একটি বেল গাছের কাহিনী

Now Reading
একটি বেল গাছের কাহিনী

বেলতলা নামে এক গ্রামের ঘটনা।সেই গ্রামের একবারে পূর্ব পাশে একটা ঘর নিয়ে থাকতো রহিমা বিবি। তার স্বামী মারা গেছে। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাজ করে যেই টাকা পেতো তা দিয়েই দিন কেটে যেতো। ছোট একটা মেয়ে ছিল রহিমার। বয়স ১১ বছর।

সেই মেয়েকে নিয়েই গ্রামের একদম শেষ মাথার একটি ঘরে থাকতো রহিমা। কষ্ট করে মা-মেয়ে দুইজনের দিন কেটে যেত।যাই হোক, ঠিক তাদের বাড়ির পাশেই একটা বিরাট আকারের বেল গাছ ছিল। সেই বেল গাছ নিয়ে গ্রামে নানাধরণের কথা প্রচলিত ছিল। মাঝে মাঝেই নাকি সেই গাছের নিচে একটা লোককে বসে থাকতে দেখা যেতো। লোকটিকে যখনই দেখা যেতো তখনই নাকি দূরে কোথাও কুকুরের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেতো। তবে রহিমা আর তার মেয়ের কাছে এটা কোন নতুন ঘটনা নয়।রহিমার মেয়ে প্রায়ই বেল গাছের নিচে বসে থাকা লোকটিকে দেখতো আর রহিমাকে প্রশ্ন করতো “এই লোকটি কে”? রহিমা তখন বলতো জানালা বন্ধ করে দেও।মার্চ মাসের কোনও এক রবিবারে শহর থেকে নিজেদের দোকানের জন্য কেনাকাটা করে ফিরছিল একদল গ্রাম্য দোকানদার। সংখ্যায় তারা ১২-১৫ জনের মতো ছিলেন। রাত তখন ১১ টার মতো হবে। রহিমাদের বাসার সন্নিকটে আসতেই তারা দেখতে পেলেন,সেই গাছের নিচে লোকটি বসে আছে এবং লোকটিকে ঘিরে আছে একদল মানুষ আকৃতির ছায়ামূর্তি। প্রতিটা ছায়ামূর্তি আঁকারে যেকোনো

