1
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
ফ্রেশ!
REGISTER

বন্ধুত্বের শুরুটা

Now Reading
বন্ধুত্বের শুরুটা

আমাদের প্রথম কথা হয়েছিল জানুয়ারীর ৮ কিংবা ৯ তারিখে। সেদিনই সম্ভবত আমাদের ইউনিভার্সিটির প্রথম ক্লাস ছিল।

হঠাৎ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলি , এই তোমার নাম অন্তু?

আমি থতমত খেয়ে বলেছিলাম , হ্যাঁ। কিভাবে জানো ?

কিছু না বলে রহস্যময় হাসি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিলি ।

আমি মনে মনে অনেক খুশি হয়েছিলাম সেইদিন । এতো সুন্দর ছেলেটা আমার সাথে কথা বলল । তাও নিজে থেকে , ভাবতেই ভালো লাগছিল । আবার আমার নামও কোন ভাবে জানে ।

তারপর প্রতিদিন তোকে দেখতাম । মুখভর্তি দাড়ি , লম্বাটে মুখ ,  অহংকারী চেহারার মধ্যে মুখভর্তি হাসি এমন চমৎকার লাগতে পারে তোকে দেখেই প্রথম টের পেলাম । নাক উঁচু করে ক্লাস্রুমে  ঢুকতি । তারপর নাক গুজে এককোনায় বসে পড়তি ছবি আঁকতে । আমি আরচোখে তোকে দেখতাম । অসম্ভব ভাল লাগত দেখতে তোকে । মাঝে মাঝে ভাবতাম তোর সাথে যদি বন্ধুত্ব করা যেত । একদিন কথা বলে আর পরে কেন নিজে কথা বলতে আসিস না সেটাও ভাবতাম । নাকি নিজে গিয়েই কথা বলব । যদি বেহায়া ভাবে ? ভাবতে ভাবতে  পুরো এক সেমিস্টার পার হয়ে গেল । আমার আর সাহস হল না তোর সাথে নিজে থেকে কথা বলার । Friendship-Day-Drawing-Black-And-White2.jpg

পরের সেমিস্টার এ একদিন সুযোগ হয়েই গেল তোর সাথে কথা বলার । তোর এক বন্ধু জায়গা না পেয়ে আমার পাশে বসল । তুইও একটু পর এসে বসলি , এক কথায় দুই কথায় বন্ধুত্বের শুরু হল ।

তারপর থেকে আমাদের এক গ্রুপে চলাফেরা শুরু । আমার বাকী বন্ধুদের সাথেও তোর ভাব হয়ে গেল ।  আমি প্রথম থেকেই তোকে আর তিনাকে নিয়ে হাসাহাসি করতাম । তোরা দুইজনই খুব সুন্দর । মানাতো বেশ । যদিও আমার তোকে ভাল লাগত ।তখনও মুখ ফুটে বলার সাহস হয় নি । মজা করলেই  তিনা রেগে মেগে অস্থির হত । তবে আমি কখনই বুঝতে পারি নি যে , তিনা তোকে ভালবেসে ফেলবে । আর আমি, আমি দেখতে সুন্দর না বলে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নিলাম । অবস্থাটা আগের মত থাকলে হয়ত এখনকার মত বেসামাল হতাম না ।  তোকে দেখে অবশ্য কোনদিনই বোঝার কোন উপায় ছিল না তুই কাউকে পছন্দ করিস কিনা ।

তিনা তোকে পছন্দ করে এ কথাটা ও কাকে প্রথম বলেছিল জানিস ?

ঠিক ধরেছিস । আমাকেই ।

 

আমি কক্সবাজারে যাচ্ছিলাম বাসে করে হঠাৎ টুং করে ম্যাসেঞ্জারে শব্দ করে উঠল । তাকিয়ে দেখি তিনা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে ।

তিনা ঃ দোস্ত, আমি একজনকে পছন্দ করি । তুই তাকে অনেক কাছ থেকে চিনিস ।

বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল । খুব চাচ্ছিলাম তোর নাম যাতে না বলে । কিন্তু আমাকে ঠিক প্রমান করে দিয়ে তোর নামই বলল ।

আরো কি বলল জানিস ? বলল, আমি যাতে তোকে একটু বুঝিয়ে বলি । ও অনেক ভয় পাচ্ছে তোকে জানাতে । আমি বুঝতে পারছিলাম না কি বলব । বুকের ভেতর টা খালি হয়ে গিয়েছিল । নিজেকে অনেক অসহায় লেগেছিল । মনে হচ্ছিল আমার অনেক কিছু কেউ একবারে কেড়ে নিয়েছে ।

‘আচ্ছা’ । এতটুকুই লিখেছিলাম।

হাত কাঁপছিল , অনেক কষ্টে তোকে একটা ম্যাসেজ লিখলাম , ঘুমাচ্ছিস ? না ঘুমালে মিসকল দে , জরুরী কথা আছে । সেন্ড বাটন এ চাপার ৩০ সেকেন্ড এর মধ্যে তোর মিসকল ।

তোকে ফোন দিলাম।

বললাম , দোস্ত তিনা তোকে ভালবাসে । ও ভয় পাচ্ছে বলতে । আমাকে বলতে বলল ।

তুই প্রথমেই বিরক্ত হয়ে বললি , মানে ?

আমি আবার বললাম ,দোস্ত তিনা তোকে ভালবাসে । ও ভয় পাচ্ছে বলতে । আমাকে বলতে বলল ।

তুই খুব শান্ত কন্ঠে বললি , আচ্ছা , এ বিষয়ে পরে কথা বলব । আর কোন কথা আছে তোর ?

আমি বললাম , ‘না’ ।

তাহলে ফোন রাখ ,বলেই, নিজেই কেটে দিলি । আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । অনেকক্ষন ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছিলাম ।

একমন বলছিল , এটার মানে নিশ্চই না । যাক , বাঁচা গেল । আরেক মন বলছিল না হলে তিনা খুব  কষ্ট পাবে । আবার পরেই ভাবছিলাম , হয়ত ও সময় চাচ্ছে ভাবার । হয়ত কাল ও ‘ই’ তিনাকে ফোন করে ভালবাসার কথা বলবে । হাজার হাজার কথা মাথায় ঘুড়পাক খাচ্ছিল ।  কে জানে কি হবে ?

