5
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

মানুষ, না উটপাখি?

Now Reading
মানুষ, না উটপাখি?

আমি অন্য সকলের মতো সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজে চোখ দিতে পারি না। বাসায় দুটো পত্রিকা রাখা হয়। একটা বাংলা, একটা ইংরাজি। অন্য সকলেই পত্রিকা পড়ে। আমার মেয়ে, রুবি, ইংরেজি পড়ে। ওকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দেয়া হয়েছিলো। বাংলা কথা শুনে বুঝতে পারে, বলতেও পারে। শুধু লেখাগুলোর সাথে ওর এখনো তেমন একটা বন্ধুত্ব্ হয় নি। ইংরেজি পত্রিকা বাসায় ওর জন্যেই রাখা। রুমানা ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চোখের সামনে বাংলা পত্রিকা ধরে বসে থাকে। আমি বুঝি না, এত কি পড়ার পায় ও। সবার হাতে চায়ের সাথে খবরের কাগজ থাকে, আমার শুধু কাপ। নাস্তার টেবিলে তেমন কোনো কথা হয় না। রুমানা মাঝে মাঝে মৃদু ধমক দেয়,
-‘এই সময়ে এসেও কেউ পত্রিকা না পড়ে, খবর না শুনে থাকতে পারে, তোমাকে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।’
আমি কিছু বলি না, একটু হাসি শুধু।
নাস্তা শেষে রুবি বেরিয়ে যায়, স্কুলের জন্যে। ও নবম শ্রেণীতে পড়ে। একসময় রুমানা ওকে আনা-নেয়ার কাজটা করতো। একটু বড় হয়ে যাবার পর, এখন রুবি একাই যেতে পারে। স্কুল খুব দূরে নয়। মিনিট পনেরোর পথ।
ও বেরোবার পর রুমানা কখনোসখনো মীনাবাজারে যায়। খুঁটিনাটি বাজার ও-ই করে ওখানে। আমি চলে আসি অফিসে।
অফিস বলতে রিয়েলস্টেট কোম্পানি। অফিসে কাজ তেমন থাকে না। দেয়ালের সাথে সেঁটে থাকা বড়সড় সাইজের একটা টিভি চলতে থাকে অলসভাবে। তাতে বেশিরভাগ সময়ই চলে খেলা, নয়তো খবর। আমার পাশের ডেস্কে বসেন হামিদ সাহেব, উনি স্মার্ট ধরনের মানুষ। চব্বিশঘণ্টা নিজেকে সবজান্তা বানিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। দেশের কোথায় কি হচ্ছে, দেশের বাইরে কোথায় কি হচ্ছে, কি হতে পারে, সেসব তার চেয়ে ভালো অন্তত এই অফিসে আর কেউ জানেন বলে আমার মনে হয় না। তেমন কাজ না থাকলে অফিসে সকালের আধঘণ্টা কাটান তিনি পত্রিকা পড়ে। দুপুরবেলা লাঞ্চের সময়টা কাটান খেতে খেতে খবর দেখে। আমি পারতপক্ষে এই সময়টাতে ডেস্কে থাকি না। ক্যান্টিনে চলে যাই। হামিদ সাহেব একা একা খবর দেখতে থাকুন, শুনতে থাকুন। অবশ্য উনি একা একা খবর শুনতে ভালোবাসেন না। তার পাশে একজন থাকতে হয়, যাকে নিয়ে খবর পর্যালোচনা করতে পারবেন। সেই একজনটা হলেন গনি মিয়া। ছোটোখাটো মানুষ। গম্ভীর ধরনের মুখ, কিন্তু কথা বলতে পারেন অস্বাভাবিক রকমের বেশি। হামিদ সাহেবের সাথে তাই তার আলাপটা বেশ ভালোই জমে ওঠে।
সন্ধ্যা ছ’টার মতো বাজে। বাসে করে বাড়ি ফিরছি। বাদুড়ঝোলা হয়ে প্রায় আধঘন্টার মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারপর বসার সুযোগ মিলেছে। এই সময়টা রুবির বাসায় ফেরার সময়। ক্লাস শেষে দু’ জায়গায় কোচিং শেষে ও ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে। রুমানা ঠিক এই সময়টাতে ফোন করে। শুধু একটা কথা বলে ফোন কেটে দেয় ও। ‘রুবি বাসায় ফিরেছে।’ তারপরই খট করে নামিয়ে রাখে ফোনটা। আমার অবশ্য কিছু বলার থাকে না তখন। মেয়ের কন্ঠটা ফোনে অস্বাভাবিক মিষ্টি লাগে শুনতে। সব বাবার-ই কি না, কে জানে। ইচ্ছেটাকে লুকিয়ে রাখি। ও এত ক্লান্ত হয়ে এসেছে। একটু জিরোবে, ভাত খাবে, সারাদিন পর, কথা বলি না আর তাই।
