা’র এমন অবস্থা দেখে শেফাও কেঁদে দিল।খুব ভয় পেয়ে গেছে সে।

শেফা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “যা না আহাদ,একবার দেখে আয়।মা কেমন করছেন।কি না কি হয়…আমার খুব ভয় করছে।“

“তোর মাথা ঠিক আছে?” আমি একটু রেগে গেলাম, “আমি সেখানে যাব কেন?”

“মাকে শান্ত করতে হলেও যেতে হবে একবার।মা কেমন যেন করছেন।“

আমি মাকে শান্ত করার জন্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।ততক্ষণে ঝগড়া প্রায় থেমে এসেছে।দরজা দিয়ে বের হতে যাব,এমন সময় মা এসে বললেন, “থাক আহাদ,যেতে হবে না।ঝগড়া শেষ।“

আমি কিছুক্ষণ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।কি করবো বুঝতে পারছি না।শেফা মাকে নিয়ে রুমে গেল।কড়া ঘুমের ঔষধ দিয়ে মাকে ঘুমিয়ে রাখলাম সারারাত।মা ঘুমালেন,কিন্তু আমি আর শেফা এক মুহূর্তের জন্যেও ঘুমাতে পারি নি সারারাত।মার আচরণ দিন দিন অদ্ভূত হয়ে যাচ্ছে।

 

সকালে যাওয়ার সময়,সব কিছু ঠিকঠাক করার পর মা বেঁকে বসলেন।তিনি যাবেন না।কাঁদতে কাঁদতে  বললেন, “আমি  চলে গেলে আশাকে মেরে ফেলবে।“

আমরা মাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করলাম।শেফা বলল, “যা হবার তা হবেই।মেরে ফেললে তুমি কি কিছু করতে পারবে?কাল যে তাকে মেরেছে তুমি কি কিছু করতে পেরেছ?পারো নি।ওর কপালে যা আছে তাই হবে।চল তো মা।“

মা তবু শুনলেন না।বললেন, “আমি আশার সাথে দেখা না করে যাব না।“

 

অনেকটা বাধ্য হয়েই শেফাকে মেয়েটার বাড়িতে পাঠালাম ডেকে আনতে।শেফা সেই বাড়িতে ঢুকলো।আমি বাড়ির কাছাকাছি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

কিছুক্ষণ পর শেফা বেরিয়ে আসলো।তবে একা।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম,মেয়েটা তার সাথে আসে নি।আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার,আসে নি?”

“বাসায় কেউ নেই।দরজায় তালা দেয়া।“

“আশপাশে কাউকে জিজ্ঞেস করিস নি?”

“করেছি।কেউ জানে না।কাউকে বলে যায় নি।পাশের বাসার একজন বলল,তারা না কি খুব ভোর বেলায়  বের হয়েছে।“

 

আশাকে পাওয়া যায় নি শুনে মা আরও হতাশ হলেন।অনেকটা জোর জবরদস্তি করেই মাকে গাড়িতে তুলতে হল।

পুরানো তিমির [৪র্থ পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [৪র্থ পর্ব]

আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি।ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়।মর্নিং ওয়াক করা হয় না অনেকদিন।প্রথম প্রহরের সিগ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ভালো লাগছে খুব।চারপাশ সতেজ আর চুপচাপ।রাস্তা-ঘাটে তেমন লোকজন নেই।আমি আর আমার মত মর্নিং ওয়াকে বের হওয়া গুটি কয়েক লোক এদিক সেদিক হাঁটছে।ফাঁকা রাস্তায় গা দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে বের হই নি।বরং এই বাড়িটার খোঁজেই আজ মর্নিং ওয়াকের আয়োজন।সাদা রঙের পাঁচতলা দালান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধার ঘেষে।সামনে উঠোনের মত ছোট একটু ফাঁকা জায়গা।

আশা নামের মেয়েটি এখানে থাকে?

