শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!

Now Reading
শহরের বাহিরে এবং ভিতরে!

৫ম শ্রেনিতে পড়ি তখন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে সাইকেলে বই গুলোকে বাধা অবস্থাতে রেখেই দৌড়ে চলে গেলাম রাস্তার পাশে গর্তটিতে। যেখানে আমরা ক্রিকেট খেলি! হঠাৎ বড় খালা এসে বলল, কালকে তর খালু দেশে আসবে। তুই আমাদের সাথে এয়ারপোর্ট যাবি। যা গিয়ে রেডি হ। কথাটা শোনতেই শরীরের মধ্য দিয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে চোখ বোঝে এক দৌড়ে চলে গেলাম বাড়িতে। মা আমি এয়ারপোর্ট যামু!

-তরে কে কইল?

-দেহ খালায় আইছে।

অজানা কোন সুখ এসে মনের মধ্যে তার অস্থিত্ব জানান দিচ্ছিল। অতি উত্তেজনায় কাপতে ছিলাম। আমি ঢাকা যামু!! বাড়ির সমস্ত ছেলে মেয়ে গুলোকে দৌড়ে দৌড়ে নিজের আনন্দের খবরটা জানিয়ে দিলাম। সবাই অনেকটা কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার অনেকটা হিংসাও! আর আমি এমন ভাব নিয়া তাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম, মনে হয় তাদের বুঝাতে চা্চ্ছি দেখ বেটারা আমি ঢাকা যাইতেছি, সো আমেরিকা যাওয়া কোন ব্যাপারনা! সারা রাত ঘুমোতে পারিনি। রাতের অলসতা আমার উত্তেজিত স্নায়ুকে হার মানাতে পারেনি। এপিঠ ওপীঠ করে কোন মতে রাত ২টা বাজিয়েছি। ৩টার সময় আমাদের গাড়ি ছাড়ার কথা। কিন্ত গাড়ি ছাড়ে প্রায় সারে ৪টার দিকে। কোন রকমে রাবেয়া আপুকে হার মানিয়ে ড্রাইভারের পাসের ছিট-টা দখল করি। গাড়ি চলে। ঘূর্ণায়মান গাড়ির চাকার সাথে তাল মিলিয়ে সকালটাও চলে আসে খব দ্রুত। আর আমি জানালা দিয়ে মাথা বের করে হা করে তাকিয়ে থাকি রঙ বেরঙের দালান গুলোর দিকে। কি যে এক অদ্ভুদ অনুভূতি! প্রতিটা ভবনের তলা গুনতে শুরু করি। আলামিন একবার ঢাকা এসে গ্রামে গিয়ে ১০ তলা বিল্ডিং-এর কথা বলছিলো। আমি প্রাইমেরি স্কুলের একতলা ভবনের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলাম, ইশ ১০ তলা বিল্ডিং যেনো দেখতে কেমন! ছোটখাট বিল্ডিং গুলো ছাড়া কোন বিল্ডিং-এরই পুরাটা গুনে শেষ করতে পারিনা। একটা গুনতে না গুনতে গাড়ি আরেকটার কাছে চলে যায়। আরেকটার পর আরেকটা! ঢাকা শহরে এত বিল্ডিং? অবাক হয়ে যাই। শেষমেশ ১২ তলা পর্যন্ত একটা গুনেছি। আমার বুকের ভেতর অঝরে কাঁপতে থাকা ছোট্ট হৃদয়টাতে তখন আনন্দের উপচে পড়া ভিড়, প্রবল উত্তেজনা। বাড়ি গেলে গল্প হবে! তবে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম একটা বিল্ডিং-এর উপর। দুই-তলা। কিন্তু রাস্তায় চলে! এ কেমন বাড়ি? প্রবল উত্তেজনায় চিৎকার দিয়ে রাবেয়া আপুকে বলি, আপু দেখো বিল্ডিং কেমন গাড়ির মত চলে! রাবেয়ার আপুর সাথে সবাই তাকালো। তারপর যেটা ঘটলো সেটা দেখে আমি হঠাৎ করেই কেমন চুপসে যাই। হাওয়া ভর্তি বেলুনের সবটুকু হাওয়া বেড়িয়ে গেলে যেমন চুপসে যায় ঠিক তেমন চুপসে যাওয়া। সবাই হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা। রাবেয়া আপুকে দেখে মনে হচ্ছিলো গাড়িতে জায়গা থাকলে সে হাসতে হাসতে শুয়েও পড়তো। কি এমন বললাম? আমার খুব করে ইগোতে লাগে। তারপর আমায় অবাক করে দিয়ে ড্রাইভার বলে এটা বিল্ডিং না, এটা দোতলা বাস। আমার মধ্যে যেন হঠাৎ করে শক লাগে। আমি প্রথমবারের মত মনে হয় ততোটা আশ্চর্য হয়েছিলাম। দোতলা বাসও হয়? অথচ আমাদের গ্রামের একমাত্র বিল্ডিং প্রাইমারি স্কুলটাও একতলা! কি অদ্ভুদ ঢাকা!  আমি আবার উত্তেজনা অনুভব করি। খানিক আগে আমাকে নিয়ে করা তাচ্ছিল্যের হাসাহাসি নিমিষেই ভুলে যাই। মনযোগের সবটুকু দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাহিরে। এই শহরে বাসে বাসে পত্রিকা, বাদাম, বুট  বিক্রি করা হয়। কি আশ্চর্য, পানিও বিক্রি করা হয়! অথচ আমাদের টিউবওয়েলের পানি খাওয়ার মত কেউ নাই। একদুইবার পানি তোলার পরে সারাদিন নিথর পরে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমি পানি কিনেছিলাম শুধু এই ভেবে, ঢাকার পানি মনে হয় অন্যরকম। কেমন বোতলে করে বেঁচে! পানির বোতল কোলে নিয়ে বসেছিলাম। এ পানি খাবোনা, গ্রামে নিয়ে যাবো বলে! সকালের ঢাকার রাস্তা, মানুষ, হকার, গাড়ি, বিল্ডিং এমনকি রাস্তার ধূলাবালিও আমায় মুগ্ধ করেছিল সেদিন। আমার প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিলো এসব কিছু আমার জন্য, শুধুই আমাকে মুগ্ধ করার জন্য। আমার মুগ্ধ হৃদয়ে অজস্র গল্প বুনা হয়েছিল সেদিন। আমাকেও যে গল্প করতে হবে আলামিনের সাথে!

