মাধ্যমিকের দিন গুলোতে প্রেম… ( ১ম পর্ব )

Now Reading
মাধ্যমিকের দিন গুলোতে প্রেম… ( ১ম পর্ব )

নবম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিয়ে দশম শ্রেণিতে উঠলাম। সাল ২০০৭। তারপরের দিন গুলোর কথা মনে করলে আমি আর আমার মন কোনটাই আর বিষণ্ণ নামক শব্দের ধারে কাছে যায় না।

ঘটনার রোমান্টিকতার শুরু সেই বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আমাদের স্কুলে খুব বড়সড় অনুষ্ঠানই হচ্ছিল।আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে পেছনের সারিতে গিয়ে বসলাম।আর বসার জায়গাটা পাকাপোক্ত করার পরই শুরু করে দিলাম নানা আজগুবি আলাপ।হঠাৎ উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করা আমাদের রশিদ স্যার বললেন ‘’ এখন ২১শে ফ্রেব্রুয়ারি নিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃতি করবে ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী লাবিবা আক্তার। যদিও মেয়েদের প্রতি আমার তেমন আগ্রহ ছিলো না তখন। শুধু আমার বন্ধুদের প্রেমিকাদের ‘’ ভাবি ‘’ বলে ডাকা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। তবে আমার এই সীমার বর্ডার পার করে মেয়েটার দিকে দেখাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটার জন্ম দিলো।সব নিয়ম নীতি ভেঙে ‘’ হা ‘’ করে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার দিকে। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম আমি। আমার স্তম্ভিত মনোভাব ভেঙে সাধারন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলাম সবার হাততালির শব্দে। বুঝলাম কবিতা আবৃতি শেষ।তবে কবিতা আবৃতি ভালো হয়েছিলো নাকি খারাপ তা আমার জানা নেই। কারণ আমি তার অবাক চাহনি,কপালে লেগে থাকা লাল টিপ আর নিষ্পাপ অবয়বে আটকা পরে ছিলাম। সবার হাত তালি দেয়া শেষ হয়ে গেলেও আমি আমার হাতকে আটকাতে পারলাম না। মেয়েটার দিকে হা করে তাকিয়ে হাততালি দিতে লাগলাম। আমার খেয়াল ছিলো না যে সবাই আমার কাণ্ডে কিছুটা বিরক্তবোধ করছে।আমি শুধু চাইছিলাম মেয়েটা একটা বার আমার দিকে তাকাক। হঠাৎ মেয়েটি মঞ্চ থেকে নেমে যাবার সময় আমার হাত তালির শব্দ শুনে আর চোখে আমার দিকে তাকালো আর ঠোটের কোনে জমে থাকা হাসিটার আমার জন্য প্লাবন ঘটলো। মনের ভেতরটা কেমন যেন কোন পোকার আক্রমন চলতে লাগলো। পরে অবশ্য আমি বুঝতে পেরেছিলাম এটা প্রেম পোকার কাজ। আর তারপরই শুরু হলো আমার অনুসন্ধানের পর্ব। মেয়েটাকে এর আগে আমাদের স্কুলে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। মনে হলো এই বছরই নতুন ভর্তি হয়েছে। তাই নাম ছাড়া আর কিছুই অবশ্য জানা ছিলো না আমার।এসব কিছু আমি আমার বন্ধুদের বললাম। আর ওরা অনুসন্ধানের দায়িত্বটা নিজেদের উপর নিয়ে নিলো।তবুও আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। আমার সব সময় মনে হতে লাগলো মেয়েটির সেই অবাক চাহনি,কপালে লেগে থাকা লাল টিপ আর নিষ্পাপ অবয়বের কথা। পড়াশোনাও মন বসতে ছিলো না।টিভিতে অনেক বার দেখেছি । নায়ক পড়তে বসার পর বই এর ভেতরে নায়িকাকে দেখে। এসব দেখে তখন আমার হাসি পেতো।মনে হতো এগুলো সব অবাস্তব। কিন্তু সেদিন রাতে পড়তে বসে আমিও বই এর পাতায় মেয়েটিকেই দেখলাম। যাই হোক, অনেক কষ্টে রাতটা পার করলাম।সকালে ঘুম থেকে উঠেই বন্ধুদেরকে এসব বিষয় বললাম। আর সাথে সাথেই বোনাস হিসেবে আমার জ্ঞানদাতা বন্ধু গুলো আমাকে নানা ভাবে জ্ঞান দিতে লাগলো।তাদের পূর্ব প্রেমের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যদিও আমি জানতাম তবুও তারা পুনরায় আমায় সেই সব অভিজ্ঞতার কথা শুনাতে লাগলো। আমি চুপ করে শুনতে লাগলাম। কারন এসব শোনা ছাড়া আমার কোন আর কাজ নেই।এই সমস্যা শেষ করতে না পারলে আমি থাকতে পারবো না।আমি নীরব , নির্বাক শিশুর মতো উপদেশ গুলো আমার মনে গেথে নিলাম। এরই মধ্যে আমার প্রেম ডিটেকটিভ বন্ধু গুলো এসে হাজির। ২ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর অনুসন্ধানের প্রতিবেদন জানার জন্য আমার পকেট থেকে ১০০টাকা খরচ করতে হলো। তাদের দুর্ধর্ষ অনুসন্ধানের প্রতিদান স্বরূপ মুখরোচক খাবারের আবদার আমার মেটাতে হলো।

অনুসন্ধানের ফলাফল থেকে মেয়েটির বাড়ির ঠিকানা,ভাই বোন সংখ্যা, বড় ভাই আছে কিনা, কোথায় কোচিং করে ইত্যাদি তথ্য বেড়িয়ে এলো।

এবার সময় এলো বন্ধুদের দেয়া উপদেশ মতো কাজ করা। বলে রাখা ভালো, আমাদের স্কুলে দুই শিফটে ক্লাস হতো। মর্নিং শিফট ছিলো মেয়েদের। মেয়েদের ছুটি হবার পর আমাদের ক্লাস শুরু হতো। সেদিন মেয়েদের ছুটি হবার ৪০ মিনিট আগেই আমি আর আমার বন্ধুরা স্কুল এর সমানে গিয়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার বন্ধুরা অবশ্য ওদের নিজ নিজ প্রেমিকার সাথে দেখা করার জন্যই এসেছিলো তারপরো আমাকে ওরা না ভাবে কথা বলার স্টাইল শেখাতে লাগলো।মেয়েদের সাথে কথা বলার আমার পূর্ব প্রস্তুতি ছিলো না। আমি জানতাম না কিভাবে মেয়েদেরকে পোটাতে হয়। তবে এই কয়েকদিনে বন্ধুদের কাছ থেকে অনেকটা শিখে নিয়েছিলাম।আমার বন্ধুরা প্রতিদিনই এরকম দাড়িয়ে থাকতো কিন্তু এর আগে আমি ওদের সাথে দাড়িয়ে থাকতাম না। এখন আমিও ওদের দলেরিই একজন।তবে ওদের প্রেম দুই দিক দিয়েই পরিপূর্ণ ছিলো কিন্তু আমার প্রেম শুধু মাত্র এক সাইড।অনেক সময় দাড়িয়ে থাকার পর স্কুল ছুটির সময় হলো।একে একে সবাই বেড়িয়ে আসছে কিন্তু আমি আমার জনকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। একে একে যখন সবাই বেড়িয়ে আসছিলো তখন আমার হৃদস্পন্দন বাড়তে লাগলো। হঠাৎ চোখে পড়লো একটি মেয়ে আমাদের রশিদ স্যার এর সাথে কথা বলছে। আমার আর চিনতে কোন দেরি হলো না যে এই মেয়েটিই হলো লাবিবা। চেহারা ভুলে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ছিলো না কারণ প্রথম দেখাতেই মেয়েটির মুখ আমার মনে গেঁথে গিয়েছিলো।কথা শেষ হবার পর আসতে লাগলো মেয়েটি। যত কাছে আসছিলো ততই আমার হৃদস্পন্দন আরো কয়েক গুন বাড়তে লাগলো… ( চলবে… )

 

 

 

ভূতুড়ে গ্রাম

Now Reading
ভূতুড়ে গ্রাম

আজব এক গ্রাম ! চারিদিকে শুধু গাঢ় সবুজের ঘন বন ! গা ছমছমে শুনশান পরিবেশ। মনে হয় এ গ্রামে কোন মানুষ নেই, আবার কদাচিৎ দু চারজনকে চোখেও পড়ে যায় ! তবে দিনের আলো থাকতেই যে যার ঘরে ফিরে আসে এবং ভুল করেও আর কেউ দরজা খুলে বাইরে বের হয়না। কেমন যেন আতঙ্কে বসবাস করে এখানকার মানুষজন। তাদের সেই অজানা আতঙ্ক ভেদ করে আদিখ্যেতার সম্পর্ক গড়ে তোলা অসম্ভব। তবুও নিজেদের প্রয়োজনেই আগ বাড়িয়ে সম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা !

পাহাড়ের গা ঘেঁষে ছোট্ট গ্রামটি। লোকসংখ্যাও কম এবং শান্ত পরিবেশ। সন্ধ্যার পরে যেন আরো ভয়ঙ্কর‌ শান্ত থাকে গ্রামটি। কখনও থেকে থেকে শেয়ালের ডাক আর বন্য কুকুরের কখনও ডাকাডাকি আবার কখনও একদমই নীরবতাকে ভেদ করে কুকুরের অস্বাভাবিক কান্না !