বাসটা জ্যামে আটকে আছে। ঘড়িতে চোখ পড়তেই দেখি, সাড়া ছ’টার বেশি বাজে। এতক্ষনে রুবির চলে আসার কথা, রুমানার আমাকে ফোন করার কথা। ফোনটা পকেট থেকে বের করি, কোনো মিসড কল নেই। এই সময়টা ফোন না পেলে বুকের ভেতর ঢিবঢিব করে আমার। ফোন দিই।
-‘রুবি ফিরেছে বাসায়?’
-‘হ্যাঁ, ফিরলো। খাচ্ছে।’
-‘ফিরলো, মানে? আমাকে ফোন করবে না তুমি?’
-‘করতাম। মেয়েটার বেশি খিদে পেয়েছিলো।’
রুমানার কন্ঠ কৈফিয়তের মতো শোনায়। আমার রাগ তাতে কমে না।
-‘আশ্চর্য। এত ইরেসপন্সিবল কেন তুমি?’
ফোন কেটে দিই।
নেমে যাবো, তার একটু আগে একটা শোরগোল ওঠে বাসের ভেতর। ভেতরে আবছা আলো-অন্ধকার। লাইট ছিলো পাঁচটা, জ্বলে আছে দু’টা। অন্যগুলো নষ্ট, নাহয় ভাঙা। যা বোঝা গেলো, এই অন্ধকারের ভেতর কে যেন একটা মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে। পেছনের দিকে ছিলাম। একটু সামনে চলে আসি। মেয়েটা মহিলা সিটে বসে কাঁদছে। কালো মতো, মোটাসোটা এক ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার গা থেকে ভুরভুর করে সিগারেট আর কীসবের যেন গন্ধ আসছিল। আমি নাকে রুমাল দিয়ে নেমে পড়ি। এসব ঝামেলার ভেতর থাকার কোনো মানে হয়?
দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে রুমানার সাথে আমার তেমন ঝগড়া কখনো হয়েছে কি না, মনে পড়ে না। একটু রাগ হয়তো করি মাঝে মাঝে, তেমন বড় কিছু না। ঘন্টাখানেক কথা বলি না। তারপর ও নিজেই গুটিগুটি পায়ে আসে, বলে,
-‘চলো, খাবে।’
আমি চুপ করে থাকি। তারপর ও বলে,
-‘আচ্ছা, আমি স্যরি তো। অনেক অনেএএক স্যরি। চলো না খাই। খিদে লাগে তো।’
কখনো আমি ভুল করলেও স্যরিটা ও-ই বলে। রাগ করে থাকতে পারি না আর। খেতে যাই।
অথচ, আজ ওর সাথে ঝগড়া বেঁধে গেলো। সন্ধ্যেবেলায় রুবি ফেরার পরে কেন ফোন দেয় নি, সেটা নিয়ে। ও বললো,
-‘ কখনো একটু দেরি হতেই পারে। এটা নিয়ে এত রিয়্যাক্ট করার কি আছে?’
আমি আরো রেগে যাই।
-‘রিয়্যাক্ট করার কি আছে, না? বাইরে তো যেতে হয় না, বোঝো না তো কিছু।’
সে চুপ করে যায়। কিছু বলে না আর। খেতেও বলে না।
শুধু মধ্যরাতে বুকের পাশে ভারী কিছু অনুভব করে ঘুম ভেঙে যায়। রুমানা মাথাটা বুকের উপর রেখে বলে,
-‘স্যরি আমি। বুঝি নি, তুমি এত চিন্তা করো।’
আমার চোখ ভিজে আসে। হয়তো ঘুমুতে পারছে না সে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলি,’ঘুমাও’। চুপ করে থাকে। অন্ধকারে দেখতে পাই না- ঘুমিয়ে পড়ে হয়তো, হয়তো না।
কয়েকদিন ধরে অফিসের কাজে ঠিক মন বসাতে পারছিলাম না। কাজ খুব বেশি, তা নয়। কিন্তু মনোযোগ থাকাটা জরুরী। ইদানীং কি যেন হয়েছে, কোনোকিছুতে মন বসাতে পারি না। পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে কয়েকটা ফাইল নিয়ে বসি। গতকালের, দেখা হয় নি এখনো। অফিসের পিয়ন এসে জানায়, স্যার দেখা করতে বলেছে। আশ্চর্য হবার মতো কিছু নেই। উনি ছোটোখাটো বিষয়েও আমাদের ডেকে পাঠান।
বসে আছি আফজাল সাহেবের সামনের চেয়ারটাতে। এসি রুমেও একটু একটু করে ঘামছি। আফজাল সাহেব প্রশ্ন করলেন,
-‘আপনার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে এখানে?’
আমি চুপ করে থাকি।
-‘শুনলাম আপনি না কি কারো সাথে তেমন কথা বলেন না অফিসে, কখনো টিভি দেখেন না, খবরের কাগজও পড়েন না।’
-‘স্যার, আপনার কি মেয়ে আছে?’