মানুষের প্রায় দ্বিগুণ। তারা সবাই দেখে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। মিনিট খানেক পরে একসময় ছায়ামূর্তিগুলো ভাসতে ভাসতে সেই গাছের উপরে
উঠে মিলিয়ে যায় এবং এর খানিকপর গাছের নিচে বসে থাকা লোকটিকে আর দেখা যায় না। ঠিক সে সময় তাদের চমকে দিয়ে রহিমার ঘর থেকে ভয়ঙ্কর আর্তনাদের আওয়াজ ভেসে আসে। তারা প্রত্যেকেই ভয় পেয়ে যায় এবং দ্রুত সেই স্থান ত্যাগ করে। পরের দিন সকালে স্থানীয় কিছু মানুষ হাতে লাঠি নিয়ে সেই ঘরের দিকে গেলে ঘরের মেঝেতে রহিমা এবং তার মেয়ের মাথাবিহীন লাশ খুঁজে পায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাদের মাথাগুলো পাওয়া যায় সেই গাছের মগডালে। ঠিক যেখানে গ্রাম্য দোকানদাররা আগের রাতে ঐসব ছায়ামূর্তিগুলোকে কে হারিয়ে যেতে দেখেছিল।আর তার চেয়েও ভূতুরে ব্যাপার হলো গাছটির শিকড়ের নিচে মাটি খুরে অনেকগুলো মাথার খুলি পাওয়া যায়।যা গ্রামবাসীদের ভয় আরো বাড়িয়ে দেয়। পুলিশ বাবু এসে সবার কাছে রহিমার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।সেই গ্রাম্য দোকানদারদের কথায় তিনি কোন কান ই দিলেন না।তিনি এটাকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলেন।তিনি সকল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে পুলিশস্টেশনের দিকে রওনা হন। সেই ঘরটিতে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং সবাইকে জানিয়ে দেন যে বেল গাছটির আশেপাশে কাউকে দেখা গেলেই যাতে পুলিশস্টেশনে জানায়।এইদিকে গ্রামেরবাসীদের মাঝে নানাধরনের কথা শুরু হয়।কেউ বলে “আমি আগে থেকেই জানতাম এমন কিছুই হবে,ভূতের সাথে কি আর মানুষ থাকতে পারে!”আবার কেউ বলে এই বেল গাছটার কারণেই সব হচ্ছে,এবার এটা কেটে ফেলতে হবে”।যাইহোক,পুলিশবাবু এইসব কথায় বিশ্বাস করেন না।তিনি তার ইনভেস্টিগেশনে ব্যস্ত।তার কাছে এটা নিতান্তই একটা হত্যা মাত্র।পরের দিন সকালে যখন তিনি আবার গ্রামে যান তখন শুনতে পান যে কাল রাতেও নাকি বেল গাছের নিচে লোকটিকে দেখা গেছে।কিন্তু গ্রামবাসীরা ভয়ে ঘর থেকে বের হয়নি।একজন বৃদ্ধা মহিলা পুলিশবাবুর কাছে এসে বলে যে সে নাকি জানে কে এই হত্যা করেছে।পুলিশবাবু বৃদ্ধার সাথে তার ঘরে গেলেন।বৃদ্ধার একটি ছোট্ট ঘর সেইখানেই তার দুঃসম্পর্কের এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন তিনি।তার এক ছেলে আছে।সে গঞ্জে থাকে।প্রতিমাসে সে এসে টাকা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দিয়ে যায়।বৃদ্ধা বললো যে সে তার ছোটবেলায় তার মায়ের কাছে শুনেছে যে ইংরেজরা যখন এই ভারত উপমহাদেশে শাসন করতো তখন একজন লোক তাদের সাথে থাকতো তাদের পথ দেখানোর জন্য।তাদের বলা হতো ইংরেজদের দালাল।তেমনি এই গ্রামেও একজন লোক ছিলেন।তাকে গ্রামের সবাই ঘৃণা করতো।তার কারনে অনেক মানুষের প্রাণ গেছে।যখন ইংরেজরাজত্ব শেষ হয় এবং দেশ ভাগ হয়,তখন গ্রামের লোকজনরা তাকে এবং কিছু ইংরেজ সৈনিকদের এই বেল গাছের নিচে নিয়ে এসে হত্যা করে।তারপর থেকেই নাকি তাদের ভূত এই বেল গাছে আছে।বৃদ্ধা আরো জানান যে,শুধু রহিমা নয় এর আগেও অনেক মানুষ এইভাবে প্রাণ দিয়েছে।পুলিশবাবু বৃদ্ধার কথা শুনে এই কথা বুঝতে পারলেন যে এটা শুধু একটা হত্যাকান্ড নয় বরং অনেকগুলো হত্যাকান্ড এখানে হয়েছে।তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তদন্ত আরো গভীরভাবে করবেন।কিন্তু তার কাছে কোন প্রমাণও যে নেই।কাউকে দোষারোপও করা যাচ্ছে না।কে এই হত্যা করতে পারে এই নিয়েই তিনি অনেক চিন্তিত হয়ে পড়লেন।আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো তিনি জানেন যে এটি একটি হত্যাকান্ড কিন্তু কে এই হত্যাকান্ড করেছে তাকে তিনি সনাক্ত করতে পারছেন না।তার ১০ বছরে এটিই একটু জটিল তদন্ত।যাইহোক,ঘরে ঘরে গিয়ে তিনি তথ্য নিয়ে আবার রওনা হলেন পুলিশস্টেশনের দিকে।পরেরদিন সকালে গ্রামের এক কৃষক পুলিশস্টেশনে এসে পুলিশবাবুকে বললেন যে গতকাল যে বৃদ্ধা তার সাথে কথা বলেছিল সে বৃদ্ধার লাশ বেল গাছের নিচে পাওয়া গেছে।পুলিশবাবু এই কথা শুনে দ্রুত গ্রামের দিকে রওনা হলেন।তিনি গিয়ে দেখেন বেল গাছের নিচে বৃদ্ধার গলাকাটা লাশ।সেই লাশের পাশে বসে বৃদ্ধার সেই দুঃসম্পর্কের মেয়ে কান্নাকাটি করছে।গ্রামের মধ্যে একটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে।এই খবর পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটে আসছে বেল গাছ তলায়।