আর মাঝে মাঝে দূর জঙ্গল থেকে কেমন এক অচেনা কোন পশুর ডাকের আওয়াজ ভেসে আসে। কিন্তু খেয়াল করতে গেলেই থেমে যায় ডাকটি ! সত্যিই কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগে পরিবেশ। তবে খুব একটা গুরুত্ব না দেয়ার চেষ্টা করে নতুন আসা দম্পতি। মানুষগুলোও তেমন আগ্রহী নয় কেউ কারো সাথে আলাপচারিতায়। সব যেন নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সন্ধ্যাটা জানালা খুলে দেখছিলো নীলা আর স্বামী ফেরার অপেক্ষা করছিলো।খেয়াল করল একঝাক মানুষ এলো এবং নিজেদের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলো কিন্তু মুখে কোন কথা নেই। আশ্চর্যের কথা হল, এত তাড়া কিসের সবার ঘরে ফেরার !

নীলার স্বামী ফিরলে নীলাও যেন নিশ্চিন্ত হল ! নীলার স্বামী রাজু জানায়, বাড়ি ফিরতে যেদিন ভরা সন্ধ্যা হয়ে যায় সেদিন জঙ্গলের পাশ থেকে যে রাস্তা ধরেই আসতে হয়, ঐ পথ দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় কিছু একটা পেছনে ফিরতে বাধ্য করে আর পেছনে ফিরলেই একটা অদ্ভূত মায়ার সৃষ্টি হয় ! যেন জঙ্গলটি কাছে ডাকছে !

একদিন নিকটবর্তী প্রতিবেশীর কাছ থেকে অদ্ভূতুড়ে রহস্যের জাল ভেদ করার চেষ্টা করে নীলা ও তার স্বামী ! কুশল বিনিময় শেষে জানতে চাইলে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও আরো কিছু রহস্যে ঘেরা ঘটনা শুনে হতবাক হয়ে যায় ওরা !

ঘটনাগুলো এমন যে,

– সন্ধ্যার পরে যারাই একাকী বের হয় তারা আর জীবিত ফেরেনা। অদ্ভূত অঙ্গভঙ্গী এবং রক্তশূণ্য মৃতদেহ পাওয়া যায় বনের ভেতরে অথবা পাহাড়ের চূড়ায় ! আবার কাউকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়না কোনদিন। অনেকে অন্ধকারে দূর জঙ্গলে এক প্রকারের অশরীরি পশুর মতন কিছু দেখতে পেয়েছে কিন্তু দিনের বেলায় হাজার চষেও এমন কিছু দেখা যায়নি। এগুলো কি এবং কোথায় থাকে কেউ জানেনা। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে ওরাও দলবদ্ধ থাকে। এমনকি পোষা প্রাণীও যদি বাইরে বের হয় তবে পরদিন মৃত পাওয়া যায়। আর প্রায়ই অদ্ভূত অচেনা কোন প্রাণীর ডাক শোনা যায়। ডাকটি খেয়াল করে শুনলে কেমন যেন ঝিম ধরে যায় ! আর নিজের অজান্তেই অনেকে ভুল করে বাইরে বের হলে সে আর ফেরেনা ! আবার কখনও হঠাৎ করে থেমে যায় ডাকটি !

বনবিভাগকে জানানো হয়েছিলো। তারপর তারা একটি টিম এবং সাহসী কিছু গ্রামবাসী সারাদিন, রাত এক করে খুঁজেছে কিন্তু কোন পশু, প্রাণী কোন কিছুরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তারপর সবাই বেশ নিশ্চিন্তে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আমোদফূর্তিতে দিন যাপন করতে লাগলো। সব ভয় যেন মিলিয়ে গেছে এবং হঠাৎ একদিন আবার রহস্যজনকভাবে একের পর এক হারিয়ে যেতে লাগলো, অনেকের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেলেও অনেকের মৃতদেহ আর খুঁজেও পাওয়া গেলনা। তখন সবাই নিশ্চিত হল যে কোন রাক্ষস অথবা অশরীরি কিছইু হবে। ওরা রাতের অন্ধকারে শিকারে বের হয় !

তারপরে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু নিতান্ত নিরুপায় যারা বা পৈতৃক সম্পত্তির টান যারা উপেক্ষা করতে পারেনি তারাই থেকে গেছে এ গ্রামে। কিন্তু কেউ জীবনের ভয়ে সন্ধ্যার পরে একা বের হয়না।

আজকাল দলবদ্ধভাবেও তেমন কেউ বের হয়না। সবাই বিকেলেই কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়। হাজার কান্না বা শব্দেও বের হয়না কেউ। ভয় কাটানোর জন্য সন্ধ্যা রাতেই ঘুমিয়ে পড়ে আবার কেউ কেই ধর্ম কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে আবার কেউ কেউ বিনোদনের ব্যবস্থা করে নিজের ঘরে। যেন ঐ ঝিম ধরা আওয়াজ বা ডাক শুনতে কেউ না পায় !

একদিন সকালে প্রতিবেশীর থেকে বিদায় নিয়ে নতুন আসা দম্পতি চলে যায় ভূতুরে গ্রাম ছেড়ে! তবে যাবার আগে আরেকটি ঘটনা বলে যায় আর সাবধান করে দিয়ে যায় !

ঘটনাটি হল, আগের রাতে সেই ঝিম ধরা ডাক শুনে তাদের পোষা কুকুরটি জানালা দিয়ে বাইরে চলে যায় ! কুকুরটির খোঁজে নীলাও দরজা খুলে বাইরে এক পাঁ রাখতেই স্বামী তাকে আটকায় ! সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই তাদের বাড়ির আশে পাশে কোন কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে। তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভয় সংশয় নিয়ে সারারাত পোষা কুকুরটির ভাবনায় বসে থাকে। কিন্তু খুব সকালে তারা কুকুরটির খোঁজে বের হলে কুকুরটির অর্ধেক অংশ খুঁজে পায় পেছনের দিকটায় ! এই ঘটনার পরে তারা গ্রাম ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় এবং চলেও যায় চিরদিনের জন্য…।

সৌদি প্রিন্স ‘মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদ’

Now Reading
সৌদি প্রিন্স ‘মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদ’

মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদ। তিনি 31 আগস্ট 1985 সালে রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি রাকান বিন হিটলারের নাতিন, যিনি আল আজমান গোত্রের প্রধান ছিলেন। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের  ভাইবোনগুলো হল, তুর্কি বিন সালমান, সৌদি রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটিং গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান এবং খালিদ বিন সালমান। প্রিন্স মোহাম্মদ কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তাকে “lawyer by training” হিসাবে ডাকা হয়। কলেজ থেকে স্নাতক নেওয়ার পর, মোহাম্মদ বিন সালমান বেসরকারি খাতে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তিনি সৌদি মন্ত্রিপরিষদে কাজ করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতেন। ২৫ শে ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে, ২৪ বছর বয়সে মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর পিতার বিশেষ উপদেষ্ঠা হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, যখন তিনি রিয়াদ প্রদেশের গভর্নর ছিলেন। এই মুহুর্তে মোহাম্মদ বিন সালমান এক অবস্থানে থেকে “রিয়াদ কম্পিটিটিভ কাউন্সিলের” সচিব-জেনারেল, “রাজা আব্দুল আজিজ ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড আর্কাইভের” বোর্ডের চেয়ারম্যানের বিশেষ উপদেষ্টা এবং বোর্ডের সদস্য ছিলেন। 2015 সালে, মোহাম্মদ বিন সালমান “রুশ ভদকা” এবং “বারমুডা-রেজিস্টার্ড ইয়ট শরিফ” € 500 মিলিয়ন দিয়ে কিনেছিলেন। ডিসেম্বর 2017 সালে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রিপোর্ট করেন যে, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির “সালভেটর মুন্ডির” সত্যিকারের ক্রেতা ছিলেন। 

মোহাম্মদ বিন সালমান সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সেলিব্রিটিদের সাথে বৈঠক করেন। জুন 2016 সালে, তিনি সিলিকন ভ্যালিতে ভ্রমণ করেন এবং ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ সহ মার্কিন হাই কারিগরি শিল্পের প্রধান ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেন। মোহাম্মদ বিন সালমান ২০০৪ সালে রাজকুমারী Sarah Bint Mashhoor বিবাহ করেন। তাদের চারটি সন্তান রয়েছে।

দেশের বর্তমান বাদশাহ সালমানকে সরিয়ে তাঁরা প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে সিংহাসনে বসাতে চান। এর আগে প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ দেশটির সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রিন্সদের মধ্যে একজন বলেন বলেন, ‘প্রভাবশালী উলামা পরিষদের সদস্য ও ধার্মিক মানুষেরা প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে বাদশাহ হিসেবে দেখতে চান। তবে সবাই যে তাকে চায়, তা নয়। তবে ৭৫ শতাংশই তাঁকে চান।

