সিয়াম _ সাধনা

Now Reading
সিয়াম _ সাধনা

C-cSPieXcAULBy-.jpgদরজা খুলতেই রিমি দেখলো তার কাজের বুয়া দাঁড়িয়ে আছে, সাথেই বুয়ার ৫ বছরের মেয়েটিও। বুয়ার দিকে তাকিয়ে রিমি তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো, “কয়টা বাজে বুয়া? তোমাকে না বলেছিলাম রোজার মাসে অন্তত সকাল সকাল আসবে?

বুয়া কিছু একটা বলতে যাবে, এর আগেই রিমি বুয়ার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওকে আবার সাথে করে কেন এনেছো? তোমাকে তো বলেছিলাম ই বাচ্চা কাচ্চা সাথে করে নিয়ে আসতে পারবে না। আবার আজ ওকে নিয়ে এলে??””

রিমির কথা শুনে বুয়া কাচুমাচু করে উত্তর দিল, “আফা, মাইয়াটার রাইত থাইকা অনেক জ্বর। রাইখা আসতে নিছিলাম, কান্দন শুরু করছে, হের লাইগা লগে নিয়া আইছি। কিচ্ছু করব না, আমার লগেই বইয়া থাকব, দেইহেন।”

রিমি আর কোন কথা বলেনা। তার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে।

নিজের ঘরে ঢুকতেই সে দেখল, মেহরাব জুতা পরে রেডি। অফিসে যাবার জন্যে। রিমিকে দেখেই মেহরাব বলল, “রোজ ই কি তোমার বুয়ার সাথে চেঁচামেচি করা লাগে?”

— “আমি রোজ চেঁচামেচি করি? বুয়ার সাথে?”
— “না, বলছিলাম রোজার দিন তো।”

— “তুমি ভাল করেই জানো মিশুর সমস্যা। ও যা দেখে তাই ই শিখে। ১০০ টা প্রশ্ন করে। আমি চাইনা বুয়ার বাচ্চাকাচ্চার থেকে আমার ছেলে খারাপ কিছু শিখুক।”

— “মিশুর বয়স মাত্র ৭ বছর, ও এখন যা দেখবে তাই ই শিখবে এটাই স্বাভাবিক। আমি বলতে চেয়েছিলাম, রোজার দিন এত চেঁচামেচি করা ঠিক না”!

— “শোনো মিশুর বাবা, তুমি আমার সংসারের ব্যাপারে কথা বলতে এসো না। যাও অফিসে যাও। আর প্লিজ ইফতারের আগে বাসায় আসবে। ”

মেহরাব আর কোন কথা বলেনা। সে অফিসের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

দৃশ্য– ৩

টেবিলে মিশু বসে খাচ্ছিলো। তার পাশেই নিচে একটা গ্লাস ভেংগে পড়ে আছে। রিমি এসেই বলল, ” এটা তুমি ভেংগেছো, বাবা?”

মিশু কোনো উত্তর দিল না। খাওয়া বন্ধ করে ভাংগা গ্লাস টার দিকে তাকিয়ে রইলো। রিমি বুয়াকে জোরে জোরে ডাকতে লাগল। বুয়া আসতেই বলল, কাঁচের টুকরা গুলি পরিষ্কার করতে। বুয়ার পেছন পেছন ছুটে আসে বুয়ার মেয়েটিও। সে মিশু আর মিশুর খাবারের প্লেটের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রিমি মেয়েটিকে বলে উঠে, “এই মেয়ে, ওইদিকে কি দেখিস? যা, রান্নাঘরে যা।”

মেয়েটি একটু দূরে সরে যায় কিন্তু যায় না।

রিমি ছেলেকে আর ছেলের খাবারের প্লেটটি নিয়ে নিজের ঘরে যেতে থাকে আর একা একা ই বলতে থাকে, এইসব কারনেই বাচ্চা কাচ্চা আনা আমার একদম পছন্দ না!!