শহরে হঠাৎ

Now Reading
শহরে হঠাৎ

প্রাঞ্জলের বাবা খুব খুশি। হবেই না কেন? তার ছেলে আজকে হলে উঠবে। প্রাঞ্জল এইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, বিষয় বাংলা। ছেলের এই সাফল্য বাবার চোখে মুখে প্রকাশ পেয়েছে। গর্বে তার বুকটা ফুলে গেছে। একেবারে গ্রামের স্কুল, মফস্বলের একটা কলেজ, এরপর আশেপাশের একটা কোচিং সেন্টারে অনেকটা ডিসকাউন্টে ভর্তি হয়েছিল। সবাই যখন এডমিশন মৌসুমে ঢাকায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, সে তখন পড়ার টেবিলে। প্রাঞ্জল তার বাবার অবস্থার কথা ভেবে কখনও বলেনি ঢাকায় পাঠাতে। তবে সে কখনও ভাবেনি ঢাকায় কোচিং না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যাবে। তার বাবাও ভাবেনি। কারণ তাদের গ্রাম থেকে গত ৭ বছরে কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেনি। সে পেরেছে, তার এলাকায় সে এখন সবার আইকন। নলডাঙা গ্রামের বাচ্চাদের এখন পড়তে বসানো হয় প্রাঞ্জলের উদাহরণ দিয়ে। ‘প্রাঞ্জলের মত হতে হবে, ওর মত ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে।’

-বাবা, সোহেল ভাই অনেক ভাল। তার জন্য আজকে সিট পেয়ে গেলাম।

-হুম, চল খেয়ে আসি। কখন থেকে না খেয়ে আছিস।

-হ্যা, চল।

রুমে সব জিনিসপত্র রেখে তারা ক্যান্টিনে খেতে গেল।

সোহেল তার কলেজের বড় ভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই তাকে মোটামুটি চিনে। রাজনীতিতে সক্রিয়। তার জন্যেই এত তাড়াতাড়ি হলের সিট পেয়ে গেল। শুরুতেই সিট পাওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল প্রাঞ্জলের জন্য।

প্রাঞ্জলের মন খুব খারাপ। বাবা চলে গেছে বাড়িতে। এই প্রথম পরিবার ছেড়ে বাইরে আছে। সবকিছুর সাথে মানায় নেওয়া খুব কঠিন হবে। বিশেষ করে সামনের দিনগুলো কি হবে ভেবেই কুল পায় না। পরশু থেকে ক্লাশ শুরু। যারা চান্স পেয়েছে সবাই কত ভাল স্টুডেন্ট। তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় ভাল করতে পারবে তো? তাকে ভাল করতেই হবে, এলাকার সবাই তার কত সুনাম করে। কোনমতেই সেটাকে ভুলে গেলে চলবে না।

তার রুমমেট গাইবান্ধার এক বড় ভাই। বেশ হাসি-খুশি থাকেন সবসময়। রতন – ডাকনাম। মনে হচ্ছে অনেক ভাল রুমমেটই হবে। তার বাবা যাওয়ার সময় রতন ভাই উনাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি দেখে রাখবেন। এই কারণে প্রাঞ্জলের বাবা বেশ নিশ্চিন্ত মনেই বাড়ি যেতে পেরেছেন।

রতন ভাই গিটার বাজাতে ভালবাসে। কি সুন্দর করে গিটার বাজায়।

-শোন তোমার কিন্তু একটূ সমস্যা হবে। মাঝে মাঝে গিটার প্র্যাক্টিস করি।

-না ভাই, আমি গান শুনতে ভালবাসি। মিউজিকের প্রতি আগ্রহ আছে। তাছাড়া আপনি তো বেশ গিটার বাজান। শুনতে ভালই লাগছে।

