মাতৃভাষা এবং সাহিত্য

Now Reading
মাতৃভাষা এবং সাহিত্য

গোড়াতেই বলিয়া রাখা ভাল, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে আমি যে সাহিত্যের সকল দিক ও বিভাগ লইয়া প্রকাণ্ড একটা কাণ্ড বাধাইয়া দিতে পারিব, আমার এমন কোন মহৎ উদ্দেশ্য বা ভরসা নাই। তবে মাতৃভাষা এবং সাহিত্যের সাধারণ ধর্ম এবং প্রকৃতি এই ক্ষুদ্র স্থানে যতটা সম্ভব, আলোচনা করিবার চেষ্টা করিব মাত্র। আমার উদ্দেশ্য বৃহৎ নহে; অতএব যিনি বৃহৎ একটা আশা লইয়া আমার এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধ পড়িতে বসিবেন। তাঁহার আশার তৃপ্তি সাধন করিতে আমি একান্ত অপারগ।

একটা কথা আমার অত্যন্ত দুঃখের সহিত মনে পড়িতেছে, আমার জীবনের আমি এমন দুই-একটা কৃতবিদ্য বাঙালীকে ঘনিষ্ঠভাবে জানিয়াছি, যাঁহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত পরীক্ষাগুলাই কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হইয়াও মাতৃভাষা জানা এবং না-জানার মধ্যে কোন পার্থক্যই দেখিতে পাইতেন না। তাঁহারা সব-কটাই পাস করিয়াছেন এবং সরকারী চাকরিতে হাজার টাকা বেতন পাইতেছেন। অর্থাৎ যে-সব অদ্ভুত কাণ্ড করিতে পারিলে বাঙালী সমাজে মানুষ প্রাতঃস্মরণীয় হয়, তাঁহারা সেই-সব করিয়াছেন। অথচ, বাঙ্গালায় একখানা চিঠি পর্যন্ত লিখিতে পারিতেন না। অবশ্য, না শিখিলে কিছুই পারা যায় না—ইহাতেও অত দুঃখের কথা নাই, কিন্তু বড় দুঃখের কথা এই যে, তাঁহারা নিজেদের এই অক্ষমতাটা বন্ধু-বান্ধবের কাছে আহ্লাদ করিয়া বলিতে ভালবাসিতেন। লজ্জার পরিবর্তে শ্লাঘাবোধ করিতেন অর্থাৎ ভাবটা এই যে, এত ইংরাজি শিখিয়াছি যে, বাঙ্গালায় একখানা চিঠি লিখিবার বিদ্যাটুকু পর্যন্ত আয়ত্ত করিবার সময় পাই নাই। জানি না, এ-রকম হাজার টাকার বাঙালী আরো কত আছেন, কিন্তু এটা যদি তাঁহারা জানিতেন যে, মাতৃভাষা না শিখিয়াও ঐ অতটা পর্যন্তই পারা যায়, কিন্তু তার ঊর্ধ্বে যাওয়া যায় না, ঐ চলা-বলা-খাওয়া-টাকা রোজগার পর্যন্তই হয়, আর হয় না; যথার্থ বড় কাজ, যা করিলে মানুষ অমর হয়, যাঁর মৃত্যুতে দেশে হাহাকার উঠে, তেমন বড় কর্মী কিছুতেই হওয়া যায় না, তাহা হইলে নিজেদের ঐ অক্ষমতার পরিচয় দিবার সময় অমন করিয়া হাসিয়া আকুল হইতে পারিতেন না।

তাই আজ আমি এই কথাটাই আপনাদিগকে বিশেষ করিয়া স্মরণ করাইতে চাই, যে, যথার্থ স্বাধীন ও মৌলিক চিন্তার সাক্ষাৎ মাতৃভাষা ভিন্ন ঘটে না, যথার্থ বড় চিন্তার ফল সংগ্রহ করিবার পথ মাতৃগৃহদ্বারের ভিতর দিয়াই, বাঙ্গালী যখন বাঙ্গালী, সে যখন সাহেব নয়, তখন, বিলাতি ভাষার মস্তবড় ফাটকের সম্মুখে যুগযুগান্তর দাঁড়াইয়াও কোনদিনই সে পথের সন্ধান পাইবে না।

এ কথা শুধু ইতিহাসের দিক দিয়াই সত্য নহে, মনোবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানের দিক দিয়াও সত্য।

কেন যে আজ পর্যন্ত জগতে, মানুষ যত-কিছু বড় চিন্তা করিয়া গিয়াছেন সে সমস্তই মাতৃভাষায়, বৈষয়িক উন্নতির অবনতির ফলে এক-একটা ভাষা সাময়িক প্রাধান্য এবং ব্যাপকতা লাভ করা সত্ত্বেও এবং সেই ভাষা সর্বতোভাবে আয়ত্তাধীন থাকা সত্ত্বেও কেন যে চিন্তাশীল ভাবুকেরা নামের লোভ ত্যাগ করিয়া নিজেদের অমূল্য চিন্তারাশি মাতৃভাষাতেই লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন, কেন মাতৃভাষা ভিন্ন অপরের ভাষায় বড় চিন্তার অধিকার জন্মায় না, এই সত্যটা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করিতে গেলে, প্রথমতঃ ভাষাবিজ্ঞানের দুটো মূল কথা মনে করিয়া লওয়া উচিত।ব্রহ্মাণ্ডে আছে কি? আছে আমার চৈতন্য এবং তদ্বিষয়ীভূত যাবতীয় পদার্থ। অন্তর্জগৎ এবং বাহ্যজগৎ। উভয়ে কি সম্বন্ধ এবং সে সম্বন্ধ সত্য কিংবা অলীক, সে আলাদা কথা। কিন্তু এই যে পরিচয় গ্রহণ, একের উপরে অপরের কার্য, ইহাই মানবের ভাব এবং চিন্তা। এবং এই পদার্থ নিশ্চয়ই মানবের চিন্তার বিষয়। এমনি করিয়াই সমস্ত স্থূল বিশ্ব একে একে মানবের ভাব-রাজ্যের আয়ত্ত হইয়া পড়ে। ঘর-বাড়ি, সমাজ, দেশ প্রভৃতি যাবতীয় পদার্থ এক-একটি চিন্তার জন্মদান করিয়া ইহারাই মানব-চিত্তে এক-একটি ভাব উৎপন্ন করে। অন্তর্জগৎ ও বাহ্যজগৎ উভয়েই বিচিত্র তথ্য ও ঘটনায় ভরিয়া উঠে। উভয় জগতের এইসব তথ্য ও ঘটনা ছাড়া মানুষ ভাবিতেই পারে না। অর্থাৎ ইহাদের দ্বারাই মানবচিত্ত আন্দোলিত হইয়া ইহাতেই পরিপূর্ণ হইয়া যায়। এক কথায় ইহারা ভাব ও ধারণার কারণও বটে, ইহারা তাহার বিষয়ও বটে।

এইবার মনের মধ্যে পদার্থের পরীক্ষা হইতে থকে। ভাব ও চিন্তার কাছে তাহাদের প্রকৃতি ও স্বরূপ ধরা পড়ে, ধর্ম ও গুণের হিসাবে নানা লক্ষণবিশিষ্ট হইয়া বাহ্যজগৎ এইবার ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট হইতে থাকে।

মানবের ভাব ও চিন্তাই যাবতীয় পদার্থে গুণের আরোপ করে। সে কি, আর একটার সহিত তাহার কি প্রভেদ স্থির করিয়া দেয়। তারপর পদার্থের সহিত পদার্থের তুলনা করিয়া সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া লক্ষণ নির্ণয় করিয়া ধর্মবিশিষ্ট করিয়া আমরা তাহাদের ধারণা-কার্য সম্পূর্ণ করি।

বিভিন্ন দেশের ও বিভিন্ন সময়ের মানব-চিন্তা-প্রণালী পর্যালোচনা করিলে স্পষ্ট দেখা যায়, এই চিন্তা-প্রণালী কয়েকটা সাধারণ নিয়মের অন্তর্গত। একই নিয়মে মানবের চিন্তারাশি পরিপক্ক ও সম্পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে।

যেমন বাহ্যজগতে দেখা যায়, কোন দুটি বস্তু একই সময়ে একই স্থান অধিকার করিতে পারে না অন্তর্জগতেও ঠিক তাই। সেখানেও কোন দুটি বস্তু এক সঙ্গেই চিত্ত অধিকার করিতে পারে না। সেই জন্যই আমরা কোনমতেই এক সঙ্গে একই আয়াসে দুটি বস্তুর পরিচয়-লাভ কিংবা একটি বস্তুর দুটি গুণনির্ণয় করিতে পারি না। আমরা বিষয় ভাগ করিয়া একটি একটি করিয়া লক্ষণ স্থির করি। অর্থাৎ চিন্তার কার্য ক্রমশঃ নিষ্পন্ন হয়। অন্তর্জগতে মন যেমন দুটি বস্তু বা দুটি গুণ এক সঙ্গে গ্রাহ্য করে না, বাহ্যজগতে পদার্থও তেমনি তাহার সব-কটা গুণই একই সময়ে মানব-চিত্তের কাছে প্রকাশ করে না। যুবতী রমণীর রূপ শিশুচিত্তের কাছে ধরা দেয় না। সে রূপের মূল্য উপলব্ধি করিবার জন্য শিশুচিত্তকে একটা নির্দিষ্ট বয়সের অপেক্ষায় বসিয়া থাকিতে হয়।

এই জন্য ভাবের ক্রমিক বিকাশ, বয়োবৃদ্ধি ও ধারণা-শক্তির বিকাশের উপর নির্ভর করে। এবং তাহার উপর ভাব ও চিন্তার সংখ্যাবৃদ্ধি হয়।
কিন্তু চিন্তা-পদ্ধতির সর্বাপেক্ষা সাধারণ নিয়ম এই যে, পুরাতন ভাব ও ধারণার ভিত্তি অবলম্বন না করিয়া প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত চিন্তাস্রোতে গা ভাসান না দিয়া মানব-চিত্ত কোনমতেই নতুন ধারণা বা নূতন ভাব আয়ত্ত করিতে পারে না। জ্ঞাত ও সুনির্দিষ্ট পদার্থ নিয়ে অতীত দিনে যেভাবে চিত্তকে নাড়া দিয়া তাহার গুণ ও ধর্মের কাহিনী জানাইয়া দিয়া গিয়াছে, অর্থাৎ তাহার সম্বন্ধে মনের মধ্যে যে জ্ঞান জন্মিয়া রহিয়াছে, সেই জ্ঞানের সহিত তুলনা না করিয়া, তাহাদিগকে ব্যবহার না করিয়া কোনমতেই মানুষ পদার্থের নূতন লক্ষণ ও ধর্মের পরিচয় পাইতে পারে না।