সালমান সৌদি আরবের রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ বিন সৌদের ২৫ তম সন্তান। মাত্র ২০ বছর বয়সে সালমান রিয়াদ প্রদেশের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ হন। ২০১১ সালে ভাই প্রিন্স সুলতানের মৃত্যুর পর সালমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১২ সালে রাজ প্রাসাদে তাঁর পূর্বের উত্তরসূরি প্রিন্স নাইফের মৃত্যুর পর তাঁকে পরবর্তী বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

নীল শার্ট গল্প

Now Reading
নীল শার্ট গল্প

হাতখরচের জন্য বাবা আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতেই আমি আনন্দে ভেসে গেলাম। যাক বাবা, জাহান প্লাজার সেই অভিজাত বস্ত্রবিতানে গতকাল দেখে আসা নীল শার্টটা কেনা যাবে।
গতকাল জাহান প্লাজার এক বস্ত্রবিতানে ঝুলানো নীল শার্টটা দেখে আমার চোখ সেখানে আটকে গেল। ভেবেছিলাম এবারে কাপড়-চোপড় কিছু কিনব না। কিন্তু নীল শার্টটি আমার সে সিদ্ধান্ত বদলে দিলো। কাপড়-চোপড় কিছু না কিনলেও অন্তত এই নীল শার্টটি আমার কেনা চাই। রাতে স্বপ্নেও দেখিÑ আমি পরম আনন্দে সেই নীল শার্ট গায়ে দিয়ে সারাবাড়ি ঘুরছি। পরিজনরা সকলে মুগ্ধ হয়ে আমাকে দেখে বলাবলি করছে আমাকে নাকি দেখতে রাজকুমারের মতন লাগছে। শুনে ভারি লজ্জা হলো আমার।
অবশেষে বাবার দেয়া মাস খরচের পাঁচ হাজার টাকা পেয়ে প্রিয় নীল শার্ট কিনব বলে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসও দিলাম। বিকেলে মানিব্যাগে ভর্তি নতুন কচকচে টাকা নিয়ে জাহান প্লাজার দিতে ছুটলাম স্বপ্নের শার্ট কিনব বলে।
জাহান প্লাজার পাশেই ফুটপাথে লম্বা সারিবদ্ধ পোশাকের স্টলগুলোতে কেনাকাটার ধুম লেগেছে। সমাজের নিম্নবিত্তরা এসব কেনাকাটায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে। ফুটপাথের ছোট্ট একটা স্টলে সাদা কালারের একটি কম দামি শার্ট আমার নজর কাড়ল। ভাবলাম এটা রতনের জন্য কিনে নিয়ে যাব। রতন আমাদের বাসায় কাজ করে। বয়স ষোল কি সতের। বেশ খুশি হবে সে এটা দেখলে।
অনেকটা আগ্রহ নিয়ে ফুটপাথের সেই স্টলে গেলাম রতনের জন্য শার্টটি কিনতে।
এই যে ভাই, এই সাদা শার্টটির দাম কত?
ভাইজান, এটা একদাম দুই’শ টাকা।
বল কি? এটা তো ফুটপাথের জামা, এত দাম? পঞ্চাশ টাকা দেবে?
না ভাইয়া, এক’শ আশি টাকা কেনা। বিশ টাকা আমার লাভ।
চুপ করো ফকিন্নির পুত। ফুটপাথের এই শার্টটি পঞ্চাশ টাকার বেশি এক টাকাও দেবো না। দেবে?
নিরব চাহনিতে বিত্রেুতা আমার মুখের অপ্রত্যাশিত গালি শুনে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে অনেকটা ঝাড়ি মেরে সোজা জাহান প্লাজার দিকে পা বাড়ালাম।

২.
অভিজাত বস্ত্রবিতানে মাঝবয়সী বিক্রেতা লোকটা প্রিয় নীল শার্ট আমার সাথে দামাদামি করছেন।
না ভাইয়া, এই শার্টের দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা। বেশ ভালো কাপড়। পরলে মজা পাবেন।
কিছু মূল্য ছাড় দেয়া যায় না?
না আসলে আমাদের এখানে সব এক দাম। এক পয়সাও কম রাখি না আমরা। কিনলে কেনেন, না কিনলে আসতে পারেন।
না ইয়ে মানে..। বুঝতে পারলাম এখানে কোনো দামাদামি চলে না। সব এক দামে বিক্রি হয়। একবার ভাবলাম শার্টটি কিনব না। আবার না কিনেও থাকতে পারছি না। কি যে মুশকিল।
শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার টাকায় শার্টটি কিনে জাহান প্লাজা থেকে বের হয়ে এলাম।
সেই ফুটপাথের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছি। ফকিন্নির পুত বলে যাকে গালি দিলাম, তার চোখে চোখ পড়ে গেল। সে কেমন উৎসুক চোখে আমার হাতে সাড়ে তিন হাজার টাকা দামের শার্টের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবলাম এই ফুটপাথের বিক্রেতা ২০০ টাকার শার্ট ৫০ টাকায় দেয়নি বলে তাকে আমরা ফকিন্নির পুত বলে গালি দিতে পারি, অথচ জাহান প্লাজা নামে বড় বড় শপিংমলে সাড়ে তিন হাজার টাকা দাম চাইলেও আমরা সে সমস্ত বিক্রেতাকে কিছুই বলি না, যারা গলাকাটা দামে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বরং হাসি মুখে আমার পণ্য কিনে ঘরে ফিরি। শখ বলে কথা।

বৃত্ত

Now Reading
বৃত্ত

“বৃত্ত”
-চলে যাচ্ছেন?
-হুম দেখতেই তো পাচ্ছেন
-তা যাচ্ছেন কেনো?
-এখানে আর মন টানছেনা
-নাকি কেউ বিরক্ত করছে?
-হুম ঠিক ধরেছেন
-তাহলে আমার sorry বলা দরকার
-কেনো?
-আপনাকে তো আমি ছাড়া আর কেউ বিরক্ত বলে আমার জানা নেই
-সবই কি আপনার জানার মধ্যে থাকতে হবে?
-থাকলে কি সমস্যা আছে?
-সমস্যা না থাকলেও অভ্যাস নেই
-তা কোথায় যাচ্ছেন?
-বাধা পড়তে চাইনা
-বুঝলামনা
-তাহলে না বুঝার চেষ্টা করাটাই ভালো
-আপনার সব অভ্যাস আমার জানা তবুও আপনাকে বুঝতে পারিনা।আপনার কথাগুলো তারও আগে বুঝিনা
-বললামনা বুঝার চেষ্টাটা না করতে
-কেনো কি এমন রহস্য আপনার?
-আপনি কি আমাকে আটকাতে এসেছেন,তাহলে এই চেষ্টাটা করতে পারেন
-নাহ্ করবোনা
-কেনো?
-এতটুকু বুঝতে পারছি আপনি কোনো বৃত্তের মধ্যে থাকতে চাননা।আপনি অবাধ্য তবে দুষ্টু না।
-হে হে তা যা বলেছেন।
-আচ্ছা আসি।
-ভালো থাকতে বলবেন না?
-যে ভাল থাকতে চায়না তাকে বলতে নেই।আচ্ছা আমি যাই দেরী হয়ে যাচ্ছে।বিদায়।
বিদায় কথাটা আমার বলার ছিলো।কিন্তু তুমি বললে।চলে যাচ্ছি আমি কিন্তু তার আগেই চলে গেলে তুমি।আমি কোনো বৃত্তের মধ্যে থাকতে চাইনা আর তুমি বৃত্তটা ভেঙে দিলে।সবই তুমি করে দিলে আমার জন্যে কি বাকী রাখলে????
ঐ ছোট্ট একটা কুটিরে এসে উঠেছিলাম।বড়ই অগোছালো হয়ে থাকতাম।তুমি আস্তে আস্তে আমার দিকে এগোতে থাকলে।আস্তে আস্তে আমাকে পুরোটাই তোমার বৃত্তের মধ্যে পুরে নিয়েছো।
যে আমি শুধু চলা ছাড়া কিছু বুঝতামনা।আর মাঝে মাঝেই ডুব দেয়া আর কিছুদিন ডুব দিয়ে থেকে আবার চলা শুরু করা।তাই লুকিয়ে লুকিয়ে ঐখানে ডুব দিতে এসেছিলাম আবার লুকিয়ে লুকিয়েই পালাতে যাচ্ছিলাম।কিন্তু না তখন পেরেছি তোমার চোখ এড়াতে না এখন পারলম।
আমি সত্যিই তোমার বৃত্তের মধ্যে থাকতে পারবোনা।আমি এক বৃত্তের মধ্যে চলতে পারবোনা।এটা আমার সত্ত্বা চাইলেও আমি পারবোনা।তাই আজ তোমার বৃত্তের পরিধি পেড়োতে যাচ্ছিলাম।কিন্তু তার আগেই তুমি আমাকে মুক্ত করে দিলে।সত্যিই তুমি আমার থেকেও বেশী “রহস্যময়ী”।
ভালো থেকো আর পারলে কখনও অন্য কাউকে এই বৃত্তের পরিধির সীমানায় আসতে দিওনা।আমার চলা শেষ হলে আমি ফিরব এই বৃত্তের পরিধিতেই…………..