বাড়িটা আবার ভালো করে দেখে নিলাম।হ্যাঁ,এটাই।মা এই বাড়ির কথাই বলেছেন।মেয়েটা থাকে নিচতলার রাস্তার পাশের প্ল্যাটটায়।কিছুক্ষণ বাড়িটার চারপাশে ঘুরঘুর করলাম।প্রায় আধ ঘণ্টার মত হবে।কাউকেই দেখলাম না।কোন মেয়ে মানুষ তো দূরের কথা,কোন পুরুষ মানুষও না।এই বাড়ির সবাই মনে এখনো ঘুমে নিথর হয়ে আছে।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস কারো নেই হয়ত।

 

আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলাম।অন্য সময় হলে একটা বাড়ির পাশে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরাঘুরি করছি কেন___এই নিয়ে লোকজন নানা ধরনের সন্দেহ করত।কেউ কেউ এসে হয়ত জিজ্ঞেসও করত, “কি ভাই সাহেব,ধান্ধা কি?”

এই কাক ডাকা ভোরে সেই সন্দেহ করার মত মানুষ এখনো রাস্তায় বের হয় নি।পুরো শহর চুপচাপ।লোকজন নেই বললেই চলে।

ভাবলাম,অনেকক্ষণ তো হল।এবার ফিরে যাওয়া উচিত।বাসায় ফিরে দেখি মা নাস্তা তৈরি করছেন।আর বাবা জায়নামাজে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন।আমি নিশ্চুপে আমার ঘুরে ঢুকলাম।ভালো লাগছে না।নিজেকে খুব হতাশ লাগছে।ঘুম নষ্ট করে মর্নিং ওয়াক করে কোন লাভ হল না।ব্যর্থ মিশন।জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখছি।পূর্বের আকাশটা লাল টকটকে হয়ে ফেটে পড়ছে।সূর্যটা আকাশের গর্ভ ভেদ করে আস্তে আস্তে উঁকি দিচ্ছে পৃথিবীর প্রান্তরে।টুকরো টুকরো সোনালি মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়ছে এদিক সেদিক।রাতের অন্ধকার কুয়াশার মত হাওয়ায় মিশে গিয়ে আবার আলোকিত হচ্ছে এই বিশ্ব।

একটানা অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি ভাবনায় ডুবে গেলাম।আশা নামের মেয়েটাকে আমি কখনো দেখি নি।আমি যে কয়দিন এখানে থাকি,সে কয়দিন সে মায়ের কাছে আসে না।মা বলেছেন মেয়েটা সময় অসময়ে চলে আসে।কখনো দুপুর,কখনো সন্ধ্যায়।ভারী চঞ্চল মেয়ে।

সেই চঞ্চল মেয়েটি আমি এখানে থাকলে আসে না কেন সেটাও এক রহস্য।যে এই বাড়িতে নিত্য আসা যাওয়া করে,ইচ্ছা করে না হোক,ভুল বশতও তো আমার সামনে সে পড়তে পারতো।আমি বাড়ি কখন আসি সে এসব খবর রাখে? না কি মা-ই তাকে কথায় কথায় বলে “আমার ছেলে আসবে।“

বললেও বলতে পারে।মানুষ কথার ছলে গল্প করতে করতে কত শত কথাই না বলে।আমি কোন সমীকরণ মেলাতে পারছি না।মেয়েটা কি আমি থাকলে লজ্জায় আসে না,না কি অন্য কোন কারণ?মেয়েটাকে আমার চঞ্চল মনে হয় না।মনে হয়,ধুরন্ধর চালাক চতুর মেয়ে।বাবা মার বয়স হয়েছে।এই বয়সের মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব।কে জানে মেয়েটা মনে মনে কি ফন্দি আঁটছে।আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এখন থেকে মূল্যবান জিনিষপ্ত্র আর টাকা পয়সা বাড়িতে বেশি রাখবো না।এমনও হতে পারে মেয়েটা খুব ভালো,মনে কোন খারাপি নেই।তবুও সাবধান থাকা ভালো।সাবধানের মার নেই।

 

“কই রে আহাদ,নাস্তা করতে আয়”,মা টেবিলে নাস্তা রাখলেন।

আমি নাস্তা খেতে বসলাম।আমার খাওয়ার সময়,খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।নিজের হাতে সবকিছু পাতে তুলে দেন।একমাত্র ছেলে হিসেবে এইটুকু আদর আমার প্রাপ্য।মায়ের মনে আদরের সীমা পরিমাপ করে বের করা যায় না।দুই তিনটা থাকলে না হয়,সে আদর ভাগ করে দেয়া যেত।এখন তো সবটুকুই আমার।

 