যেমন করিয়া এবং যে-যে উপায়ে শিশুচিত্তে প্রথম চৈতন্যের বিকাশ ঘটিয়াছিল জানিয়া এবং না জানিয়া যে-সকল পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া সেই তরুণ চিত্ত, ভাব, চিন্তা ও ধারণায় অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল, যে-সমস্ত জল, হাওয়া ও আলোক পাইয়া তাহার জ্ঞানের অঙ্কুর পল্লবিত হইয়া আজ শাখা-প্রশাখায় বড় হইয়াছে, সে জল, হাওয়া, আলোককে বাদ দিয়া আর একটা অভিনব প্রণালীতে মানবচিত্ত কোনমতেই নূতন জ্ঞানরাজ্যে প্রবেশ করিতে পারে না। অর্থাৎ যেমন করিয়া সে মাতৃক্রোড়ে বসিয়া চিন্তা করিতে শিখিয়াছিল মরিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সে সে-পথ ছাড়িয়া যাইতে পারে না—পুরাতন জ্ঞানকে অস্বীকার করিয়া পুরাতন পদ্ধতি ত্যাগ করিয়া কাহারোই নূতন জ্ঞান, নূতন চিন্তা জন্মে না।

আরো একটা কথা। ভাব ও চিন্তা যেমন ভাষার জন্মদান করে, ভাষাও তেমনি চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত, সুসম্বন্ধ ও শৃঙ্খলিত করে। ভাষা ভিন্ন ভাবা যায় না। একটুখানি অনুধাবন করিলেই দেখিতে পাওয়া যায়, যে-কোন একটা ভাষা মনে মনে আবৃত্তি করিয়াই চিন্তা করে—যেখানে ভাষা নাই, সেখানে চিন্তাও নাই।

আবার এইমাত্র বলিয়াছি, পুরাতন নিয়মকে উপেক্ষা করিয়া, পুরাতনের উপর পা না ফেলিয়া নূতনে যাওয়া যায় না—আবার ভাষা ছাড়া সুসম্বন্ধ চিন্তাও হয় না—তাহা হইলে এই দাঁড়ায় বাঙ্গালী বাংলা ছাড়া চিন্তা করিতে পারে না, ইংরাজ ইংরাজি ছাড়া ভাবিতে পারে না। তাহার পক্ষে মাতৃভাষা ভিন্ন যথার্থ চিন্তা যেমন অসম্ভব, বাঙ্গালীর পক্ষেও তেমনি। তা তিনি যত বড় ইংরাজি-জানা মানুষই হউন। বাংলা ভাষা ছাড়া স্বাধীন, মৌলিক বড় চিন্তা কোনমতেই সম্ভব হইবে না।

এ-সব বিজ্ঞানের প্রমাণিত তথ্য। ইহার বিরুদ্ধে তর্ক চলে না। চলে শুধু গায়ের জোরে, আর কিছুতে না।

যে ভাষায় প্রথম মা বলিতে শিখিয়াছি, যে ভাষা দিয়া প্রথম এটা ওটা সেটা চিনিয়াছি, যে ভাষায় প্রথমে ‘কেন’ প্রশ্ন করিতে শিখিয়াছি, সেই ভাষার সাহায্য ভিন্ন ভাবুক, চিন্তাশীল কর্মী হইবার আশা করা আর পাগলামি করা এক। তাই যে কথা পূর্বে বলিয়াছি তাহারি পুনরাবৃত্তি করিয়া বলিতেছি, পরভাষায় যত বড় দখলই থাক, তাহাতে ঐ চলা-বলা-খাওয়া, নিমন্ত্রণ রক্ষা, টাকা রোজগার পর্যন্তই হয়, এর বেশি হয় না, হইতে পারে না।

তারপরে সাহিত্য। আমার মনে হয়, সর্বত্র এবং সকল সময়েই ভাষা ও সাহিত্য অচ্ছেদ্য বন্ধনে গ্রথিত। যেন পদার্থ ও তাহার ছায়া। অবশ্য প্রমাণ করিতে পারি না যে, পশুদের ভাষা আছে বলিয়া সাহিত্যও আছে। যাঁহারা ‘নাই’ বলেন, তাঁহাদের অস্বীকার খণ্ডন করিবার যুক্তি আমার নাই, কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না যে, ভাষা আছে কিন্তু সাহিত্য নাই।

ভাষা-বিজ্ঞানবিদেরা বলেন, মানবের কোন্‌ অবস্থায় তাহার প্রথম সাহিত্য-সৃষ্টি তাহা বলিবার জো নাই, খুব সম্ভব, যেদিন হইতে তাহার ভাষা, সেই দিন হইতে তাহার সাহিত্য। যেদিন হইতে সে তাহার হত দলপতির বীরত্ব-কাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিয়া বলিয়াছিল, যেদিন হইতে প্রণয়ীর মন পাইবার অভিপ্রায়ে সে নিজের মনের কথা ব্যক্ত করিয়াছিল, সেই দিন হইতেই তাহার সাহিত্য।

তাই যদি হয়, কে জোর করিয়া বলিতে পারে পশু-পক্ষীর ভাষা আছে অথচ সাহিত্য নাই? আমি নিজে অনেক রকমের পাখি পুষিয়াছি, অনেক বার দেখিয়াছি তাহারা প্রয়োজনের বেশি কথা কহে, গান গাহে। সে কথা, সে গান আর একটা পাখি মন দিয়া শুনে। আমার অনেক সময় মনে হইয়াছে, উভয়েই এমন করিয়া তৃপ্তির আস্বাদ উপভোগ করে, যাহা ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তির অতিরিক্ত আর কিছু। তখন, কেমন করিয়া নিঃসংশয়ে বলিতে পারি ইহাদের ভাষা আছে, গান আছে কিন্তু সাহিত্য নাই? কথাটা হয়ত হাসির উদ্রেক করিতে পারে, পশু-পক্ষীর সাহিত্য! কিন্তু সেদিন পর্যন্ত কে ভাবিতে পারিয়াছিল গাছপালা সুখদুঃখ অনুভব করে? শুধু তাই নয়, সেটা প্রকাশও করে। তেমনি হয়ত, আমার কল্পনাটাও একদিন প্রমাণ হইয়া যাইতেও পারে।

যাক ও কথা। আমার বলিবার বিষয় শুধু এই যে, ভাষা থাকিলেই সাহিত্য থাকা সম্ভব; তা সে যাহারই হোক এবং যেখানেই হোক। অনুভূতির পরিণতি যেমন ভাব ও চিন্তা, ভাষার পরিণতিও তেমনি সাহিত্য। ভাব প্রকাশ করিবার উপায় যেমন ভাষা, চিন্তা প্রকাশ করিবার উপায়ও তেমনি সাহিত্য। জাতির সাহিত্যই শুধু জানাইয়া দিতে সক্ষম সে জাতির চিন্তাধারা কোন্‌ দিকে কোথায় এবং কতদূরে গিয়া পৌঁছিয়াছে। দর্শন, বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ, এমন কি যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও চিন্তাও দেশের সাহিত্যই প্রকাশ করে।

একবার বলিয়াছি, ভাষা ছাড়া চিন্তা করা যায় না। তাই জগতে যাঁহারা চিন্তাশীল বলিয়া খ্যাত,তা সে চিন্তার যে-কোন দিকই হউক, মাতৃভাষায় দেশের সাহিত্যে তাঁহারা ব্যুৎপন্ন এ কথা বোধ করি অসংশয়ে বলা যায়।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকদের প্রতি চোখ ফিরাইলে এই সত্য অতি সহজেই সপ্রমাণ হয়। তাঁহারা দর্শন বা বিজ্ঞান লইয়াই থাকেন, লোকে তাঁহাদের চিন্তার ঐ দিকটার পরিচয় পায়, কিন্তু, দৈবাৎ কোন প্রকাশ পাইলে, বৈজ্ঞানিকের অসাধারণ সাহিত্য-ব্যুৎপত্তি দেখিয়া লোকে বিস্ময়ে অবাক হইয়া যায়। বিলাতের হক্‌সলি, টিন্‌ডল, লজ, ওয়ালেশ, হেল্‌ম হোজ, হেকেল প্রভৃতি বৈজ্ঞানিকেরা খুব বড় সাহিত্যিক। আমাদের জগদীশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্রও কোন খ্যাত সাহিত্যিক অপেক্ষা ছোট নহেন।

কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় কিছুই থাকে না, যদি এই কথাটা মনে রাখা যায়। সাহিত্যকে বাদ দিয়া যাঁহারা বিজ্ঞান আলোচনা করেন, তাঁহারা বিজ্ঞানবিৎ হইলেও হইতে পারেন, কিন্তু বাহিরের সংসার তাঁহাদের পরিচয় পায় না। কারণ, ভাষা সাহিত্যকে অবহেলা করার সঙ্গে সঙ্গেই, স্বাধীন চিন্তাশক্তিও অন্তর্ধান করে।

এইবার সাহিত্যের দ্বিতীয় অংশের কথা আপনাদিগকে স্মরণ করাইয়া দিব। কিন্তু তাহার পূর্বে এতক্ষণ যাহা বলিলাম তাহা কি? তাহা শুধু এই যে, মাতৃভাষা শিক্ষার যথেষ্ট আবশ্যকতা আছে। পরের ভাষায় সংসারের সাধারণ মামুলি কর্তব্যই করা যায়, কিন্তু বড় কাজ, বড় কর্তব্যের পথ মায়ের উঠানের উপর দিয়াই—তাহার আর কোন পথ নাই। ইতিহাস ও বিজ্ঞান এই সত্যই প্রচার করে।

