কাগজের প্লেনঃ পর্ব ২

Now Reading
কাগজের প্লেনঃ পর্ব ২

 

কিছু মানুষ সিধা হয়না কোনদিন।সাবিত ও হইলো না।সোমালিয়ার পর সুইটি এবং শেষে তার জীবনে টরন্টোর বরফকন্যার আবির্ভাব ঘটে।বরফকন্যার কথা আর কি বলবো,দেখলে তো সান্তা ক্লজের কথা মনে পড়ে যায়।মানে দুইজনেই তারা ঠান্ডার দেশে থাকে তো!তুষারের মত চেহারা তার,রক্তলাল ঠোঁট, সাদা মলিন চেহারা,উজ্জল বর্নের চোখের মণি।একবার দেখলেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট হয় তাদের,হেই ডুড বলে ডাকে সাবিতকে।সাবিত ও লুল লেইখা কুল হওয়ার চেষ্টা করে।তাদের মধ্যে সেলফি আদান প্রদান হয়,চুম্মাচাটি, চোখ টিপার ইমো চলে।বরফকন্যার ছবি এডিট করে বারবার দেখে সাবিত।আহা!কবে যে দেখা হবে!এদিকে দুষ্টু ছেলে সোহেল মোবাইলে ছবিটা দেখে ফেলে।দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়।কায়দা করে বরফকন্যার নাম্বার বাগিয়ে নেয় সে।তবে তাড়াহুড়া করে সেভ করার সময় একটা ডিজিট উলটপালট হয়ে যায়।সোহেল সেই নাম্বারে নক দিয়া চ্যাট করতে থাকে।নাম্বারটা ছিল জনৈকা বিলকিসের।কয়েকদিনের মধ্যেই অনেক গভীরে চলে যায় তাদের সম্পর্ক।বাহরাইনের রাজপুত্র নামে আইডি দিয়ে সারা দিন রাত পড়ে থাকে “বিল কিস” এর আইডিতে।অটোলাইক দিয়ে ভরিয়ে দেয় তার প্রতিটা স্ট্যাটাস,প্রোফাইল পিকচার।চ্যাটাইতে চ্যাটাইতে একদম চ্যাটচ্যাটা করে ফেলে মোবাইল।(মোবাইলের নাড়ীভুড়ী কিছু রাখছে বইলা মনে হয় না)
সোহেলের মনের মধ্যে আবারো প্রেম চ্যাগায়া উঠে।বসন্তের শিয়ালে কাওয়ালি গায়।(গাইতে গাইতে কই যে হারাইয়্যা যায়)
এমনই এক শীতের সকালে বিলকিস তাকে সুখবরটা জানালো।(না না,অমন কিছু না কিন্তু!)বিকেলে মিনি বাংলাদেশে যাইতে বলল।সোহেল তো খুশিতে চৌচির।সরিষার তেল মেখে গোসল করলো ভালমত।শীত টের ই পেলো না আনন্দে।বিকেল হতেই আগাগোড়া ফিটফাট হয়ে হাজির হল সোহেল।উগ্র সাজ পোশাকে বিলকিস আসলো আধা ঘন্টা পর।দুইজন অনেকক্ষণ হাতে হাত ধরে শিশুপার্কে বসে কথা বলল,বাদাম চিবালো ইত্যাদি ইত্যাদি।সন্ধ্যা নেমে আসতেই সোহেল বলল,“চলো উঠি”।জবাব না দিয়ে আরও কাছাকাছি ঘেঁষে এলো বিলকিস।সোহেলের কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরুতে লাগলো।সে খেয়াল করলো না আঁধার থেকে কয়েকটা ছায়ামূর্তি তাদের কাছাকাছি চলে এসেছে।হঠাত দেখল ফ্যাকাশে চেহারার একটা ছেলে তাদের দিকে আসছে।বিলকিসের কাছ থেকে সরে বসলো সোহেল।ছেলেটা হাসি হাসি মুখ করে ওর পাশে এসে বসে পড়লো।তারপর সোহেলের কাঁধে ডেভিডের মত হাত ঝুলিয়ে দিলো।সে রেগেমেগে তাকে হাত সরাতে বলতে যাচ্ছিলো,কিন্তু কিডনির ঠিক উপরে ধাতব কিছু একটার শীতল স্পর্শ পেয়ে থেমে গেলো।খুব মজার কোন কৌতুক বলছে এমন ভাব করে সোহেলকে বললো-“চুপ চাপ মোবাইল আর মানিব্যাগ টা বাইর করে আমার হাতে দে।যদি টু টা করস তাইলে তোর কিডনি একটা কমাই দিবো।”
ভয়ার্ত সোহেল বিলকিসের দিকে তাকাল।ওকে বেশ শান্ত আর নির্বিকার মনে হচ্ছে।মুহূর্তেই সে বুঝে গেলো ব্যাপারটা।