হঠাতই প্রশ্ন করি।

একটু অবাক হলেন তিনি।
-‘হ্যাঁ, দুটো।’
আবার প্রশ্ন করি,
-‘স্ত্রী আছে?’
-‘হ্যাঁ, কিন্তু এসব কথা কেন?’।
-‘আপনি প্রতিদিন খবর দেখে, পেপার পড়ে এত নির্বিকার কিভাবে থাকতে পারেন স্যার? রাস্তাঘাটে, সবখানে মেয়েদের নির্যাতনের, ধর্ষনের খবরগুলো কি আপনার চোখ এড়িয়ে যায়? আপনার মেয়েদের জন্য, স্ত্রীর জন্য চিন্তা হয় না?’
একটু থেমে নিয়ে বলি,
-‘ আমার স্যার একটামাত্র মেয়ে। সারাদিন বাইরে ক্লাস করে, কোচিং করে। কোথায় যায়, কিভাবে যায় জানি না। ওর মা-কেও বাইরে যেতে হয়। তার উপর কাগজ খুললে, খবর দেখলেই ওসব। বুকের ভেতর চিন্তায় ধুকধুক করে স্যার। কাজে মন দিতে পারি না। সেদিন তো চোখের সামনে দেখলাম, বাসে এক মেয়েকে অপমান করছে।’
আফজাল সাহেব চুপ করে থাকেন, বেশ অনেকক্ষণ- মাথা নিচু করে। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
-‘উটপাখি দেখেছেন কখনো? ওদের স্বভাব জানেন?
আমি চুপ করে থাকি এবার।
-‘ওরা বিপদ দেখলে বালির ঢিপিতে মাথা গুঁজে থাকে, ভাবে, কেউ ওদের দেখতে পাচ্ছে না। শরীরটা তো ঢাকতে পারে না, বিপদও তাই আটকে থাকে না। বরং আরো সহজে কাবু করে।’
তারপর উনি প্রশ্ন করেন,
-‘আপনি-আমি তো মানুষ, তাই না? না উটপাখি?’
আমি উত্তর দিতে পারি না। মস্তিষ্কের ভেতর বেজে চলছে, ’আপনি তো মানুষ, না উটপাখি?’