ছেলেবেলা

Now Reading
ছেলেবেলা

আজ ২৯শে সেপ্টেম্বর ২০১৭,

আমি মুসফিক, এই লেখালেখি করি আর কি, কিন্তু ফটোগ্রাফির ইচ্ছা ও মনের মধ্যে আছে। আজকে কেন জানি কি মনে করে বের হলাম, রাস্তার ধারে ঝলমলে রোদ এসে গায়ে আছড়ে পড়ছে। সারাটা পথ ফাকা। একটি ছেলে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে তার সাইকেল নিয়ে। ভাল ভাবে চালাতেও জানে না, যেমন পারে তেমন ভাবেই আসছে কিন্তু আসতে চাইছে দ্রুত। এসে থামল আমার সামনে। সে বলে; ভাই আপনের হাতে এইডা ক্যামেরা না? ওই যে ছবি উঠায়। অবাক দৃষ্টি তে ওর দিকে চেয়ে, একটু হেসে বললাম হ্যা। শুনলাম তোমার নাম কি? উত্তরে সে বলে, আমার একটা ছবি উঠায় দিলে আমি নাম বলবো। আমি ওকে সামনে দাড় করালাম আর ওই পিচ্চি ছেলেটা ওই ভাবে দাড়ালো। ছবি দেখালাম সে অনেক খুশি মনে বলল, ভাই আমার নাম সোহাগ। এই বলেই চলে গেল।

এতক্ষন আমি এই ছবির পেছনের কাহিনী বলছিলাম। আসলেই অনেক সুন্দর ছিলো আমার আপনার, আমাদের ছেলেবেলা। সারাদিন খেলা করতে করতেই বেলা বয়ে সন্ধ্যা নেমে আসত। ঠিক-ই পেতাম না। তখন জীবন টা এখনকার মত এতোটা জটিল ছিল না। ছিল সাদা-মাটা কাগজে বানানো এক ঘুড়ি, যার মাঝে আম্মুর কাছ থেকে নেওয়া কাঠিম সুতোর সুতা বেধে আকাশে চেলে দিয়ে দৌড়ে বেড়াতাম সারা মাঠ। মানুষ আসলে ঠিক-ই বলে, সময় আর স্রোত কারোর জন্যে অপেক্ষা করে না। আর আমাদের ছোটবেলার ভাবনা গুলো-ও ছিলো অন্যরকম। ছোটবেলায় ভাবতাম বড় হলে আম্মু আব্বু কে দেখিয়ে দিবো আর বড় হয়ে ভাবি, নাহ! সেই আগের দিন গুলো-ই ভাল ছিল অনেক। আর আফসোস ও করি যে যদি আবার আর একবার সেই ছেলেবেলায় ফিরে যেতে পারতাম!

এখন তো কিছু করার নেই বড় হয়ে গেছি, বুঝতে শিখেছি আর জীবনের এই আঁকাবাঁকা পথ ধরেই চলতে হবে কারন সৃষ্টিকর্তা আমাদের কে তো বাচার জন্যে সৃষ্টি করেননি, করেছেন লড়াই করার জন্যে। জীবন যুদ্ধে লড়াই করে যে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে সেই হবে বিজয়ী।

আমাদের আশেপাশে এমন হাজারো সোহাগ আছে যাদেরকে আমরা কোন পাত্তা-ই দেইনা। কখনো কি তাদের মুখে আমরা হাসি ফুটিয়ে দেখেছি, লুটেছি সে শান্তি যে শান্তি অন্যকে খুশি করার মধ্যে মেলে? আমরা কি এমনো সোহাগ দের কাছে ভালো মানুষ হতে পেরেছি? আমরা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবি। জীবনে কি করলাম আর কি করবো এই ভাবতে ভাবতেই দুশ্চিন্তায় ভুগি আর সেই দুশ্চিন্তা মেটাতে এদিক সেদিক ছুটি। কিন্তু একবার অন্তত এমন পরিস্থিতিতে পড়লে এমন কোন সোহাগের মুখে হাসি ফুটিয়ে দেখেন, দুশ্চিন্তা থাকবে না, শান্তি অনুভব করবেন আপনি যেমনটা আমি আজ করেছি।

বাঁচুন, বাঁচতে দিন। আর সেইটা অবশ্য-ই ভাল ভাবে হতে হবে।

 

কারন আমি সাইকো!

Now Reading
কারন আমি সাইকো!

একটা ফোন কল করতে হবে। বাংলাদেশে এখন গভীর রাত। আমার অনুমান যদি ভুল না হয়, তাহলে রবিন এখন তার বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। অনুমান ভুল হলেও কোন সমস্যা নেই। আমি এখন ফোন করে বললেই, রবিন বাধ্য ছেলের মত বউকে জড়িয়ে ধরবে। তারপর সারা রাত সে ঘুমাক আর না ঘুমাক তাতে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই।
ভাবছেন, কেন রবিন আমার কথা শুনবে??…..
বলছি শুনুন,
“তখন শীতকাল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি। লিকার ছাড়া রঙ চা। শুধুমাত্র গরম মশলার গুঁড়ো আর চিনি গরম জলে ফুটিয়ে খাচ্ছি। এটাই আমার চা। চা পাতা দিয়ে চা খেলে আমার ঘুম হয় না। আর তখন সারা রাত খুব কষ্ট হয়।
ফেসবুকে স্ক্রল করছিলাম। হঠাৎ একটা আননোন আই ডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসল। একটা মেয়ের আই ডি। আমাকে কেউ রিকুয়েস্ট পাঠায় না। মেয়েরা তো অসম্ভব। তাই রিকুয়েস্ট আসার সাথে সাথে এক্সেপ্ট করে ফেললাম। রাত তখন প্রায় ১ টা। শীতের রাত মানে অনেক রাত। ভাবলাম কোন পরিচিত কেউ কিনা?… তাই মেসেজ দিয়ে বসলাম।….
— অসময়ে বন্ধুত্তের অনুরোধ কেন??…
সে রিপ্লাই দিল…
— অসময় হলে, এই অনুরোধ রাখলেন কেন??…
বিপদে পড়ে গেলাম। প্রশ্নের উত্তরে আবার প্রশ্ন করে দেখি। আর যাই হউক, পরিচিত কেউ না। বললাম,….
— আমি কারো অনুরোধ ফিরাতে পারি না।
— খুব খারাপ কথা। বিপদে পড়ে যাবেন….
— বিপদ? সে তো ২৪ ঘণ্টা মাথার উপর লেগেই থাকে। নতুন করে আর কি বিপদে পড়বো?
— কেন? আপনি কি চোর?
— না। আমি ডাকাত।
— হা হা হা….। খুব মজার মানুষ তো আপনি। সত্যি অনেক কষ্টের মাঝেও হেসে ফেললাম।
— হুম। আমি, আমার জীবনের একমাত্র জোকার।
— এভাবে বলছেন কেন?… আই ডিড নট মিন দ্যাট।
— আপনি ভুল বুঝচ্ছেন কেন? আসলে আমার সাথে কেউ মজা করে না। আমি নিজের সাথে নিজে মজা করি। তাই বললাম।
— কেন? আপনি কি খুব সিরিয়াস টাইপের?
— নাহ তেমন না। আর সবাই আমার সিরিয়াসনেস টা নিতে পারে না।
— ও আচ্ছা।
— আচ্ছা, আপনি আমাকে রিকুয়েস্ট পাঠালেন কেন?
— এমনি। অনেক কেই পাঠাচ্ছিলাম। হয় তো ভুল করে চলে গেছে।
— হুম। কিছু ভুল শুধু ঈশ্বরের পক্ষ থেকে হয়। সেই ভুল গুলো শুধু আমাদের ভালোর জন্যই হয়। আমার মনে হয়, এই ভুলটাও তেমনি একটা ভুল।
— হুম। আসি। গুড নাইট।
— চলে যাচ্ছেন যে…..
— হুম। কিছু কথা শুনলে মনটা ভালো হয়ে যায়। আর এই ভালোলাগার আবেশ থাকতে থাকতে ই চলে যাওয়া উচিৎ।
কথা শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমি তাও দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমি আবার সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছি। এবারের এই সিরিয়াসনেস টা, এই অচেনা মেয়েটার বেপারে।