 

তখন রাত দু’টো বাজে । ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত কান্না করলাম । আলো হতে হতেই চোখ মুখে ফেললাম । রাতের কষ্ট রাতের গভীরেই হারিয়ে যাক । সকালে সুদীপদা ডেকে বলল , তোর কি জ্বর ? মুখ ফুলে আছে কেন ?

আমি বললাম , না ঠিক আছি , খুব মাথা ধরেছে । আসল কথাটা বলতে পারি নি , যে বুকের ভেতরটাই ধরে গেছে ।

 

সেই রাতের আগ পর্যন্ত ভাবতাম তোকে আমার ভাললাগে । শুধুই ভাললাগা । হঠাৎ করে অনুভব করলাম এক অদ্ভুতুড়ে অনুভুতি , হয়ত সেই অনুভুতিটার নাম ভালবাসা।

ভালবাসা শব্দটা খুব অদ্ভুত । অজানা ভয় , কখনো বা অনিশ্চয়তা , পাওয়ার ইচ্ছা , হারাবার ভয় , শব্দ , গন্ধ , ছোয়া সকল অনুভুতির সমষ্টি এ ভালবাসা । এক রাতে অনেকটা বড় হয়ে গেলাম । গল্পের পাতায় যে শব্দের পরিচয় , তার আজ হাতে কলমে শিক্ষা পেলাম । সেদিন থেকেই পাবার তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠল। আর সেই সাথে হারাবার প্রবল ভয় ।

আজ এ পর্যন্তই থাক , ভালবাসার গল্পটার বাকীটুকু  না হয় পরে হবে ।

 

