সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স নিয়ে জানা অজানা কথা

Now Reading
সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স নিয়ে জানা অজানা কথা

আপনারা সবাই ঐ জোকটা তো অবশ্যই শুনেছেন ।

ঐ যে একজন লোক কিভাবে যেন দোযখে যাওয়ার সুযোগ পায় । তারপর সেখানে গিয়ে দেখে বিভিন্ন কড়াইতে মানুষদের ভাজা হচ্ছে । সব কড়াইয়ের পাশে গার্ড, শুধু একটা কড়াইতে কোন গার্ড নেই ।

অবাক হয়ে লোকটা জিজ্ঞাসা করে, ভাই, এই কড়াইতে গার্ড নেই কেন ?

দোযখের দারোয়ান উত্তর দেয়, এটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য রাখা কড়াই । এখান থেকে কেউ বেরোতে চাইলে বাকি সবাই তার পা ধরে নিচে নিয়ে আসে, গার্ড রাখার কোন দরকার হয়না ।

আমরা প্রায়ই আমাদের পরশ্রীকাতরতার উদাহরণ দিয়ে গিয়ে এই জোকসটা ব্যবহার করি । আমরা হাসি, হাসতে হাসতে মনে মনে স্বীকার করে নিই, আসলেই ব্যাপারটা সত্যি। আমাদের কড়াইতে কোনদিন কোন গার্ডের প্রয়োজন নেই ।
.

আমি ব্যাপারটা নিয়ে একদিন ভাবলাম, কেন আমরা এতো পরশ্রীকাতর ? কেন অন্যের ভালো আমাদের সহ্য হয় না ??
.

ভাবতে গিয়ে চমৎকার একটা টার্মের সাথে পরিচিত হলাম । ‘সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স’ । আচরণটি বাঙালির মাঝে প্রবলমাত্রায় বিদ্যমান বলেই সম্ভবত এটার যথার্থ কোন বাংলা শব্দ নেই । ‘উন্নাসিকতা’ সম্ভবত সবচেয়ে কাছাকাছি কোন শব্দ হবে ।

.

আমরা মোটামুটি সবাই ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স নিয়ে অবগত । সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স এটারই ঠিক বিপরীত অবস্থা । মজার ব্যাপার হল, কখনো যদি কারো সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স এ আক্রান্ত ব্যক্তির সুপিরিয়রিটি আহত হয়, তার মাঝে অল্প কিছু সময়ের জন্য হলেও অনেকগুলো ডিফেন্স মেকানিজম কাজ করতে থাকে । জানি, কথাগুলো খটোমটো শোনাচ্ছে, আমি একটু সহজ করে বুঝিয়ে বলছি ।
.

ধরুন , আপনি বিশ্বাস করেন আপনি একজন শিক্ষিত, জ্ঞানী ব্যক্তি। এখন আপনি আর একজন ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, যিনি আপনার চেয়েও বেশি জানেন । এখন, আপনি যদি একজন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে থাকেন, আপনি সেই ব্যক্তির জ্ঞানের কদর করবেন, তাকে সমাদর করবেন । কিন্তু, আপনি যদি সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে আক্রান্ত হন, ডিফেন্স মেকানিজম হিসেবে আপনি চাইবেন সেই লোকটিকে অপমান করতে, কোনভাবে প্রমাণ করতে যে আসলে তিনি আপনার চেয়ে বেশি জানেন না । আর তাকে ছোট করে আপনি নিজে বড় হতে চাইবেন ।
.

এইযে স্টিফেন হকিং মারা গেলেন । আমরা জানি, তিনি অনেক বড় একজন বিজ্ঞানী, সারা পৃথিবী তাকে সমাদর করতো, করে এবং করবে । আমি এইটাও জানি আমি সলিমদ্দীর পোলা কলিমদ্দি, দুনিয়ার কেউ আমারে পুছে না । কিন্তু , আমারতো বিশাল একটা ইগো আছে, আমার মাথায় আছে, আমি হকিং ফকিংএর থিকা অনেক বড় মানুষ । তখন আমি, এক ওয়াক্ত নামায না পড়া আমি, একদিনও রোযা না থাকা আমি ফেসবুকে কমেন্ট দেই, ‘হকিং শালা নাস্তেক, ও তো জান্নাতে যাবে না ।‘
.

স্টিফেন হকিং এর প্রতি এই ঘৃণার আদৌ কি কোন কারণ আছে ? তিনি নাস্তিক ছিলেন, হতেই পারেন তিনি নাস্তিক, এটা তার বিশ্বাস । তিনি তো আপনার কল্লায় তলোয়ার ঠেকিয়ে বলেননি, তার মত নাস্তিক হতে । সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন তার শারিরীক প্রতিবন্ধকতার সাথে । দু:খ লাগে দেখলে যখন দেখি এইট পাশ করা ফেসবুক প্যাক ব্যবহারকারী মানসিক প্রতিবন্ধীরা তাকে বাংলাদেশের বরেন্য বিজ্ঞানী ড.জামাল নজরুল ইসলামের সাথে তুলনা করে তুচ্ছ করতে চায় । জামাল স্যার বেচে থাকলে যে আপনাদের তুলনায় লজ্জিত হতেন, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই ।
.