সেদিন রাতের পরে অনেক রাত কেটে গেছে। আমাদের কথার জলও অনেক দূর গড়িয়েছে। আমরা একে অন্যকে চিনতে শুরু করেছি। মেয়েটার নাম, মৌলি। তার একটা রিসেন্ট ব্রেকাপ হয়েছে। মানসিক ভাবে কিছুটা হতাশাগ্রস্থ। আমি তাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিতে লাগলাম। সে আমার কথায় খুব মজা পেত। আর ওকে সময় দিতে দিতে আমার সিরিয়াসনেস আরো বেড়ে যেতে লাগল। আমি মৌলিকে ভালোবেসে ফেললাম। ওর কথা বার্তায় মনে হতো, ও নিজেও আমাকে পছন্দ করে। আমি ঠিক করলাম ওকে এইবার ভালোবাসার কথাটা বলেই ফেলবো। আর কত চুপি চুপি ভালোবাসা যায়?….
সেদিন ছিল, বৃহস্পতিবার। রাতে কথা হচ্ছে। সে বলল….
— জানো, আজকে না আমি ভিশন খুশি।
(আমরা তুমি করে বলতাম। যদিও তার আপত্তি ছিল।)
— কেন? তোমার কি আক্কেল দাঁত উঠেছে?
— একদম ফাজলামি করবে না। আমি সত্যিই খুব খুশি আজকে।
— কারন টা তো বলবে….।
— একটা ছেলে আজ আমাকে প্রপোজ করেছে।
আমি টের পেলাম ভিতরে ভিতরে আমি রেগে যাচ্ছি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
— এ আর নতুন কি?
— নতুন হল, এবার আমি হ্যাঁ বলে দিয়েছি। হি ইজ সো ড্যাসিং। অ্যান্ড হ্যান্ডসাম।
আমার রাগের পারদ তার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নিজেকে কন্ট্রল করতে ভিশন কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছা হচ্ছে, মৌলির গলাটা খুব শক্ত করে চেপে ধরি। আর সেই নাম না জানা ছেলেটাকে এখন সামনে পেলে, কাগজের মত ছিঁড়ে ফেলতাম। মৌলি আবার বলল…
— তুমি খুশি হও নি। আমি সবার আগে তোমাকে বললাম। ইভেন, এটা আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তূর্ণা কেউ বলিনি। আমি জানি এটা শুনার পর সবচেয়ে বেশি খুশি তুমিই হবে।
আমি খুব শক্ত করে বারান্দার রেলিং টা ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করলাম,
— তোমার কেন মনে হল, সবচেয়ে বেশি খুশি আমিই হব…??
— বারে, এতদিন এতভাবে আমাকে বুঝিয়েছ। আমাকে সামলিয়ে রেখেছ। আর তুমি না থাকলে, ওকে আমি কিভাবে পেতাম? আমার যেই মনের অবস্থা হয়ে ছিল, তুমি ছিলে বলেই আবার সব কিছু ঠিকমতো সামলিয়ে উঠতে পেরেছি।
— কেন করলে এমনটা?
— কি করলাম?
— তুমি হ্যাঁ কেন বললে?
— ভালোবাসি। তাই হ্যাঁ ই তো বলতে হবে। তাই না?
— তুমি আমাকে ভালোবাস না?
— সাট আপ। তুমি এসব কি বলছ? তুমি আমার ভালো বন্ধু। দ্যাটস ইট।
— না আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর তুমি কাউকে ভালবাস্তে পারবে না।
— দেখ, সোপান। নিজের মাত্রা ছাড়িও না। কাম ব্যাক টু ইওর সেন্স।
মৌলির এই রূপের সাথে আমি পরিচিত না। এ যেন অন্য কেউ। আমি রাগে এবং কষ্টে বলে উঠলাম,
— তুমি ভুল করছ। তুমি এমনটা করতে পার না। কখনোই না….
ফোনের লাইন কেটে গেল। মৌলির নাম্বার থেকে আর কখনো কল আসে নি।……

মিতি স্কুলে গেছে। আজ ওর জন্মদিন। ওর জন্ম কবে হয়েছিল জানি না। তবে আমি প্রতি বছর এই দিনে ওর জন্মদিন পালন করি। মিতি কে খুঁজে পাই এক ভোর বেলা। সাত বছর আগে। যেদিন মৌলির বিয়ে ছিল সেইদিন। হতাশা গ্রস্থ আমি সেদিন ভোরে রাস্তায় হাঁটছিলাম। ভাবছিলাম যেকোন উপায়ে ওর বিয়েটা আটকে দেওয়া যায় কিনা!!…. তখন রাস্তার পাশের ডাস্টবিনে ওর কান্না শুনতে পায়। সাধারণত ডাস্টবিনে যেই বাচ্চাদের পাওয়া যায়, তাদের চেয়ে মিতির বয়স একটু বেশিছিল। হতভাগ্য মা হয়তো আদরের সন্তানটিকে বুকে জড়িয়ে রাখতে চেয়েছিল। পারে নি। মৌলিকে হারিয়ে যেন, মিতিকে পেলাম। কিন্তু আমি অবিবাহিত। মিতিকে কি ভাবে, কি পরিচয়ে নিজের কাছে রাখবো? তখন একটা প্ল্যান বের করলাম মনে মনে। মাস্টার প্ল্যান। মিতি এবং মৌলিকে একসাথে পাবার প্ল্যান।

 

বেলা ১২ টা বেজে গেছে। মিতি তার মা কে নিয়ে বাসায় আসার সময় হয়েছে। মিতির মা আর কেউ নয়, মৌলি। হুম.. অন্তত মিতি এবং আমার প্রতিবেশীরা এটাই জানে। আমার বাসায় মৌলির বিয়ের সব ছবি বাধানো আছে। আমারও কিছু ছবি তার পাশেই বাধায় করে রেখেছি। আর মিতির ছোটবেলার ছবি তো আছেই। সিব মিলিয়ে হ্যাপি ফ্যামিলি। মৌলি যেই স্কুলে পড়ায়, মিতিকে আমি সেখানেই ভর্তি করিয়েছি। মৌলি মিতির ক্লাস টিচার। মিতি ভালো ছাত্রী। তাই মৌলির সাথে মিতির খাতির ও বেশি। আমি মিতিকে বলেছি, সে যেন মৌলি কে স্কুলে মা বলে না ডাকে। কিন্তু আমার মেয়ে, অনেক বেশি বুদ্ধিমান, সে কিভাবে যেন মৌলিকে পটিয়ে মা ডাকে। আর মৌলিও সেটাতে কোন আপত্তি করে না।
কলিং বেল বাজছে। আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম। অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হবে আমাকে। দরজা খুলতেই, মিতি চাপা স্বরে বলে উঠল,
— বাবা আমি মা কে নিয়ে এসেছি।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। মিতি দৌড়ে ওর ঘরে চলে গেল। মিতির পিছু পিছু মৌলি ঘরে ঢুকল। প্রথমে সে আমাকে চিনতে পারে নি। পরে চিনতে পেরে হতবাক হয়ে বলল,
— তুমি?
— হুম। আমি মিতির বাবা।
— ও… বিয়ে করেছ কবে?.
— অনেকদিন হল। প্রায় সাত বছর।
— ভালো তো। তোমার মেয়েটা কিন্তু খুব ট্যালেন্টেড। আর খুব মায়াবী।
— হুম। ঠিক ওর মায়ের মত।
— তাই? ওর মা ও বুঝি খুব সুন্দরি?
— হুম। খুব। অন্তত আমার দেখা।
মৌলির ঠোঁটের কোনায় খানিকটা হেসে উঠল। বলল,
— বউকে খুব ভালোবাস তাই না?
— হ্যাঁ। খুব ভালোবাসি।
— সত্যি, তোমার স্ত্রী খুব লাকি! তোমার মত একটা হাসব্যান্ড পেয়েছে।
— আমারও তাই মনে হয়।
— হা.. হা.. হা। তোমার মেয়ে আর বউ কে ডাক। দেখা করে যায়। আমার বাসায় যাওয়ার তাড়া আছে।
— এত তাড়া কিসের? তোমার স্বামী তো মিটিং এ ব্যস্ত। আজকে আমাদের একটু সময় দাও।
— আমার স্বামী মিটিং এ তোমাকে কে বলল?
মৌলি জানেই না, ওর আর ওর স্বামীর ব্যাপারে কিছুই আমার অজানা না। ওদের বিবাহিত জীবনের প্রথম ২ বছর বাদে, পুরোটাই আমার নিয়ন্ত্রণ করা। আমি যেভাবে চেয়েছি। অনেকটা সেভাবেই ওদের বিবাহিত জীবন এগিয়েছে।
আমি বললাম,
— বিশ্বাস না হলে ফোন করে দেখ।
— থাক, তোমার মেয়েটাকে ডাক। আর সুন্দরি বউ কে তো দেখাবে না বলে মনে হচ্ছে।
— এতো তোমার মেয়ে, তোমার মেয়ে করছ কেন? মিতি তো তোমার ও মেয়ে।
— কি! আমার মেয়ে? মানে? এসব কি বলছ?
— সত্যি বলছি। তুমি চারপাশে তাকিয়ে দেখ।
মৌলি এবার চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। পুরো ঘর জুড়ে শুধু সে আর মিতি। ওদের স্কুল প্রোগ্রাম থেকে পিকনিক এর সব ছবি বড় করে বাধিয়ে রাখা। ওর বিয়ের ছবি। আমার সাথে ওর ছবি। ওর ছোটবেলার ছবি। সব কিছু। বাইরের যে কেউ বলবে, এই পরিবারের সদস্য আমরা ৩ জন। মিতি, মৌলি আর আমি।
মৌলি যেন আকাশ থেকে পড়ছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বলে ওঠে,
— তুমি এটা কি করেছ?… এসব ছবি কোথায় পেলে?..
— তোমার বিয়ের ছবি তোলার জন্য যেই ক্যামেরা ম্যান কে এপয়েন্ট করা হয়েছিল। সেটা আমিই ছিলাম। আর বাকি ছবি গুলো খুব ভাল করে খেয়াল না করলে, কেউ বুঝবে না যে, আসল মেয়েটা তুমি নও। তোমার আমার কমন ছবিগুলোতে, আমরা কেউ সরাসরি তাকিয়ে নেই। ছবি গুলো সব বাস্তব। শুধু মেয়েটা তুমি নও।
— তুমি একটা সাইকো, পেলব। সাইকো। তুমি তোমার মেয়ে দুজনেই।
আমি মেজাজ হারিয়ে ফেলছি।
— তুমি আমাকে যা খুশি বলতে পার। কিন্তু আমার মেয়েকে কিছু বলবে না। তাহলে, তোমার ফিরে যাওয়ার আর কোন পথ খোলা থাকবে না।
— কেন, কি করবে তুমি?
— তোমার সাজানো সংসার ভাঙতে আমার যাস্ট ২ মিনিট সময় লাগবে। শুধু একটা ফোন কল। তারপর সব শেষ।
— সে তোমার কথা বিশ্বাস করবে না। তাছাড়া সে তোমাকে চেনেই না।
মৌলি জানেই না তার প্রেমিক স্বামী যে মেয়েটার সাথে ৫ বছর ধরে পরকিয়া করে, সে মেয়েটা আসলে আমিই। এতো সুন্দর করে অভিনয় করি, যে সে ছেলে আর মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। গাধাটা কে যা বলি, সে তাই শোনে। ওর সমস্ত দুর্নীতির প্রমাণ পত্র আমার কাছে দিয়ে রেখেছে। শুধু ফাস করার দেরি এই যা।
আমি শুধু বললাম,
— শুনবে, কারন তাকে শুনতে ই হবে।
মৌলি চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। আমি বললাম,
— আজ আমার মেয়ের জন্মদিন। তুমি এখন চলে গেলে আমি তোমার স্বামী রবিন কে ফোন করব।
আমার সিরিয়াসনেস দেখে মৌলি ভয়ে শুকিয়ে গেছে। আমার কণ্ঠের শীতলতা, ওকে বুঝতে বাধ্য করেছে যে আমি কোন মিথ্যা বলছি না।
— তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছ। প্লিজ আমার সংসার ভেঙো না। আমি ওকে ভালোবাসি।
— কিন্তু সে তোমাকে ভালোবাসে না।
মৌলি, এবার কিছু বলল না। কাঁদতে লাগল। কিছু অপ্রিয় সত্যি যদি মানুষের সামনে আসে, তাহলে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মৌলিও পারে নি। এই মূহুর্তে ওকে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে আমার। এই ভালোবাসার কষ্ট আমি প্রতিদিন পাই। কাওকে ভালোবেসে না পাওয়ার যে যন্ত্রণা তা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানেনা।
মিতি অনেক্ষণ ধরে আমাদের কথা শুনছে। সে এবার বলে উঠলো,
— মা কে যেতে দাও বাবা। মা’র খুব কষ্ট হচ্ছে।
— তোর মা চলে গেলে যে, আমার খুব কষ্ট হবে….
— আমিতো আছি বাবা, তোমার কাছে। আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না।
মৌলি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে উঠল,
— তোমার মেয়েটা সত্যি খুব লক্ষ্মী। এমন মায়াবতী একটা মেয়ের মা হবার ভাগ্য আমার হল না……