কষ্ট

Now Reading
কষ্ট

শ্রাবণ মাসের এক রাত। পরিবারের সবাইকে আমি চিৎকার করে ডাকছি। কেউ আমার কোনো কথাই শুনতে পায় না। আমার কথা বুঝতে পারে না। শুধু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। আমি শত চেষ্টা করেও যখন ওদেরকে মনের কথাগুলো বোঝাতে পারি না, তখন যেন আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তখন আমার একমাত্র ভাষা হয়ে যায় চোখের জল। আমি অঝোরে কাঁদতে থাকি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি।
প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যেন পরিবারে ঈদের আনন্দ নেমে আসে। কাল শুক্রবার, হুররে কি মজা হবে। সবার ছুটি কী মজা বলে সাত বছরের ছোট্ট শিশুটি আনন্দে নাচানাচি করছে। বাবা, কাল সবাই মিলে বেড়াতে যাব। অনেক মজা হবে। সারাদিন পার্কে বেড়াব, তারপর সন্ধ্যায় সবাই মিলে চাইনিজ খাব। কি মজা। বাবা তুমি প্রমিজ করো! আচ্ছা ঠিক আছে যাব, হলো! তারপর আবার নাচানাচি।
তখন রাত ৩টা কি সাড়ে ৩টা। বাথরুমে যাওয়ার জন্য বেড থেকে নামতেই মাথায় আচমকা একটা চক্কর মেরে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ধপাস করে পড়ে যাই মেঝেতে। বস্তা পরার মতো একটা শব্দ হয়। আমার স্ত্রী হুড়মুড় করে উঠে বসে। রাফির বাবা বলে, আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি রাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। চুলগুলো এলোমেলো। চোখে মুখে রাজ্যের আতঙ্ক। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল রাবুকে। আমি শরীরের সব শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। বাম পাশটায় কেন যেন কোনো শক্তি পাচ্ছি না। আমি ডান হাত দিয়ে রাবুর হাতটা শক্ত করে ধরে আছি। রাবু কাঁদতে কাঁদতে বলে, রাফির বাবা, কি হলো তোমার? ওঠো! আমি পারি না। রাবুর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। যেন আজ প্রথম দেখছি রাবুকে। রাবুর কান্নার শব্দে শিশু দু’টি উঠে পড়ে। ওরা এসে ওদের মায়ের কান্না দেখে ওরাও কান্না শুরু করে দেয়। আমি ওদের বলি কেঁদো না। ওরা কেউই আমার ভাষা বুঝতে পারে না। আমি হাত দিয়ে ওদের ইশারা করে থামতে বলি। ওরা শব্দ থামিয়ে ফোঁপাতে থাকে।
পরদিন সকালেই আমাদের বাসায় অনেক মেহমান আসে। আমাকে দেখতে আসে। অনেক ফলমূল নিয়ে এসেছে। রোগী দেখতে গেলে ফলমূল নিতে হয়। সবাই আমার মুখের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আহারে কত জোয়ান মানুষ! মুহূর্তে কি হয়ে গেল! আমি ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, পারি না। কথা বোঝাতে না পারলেই কান্না।
এখন বিছানাই আমার জগৎ। এভাবে দিন যায়, মাস যায়। আস্তে আস্তে সব কিছু স্বাভাবিক হতে থাকে। পৃথিবী কারো জন্য থেমে থাকে না। শিশুরা স্কুলে যায়। রাবু কলেজে ক্লাস নিতে যায়। রাবু যাওয়ার আগে আমার অনেক সেবাযতœ করে। আমি একা একা বিছানায় পড়ে থাকি। একটু পানি পিপাসা লাগলে আমি উঠে খেতে পারি না। রাবু যাওয়ার সময় এক লিটারের একটা বোতল ভরে আমার ডান পাশে রেখে যায়। সবাই যখন বাসা থেকে চলে যায়, আমি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। চার তলার খোলা জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। দূরের আকাশে একদল পাখি উড়ে বেড়ায়। উড়তে উড়তে পাখিরা দূর আকাশে মিলিয়ে যায়। পাখিদের আকাশে উড়তে দেখে আমারও খুব পাখি হতে ইচ্ছে করে। দূর আকাশে উড়তে ইচ্ছে করে। রাতের বেলায় দূর আকাশে তারা দেখি। কত রকমের তারা!
চিত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে আমার বাম পাশটায় ঘা হয়ে যাচ্ছে। রাবু একটা মিল্লাত পাউডার কিনেছে। কলেজে যাওয়ার সময় ঘা তে লাগিয়া দিয়ে যায়। গন্ধ দূর হয়। আরামও পাওয়া যায়। এখন আর আগের মতো আত্মীয়স্বজন আমাকে দেখতে আসে না। ক’দিনই বা আসবে। সবাই তো ব্যস্ত। গত কয়েক দিন যাবৎ ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তার ওপর আবার মশার উপদ্রব। ভ্যাপসা গরমে মশারি খাটানোর জো নেই। রাবু বিছানার পাশে কয়েল ধরিয়ে দেয়। মাঝরাতে কখন যে কয়েল এসে বিছানার সাথে লাগে বুঝতেই পারি না। আমি জেগেই ছিলাম। ধোঁয়া দেখেই আমি চিৎকার করে ডাকতে থাকি। কয়েলের আগুন তোষক থেকে আমার শরীরে লাগতে থাকে। আমার চিৎকার ওরা কেউ শুনতে পায় না। রাবু বেচারা রাত জেগে খাতা দেখে ঘুমিয়েছে। কিছুই টের পায় না সে। আগুন আস্তে আস্তে আমাকে পোড়াতে থাকে। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে থাকি। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আমি পুড়তে থাকি। সে যে কি কষ্ট! আস্ত মানুষ পোড়ার ভয়াবহ দুর্গন্ধে রাবু পাশের ঘর থেকে দৌড়ে আসে। আমার সন্তান দু’টি উঠে আসে রাবুর সাথে। রাবু পাগলের মতো দৌড়ে বাথরুম থেকে পানি এনে আমার শরীরে ঢালতে থাকে। আমি কথা বলার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমি নীরব। রাবু আমার ডান হাত ধরে টান দেয়, রাফির বাবা কথা বলো। আমার হাতটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। আমার স্ত্রী আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার দেয়। মায়ের সাথে শিশু দু’টিও কেঁদে ওঠে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ঠিক আমার মতোই একজন মানুষ নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়।
গভীর রাতে রাবু আর সন্তানদের কান্নার শব্দে প্রতিবেশীরা ভিড় জমায় বাসায়। আহারে! কত কষ্ট পেয়ে যে মানুষটা মরে গেছে! খুব ভালো মানুষ ছিল লোকটা। সবসময় মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটত।
ভোর হতে না হতেই আত্মীয়স্বজনেরা বাসায় চলে আসে। সবাই বলাবলি করছে, লাশ বেশিক্ষণ ঘরে রাখতে নেই। যত তাড়াতাড়ি দাফন করা যায়, ততই ভালো। তা না হলে মুর্দার রূহ কষ্ট পায়। রাবুর ভাই-ভাবীরা সংবাদ পেয়ে আগেই মাইক্রোবাস ঠিক করে নিয়ে এসেছে। আত্মীয়স্বজনদের কাছে পেয়ে রাবু আর সন্তান দু’টি আরো তুমুল বেগে কাঁদতে থাকে। আমি কত করে বলি রাবু, কাঁদছ কেন, কী হয়েছে আমার? রাবু আমার কথা বুঝতে পারে না। ফ্ল্যাটের অন্য বাসিন্দারা শেষ দেখা দেখতে আসে। আহারে, লোকটা কত ভালো ছিল। দেখা হলে কী সুন্দর করে সালাম দিত। হাসি ছাড়া কথা বলত না। সন্তান দু’টি কেমন অল্প বয়সে এতিম হয়ে গেল।
সবাই মিলে ধরাধরি করে মানুষটাকে গাড়িতে তোলে। তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। বিছানার চাঁদর দিয়ে মানুষটাকে ঢেকে দেয়া হয়েছে। রাবুর দুই ভাই মুখ ভার করে গাড়িতে বসে আছে। আমি সবকিছু খেয়াল করছি। রাবু আমার কোনো কথাই শুনছে না। গাড়ি চলছে গ্রামের উদ্দেশে। আমার স্ত্রী আর সন্তানেরা এখন থেমে থেমে কাঁদছে। গ্রামের আত্মীয়স্বজনদের আগেই খবর দেয়া হয়েছে। তারা নাকি কবর খুঁড়ে রেখেছে। বাড়ির উঠোনে নামানোর পর ভাইবোন সবাই গড়াগড়ি করে কাঁদছে। কিন্তু আশ্চর্য, মাকে দেখলাম একটুও কাঁদছে না। বলছে, তোরা সবাই থাম, আমার রাজপুত্রকে একটু সাজিয়ে দেই। আমার মতোই দেখতে মানুষটাকে মা চোখে সুরমা লাগিয়ে দেয়, সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দেয়। আমি বললাম মা, আমার কী হয়েছে? আবার আশ্চর্য হলাম, শুধু মা আমার কথা বুঝতে পারল। বলল, বাজান আজ তুমি তোমার আসল বাড়িতে যাচ্ছো। তুমি ভেবো না বাজান, আমি তাড়াতাড়িই তোমার সাথে দেখা করব।