কিন্তু সাহিত্য বলিতে সাধারণত কাব্য ও উপন্যাসই বুঝায়। সে যে নিছক কাল্পনিক বস্তু। একশ্রেণীর কাজের লোক আছেন, তাঁহাদের বিশ্বাস যাহা কল্পনা তাহাই মিথ্যা এবং মিথ্যা কোন দিন কাজে লাগিতে পারে না। সেটা পড়িয়া নিশ্চয়ই জানিয়া রাখা উচিত, বিলাতের রাজা অত নম্বরের হেনরীর কতগুলি ভার্যা ছিল এবং অমুক অমুক সালে, তাহাদের অমুক অমুক কারণে, অমুক অমুক দশা ঘটিয়াছিল। কারণ, কথাগুলি সত্য কথা এবং দশাগুলি সত্যই ঘটিয়াছিল। কিন্তু, কি হইবে জানিয়া বিষবৃক্ষের নগেন্দ্রনাথের ভার্যা সূর্যমুখীর কি দশা ঘটিয়াছিল এবং কেন ঘটিয়াছিল? তাহা ত সত্যই ঘটে নাই—লেখক বানাইয়া বলিয়াছেন মাত্র। বানানো কথা পড়িয়া বড় জোর সময়টাই কাটিতে পারে। কিন্তু, আর কোন্‌ কাজ হইবে? তাঁহাদের মতে যাহা ঘটিয়াছে তাহাই সত্য, কিন্তু যাহা হয়ত ঘটিলে ঘটিতে পারিত কিন্তু ঘটে নাই, তাহা মিথ্যা। কিন্তু বস্তুতঃ তাই কি? এইখানে কবির অমর উক্তি উদ্ধৃত করি—

ঘটে যা তা সব সত্য নয়, কবি তব মনোভূমি

রামের জনমস্থান অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।

বস্তুতঃ ইহাই সত্য এবং বড়রকমের সত্য। ইংরাজেরা যাহাকে ‘এ হায়ার কাইন্ড অফ ট্রুথ’ বলেন, ইহা তাহাই। সীতাদেবী যথার্থই শ্রীরামচন্দ্রকে অতখানি ভাল বাসিয়াছিলেন কিনা, ঠিক অমনি পতিগতপ্রাণা ছিলেন কিনা, যথার্থই রাজপ্রাসাদ, রাজভোগ ত্যাগ করিয়া বনে-জঙ্গলে স্বামীকে অনুসরণ করিয়াছিলেন কিনা, কিংবা ঐতিহাসিক প্রমাণে তাঁহাদের বাস্তব সত্তা কিছু ছিল কিনা, ইহাও তত বড় সত্য নয়, যত বড় সত্য কবির মনোভূমিতে জন্মিয়া রামায়ণের শ্লোকের ভিতর দিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে।

জানকী দেবী হউন, মানবী হউন, সত্য হউন, রূপক হউন, যাহা ইচ্ছা হউন; অত গভীর পতিপ্রেম তাঁহাতে সম্ভব-অসম্ভব যাহাই হউক, কিছুমাত্র আসে যায় না; যখন, ঐ গভীর দাম্পত্য-প্রেমের ছবি কবির হৃদয়ে সত্য বলিয়া প্রতিভাত হইতে পারিয়াছে এবং যুগ-যুগান্তর নর-নারীকে আদর্শ দাম্পত্য প্রেমে দীক্ষা দিয়া আসিয়াছে, ইহাই সত্য। সত্যকার অযোধ্যা সত্যকার রাম-সীতা অপেক্ষা সহস্র সহস্র গুণে সত্য। অযোধ্যা হয়ত একটি রাম, একটি সীতাতে সত্য, কিন্তু কবির কল্পনায় যে রাম-সীতা জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, হয়ত তাহা আজ পর্যন্ত কোটি কোটি রাম-সীতাতে সত্য হইয়াছে।

সেদিন স্নেহলতার আত্মবিসর্জনকাহিনী সংবাদপত্রে পড়িয়াই মনে হইয়াছিল ঠিক এমনি করুণ, এমনি স্বার্থত্যাগের চিত্র কিছুদিন পূর্বে গল্প-সাহিত্যে পড়িয়াছিলাম। সে মেয়েটিও দরিদ্র পিতাকে দুঃখ-কষ্ট হইতে অব্যাহতি দিবার জন্যই আত্মবিসর্জন করিয়াছিল। তাহারও বিবাহের বয়স উত্তীর্ণ হইতেছিল এবং পাত্র পাওয়া যাইতেছিল না।

সংবাদপত্রের কাহিনী ঐ একটি স্নেহলতাতেই সত্য, কিন্তু কবির কল্পনায় যে মেয়েটি আত্মহত্যা করিয়াছিল, তাহা হয়ত শত-সহস্রে সত্য।

স্নেহলতা শিক্ষিতা ছিলেন, কে জানে তিনি এই কাহিনী পড়িয়াছিলেন কি না, এবং স্বার্থত্যাগ-মন্ত্র ইহাতেই পাইয়াছিলেন কি না!

আমার বিশ্বাস কিন্তু এই। আমার নিশ্চয় মনে হয়, তিনি লেখাপড়া না জানিলে, সাহিত্যচর্চা না করিয়া থাকিলে কিছুতেই এ শক্তি, এ বল নিজের মধ্যে খুঁজিয়া পাইতেন না। কবির কল্পনা এমনি করিয়াই সত্য হয়, কবির কল্পনা এমনি করিয়াই কাজ করে।

দেশের কল্পনায় দেশের সাহিত্য, দেশের ইতিহাস বড় হউক, জীবন্ত হউক, সত্য হউক, সুন্দর হউক, এই প্রার্থনাই আজ আপনাদের কাছে নিবেদন করিতেছি। প্রত্যেক সুসন্তান অকপটে মাতৃভাষার সেবা করুন, এইটুকু মাত্র ভিক্ষা আপনাদের কাছে সবিনয়ে করিতেছি। কিন্তু কি করিলে সাহিত্য ঠিক অমনটি হইবে, সে পরামর্শ দিবার স্পর্ধা আমার নাই। শুধু এইটুকু মাত্র বলিতে পারি, যাহা সত্য বলিয়া মনে হইবে, অন্তরের সহিত যাহাকে সুন্দর বলিয়া বুঝিবেন, নিজের সাধ্যমত সেই পথ ধরিয়াই চলিবেন—তার পরে ফল ভবিষ্যতের হাতে।

যাঁহারা বড় সাহিত্যিক, বড় সমালোচক তাঁহারা পরামর্শ দিতেছেন, উপদেশ দিতেছেন ইংরাজি ভাব, ইংরাজি ভঙ্গী ত্যাগ করিয়া খাঁটি স্বদেশী হইতে; আমি নিজেও একজন অতি ক্ষুদ্র নগণ্য সাহিত্যসেবক, কিন্তু দুঃখের সহিত স্বীকার করিতেছি, তাঁহাদের পরামর্শ, তাঁহাদের উপদেশ যে ঠিক কি, তাহা এখন পর্যন্ত বুঝি নাই।

কে কোথায় হ্রস্ব-ই-কার স্থানে ঈ দিয়াছেন, কে কোথায় ‘অ’-কারের পরিবর্তে ‘ও’-কার ব্যবহার করিয়া ভয়ানক অন্যায় করিয়াছেন, কে কোথায় কোন্‌ বিধবা বঙ্গনারীকে দিয়া এক মুমূর্ষু হতভাগ্য পরপুরুষের মুখে জল দিয়া সাহিত্যে বিষম কুরুচি টানিয়া আনিয়াছেন, এই-সব লইয়া সাহিত্যক্ষেত্রে মহা তোলপাড় হইতেছে, কেন হইতেছে, যথার্থ কি তাহাতে দোষ, কি হইলে ঠিকটি হইত, এ-সব খুঁটিনাটি আয়ত্ত করিয়া তাহাতে মতামত দিবার ক্ষমতা বা প্রবৃত্তি কিছুই আমার নাই।

কোন সাহিত্য-সেবককেই আমি উপদেশ দিতে পারি না, এই কর কিংবা এই করা উচিত।

শুধু এইটুকু বলি, হৃদয়ের মধ্যে এই সত্য জাগাইয়া রাখিয়া সাহিত্যসেবা করুন, যেন আপনার সেবা মাতৃভাষার দ্বার দিয়া স্বদেশবাসীকে কল্যাণের পথে লইয়া যায়। তখন কি উচিত, কি উচিত নয়, তাহা দেশের হৃদয় ও প্রাণই বলিয়া দিবে।

IMG_20171207_171541_720.JPG

সখি ভালোবাস কারে কয় ?

Now Reading
সখি ভালোবাস কারে কয় ?