এটাই ছিল আমার প্রথম ঢাকা আসা।

………………………………

পড়াশোনা নামক পার্ট টাইম চাকরিটা নিয়ে যখন এই শহরে পাড়ি জমাব, বিদায় ক্ষনে আমার মা চোখের পানি গুলো গড়গড় করে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্ত আমি সেই কান্নার অর্থ বুঝিনি। তখন আমার চোখে মুখে ছিল শহরের রঙিন দালান গুলোর টগবগে স্মৃতির মিহীন ক্যানভাস। মনে ছিল ইচ্ছা। আমিও সেই যেকোন একটা দালানের বাসিন্দা হবো।  

পরিশেষে আজ এই স্বপ্নের শহরে আমার বসবাস। ধূলা-বালি ও কালো ধূয়ায় মিশ্রিত দূষিত বাতাস আর যান্ত্রিক যন্ত্রনার অসহনিয়তা আমার আবেগে জড়ানো সকল স্বপ্নকে ভেঙ্গে এনে দিয়েছে বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাটা শহুরে জীবনে কতটা সুখের তা আমার মত একজন ব্যাচেলরই বলতে পারবে। এই বাস্তব জীবনে অনেকবার আকাশে তাকিয়েছি। কিন্ত কখনো রংধনু দেখিনি। দেখেছি ঘন কালো মেঘ। কখনো দোয়েল পাখিটাকে শূন্যে ভাসতে দেখিনি। দেখেছি উড়োজাহাজ। মানুষের প্রতি মানুষের মমতাহীনতা, একটাকার আশায় কাছে এসে হাত পাতা বৃদ্ধ ভীখারির পেটে লাথি দেয়া আর স্বার্থপরায়নতার কর্মকান্ড গুলো আমার দৃষ্টি শক্তিকে ঝাপসা করে দিয়েছে। আর এই ঝাপসা চোখে মধ্য রাতের অন্ধকারে রাস্তার পাশের লেম্পের আলোতে আমি প্রায়ই খুঁজে বেড়াই কবি গুরুর ফটিককে। কারন এই মুহুর্তে আমিও যে ফটিকের পথের অনুসারি!

পাগলামির কারনে মায়ের হাতে মার খেলে নিজের প্রতিশোধের আগুন জালিয়ে দিতাম ছোট ভাইয়ের পিঠে। তারপর যা ঘটত তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তত থাকতাম। রিপিট মায়ের হাতে ধাওয়া খেয়ে বাড়ি থেকে পলাতক। সন্ধ্যা হতেই মা যখন নামাযে দাড়াতো তখন পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে খাটের নিচে লুকিয়ে যেতাম। ততক্ষনে দেখতাম পাগল দাদিটা কয়েকবার পুরো গ্রামে আমাকে খুজে বেরিয়েছেন। চোখে না দেখলেও রাতের অন্ধকারে তার পা গুলো অনবরত চলত সজিবের খোঁজে। আর মা? সন্তান কে মেরে নিজেকে অপরাধী ভেবে গভীর শোকে বসে থাকত খাবারের প্লেট নিয়ে।

আর আজ এই স্বপ্নের শহরটাতে অনেক বার না খেয়ে ঘুমিয়েছি। কিন্ত কোন মায়াবি হাতের স্পর্শ আমি পাইনি। ভাইকে না মারা সত্ত্বেও মধুমাখা কণ্ঠে কখনো শোনিনি বাবা খেয়ে ঘুমা। আজ আমার শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চমকায়। উত্তেজনায় কাপি। রাতে ঘুম হয়না। যখন ভাবি গ্রামে যাব। স্নায়ু গুলো রাতের অলসতার কাছে হেরে গিয়ে যদি চোখের দুটি পাতা এক হয় তখন স্বপ্ন দেখি,………ঘুরে বেড়াচ্ছি সবুজে ঘেরা ধান ক্ষেতের লাইল ধরে, শাস নিচ্ছি প্রানভরে। যে বাতাসে নেই ধুলা-বালি আর কালো ধূয়ার বিষ। আছে শুধুই অক্সিজেন। তরতাজা অক্সিজেন! সু্যোগ পেলেই ঢিল মেরে দিচ্ছি কারো আম গাছে। বাবু,উজ্জ্বল,সুমন দের সাথে সাইকেল দৌড়াচ্ছি আধা-ভাঙ্গা সেই চিরচেনা পিচঢালা পথটি ধরে।

***************************

 

গর্বিত পিতা

Now Reading
গর্বিত পিতা

“জন্মের সাথে সাথেই মা মারা গেলেন। মায়ের আদর, মায়ের গন্ধ কিছুই পাইনি। নানীর কাছেই শৈশবের কিছু সময় কেটেছে। বাবা রিকশা চালাতেন। মাঝেমাঝে এসে আমাকে দেখে যেতেন আর আমার কিছু খরচ নানীর হাতে দিয়ে যেতেন। নানী মায়ের আদর স্নেহ দিয়ে একটু একটু করে বড় করলেন কিন্তু হাঁটতে পারতাম না। নানী বহু কষ্ট করে কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছিলেন বাবাও চেষ্টা করেছেন কিন্তু তেমন কোন ভালো ফল হয়নি। ডান পাঁ সম্পূর্ণ অকেজো। বাবা একটা লাঠি কিনে দিয়েছিলেন। সেই লাঠি ভর করে হাঁটতাম তাও খুব কষ্ট হত। নানী গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ‌নানীর অক্লান্ত পরিশ্রমে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলাম। কিন্তু নানীও একদিন প্রচন্ড জ্বর হয়ে মারা গেলেন।

তারপর বাবা নিয়ে আসলেন তার কাছে। ওখানে আর কেউ রইলো না আমাকে দেখার মতন। কিন্তু পড়াশুনা আর হলনা। বাবাই বা কি করতেন ! সারাদিন আমার জন্য বসে থাকলে পেটে ভাত কিকরে জুটবে ! তিনবেলা খেয়ে মোটামুটি দিন কাটতো। আর সারাদিন সামনের খোলা মাঠের কোণে বসে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখতাম। চলতে থাকে কোনরকম….।

তারপর একদিন বাবা সন্ধ্যারাতে নিজের রিকশায় করে এক সুন্দরী লাল শাড়ি পরিহিত মহিলাকে ঘরে নিয়ে ফিরলেন। বললেন এ তোর নতুন মা। তোকে অনেক আদর করবে, তোকে কষ্ট করে চুলার পাশে বসে আর ভাত সিদ্ধ করতে হবে না।

প্রথম প্রথম ভালোই আদর করত নতুন মা। কিন্তু সংসারে নতুন সন্তান আসার সাথে সাথেই রুপমতীর আসল রুপ বেরিয়ে পড়ল। খেতে দিত না ঠিকমত। ঘরের সমস্ত বাসন ধুতে হত কাপড় কাঁচতে হত! বসেবসে সব কাজ করাত সৎ মা। যদি করতে না পারতাম অথবা ভুল হত তবেই জুতাপেটা করত, চড় থাপ্পড় আরও কত কি….!

শারীরিক অক্ষমতার কারণে অথবা অসুস্থ থাকলে সেদিন না খেয়ে থাকতাম ! বড় গলায় ডেকে বলতাম, ” ও মা মা অনেক খিদা লাগছে ! পান্তা দাও তাতেই হবে। সব পান্তাতো ফেলেই দেবে !” কখনও দয়া হত সৎ মায়ের আবার কখনও বাবা এলেই শুধু খেতে পেতাম। তবে বাবার ধারে কাছে কখনও ভিড়তে দিত না। যদি সব বলে দেই বাবার কাছে ! মাঝে মাঝে খোলা আকাশের দিকে তাঁকিয়ে চিৎকার করে মাগো মাগো ডাকতাম আর কষ্টের কথা বলে নালিশ দিতাম কেঁদে কেঁদে…! হায় নসিব নানীও চলে গেলেন ! বাবাও বেশ উদাসীন হয়ে গেলেন আমার প্রতি।

একদিন সুযোগ পেয়ে বাবাকে বলেছিলাম সৎ মায়ের সব অত্যাচারের কথা। কিন্তু কোন কাজে আসেনি ! বাবাকে রুপমতী অনেক আগেই বস করে রেখে ছিলো বুঝতে পারিনি। বাবা বিশ্বাস করেনি আমার কথা উল্টো চড় মারল ! বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে সৎ মা দরজা বন্ধ করে অনেক মেরেছিলো সেদিন…! রাতে প্রচন্ড জ্বর ওঠে ! কত আর সহ্য হয় ! ঠিক করলাম হাঁটতে নাহয় খুব কষ্ট হয় কিন্তু এক পাঁ আর দুটি হাত তো আছে ! গতরে খেটে খাব ভিক্ষা বা দয়ায় কেন বাঁচব !