জরিনা বিবির জরির শাড়ি

Now Reading
জরিনা বিবির জরির শাড়ি

“অ বউ! যাওতো অহন তুমি, যাও!
 এদ্দিন পর পোলাডা বাড়ি আইতেয়াছে, তরা কইরা একটা নতুন শাড়ি পইড়া লওগা যাও।” উঠানের একপাশ থেকে শ্বাশুরির কথাগুলো শুনে বিরক্তিতে মুখ বাঁকালো জরিনা।
      “হুও,নতুন শাড়ি পইড়া লও!
 আওনের পর থিক্যা পোয়াইত্তা বেডির মতন কোলের কাছে বওয়াইয়া রাহে আবার কয় বউ নতুন শাড়ি পড়গা! শাড়ি পড়ুম না তর মাথা খামু বুড়ি!”
     আপনমনে বিড়বিড় করলো জরিনা। এসব কথা জোরে বলতে নেই, বিয়ের আগেই শ্বাশুরির তর্জন গর্জনের খবর সব জানা, এসব বললেই এখন কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে!
রান্নাবান্না সহ হাতের কাজ সব শেষ করে গোসল শেষে  মোটা পাড়ের নতুন শাড়িটা পড়লো জরিনা। মাথায় তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ে খোঁপা করলো একটা। তারপর দক্ষিনের ঘরটা ঝারমোছ করলো একটু।
এমনিতে শ্বাশুরির ঘরেই নিচে পাটি পেতে শোয় জরিনা, বুড়ির আবার বোবায় ধরে প্রায় রাতে তাই একলা থাকতে দিতে নিষেধ করে গেছে ছেলে। “মার জন্য দরদ একেবারে অফুরন্ত!
তাই বলে আজও নিশ্চয় জরিনাকে এঘরে শুতে বলবেনা!”
 প্রায় দুমাস পর শহর থেকে আসছে রহমত, নিজের ঘরদোর অগোছালো দেখলে কি মনে করবে মানুষটা!
কাজ শেষ করে বাইরে বের হতেই দূরের মেঠো পথে দেখা গেলো রহমতকে। মা’কে জড়িয়ে ধরে এদিকেই আসছে।
“এ্যহ বুড়ির রং দেখলে বাঁচিনা, পুলা যেন নাই আর কোনো বেটির!” বিড়বিড় করে গাল বকলো একটা জরিনা, তারপর হাসিমুখে মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীকে সালাম করলো এগিয়ে গিয়ে!
পানির ঘটিটা এগিয়ে এনে রাখলো উঠানের কোনের পেয়ারা তলায়। পাক ঘরের দরজায় একটা বিড়াল দেখে তেড়ে গেলো ওদিকে!
শহরে ইট ভাটায় চাকুরি করে রহমত। ছুটিছাটা কম দেয় ওরা। সারা বছরই তো কাজ লেগে থাকে। তারপরও মাস দু মাসে একবার এসে ঘুরে যায় গ্রাম থেকে।
 নতুন বউ, এভাবে কাছ ছাড়া রাখলে নজর অন্যদিকে চলে যাবে জানে রহমত। তাই যখনই সুযোগ হয় একবার দেখে যায়। গ্রামের মেয়েগুলো বড় কোমল হয়, এক রাতেই দুমাসের অভিমান ভুলে যায় ওরা!
খেতে বসে জরিনার শ্বাশুরি মুখ বাঁকালো।
– আল্লাহ! আ লো বউ, তর বাপের কি লবনের আড়ত আছিলোনি? এত কইলাম তবুও যদি একটু কম লবন দিতি। এহনই এমুন, আমি মইরা গেলে পুলাটারে ত আমার লবন খাওয়াইয়াই খুন করবি মুখপুড়ি!!
      বলতে বলতে নিমিষেই চোখ ছলছল করে ওঠলো শ্বাশুরি মোমেনা বিবির। “তুই কি বুঝবি পুলা পালন কত কষ্ট!”
– “মা রাহো না! কই অত তো লবন অয়নাই…
      রহমত আস্তে করে বউয়ের পক্ষ নিতে চাইলো।
– থাউক, তুমি চুপ করো। অত পিরিত দেহাইয়া কাম নাই আর!
      মোমেনা বিবি ছেলেকে ধমকে ওঠলেন।
    “লও বউ, খাইয়া সব গোছাইয়া ওডো, বিছনাডা গুছাইছো নাকি আমারই যাওন লাগবো?”
বাতের ব্যাথায় কাতর পা টা নিয়ে কাঁতরাতে কাঁতরাতে ওঠলো মোমেনা বিবি। ছেলেটা এতদিন বাদে আসছে, মা কে কম ভালোবাসে তা না, তারপরও কিসের টানে মাস না যেতেই ছুটে আসে তা না বুঝবার মতো অত বোকা নয় মোমেনা বিবি!
কুঁলকুচা করতে করতে উঠোনে নেমে গেলো মোমেনা। ওজু করে, দুরাকাত নামাজ পড়ে ঘুমাবে এখন নিজের ঘরে। “আইজ আর বোবায় ধরলে রক্ষা নাই” ভাবতেই কেমন লেগে ওঠলো। বয়সের সাথে সাথে মৃত্যুভয়টা বেশ জাকিয়ে বসছে মনের ভেতর!
মা চলে যেতেই জরিনার দিকে তাকালো রহমত। ঘোমটা টা খসে পড়ে গেছে এখন। মুখটা কালো করে রেখেছে জরিনা। শ্বাশুরির কথাশ রাগ করে বসে আছে বোকা মেয়েটা!
রহমত ওর হাত টা ধরতেই মুখ ঝামটা দিয়ে ছাড়িয়ে দিলো..
– “ছাড়েন, রঙ্গ কইরা কাম নাই। মার লগে তো কইতারলেন না একটা কতাও। কেমুন আমার বাপ-মা তুইল্লা খোঁচা মাইরা গেলোগা!”
– “বউ রাগ কইরোনা। মা কিন্তু তোমারে অনেক ভালোবাসে, এমনে বকাবকি করে আরকি। বুঝোনা ক্যান?”
– অত বুইজা কাম নাই আমার। যান বিছনা করা আছে ঘুমানগা।
– তোমারে ছাড়া ঘুমাইছি আমি কোনোদিন? চলো রাগ পরে কইরো, কি আনছি দেখবা আসো,,,,
      জরিনাকে একপ্রকার জাপটে ধরে ঘরে গিয়ে খিল দিলো রহমত। ব্যাগ খুলে একে একে বের করতে শুরু করলো আলতা, চুলের কাঁটা,পুতির মালা আরো টুকটাক জিনিস। এসব দেখেও জরিনার রাগ কমলোনা!
“কই পাইছেন এইসব, লাগবোনা আমার লইয়া যান, ফিরাইয়া দেনগা।” মুখ বাঁকিয়ে বললো জরিনা।
এত যত্নে আনা জিনিসগুলোর প্রতি অবহেলা দেখে একটু খারাপ লাগলো রহমতের।
“আইচ্ছা কি লাগবো তোমার? কও? পরেরবার ঠিক তাই আনুম!”
-আনবা? সত্যি?
-হু। কি লাগবো?
– “শাড়ি।
   লাল জরির একটা শাড়ি আইনা দেও আমারে। দিবা?”
    জরিনার চোখ দুটো চকচক করে ওঠলো। যেনো চোখের সামনেই শাড়ি দেখতে পাচ্ছে ও! চকচকে লাল পাড়ের জরিওয়ালা শাড়ি একটা!!
– ঠিক আছে দিমু!
দুদিন থেকেই কাজে ফিরে গেলো রহমত। জরিনার শ্বাশুরি ছেলেকে একদম বাসে তুলে দিয়ে এলো গিয়ে! জরিনার খুব শখ একদিন স্বামীকে এগিয়ে দেয়। “হুও বুড়ি না মরলে আর পারুম আগাই দিতে? পুলার লগে লগে তো তার না গেলে পেডের ভাত হজম অয়না!” শ্বাশুরির উপরে বেজায় রাগ জরিনার। মাঝে মাঝে তো স্বামীর উপরও রাগ লাগে। “মার কতার ওপর কোনো কতা নাই এ কেমুন জামাই পাইলাম খোদা!
  এমুন মা ন্যাওটা জামাই দিয়া মাইয়্যা মাইনষের কপাল পোড়াও ক্যান?”
একটা পাটিতে শুয়ে ঘুমের ঘোরে রাগে গজগজ করে জরিনা। কখনো বা আবেগে তেল চিটচিটে বালিশ ভাসায়! ভোরের আলোয় এই শ্বাশুরির সাথেই সব কাজে সমানতালে হাত চলে আবার!
রহমত গেছে আজ  চল্লিশ দিন। পাশের গ্রামের কালা ভাইজান এসে বলে গেছে কাল পরশু নাগান বাড়ি আসবে রহমত। একসাথেই কাজ করে ওরা শহরে। সংসারের টুকটাক কিছু জিনিস পাঠিয়েছে কালা ভাইয়ের হাতে শহর থেকে। যাওয়ার সময় চুপিচুপি জরিনার হাতে একটা পানের ডাবা গুজে দেয় কালা ভাই, ফিসফিস করে বললো, রহমত ভাইজান কইছে আফনের লাইজ্ঞা ছারপ্রেরাইজ আনবো!”
     বলেই মিটিমিটি হাসতে লাগলো কালা মিয়া। লজ্জায় মিইয়ে গেলো একেবারে জরিনা। কোনোমতে বিদায় দিয়েই পালাল লোকটার সামনে থেকে। “মানুষটার একেবারে লজ্জা শরম নাই, এইসব কতা কেও বাইরের লোকরে কয়?” ভাবতেই রাগ ওঠে গেলো ওর। “আসুক এইবার!”
সাত সকালে ওঠে ঘরদোর গুছিয়ে,  উঠান ঝাঁট দিয়ে সব ময়লা পেয়ারা তলায় জমাচ্ছে জরিনা। ওর কাজের গতিতে শ্বাশুরিও অবাক। আপন মনেই গজগজ করছে মোমেনা বিবি, “মাইয়্যা মাইনষের রঙ্গ দেইখ্যা আর বাঁচিনা! এদ্দিন ঘুম ভাঙতেই চায়না,  আর আইজ সোয়ামীর কাছে ভালা সাজনের লাইগ্গা এত কারবার! আমরা যেন বউ আছিলামনা কোনদিন! রঙ্গ লাগছে মনে!”
জরিনা কোনো কথা বলেনা। চুপচাপ কাজ করে আর আড়চোখে দূরের পথে তাকিয়ে দেখে। মানুষটার ছায়াও নেই ওখানে!
দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধ্য। রহমত মনে হয় আজ আর আসবেনা। খেয়েদেয়ে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে জরিনা।
মাঝরাতে পিঠে কারো জোর ধাক্কায় ঘুম ভাঙে জরিনার। মোমেনা বিবি চিৎকার করছে সমানে, “আ লো মুখপুড়ি ওঠ! সব তো শেষ অইয়া গেলোগা!
দৌড়ে ঘরের বাইরে আসে জরিনা।
থমকে দাড়ায় এসে,
দরজার চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওপারে শুয়ে আছে রহমত! পুরো শরীর,
 আগাগোড়া ছোঁপ ছোঁপ রক্ত লাগানো লাল কাপড়ে মোড়ানো!
লাল শাড়ি!!
সাথে হলুদ জরির পাড়!!