আজ মা আমার পাশে নাস্তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন নি।খাওয়ার মাঝখানে চলে গেলেন।এত বছরের পুরাতন অভ্যাস আজ হঠাৎ এভাবে ভাঙ্গাতে আমি একটু চমকালাম।পরক্ষণেই ভাবলাম,মা’র বয়স হয়েছে।আর কত? হয়ত এখন একটু শরীর খারাপ করছে।দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারছেন না।বিছানায় গিয়ে একটু শুয়ে থাকবেন।

 

আমি বসে বসে নাস্তা করছি।রকমারি খাবারের মধ্যে মা আজ বিশেষ খাবার হিসেবে পায়স রেঁধেছেন।মায়ের হাতের পায়স অনন্য।তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।আমার ফুফুদের মুখে শুনেছি, যৌবনে বাবা মায়ের উপর রাগ করলেই তিনি পায়স রাঁধতেন।সে পায়স খেয়ে বাবা আর রাগ ধরে রাখতে পারতেন না।মা’র প্রেমে পড়ে যেতেন।

হঠাৎ দেখলাম মা হাতে একটা বক্স নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।আমি তড়িঘড়ি করে জানতে চাইলাম, “কোথায় যাচ্ছ মা?”

মা বললেন, “আশাকে একটু পায়স দিয়ে আসি।“

“তুমি পাগল হয়েছ মা?ডাক্তার তোমাকে সিঁড়ি দিয়ে বেশি উঠা নামা করতে নিষেধ করেছেন।অকারণে এখন নিচে নামার কি দরকার?”

“অকারণে কোথায়?মেয়েটাকে পায়স দিতে যাচ্ছি।যাব আর আসবো।এক দুইবার সিঁড়ি চড়লে কিছু হয়না।“

মা কে আটকান কঠিন কাজ।হিংসায় আমার গা জ্বলে যাচ্ছে।কোথাকার কোন মেয়ে,তার জন্যে মা’র এত আদর?আমার থেকেও বেশি?এই মেয়ের জন্যেই কি মা আজ নাস্তা খাওয়ার সময় দাঁড়ালেন না?এত দিনের অভ্যাস পালটে ফেললেন?পায়স নিয়ে তো পরেও যেতে পারতেন।মায়ের কাছে মেয়েটার এত গুরুত্ব?রাগে আমার মাথা টগবগ করছে।আমার নিজের বোন,পরিবার, কিংবা আত্মীয় স্বজনের জন্যে এমন মায়া দেখালে না হয় মেনে নিতাম।পরের জন্যে এমন আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগে না।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে যেও।আরেকটু পর যাও।এই সাত-সকালে যাওয়ার কোন মানে হয়! হয়ত ওরা এখনো ঘুম থেকেই উঠে নি।“

“বলেছে তোকে! আশা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে।তোদের মত এত অলস না!”

“তাই বলে এত সকালে যাবে! আর যেতে হবে কেন?মেয়েটা তো এখানে আসে।আসলে তখন দিও।“

“তুই বাসায় থাকলে ও আসে না।ওর লজ্জা করে।“

“ঠিক আছে যাবে।আরেকটু পরে যাও।“

“না না,এখনই……পায়স ঠান্ডা হয়ে যাবে।“

আমি আর রাগ সামলাতে পারলাম না।চিৎকার দিয়ে বলে ফেললাম, “পরের জন্যে তোমার এমন দরদ আমার ভালো লাগে না মা।কোথাকার কোন মেয়ে,কে জানে মনে মনে কি চাল চালছে! ওসব লজ্জা টজ্জা কিচ্ছু না……আমার সামনে আসলে মেয়েটার দুষ্ট বুদ্ধি ধরা খেয়ে যাবে এই ভয়ে আসে না।তোমাদের বয়স হয়েছে।এখন তোমাদের মন ভোলান সহজ….“

মা যেন মূর্ছা খেলেন।বজ্রাহত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

“কি বললি তুই! আশার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?”

আচমকা হাতে ধরা পায়সের টিপিন বক্সটা মেঝেতে ছুড়ে মারলেন।পুরো মেঝে জুড়ে পায়স ছড়িয়ে পড়লো।আমি অবাক দৃষ্টতে মায়ের দিকে চেয়ে আছি।দুদিনের পরিচিত একটা মেয়ের জন্যে মা আমার সাথে এমন করলেন!আমি যেন কিছুই ভাবতে পারছি না।একেবারে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম।

মা কেঁদে ফেললেন।আঁচলে মুখ ঢেকে নিজের ঘরে গিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলেন।

“খুশি থাক তুই,খুশি থাক!আমি যাব না আশার কাছে।হল তো?মেয়েটার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?কি খারাপ তোর চিন্তাধারা……ছিঃ!”