মমতার গহীনে

Now Reading
মমতার গহীনে

-আচ্ছা আপনি লাইট অফ করলেন কেন?

-আমি আপনার চোখের দিকে তাকাতে চাইনা।

-মানে?

-আপনার অসাধারন একজোড়া চোখ আছে। খুব লোভনীয়। তাই লোভে পড়ার আগে আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।

-করুন।

-বিয়েটার ব্যাপারে আপনি কি কিছুদিন সময় চান? আই মিন ভাবার জন্য।

-আপনার দিক থেকে প্রবলেম না থাকলে আমারও কোন সমস্যা নেই।

-না বলছিলাম কি, একজন মানুষকে একবার দেখেইতো চেনা যায়না। আপনি যেমনটা ভাবছেন আমিতো তেমনটা নাও হতে পারি।

বাকিটা জীবন একসাথে থাকতে হবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটু হলেও সময় নেওয়া উচিত।

-আমি আমার পরিবারকে বিশ্বাস করি। তারা আমার ভালো হোক সবসময় চায়।

_____________

 

মেয়েটার প্রতি আমার প্রেমের শুরু তখন থেকেই। তীর গেথে যাওয়ার মত করে আমার হৃদয়েও তার প্রতি ভালোবাসা গেথে গিয়েছিলো নিভৃতে, অজান্তে।

সে গেথে যাওয়া ভালোবাসাকে সঙ্গী করে আজ আমাদের পথচলার তিন বছর। একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান আমাদের। ইরা। ৮ মাস বয়স।

মীমের ব্যস্ততা গুলো এখন ইরাকে ঘিরেই। ইরা পুপু-চুচু টাইপ সংকেত দেওয়াটা লপ্ত করে নিয়েছে ভালো করেই। মেয়ের পুপু-চুচু সংকেতেই মীম বুঝে যায় তার কি লাগবে।

ইরা যদি পুপু-পুপু বলে শব্দ করতে থাকে তাহলে দৌড়ে এসে মীম তার মুখে খাবার তুলে দেয়। পুপু-পুপু মানেই হচ্ছে তার ক্ষিদা পেয়েছে, এবার তাকে খাবার দাও!। আর ডায়পার চেঞ্জ করার জন্য সে চুচু-চুচু করতে থাকে। মানে সে আসল কাজ সেরে ফেলেছে এবার তাকে চেঞ্জ করাও!।

কিন্তু গোসলের জন্য এখনো মনে হয় সে কোন সংকেত আবিষ্কার করতে পারেনি। ডেটল মাখানো পানিতে নামাতেই তীব্র চিৎকারে তুলপার শুরু করে। ভয়ংকার চিৎকার। বাসা জুড়ে বীনা মেঘে বজ্রপাত নয়, একেবারে ঝড় উঠে।

অবশ্য এতে মীম বিরক্ত হয়না। বরং মেয়ের কান্না যেন তাকে আরো যত্ন করে গোসল করানোর জন্য অনুপ্রাণিত করে!। মাঝে মাঝে দুকথার কয়েকটা শাসন। “এই মেয়ে বাবার মত হওয়া চলবেনা, চুপচাপ সময়ের কাজ সময়ে করে নিতে হবে”।

অথচ এমনটা কথা ছিলোনা। কথা ছিলো অক্ষরে অক্ষরে বাবার মত হওয়ার।

 

ইরা তখন ৯ মাসের গর্ভাবস্থায়।

সে রাতে ঝকঝকে পূর্ণিমা। মীমের দীর্ঘশ্বাস গুলো আমার কাধে উষ্ণতা ছড়াচ্ছিলো। সুখের উষ্ণতা। যে উষ্ণতায় ছিলো মা হতে চলা কোন এক মেয়ের ভালোবাসা, মমতা, আবেগ আর স্বপ্নের এক পশলা মিশ্রন। প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসেই ছিলো চীরসুখের এক গভীরতম আভাস।

-আচ্ছা আমাদের যদি ছেলে হয়ে যায়!