শুনে হেসে দিল।

-আজকে টিএসসিতে কনসার্ট আছে। তুমি যাবে?
-আপনার পার্ফরম্যান্স আছে নাকি?
-আরে নাহ, জেমস আসতেছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। যাবা নাকি মিয়া বল।

কখনও এত বড় কনসার্টে যায়নি। মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে গেল।

-আচ্ছা ভাই, আপনি নিয়ে গেলে যেতে পারি।

সোহেল ভাই ফোন করেছিল। কনসার্টে থাকার কারণে ফোন ধরতে পারেনি। ফোনে হঠাৎ দেখল ২ টা মিসকল।

-সোহেল ভাই, সরি – আমি কনসার্ট দেখতে গেছিলাম। বুঝতে পারিনি।

-তাই নাকি? বাহ, তুমি তো পুরাই স্মার্ট হয়ে গেছো। যাই হোক, আমার রুমে এসে দেখা কর।

-অবশ্যই ভাই। কখন আসব বলেন?
পরেরদিন ক্লাশ করে বিকালে সোহেল ভাইয়ের রুমে দেখা করতে গেল।

-আসছ? গুড। বসো এইখানে।

চুপ করে বসল। সোহেল বেশ গম্ভীর মেজাজের ছেলে। সবসময় একটা চড়া গলায় কথা বলে। তবে হলে ওঠার ব্যবস্থা করে দিয়ে যে উপকার করেছেন সেটা তার কাছে অনেক বড় কিছু। তার বাবার সামর্থ্য ছিল না হলের বাইরে কোথাও রাখার। ঢাকায় বাসা ভাড়া, খাওয়া বাবদ যে খরচ সেটা প্রাঞ্জলের বাবার পক্ষে সম্ভব নয়।

-শোন, হলে থাকলেও কিন্তু হাতখরচ লাগবে প্রতি মাসে। কিছু ভেবেছ?

-টিউশনি খুজতেছি। রুমমেট বড় ভাইকে বলেছি। উনি কয়েকটা টিউশনি করান। আমাকে বলেছেন, পেয়ে গেলে জানাবে।

-আচ্ছা।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি উঠে দাড়ালেন। বললেন, চল চা খেয়ে আসি।

রুমে ফিরেছে প্রাঞ্জল। তার মধ্যে একটা চিন্তার রেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

-কি রে!! কিছু হয়েছে?
-ভাই, যদি পড়াশোনার বাইরে কিছু করি, আপনার মত মিউজিক করতে চায়। পলিটিক্স না।

-পলিটিক্সের কথা আসছে কেন? মিউজিক করবি তো ভাল কথা।

-সোহেল ভাই, বলল মাঝে মাঝে তার সাথে থাকতে। কোন মিটিং মিছিলে গেলে যেতে। আরো বললেন যে টিউশনি করা লাগবেনা। মাসে মাসে বেশ টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে দিবেন উনি।

-বলিস কি? এত তাড়াতাড়ি পলিটিক্সে যাস না। একটু সময় নেওয়া ভাল।

-না গিয়েও তো উপায় নেই। উনি আমার হলে সিটের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

-হুম, উনি বেশ নামি-দামি, ক্ষমতাশালী লোকের সাথে উঠ-বস করেন। তুই এক কাজ করতে পারিস। উনাকে একবার অনুরোধ করে দেখ। বল যে, পলিটিক্সের প্রতি তোর আগ্রহ নেই। সবেমাত্র ক্লাশ শুরু হয়েছে। কিছুদিন ভালভাবে পড়াশোনা করতে চাস। এরপর পলিটিক্স করবি। তাহলে কিছুটা সময় পাবি সবকিছু বুঝে ওঠার। ততদিনে হয়ত ভুলেও যাবেন উনি।

প্রাঞ্জলের মুখ দিয়ে কথা বের হল না। শুধু মাথা নাড়ল।

তাকে সোহেল ভাইকে কিছুই বলতে হয়নি। তার রুমমেটই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রতন ভাইয়ের এক বন্ধুও পলিটিক্স করেন। তাকে দিয়েই সোহেলকে বলা হয়েছে প্রাঞ্জলের বিষয়ে।

সোহেল ফোন দিয়েছিল প্রাঞ্জলকে। বলেছে, আপাতত থাক।

রতন ভাই টিউশনি করিয়ে মাত্র রুমে আসল। এসেই গিটার নিয়ে বসে গেল। সাউন্ডবক্সে বেজে চলেছে,

“শহরে হঠাৎ আলো চলাচল, জোনাকি নাকি স্মৃতি দাগে;

কাঁপছিল মন, নিরালা রকম, ডাকনাম নামলো পরাগে !”