 

হই-হুল্লোড়ের মাঝে এবার রুম থেকে বাবাও বেরিয়ে এলেন।এসে আমাকে খুব বিশ্রী ভাবে বকে গেলেন।

“মেয়েটার মাঝে তুই কি খারাপি দেখেছিস?কি দুষ্ট বুদ্ধি আছে ওর মনে?বল!সামান্য একটু পায়েস দিয়ে আসলে কি এমন ক্ষতি হয় শুনি!সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বুড় মায়ের সাথে হৈ চৈ করতে একটুও লজ্জা করলো না তোর!অসভ্য…জানোয়ার…”

 

বাবার মুখের উপর আমি আর কোন কথা বললাম না।উনারা দুজনেই এখন খুব রেগে আছেন।কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।শুধু এইটুকু বুঝে নিলাম,মেয়েটা শুধু মাকে নয়,বাবাকেও কাবু করে ফেলেছে।

পুরানো তিমির [২য় পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [২য় পর্ব]

সারারাত ঘুম হয় নি। সকালে উঠে মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে।পরদিন অফিস।তাই সকাল সকাল নাস্তাটা সেরে জামা কাপড় গুছিয়ে নিলাম।বাহিরের দুনিয়ায় তখনো পুরোপুরি আলো ফুটে নি।সবে ভোর হল।পূর্ব দিগন্তের এক কোণায় সূর্যটা উদয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।এমন ভোরে হাতে ব্যাগ নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম।।ঢাকা যেতে হবে।বাসে উঠে গত রাতের কথা মনে পড়লো।মেয়েটা সম্পর্কে কিছুই জানা হয় নি।রাতে মায়ের ঘুম নষ্ট হবে বলে আমি আর কথা বাড়াই নি।মনে মনে ভেবেছিলাম সকালে ঘুম থেকে উঠে সব জানা যাবে।সে ভাবনা ভাবনাই রয়ে গেল।সব কিছু গোছাতে গিয়ে মা কে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।দীর্ঘ পথ জার্নি করে,দশ ঘন্টা বাদে,ঢাকায় পৌঁছে মনে পড়লো,মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানা হল না।

হায়রে বেখেয়ালি মন!

মনে মনে আমি হাসলাম।প্রতি রাতে একটা মেয়ে কেন নির্যাতিত হয়,কি কারণ,নির্যাতনকারীর সাথে মেয়েটার সম্পর্ক কি এসব কিছুই জানা হল না।

মা নিশ্চয় সব কিছু জানেন।মেয়েটার সাথে মায়ের সম্পর্ক ভালো।মা’র কথা শুনে মনে হল দু’জনের মাঝে খুব ভাব।সুখ,দুঃখের কথা নিশ্চয় একে অপরকে বহুবার বলেছে।

 

তারপর বহুদিন।

বহু সময় এভাবে কেটে গেল।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের ঝামেলা,নিজের ব্যক্তিগত কাজ,ঢাকা শহরের অসহ্য জ্যাম ঠেলে ব্যস্ত জীবন……সব কিছু মিলিয়ে মেয়েটার কথা ভুলেই গেছি।ভুলে গেছি বললে সম্ভবত ভুল হবে।।বরং মনে করার সময়ই পাই না।

মায়ের সাথে ফোনে রোজই কথা হয়।সে কথা নিজেদের মধ্যে খোঁজ খবর নেয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।এই ব্যস্ত নগর জীবনে অন্যকে নিয়ে ভাবার জন্যে কতটুকু সময়ই বা আমরা পাই?

 

তারপর একদিন।প্রায় মাস খানেক পরে একদিন মায়ের কাছে গেলাম।বাবার সাথে বসে রাতের খাওয়া দাওয়া হল।নিজের ঘরে বিছানা পেতে শুয়ে আছি।জার্নি করে বেশ ক্লান্ত লাগছে।কিছুক্ষণ পর মা এসে বিছানার পাশে বসলেন।হাতে পেয়ারা,আপেল ফলমূল আরও কত কি! একটা বাঁটিতে কয়েক রকম পিঠাও আছে।আমি বললাম, “এসব কেন মা? মাত্র ভাত খেলাম। “

“আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখেছিস?” মা মুখ ভেংচালেন, “এই বয়সে খাওয়া দাওয়ায় কোন ধরাবাঁধা আছে?”