-দুই-দুইবার আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে তো মেয়ে হওয়ার সম্ভবনার কথাই বললো। বাকিটা আল্লাহ জানে।

-জানো আমার কেনো জানি মনে হয়, আমার পেটের বাবুটা ছেলে। সে সারাক্ষন শুধু জ্বালায়। তোমার মত!। মেয়ে বাবু হলে আমার মত শান্ত থাকতো! এতো এতো পেটের ভিতরে জ্বালাতন দিতোনা!

-উহু, সে জ্বালায়না। খানিক পরপর সে তোমাকে তার বাবার অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তুমিতো ভুলেই যাও, সারাক্ষন শুধু আমার বাবু আমার বাবু করতে থাকো!

-উহ আসছে অবদান ওয়ালা! আচ্ছা যদি মেয়ে হয় তাহলে তোমার ইচ্ছেমত মানুষ হবে আর ছেলে হলে আমার ইচ্ছে মতো।

-অকে ডান।

-এখন বলো মেয়ে হলে তুমি তোমার মেয়ের কি নাম রাখবে?

-জ্যোৎস্না বানু! আমাদের ঘরে যখন কারেন্ট চলে যাবে তখন আমাদের জ্যোৎস্না বানু ফুরফুর করে আলো ছড়িয়ে বেড়াবে। ছেলের ব্যাপারে তুমি কিছু ভাবছো নাকি?

-এখনো ঠিক করিনি। মনে মনে পাঁচটা নাম বাছাই করে রেখেছি। তারপর যে নামের পাশে মোমবাতির আগুন ভালো জ্বলবে সেটাই রাখবো!

-এগুলো তোমাকে কে শিখিয়েছে?

-আম্মু! ছোটবেলায় নাকি আমার নামটাও এভাবে রাখা হয়েছিলো। তাই আমিও আমার মতো করে আমার ছেলের নাম রাখবো।

-এত পরিশ্রম করতে হবেনা। ছেলে হলে তুমি নাম রাখতে পারো, চাঁদ মিয়া। যে দিনের বেলায় চুরি করে সূর্যের রোদ খাবে আর রাতের বেলায় নিজের নাম করে জ্যোৎস্না বিলাবে। নামে গুনে সমানে সমান! ঠিক তোমার মতো!

-এই সাবধান, আমার ছেলের ব্যাপারে নাক গলাতে হবেনা। নিজের মেয়েকে নিয়েই ভাবো!

 

শেষমেষ এক আলোকবর্ষের সবগুলো আলো একসাথে জড়ো হয়ে মীমের কোল জুড়ে একটা মেয়ে শিশুই আসলো। কিন্তু চীর ধরলো আমার কপালে। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তা নিয়ে অধিকার খাটানোতো দূরের থাক, আমার ইচ্ছামত নামটাও রাখা হলোনা।

খুব ইচ্ছে ছিলো আমার মেয়ের নাম জ্যোৎস্না বানু হবে। জ্যোৎস্না বানু বড় হবে। কোন এক ঘোর আমাবশ্যায় টেলিফোনের ওপার থেকে কেউ একজন বলে উঠবে, “এই জ্যোৎস্না বানু খুব অন্ধকার জানো। অন্ধকার আমার খুব ভয়ের। আসবে একটু আলো হয়ে আমার ঘরে?

দুজন মিলে আমাবশ্যাকে বুরো আঙুল দেখিয়ে জ্যোৎস্না বিলাস করবো! আসোনা। এপাশ থেকে জ্যোৎস্না বানু খিটখিট করে দু-পাটি হেসে দিবে। লজ্জা মাখা কন্ঠে ফিসিফিস করে বলবে, জ্যোৎস্না বানু তোমার পাশেই আছে। হাত বাড়িয়ে নয়, মন বাড়িয়ে দাও দেখবে জ্যোৎস্না বানুকে ছুঁতে পারবে! ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস আসবে। প্রেমের ছলে ছেলেটির হেরে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। নিঃশব্দে দুজন অনেকটা সময় কাটিয়ে দিবে। তারপর হঠাত করে আমাবশ্যা কেটে যাবে!