-ভাই, আমাকে গিটার শেখাবেন?
-শিখবি?

প্রাঞ্জল হাসল, এই প্রথম তাকে প্রাণখুলে হাসতে দেখল রতন।

চারু! একটি মেয়ের নাম

Now Reading
চারু! একটি মেয়ের নাম

চারু! নামটা বড্ড সেকেলে তাই না। চারু মানে সুন্দর। আর এই চারু নামটা ঠিক আমার গায়ের রঙের বিপরীত। দাদু খুব শখ করে নাম রেখেছিলো। বড় হয়েছি কলকাতায়। কলকাতার বড়বাজার এ। ছোট থেকেই ছুটে বেড়িয়েছি এখানে ওখানে। কখনো বাবার কাজের জন্য ছুটেছি এই শহর থেকে ঐ শহর। কখনো ছুটেছি মায়ের হাত ধরে দাদুর বাড়ি। বাবা-মায়ের ঝগড়া সে নিত্য দিনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছিলো। সকালে বা রাতে এইটা ওটা নিয়ে তারা ত্বর্কে লেগেই থাকতো। আমি সেই ত্বর্কের সময় লুকিয়ে কান্না করতাম, দরজার আড়ালে। তখন মা’ও আমার সাথে কান্না করতো। ছোট ছিলাম বলেই মনে হয় কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু মা ঘুমাতো না। কান্না করেই যেতো। আমি বড় হয়েছি বলতে গেলে দাদুর কাছেই। বাবা-মা অফিস করতো আর আমি একা একাই থাকতাম। আমার সহযোগী ছিলো এক আন্টি আর দাদু। আন্টি সপ্তাহে ৩ দিন আসতেন। বাকি সময় আমি আর দাদুই থাকতাম। দাদু বই পরতো আর আমি একা একাই থাকতাম প্রায় সময়। খেলার সাথী তেমন এলাও করতো না কেও। তাই বলতে গেলে একা একাই বেড়ে উঠা।

গবেষণা নাকি বলে, একা একা থাকা মানুষ গুলোর নাকি আয়ু কম থাকে। আর রোগের বেলায় সবার উপরে। জানিনা কতটা সত্য কিন্তু হতেও পারে সত্য। প্রথম ভালোবেসেছিলাম সেই ক্লাস ৮ এ। আমার ক্লাসেই পড়তো। সারা ক্লাস আমার দিকে তাকিয়ে থাকা, আমার সাথেই প্রাইভেট পড়া, আমার সাথেই বাড়ি আসতো। যদিও ওর বাড়ি অন্য এলাকায় ছিলো। আমাকে নোট’স দিয়ে হেল্প করতো সারাক্ষন। স্কুলে কেও আমার সাথে বাজে ব্যবহার ও করতে পারে নি। আসতে আসতে বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হয়ে গেলো। কিভাবে কি হলো নিজেও জানি না। চলছিলো এভাবেই দিন। আমার নিজের ফোন ছিলো না। লুকিয়ে লুকিয়ে দাদু বা দোকান থেকে ফোন করতাম। ওর কাছেও ছিলো না ফোন। বাসার ফোন দিয়েই কথা বলতো। স্বল্পবয়ষি দুই কিশোর-কিশোরীর চলছিলো দিন এই ভাবেই। আমি সারাজীবন একা একাই বড় হয়েছিতো তাই ভয় পেতাম, কিছু পাওয়ার সময়।