মৌলিকে আমি যেতে দিয়েছি। আর মিতিকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে এসেছি। রবিনকে তার মিথ্যে প্রেমিকার ভুল ভাঙিয়েছি। কিন্তু ওর অপকর্মের প্রমাণ নিয়ে, নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করি। যেন মৌলিকে আর কখনো কষ্ট না দেয়। খুব কষ্ট হয়। কারন আমি জানি, আমি রবিন কে বলা মাত্র সে মৌলিকে জড়িয়ে ধরবে। তার অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে। আর মৌলিও মিথ্যে ভালোবাসায় মেতে উঠবে।

তাবুও এমন করি….
কারন, আমি সাইকো!

রাত্রি অন্ধকার!

Now Reading
রাত্রি অন্ধকার!

বাসটা শেষ স্টপেজে এসে থামতেই ঝপ করে বাম পা টা দিয়ে রাস্তায় নেমে এলো প্রদোষ। লক্ষীবাজারের এই আধো ছায়া আধো হলদে আলোর রাস্তাটায় একা একা উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে হাটতে বেশ ভালোই লাগছে তার।

“ভালোই হলো এভাবে বের হয়ে এসে। অন্তত সকাল-বিকাল কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করার মতো তো কেও থাকলোনা আর।” হাটতে হাটতে এসব সাত-পাঁচ ভাবছে প্রদোষ।

প্রদোষ বর্মন। নতুন মার সাথে এক ছাদের নিচে ছাব্বিশ বছর কাটিয়েও যার অভ্যেস করতে পারলোনা। কটাক্ষ করে নতুন মা আর প্রদোষের ঝগরা হয় বাবার সাথে!

সৎ মা মাত্রই নির্দোষ অথচ ঝগরাটে হবে!” সম্ভবত পুরো দেশটার শিকড়-বাকরের সাথেই এমন বিদঘুটে ব্যাপারটা আষ্টেপৃষ্টে জমে গেছে। প্রদোষের আর কি বলার থাকে, যেখানে নতুন মাও নিজেকে নির্দোষ দাবী করে এসেছেন সবসময়!

হাটতে হাটতে হুশ হলো সামনে প্রাচীরের বাঁধা পেয়ে। আহসান মঞ্জিল! এতদূর হেটে চলে এসেছি আমি! অবাক হয়ে ভাবলো প্রদোষ। চাঁদনী আলোয় প্রকান্ড আহসান মঞ্জিল অপূর্ব ঝিলিক দিচ্ছে। অপরূপ সৌন্দর্য্য! হা করে তাকিয়ে আছে প্রদোষ। হঠাৎ দেখে মঞ্জিলের গেইট খুলে কে যেনো বেরিয়ে এলো।

– “হ্যা ভাই এই ঘুটঘুটে অাঁধারে পথ-ঘাট কিছুই চিনতে পারছিনে! সদরঘাট যাওয়ার রাস্তা খানা কোথা বলোতো বাপু?” মূর্তিটার ভরাট পুরুষ কন্ঠ গমগম করে প্রশ্ন করলো প্রদোষের কাছে এসে।

– এত রাতে! আপনি আসলেন কোথা থেকে!

– “এই গিয়েছিলুম একটু ওইদিক হাটতে, হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেললুম। এত জঙলা গাছ ছাঁটেনা কেনো ওরা বুঝিনাহ!” খেদ ঝরে পড়লো যেনো।
– তা ভাই সদরঘাট দেখিয়ে দাও, আমায় আবার ভোরের আগেই শীপ ধরতে হবেনে।”

-জ্বী! এত রাতে তো বাস পাবেননা। বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে সিএনজি পান কিনা দেখুন। তা নাহলে রাতটা কোনো আত্মীয়ের বাসায় কাটিয়ে সকালে নাহয়….
-বড় রাস্তা কোনদিক গ্যালে পাবোনে বাপু? প্রদোষ কথা শেষ করার আগেই লোকটা ধমকে ওঠলো প্রায়।

অবাক প্রদোষ হাত ইশারায় দিক দেখিয়ে দিতেই ধুতিটা তুলে নিয়ে হনহন করে ওদিকে চললো।
-অকৃতজ্ঞ একটা, ধন্যবাদ দিতেও শিখেনি!

মোড় ঘুরতেই চোখের আড়ালে চলে গেলো লোকটা। প্রদোষও একটা শ্বাস ফেললো। জায়গাটা আবারো স্তব্ধ হয়ে গেলো!
মঞ্জিলের গেইটের পাশেই দারোয়ানের একটা টুল।

-ব্যাটা হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে, এই ফাঁকে একটু বসে নেই।আসলে নাহয় গল্পে গল্পে রাতটা পার করা যাবে।”

বসে সারাদিনের কীর্তি কাহিনী সব মনে পড়ে গেলো একে একে। বাবার হুংকার,নতুন মার মায়াকান্না,প্রতিবেশীর ওঁকিঝুকি মারা সঅঅব!
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা প্রদোষ। ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙে দেখে এক লোক সামনে দাড়িয়ে।

-কি মিয়া বাই, সাত সক্কালে ঘুরতে আইয়া পরছেন। দশটার আগে ত খুলবোনা! লাল দাঁতগুলো বের করে অকারন হাসলো লোকটা।

প্রদোষ বিরক্ত হলো একটু।
-আমি ঘুরতে আসি না ঘুমাতে আসি তোর কি শালা! মনে মনে লোকটার পিন্ডি চটকাতে চটকাতে প্রাচীরের গেইটের সামনে চলে এলো প্রদোষ।

প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা। সাত বছরের নিচের বাচ্চাদের ফ্রী। শনিবারে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রবেশ বিনামূল্যে।
বাহ! ভালোই তো!

দশটা বাজতেই টিকিটঘরের ঝাপি খুললো। দলে দলে দর্শনার্থী আসছে। প্রদোষও একটা টিকিট কেটে ঢুকে পরলো তাদের সাথে। ঘুরে ঘুরে দেখলো এক তলা দো তলা। তিন তলায় এসে প্রথম তৈলচিত্রটার সামনে থমকে দাড়ালো।

-ছবিটা কেমন চেনা চেনা লাগছে!
একই গোঁফ,একই পাতলা চুল,একই গোলগাল মুখ,একই রাগী চোখ! পড়নের ধূতিটা ও সেই রকমই লাগছে!

চোখ কঁচলে নিয়ে নিচের নামটা পড়লো প্রদোষ।
– “নওয়াব স্যার খাজা আহসানউল্লাহ। বাংলার চতূর্থ নবাব!