হলোনা। কিছুই হলোনা। মেয়েটা বড় হলে জ্যোৎস্না বানু দিয়ে একটা ফেইসবুক একাউন্ট খোলার বুদ্ধি দিয়ে দিবো। অবশ্যই ফেইক একাউন্ট হবেনা!

এইতো গেলো নামের কথা। আমি নাকি মেয়েকে অনেক শক্ত হাতে কোলে নেই! তাই যখন তখন চাইলেও কোলে নেওয়া যাবেনা। কোলে নিতে হলে মীম তোয়ালে পেঁচিয়ে মেয়েকে একেবারে শীতকালীন পোশাকের মডেল বানিয়ে দেয়। তাও একগাধা সতর্কীকরন নোটিশ দিয়ে। সবটুকুর অর্থ, মেয়ে যেনো ব্যাথা না পায় কোন ভাবে!

আমিও খুব সতর্ক থাকি। মেয়েকে কোলে নেওয়া মুহূর্তেই আমার কানে বাজে, “ সাবধান মেয়ে যেনো ব্যাথা না পায় কোন ভাবে!”

 

নারী মীম আর মা মীম কে আমি আলাদা করার চেষ্টা করি। পথচলার তিন বছরে আমি কখনোই তার কপালের ভাঁজে বিরক্তির ছাপ দেখিনি। যা দেখেছি সেটা হলো মমতার এক অসীম ক্ষমতা। ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি রেখে নরম হাতে সব কিছু সহজ করে আগলে রাখার ক্ষমতা। শর্তহীন ভালোবাসায় সংসারটাকে এক অদ্ভুত মায়া গন্ধে কাবু করে রাখার মতো ক্ষমতা। মেয়েগুলো এমনিই হয়। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্যে সবচেয়ে বড় রহস্য মেয়ে। যারা চোখে যন্ত্রনা দেখেও অন্তরে ভালোবাসা নিয়ে মুখে হাসি রাখে অতি যত্নে, সাবধানে। বুঝতে দেওয়া যাবে না। কিছু বুঝতে না দেওয়াটা তাদের অনেক বড় একটা দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে তারা সজাগ থাকে বেঁচে থাকার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। বিসর্জনের যুদ্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হলো নারী। যারা হেরে যায়না কিন্তু হারিয়ে দেয় সকল অনিয়মকে!

 

চাঁদ আজ আলো ছড়িয়েছে নিজের সর্বস্ব দিয়ে। বোকা চাঁদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। লজ্জা পেলো বোধহয়। নিজেকে খানিকটা মেঘের মাঝে লুকিয়ে নিলো। মীম খুব শক্ত করে আমায় জড়িয়ে আছে। হারিয়ে যাবেনা, হারাতেও দিবেনা এমন কঠিন বিশ্বাসের জড়িয়ে ধরা! পাগলীটা হয়তো আমার হার্টবিটের আওয়াজ বুঝতে পেরে গেছে। সেই আমার বেঁচে চলার একমাত্র হাতেখড়ি, আমার বিশ্বাস গুলোর একমাত্র শক্তি। একসাথে দুটি হৃদয়ের ভার বহনের দায়িত্বে ঘাবড়ে গেছে হয়তো। তাই ভয় মেশানো জড়িয়ে ধরার মাত্রাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে!

-আমার একটা কথা রাখবে?

-বলেই দেখোনা!

-ইরাকে তোমার মতো একটা মীম করে গড়ে তুলবে? ঠিক তোমার মতো।

মীমের দীর্ঘশ্বাস গুলো আমার কাধে উষ্ণতা ছড়ায়। সুখের উষ্ণতা। যে উষ্ণতায় মাখানো মা হয়ে যাওয়া কোন এক মেয়ের ভালোবাসা, মমতা, আবেগ আর স্বপ্নের এক পশলা মিশ্রন। চীরসুখের এক গভীরতম আভাস।

*********************************

Page Sidebar