প্রেম আছে বলেই মানুষ অমৃতের সন্তান। সম্ভবত: পৃথীবিতে যত কিছুর ব্যাথা আছে, সবচেয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর প্রেম ব্যাথা। একটি পৌরণিক প্রণয়োপাখ্যান, শ্রী কৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন – আর রাঁধার মনে হলো, বাঁশি তার নাম ধরে ডাকছে। কবির ভাষায়,“কানের ভিতর দিয়া মরমে পর্শিল”। ব্যাকুল রাঁধা ছল করে কলসি কাঁখে চলিলো যমুনার ঘাটে। সখিদের স্ব-কৌতুহল জিজ্ঞাসা “অমন কাক সাদৃশ্য কালো কেষ্টার মধ্যে কি এমন দেখেছিলো সখি”! রাঁধার নিরূদ্বেগ উত্তর, আমার চোখ তোদের চোখে লাগিয়ে দ্যাখ।

প্রেম-ভালবাসা ঘুমন্ত। এটি জেগে ওঠে হৃদয়ের আহ্বানে। পাশাপাশি সত্য, রোমান্টিক প্রেমে শুধু মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এখানেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। লাইলী-মজনুর দীর্ঘ বিরহের পর একে-অপরকে খুঁজে পায়। ততদিন মজনু দেহাতীত পর্যায়ে চলে গেছে। তার কাছে তখন কামের আর কোনো আবেদন নেই। মজনু লাইলিকে আবেগ থেকে নিরস্ত থাকতে বললো।

এবার কবি ও কবিতার কাছে তরি একটু ভিড়াই। বিখ্যাত ইংরেজ কবি ব্রাউনিং ও এলিজাবেথ এবং বিয়াত্রিচের প্রেম। এ হচ্ছে নি:স্বার্থ প্রেম-ভালোবাসার দৃষ্টান্ত। কবি রফিক আজাদ তার ভাবনায় ব্যক্ত করেছেন ,“ভালোবাসা মানে দু’জনার পাগলমি/পরষ্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা/ ভালোবাসা মানে, জীবনের ঝুঁকি নেয়া/ বিরহ বালুতে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি/ ভালোবাসার মানে একে-অপরের প্রতি, খুব করে ঝুকে থাকা/ ভালোবাসা মানে ব্যাপক বৃষ্টিতে একটানা দুজন হেঁটে যাওয়া/ ভালোবাসা মানে ঠান্ডা কফির পেয়ালা, সামনে অবিরাম কথা বলা/ ভালবাসা মানে শেষ হয়ে যাওয়া কথার পরেও, মুখোমুখি বসে থাকা ”।
প্রেম- ভালোবাসার সম্পর্ক জল ও চিনির সম্পর্কের মতন। প্রাচীন গ্রিক আমলে ‘আপেল’ প্রতীক প্রেমের। আর গ্রিক পুরাণ দেবতা অন্ধ। কেননা, প্রেম- ভালোবাসা দেশ কাল জাতির গন্ডি ভেঙ্গে বিস্তারিত। ইহা, শ্রেণি বৈষম্য,বংশীয় কৌলন্য, লোকাচার স্বীকার করে না।
প্রেম-ভালবাসার অনুভব কতটা তীব্র তা প্রকাশ করতে মানুষ অপরাগ। 

kk.PNG

আজও কেন এমন হয় — পর্ব—৩

Now Reading
আজও কেন এমন হয় — পর্ব—৩

— আমি খুব সরল ভাবে বললাম।  ‘এ গায়ে তো গাড়ি দেখাই যায় না ।  এমন কি  দু চার মাসে কেউ কোন কাজে রিকশা নিয়ে আসে।  কারন ব্রিজটা ভীষণ উঁচু  এ পারে বাহন বলতে তেমন কিছু  নেই । কিছু আনতে হলে  দুতিন জনে টেনে ঠেলে আনতে হয় । কিন্তু  মোটর সাইকেল দেখা যায়। এরা কারা । ‘

— ‘একটি মোটর সাইকেল তো বজলু মিয়ার। আমার পাশের বাড়ির ।  বিদেশ থেকে আসার পর কিনেছিল। কিন্তু সাইকেল চালিয়ে গ্রাম ছেড়ে দূরে যাওয়া খুব সমস্যার ব্যপার তাই বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই পড়ে থাকে সেটি । যখন গঞ্জে বা শহরে যায় নিয়ে যায় । আর কার কার আছে আমি জানি না ।‘

— ‘কিন্তু দুটো ছেলেকে আমি প্রায়ই দেখি মোটর সাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে ?’  আমি আলতো ভাবে বললাম কথাটা ।

উত্তর দিতে গিয়ে একটু ভাবেন চাচি –‘হুম , মোটর সাইকেল নিয়ে দাবড়ে বেড়ানো,  অভি আর বাদলের কথা বলছ না তো?’

—‘ আমি তো নাম জানিনা । দুজন কে বাইকে দেখি সব সময় ।’ , বললাম।

—‘ হ্যা ওরাই হবে। আর কেউ তো এমন করে গাড়ি চালায় না । শুনেছি,  অভি হল  এম পি সাবের ভাইয়ের ছেলে। আর বাদল উনার শ্বশুর বাড়ির পক্ষের আত্বিয়। এখানেই থাকে । এম পির গ্রামের বাড়িতে  ।‘

— ‘এম পি তো ঢাকায় থাকেন। তাই না?’

—‘ হ্যা। পরিবার নিয়ে ঢাকায় আছেন। নিজের বাড়িতে । এখানে উনার ভাই আর অন্য আত্বিয়রা থাকে।‘

—‘এখানে আসেন না তিনি  ?’

—‘আসেন তো শুনেছি । ‘

—‘ উনার বাড়ি কোথায়?’

— ‘ শুনেছি , তোমার স্কুলের সামনে দিয়ে উত্তরে একটা রাস্তা গেছে। ওখানে কোথাও। আমি জানিনা ঠিক। তোমার চাচা বলতে পারবেন ।‘

—‘ ও তাহলে এম পি এই গ্রামেরই ।  উনার লোকেরা যেভাবে বাইক চালায়। ভয় হয়,  কবে না একটা এক্সিডেন্ট করে বসে।‘

— ‘হ্যা শুনছিলাম । ওরা এমনই , কম বয়সি ছেলেরা একটু এমন হয়ই ।‘

—‘এভাবে গ্রামের হাঁটা পথে স্পিড তোলা – আমি মৃদু প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বললাম , ‘ কখন কার গায়ে উঠে যায়, কে আহত হয় ।  কেউ কি  কিছু বলে না ?’

— ‘ কার এতো সাহস হবে মা ?’—‘সাহস ? সাহস কেন ? ভয় পায় নাকি ?’

—চাচি আমার কথার উত্তর না দিয়ে বললেন , ‘এম পির লোককে কে সাহস করে বলবে ?’

— ‘এটা সাহসের  কথা না । সতর্কতার কথা । কারও কিছু বলা উচিত ।‘  কথাটা  শুনে চাচি একটু চমকালেন । সেটা দেখে বললাম, ‘গ্রামের বুড়ো মানুষেরা হাঁটছে বাচ্চারা হাঁটছে,  স্কুলে যাচ্ছে , কখন কার গায়ে ধাক্কা লাগে ।‘

— চাচি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার কাছ ঘেসে বসলেন । যেন খুব জরুরি গোপন কথা বলছেন ,  ‘এসব কথা বলাবলি করোনা মা । কখন ওরা কাকে কি বিপদে ফেলে দেবে কে জানে । পুরো গ্রাম থানা পুলিশ সব ওদের ইশারায় চলে । আর আমি যে এসব কথা বলছি – ওরা যদি শুনে—‘   ভয়ে একটু কেঁপে উঠলেন চাচি ।

— ‘কি হয়ছে ? এমন  ভয় পাচ্ছেন কেন ?’  চাচি চুপ করে থাকেন । ‘প্লিজ বলুন কিছু কি করেছে ওরা ? কি করেছে ?’  আমার অনেক অনুনয়ের পর চাচি আমাকে কিছু ঘটনা বললেন । এগুলো  কিছু উনার দেখা , কিছু শুনা কথা । রুদ্ধশ্বাস হয়ে শুনলাম আমি ।

— ‘এমনও হয়  ?’ প্রচণ্ড  হতাশ সুরে বললাম আমি ।  ‘এতসব ভয়াবহ কাজ করার পরও এমন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ?’

—চাচি আমাকে বারবার অনুরধ করলেন এসব বিষয়ে কাউকে যেন কিছু জিজ্ঞেস না করি । ‘কোথা থেকে কি হয় ?  কে ওদের লোক আর কে নয় কে জানে ? এরাই শুধু নয় আরও আছে ওদের সাঙ্গ পাঙ্গ । কে কখন কোথা থেকে উদয় হবে কে জানে ?  আমি এসব বলাবলি করছি ওরা জানলে তোমার চাচাকে হয়তো আর দেখবো না কিম্বা আমার ছেলেমেয়েদের কাউকে । এ নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না ।‘

—‘আপনারা এম পি কে কিছু জানান নি ?’

—  তাকে কোথায় পাবো ? পেলেও তার কাছ পর্যন্ত যাবে কাকে ডিঙ্গিয়ে , বল ? এরাই তো । কেউ কেউ চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়েছে । আর প্রমান কই ? কে দেবে প্রমান ?‘

— আমি আবারও কিছু বলতে চাইলে চাচি আমার হাত চেপে ধরলেন , ‘মা  আর  কোন বিপদ সামলানোর মতো সাহস আমাদের নেই । ওরা কি কি করতে পারে তার কোন ধারনা নেই তোমার , তাই এসব ভাবছ । কিছুদিন গ্রামে থাকো বুঝবে ।‘

— আমি চাচিকে নিজের কথা আর কিছু বললাম না । বাসায় ফিরে এলাম । চাচি বা চাচা  কোন সাহায্য করতে তো পারবেনই   না । অযথা ভয় পেয়ে আমাকে না আবার বাসা ছাড়তে বলেন । এই গ্রামে ভাড়ায়  ঘর পাওয়া খুব মুশকিল । উনারা যখন অপারগ তখন আর কাকেই বা বলবো ।  আমি আপাতত চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম । ছুটিতে ঢাকায় গিয়ে কারও সাথে আলাপ করে দেখবো । কি করা যায় ?  পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা ।

— আমি আজ কাল খুব একটা বের হচ্ছিনা । বাসায় বসে সারাদিন স্কুলের কাজ দেখা আর বই  পড়াতেই  লেগে থাকি ।  । কোথাও গেলে সুমিকে সাথে নিয়ে যাই । ছোট্ট সুমি আমার কিছু সাহাজ্যে হয়তো আসবে না । তবে এই পথে একা যাবার অস্বস্থিটা  একটু কমেছে । ওর ও নিয়মিত স্কুল যাওয়া হচ্ছে ।  এখন থেকে আমি সুমিকে সাথে নিয়েই স্কুলে যাই । তাতে কি , তাতে তো দুই পাজীর দুষ্কর্মে বাঁধা পড়ে নি । ওরা আগের মতই ওদের নোংরামি করে যাচ্ছিল। আমি আর সুমি নিজের মত,  কিছু না দেখার ভান করে হাঁটতে থাকি ।