নানী আদর করে মাঝেমাঝে হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিতেন ! লুকিয়ে জমিয়েছিলাম সেগুলো স্কুলের টিফিন না খেয়ে। বাবাও আগে মাঝেমধ্যে কিছু চকলেট আবার কখনও টাকা দিতেন জমাতে ! জমিয়েছিলামও গোপনে। সিদ্ধান্ত নিলাম এগুলো নিয়েই পালাবো শহরে। কত কাজ একটা কিছু ঠিকই খুঁজে নেব।

বাবা যতই অবহেলা করুক তবু বাবাকে ছেড়ে যাবার সময় মন টানছিলনা। বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছিল ! এই বাবাইতো ছিল আর কে ছিল আমার ? আর হয়তো কোনদিনই বাবাকে দেখা হবেনা ! বাবা, মা সমস্ত স্মৃতি মায়ার বন্ধন ছিড়ে চলে যাচ্ছি। বুকের ভেতর খুব হাহাকার হচ্ছিল…আর পেছনে ফিরে তাঁকাচ্ছিলাম যেন মনে হচ্ছিল মা বুঝি দাঁড়িয়ে আছেন আমাকে যেতে বাঁধ সাধছেন ! কিন্তু মাকে তো দেখিনি তবু কেমন যেন লাগছিলো…।

কাঁক ডাকা ভোরে অক্ষম পাঁ আর শরীরে জ্বর নিয়েই মনের জোরে পালিয়ে শহরের রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি ক্ষুধা ও জ্বরের কষ্টে হাতের পোটলা বুকে চেঁপে নিস্তেজ ঘুমিয়ে পড়লাম। ওখানে এক কোণে ঠাঁই নিয়ে পড়ে থাকলাম। আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম আর খেয়াল করলাম এক চাচা আমার থেকে একটু দূরে জুতা পলিশ, সেলাই করে বেশ ভালোই কামাচ্ছেন ! এগিয়ে পাশে বসলাম কাজের কৌশল শিখতে। চাচাও আগ বাড়িয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন তারপর সবকথা খুলে বললাম তাঁকে !

অল্প সময়েই ভালোই সম্পর্ক হল চাচার সাথে। আমাকে রোজ তাঁর পাশে বসিয়ে কাজ করতেন মাঝেমাঝে কিছু খেতেও দিতেন। তারপর চাচার পাশে অল্প কিছু পুঁজি দিয়ে আমিও কাজে লেগে গেলাম। চাচা তাঁর বাড়িতে নিতে চাইলেন কিন্তু যাইনি ! এই অক্ষম শরীরের বোঝা কাউকেই আর দেবনা ভেবেছিলাম…।

কোন রকম খেয়ে বাকী কিছু টাকা জমাতাম আর কিছু টাকা দিয়ে বই কিনে সুযোগ পেলেই পড়তাম স্টেশনের হালকা আলোতে। চলে যেত কোনমতে দিন…।

একদিন চাচা এলেননা ! এক মাস কেটে গেলো চাচা এখনও এলেননা। ভাবলাম চাচার কোন বিপদ হল কিনা ! বাড়ির ঠিকানা জানতাম। কষ্ট করে চাচার খোঁজে গেলাম। শুনি চাচা হঠাৎ ক’দিনের তীব্র জ্বরে মারা গেছেন। তাঁর একটা মেয়ে রেখে গেছেন। মেয়েটি বাসাবাড়ির কাজ করে চলে কোনরকমে।

আমি রোজ একবার আসতাম মেয়েটির খোঁজ নিতে। তারপর আস্তে আস্তে কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে গেলাম মেয়েটির সাথে। মাঝেমাঝে কিছু টাকা জোর করে মেয়েটিকে দিয়ে আসতাম…! মেয়েটিও একসময় আর বাঁধা দিত না। মেয়েটিও যেন আমারই অপেক্ষায় বসে থাকতো ! বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম দুজনে ! করেও ফেললাম একদিন বিয়ে…!

তারপর সুখে দুঃখে আত্মত্যাগে দু’যুগ পেরিয়ে গেছে আমাদের একসাথে ! আমাদের একমাত্র মেয়ে আলেয়া আজ সম্পূর্ণ সরকারী খরচে ডাক্তারি পড়ছে। স্রষ্টার অপার মহিমা ! তিনি আমার সন্তানকে আমার মতন অক্ষমতা দেননি ! একটা সময় মরে যেতে ইচ্ছে হত! মায়ের কাছে নানীর কাছে চলে যেতে মন চাইতো! কিন্তু এখন আরো অনেকদিন বাঁচতে ইচ্ছে হয়। একজন সৎ দয়ালু ডাক্তারের গর্বিত পিতা হয়ে বাঁচতে ইচ্ছে হয়।”