মায়ের ধারণা আমি ঢাকা গেলেই ভীষণ শুকিয়ে যাই।যদি পাঁচ কেজি ওজন বাড়িয়েও বাড়ি ফিরি,তারপরও মায়ের চোখে আমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছি।মায়েরা এমন।তাই অগত্যা আমাকে বাড়ি এলে ভুরি ভুরি খাবারের অত্যাচার সহ্য করতে হয়।কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন,ভালোবাসার অত্যাচার কঠিন অত্যাচার।সত্যিই তাই।

 

মা বিছানার পাশে বসে আছেন।আমরা সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করছ।আত্মীয় স্বজন,তাদের সুখ,দুঃখ……কার কি অবস্থা এইসব।আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে আমার খাওয়া কার্যক্রমও বেশ চলছে।বাঁটি থেকে একটা তেলে ভাজা ডিমের পিঠা নিয়ে মুখে দিলাম।

“বাহ! খুব মজা হয়েছে এই পিঠা।অসাধারণ।”

মা কিছু বললেন না।আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন।তৃপ্তির হাসি।

মায়ের হাসি বেশিক্ষণ মুখে টিকলো না।পরক্ষণে কি ভেবে যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন।

“আহাদ!”

“কি মা?”

“তুই দেখি কিছুই খেয়াল করিস না।এখন যে পিঠাটা খেলি,এমন পিঠা আমি তোকে এর আগে কোনদিন বানিয়ে খাইয়েছি?”

আমি কিছুক্ষণের জন্যে চুপ মেরে গেলাম।মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি বোকার মত।ছোটবেলা থেকেই মা নানা রকম পিঠা বানিয়ে আমাদের খাইয়েছেন।মা বাইরের খারার পছন্দ করেন না।তাঁর রান্নাবান্নায় বিশেষ সখ আছে।আমি লজ্জিত কন্ঠে জানতে চাইলাম, “এই পিঠা তুমি বানাও নি?”

“হ্যাঁ,আমিই বানিয়েছি…”

“তাহলে……”

“আমি আগে এই পিঠা বানাতে পারতাম না তো।অল্পদিন আগে শিখলাম।আশা শিখিয়েছে।”

“আশা কে?”

মা বিরক্ত হলেন।বৃদ্ধরা খুব সহজে বিরক্ত হয়ে যান।জীবনের সাথে দীর্ঘ সময় লড়াই করে শেষ বয়সে আর ধৈর্য্যের কিছু অংশ বাকি থাকে না।মা ভুরু কুটি করে বললেন, “গতবার এসে যে মেয়েটার কান্না শুনেছিলি সেই মেয়ে।”

আমি ধাক্কার মত খেলাম।মেয়েটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম অনেক আগেই।মা’র মুখে শুনে এখন আবার হুট করে মনে পড়লো।

“ওহ্‌…মেয়েটার নাম আশা?”

“জানি না।আমি ওকে আশা বলে ডাকি।”

“কেন?”

মা দ্বিতীয় বারের মত বিরক্তি প্রকাশ করলেন, “তুই দেখি সবকিছু ভুলে যাস! “

তাঁর ধারনা তিনি আমার সাথে মেয়েটাকে নিয়ে অনেক কথা বলেছেন।বৃদ্ধ বয়সে এমন স্মৃতি বিভ্রাট হয়।

আমি মায়ের হাত দুটা ধরে ক্ষীণ স্বরে বললাম, “ভুলব কি মা?তুমি তো মেয়েটা সম্পর্কে আমাকে বেশি কিছু বল নি।গতবার তো আমরা এ নিয়ে বেশি কথা বলার সুযোগই পাই নি। “

মা কিছু বলছেন না।চুপ করে বসে আছেন।আমি নিরবতা ভাঙতে মাকে প্রশ্ন করলাম, “তুমি মেয়েটাকে আশা ডাক কেন?”