-কিরে এমনে তাকাস ক্যারে,হালারপো?যেটা বলসে কর তাড়াতাড়ি।শান্ত,বেনসন দে তো একটা।
অন্ধকার থেকে আরেকটা ছেলে বেরিয়ে এসে বিলকিসের হাতে সিগারেট দিলো।আয়েশ করে সেটা ধরিয়ে এক পা তুলে বসলো বিলকিস।তারপর সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে গলগল করে সোহেলের মুখের উপর ধোঁয়াটা ছাড়লো।
-বেশি সেয়ানা হইসোস,না?মাইয়া দেখলেই চ্যাগব্যাগ করবার মন চায়,না?এখন কেমন লাগতেছে,খাট্টা বাইউন?
সোহেলের মানিব্যাগ,মোবাইল আর হাতঘড়িটা ততক্ষণে নিয়ে নিয়েছে ফ্যাকাশে চেহারার ছেলেটা।লগআউট করতে গিয়ে থাবড়াও খেয়েছে।কিন্তু তাকে খাট্টা বাইউন বলার পর মাথায় আগুন ধরে গেলো।টূট টূট মার্কা কয়েকটা শব্দ বলল বিলকিসকে।
রেগে মেগে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো বিলকিস।
-*** পোলা!দাঁড়া তুই! তোর আজকে খবর আছে!
উঠে দাঁড়ালো সোহেল।
-জামা খুল।
-মানে?
-ওই হানিফ,সব কিসু খুইলা নে
ছেলেটা জোর করে সোহেলের বস্ত্রহরণ করলো।ওর পরনে এখন শুধু পিঙ্ক কালারের প্রজাপতি আঁকা হাফপ্যান্ট।সেটা দেখে পৈশাচিক হাসি দিলো বিলকিস আর তার সঙ্গী।দুই হাত দিয়ে নিজের প্রজাপতি ঢাকলো সোহেল।
-আমারে গালি দেয়ার সাজা দেখসস?
-প্লিজ,বিলকিস।কাপড় নিও না।বাসায় যাবো কিভাবে?
-সেটা আমার চিন্তা নাকি?
-প্লিজ…
-আবার কথা!চুপ চাপ ভাগ এখান থেকে,নইলে তোর প্রজাপতিটাও খুইলা নিবো।
আরেক দফা হৃদয়হীনা হাসি দিলো সে।
শক্তিমানের মত চইদ্দটা ঘুরান্টি দিয়ে ফিট হয়ে পড়ে গেলো সোহেল।
আধ ঘন্টা পর শীতের ঠেলায় জ্ঞান ফিরতেই ধরমড়িয়ে উঠে বসলো।শিশিরে ভিজে গেছে তার গোলাপি হাফপ্যান্ট।কিছু দূরেই তার জামাকাপড় পাওয়া গেলো।দৌড়ে গিয়ে সেগুলো পড়ে নিয়েই ছুটল সোহেল বাইরে।বিলকিস তাহলে অতটা নিষ্ঠুর হতে পারেনি।
ঠিক তখনি সেই রাস্তা ধরে সাদা শলাকা টানতে টানতে আসছিল রিফাত।মাথায় তখন তার ব্যাবসায়িক চিন্তাভাবনা।দৌড়ন্ত সোহেল সরাসরি এসে তার সাথে ধাক্কা খেলো এবং তারা বাংলা সিনেমার নায়ক নায়িকাদের মতন গলাগলি করে পড়ে গেলো।রিফাতের হাতের জলন্ত সিগারেট উড়ে গিয়ে আকিজ বিড়ির গুদামে পড়ে সেখানে আগুন ধরে গেলো।
সেই আগুনের আলোয় সোহেলকে চিনতে পেরে বুকে টেনে নিলো রিফাত…
কথায় কথায় সোহেল তার বিয়োগান্তক কাহিনী জানালো।রিফাত বললো,“চিন্তা করিস না,রিফাত ভাই আছে না”
তারপর কাহিনী অল্প।রিফাত সোহেলকে পৌঁছে দিয়ে চলে গেলো।সোহেল প্রথমেই তার বেহাল দশার একমাত্র সাক্ষী প্রজাপতিটা পুড়িয়ে ফেললো।দুঃস্বপ্নে কেটে গেলো রাত।
এরপর থেকেই সোহেল ভালো হয়ে চলার চেষ্টা করছে।ফেসবুকেই আসত না অনেক দিন।অচেনা কাউকেই নক দিত না।অচেনা কারো নক পেলেই তার সেই কালসন্ধ্যার কথা মনে পড়ে শিউরে উঠত…
বিড়ির গুদামে আগুন লাগার পর থেকে রিফাত শলাকা টানা ছেড়ে দিয়েছে।কেউ কারণ জিজ্ঞেস করলেই সে চুপসে যেত ফুটা বেলুনের মত।

আর এভাবেই দুটা ছেলে লাইনে ফিরে এলো।আর সাবিত?কি হল তার? আরেকদিন বলবো নাহয়।