— প্রতিদিনের মত আমি আর সুমি যাচ্ছিলাম । ওরা বেশ দূরে দাড়িয়ে ছিল । হটাত কি করলো ওরা – খুব  স্পিডে বাইক চালিয়ে সুমির সামনে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক করলো । আতংকিত সুমির সামনে এসে বাইক থেকে নেমে  ওর সামনে এসে দাঁড়ালো ।

— ভয়ার্ত সুমির  চুলের ফিতা টেনে ধরে  একজন বলল,  ‘কিরে লাল ফিতা নিল ফিতা । কি খবর ?‘ সুমি প্রতিদিন দুই বেনী  করে । একটি বেণীতে  লাল  ফিতা আর অন্যটিতে নিল রঙের ফিতা বাঁধে। ওদের অসভ্যতায় সুমি ভয়ে আমার পেছনে লুকাতে চায় । লম্বু এবার  ফিতা ছেড়ে হাসতে থাকে । কালো গ্লাস বলে, ‘আরে আরে বাদল দেখ ,   লাল ফিতা নিল ফিতাও তো কম সুন্দর না ।‘

—লম্বু হাতে তালি দিয়ে  বলল , ‘বাহ,  একটার সাথে একটা ফ্রি া’

—আমি হাতের কাছে কালো গ্লাসকে পেয়ে ওর গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলাম ।

— কাল গ্লাস থমকে গিয়ে গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে,  হাসতে হাসতে বলল , ‘এক কিলোর সাথে আড়াই শ গ্রাম ফ্রি । ম্যাডাম আজকের চড়ের বিনিময়ে  এইটুকু ফ্রি তো পেতেই পারি ।‘ তারপর শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেল।

— ‘আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না । বলতে গেলে ওরা না আবার আরও খারাপ আচরন করে এই নির্জন রাস্তায় এমন কেউ ছিল না যাকে ভরাসা  করে কিছু বলবো । আর বলবোই বা কাকে ? দেখে শুনে এমন মনে হচ্ছে , এ গায়ে  কিছু হিংস্র দাঁতাল বাঘ থাকে আর বিপরীতে নিরীহ মেষ শাবক ।

— এর একটা বিহিত হওয়া দরকার । কিন্তু কি ভাবে ? কোন সে পথে ?

— এর মাঝেই একদিন হটাত করে সুমি অসুখে পড়লো । কিছুদিন  থেকে আমাকে একাই যেতে হচ্ছে । সুমি যে আমাকে প্রটেক্ট করবে তা নয় । কিন্তু ও থাকলে খুব সামান্য হলেও শক্তি পাই ,। এখন  ভরসা একটাই-  ছেলে দুটো মুখেই যা বলে । এছাড়া আর কোন অশালীন কাজ করেনি  এযাবৎ।

©সেলিনা জান্নাত

ঢাকা- রচনাকাল

১২/০৫/২০১৭ইং

 

 

আর হবে একটি বানানও ভুল! ফুটপ্রিন্টারদের জন্য মেগা ট্রিক

Now Reading
আর হবে একটি বানানও ভুল! ফুটপ্রিন্টারদের জন্য মেগা ট্রিক

ফুট প্রিন্টের কথা যখন প্রথম জানতে পারি, তখন আসলেই অনেক খুশি হয়েছিলাম। সাতশ শব্দের একটা বাংলা আর্টিকেল লিখলে ফুট প্রিন্ট সত্তর টাকা করে আয় করার সুযোগ দিচ্ছে প্রথমে। এটা আমার মত মানুষের জন্য অনেক ভালো একটা ব্যাপার। কেননা, লেখার মান কেমন সেটা অবশ্য বিতর্কের ব্যাপার কিন্তু ভালো টাইপিং স্পীড আর বানান সম্পর্কে টুকটাক সচেতনতা আছে। অর্থাৎ, ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিলে বেশ ভালো আয় করা যাবে।

প্রথমদিকে এটাই আমার ধারণা ছিল। কিন্তু প্রথম একটা আর্টিকেল লেখার পরে ভুল ভাঙতে দেরী হলো না। কারণ, বানান এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। আর বাংলা বানান এতটা কঠিন আমাদের সবারই প্রায় তিনটির বেশী করে বানান ভুল হচ্ছেই। তখন থেকেই একটা সল্যুশন বের করার চেষ্টা করছিলাম। এবং খুব সম্ভবত ভালো একটা উপায় পেয়েও গেছি। যেটা আমার বানান শুদ্ধ হতে সহায়তা করবে।

অতএব, দেরী না করে আসুন আলোচনা করি।

বানান শুদ্ধ করার জন্য আমরা অনেকেই গুগলে শব্দটি সার্চ দিয়ে বানান ঠিক আছে কিনা সেটা মিলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি। প্রথমদিকে যখন আমি নিজে এটা করতাম, অনেক বেশী কনফিউজড হয়ে যেতাম। কারণ নামকরা নিউজ পোর্টাল গুলো একেকটা একেক ধরনের বানান লিখেছে। তবে এক্ষেত্রে আমি বরাবরই প্রথম আলোর বানান ফলো করার চেষ্টা করি। কিন্তু এতেও ঠিক পোষাচ্ছিল না। তাহলে কী করা যায়?

হুম, সমাধান আমাদের হাতের কাছে। আমরা লেখার জন্য প্রায় প্রত্যেকেই তো অভ্র ব্যবহার করে থাকি, ঠিক না? আপনি জানেন কি, এই অভ্র সফটওয়্যারটিরই কিন্তু নিজস্ব বানান শুদ্ধিকরণ সুবিধা আছে।

 

কিভাবে আপনি এই অপশনটি পাবেন?
১। প্রথম আপনার ডেস্কটপে উপরের দিকে অথবা হিডেন আইকন গুলোর মধ্যে অভ্র আইকনটিতে রাইট বাটন ক্লিক করুন। তাহলেই নিচের ছবির মত spell checker অপশনটি পাবেন। এছাড়াও আপনি ctrll+F7 কমান্ড চেপেও এই অপশনটি আনতে পারেন।

Screenshot_1.pngScreenshot_3.png

২। এরপরে যখন স্পেল চেকারটি ওপেন হবে, তখন আপনি এমএস ওয়ার্ডে আপনার যে লেখাটি লিখেছেন, সেটা কপি করে টেক্সট বক্সে পেস্ট করুন। এবং এবার শুধু F7 চাপুন। তাহলেই আপনার লেখায় প্রথম যে ভুলটি হয়েছে, সেটা অভ্র ফাইন্ড আউট করবে এবং আপনাকে সঠিক বানানটি দেখিয়ে পরিবর্তন করতে বলবে।

৩। এক্ষেত্রে দুইটা সমস্যা হবে। কিছু অজানা ইংরেজি শব্দ অভ্র ভুল হিসেবে দেখাতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি ইগনোর অন্স ক্লিক করে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন। আর ভুল বানানটি দেখিয়ে দিলে, চেঞ্জ অন্স অথবা চেঞ্জ অল ক্লিক করবেন। বুঝতেই তো পারছেন, চেঞ্জ অন্স ক্লিক করলে শুধু ওই শব্দটিই পরিবর্তন হবে। আর চেঞ্জ অল ক্লিক করলে পুরো লেখায় যতবার ঐ শব্দ এসেছে সব গুলো চেঞ্জ হয়ে যাবে।

৪। এভাবে একদম শেষ পর্যন্ত আপনি বানান শুদ্ধ আছে কিনা যাচাই করতে পারবেন।

 

অসুবিধা:

হ্যাঁ, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন অভ্র এর এই বানান শুদ্ধিকরণ সুবিধাটি শতভাগ পারফেক্ট নয়। এটা টাইপ মিস্টেক এবং প্রায় নব্বই ভাগ ভুল বানান গুলো বের করতে পারে। কিন্তু আপনার তো দরকার পুরো ১০০ ভাগ সঠিক বানান। সেক্ষেত্রে আপনার সহজ কিন্তু কনফিউজিং বানান গুলো সম্পর্কে কিছুটা ধারনা রাখতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে, ‘কোনো’ শব্দটির কথা বলা যায়। আপনি কোনো কিছু সম্পর্কে যদি লিখতে যান, তাহলে কিন্তু কোনো এবং কোন দুইটিই সঠিক। কোন লিখতাম আমরা অনেক আগে। আর সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা একাডেমী যে বানানের বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে, তার মধ্যে এই কোনোও একটি। অর্থাৎ, দুইটিই সঠিক।

তাহলে আমাদের লেখার কমন কিছু কনফিউজিং বানান নিয়ে চলুন ছোট্ট করে একবার আলোচনা করে নেই। যেগুলোর দুটো বানানই সঠিক যার ফলে অভ্র ফাইন্ড আউট করতে পারে না।

কী নাকি কি?

অবশ্যই দুটিই সঠিক। তবে এটা নির্ভর করে আপনি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছেন? ধরুন, আপনি কাউকে প্রশ্ন করছেন, আজকে ক্লাসে কী কী পড়াবে? এক্ষেত্রে কিন্তু আপনাকে ‘কী’ লিখতে হবে। অর্থাৎ, আপনি এমন কিছু জিগ্যেস করছেন, যেটার উত্তর এক কথায় না হয়ে কিছুটা ব্যাখ্যা থাকবে, সেটার ক্ষেত্রে লিখতে হবে কী। তাহলে ‘কি’ লিখবেন কোথায়? আমি যদি আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনি কি আমার লেখাটি পড়ছেন? তাহলে আপনার উত্তর হবে, হ্যাঁ। হুম, এখানেই আপনি কি লিখবেন। অর্থাৎ যে প্রশ্নের উত্তর এক কথায় হ্যাঁ এবং না তে দেয়া যায়, সেই প্রশ্ন করতে হলে আপনাকে কি লিখতে হবে।

করো নাকি কোরো?

এখানে একটা ভাবের ব্যাপার আছে। ধরুন আপনি কাউকে প্রশ্ন বলছেন, সাইদ, তুমি এই কাজটা করো। অর্থাৎ কথাটি খুব সাধারণ ভাবে সাইদকে করতে বলছেন। আবার, মনে করুন সাইদ কাজটি করতে চাচ্ছে না, তখন ওকে বলতে হবে, সাইদ… তুমি কাজটি কোরো প্লিজ? বুঝতে পারছেন? পরেরটায় আলাদা একটা আবেদন রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি কোরো ব্যবহার করতে পারেন।

হল নাকি হলো?