অবসরের পর

Now Reading
অবসরের পর

ফেনী স্টেশনে সন্ধ্যা থেকেই বসে ছিলেন রমেনবাবু, খেয়াল নেই কখন যে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে।
চায়ের দোকানের ছেলেটা দোকান বন্ধ করতে করতে বলল,

“কাকু আর কতক্ষণ বসে থাকবেন এভাবে? ঘড়িটা দেখুন, বারোটা বাজতে যায় যে!”

হাত ঘুড়িয়ে ঘড়িটার দিকে দেখে, বাড়ির পথে রওনা হলেন। বেশিদুর নয়, স্টেশন থেকে মাত্র কুঁড়ি মিনিটের হাটাপথ।

বাড়ির অমতে অমৃতাকে বিয়ে করেছিলেন রমেনবাবু, অব্রাহ্মণ মেয়ে বলে বাবা সাফ জানিয়ে ছিলেন তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করলাম।

রমেনবাবুরা চারভাই, কারো সাথে সেভাবে যোগাযোগ নেই।
তাদের দুজন বিদেশে, আর একজন পৈতৃক ভিটে পুরান ঢাকার বাবুবাজারে থাকে, অবশ্য পৈতৃক বলতে গেলে নেই(ফ্ল্যাটবাড়ি)।

রমেনবাবু বাড়ির বড়ছেলে কিন্তু বাপ-মায়ের মুখাগ্নি পর্যন্ত করতে পারেন নি। বাবার কঠোর নির্দেশ ছিল, মায়ের বেলাতেও সেটা অক্ষুণ্ণ ছিলো।

অতএব, রমেনবাবু ওনার স্ত্রীকে নিয়ে এসে বাসা ভাড়া করে বসবাস করা শুরু করলেন।
সংসারে সুখের খামতি ছিলনা ওনাদের, কিন্তু ওনারা সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
ডাক্তারবদ্যি করে লাভ হলনা, তারপর ওঝা, হাকিম, ঝাড়ফুঁক করেও যখন কিছু হলনা তখন রমেনবাবু হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন।
স্ত্রী অমৃতাকে বোঝাতেন তিনি,
‘অমন অনেকেরই বাচ্ছা হয়না, তাতে কি!’