আমার চারপাশে নারীরা এগিয়ে চলে, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা-বানিজ্যে-চাকুরিতে । আমাদের গা জ্বলে, আমাদের দাঁত কিড়মিড় হয় । আজীবন সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা পুরুষ মন চায় বান্দির দলরে ঝাটা নিয়া পিটাইতে । অক্ষম রাগ মেটাতে ফেসবুকে বাঙালি কমেন্ট করে, ‘কাপড় খুইলা তো চাকরি পাইসো ‘ অথবা ‘ মেয়ে মানুষ পাইলট হৈলে এইরকমই হয়’ ।


.

অহংকার করাটা অপরাধ না । অপরাধ হচ্ছে অন্ত:সারশূণ্য বিষয় নিয়ে অহংকার করা ।
.

আমার একজন পরিচিত ফটোগ্রাফার ভাই আছেন । সঙ্গত কারণেই নামটা উল্লেখ করছি না । ভাইয়া চমৎকার একজন ফটোগ্রাফার, চমৎকার একজন মানুষ । সমস্যাটা হয়ে গেল যখন তিনি দেশ ও বিদেশে নানা পুরস্কার পেতে শুরু করলেন।
.

এখন নিখিল বাংলা ফটোগ্রাফার কম্যুনিটির অনেকেই উনাকে দেখতে পারে না । এই দেখতে না পারার পেছনে তারা হাজারখানিক কারণ দর্শায় । যদিও শ্রোতাদের বুঝতে বাকি থাকে না, আসল কারণটা কোথায় ।
.

সারা পৃথিবীতে রেসিজমের উদ্ভব কিভাবে জানেন ? এই সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকে । সাদারা ভাবতো তারা সুপিরিয়র – তাই কালোরা ক্রিতদাস, জার্মানরা ভাবতো তারা সুপিরিয়র – তাই বিশ্বযুদ্ধ । পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়টি এথনিক আক্রমণ হয়েছে, যে কয়জন মানুষকে শুধুমাত্র গায়ের রং, ধর্মবিশ্বাস অথবা গোত্রভুক্ত হবার কারণে অত্যাচার করা হয়েছে , তার কারণ এটাই । সম্পূর্ণ বিনা কারণে নিজেদের অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা । এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বে কোন আচঁড় পড়লে সেটা স্বীকার না করা ।
.

আপনি ফিলিস্তিনের মুসলমানদের জন্য কাদেঁন, সিরিয়ার মুসলমানদের জন্য কাদেঁন, রোহিঙ্গাদের জন্য কাদেঁন, আপনার বাড়ির পাশের যেই বৌদ্ধমন্দির জ্বালিয়ে দেয়া হয় তার জন্য কাদেঁন না, নাস্তিক হবার অপরাধে আপনার দেশে যেই ছেলেটিকে কুপিয়ে মেরে ফেলা হয় তার জন্য কাদেঁন না – আপনার সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স আপনার সামনে রেসিজমের দেয়াল তুলে দাড়ায় ।
.

আপনি মুসলমান হিসেবে গর্বিত হতেই পারেন, আপনি বাঙালি হিসেবে গর্বিত হতেই পারেন, আপনি বাংলাদেশী হিসেবে গর্বিত হতেই পারেন – প্রতিটি ক্ষেত্রেই গর্বের যথেষ্ট কারণ রয়েছে । কিন্তু অন্যকে খর্ব করে কেউ গর্ব করলে সেইটাকে হিংসা বলা হয়, ভাইয়া ।
.

মুহম্মদ জাফর ইকবাল তখন আর শিশুসাহিত্যক থাকেন না, বিজ্ঞানী থাকেন না, অধ্যাপকও থাকেন না । নাস্তিক হয়ে জান । একজন আপাদমস্তক আস্তিক লোককে নাস্তিক বানিয়ে বাঙালি তাকে কোপানোটা হালাল করে । তারা মৃত্যু না ঘটাতে দু:খ প্রকাশ করে ।
.

এতো ঘৃণা কেন আপনাদের মনে ? সারা পৃথিবীতে আপনার চেয়ে জ্ঞানী, সুশ্রী, বিত্তবান, ক্ষমতাবান মানুষকে এভাবে ঘৃণা করতে থাকলে একদিন নিজেই ঘৃণ্য একটা বস্তুতে পরিণত হবেন । যে সুপিরিয়ারিটি কমপ্লেক্সকে বাচানোর জন্য ঘৃণা করছেন, সেটা একদিন আপনাকে রিক্ত , নি:স্ব , হাস্যবস্তু বানিয়ে রাস্তায় ফেলে দেবে।
.

শেষ করছি এপিজে আবুল কালামের একটা উক্তি দিয়ে। এই সাধারণ মানুষটির অসাধারণ জীবন হতে পারে অনেকের প্রেরণার উৎস ।

“ অহংকার তারাই করে যারা হঠাৎ এমন কিছু পেয়ে যায়, যা পাওয়ার যোগ্যতা তাদের আদৌ ছিলো না ।