এক্ষেত্রে একটা কমন সমাধান আছে। যেটা প্রায় সব ব্যাকরণ বইতেই আপনি পাবেন। সেটা হলো, যে ক্রিয়াপদের শেষে ও কার না দিলে ব্যাপারটি বোঝা যায়। সেটায় আপনি অযথা ও কার দিতে যাবেন না। যেমন এখানে, হল মানে কিন্তু হলরুমও বোঝাতে পারে। অর্থাৎ আপনার এখানে হলো ব্যবহার করতে হবে।

যাইহোক, একদমই কমন কিছু ভুল নিয়ে শেষের দিকে আলোচনা করলাম। যেগুলো আপনাদের কাজে আসতে পারে। আর প্রথমদিকের অভ্র ট্রিকটা যে কাজে আসবে, সেটা তো গ্যারান্টি দিয়ে বলাই যায়!

ভাল থাকুন সবাই।

 

“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?

Now Reading
“ নিরাপত্তাহীনতার বলয়ে শিশুরা ” সমাজের করণীয় কি ?

কিশোর কবি সুকান্তের কন্ঠে উদাত্ত আহব্বান ছিল নবজাতকের জন্য করে যেতে হবে এই পৃথিবীকে জঞ্জালমুক্ত। এই জঞ্জালের ভেতর নবজাতকের বেঁচে থাকা কতখানি দুস্কর তা হয়তো কবির মনে একটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল। সময়ের স্রোতে কবি আজ আমাদের মাঝে নেই। কবির চিন্তা বা উদ্বেগ আজ যেন বার বার ফিরে আসছে প্রতীয়মান হয়ে। আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে একটা পরিবারতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখানে বাবা,মা,ভাই,বোন সকলে একটা সৌহার্দ্যের বন্ধনে থাকে।

জন্মের পর মানব শিশুর যে আত্মা তা অনেকটা অবচেতন কেননা তখন তার কোন অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে তাড়িত করতে পারে না। একটা সময় অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করতে করতে যোদ্ধায় পরিণত হয়। প্রতিটা শিশুর অন্তরে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের কোন এক মূর্তমান চরিত্র। এই চরিত্রের গঠন ও লালন পালনের জন্য যাবতীয় কিছু করতে হয় শিশুর পাশাপাশি পরিবারের অন্য সকলকে। একটা শিশুর মানবাত্মা কাঁচা মাটির পিন্ডের মতো,শিল্পী কাঁচা মাটির পিন্ডকে লক্ষ্য করে তার মনের যে স্বীয় চিন্তা তার প্রতিফলন ঘটায়।

তেমনি সমাজে বসবাসরত মানুষের আচরণ আর ভালবাসা একজন শিশুর মনে একটা শক্ত বুঁনিয়াদ গড়ে তোলে।

মানব জীবনের প্রতিটা স্তরের গুরত্ব রয়েছে তবে শিশুকাল বা জীবনের প্রথম স্তরই যেন সবচেয়ে গুরুত্ববহ। এই সময়ে শিশু সবচেয়ে বেশি মানসিক বা চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে বেঁড়ে উঠে। তাই একজন সচেতন বাবা মায়ের স্থানে অধিষ্ঠিত হয়ে আমরা কি এই দায়িত্ব থেকে সরে আসছি ? এই বিষয় নিয়ে ভাবা উচিত।

সমাজ বিজ্ঞানের আলোচনায় বলা আছে পরিবারের মাঝে  এমনকি বাবা মায়ের গন্ডির মধ্যে শিশুর জন্য একটা নিরাপদ বলয় থাকা উচিত। যেখানটায় শিশুর সার্বিক বিকাশে কোন বাধা আসবে না। আমাদের দেশে একান্নবর্তী পরিবারের প্রথা ভেঙ্গে ক্ষুদ্র পরিবার প্রথা গড়ে উঠছে। যেখানে শিশুর জন্য অপেক্ষা করে বহুমাত্রিক সমস্যা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তার সাথে অনেকাংশে কোন সহায়ক কেউ থাকে না। সমাজ বা পরিবারের ক্ষেত্রে উদ্ভুত পরিস্থিতির আলোকে এইসব সমস্যার সুষ্ঠু বিহিত করা জরুরী।

আমরা আধুনিকতার মোড়কে একটা পিছিয়ে পড়া সমাজব্যবস্থায় আছি। এখানে সামাজিক সুরক্ষা আইনগুলো খুবই দুর্বল। যা প্রচলিত আছে তার কোন সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই বললে চলে। সমাজে বেড়ে উঠতে গিয়ে একটা শিশু নানানভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এই সব পরিস্থিতি আমরা যেমন সৃষ্টি করি তেমনি এসবের প্রতিকারও আমাদের হাতে। এখন সময়ের দাবী আমরা কতটা সোচ্চার এই বিষয়াদি নিয়ে। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন নানাভাবে শিশুদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যেমন আছে তেমনি অবহেলিত কাজেও আছে। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের তদারকি যেমন নাই তেমনি পাশাপাশি রয়েছে উদাসীনতা।

আমাদের দেশে এখনো অনেক শিশু রয়েছে যারা শিশুসুলভ চরিত্রের গন্ডি হতে বের না হতেই তাদের নিয়োগ করা হয়  গৃহপারিচারিকার কাজে। শহরের উঁচু সু-সজ্জিত দালানের ভেতর এই রুপটা খুবই নিকৃষ্ট বলা যায়। আমি নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি।

আমি টিউশনির সূত্রে এক বড়লোকের বাড়িতে পড়াতে যেতাম। আমার স্টুডেন্টের বয়সী একটা কাজের মেয়ে তাদের বাসায় কাজ করে। একদিন দেখি কাজের মেয়েটিকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে। চোখের সামনে মেয়েটিকে বারকয়েক মারতে বা খারাপ ব্যবহার করতে দেখে নিজে বেশ অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম।

কলকারখানাগুলোতে দীর্ঘসময়ে কাজের বিনিময়ে যৎসামান্য মজুরি বা নানানভাবে নির্যাতন যা কিনা একটা সভ্য সমাজে শিশুর জন্য বরাদ্দ হতে পারে না। শিশুর মৌলিক অধিকারের কতখানি আমাদের সমাজ দিতে পারছে তা দৃশ্যমান বটে।

সম্প্রতি আমাদের দেশে শিশুদের উপর বিদ্বেষটা যেন বেড়ে গেছে। বিগত কয়েকবছরে শিশুর প্রতি বিদ্বেষ যে হারে বেড়েছে তা সমাজবিশারদরা একটা সামাজিক উৎকন্ঠা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকাশহরসহ সারাদেশে পরকীয়ার জেরে,সম্পত্তির বিদ্বেষ বা স্বার্থের জন্য এখন শিশুকে হাতিয়ার করছে। কোন তুচছ ঘটনার জেরে যেমন শিশুকে আছাড় মেরে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে। তেমনি শিক্ষিত পরিবারের স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার জেরে অবুঝ শিশুকে বেগোড়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে।

কখনো কখনো অবহেলা বা নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতার ছলে দিনে দুপুরে শিশুকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। যেখানে দিনের আলোয় একজন শিশুকে মেরে তার ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ সাইটে আপলোড করেও এইসব ঘৃণ্য অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এটা আইনের নিছক দুর্বলতা বলে দায় এড়ানো কোনভাবে সম্ভব নয়। একটা পোশাক কারখানায় কর্মরত শিশুকে শাস্তির নাম করে পায়ুপথে বায়ু প্রবেশ করিয়ে খুনের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। হিংস্র বা কুৎসিত মানসিকতার কিছু অধিকারী লোক যারা কিনা এইসব উগ্রতা অনেকটা খেলাছলে ঘটিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যৌন নির্যাতনের মতো  কু-লিপ্সা মেটানোর জন্য হিংস্র জানোয়াররুপী মানুষগুলো শিশুদের ছাড় দিচ্ছে না। ষাটোর্ধ্ব বয়সী লোকের লিপ্সার শিকারে পরিণত হচ্ছে পাঁচ বছরের বয়সী কোন মেয়ে শিশু। নারী পাচারের মতো ঘটনা যেখানে অহরহ ঘটছে যার ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই নারী শিশু। এটা সামাজিক অন্যায্যতার প্রতিপাদন বটে। আমাদের দেশে নারী শিশুরা এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার আড়ালে আবডালে একটা অদৃশ্য কালো থাবার ছত্রছায়ায় পড়ে আছে। যেখানে প্রতিমুহুর্তে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে নানা উৎকন্ঠা আর উদ্বেগ। তাদের বেড়ে উঠার স্বাভাবিক সুস্থ পথটা আমরা প্রতিবন্ধকতায় ভরিয়ে রেখেছি।

প্রতিটা পরিবার আর সমাজের শৃঙ্খলে একটা বিব্রতকর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সর্বাগ্রে দায়ী বাবা-মা এবং পরিবারের কর্তারা। এখন পারিপার্শ্বিকতায় আমরা নিজেদের স্বার্থকে জড়িয়ে কোমলমতি শিশুকে যেমন রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করে আসছি,তেমনি যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ন্যাক্কারজনক ঘটনাও কম ঘটছে না। ইদানীংকালে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার প্রেক্ষাপটে রোষানলের শিকার ও বেঁচে যাওয়া সকল শিশুর প্রতি রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকরা কোন সুবিচার করতে পারছে না। কোন ঘটনার উল্লেখযোগ্য শাস্তির বিধান করতে না পারায় রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নেপথ্যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্তরালে কেবল পরিবারই যেখানে নিরাপদ একটা বলয় দিতে পারে সন্তানকে। সেখানে আমাদের উদাসীনতা আর অবহেলার কারণে পরিবারের মতো সুরক্ষিত স্থানটা আজ কোন না কোনভাবে শিশুদের জন্য বিপদসংকুল একটা স্থান হিসেবে চিহ্নিত।