তবুও অমৃতার চোখের জলে রোজ রাতে বালিশ ভিজত।
একটি নারীর কাছে মা না হতে পারার যন্ত্রণাটা বুঝতেন রমেনবাবু।
তাই কিছু বলতেন না তিনি স্ত্রীকে।

একটা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকতা করতেন রমেনবাবু। অবসরের একবছর আগে তিনি সেই স্কুলের প্রধানশিক্ষক হন।
দীর্ঘদিন তিনি রিটায়ার করেছেন। বর্তমানে তিনি সাড়ে সাতহাজার টাকা পেনশন পান।
তারমধ্যেই অমৃতার ওষুধ, রেশন, বিদ্যুৎ বিল, বাড়িভাড়ার পরে আর কিছুই বাঁচেনা।

কিন্তু,
বিগত দুইমাস ধরে পেনশন বন্ধ, বেশকিছু সরকারী কারণে দেরী হচ্ছিল।
গতকাল সব একসাথে পাবার কথা, কিন্তু আরো দিন দশেক মতো লাগবে পেনশন পেতে।
বাজারে একগাদা ধার,
ওষুধ, মুদী দোকান, বাড়িভাড়া!
ভেবেছিলেন গতকাল সব মিটিয়ে দেবেন, তা আর হলো কই!!

অমৃতা বাতের ব্যাথায় চলতে পারেননা, হার্টের সমস্যার সাথে আবার শ্বাসকষ্টও আছে।
রমেনবাবু অবশ্য এখনো প্রায় সুস্থ।

তিনদিন আগে অমৃতার ওষুধ শেষ, শতকষ্টেও অমৃতা ‘ভালো আছি নামক হাসি মুখে’ কাজকর্ম করে চলেছেন।
কাল রাতে অমৃতার শ্বাসকষ্টটা খুব বেড়েছিল।

তাই তিনহাজার টাকা ধারের জন্য আজ এক পুরানো বন্ধু প্রণব কে ফোন করেছিলেন সকালে। সে আজ দুপুরবেলায় তার বাড়িতে আসতে বলেছিলেন।

তিনহাজার টাকা দিয়েছিলেন প্রণব।
এতোদিন পর দেখা, তাই চায়ের আড্ডা হলো ঘন্টাদুয়েক।
আড্ডা শেষে সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পথে রওনা হলেন রমেনবাবু।

ফেনী স্টেশনে তখন খুব ভিড়, লোকালে কোনোরকমে ঝুলন্ত অবস্থায় এক পা দিতেই ট্রেন ছাড়ল, আর সেই ভিড়ে রমেনবাবুর হাতব্যাগটা কে টান মেরে নিয়ে চলে গেল!

স্টেশনে বসে সুইসাইড করার কথা ভাবছিলেন।
হঠাৎ, ছলছল চোখে তার অমৃতার ভাঙাচোরা মুখটা মনে পড়ল, মনে পড়ল তার সারাজীবনের ভালোবাসার কথা।

সেই মামাবাড়িতে বড়ো হওয়া অভিভাবকহীন লাজুক মুখের মেয়েটির ফুলসজ্জার রাতের ভয় মেশানো কথাটি কানে বাজলো আবার!

”কোনোদিনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো!”
কথা দিয়েছিলেন মৃত্যুর আগে অবধি হাতটি ধরে থাকবেন রমেন,তাই সুইসাইড আর করা হলনা।

রাস্তা দিয়ে হাটতে হাটতে একমনে ভাবছিলেন রমেনবাবু! তিলেতিলে অমৃতার……

“আরে মাস্টারমশাই না!
ও মাস্টামশাই!! শুনুন!!”

মুখ ঘুরিয়ে রমেনবাবু পিছনের দিকে তাকালেন। দেখলেন,
একটা রিক্সা থেকে একজন নেমে এসে প্রণাম করলো তাকে। আর বলল,

– আমি গনেশ মন্ডল, গনা।
আপনার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছিলাম বলে সেই আপনি আমাকে বেতের বাড়ি মেরে ইস্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন! মনে পড়ছে মাস্টামশাই!

– হ্যাঁ! মনে পড়ছে, তা তুমি এখন রিক্সা চালাও?

– হ্যাঁ, কিন্তু আমার আরো দুটো রিক্সা আছে, সেগুলো ড্রাইভার চালায়। তা আপনি এতো রাতে, আপনার চোখে জল! কি হয়েছে বলুন না!

রমেনবাবু সমস্তকিছু বললেন,সব শোনার পর গনা বললো,

– মাস্টামশাই, আমি আপনাকে টাকাটা দিচ্ছি।
বদলে আপনি আমার এক ছেলে ও এক মেয়েকে পড়ানো শুরু করুন।আমার পরিচিত রিক্সাওলাদের বললে ওরাও তাদের ছেলেমেয়েদের আপনার কাছে পাঠাবে।
আপনি আবার শুরু করুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

– কিন্তু আমিতো স্কুলের বাইরে পড়াইনি কখনো!

– মাস্টামশাই,আপনি কিন্তু এখন আর স্কুলেও নেই,
চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে আসি।
কাল সকালে ওদের আপনার বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।

রিক্সাটার সীটে বসে রমেনবাবু যখন উজ্জ্বল চোখে নতুন করে শুরু করার কথা ভাবছিলেন,তখন গনার ফোনের কথোপকথন কানে এলো,

“চারু! আমাদের বাচ্ছারাও পড়াশুনোয় এবার ভালো হবে গো! মাস্টারমশাই কে পেইচি…”

কি খবর, রাত্রি?

Now Reading
কি খবর, রাত্রি?

সূচনাপর্ব

 

“তুমি কি রোকসানা আপার বাড়ীতে আসলেই যাবা না?”

-“নাহ।”

“সবাই যাচ্ছে আর তুমি যাবা না কেন? আমি তো যাচ্ছি না আমার জ্বর তাই। জ্বর না থাকলে আমিও নাচতে নাচতে যাইতাম।”

-“যাইতে ইচ্ছা করতেসে না।”

“তুমি কি আমার জন্য যাইতেস না? আমি যাব না তাই?”

-“না তো। তোমার জন্য বেড়ান বাদ দিব কেন? বেড়াইতে যাওয়া বাদ দেওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তো তুমি না রাত্রি আপা।”

“এ্যই পিচ্চি,তুই এত পাকা পাকা কথা শিখসিস কোত্থেকে?”