এটি কারো জীবনের সত্যিকারের গল্প।

বাস্তবতা

Now Reading
বাস্তবতা

বিরামহীন বৃষ্টি হলো সারাদিন।এখন অনেকটা শান্ত প্রকৃতি। কিন্তুুু আকাশ মেঘাচ্ছন্ন যেখনো সময় আবার বৃষ্টি নামতে পারে । তবে সারাদিন ঘরে বসে থাকার পর বাহিরে বের হবার সুযোগ কি কেও সহজে হাত ছাড়া করে । তাই হাটতে বের হয়ে গেলাম।সারা দিনের বৃষ্টিতে পুরো মনে হচ্ছে শহর ধৌত করা হয়েছে।রাস্তা গুলো অনেক পরিষ্কার।চারদিকে যেন এক অপরিসীম সুন্দর আবহাওয়া।
হাটতে হাটতে পিন্টুর চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম ।বৃষ্টির দিন তাই তেমন কোন লোক নেই । অন্য দিনগুলোর মতো আজ তেমন ভিড় নেই। পুরো দোকান ফাঁকা বললেই চলে ।পুরো দোকানে দোকানদার আর দোকানের কর্মচারীরা ছাড়া মাত্র দুই জন। দোকানের এক কোণের টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প করছে । আমি তাদের পাশের টেবিলে বসে এক কাপ চা দিতে বললাম।চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাশের টেবিলে বসা লোক দুটোর কথা শুনতে লাগলাম-
-মায়ানমার দেশে এ কি অরাজকতা শুরু হলো বলতো ।
-খুবই মর্মান্তিক অবস্থা ।
-হুম, একটা দুধের বাচ্চাকেও ছাড়ছে না ।
-এ নাকি আবার শান্তিতে নোবেল পাইছে ।
-ঐ সুচির কথা আর বলিস না আমার যদি ক্ষমতা থাকতো ওকে থাবরায়া সোজা করতাম ।
-ঠিকই,বলছি ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের প্রতি কি একটুও দয়া হয় না ।
-আমার তো ঐ সব ছোটছোট ছেলে মেয়েদের দেখেই চোখে পানি এসে যাচ্ছে ।
-একদম অমানুষ।
তাদের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে যতটুকু বুজলাম তারা রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণে তারা অং সাং সুচির উপর অনেক ক্ষোভ ।ছোটছোট ছেলে মেয়েদের প্রতি যে নির্যাতন হচ্ছে তা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পাচ্ছে না।মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রতি যে নির্যাতন হচ্ছে তা সত্যি অনেক মর্মান্তিক।
একটু পরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো । একটা ছোট ছেলে বৃষ্টি থেকে বাচতে তার ভাঙরি বস্তা নিয়ে দোকানে ডুকতেই,তাড়াহুড়ো তে বস্তা টা পাশের টেবিলে বসা দুজনের একজনের হাটুতে আঘাত লাগে সাথে লোকটি রেগে একটা থাপ্পর দিয়ে বলল চোখে দেখিস না বদমাশ,বলে দোকান থেকে বের হয়ে গেল ।ছেলেটি মনে মনে তীব্র রাগ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকল ।সাথে আমিও অবাক হয়ে তার কর্মকান্ড দেখলাম ।
একটু আগে যে লোকটি শিশুদের প্রতি অন্যায় হচ্ছে বলে এতো কিছু বলল।আর সে নিজেই অন্য একটা ছোট ছেলের সাথে এটা কি আচরণ করলো ।এটাও তো একটা অন্যায় ছেলেটা তো আর ইচ্ছা করে তাকে আঘাত করেনি । লোকটি সে কথা একবার ভেবেও দেখলো না ।আর ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের প্রতি অন্যায় হচ্ছে বলে অং সাং সুচির উপর ঠিকই ক্ষিপ্ত ছিলেন। প্রকৃত পক্ষে আমরা সবাই ঠিকই বুজি কোন কাজ করা ঠিক আর কোন কাজ করা ঠিক না।আমাদের সকলের মধ্যেই একটা সুন্দর মন আছে । কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনে করার ক্ষেত্রে এতো তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেই যে সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই ভুল করে ফেলি । লোকটি যদি একটু ভাবতো তবে হয়তো ঠিকই বুজতো ছেলেটি ইচ্ছে করে তাকে আঘাত করেনি। সেটা বুজে সে যদি ছেলেটার প্রতি রাগ না হয়ে স্নেহের চোখে দেখতো তাহলে ছেলেটি তার দিকে রাগ হয়ে না তাকিয়ে হয়তো সহজ ভাবে বলতো দুঃখিত ।
এটাই বাস্তবতা….।

সখি ভালোবাস কারে কয় ?

Now Reading
সখি ভালোবাস কারে কয় ?


প্রেম আছে বলেই মানুষ অমৃতের সন্তান। সম্ভবত: পৃথীবিতে যত কিছুর ব্যাথা আছে, সবচেয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর প্রেম ব্যাথা। একটি পৌরণিক প্রণয়োপাখ্যান, শ্রী কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন – আর রাঁধার মনে হলো, বাঁশি তার নাম ধরে ডাকছে। কবির ভাষায়,“কানের ভিতর দিয়া মরমে পর্শিল”। ব্যাকুল রাঁধা ছল করে কলসি কাঁখে চলিলো যমুনার ঘাটে। সখিদের স্ব-কৌতুহল জিজ্ঞাসা “অমন কাক সাদৃশ্য কালো কেষ্টার মধ্যে কি এমন দেখেছিলো সখি”! রাঁধার নিরূদ্বেগ উত্তর, আমার চোখ তোদের চোখে লাগিয়ে দ্যাখ।

প্রেম-ভালবাসা ঘুমন্ত। এটি জেগে ওঠে হৃদয়ের আহ্বানে। পাশাপাশি সত্য, রোমান্টিক প্রেমে শুধু মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। লাইলী-মজনুর দীর্ঘ বিরহের পর একে-অপরকে খুঁজে পায়। ততদিন মজনু দেহাতীত পর্যায়ে চলে গেছে। তার কাছে তখন কামের আর কোনো আবেদন নেই। মজনু লাইলিকে আবেগ থেকে নিরস্ত থাকতে বললো।

এবার কবি ও কবিতার কাছে তরি একটু ভিড়াই। বিখ্যাত ইংরেজ কবি ব্রাউনিং ও এলিজাবেথ এবং বিয়াত্রিচের প্রেম। এ হচ্ছে নি:স্বার্থ প্রেম-ভালোবাসার দৃষ্টান্ত। কবি রফিক আজাদ তার ভাবনায় ব্যক্ত করেছেন ,“ভালোবাসা মানে দু’জনার পাগলমি/পরষ্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা/ ভালোবাসা মানে, জীবনের ঝুঁকি নেয়া/ বিরহ বালুতে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি/ ভালোবাসার মানে একে-অপরের প্রতি, খুব করে ঝুকে থাকা/ ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টিতে একটানা দুজন হেঁটে যাওয়া/ ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির পেয়ালা, সামনে অবিরাম কথা বলা/ ভালবাসা মানে শেষ হয়ে যাওয়া কথার পরেও, মুখোমুখি বসে থাকা ”।
প্রেম- ভালোবাসার সম্পর্ক জল ও চিনির সম্পর্কের মতন। প্রাচীন গ্রিক আমলে ‘আপেল’ প্রতীক প্রেমের। আর গ্রিক পুরাণ দেবতা অন্ধ। কেননা, প্রেম- ভালোবাসা দেশ কাল জাতির গন্ডি ভেঙ্গে বিস্তারিত। ইহা, শ্রেণি বৈষম্য,বংশীয় কৌলন্য, লোকাচার স্বীকার করে না।
প্রেম-ভালবাসার অনুভব কতটা তীব্র তা প্রকাশ করতে মানুষ অপরাগ। 

kk.PNG

ক্ষনিকের ভালোবাসা…

Now Reading
ক্ষনিকের ভালোবাসা…

– মা! দেখো এদিকটায় গন্ধ নিয়ে। কেমন মিষ্টি মিষ্টি বাতাস!
বারান্দার দরজাটা খুলতেই গন্ধটা আরো বেড়ে গেলো। মা টা যে কি! এত করে বলছি কিছুতেই আসছেনা। নতুন বাসায় এসেই বুঝি ঘরদোর গোঁছাতে লেগে যেতে হবে? মা টা এত্ত বেরসিক উফ!

-“এই অনিতা, ওপাশের জানলাটায় পর্দাটা লাগাও তো মা। নিজের রুম নিজেই গোছাও একটু।” পাশের রুম থেকে মা চিৎকার করে বললো।

বাবা সরকারী চাকুরী করেন। সেই সুবাদে মাস কয়েক পরেই নতুন নতুন জায়গায় নতুন নতুন বাসা। আমার একটাও বন্ধু নেই। এত জায়গা বদলালে থাকবে কি করে? বন্ধুদের তো আর সাথে করে নিয়ে আসতে পারিনা!

সারাদিনের গোছগাছের পর এলাকাটা দেখতে বের হলাম আমি আর মা। ছোট্ট ছিমছাম গ্রাম,ছোট কাঁচা রাস্তা,পর পর তিনটে রেললাইন।তেমাথায় ছোট্র স্টেশনঘর। বাবার অফিসটা এখানেই।

আমাদেরকে দেখে বাবা হাসলেন।
-অনিতা মা, কেমন লাগছে জায়গাটা?

-ভালো বাবা। আমার বারান্দার পাশে একটা জারুল গাছ আছে জানো? হলুদ ফুল ফুটে আছে পুরো গাছটায়!