আজকের শিশুর মধ্যে ভবিষ্যতের ধারকের অস্তিত্ব নিহিত। আগামীতে সুন্দর একটা সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্য এগিয়ে চলার জন্য আমাদের উচিত গঠনমূলক কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

যেখানে সুন্দর আগামীর পথচলায় প্রতিটা মানবশিশু দাঁপিয়ে বেড়াবে। এমন সুন্দর পথচলা কেবলই নিশ্চিত করতে পারি আমরা। এই পথচলার দ্বার তৈরিতে আসুন আমরা একটা পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যায়।

দি জোয়ান অব্ আর্ক — প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

Now Reading
দি জোয়ান অব্ আর্ক — প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

মানব সভ্যতার ইতিহাস ক্রম পরিবর্তনের ইতিহাস।সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে বারবার। এ আন্দোলনে অর্জন যেমন হয়েছে তেমনি ব্যর্থতা ও কম নয় ।এসব সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নারীও অংশগ্রহণ করেছিল।

মুক্তি সংগ্রাম শব্দটি ব্যপক অর্থবহ।এক্ষেত্রে মুক্তি সংগ্রাম বলতে আমরা বুঝে নেব বিভিন্নভাবে বন্দীদশা থেকে নারীর মুক্তির সংগ্রাম।পারিবারিক,সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী বঞ্চিত হয়েছে।তাই নারীকেও তার ন্যায্য প্রাপ্তির জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল।অনেক মহীয়সী নারীর বীরত্ব ও মহত্ব গাঁথায় আমাদের ইতিহাস উজ্বল হয়ে আছে।সময় এসেছে আজ অতীতের গৌরবের দিকে ফিরে দেখার।আজকের নারী যেন অতীতের মহিমাময় পটভূমিতে নিজেদের আলোকিত ও জাগ্রত করে তুলতে পারেন।দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন বীরাঙ্গনা অনেক মহীয়সী নারী,তাদের মধ্যে যে মহীয়সী নারী ঐকন্তিক দৃঢ়তায় সংকল্পবদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তিনি চট্টল গৌরব প্রীতিলতা। এই বীরচট্টলা কালের প্রেক্ষিতে সময়ের সাহসী সূর্য্ সন্তানদের বুকে ধারণ করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল হতে মুক্তির ইতিহাসে যাঁর নাম চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।তাঁর এ আত্মাহুতি আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণে প্রেরণা জুগিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করছে বর্তমান নারীদেরকেও।

প্রীতিলতার সাহসী কর্মকান্ডের জন্য তাঁকে উপমহাদেশীয় জোয়ান অব্ আর্ক নামে ভূষিত করেন।

জন্ম ও পরিচয়ঃ

প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে।চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে।এখানে জন্ম হয়েছে অসংখ্য বিপ্লবীর।ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গ্রাম ছিল বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি।প্রীতিলতার বাবার নাম জগদ্বন্ধু ওয়াদেদ্দার তিনি একজন তৎকারীন সিটি কর্পোরেশনের চাকুরীজীবি ছিলেন।মায়ের নাম ছিল প্রতিভাদেবী ,তিনি গৃহিণী ছিলেন।

শিক্ষাজীবনঃ

প্রীতিলতার শিক্ষাজীবনের সুত্রপাত হয় তৎকালীন সময়ের স্বনামধন্য নারী শিক্ষালয় ড: খাস্তগীর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে।লেখাপড়ায় তিনি মেধাবী ছিলেন তারই স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ করেন।১৯২৮ সালে কৃতিত্বের সাথে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করে বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে।১৯২৯ সালে ঢাকা ইডেন কলেজ থেকে আই.এ তে মেয়েদের মধ্যে ১ম স্থান লাভ করে বিশ টাকা বৃত্তি পান।ভর্তি হলেন কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিষয়ে অর্নাস নিয়ে।প্রীতিলতা বি.এ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ডিস্টিংশন নিয়ে বি.এ পাশ করেন।

বিপ্লবী ও কর্মজীবনঃ

চট্টগ্রামে ফিরে এসে প্রীতিলতা নন্দনকানন স্কুলে(বর্তমান অপর্ণাচরণ স্কুল) এ প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন।

প্রীতিলতার স্বাধীনতাকামী মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়ার সুত্রপাত হই তার আত্মীয় সম্পর্কের এক ভাইয়ের মাধ্যমে,পরে এই বিষয়টা আরো ত্বরাণিত হয় দীপালী সংঘের সংস্পর্শে গিয়ে।তাঁর ব্যাক্তি জীবনে একজন আর্দশ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিলেন  “উষা দি “ যার সাথে কলেজে পড়ার সময়ে পরিচয় হয়।

তখন বিপ্লবীদের একমাত্র লক্ষ্য ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা।মাস্টার‘দা তখন বলেছিলেন — মেয়েদের ছাড়া কোন বিপ্লবের কথা ভাবা যায় না।শত্রুর সাথে লড়াই কঠিন-অনেক রক্তপাত,অস্ত্র সংঘর্ষ এ সবে মেয়েরা আপাততঃ যোগ দেবে না।তবে আগামিতে পারবে।সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বদেশের স্বাধীনতা সুদুরপরাহত সেই আর্দশকে বুকে নিয়ে প্রীতিলতা কলেজে মাস্টারদার নির্দেশে এক বিপ্লবী চক্র গড়ে তুলেন।প্রীতিলতা ও অন্য মেয়েরা বোমার খোল এনে চট্টগ্রামে বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিতেন।এটা ছিল তাদের সাংগঠনিক কাজের একটা অংশ।

একটা সময় প্রীতিলতা লক্ষ্য করলেন যে বিপ্লবীরা ধর্মভীরু,দলের প্রতি নিষ্ঠা,আনুগত্য,বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুশাসনেই গঠিত।বাবা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ধর্মশিক্ষা তাকে দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে আত্মদানকে পবিত্র কর্তব্য বলে ভাবতে শিখিয়েছে।দর্শনের ছাত্রী – যুক্তি ও চিন্তার ব্যাপকতা তাঁর মধ্যে প্রোথিত।

১৯৩০ সাল।

প্রীতিলতা ছাত্রীনিবাসে বসে জানতে পারলেন যে চট্টগ্রামে বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার লুন্ঠন,টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন অফিস ধ্বংস ও রির্জাভ পুলিশ লাইন অধিকার করে।এই ঘটনার পর তার মধ্যে আরো উন্মাদনা জাগে বিপ্লবীকাজে সক্রিয় হতে।পরে মাস্টারদার নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ আসল আর দলের প্রয়োজনে কল্পনা দত্তের সাথে তিনি তৈরি করলেন বোমা তৈরীর সরঞ্জাম আর গান কটন।এই কাজে আর্থিক সহায়তার জন্য তিনি নিজের গহনা দিয়ে এবং বাকিদের কাছ থেকে নিয়ে তহবিল যোগাড়ের  কাজ করেন।এই কাজে তিনি মাস্টারদার কাছ থেকে বেশ প্রশংসা পান।যা তাঁকে আরো অনুপ্রাণিত করে তুলেছিল বলা যায়।দীর্ঘদিন ধরে কল্পনা দত্ত আর প্রীতিলতা প্রত্যক্ষভাবে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার দাবি জানিয়ে আসছিল।অবশেষে বিপ্লবীদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ধলঘাটের এক গোপন আস্তানায় এক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় ।বাড়িটি ছিল সাবিত্রিদেবীর।তবে সেদিন ব্রিটিশ পুলিশের আক্রমণে তারা কোনমতে পালিয়ে বাঁচে আর এই ঘটনায় বিপ্লবী নির্মল সেন আর অপূর্ব সেন নিহত হলেন।

অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ…………

এ সময় প্রীতিলতা আর কল্পনা দত্তের প্রবল আগ্রহের কথা জানতে পেরে মাস্টারদা তাঁদের দুজনকে বিপ্লবীকাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন আর আত্মগোপনে থাকার নির্দেশ দিলেন।

১৯২৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর রাতে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা নেন এবং দায়িত্ব দেন প্রীতিলতাকে।মুহুর্তের মধ্যেই স্থির করে ফেললেন এ আহবানে তিনি সাড়া দেবেনই।জীবনে হয়তঃ মৃত্যুর যবনিকা পড়বে কিন্তু তিনি ভীত নন।

ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাঈ যদি যুদ্ধ করতে পারেন,শত্রুর প্রাণ সংহার করতে পারেন তিনি কেন পারবেন না ? নিশ্চিত মরণ উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংঙ্খল মোচনে দৃঢ় সংকল্প প্রীতিলতা।মনে মনে শপথ নিলেন পাহাড়তলী অভিযানে তাঁকে সফল হতেই হবে।প্রীতিলতা উপস্থিত সেনাপতি হিসেবে আর নির্দিষ্ট সংকেত পাওয়ার পর চার্জ বলার সাথে সঙ্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল।মুহুর্তের মধ্যে বল নাচের পরিবর্তে ক্লাবটি রুপ নিল বিভীষিকাময় স্থানে।কান্না, চিৎকার আর দৌঁড়ঝাপ সবকিছূ মিলে সেদিনের যুদ্ধে প্রায় পঞ্চাশোর্ধ লোক হতাহত হয়।আক্রমণে নেতা সর্বাগ্রে আর প্রত্যবর্তনে নেতা পিছনে এমনই ছিল রণনীতি।সফল অভিযান শেষে সাথীরা মার্চ করে চলে যাচ্ছে।প্রীতিলতা পেছনে।হঠাৎ একটা গুলি এসে লাগল প্রীতিলতার বুকে,প্রবল রক্তক্ষরণ হচ্ছে,মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নিথর দেহ।

ইংরেজ সৈন্যর একটা বেয়নেট এগিয়ে আসতে দেখে তিনি সঙ্গে রাখা পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন অবলীলায়।দেশের জন্য প্রাণ দিলেন চট্টল রাণী প্রীতিলতা।সৃষ্টি করলেন ইতিহাস।সেই যুগের প্রথম নারী বিপ্লবী শহীদ প্রীতিলতা রেখে গেলেন দেশপ্রেমের আর্দশ,চারিত্রিক দৃঢ়তা।