– “এও কি কোনোভাবে সম্ভব? ভেবে কূল কিনারা পেলোনা প্রদোষ।

– কি জানি কি হচ্ছে এসব। তাও ভালো রাতে ওটা পুরুষ ছিলো, নয়তো কোনো অপ্সরী হলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হলেও হতে পারতো!!”

 

অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব

Now Reading
অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

তার প্রতি যে আমি একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করছিলাম এটা সত্যি। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম এই আকর্ষণ শুধু ভাললাগার নয়। আমার কল্পনার জগতে তার ছিল নিত্য চলাচল। আস্তে আস্তে সে হয়ে উঠছিল আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ যখন হৃদয়ের এত কাছে চলে আসে তখন মনে একটা ভয়ের উদয় হয়, একটা সূক্ষ্ম কিন্তু প্রখর ব্যাথা অনুভূত হয়; ভয়টা হারিয়ে ফেলার আর ব্যাথাটা তার যন্ত্রণার। আমি তাকে হারাতে চাচ্ছিলাম না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল আমার সর্বস্ব দিয়ে হলেও অন্তরের অন্তঃস্থলে তাকে আগলে রাখব, বিস্বাদ নীলিমার কোন স্পর্শ লাগতে দেবো না তার মনে, তার চোখে জমতে দেবো না কাল মেঘ। সে কে এই প্রশ্নটা বোধ হয় মন থেকে তখন উধাও হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক।

তার একটা নাম দেয়া প্রয়োজন ছিল। ‘নাম’ যদিও কেবল একটা সম্বোধন তবুও আমি চাচ্ছিলাম এমন একটা ‘বিশেষ্য’ যার মাধ্যমে তাকে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত করা যায়। আমি মনে মনে যে নামটা ভেবে রেখেছিলাম সেটা তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে সামর্থ্য না হলেও সার্বিক বিবেচনায় সার্থকতার পাল্লাটাই হয়তো বেশি ভারী হবে।

আমার অনিদ্রায় কাটানো রাতটা ব্যর্থ হয়ে গেল যখন পর পর দুই দিন তার দেখা না পেলাম। প্রথম দিন তেমন কিছু মনে হয় নি। আমি তার জন্য আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে গেলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিনও যখন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো সেটা আমি আর স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলাম না। মনের মধ্যে একটি শুন্য স্থানের সৃষ্টি হয়েছিল। এটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক সেটা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আমার তখন ছিল না।

দ্বিতীয় দিন আমি তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। মনের মধ্যে একটি ক্ষীণ আশা ছিল তার দেখা পাব। কিন্তু ভাগ্য আমাকে নিরাশ করার প্রতিজ্ঞা করে বসে ছিল সেদিন। তার এই হঠাৎ অনুপস্থিতি আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল। আমি কিছুই ভেবে বের করতে পারছিলাম না। আমার ধীর পদক্ষেপ আমাকে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আমার মন ওই আধঃ আলোকিত জায়গাটাতেই পরে ছিল।

এর পরের দিনটা আমার একদমই ভাল কাটেনি। মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম যাতে সেদিন তার সাথে দেখা হয়। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ও তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু ফলাফল শুন্য।

সেদিন রাতে পড়ানো শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। রোড পার হবার জন্য দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনি আমার পিঠে একটা হালকা স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি পিছন ফিরতেই দেখলাম আমার বিসন্নতার কারণ হওয়া সেই রাজকুমারী আর তার চিরচেনা হাসি। আমার তখন কেমন লাগছিল তা বর্নমালায় ব্যাক্ত করার মত না। আমি জানি না এইটুকু সামান্য ঘটনায় কারো প্রেমে পড়া যায় কিনা। কিন্তু আমি নির্লজ্জের মত তার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম সেই মুহুর্তে। আমার গত তিন দিনের এত বিষণ্ণতা, হতাশা সব ডুবে মরেছিল তার হাসিতে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম; কোথায় ছিলে এত দিন?

সে বলল; এত দিন কোথায়? মাত্র দুই দিন।

– আমার কাছে এই দুটি দিন, দুটি বছর ছিল।

– পড়াতে গিয়েছিলে? নাকি সিনেমা দেখতে?

– সিনেমা কেন দেখতে যাব?

– তাহলে ডায়লগ কেন দিচ্ছো?

এরপর কি বলবো আমি বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর ও বলল; ‘চল’।

কোথায় যাব জানতে চাইলে তার কাছ থেকে যে কোন উত্তর পাবো না তা আমি নিশ্চিত। তাই কোন কথা না বাড়িয়েই তার সাথে চলা শুরু করলাম।

আমরা যেখানে পৌছালাম, সেটা একটা লেকের পাড়। আমাদের আড্ডা দেবার আর একটা জায়গা। রাতের এই সময়টাতে সেখানে মানুষের চলাচল এতটা নেই। ল্যাম্বপোস্টের আলোয় আমরা হাটছিলাম। নীরবতা ভেঙে সে বলল; “তুমি যে এই দুই দিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আমি জানি। আমার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলে সেটাও খেয়াল করেছি। আমি ইচ্ছে করেই আসলে আসিনি এই দুই দিন। দেখতে চেয়েছি আমার ছোঁয়াচে পাগলামী তোমার মাথা কতটা খারাপ করতে পারে।”

– তারপর কি দেখলে?

– দেখলাম, আমি তোমাকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি বোকা তুমি।

– কিভাবে?

– এই, তুমি এত বেশি বেশি প্রশ্ন কর কেন বলতো?

– আচ্ছা, করবো না প্রশ্ন। কিন্তু আমার মাথায় যে প্রশ্নগুলো ঘুরছে সেগুলোর কি হবে?

– সেগুলো প্রশ্নই থাক। আস্তে আস্তে খুজে নিও উত্তরগুলো।

এরপর কিছুক্ষনের নীরবতা আবারো। সে আর আমি পাশাপাশি লেকের পাড়ে এক ব্যাঞ্চে। সময় তখন রাত দশটার কাছাকাছি। আমি বললাম; “চল ফিরি।” সে কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো। আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম। হঠাৎ সে বলল; “মনে আছে তোমার আর আমার একটা ফার্মেসীতে দেখা হয়েছিল? সেদিনই আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম। তারপর আরো অনেক বার দেখেছি তোমাকে, অনেক জায়গায়। এই দেখতে দেখতেই কবে যে তোমাকে ভাল লেগে গেছে আমি জানি না। অনেকবার ভেবেছি কথা বলবো। কিন্তু পারি নি। ভয় আর দ্বিধাকে উপেক্ষা করতে আমার লেগে গেছে এক বছর চার মাস ছাব্বিশ দিন।”

আমি অবাক হয়ে ওর কথাগুলো শুনছিলাম। আমার বলার মত কিছুই ছিল না তখন। মেয়েটি তখন বলল; তোমাকে না আমার একটা নাম দিতে বলেছিলাম? কি নাম ভেবেছো?

– পরী।

– হা হা হা। আমি জানতাম, তোমার মাথায় এর চেয়ে ভাল নাম আর আসবে না।

– আমার জন্য কি নাম ভেবেছিলে?

– আমি তো কোন নাম ভাবিনি।

– কেন?

– আমার ইচ্ছা। তোমার কি তাতে।

আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়ালাম না। বললাম; আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি?  সে হেসে বলল; “পরীকে ছুঁয়ে দেখতে চাও?” বলে সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

আমি তার হাতে হাত রাখার পর সে বলল; ” আমি পরী নই, মানুষ”।

অনুসন্ধান (৩য় পর্ব)

Now Reading
অনুসন্ধান (৩য় পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

বছর খানেক আগে ডাইরিটার শেষ লেখার মাধ্যমে শেষ করেছিলাম জীবনের একটা পুরনো অধ্যায়ের। এখন কি আবারও নতুন একটা পাতায় নতুন করে লিখতে যাচ্ছি তেমনি কোন কাহিনী? ভয় হচ্ছিল কারণ আগের মত এটাও যদি অসমাপ্ত থেকে যায়? যদি জীবনের পাতা অলেখা থাকতেই আবারও ফুরিয়ে যায় শব্দ গুলো? অসমাপ্ত সকল কিছুতে অনেক ভয় আমার। কেননা, অপূর্ণতা না যোগায় বাঁচার অবলম্বন আর না’ই বা করে পুরোপুরি নিঃস্ব।

সে যা’ই হোক, সবকিছুর পরেও হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা অন্যরকম ভাললাগা কাজ করছিল। একটা মেয়ে আমাকে এভাবে ভাবে, আমি কখন বাইরে যাই, কখন ফিরি তার খেয়াল রাখে, এর থেকে ভাল লাগার আর কি হতে পারে? নিজেকে সিনেমার নায়কের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হচ্ছিল না। একটা অস্থিরতা কাজ করছিল মনে, কিন্তু সে যে ভাল লাগারই সেটা বোঝাও কষ্টকর ছিল না।