বাবা হেসে মাথা নাড়লো।
– এজন্যই ওই রুমটা তোকে দিয়েছি।

বাবাকে কাজ করতে দিয়ে আমি আর মা বেরিয়ে এলাম। হাটতে হাটতে মার সাথে গল্প করছি।

-মা আমরা আরো কতবার বাসা বদলাবো? এখানেই থেকে যাইনা কেনো আমরা। গ্রামের অনেকগুলো বন্ধু হবে আমার। একসাথে স্কুলে যাবো,খেলবো। মজা হতো অনেক!

মা চট করে একবার আমার দিকে তাকালো। আদর করে বললো
-বোকা মেয়ে গ্রামের বন্ধুদের দিয়ে কি হবে তোর? বরং শহরেই থাকবো গিয়ে আমরা। পরের মাসে ঢাকায় পোষ্টিং হবে। তখন অনেক বন্ধু হবে কেমন?

মা টা যেনো কেমন! বন্ধু তো বন্ধুই, তাতে আবার গ্রাম, শহর কি!

হাটতে হাটতে মা এগিয়ে গিয়েছে অনেকটা। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হাটছি। হঠাৎ দেখি একটা পেয়ারা গাছের নিচে বসে আছে একটা থুরথুরে বুড়ি। হাতে হলুদ একটা পেঁয়ারা।

– ইশ! গ্রামের মানুষের কি মজা। যখন তখন গাছতলায় বসে পেঁয়ারা খেতে পারে। আর মা হলে এতক্ষনে তুলকালাম করে ফেলতো না ধুয়ে খেয়েছো কেনো? হাত ধোওনি কেনো? আরো কত কি!

বুড়িটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম একটু। আমায় দেখে হাত নেড়ে ডাকলো সে। এগিয়ে যেতে গিয়েও পিছিয়ে এলাম,মা ডাকছে। সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায়। পড়তে বসতে হবে এখন।

হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে দৌড়ে চলে এলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখলাম। দূরে পেঁয়ারা গাছটা দেখা যাচ্ছে,তলাটায় আবছা আলো বুড়িটা নেই।

পড়া শেষ করতে করতে বাবা চলে এলো। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে বললেন মা। খেয়ে আমি আমার রুমে চলে এলাম।

বারান্দার দরজাটা খোলা রেখেই শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। রুম ভর্তি জারুলের মিষ্টি গন্ধ! আস্তে করে ওঠে বারান্দায় এসে দাড়ালাম। আরে! জারুল তলায় ওটা কে দাড়িয়ে আছে? ওই বুড়িটা না? এত রাতে এখানে কি করছে!

ফিসফিস করে ডাকলাম,
-দাদুমনি! ওখানে কি করছেন এত রাতে!

উপর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো দাদুটা। হাত ইশারা করে চুপ থাকতে বলে জারুল গাছের ডাল বেয়ে সোজা ওঠে এলো বারান্দার একেবারে কাছের ডালটায়! আমি তো অবাক! গ্রামের এমন বুড়ো মানুষও গাছ বাইতে পারে আর আমি পারিনা।

হাত বাড়িয়ে একটা পেঁয়ারা এগিয়ে দিলো বুড়িটা। আমাকে খেতে বলছে! পেঁয়ারাটা নিলাম। সাথে সাথেই নেমে চলে গেলো। শুধু এটা দিতেই এতদূর কষ্ট করা! কি আশ্চর্য!!

 

সকালে মার ডাকাডাকিতে ঘুমটা ভেঙে গেলো। বারান্দার দরজাটা ভেজানো। টেবিলের ওপর ওই তো পেয়ারাটা। পেঁকে একদম টসটসা হয়ে আছে। জলদি লুকিয়ে ফেলি, মা যদি আবার বুড়িটাকে কিছু বলে বকা দেয়!

নাস্তা করে রেডী হয়ে মার সাথে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আজ স্কুলে যাবো। বাবা গতকাল বলে রেখেছে, আমরা আসার আগেই সব ঠিকঠাক করে রেখেছিলেন।

নতুন ক্লাসে জবুথবু হয়ে বসে আছি। কি কঁচু যে পড়াচ্ছেন টিচার বুঝতেই পারছিনা! হঠাৎ জানলার পাশেই দেখি সেই দাদুমনি হাসিমুখে দাড়িয়ে!

ঢং ঢং ঘন্টি পড়তেই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ওইতো গাছতলায় বসে আছেন। কাপড়ের পুটলি খুলছেন একটা। কাছে গিয়ে দেখলাম ভেতরে একটা পাকা পেঁয়ারা! এই বুড়ি এত পেঁয়ারা খেতে ভালোবাসে!

আবিষ্কার করলাম বুড়িটার একটাও দাঁত নেই। কথা বলছিলাম ইশারায়, আমি যাই বলি সে শুধু হেসে মাথা নাড়ে।

স্কুল শেষে বাবা এসে নিয়ে যাবে বাসায়। বসে বসে অপেক্ষা করছি। অনেক্ষন পর দূরে বাবাকে দেখতে পেলাম। কেমন রাগী রাগী হয়ে আছে চেহারাটা! ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলামনা।

বাসার কাছে এসেই দেখি দুইটা গাড়িতে মালপত্র তোলা হচ্ছে। মা দাড়িয়ে আছে দিশেহারা ভাবে!

দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম।
-কি হয়েছে মা? আমরা কোথায় যাচ্ছি?

-চলে যাচ্ছি আমরা মামুনি। তোমার বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।

-কেনো!

-জানিনা রে। কি নাকি ঝামেলা হয়েছে অফিসে।

আর কিছু বলার থাকেনা। বাসা বদল এখন আর নতুন কিছু নয় আমার কাছে। আর এজায়গায় তো এলামই কাল। কার কাছে কি বলার আছে?

একটা গাড়িতে বসে চলে এলাম আমরা স্টেশনে। ট্রেইন আসার অপেক্ষায় আছি। হঠাৎ মা কি যেনো বলে ওঠলেন।

-এই যাহ! এসব এলো কোথা থেকে!!

তাকিয়ে দেখি মায়ের হাতে একটা কাপড়ের পুটুলি। ভেতরে টসটসে হলুদ পাঁচটা পেঁয়ারা!

বাবা-মা দুজনেই অবাক। এক আমিই মুখ ফিরিয়ে চুপ করে থাকলাম।

-আর কেও না জানুক। আমিতো জানি এই ভালোবাসার দান কার!

ভার্চুয়াল সম্পর্ক: বাস্তবিক নাকি বায়বীয়?

Now Reading
ভার্চুয়াল সম্পর্ক: বাস্তবিক নাকি বায়বীয়?