প্রীতিলতার নিজ হাতে লেখা একটা চিঠি তার মরদেহের সাথে পাওয়া যায় যাতে তিনি লিখেছেন নিজ অভিমত —-

প্রীতিলতার এই অন্তিম চিঠিখানি আমাদের আলোকবর্তিকা।প্রীতিলতার শৌর্য্,সাহস,অম্লান আর্দশনিষ্ঠা আমাদের কাছে এক অমূল্য দৃষ্টান্ত যা আমাদের অন্ধকারে বিদিশিার দিশা হয়ে থাকল।

আজ ভারতবর্ষ নেই,ব্রিটিশ শাসন নেই। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ যেখানে শত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করা স্বাধীনতার ফলটুকু আত্মসাৎ করছে কিছু মানুষ।ভোগবাদী ব্যবস্থার মূলোৎপাটন আর সামাজিক বিপ্লবের নিমিত্তে দরকার আরো একটা প্রচেষ্টার যেমনটা চেয়েছিল প্রীতিলতাসহ অন্য বিপ্লবীরা।

আজ নারীরা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে ঘরে বাইরে।ইতিহাসের বীরসেনানী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হয়তো আজও কোন সংগ্রামী নারীর চিত্তে সদাজাগ্রত আর বলীয়ান হয়ে নারীসত্তাকে করছে বিকশিত আর নারীশক্তির আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে চলছে নিরন্তর।

এই মহীয়সী নারীর জন্য নিরন্তর ভালবাসা আর আকুন্ঠ শ্রদ্ধা রইল ।

অস্তিত্বে মাতৃত্বের স্নেহ

Now Reading
অস্তিত্বে মাতৃত্বের স্নেহ

এখনো আমাদের স্মৃতিতে মা দিবসের স্মৃতি ভাস্বর কেননা বিশ্বজুড়ে সকল মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় পালিত হয়েছে এই দিবসটি।আপনি আমি নিতান্তই সৌভাগ্যবান কেননা আমাদের অস্তিত্ব আমরা একটা পরিবারতন্ত্রের মধ্যে পেয়েছি।এই পরিবারের নানান লোকের ভীড়ে পেয়েছি এক পরম আরাধ্য নির্ভরতার স্থান আর ভালবাসার বিমূর্ত প্রতীক তিনি হলেন মা।এই মা নিছক কোন শব্দের আলোকে বর্ণনা করার মতন নয় কেননা এই যেন সন্তানের জন্য আত্মার আত্মীয়।

এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে টিকে থাকতে আমরা প্রতিনিয়ত নানা চলছাতুরী করে জিতে যাওয়ার চেষ্টাই করি,একটা জায়গায় বরাবরের মতো আমরা সমপর্ণ করতে রাজি তা হল সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা।এখানে মা কেবল নিঃস্বার্থভাবে সন্তানকে ভালবেসে যায় প্রতিদানে প্রত্যাশায় শুধু সন্তানের কল্যাণই কামনা করে।

মমতাময়ী মায়েদের সম্মান প্রর্দশনের জন্য মে মাসের ২য় রবিবারকে স্বীকৃত করে নেয়া হয়েছে যেখানে এই আলাদা দিনটি শুধু মায়েদের জন্য।আমরা অধিকাংশ জায়গায় পশ্চিমা বা ইউরোপের সংস্কৃতির একটা ছায়াতলে থেকে নিজের সভ্যতাকে বিকশিত করে যাচ্ছি।এই অঞ্চলে সভ্যতা বিকশিত হয়ে আলোয় পরিস্ফুট হতে বেশ সময় লেগেছে বলা যায়।মায়ের প্রতি সম্মানের যে সংস্কৃতি তা অণুকরণীয় হলেও আপনি একটি জায়গায় খুব ভাগ্যবান কেননা আপনি দীর্ঘসময় পরিবার প্রথার কারণে মায়ের আঁচলের ছোঁয়া পেয়ে যাবেন।পাশ্চাত্যের পরিবার প্রথা অনেকটা উন্মুক্ত কেননা এখানে কিশোর বয়সের গন্ডি পেরিয়ে আপনি চাইলে স্বাধীন জীবনাচার করতে পারবেন।

আমরা সমাজ গঠনের প্রথমদিক হতে একটা বিষয় শিখে আসছি একত্রে থাকার বিষয়টা একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে সভ্যতার বহুবিধ কল্যাণকর ছোঁয়া এখনো আমাদের পরিবার প্রথায় অতটা ভাঙ্গন ধরাতে পারে নাই।এটাতে ভাঙ্গনের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরী কেননা আপনি যদি এই সম্পর্ক হতে ক্রমান্বয়ে দূরে চলে যান আসলে আপনি আত্মার সম্পর্ককে ভুলতে বসবেন।

আমাদের এই সময়ের তরুণের কাছে উপজীব্য অনেক ইতিহাস আছে যেখানে মা আর ছেলের ভালবাসার নিরেট কাহিনী বর্ণিত আছে যা কিনা আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জোগায়।হযরত আবদুল কাদের জিলানীর মায়ের প্রতি আনুগত্যের যে বিরল নির্দশন তা অবশ্য অণুকরণীয়।

সময় ও কালের বহমান স্রোতধারা আমাদের নিয়ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা আর ঘটনার সম্মুখীন করে যাচ্ছে।

আমরা মায়ের মমতাময়ী রুপ দেখতে দেখতে অভ্যস্থ ইদানীং আমরা ঐ একই মায়ের বিধ্বংসী কোন রুপ দেখে হতবাক হই।সামাজিক অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হওয়া সম্প্রতি কিছু ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। দশমাস গর্ভে ধারণ করে যেখানে সমস্ত প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করে কোন মা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখায়।সেই একই মা কি তুচ্ছ বা কোন সামান্য বিষয়ে সন্তানকে খুন করতে পারে।

বাস্তবতার মিশেলে এই প্রতিদ্বন্ধিতাপূর্ণ জগত কি প্রতিযোগিতায় মত্ত রেখে আমাদের মনের কোমল সত্তাকে নিয়ত কঠোর করে তুলছে।এই কঠোরতা বা নিষ্ঠুরতার যে নমুনা তা বন্ধে কি করণীয় বা সমাধানকল্পে দীর্ঘমেয়াদী কোন পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

কবিকন্ঠে নবজাতকের জন্য এই পৃথিবী বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে যে উদাত্ত আহবান তা যেন বাস্তবায়িত হয় আমরা অবুঝ এই নবজাতকের জন্য তার মায়ের কোলকে যেন নিরাপদ করে গড়ে তুলতে পারি।সম্প্রতি একুশ নামের এক নবজাতকের জন্য নিঃসন্তান গুটিকয়েক দম্পত্তি আইন আদালতে যেতে পিছপা হননি। সে সকল নিঃসন্তান দম্পত্তির জন্য অনুশোচনা কেননা নবজাতকটি অসুস্থতার কারণে মারা যায়।সেই সকল মায়েরা যারা কিনা একটা সন্তানের অধিকার লাভের জন্য কত দৌড়ঝাপ করেছেন তাদের সেই স্পৃহা দেখে বোঝা যায় একজন নারীর জন্য মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ কতটা আরাধ্য।

আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি যেখানে সময়ের প্রেক্ষিতে দর্পণে আপনি আপনার এবং আশেপাশের সবার সোজা এবং উল্টো দিক দুটো অবলোকন করতে পারবেন।

উন্নয়নের এই জোয়ারে সুরম্য প্রসাদের ভীড়ে এই নগর জীবনে গড়ে উঠেছে কিছু ভিন্নমাত্রার আবাসস্থল যেখানে আমরা দেখি সন্তানের ভালবাসা হতে বঞ্চিত হয়ে অনেক মা তাদের দিন নীরবে কাটিয়ে দিচ্ছে।যেই মা কোন সন্তানকে দশমাস সময় ধরে গর্ভধারণ করে জন্মদান করে সেই সন্তানেরা এখন মায়ের সাথে দেখা করার জন্য  মাসের একটা দিন বের করে আসে।অনেকাংশে ব্যস্ততা তা করার অবকাশ দেয় না ,এটা কি আসলে অবকাশ নাকি সদিচ্ছার অভাব তা বোঝা মুশকিল।

বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত মায়েরা সবসময় স্মৃতিকাতর থাকেন তাদের স্মৃতিতে সর্বদা ঘুরপাক খায় সন্তানের সাথে কাটানো মধুর সময়গুলো।আপনি যদি কোন সন্তান মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এমন মায়ের চেহারা দেখেন বা তার সাথে আলাপন করতে যান অধিকাংশ সময় তিনি আপনার সাথে সন্তানের বিষয়ে সুখস্মৃতি নিয়ে আলাপন করবে।

আমাদের সমাজে নারী পুরুষের ভীড়ে কিছু অনন্য প্রকৃতির মানুষ আছে যাদের মুল্যবোধ আপনার কাছে ঠুনকো মনে হবে আপনি যদি মনযোগি হন তবে অবশ্যই বুঝতে পারবেন তাদের মনে সন্তানের প্রতি ভালবাসার গভীরতা কতখানি।

এই প্রতিকূল সমাজব্যবস্থায় সংসারে যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় ঠিকে থাকা দুস্কর সেখানে এইসকল সিঙ্গেল মায়েরা তাদের সন্তানের আগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে সুরক্ষাকবচ হিসেবে বুকে আগলে রাখে।সমাজ হয়তো তাঁকে (মাকে) কটাক্ষ করে তবে তিনি তো সন্তানের কাছে মহীয়সী।

এই মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি আকুন্ঠ শ্রদ্ধাপোষণ করছি।

এই নগরের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাক নিষ্প্রাণ আর মলিন বৃদ্ধাশ্রমের সকল বর্ণচোরা দালানগুলো হারিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা রইল।

আমি,আপনি আপনারা মিলে যদি ইতিবাচক পদক্ষেপ ফেলতে ফেলতে অগ্রসর হই তবে কোন পিছুটান আমাদের কলুষিত করতে পারবে না।

সকল সন্তানের ভালবাসার স্নেহডোরে মায়েরা থাকুক সুরক্ষিত।