নি বে দি ত

Now Reading
নি বে দি ত

কাল হাবিবার জন্মদিন। তাই ভাবনার অন্ত নেই। কারণ আমার এত বড় পকেটটা শূন্য মাঠের মতো খালি হয়ে আছে। কী করব বুঝতে পারছি না। ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করে দিব্যি বসে আছি। কোনো চাকরির দেখা আমার কপালে আজ পর্যন্ত জোটেনি। হাবিবাও আমাকে মাঝে মাঝে, না মাঝে মাঝে বললে বিরাট রকমের ভুল হবে। বলতে হবে সারাক্ষণই অকর্মা বলে আচ্ছা মতো জব্দ করে। শুধু কান পেতে শুনে যাই। কিছুই করার নেই। একজন মানুষ যা, লোকে তো তাই বলবে। সে অন্য কিছু তো আর বলে না। মাঝে মাঝে আবার অন্য কিছুও বলে। যা বলার নয়। কয়েক জায়গায় চাকরির অ্যাপ্লাই করেছিলাম। কিন্তু সেই চাকরি আর আলোর মুখ দেখেনি। অনেক পরিশ্রম করেও যখন শেষে আর হয় না তখন মনের অবস্থাও খুব খারাপ হয়ে যায়। তাই দিন দিন চাকরির আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি। অন্য কিছু করব ভাবছি। কী করব সেটাও ভেবেও পাচ্ছি না।
বাড়ি থেকে টাকা নিতে গেলেও লজ্জা লাগে। সাত-পাঁচ না ভেবে তবু টাকা সংগ্রহ করে ফেলি। চলতে হবে তো নাকি। টাকা ছাড়া যে এক পা ফেলা যায় না, তা আর আমার চেয়ে কে ভালো জানে!
হাবিবার জন্মদিনে একটা কিছু তো দিতেই হবে। ভাবলাম সুন্দর একটা সোপীস কিনে দেবো। টাকার কাছে এসেই থেমে গেলাম। তবে বুদ্ধি একখানা পেয়ে গেলাম। বাড়িতে এসে আদরের মাকে বললাম, মা একটা চাকরির অ্যাপ্লাই করব, কিছু টাকা দাও তো। মা তার অকর্মা ছেলের দিকে তাকিয়ে আর না করতে পারল না। নিমেষেই মা শ’পাঁচেক টাকা বের করে দিলো। মা জানে তার তার পাগল ছেলের একটা চাকরির জোগাড় হয়ে গেলে অন্তত বাবার ঘ্যানঘ্যানানি থেকে রেহাই পাবে। টাকা পেয়ে আমার খুশি যেন আসমান ছুঁয়ে গেল।
২.
একটা নিরিবিলি জায়গায় ছোট করে হাবিবার জন্মদিনের আয়োজন করলাম মনের মতো করেই। ফোন করে হাবিবাকে আসতে বললাম। কিছুক্ষণ পর সে এসে গেল। গোলাপি নীল একটা সুন্দর ড্রেস পড়ে। মাথায় সাদা স্কার্ফ। কী অমায়িক লাগছে তাকে। দেখতে দেখতে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। হাবিবা আমাকে চমকে দিয়ে বলল।
এই এভাবে তাকিয়ে আছ কেন? আর এসব কী?
গাঢ় বিস্ময়টা ভেঙে গেল।
কই, কিছু না তো, এমনি।
এমনি তোমায় এসব করতে কে বলেছে?
আরে বাবা, আজ একটা বিশেষ দিন তাই।
কী বিশেষ দিন?
আজ তোমার জন্মদিন।
হাবিবা খুব সহজেই চমকে গেল। দিনটি সম্ভবত মনে ছিল না।
এই ছোট আয়োজনটুকুও কি আমি করতে পারি না আমার মায়াবতীর জন্য?
না, পারো না !
কেন?
আগে চাকরির গোছ করো তার পর।
আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে।
আগে বলো, তুমি টাকা পেলে কোথায়?
পরে সব বলছি তোমাকে। এখন এসো কেকটা কেটে নাও।
উজ্জ্বল মন নিয়ে মুখে হাসি রেখে কেটে ফেলল কেকটা। আমি বারণ করা সত্ত্বেও আমার মুখেই আগে তুলে দিলো। তা না হলে হাবিবা ভীষণ মন খারাপ করবে। আয়োজন পর্ব শেষে মাথায় রাখা প্রশ্নটা করে বসল।
তুমি টাকা পেলে কোথায়?
মায়ের কাছ থেকে নিয়ে ছিলাম।
কী বলে নিয়েছ, সত্য বলবা। মিথ্যা আমার পছন্দ না তুমি সেটা ভালো করেই জানো।
চাকরির অ্যাপ্লাইয়ের কথা বলে নিয়েছিলাম।
আমার কথা শোনার পর হাবিবা আমাকে মিথ্যুক আর চোর খেতাবি দিলো। আমি জানতাম হাবিবা এসব পছন্দ করে না।
৩.
নিজের অযোগ্যতা ঝেড়ে ফেলে বেশ কিছু দিনের মধ্যেই একটা ভালো চাকরির গোছ করে ফেললাম। স্যালরিটাও খুব ভালো।
আগের মতো আর দিন কাটাতে চাই না। নতুন দিনের মতোই নিজেকে নতুন করে তুলতে শুরু করলাম। সকালে বের হই। সন্ধ্যা হলে বাসায় ফিরি। এভাবেই দিন যায়। যাচ্ছে।
দিনে দিনে বাড়তে থাকে নাম না জানা অভাব। ভালো না থাকার অভাব। আলো ছড়ানো সময়ের অভাব। একটু আনন্দের অভাব।
হাবিবার দুষ্ট-মিষ্টি ছায়াগুলো কেমন এলোমেলো করে দিচ্ছে আমাকে। শুকনো পাতার বাঁশি বাজাচ্ছে মনের কোটরে। কী করব? কী করা উচিত? কোনোটাই মাথায় ধরা দিচ্ছে না আমার। কেন জানি, হাবিবার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ফোন হাতে তুলে সেই পরিচিত নম্বরে ডায়েল করলাম। কত দিন ফোন দেয়া হয় না প্রিয় নম্বরে। বার কয়েক ফোন দিলাম। রিসিভ হলো না। ভাবলাম, এই একটা দেবো। তার পর আর না। ভাগ্যক্রমে ফোন রিসিভ হলো। কোনো কথা নেই। কোনো শব্দ নেই। শেষমেশ খুব রেগে যেতেই ইচ্ছে হলো। এত দিন পরে ফোন দিলাম অথচ কোনো কথা না বলে কেমন চুপ করে আছে। খুব অস্বস্তি জমল মনে।
কী হলো কথা বলছ না কেন?
কী বলব? আমার কিছুই বলার নেই। আগে কখনো বলিনি আর এখনো বলব না।