শুভ্রর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতাম সবটা সময়। আমি কখনো চাইতাম না কোন কারনে কষ্ট হোক বা শুভ্র’ও কখনো বাজে ব্যবহার করতো না। ভালোই চলছিলো দিন-গুলো। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম দুই জনেই। ভর্তি হলাম এক ই কলেজে। কলেজে উঠেই যেন নিজেকে বদলে যেতে দেখলাম। খুব চুপচাপ স্বভাবের হলেও সব সময় চাইতাম সবার সাথে মিশতে। কিন্তু পারতাম না। কাওকেই আপন ভাবতে কষ্ট হতো। আমার মাঝে মাঝেই মাথা ব্যথা হতো। ছোট বেলা থেকেই। ভেবেছিলাম সাধারন ব্যথাই হবে। হয়তোবা ভুলছিলাম।

একদিন ডাক্তার দেখালাম। Neurologist অতুল কুমার সেন। আমার নানান টেষ্ট এর রিপোর্ট দেখে তিনি যে কথাটা আমাকে বলেছিলো, এখনো সেটা আমার কানে বাজে। প্রতিনিয়ত। “Miss Charu, you have brain cancer . There are approximately 1 month as the time in your hands. I would be happy to speak the words of someone in your family. But since there is no one, so it will be up to you to accept this fact. কথাগুলো যেনো আমার মনে গেথে গিয়েছিলো। আমি ডক্তরের চেম্বার থেকে যেনো হাটতে পারছিলাম না। চেম্বার থেকে বের হবার সময় শুভ্র ফোন করে বললো যে ওর বাবা আর নেই। আমার খুব কান্না পেলো কথাটা শুনে। আমি দেখতে গেলাম ওর বাবাকে। শুভ্র আমাকে ধরে খুব কান্না করলো। আমিও খুব কান্না করলাম। আমি ওকে কিছুতেই বলতে পারিনি যে আমার ক্যান্সার ধরা পয়েছে। এমনি ওর বাবা হারানোর কষ্ট, তার উপর আমার কথাগুলো বলে আরো কষ্ট দিতে চাই নি আমি। তাই আড়াল করে গেলাম সব কিছু। কেও কিছু জানলো না। সময় চলে যাচ্ছিলো। শুভ্র কে সাপোর্ট দিচ্ছিলাম মেন্টার্লি। কিন্তু আমি? নিজে নিজে যেন যুদ্ধ করছিলাম সারাটা সময়। কেনো আমার সাথে এমন হলো। ওদিকে বাবা-মা ও কিছু জানলো না। জমানো যা ছিলো সব দিয়েই শুভ্রর জন্য, বাবা-মা এর জন্য সবার জন্য এইটা সেইটা কিনে দিলাম। এক একটা দিন যেনো খুব তারাতারি ই চলে যাচ্ছিলো। আমি একা থাকতাম। মাথার এক্সট্রা চুল আনিয়ে নিয়েছিলাম। যাতে কেও সন্দেহ না করে। শুভ্রর সাথে দেখা করেছি ২ বার। সামনে গেলে যদি বলে দেই আমার কথা। তাহলে খুব কষ্ট পাবে ও। আমি তো কষ্ট দিতে চাই না। আচ্ছা, ভালোবাসা কি এমনি। নিজের মৃত্যু জেনেও অন্যকে খুসি রাখার চেষ্টা। আমি জানি আমার চলে যাওয়ার তারিখ। এক একটা সময় চলে যাচ্ছিলো আর মনে হচ্ছিলো কত কাজ করার ছিলো আমার। কত স্বপ্ন ছিলো। কিছুই পূরন হলো না আমার। সব কথা তো সবাইকে বলা যায় না। মায়ের জন্য, বাবার জন্য, শুভ্রর জন্য চিঠি লিখেছি আলাদা আলাদা করে। এক বন্ধুকে বলেছি ২ দিন পর যেনো সেই চিঠিগুলো আমাদের বাসায় দিয়ে দেয়। আমার হাতে আর ২ দিন আছে। জানিনা আমি আর লিখতে পারবো নাকি। আমার এই ডাইরিটা কেও পাবে বলেও মনে হয় না। এই জন্মে আমার কিছু পাওয়া হলো না। ঈশ্বর যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে পরের জন্মে যেন আমি শুভ্রকে আমার করে পাই।