পরদিন যথা সময়ে জায়গামত যেয়েও মেয়েটাকে পাওয়া গেল না। আমি চলে না এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যদিও সেদিন সে আসবে কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। তবুও…। অপেক্ষার প্রহরগুলো অনেক বেরসিক হয়। যেন সময় একেবারেই থমকে দাঁড়ায়। আমার মতে অপেক্ষা করার মত বিরক্তিকর কাজ আর নেই। যদিও এই সময়ে এই জায়গায় মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম। তবুও মনে হচ্ছিল আশেপাশের মানুষগুলো চলার পথে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। প্রায় ২০ মিনিট পর তাকে দেখা গেল; আমার দিকেই আসছে। আমাকে দেখে সে তার চলার গতি স্বাভাবিকতার চেয়ে খানিকটা বাড়িয়ে দিল। আমি আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম সে আমার উপর রেগে আছে, রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক।  কেননা আমি এই ২০ মিনিট অপেক্ষা করেই হাঁপিয়ে গেছি, না জানি সে গতকাল কত সময় অপেক্ষা করেছে। তার রাগের মাত্রা কত ডিগ্রি সেটা জানতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। কাছে এসেই সে কোন কথা না বলে আমার শার্টের কলার টেনে ধরল। এমন একটা ভাব যেন আমাকে এখনি শূন্যে নিক্ষেপ করতে পারে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সেদিন তার আচরণে আমি একটুও বিচলিত হলাম না। বরং ভাল লাগছিল। তাই নিজেকে ছাড়ানোর কোন চেষ্টাই ছিল না আমার। এমন একটা পরিস্থিতিতেও যে মানুষের ভাল লাগা কাজ করতে পারে সেটা ভেবেই যেন অবাক হলাম। সে শুরু করল তার কথার গোলা বর্ষণ। আমার শার্টের কলার টানতে টানতে সে বলল;

“ওই, কালকে তোকে কখন থাকতে বলেছিলাম, আসিস নি কেন? কোথায় ছিলি এত রাত পর্যন্ত? বল?”

আমি পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম এই ভেবে যে গতদিন তবু ‘তুমি’ পর্যন্ত ছিল। আজ সরাসরি তুই! আগামীতে কি বলবে কে জানে। আমি অনুতপ্ত আসামীর মত পুরো ঘটনাটার বর্ণনা দিলাম। শুনে সে বলল;

– বন্ধুর জন্মদিন তাহলে আগের দিন বলে দিলি না কেন?

– আমার মনে ছিল না।

দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল; “ কি মনে থাকে তর?”

আমি তার থেকে যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় আমার কলার ধরার জন্য তাকে আমার অনেকটা কাছে সরে আসতে হয়েছে। আর উত্তেজনার বশে কথা বলতে বলতে সে দূরত্বটাও অনেক কমে এসেছিল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম আর প্রত্যক্ষ করছিলাম কথার ভঙ্গিতে কিভাবে তার ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠে, সেই ঠোঁট একটু বেঁকে গেলেই কিভাবে শ্রোতাকে আকৃষ্ট করার জন্য গালে সৃষ্টি হয় টোলের। সে অসম্ভব রকমের সুন্দরী। তার পুরো মুখমণ্ডলে সদ্য জন্মানো একটা অবাধ্য ব্রণ ছাড়া আর কোন দাগ নেই। কিন্তু ডান পাশে থাকা ব্রণটি তার সৌন্দর্যকে একটুও না কমিয়ে বরং আরও বৃদ্ধি করেছে, সমস্ত চেহারাকে করেছে আরও নিষ্পাপ। সে যখন বুঝতে পারলো আমরা এতটা কাছাকাছি, তখন সে এক ঝটকায় আমার শার্টের কলার ছেড়ে দিল এবং স্বাভাবিক দূরত্বে দাঁড়ালো। এতক্ষণ যে মেয়েটি উচ্চশব্দে আমাকে শাসাচ্ছিল, সে’ই এখন মূর্তির মত নির্বাক হয়ে গেছে। লজ্জায় সে কোন কথা বলতে পারছিল না। তার দৃষ্টি ছিল নিচের দিকে। এ যেন সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন চরিত্র। তার নিস্তব্ধতায় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চারপাশ, যেন প্রকৃতিও তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য জানাচ্ছিল সমবেদনা।

কিছুক্ষণের মৌনতা ভেঙ্গে আমি জিজ্ঞাসা করলাম

– রাগ কমেছে আপনার?

সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

আমি প্রশ্ন করলাম

– আচ্ছা, আপনি আমার দিকে এত নজর রাখছেন কেন? কবে থেকেই বা রাখছেন?

– আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই। আমি তো কাউকে কোন কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।

– কৈফিয়ত চাইছি না। শুধু জানার ইচ্ছা।

– সব ইচ্ছাই কি পূর্ণতা পায়?

– তা হয়তো পায় না। কিন্তু যেটাকে ইচ্ছা করলেই পূর্ণতা দেয়া যায় তাকে পায়ে ঠেলাও তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই না?

– তোমাকে বুদ্ধিমান বানানোর ভার তো আমি নিয়ে রাখিনি।

– তাহলে বোকা কেন বানাচ্ছেন?

আজ আসার আগে ভেবেছিলাম ও’কে ‘তুমি’ বলে ডাকবো। কিন্তু সে আমার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ায় সব গুলিয়ে ফেলেছি। শেষ প্রশ্নটা করার পর সে শুধু হাসল। কে যেন বলেছিল; কারও হাসিতে মৃত্যু লেখা থাকে, কেউ হাসির ফাঁদে যে কাউকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তার হাসিতে আমার অনুর্বর আত্মার মৃত্যু ঘটেছিল কিনা জানি না কিন্তু আমি যে আস্তে আস্তে তার ফাঁদে বন্দি হচ্ছিলাম সেটা নিশ্চিত। সে তখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি বললাম ; উত্তর দিচ্ছেন না যে? সে বললঃ

– যদি একটা মানুষ সম্পর্কে সব কিছু জানা শেষ হয়ে যায় তাহলে তার প্রতি আকর্ষণও  ফুরিয়ে যায়, আস্তে আস্তে সে মূল্যহীন হয়ে পরে। আমি মূল্যবান থাকতে চাই তোমার কাছে। না হয় এই অনুসন্ধানের আকর্ষণেই তুমি আমাকে মনে রাখবে, কাছে টানবে।

এর উত্তরে আমার কি বলা উচিৎ ছিল আমি জানি না। তাকে জোর করারও কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি নি। শুধু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম; “তাহলে কি প্রশ্নগুলো বিনা উত্তরেই পরে থাকবে?”

সে বলল; অবশ্যই না। আমারও অনেক প্রশ্ন আছে তোমার কাছে। কিন্তু এখন সে প্রশ্নের সময় নয়। আস্তে আস্তে তোমাকে আবিষ্কার করে নেব নিজের মত করে। আচ্ছা তোমার নাম টা তো বললে না?

– সেটাও ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেই?

– ঠিক আছে। কিন্তু এখন একটা নাম তো চাই, তুমি একটা নাম দাও আমার।

হটাত করে কি নাম দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। যদি তার পছন্দ না হয়? আমার সব থেকে কাছের বন্ধু মাসুমকে তার প্রেমিকা রূপাই নামে ডাকতো। সে মাসুমকে বলেছিল তার ও একটা নাম দিতে। বর্তমানে প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে রোমান্টিকতার একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছদ্ম নাম। আর সে নামের মধ্যেও থাকতে হয় মিল। যেমনঃ রোমিও- জুলিয়েট, শিরি- ফরহাদ। তেমনি রূপাই এর বিপরীতে সাজু ছাড়া অন্য কোন নাম ই যথাযত নয়। তাই মাসুমও তার প্রেমিকার নাম দিয়েছিল ‘সাজু’। মাত্র একবারই সে এই নামে ডাকতে পেরেছিল। আর এতেই তার প্রেমিকা ক্ষেপে গিয়েছিল। মেয়েটির মতে নামটা ছিল ‘বিশ্রী’। আর এমন নাম দেয়ার ফলাফল স্বরূপ তাদের সম্পর্কেরই ইতি টানতে হয়েছিল। যার মাথায় সাহিত্য ঢুকে নি, তার প্রেম হয়তো ততটা গভীর হয়না। আমার যদিও সম্পর্ক ভাঙার কোন ভয় ছিল না, তবুও নাম পছন্দ না হলে এই দুর্ধর্ষ মেয়েটি আমাকে দুই তিন টা ঘুষি মেরে আমার দাঁত ভেঙ্গে দিতে পারে আমি নিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে পরার আগেই আমি বললাম; “নাম রাখার জন্য আমাকে কিছু সময় দাও”। এই প্রথম আমি তাকে তুমি বললাম। সে যে খুশি হয়েছে সেটা তার মুখ দেখে অনুমেয়। সে বলল-‘কতটা সময়?’

– কয়েক বছর।

– আরও কিছু সময় নাও। এই যে ধর দুই তিন যুগ? হবে?

আমি মজা করে বললাম “এর মধ্যেই হয়ে যাবে”। সে বলল; “কালকে নাম বলবে, না হলে কি করি দেখবে। এখন যাই অনেক দেরি হয়ে গেছে”।

যদিও আমাদের পথ একই দিকে তবুও সে আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গেল। আমি তার পথের পাণে চেয়ে রইলাম। তার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল আমার দৃষ্টি। মনে হচ্ছিল এমনই ধীর পদক্ষেপে সে প্রবেশ করছে আমার মনে, আমার শিরায়-উপশিরায় বা তার থেকেও অস্তিত্বের কাছাকাছি যদি আর কোন জায়গা থেকে থাকে তাহলে সেখানটাতেই।

(চলবে…)