আমি উত্তরে কিছু বললাম না।ঠোট গোল করে শিস দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

রাত্রি আপাকে আমি মুখের উপর “যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ না” বলে দিলাম। আপা? কীসের আপা?! রাত্রি, হ্যা শুধুই রাত্রি। সে আমার ফুফাতো বোন হোক, হোক বয়সে পাঁচ বছরের বড় তাতে কি কিছু যায় আসে? ভালোবাসা কি একটা অংক নাকি যে হাজারটা সূত্র আর নিয়ম মেনে এরপর প্রেমে পরতে হবে? প্রণয় কখন কীভাবে কাকে স্পর্শ করবে এইরকম নিয়মাবলী কোন সংবিধানে আছে? তার উপর অংকে আমি এমনিতেই কাচা, অংক আমার মাথায় কিছুতেই ঢোকে না, অতি সহজ সহজ সরল অংকের হিসাবও আমার কখনোই মিলে না।

তাকে এভাবে কথাটা বলার পর বুকের বাম পাশে খচ করে ধরে নাই সেটা বললে মিথ্যা বলা হবে। কি আর করার! আমি আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। শুধু আমি না আমার ধারণা সবাই-ই তাই। খুব সম্ভবত নিজেকে ভালোবাসি বলেই রাত্রিকে আমি ভালোবাসি। নিজের আনন্দে থাকার প্রয়োজনেই রাত্রিকে আমার প্রয়োজন। নিজের ভালো থাকার প্রয়োজনেই যার প্রেমে পরেছি তাকে পাশে বসিয়ে রাখতে ইচ্ছা করে, দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা বিরক্তিকর আঠার মতো সাথে লেগে থাকতে ইচ্ছা করে, তাকে ভালো রাখার প্রচন্ড অভিপ্রায় জাগে।

 

রাত্রি চলে যাচ্ছে। যাক।চলে যাক। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে সে চলে গেল। আমি মাথা নীচু করে ফেললাম। ভয়াবহ রোদের কারণে আমার চোখ জ্বালা করছে। আমার ঘর্মাক্ত হাত পা আমি সমানে চুলকিয়ে যাচ্ছি। শরীর থেকে ঘামের বীভৎস গন্ধ বের হচ্ছে। চুলকানি কিংবা দুর্গন্ধ দুইটাকেই অবশ্য ছাপিয়ে গেছে চোখের জ্বালাপোড়া।আনন্দের ব্যাপার সে আজকে নীল সালোয়ার কামিজটায় নাই। নাহলে এই বিদায় সহ্য করা আমার জন্য অসম্ভের কাছাকাছি হতো।

 

 

কোরাস

 

আমি জানতে পারলাম রাত্রির বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সে জানতে পারল না অন্য একজন তার প্রণয় দংশনে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে এতদিন বেলতলায় শুয়ে ছিল এবং ভবিষ্যতেও শুয়েই থাকবে। এই “একজন” ব্যক্তিটা ন্যাড়া না। তার মাথায় ঘন দীর্ঘ ঝাকড়া চুল। সমস্যাটা এখানেই। এ কারণেই ন্যাড়ার মতো একবার ভুল করেই তার শিক্ষা হয় না, সে ভুল করে, নিজের ভুল নিজেই অনুধাবন করে কিন্তু তারপরো সে বারবার ভুল করতেই থাকে, বারবার বেলতলায় ফেরত যায়। তাকে যেতে হয়। আমাদের পুরোটুকুর উপর কি আসলেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে? তাহলে ভুল জেনেও আমরা একই ভুল বারবার করি কেন? আমাদের নিজেদের কতটুকুকে আমরা আসলেই চিনি? আমার কতটুকুকে প্রকৃতপক্ষে আমি নিজেই চালাই?

তো যাক, আমি কাজে মন দিলাম।অনেক কাজ। অনেক অনেক কাজ। মানুষ হয়ে যেহেতু জন্মেছি সেহেতু পেট পূজা করতেই হবে। কোন এক জ্ঞানী ব্যক্তি নাকি বলেছেন “পেটে ভাত না থাকলে প্রেম জানালা দিয়ে পালায়।” কথা মিথ্যা না। খাদ্য অপরিহার্য। প্রেম না। নাকি প্রেমও অপরিহার্য? জ্ঞানী তুমি কোথায়? তোমার জ্ঞান এখন কি বলে?

 

উপসংহার

 

“কেমন আছো?বহুদিন পর তোমাকে দেখলাম ভাইয়া।”

-“আছি। তোমার কি অবস্থা? বাচ্চাদের খবর কি?”

“এই তো আছি ভালোই।ওরাও ভালো।”

-“বাই দ্যা ওয়ে, আমার চুল পাইকা গেলেও আমি কিন্তু আগের মতোই বেয়াদব আছি। আপু তো আগেও কখনো ডাকি নাই খুব সম্ভবত আজকেও ডাকব না। তোমার বাচ্চাদেরকে সরাও। নাইলে তারা মামার কাছ থেকে বেয়াদবি শিখবে।”

রাত্রি কথাটা শুনার পর হাসতে শুরু করল। এই হাসিটা দুই যুগ ধরে দেখা হয় নাই। নিয়তি? নাহ!

 

হঠাৎ করে সে গম্ভীর হয়ে গেল। টেবিলে সাজিয়ে রাখা হাজারটা খাবার থেকে চমচমের পিরিচটা আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

“আচ্ছা উপম, তুমি আমার বিয়ে হওয়ার পর আর এইদিকে আসো নাই কেন? সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিসো। এমনকি তোমার ফোন নাম্বারটা পর্যন্ত আমরা খুজে খুজেও কখনো পাই নাই। সবাই তোমার কথা অনেক বলত। এমনকি শফিক যখন চাচা মারা গেলেন তখন কিন্তু মামা,মামী সবাই আসলেন অথচ তুমি কিন্তু আসলা না! কারণটা কি?এত কীসের ব্যস্ততা তোমার?”