“ভালো লাগে তাই।প্রথম দিন থেকেই মেয়েটার মুখে কত আশা ভরসার কথা শুনি।মেয়েটার চোখে অনেক স্বপ্ন রে আহাদ! পোড়া কপালি! কে জানে জীবনে কোন আশা পূরণ হয় কি না।পড়ে আছে একটা কসাইর কাছে।বদলোক!”

“কোনদিন নাম জিজ্ঞেস কর নি?”

“না……আমার আশা ডাকতেই ভালো লাগে। “

“বদলোকটা মেয়েটার কি হয়?…স্বামী?”

“হু…”

“এখন আর ওদের মাঝে ঝগড়া হয়?যেদিন যেমন শুনলাম। “

“জানি না। “

“কেন……এখন আর সেদিনের মত হৈ চৈ,হট্টগোল শুনো না?”

“না রে আহাদ! গত একমাস কিছুই শুনি নি। “

মায়ের গলাটা খুব শান্ত হয়ে গেল।জানালার ফাঁক দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছেন।মুখে হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।গভীর অনুতপ্তের একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন।

আমি বললাম, “দেখেছ মা,আমি বলি নি,সংসারে এমন মাঝেমাঝে হয়। ওসব কিছু না। “

“মাঝেমাঝে না প্রতিদিন তুই কেমনে জানিস? তুই কি মেয়েটার কাছে গিয়ে বসে আছিস?” মা হঠাৎ রেগে গেলেন।

আমি আমতা আমতা করে বললাম, “প্রতিদিন ঝগড়া হলে তো তুমি শুনতে মা।সেদিন যেমন শুনেছিলে……“

মা আগের চেয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন।মায়ামাখা করুণ সুরে বললেন, “গত একমাস ধরে মেয়েটার কোন খোঁজ পাচ্ছি না আহাদ।কয়েকবার ওদের বাসায়ও গিয়েছিলাম,পাই নি।বাসায় তালা দেয়া ছিল। “

“আশপাশের কাউকে জিজ্ঞেস কর নি?”

“করেছি,কেউ জানে না।লোকটার স্বভাব চরিত্র ভালো না।তাই কেউ তাদের সাথে তেমন একটা মিশতে চায় না।তাদের পাশের বাসার এক লোক শুধু বলল, মাস খানেক আগে একদিন সকালে তারা নাকি বাসায় তালা দিয়ে কোথায় গিয়েছিল।তারপর আর ফিরে নি। “

 

তারপর অনেক্ষণ নিরবে কেটে গেল।মা মনমরা হয়ে বসে আছেন।আমিও চুপচাপ।এমন পরিস্থিতিতে আমার কি বলা উচিত তাও বুঝতে পারছি না।কি ভাবে মাকে সান্ত্বনা দেয়া উচিত ভেবে পাচ্ছি না।ভাবতে ভাবতে অনেক্ষণ গেল।শেষে মায়ের মন অন্যদিকে ফেরাতে মুখ হাসি হাসি করে বললাম, “মেয়েটা তোমাকে কি সব আশা ভরসার কথা বলে মা?কয়েকটা বল দেখি,শুনি।”

“ওসব ছেলেমানুষি স্বাদ-আহ্লাদ তুই কি শুনবি? মেয়েছেলেদের সব কথা শুনতে নেই।”

আমি আবার কথার খেই হারিয়ে ফেললাম।মাকে কি বলে ভোলান যায় বুঝতে পারছি না।আমি প্রসঙ্গ পালটে মায়ের সাথে আত্মীয় স্বজনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাইলাম।কথাবার্তা তেমন জমলো না।মা বারবার ঐ মেয়েটার কথা টেনে আনেন।আমি একবার বলে ফেললাম, “বাদ দাও তো মা।কোথাকার কোন মেয়ে,দুদিনের পরিচয়,ওকে নিয়ে চিন্তা করে তোমার লাভ কি?”

মা কিছু বললেন না।শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার ঘর থেকে চলে গেলেন।

 

সারারাত আমার তেমন আর ঘুম হয় নি।বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছি শুধু।গভীর দুশ্চিন্তায় মাথা ভার হয়ে আছে।আমার চিন্তা মেয়েটাকে নিয়ে নয়,মাকে নিয়ে।তাঁর বয়স হয়েছে।এ ভাবে দিনের পর দিন দুশ্চিন্তা করলে,কে জানে কখন কি হয়ে যায়!

Page Sidebar