দৃশ্য — ৪

মেহরাব জ্যামে বসে আছে। জ্যাম দেখে তার মনে হচ্ছে ইফতারের আগে সে আজ আর বাসায় ফিরতেই পারবেনা। হঠাত এক রিক্সা এসে মেহরাবের গাড়িতে ধাক্কা দিল। জানালার কাঁচ খুলে মেহরাব দেখল, রিক্সার ধাক্কা লেগে গাড়ির কিছু জায়গায় স্ক্রেচ পড়ে গেছে। তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।

গাড়ি থেকে নেমেই সে মধ্যবয়সী রিক্সাওয়ালার গালে চড় বসিয়ে বলল, “তোর বাপের রাস্তা? দেখে রিক্সা চালাতে পারিস না?””

লোকজন জমা হয়ে গেল। রিক্সাওয়ালাও পালটা জবাব দিতে লাগল। লোকজনের কথামতো মেহরাব আর কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল।

বাসায় ফিরেই সে দেখল, রিমি একটা হিন্দী সিরিয়াল দেখছে।

সে রিমিকে বলে উঠল, “সারাদিন ই তোমার সিরিয়াল দেখা লাগে? রোজার দিন তো একটু সংযত থাকতে পারো?”
— “কি হয়েছে তোমার? এত রেগে আছো কেন?” রিমি আস্তে করে বলল।

— “আর বলো না, এক হারামজাদা রিক্সাওওয়ালা গাড়িতে স্ক্রেচ ফেলে দিছে। ”
— “বলো কি? তারপর?”

— “তারপর আর কি? দিলাম শালাকে কষে একটা চড়”!!
–” আচ্ছা, তুমি মাথা খারাপ করো না। আমি ইফতার রেডি করছি। ফ্রেশ হয়ে টেবিলে আসো।
শেষ দৃশ্য

মাগরিব এর আজান হচ্ছে। খাবার টেবিলে সবাই বসে ইফতার করছে।

মিশু তার মামা রাতুলকে প্রশ্ন করে উঠলো, “মামা, রোজা কি?”
— “রোজা মানে হচ্ছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়ে থাকা।” রাতুল খেতে খেতে বলল।

মেহরাব বলে ঊঠিল, “বাবা, রোজা মানে হল, সিয়াম। সিয়াম মানে হল বিরত থাকা। সকল খারাপ কাজ আর খাওয়াদাওয়া থেকে বিরত থাকা ই হল সিয়াম।”

–” আমরা রোজা কেন থাকি বাবা”? মিশু প্রশ্ন করল।
–” গরীব মানুষরা খেতে পায় না। কষ্টে থাকে। তাদের কষ্ট বুঝার জন্যেই আমরা রোজা থাকি।” মেহরাব উত্তর দিল।

কিছুক্ষন চুপ থেকে মিশু একটা আলুর চপ মুখে দিয়ে বলল, ” বাবা, তুমি মা আর মামা তো রোজা ছিলে আজ। তোমরা কি বুঝেছো গরীব মানুষের কষ্ট”??

মেহরাব রিমির মুখের দিকে তাকালো। রিমি মাথা নিচু করে রইলো।

মিশু আবার বলতে লাগল, ” মামা তুমি তো সারাদিন ঘুমিয়েই ছিলে। ঘুম থেকে উঠে ফোন টেপাটেপি করলে, তুমি বুঝেছো গরীব মানুষের কষ্ট?”
রাতুল ও লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলো।

আসলেই তো, রোজা মানে কি শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি না খেয়ে থাকা?

ঘটনা গুলি তো এমন ও হতে পারত, বুয়াকে দেখে রিমি বলতে পারত, “আজ, তোমার কাজ করতে হবেনা। মেয়েকে নিয়ে বাসায় থাকো।”
কিংবা, রাতুল ঘুম থেকে উঠেই মসজিদে চলে যেতো, নামাজ আদায় করতে।
অথবা, মেহরাব রিক্সাওয়ালাকে চড় না দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বুঝিয়েই বলতে পারত।

যেদিন আমরা সকলেই আরো সহনশীল আরো সংযমী হতে পারবো, সেইদিন ই পুরিপুর্নতা পাবে, আমাদের সিয়াম সাধনা।