ভার্চুয়াল জগৎ হল যার অস্তিত্ব শুধু অনুভূতি বা চেতনায় কিন্তু যার উপস্থিতি বাস্তবতায় নেই। অর্থাৎ অবাস্তব এক জগৎ। ইন্টারনেট জগতটাই ভার্চুয়াল জগৎ। সাড়ে তিন ইঞ্চির মোবাইল ফোন আর পনেরো, ষোল ইঞ্চির মনিটরে মানুষ ধীরে ধীরে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং কিছু অবাস্তব, মিথ্যা সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

ভার্চুয়াল সম্পর্ক:

ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো হল বন্ধুত্ব, প্রেম, ভালোবাসা, আর ব্যাখ্যাতীত কিছু অসুস্থ সম্পর্ক। এ সম্পর্কের কোন বাস্তবিক ভিত্তিই নেই আছে শুধু বায়বীয়তা।

কেমন হয় ভার্চুয়াল জগতের সম্পর্ক:

বাস্তবে হয়তো একটা মানুষের কোনো বন্ধু নাই, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে সে খুবই আনন্দের ও কোলাহলপূর্ণ জীবন-যাপন করছে ঠিকই কিন্তু ভার্চুয়াল জগৎ আসলে একটি বায়বীয় জগৎ। এ জগতের প্রেম, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা সবই খুব সহজেই গড়ে ওঠে আবার খুব সহজেই ভেঙে যায়। এটা শুধু আবেগ আর সময়ের দাবী ছাড়া আর কিছুই নয়। এ সম্পর্ক একটা মোহ মায়ার সম্পর্ক।

ভার্চুয়াল সম্পর্ক আসলে অবাস্তব আবেগ অনুভূতির মায়াজালে ঘেরা ঠুনকো সম্পর্ক। যা বাস্তবিক চেতনার উদ্বেগ জাগায় এবং রোমাঞ্চিত করে তবে তা ক্ষণস্থায়ী এবং অলীক ভাবনা মাত্র। যার বাস্তবতা বা পরিণতিই নেই তবু এক নেশা ও ঘোরের মতন কাজ করে। এটি বাস্তবিক নয় পুরোটাই বায়বীয়। ক্ষণস্থায়ী এ সম্পর্কের ঘোর কেটে যাওয়ার পরে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় যার মোকাবেলা অনেক ক্ষেত্রে মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ অবাস্তব সম্পর্কগুলো বাস্তব সম্পর্কগুলো অস্বীকার করে ফলে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায়।

এ সম্পর্কের ফলে সমাজে কিছু ভয়ঙ্কর এবং কু প্রভাব দেখা যায় যেমন :

* বাবা মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সন্তানরা অনেক সময় বাবা মায়ের অবাধ্য হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপথগামী হয়।

* কারো সাথে অপ্রয়োজনে কথোপকথনে বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে প্রেমের সম্পর্কে পরিণত হয়। কিন্তু আদৌ সেটা প্রেম নয় বরং একটা ধোকার সম্পর্ক। তবু যুবসমাজ এ ধোকার এবং বায়বীয় সম্পর্কে জড়িয়ে অনেক প্রতারিত হচ্ছে।

* বিবাহিত নারী পুরুষও এই ভার্চুয়াল জগতে নিজের অজান্তেই অস্বীকৃত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে ফলে স্বামী স্ত্রী দ্বন্দ্ব কলহ লেগেই থাকে।এই মোহের সম্পর্কগুলো বাস্তব সম্পর্ক মিথ্যে করে দেয় আর মিথ্যে সম্পর্কগুলোই প্রাধান্য পায়।

* কখনও আবার বন্ধত্বু গড়ে ওঠে। একসময় ভার্চুয়াল বন্ধুমহল আড্ডার নাম করে একে অন্যের ঠিকানা নিয়ে নিচ্ছে। প্রায়ই আড্ডা চলছে হঠাৎ একদিন একা পেয়ে হাত পাঁ বেঁধে সব লুট করে সর্বশান্ত করে দিচ্ছে আবার প্রমাণ মুছে ফেলতে গুম হত্যাও করছে অহরহ। সিরিয়াল কিলার, লুট, ডাকাতি, চুরি অধিকাংশ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ভার্চুয়াল জগতের ভয়ঙ্কর কিছু পরিনতির অংশ।

* শুধু এ সম্পর্কই না, ব্যাখ্যাতীত কিছু সম্পর্কও আছে যার আদৌ কোন বাস্তবতা নেই আছে শুধু অসুস্থ বিনোদন, আবেগ আর অনুভূতি। যার কোন বাস্তবিক ভিত্তি বা পরিণতি নেই! তবু যুবসমাজ এর কবলে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

আসলে এ জগতের সম্পর্কগুলো বায়বীয় এবং বিশ্বাস অবিশ্বাসের খেলা মাত্র। সম্পূর্ণটাই ধোঁয়াশা এবং মিথ্যে মোহ মায়া।

এছাড়া ভার্চুয়াল জগতে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলো যুবসমাজকে সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন কর দিচ্ছে। আগে মানুষে মানুষে একটা সৌহার্দ্য, প্রেম, প্রীতি ছিলো, আদিখ্যেতা ছিলো যা প্রায় বিলীন হয়ে গেছে ভার্চুয়াল জগতে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভার্চুয়াল জগতটাই একটা নেশার জগৎ যে জগতের প্রতি যুবসমাজ প্রতিনিয়ত আসক্ত হয়ে পড়ছে এবং ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রীক হয়ে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। একসময় ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

জীবন ও সময়ের সাথে তাল মেলাতে গেলে এর সুফলের থেকে কুফলই বেশী প্রতীয়মান হয় সমাজে। কারন এর কোন বাস্তবিক ভিত্তিই নেই শুধু ধোঁয়াশায় ঘেরা বেনামী সম্পর্ক। বাস্তব সম্পর্কগুলো ভেঙে সামাজিক ও পারিবারিক ভাঙনের সৃষ্টিই বেশী করে যার প্রভাব আমাদের সমাজে অহরহ হচ্ছে। এবং সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয় সৃষ্টি করছে।

অবশ্য ভার্চুয়াল জগতের সম্পর্কের গুটিকয়েক ইতিবাচক দিক বা প্রভাবও প্রতীয়মান হয়, তবে এ দ্বারা ভার্চুয়াল সম্পর্ক কখনই বাস্তবমুখী প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

যুবসমাজ জুড়ে চলছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের আগ্রাসন

Now Reading
যুবসমাজ জুড়ে চলছে ভার্চুয়াল সম্পর্কের আগ্রাসন

বর্তমানে ভার্চুয়াল জীবনের একটা কমন বিষয় হলো প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। স্বভাবগত কারণেই আমাদের বিপরীত লিঙ্গের দিকে আকর্ষণ কাজ করে। তাদের সাথে চ্যাট করতে ভালো লাগে।ভালো  একটা বন্ধুত্তের সম্পর্ক গড়ে উঠে। চ্যাট করতে করতে একটা সময় সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। কিন্তু এ সম্পর্কে জড়িয়ে আমরা কি পেয়েছি এবং কি হারিয়েছি তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

আমাদের যুবসমাজ কি এতটা বোকা?

আমরা যদি একটু খেয়াল করি তাহলে দেখতে পারবো এই ভার্চুয়াল জীবনের সাথে জড়িয়ে অনেক মেয়েই তাদের সবটা হারিয়েছে। অনেক সময় ছেলেরাও। তাও আমরা ভূল করি। ভার্চুয়াল জগতের আবেগ গুলো বড়ই অদ্ভুত। কত সহজে একটা মানুষকে মনের উচ্চ স্থানে জায়গা দেই আবার  ঠুনকো কোন কারণে একমিনিটেই ছুড়ে ফেলে দেই। কারো সাথে সম্পর্ক গড়তে যেমন সময় লাগে না, ঠিক তেমনি ঠুনকো আঘাতে সম্পর্ক গুলো ভেঙে চুরমার হতেও সময় লাগে না। যে মানুষ টি আজ আমাদের ক্লোজ লিষ্টে আছে, দু’দিন পর সেই মানুষটিই চলে যায় আমাদের ব্লক লিষ্টে অথবা আমাদের আইডির ঠিকানা হয় তাদের ব্লক লিষ্টে ; নাহয় হয়ে যাই দুজনের দু’চোখের বিষ !