“কোন একটা লেখায় জানি পড়সিলাম মেয়েরা যে কোন পুরুষের চোখের দিকে তাকায়া বুইঝা ফালাইতে পারে সে তার দিকে কোন দৃষ্টিতে তাকাইতেসে । তাকায় দেখ তো কিছু বুঝো কীনা।”

রাত্রি উত্তর দিল না। সে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। কিছুক্ষন পর চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে আবার তার দৃশ্যকল্পে আগমন।সে হাসল। আবারো সেই দুই যুগ আগের হাসি। হাসতে হাসতেই বলল,

“ঠিকই লিখসে তোমার লেখক।আগেও বুঝতাম।এখনো বুঝতেসি।’’

-“বাহ!চমৎকার!”

“জীবন কি এইসব ছোটো খাটো বিষয়ে আটকায় যায়? জীবন কি এতটাই ছোট? আচ্ছা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাটা কি বলো তো আমাকে।”

-“খুব সম্ভবত তোমাকে নিয়া ৩২ নাম্বারের লেকে বাদাম খাইতে না পারা।”

 

রাত্রি কিছু বলল না। সে আবারো হাসছে। এটা কিন্তু সেই দুই যুগ আগের হাসি না। হাসতে হাসতে রাত্রির হেচকি উঠে যায় এমন অবস্থা। রাত্রিকে হাসিখুশি এবং আনন্দিত রেখেই আমি যেভাবে হুট করে আসছিলাম সেইভাবে হুট করেই বের হয়ে গেলাম। আমার কাজ শেষ। এখানে আমাকে আর দরকার নাই।

 

বাসের সিটটা ভালো পেয়েছি। জানালার পাশে। বাতাসে আমার বেধে রাখা চুলও একটু একটু উড়ছে। আমি গান্স এন রোজেস এর ডোন্ট ক্রাই গুনগুন করছি,

Talk to me softly

There’s something in your eyes ….

স্বপ্নের প্রহর।

Now Reading
স্বপ্নের প্রহর।

স্বপ্নের প্রহর।

আমাদের বড় স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে যায়,আর ছোট স্বপ্ন গুলো মনের অজান্তেই ভুলে যাই।
তাই স্বপ্ন না দেখাই ভালো,আমার তো মনে হয় স্বপ্ন ভাইরাস । যা কিছু ক্ষেত্রে হয়ত ভাল কিন্তু যখন বেড়ে যায় তা সারানো দূর্ভোগ হয়ে যায়।

মনে পড়ে যায়, সেই ছেলেটির কথা,ওর দেশ প্রেম নিজেকে ওর কাছে অনেক ছোট মনে হল,যদি ও ছেলেটি বয়সে আমার ছোট। দুষ্টামি করে আমায় মোটা ভাই ডাকত।তখন আমি সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি,আর ও বোধয় ক্লাস সিক্সে।

লেখার সময় ওর স্বর গুলো কানে বেজে উঠল।

ভাই, জীবনে আর কিছু করি আর না করি, দেশের জন্য কিছু একটা করবই।
৭১ থাকলে যুদ্ধে নামতাম।কিন্তু তা পারি নাই। তাই যে ভাবেই হোক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তে ঢুকে দেশের সেবা করবই।

শুনে আমি বললাম, বাংলা মায়ের দামাল ছেলে, করতে পারে চাপার বড়াই।

আমার কথার পেক্ষিতে বলল, ভাই মজা নিলেন আমি কিন্তু সিরিয়াস। আমার ইচ্ছা স্বপ্ন সব একটাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

শুনে তারপর বললাম বেশ তো,চেষ্টা কর ক্যাডেটে চান্স পাওয়ার।আর ও বললাম,
তোরাই তো দেশের অহংকার আমরা তো সব জংকার।

আমার কথা শুনে হেসে বলল, ভাই দোয়া করবেন। এই বছর ক্যাডেটে পরীক্ষা দিব।

তারপর কয়েক মাস পড়ে সেই ছোট ভাইয়ের ফোন কল,,,, ধরার পর

ভাই আমি লিখিত পরীক্ষায় পাশ করছি,
আলহামদুলিল্লাহ্‌।
এখন ভাই মেডিকেল বাকি।
ইনশাআল্লাহ ভালো হবে।
ভাই দোয়া করবেন বলে ফোনে কথা শেষ হল।

অনেকদিন পর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ইচ্ছুক ছাত্র। ওর মত আমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হওয়ার স্বপ্ন দেখি আর মডেল টেষ্ট দেই। একদিন ক্লান্ত মনে ফোনের কন্ট্রাক্ট লিষ্টে কোন একজনে র নাম্বার খুজতে ওর নামটি চোখে পড়ল।
সব কিছু মনে পড়তে ই মনের অজান্তেই কল দিয়ে দিলাম, রিং বাজতেই অপর প্রান্ত থেকে একজন মহিলা কন্ঠ স্বর বুঝতে পেরে জিজ্ঞসা করলাম
মাসি কেমন আছেন?
জি ভালো বাবা। তুমি কে বাবা?
পরিচয় দিলাম তারপর জিজ্ঞসা করলাম, মাসি বিজয় আছে?
ও কী ক্যাডেটে চান্স পেয়েছে?
ফোনের অপর প্রান্তে এক নিস্তব্ধতা সৃষ্টি হয়।
আর তার ক্ষনিক পরে শুরু হয় ব্যাকুল কান্না। আর কান্না জড়িত কণ্ঠে শুনতে পেলাম, বাবা প্রার্থনা কর যেন ভগবান ও কে স্বর্গে ঠাই দেয়।
আর শুরু হয়ে ছেলে হারা মায়ের আর্তনাদ…….।

পরে জানতে শারীরিক কিছু দূর্বলতার কারণে ও মেডিকেল থেকে বাদ পরে।আর স্বপ্নের এই ভাঙ্গন ওকে ভেঙ্গে ফেলে আর বিজয় বেছে নেয় আত্মহত্যার আর এরই মাঝেই হয় বিজয়ের পরাজয়।

আমি এখন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
স্বপ্ন!!!
এই সব কথা গুলো আজ স্বপ্নের মত লাগছে।
ঠিক যেন সেই কবিতার মত
“আমি জেগে রই আর স্বপ্ন দেখি,
আমি দিবা নিশি স্বপ্নের পথচারী।
আমার স্বপ্নে শত ব্যাক্ষা যুক্তি,
আমি সেই যে চির নিদ্রার স্বপ্ন দেখি।

_____________________ নিলয়।

 

ফুটপ্রিন্ট লেখক লগিন