কেউ দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে থাকলেও খুব তুচ্ছ একটা কারণে ঘৃণার সম্পর্ক শুরু হয়। বিশ্বাস কেমন জানি ঠোনকো একটা বিষয় হয়ে গেছে। কত সহজে একটা মানুষকে বিশ্বাস করে,কথা বলে,একজন অন্যজনকে নিজেদের গোপন কথা শেয়ার করে। অনেক সময় ব্যক্তিগত  ছবি ও আদান প্রদান করে। আবার ঠিক তাকেই কোন একটা কারণে অবিশ্বাস করে। ভেঙ্গে যায় বিশ্বাস নামক ভিত্তিটা।

সম্পর্ক ভেঙ্গে দেওয়ায় মেয়েদের থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত ছবিগুলা আবার ভার্চুয়াল সাইডে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমন ধাক্কা খেয়ে মেয়েদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা ঘৃণা শুরু হয়। অনেক মেয়ে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার ছেলেরা ও মেয়েদের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে নানান অনৈতিক কাজে জড়ায়। আবার স্বভাবগত কারণে মেয়েটা কোন ছেলের প্রতি এবং ছেলেটা কোন মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। আবার ভূল করে।

তবে হ্যাঁ এটা শুধু ভার্চুয়াল জীবনেই হয় না। বাস্তব জীবনেও হয়। তাই বলছি বাস্তব জীবনে যেখানে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে সেখানে ভার্চুয়াল জীবন কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

তবে একটা কথা না বললেই নয়। তা হলো ভার্চুয়াল জীবনের সবটাই যে মিথ্যে তা বলা যাবেনা। মানুষ ভার্চুয়াল জীবন থেকেও সত্যিকারের মানুষ খুঁজে পেয়েছে। এমন মানুষ যার কাছে চোখ বন্ধ করে নিজেকে তোলে দেওয়া যায়। তবে তা খুবই কম। যেমন কিছুদিন আগে একটা নিউজ পড়েছিলাম। “ছেলেটা এবং মেয়েটার ফেইসবুকে পরিচয় তারপর বন্ধুত্ব। পরিচয়ের পরই মেয়েটা জানতে পারে যে ছেলেটার দুইটা কিডনি নষ্ট। মেয়েটা চাইলেই ছেলেটাকে ছেড়ে চলে যেতে পারতো।  কিন্তু যায়নি। ছেলেটাকে একটা কিডনি দান করবে বলেছে এবং বিয়ে করে ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়েছে।”

ভার্চুয়াল জীবনে এমন আরো কিছু ভালোবাসার নিদর্শন আমরা দেখতে পারলেও তা খুবই কম।

একেবারে অবিশ্বাস করে জীবন চলে না। সব মানুষ খারাপ হয়না। তবে অনেক খারাপের ভিতর থেকে বা কারো কাছ থেকে ধোঁকা খাওয়ার পর কাওকে খুব সহজে বিশ্বাস করা যায় না বা উচিৎ না। মনে রাখবেন অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। কাওকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করা ও উচিৎ না। ভার্চুয়াল জীবনে হোক অথবা বাস্তব জীবনে কাওকেই অতিরিক্ত ভালবাসবেন না,কাওকে এতটা বিশ্বাস করবেন না যার কারণে আপনাকে সব হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় বা খারাপ পথে পা এগিয়ে দিতে হয় অথবা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।

আমরা সৃষ্টির শ্রেষ্ট জীব। আমাদের ভালো মন্দ বিচার করার ক্ষমতা আছে। আমরা জানি আমরা কিভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারবো।আর কোন কাজটা করলে আমরা ভালো থাকবো। ভালো থাকা মানে এই না যে কোন একজনকে বিশ্বাস করে নিজের সবটা বিলিয়ে দিব। এবং তার থেকে প্রতারিত হয়ে আবার নিজেকে শেষ করে দিব। ভার্চুয়াল লাইফে নিজেকে জড়ান। তবে লিমিট মেনে।  মনে রাখবেন মাত্রারিক্ত কোন কিছুই ভালো না। বর্তমান যুবসমাজ ভার্চুয়াল লাইফে একটু বেশি জড়িয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল লাইফ যুবসমাজের কাছে এক ধরণের নেশায় পরিণত হয়েছে। যে নেশা থেকে বের হয়ে আসা সত্যিই খুব কষ্টের।

আমি নেশা বলেছি এবং এর জন্য যঠেষ্ট কারণ আছে।একটা মানুষ যখন নেশাগ্রস্থ হয় আমরা তাদের ভিতর কি কি অনিয়ম দেখতে পাই?

১.ইনসমনিয়া(নিদ্রা রোগ)

২.খাবারে অনিয়ম।

৩.পরিবার থেকে দূরে থাকা।

৪.বাস্তব জীবন থেকে কিছুটা দূরে চলে যাওয়া।

ভার্চুয়াল জীবনে জড়ানোর পরেও যুবসমাজের ৬০% এ সব অনিয়মে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা যুবসমাজ ভার্চুয়াল জীবনে জড়িয়ে যাওয়ার পর নিজেদের পরিবারকে কতটা সময় দেই? ভার্চুয়াল জীবনে জড়ানোর পর আমরা অনেকে ভূলে যাই যে আমাদের একটা পরিবার আছে। অনেক সময় ভার্চুয়াল কাওকে সময় দিতে গিয়ে নিজের পরিবারের কারো না কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করছি।

আমার লেখা কথাগুলো কতটা সত্যি তা যে বা যারা আমার লেখাটা পড়ছেন তারা একবার ভেবে দেখেন।

যুবসমাজের কাছে একটাই অনুরোধ, ভার্চুয়াল লাইফ আমাদের সব কিছুনা। নিজের বাস্তব মানুষদের সময় দিন। পরিবার,আত্মীয়দের সময় দিন। তাহলে হয়তো আমরা ভার্চুয়াল লাইফে ভূলটা কম করবো। লিমিট রেখে চলুন।

ইনসেপশন বিশ্লেষন (পর্ব ২)

Now Reading
ইনসেপশন বিশ্লেষন (পর্ব ২)

এই অংশে ট্র‍্যাক রাখার জন্য ইনসেপশন বিশ্লেষন পর্ব ১ পড়া থাকতে হবে।

আজকে আলোচনা করবো মুভির প্যারালাল অর্থাৎ পাশাপাশি ২ টা কাহীনি কিভাবে চলছে তা নিয়ে, তাদের মিশনের বিস্তারিত তে যাবো পরের পর্বে।

ইনসেপশন হলো চিন্তার বীজ বুনে আসা। অবচেতন মনে। আমরা আসলে কোনো সিদ্বান্ত এভাবেই নিয়ে নেইনা, মন কিছুটা যুক্তি কিছুটা বিবেকের উপর চলে।

হয়তো আবেগ অনুভূতি আমাদের চালায়। খুব সুক্ষ্ম হলেও ব্যাপার টা শক্তিশালী। কারন এই বীজ থেকে যে বিশাল বৃক্ষ হয়,সেটাই আসলে আমাদের ব্যাক্তিত্ব। কথায় আছে

“Our experience & our decisions make the shape of us”

ইনসেপশন মুভি টাতে এই কমপ্লেক্স প্লট টার পাশাপাশি আরেকটা কাহীনি প্যারালাল ভাবে চলে।

তা হচ্ছে কব কে নিয়ে, যে হচ্ছে আর্কিটেক্ট। লিওনার্দো ডিক্যপ্রিও। তার জীবনে একটি নেগেটিভ মেমোরি আছে। সে আর তার স্ত্রী ম্যাল স্বপ্নের গভীর থেকে গভীরে বিচরন করে বেড়াতো। তারা কি পরিমান লেয়ার পাড় করেছিলো একসময় তার হিসাব টা হারিয়ে যায়।

তারা গভীর (মুভি তে বলে limbo) থেকেও গভীরে অবচেতন অংশে চলে যায় এবং সেখানে তাদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তাদের পৃথিবী তৈরী করে ফেলে।

এখানে আরেকটা কথা বলে নেই, এই ইনসেপশন এ ঢুকে তারা যেনো রিয়েলিটি ভুলে না যায়, তার জন্য তারা সবাই নিজেদের একটা “টোটেম” তৈরী করে।

যেমন একটা লাটিম যদি আমরা ঘুরিয়ে দেই, সত্যিকারের পৃথিবীতে লাটিম টা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘুরে থেমে যাবে, কিন্তু স্বপ্নের ক্ষেত্রে হিসেব টা একরকম না।

লাটিম টা ইনফিনিট সময় ধরে ঘুরতে থাকবে। সেরকম একটি লাটিম টোটেম হিসেবে ছিলো কব এবং ম্যাল এর। কিন্তু লিম্বো তে গিয়ে ম্যাল একসময় নিজেই চায় রিয়েলিটি ভুলে যেতে। কারন তাদের নিজের তৈরী করা পৃথিবীতে তো ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নেই।

ম্যাল তার টোটেম টা ঘুরানো বন্ধ করে একটা গোপন ভল্টে রেখে দেয়। কব তাকে অনেক বোঝায়, কিন্তু ম্যাল ভুলে যায়। যে সে স্বপ্নের পৃথিবীতে আছে..

কব তাকে বোঝায় তারা এই স্বপ্নের পৃথিবীতে সুইসাইড করে ফিরে যেতে পারে রিয়েলিটি তে। কিন্তু ম্যাল বিশ্বাস করেনা..

একসময় বাধ্য হয়ে কব ম্যাল এর অবচেতন মনে ইনসেপশন এর মাধ্যমে প্রবেশ করে এবং গোপন ভল্ট অর্থাৎ রুপক ভাবে যেটিকে ম্যাল এর চিন্তার বীজ দেখানো হয়েছে,সেখানে গিয়ে লাটিম টি ঘুরিয়ে দিয়ে লকটি বন্ধ করে রেখে দেয়।

ম্যাল এর মাথায় তখন আসতে থাকে লাটিম ঘুরছে, সে মিথ্যা জগতে আছে। তারা একসাথে সুইসাইড করে,লিম্বো থেকে বেরিয়ে যায়। একটার পর একটা কিক এর মাধ্যম এ তারা রিয়েলিটি তে ফিরে আসে।

কিন্তু সমস্যা একটা রয়ে যায়, ওইযে অবচেতন মনে বীজ বোনা হয়ে গেছে সে রিয়েলিটি তে নেই, সেটা গেথে যায় মাথায়। রিয়েলিটি তে থেকেও সে মনে করতে থাকে সে স্বপ্নে বাস করছে।

ওইযে কোনো স্বপ্ন থেকে হঠাত জেগে উঠলে একটা ফিলিংস হয়না যে এখনো স্বপ্নের মধ্যে আছি? কি হলো? কি দেখলাম? কয়েক সেকেন্ড এর জন্য কিন্তু আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, যে আসলে এখন কয়টা বাজে?

আমি কোথায় আছি? ম্যাল এর ক্ষেত্রে শুধু ফিলিংস টা পার্মানেন্ট হয়ে গিয়েছিলো, এবং সে ভাবছিলো এখানে সুইসাইড করলে সে সত্যিকারের পৃথিবীতে চলে যাবে, কিন্তু সে যে অলরেডি রিয়েলিটি তে, তা সে বুঝতে পারেনি…

 

সুইসাইড করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সে

একসময় সে তাদের বিবাহবার্ষিকী এর দিন সত্যি সত্যি অনেক উচু বিল্ডিং এর জানালা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে। এবং আত্মহত্যা করার আগে কব কেও অনুরোধ করে, কব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে বলে সে তার আত্মহত্যার জন্য কব কে দায়ী করে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে,সে মারা গেলে কব যদি থাকে সেও রেহাই পাবেনা, কব কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আত্মহত্যা করে সে।

আত্মহত্যা হলেও,কব জানে এর প্ররোচক সে। সে শহর থেকে পালিয়ে থাকতে শুরু করে,

সে শুধু ফিরে যেতে চায় পুরানা বাড়িতে যেখানে তার ছোট ২ টি সন্তান আছে। কিন্তু তার জন্য তার দরকার বিরাট পাওয়ারফুল কারো সাহায্য যা এই মুহুর্তে সে পাচ্ছেনা।

এর ই মধ্যে তার কাছে আবার অফার আসে ইনসেপশন এর।

যে ব্যবসায়ী তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এর মাথায় ঢুকে তারা যদি প্রয়োজনীয় তথ্য প্লান্ট করে আসতে পারে, তাহলে তার পাসপোর্ট ক্লিয়ার করে দিবে সে, কব তার সন্তানের কাছে ফিরে যেতে পারবে। কাজ সমাধান হলে একটা ফোন কল ই যথেষ্ট।

কোনো একজন ব্যবসায়ী এর মনের গভীর থেকে গভীর অংশে গিয়ে তথ্য বের করে আনতে হবে এবং নতুন বীজ বুনে দিতে হবে। শুরু হয় এডভেঞ্চার। সমস্যা হচ্ছে ম্যাল কে নিয়ে, সে কব এর স্মৃতি তে একটি খারাপ অংশ জুড়ে আছে..

ম্যাল বেচে আছে শুধু কবের স্মৃতি তে, কব স্মৃতির সাথে স্বপ্ন মিলিয়ে ফেলে। সে নতুন স্বপ্ন বানাতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়। স্বপ্নে ম্যাল কে মেরে ফেললেই হারিয়ে যাবে সে, কিন্তু কব এই কাজটাই করতে পারেনা। এখানেই তার দুর্বলতা..

এবং কব স্বপ্নের কোনো মিশনে গেলেই ম্যাল সেখানে গিয়ে সব উলট পালট করে দেয়, কারন কব আর্কিটেক্ট, কোথায় কি আছে কব জানলে ম্যাল ও তা জানে। কব তখন ইনসেপশন এর জন্য সাহায্য নেয় আরেক আর্কিটেক্ট এর।

তারা তাদের যে অফার দেয় তার প্রতিদ্বন্দ্বীর মাথায় ঢুকে। খুঁটিনাটি মিশন শুরু হয় তখন। প্রথম ধাপে তারা থাকে প্লেনে…

এখান থেকে কাহীনি এর কমপ্লেক্সিটির শুরু। আলোচনা করবো আরেকদিন তৃতীয় পর্বে। চলবে…

Page Sidebar